নতুন চিন্তার আলোকে পুরোনো সংবিধান
jugantor
নতুন চিন্তার আলোকে পুরোনো সংবিধান

  আবু তাহের খান  

০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান ৫০তম বছরে পদার্পণ করেছে। বলা হয়ে থাকে, এটি পৃথিবীর সেরা সংবিধানগুলোর অন্যতম। অন্যতম শুধু এ অর্থে নয় যে, এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় সব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করতে পেরেছে; বরং এ কারণেও যে, এটি মানুষের অধিকাংশ মৌলিক চাহিদা ও মানবিক অধিকারকে সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে এবং সমতা প্রতিষ্ঠার নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানে সক্ষম হয়েছে।

বলা যায়, এর একটি দার্শনিক রূপকল্পও রয়েছে। ধারণা করা যায়, এর মাধ্যমে এর প্রণেতারা বাংলাদেশকে শুধু একটি আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোই দিতে চাননি, একে একটি উন্নত মানবিক সমাজের আদলেও গড়তে চেয়েছিলেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ৪৯ বছরে বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কর্মক্ষেত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা ও মানসিকতা গড়ে তোলা, কৃষির বহুমুখীকরণ, দারিদ্র্য নিরসন, মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথেষ্ট সফল হলেও একটি গুণগত মানসম্পন্ন উন্নত মানবিক সমাজ বিনির্মাণে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে। আর সাংবিধানিক অঙ্গীকার রক্ষায় রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার হার এতটাই বেশি যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৯৭২-এর তুলনাতেও আমরা পিছিয়ে পড়লাম কিনা, সে প্রশ্নও উঠছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শোষণমুক্তি, বৈষম্য নিরসন ও সমতা প্রতিষ্ঠার ওপর। এ নিয়ে তিনটি অনুচ্ছেদে (১০, ১৪ ও ১৯) সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং এর বাইরেও অন্য অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। তন্মধ্যে ১০নং অনুচ্ছেদে ‘শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা’ এবং ১৪নং অনুচ্ছেদে ‘সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তিদানে’র প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৯(২) অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য,..সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য..রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’

কিন্তু একটি শোষণমুক্ত ন্যায়ানুগ সমাজ প্রতিষ্ঠা কিংবা সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্যের বিলোপ সাধনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত পঞ্চাশ বছরে আদৌ কি এগোতে পেরেছে? বরং বৈষম্যের মাত্রা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর প্রকট ও অমানবিক। অথচ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্রই ছিল শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে সেটিই হয়ে ওঠেছিল ১৯৭২-এর সংবিধানের মৌলচেতনা। কিন্তু সে চেতনার কতটা আজ বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ধারণ করতে পেরেছে?

সংবিধানের ১৩নং অনুচ্ছেদে ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালিগুলোর মালিক হইবে জনগণ’-এ চেতনাকে সামনে রেখে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার সীমা আইনের দ্বারা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। আর সে অনুযায়ী এ বিষয়ে ১৯৭২ ও ১৯৮৪ সালে প্রণীত আইনে জমির মালিকানার সর্বোচ্চসীমা যথাক্রমে ১০০ ও ৬০ বিঘা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত দুটি আইনেই ভূমি-মালিকানার এ ঊর্ধ্বসীমা সমবায় সমিতি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না মর্মে উল্লেখ রয়েছে। আর আইনে উল্লিখিত ওই ব্যত্যয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সিংহভাগ ভূমির মালিকানা ঘুরেফিরে এখন ওই বিত্তবানদের হাতেই চলে গিয়েছে-ভূলুণ্ঠিত হয়েছে সমতাপূর্ণ বণ্টনের বিষয়ে এ অনুচ্ছেদেই উল্লিখিত বিধানের প্রকৃত চেতনা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিষয়টি নিয়ে প্রায় কেউই কথা বলছেন না।

সংবিধানে ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা’র (অনুচ্ছেদ-১৭) বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ নিয়ে যতবার কথা হয়েছে, ততবারই এর বিপরীতমুখী বিস্তার আরও বেশি করে ঘটেছে। বহুল আলোচিত ও প্রশংসিত কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত শিক্ষার বিষয়ে আরও নানা কমিশন-কমিটি গঠন করে বহু সুপারিশ ও পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে।

অথচ দেশ এখন পর্যন্ত একমুখী শিক্ষার ধার কাছেও নেই। সাধারণের মধ্যে আলোচনা আছে, এর সঙ্গে সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের স্বার্থ জড়িত নেই বিধায় (কারণ তাদের সন্তানেরা দেশে পড়াশোনা করে না) নিকট ভবিষ্যতে তা হবে বলেও মনে হয় না। অথচ মনে রাখা দরকার, বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা যতদিন বহাল থাকবে, সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় বৈষম্যের চর্চাও ততদিনই চলতে থাকবে।

সংবিধান অনুযায়ী ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ এবং ‘কর আরোপ করবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা’সহ দেশে একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা থাকার কথা (অনুচ্ছেদ ৫৯ ও ৬০)। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংবিধানকে শুধু উপেক্ষাই করা হয়নি, বরং আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ মিলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণের পরিবর্তে তার ক্ষমতাকে আরও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার চেয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের যা করার কথা, সেসব স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজ করতেই অধিকতর উৎসাহী এবং করছেনও তাই। অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের কেন্দ্রীয় কাঠামোর কর্মচারীরাও কাজ করছেন ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই তারা তাদের ক্ষমতার ভাগ স্থানীয় সরকারকে দিতে রাজি নন।

সত্যি কথা বলতে কী, গত ৫০ বছরে এ দেশে ছোটখাটো যেসব প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কোনোটিতেই কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের সদস্যরা বোধগম্য কারণেই খুশি হননি। আর অস্বস্তিকর মনে হলেও সত্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন যে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারে জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদের সময় যেটুকু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কোনো বেসামরিক সরকারই ততটুকু করেনি (সামরিক শাসনকে সমর্থন করা হচ্ছে না)।

মানুষের মৌলিক মানবাধিকার, বাক-বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা, সুযোগ ও অধিকারের সমতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বিচার লাভের ক্ষেত্রে সবার সমঅধিকার লাভ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, ধর্ম-বর্ণ ও নৃতাত্ত্বিকতা নির্বিশেষে স্বাধীন জীবনযাপন ও আচার পালনের অধিকার, জনগণের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ, গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নয়ন ও প্রাপ্যতার ব্যবধান দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধান অত্যন্ত সংবেদনশীল।

কিন্তু গত পঞ্চাশ বছর ধরে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব যারা পালন করেছেন, তারা সে ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি যথেষ্ট সুবিচার করতে পেরেছেন কিনা, সে প্রশ্ন এসেই যায়। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, এ নিবন্ধের আলোচনা কাউকে দোষারোপ বা ছোট বড় করার জন্য নয়। বাংলাদেশের যে মহান স্থপতিরা এত কষ্ট করে অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে এত সুগঠিত ও সুবিন্যস্ত একটি সংবিধান জনগণকে উপহার দিয়েছিলেন, আমরা আমাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য দিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটাতে না পারলে জাতি হিসাবে একাত্তরের অহংকারের জায়গাটি অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় বৈকি! সংবিধানের ৫০তম বর্ষে পদার্পণের এ ক্ষণে তাই প্রস্তাব করব, বাংলাদেশের আগামী এক দশক হোক এর সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দশক।

আবু তাহের খান : পরিচালক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; সাবেক পরিচালক, বিসিক

atkhan56@gmail.com

নতুন চিন্তার আলোকে পুরোনো সংবিধান

 আবু তাহের খান 
০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের সংবিধান ৫০তম বছরে পদার্পণ করেছে। বলা হয়ে থাকে, এটি পৃথিবীর সেরা সংবিধানগুলোর অন্যতম। অন্যতম শুধু এ অর্থে নয় যে, এটি একটি আধুনিক রাষ্ট্র ও সমাজের প্রায় সব বিষয়ের প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করতে পেরেছে; বরং এ কারণেও যে, এটি মানুষের অধিকাংশ মৌলিক চাহিদা ও মানবিক অধিকারকে সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করতে এবং সমতা প্রতিষ্ঠার নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদানে সক্ষম হয়েছে।

বলা যায়, এর একটি দার্শনিক রূপকল্পও রয়েছে। ধারণা করা যায়, এর মাধ্যমে এর প্রণেতারা বাংলাদেশকে শুধু একটি আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোই দিতে চাননি, একে একটি উন্নত মানবিক সমাজের আদলেও গড়তে চেয়েছিলেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ৪৯ বছরে বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে কর্মক্ষেত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষা ও মানসিকতা গড়ে তোলা, কৃষির বহুমুখীকরণ, দারিদ্র্য নিরসন, মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যথেষ্ট সফল হলেও একটি গুণগত মানসম্পন্ন উন্নত মানবিক সমাজ বিনির্মাণে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে। আর সাংবিধানিক অঙ্গীকার রক্ষায় রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার হার এতটাই বেশি যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৯৭২-এর তুলনাতেও আমরা পিছিয়ে পড়লাম কিনা, সে প্রশ্নও উঠছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে শোষণমুক্তি, বৈষম্য নিরসন ও সমতা প্রতিষ্ঠার ওপর। এ নিয়ে তিনটি অনুচ্ছেদে (১০, ১৪ ও ১৯) সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে এবং এর বাইরেও অন্য অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। তন্মধ্যে ১০নং অনুচ্ছেদে ‘শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা’ এবং ১৪নং অনুচ্ছেদে ‘সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তিদানে’র প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৯(২) অনুচ্ছেদে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য,..সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য..রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে।’

কিন্তু একটি শোষণমুক্ত ন্যায়ানুগ সমাজ প্রতিষ্ঠা কিংবা সম্পদের সুষম বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্যের বিলোপ সাধনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ গত পঞ্চাশ বছরে আদৌ কি এগোতে পেরেছে? বরং বৈষম্যের মাত্রা এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অধিকতর প্রকট ও অমানবিক। অথচ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলমন্ত্রই ছিল শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং তারই পরিপ্রেক্ষিতে সেটিই হয়ে ওঠেছিল ১৯৭২-এর সংবিধানের মৌলচেতনা। কিন্তু সে চেতনার কতটা আজ বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ধারণ করতে পেরেছে?

সংবিধানের ১৩নং অনুচ্ছেদে ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদনব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালিগুলোর মালিক হইবে জনগণ’-এ চেতনাকে সামনে রেখে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার সীমা আইনের দ্বারা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। আর সে অনুযায়ী এ বিষয়ে ১৯৭২ ও ১৯৮৪ সালে প্রণীত আইনে জমির মালিকানার সর্বোচ্চসীমা যথাক্রমে ১০০ ও ৬০ বিঘা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু উল্লিখিত দুটি আইনেই ভূমি-মালিকানার এ ঊর্ধ্বসীমা সমবায় সমিতি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না মর্মে উল্লেখ রয়েছে। আর আইনে উল্লিখিত ওই ব্যত্যয়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের সিংহভাগ ভূমির মালিকানা ঘুরেফিরে এখন ওই বিত্তবানদের হাতেই চলে গিয়েছে-ভূলুণ্ঠিত হয়েছে সমতাপূর্ণ বণ্টনের বিষয়ে এ অনুচ্ছেদেই উল্লিখিত বিধানের প্রকৃত চেতনা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিষয়টি নিয়ে প্রায় কেউই কথা বলছেন না।

সংবিধানে ‘একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা’র (অনুচ্ছেদ-১৭) বাধ্যবাধকতা থাকলেও এ নিয়ে যতবার কথা হয়েছে, ততবারই এর বিপরীতমুখী বিস্তার আরও বেশি করে ঘটেছে। বহুল আলোচিত ও প্রশংসিত কুদরত-ই-খোদা শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত শিক্ষার বিষয়ে আরও নানা কমিশন-কমিটি গঠন করে বহু সুপারিশ ও পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়েছে।

অথচ দেশ এখন পর্যন্ত একমুখী শিক্ষার ধার কাছেও নেই। সাধারণের মধ্যে আলোচনা আছে, এর সঙ্গে সিদ্ধান্ত প্রণেতাদের স্বার্থ জড়িত নেই বিধায় (কারণ তাদের সন্তানেরা দেশে পড়াশোনা করে না) নিকট ভবিষ্যতে তা হবে বলেও মনে হয় না। অথচ মনে রাখা দরকার, বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা যতদিন বহাল থাকবে, সম্পদের বণ্টনব্যবস্থায় বৈষম্যের চর্চাও ততদিনই চলতে থাকবে।

সংবিধান অনুযায়ী ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন’ এবং ‘কর আরোপ করবার ক্ষমতাসহ বাজেট প্রস্তুতকরণ ও তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা’সহ দেশে একটি শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা থাকার কথা (অনুচ্ছেদ ৫৯ ও ৬০)। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংবিধানকে শুধু উপেক্ষাই করা হয়নি, বরং আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ মিলে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণের পরিবর্তে তার ক্ষমতাকে আরও ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার চেয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের যা করার কথা, সেসব স্থানীয় উন্নয়নমূলক কাজ করতেই অধিকতর উৎসাহী এবং করছেনও তাই। অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের কেন্দ্রীয় কাঠামোর কর্মচারীরাও কাজ করছেন ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে কোনোভাবেই তারা তাদের ক্ষমতার ভাগ স্থানীয় সরকারকে দিতে রাজি নন।

সত্যি কথা বলতে কী, গত ৫০ বছরে এ দেশে ছোটখাটো যেসব প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কোনোটিতেই কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের সদস্যরা বোধগম্য কারণেই খুশি হননি। আর অস্বস্তিকর মনে হলেও সত্যের খাতিরে বলা প্রয়োজন যে, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারে জেনারেল হোসেন মুহাম্মদ এরশাদের সময় যেটুকু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কোনো বেসামরিক সরকারই ততটুকু করেনি (সামরিক শাসনকে সমর্থন করা হচ্ছে না)।

মানুষের মৌলিক মানবাধিকার, বাক-বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতা, সুযোগ ও অধিকারের সমতা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বিচার লাভের ক্ষেত্রে সবার সমঅধিকার লাভ, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান, ধর্ম-বর্ণ ও নৃতাত্ত্বিকতা নির্বিশেষে স্বাধীন জীবনযাপন ও আচার পালনের অধিকার, জনগণের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ, গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নয়ন ও প্রাপ্যতার ব্যবধান দূরীকরণ ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধান অত্যন্ত সংবেদনশীল।

কিন্তু গত পঞ্চাশ বছর ধরে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব যারা পালন করেছেন, তারা সে ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি যথেষ্ট সুবিচার করতে পেরেছেন কিনা, সে প্রশ্ন এসেই যায়। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন, এ নিবন্ধের আলোচনা কাউকে দোষারোপ বা ছোট বড় করার জন্য নয়। বাংলাদেশের যে মহান স্থপতিরা এত কষ্ট করে অনেক স্বপ্ন ও আশা নিয়ে এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে এত সুগঠিত ও সুবিন্যস্ত একটি সংবিধান জনগণকে উপহার দিয়েছিলেন, আমরা আমাদের যোগ্যতা ও সামর্থ্য দিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ঘটাতে না পারলে জাতি হিসাবে একাত্তরের অহংকারের জায়গাটি অনেকটাই ম্লান হয়ে যায় বৈকি! সংবিধানের ৫০তম বর্ষে পদার্পণের এ ক্ষণে তাই প্রস্তাব করব, বাংলাদেশের আগামী এক দশক হোক এর সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দশক।

আবু তাহের খান : পরিচালক, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ; সাবেক পরিচালক, বিসিক

atkhan56@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন