টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনাই পারে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে
jugantor
টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনাই পারে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে

  ড. এসএম ইমামুল হক  

০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবারের মতো এবারও ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হচ্ছে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য করা হয়েছে Halt salinity, increase soil productivity, যার বাংলা রূপান্তর দাঁড়ায় ‘লবণাক্ততা রোধ করি, মৃত্তিকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করি’। বিশ্বের বহু দেশে লবণাক্ততা একটি বড় সমস্যা। নানাবিধ কারণে মৃত্তিকা লবণাক্ত হতে পারে। কারণগুলোর বেশির ভাগ প্রাকৃতিক। মানবসৃষ্ট লবণাক্ততা দেখা যায় তখন, যখন লবণসিক্ত জল দিয়ে জমি সেচ করা হয়। একমাত্র এ অবস্থায় লবণাক্ততা রোধ করা সম্ভব। তাই প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশটির ভাব হতে পারে লবণাক্ততা প্রশমন, অবনয়ন, নিয়ন্ত্রণ বা লবণাক্ত মৃত্তিকা পরিহার। এ কারণে ‘রোধ’ শব্দটি উচ্চাভিলাষী বা Utopique বলে আমার মনে হয়েছে। লবণাক্ত মৃত্তিকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কেবল লবণাক্ততা রোধ করেই সম্ভব নয়, বরং এ পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারাটাই উপযুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় যে লবণাক্ততা রয়েছে, সেটি মূলত সমুদ্রের লোনা জলের আগ্রাসনে হয়ে থাকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার পরিমাণ ২.৮৫ মিলিয়ন বা ২৮ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর এবং এর মধ্যে প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন বা ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর লবণাক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বর্তমানে এ লবণাক্ত এলাকার পরিমাণ বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, উপকূলবর্তী এলাকার ১৪ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর চাষ করা জমির মধ্যে ১১ লাখ ২০ হাজার হেক্টরই লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা মৌসুমি-শুষ্ক মৌসুমে বৃদ্ধি পায় আর বর্ষাকালে কমে আসে। নভেম্বরের শেষ থেকে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং মে-জুন মাসে তা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। মৃত্তিকায় লবণ যুক্ত হওয়ার পেছনে যেসব উপাত্ত কাজ করে তার মধ্যে রয়েছে ভূমির বন্ধুরতা, প্লাবন মাত্রা, মৃত্তিকার ধরন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, জোয়ার-ভাটার স্বরূপ, নদীর গতি-প্রকৃতি, ভূ-গর্ভস্থ জলাধারের গভীরতা ও জমাকৃত লবণ, ভূমির ঢাল এবং জল নিষ্কাশন প্রণালীর সংলগ্নতা। লবণাক্ত এলাকার প্রধান ফসল হচ্ছে স্থানীয় জাতের রোপা আমন ধান। লবণাক্ততা ও এর বিস্তার রোধ, অবনয়ন বা উপশমের জন্য অতীতে খুব একটা প্রচেষ্টা ছিল না। তবে বর্তমানে এ বিষয়ে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে উপকূলীয় এলাকার কৃষকের রক্ষার্থে লবণাক্ত জলের প্রবেশ ও সামুদ্রিক বন্যা রোধে ১৩৯টি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অ-কার্যকর স্লুইস গেট, নিয়মিত ভাঙন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবের কারণে এ বাঁধগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর নেই। নিকট অতীতের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চিংড়ি ও লবণ চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্বাভাবিক ফসল চাষ ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। লবণাক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে লবণ সহনশীল কিছু ধান ও অন্যান্য ফসল ওইসব এলাকার উপযোগী করার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

লবণাক্ত মৃত্তিকার উন্নত ব্যবহারের অন্যতম উপায় হতে পারে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা (Sustainable Land Management (SLM) গ্রহণ। এ পদ্ধতি গ্রহণে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তার প্রশমন, সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, উন্নততর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও অধিক উৎপাদনসহ লবণাক্ততার কারণে মৃত্তিকার যে অবক্ষয় হয় সেটিও কমিয়ে আনা সম্ভব। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা সরাসরিভাবে মৃত্তিকার লবণাক্ততা রোধ/অবনয়ন অথবা প্রতিহত করতে সহায়ক এবং এ কারণে বাস্তুতান্ত্রিক (Ecosystem) সুযোগ-সুবিধা সঠিক পর্যায়ে রাখতে সক্ষম। যে পদ্ধতিতে ভূমি ব্যবহারকারীরা তাদের ভূমি ও বাস্তুতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধাগুলো বজায় রেখে একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক লাভগুলো সর্বাধিক করতে পারে, সেই পদ্ধতিটিই হচ্ছে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা। অন্যভাবে বলতে গেলে, টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকে (মৃত্তিকা, জল, জীব, উদ্ভিদ) এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে প্রাপ্তব্য সুযোগ-সুবিধাদি দীর্ঘকালীন হয় এবং একই সঙ্গে পরিবেশ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি, নীতি ও কার্যক্রমকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ সম্পর্কিত আর্থ-সামাজিক বিধানগুলোকে একীভূত করতে সচেষ্ট থাকা হয়। এর ফলে যেমন ফলন বৃদ্ধি বা টেকসই রাখা যায়, তেমনি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার বিপদমাত্রাও কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। মৃত্তিকার লবণাক্ততা দমনের জন্য বালাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় এ ধরনের ভূমি ব্যবস্থা তাই আশু প্রয়োজন। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে প্রয়োজন স্থানীয় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন।

উপকূলীয় এলাকায় কৃষক টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে মৃত্তিকা ও জলাধারের লবণাক্ততা রোধ/প্রশমন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের সহায়তা প্রদান করছে। এ ব্যবস্থাপনায় উপকূলবর্তী এলাকায় উৎপাদন (খাদ্য, পশুখাদ্য, কাঠ/তন্তু, জল, শক্তি) বৃদ্ধি, ভূমি অবক্ষয় রোধ, বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা/উন্নতকরণ, আয় বা কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস রোধ, বেড়িবাঁধের ভাঙন রোধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও তার প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, লবণাক্ত পরিবেশের প্রতি সহনশীলতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় এ ভূমি ব্যবস্থাপনা গ্রহণের কারণে সম্ভব হচ্ছে। লবণ সহনশীল এবং লবণাক্ততায় খাপ খাওয়া ফসল আবাদ ছাড়াও লবণাক্রান্ত উপকূলবর্তী এলাকায় টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার সর্বোত্তম প্রথাগুলো গ্রহণ করে লবাণক্ততা প্রশমন করা ও মৃত্তিকার উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ প্রথাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মৃত্তিকা ও শস্য ব্যবস্থাপনা, মৃত্তিকা ও জল ব্যবস্থাপনা এবং বনজ কৃষিব্যবস্থার সঠিক ও যথোপযুক্ত প্রয়োগ। উপকূলবর্তী এলাকায় লবণাক্ততা রোধ/প্রশমনে বেড়িবাঁধ ব্যবস্থাপনা এবং জলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করি। মৃত্তিকার উৎপাদন বৃদ্ধি করতে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা যেমন- একই জমিতে রোপা আমন ও গলদা চিংড়ি চাষ, কাঁকড়া চাষ, কৃষি-বনজ বৃক্ষাদি চাষ নিবিড়করণ ইত্যাদি গ্রহণ করা যেতে পারে। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় দেশের লবণাক্ত মৃত্তিকায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে- এ কামনা করছি।

অধ্যাপক ড. এসএম ইমামুল হক : সভাপতি, বাংলাদেশ মৃত্তিকা বিজ্ঞান সমিতি; সাবেক উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক চেয়ারম্যান, বিসিএসআইআর

imamhuq@hotmail.com

টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনাই পারে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে

 ড. এসএম ইমামুল হক 
০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবারের মতো এবারও ৫ ডিসেম্বর বিশ্ব মৃত্তিকা দিবস পালন করা হচ্ছে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য করা হয়েছে Halt salinity, increase soil productivity, যার বাংলা রূপান্তর দাঁড়ায় ‘লবণাক্ততা রোধ করি, মৃত্তিকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করি’। বিশ্বের বহু দেশে লবণাক্ততা একটি বড় সমস্যা। নানাবিধ কারণে মৃত্তিকা লবণাক্ত হতে পারে। কারণগুলোর বেশির ভাগ প্রাকৃতিক। মানবসৃষ্ট লবণাক্ততা দেখা যায় তখন, যখন লবণসিক্ত জল দিয়ে জমি সেচ করা হয়। একমাত্র এ অবস্থায় লবণাক্ততা রোধ করা সম্ভব। তাই প্রতিপাদ্যের প্রথম অংশটির ভাব হতে পারে লবণাক্ততা প্রশমন, অবনয়ন, নিয়ন্ত্রণ বা লবণাক্ত মৃত্তিকা পরিহার। এ কারণে ‘রোধ’ শব্দটি উচ্চাভিলাষী বা Utopique বলে আমার মনে হয়েছে। লবণাক্ত মৃত্তিকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কেবল লবণাক্ততা রোধ করেই সম্ভব নয়, বরং এ পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে পারাটাই উপযুক্ত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় যে লবণাক্ততা রয়েছে, সেটি মূলত সমুদ্রের লোনা জলের আগ্রাসনে হয়ে থাকে। বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার পরিমাণ ২.৮৫ মিলিয়ন বা ২৮ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর এবং এর মধ্যে প্রায় ০.৮৩ মিলিয়ন বা ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর লবণাক্ত বলে প্রমাণিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে বর্তমানে এ লবণাক্ত এলাকার পরিমাণ বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, উপকূলবর্তী এলাকার ১৪ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর চাষ করা জমির মধ্যে ১১ লাখ ২০ হাজার হেক্টরই লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। উপকূলীয় এলাকার লবণাক্ততা মৌসুমি-শুষ্ক মৌসুমে বৃদ্ধি পায় আর বর্ষাকালে কমে আসে। নভেম্বরের শেষ থেকে লবণাক্ততার মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং মে-জুন মাসে তা চরম মাত্রায় পৌঁছায়। মৃত্তিকায় লবণ যুক্ত হওয়ার পেছনে যেসব উপাত্ত কাজ করে তার মধ্যে রয়েছে ভূমির বন্ধুরতা, প্লাবন মাত্রা, মৃত্তিকার ধরন, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, জোয়ার-ভাটার স্বরূপ, নদীর গতি-প্রকৃতি, ভূ-গর্ভস্থ জলাধারের গভীরতা ও জমাকৃত লবণ, ভূমির ঢাল এবং জল নিষ্কাশন প্রণালীর সংলগ্নতা। লবণাক্ত এলাকার প্রধান ফসল হচ্ছে স্থানীয় জাতের রোপা আমন ধান। লবণাক্ততা ও এর বিস্তার রোধ, অবনয়ন বা উপশমের জন্য অতীতে খুব একটা প্রচেষ্টা ছিল না। তবে বর্তমানে এ বিষয়ে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে উপকূলীয় এলাকার কৃষকের রক্ষার্থে লবণাক্ত জলের প্রবেশ ও সামুদ্রিক বন্যা রোধে ১৩৯টি বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অ-কার্যকর স্লুইস গেট, নিয়মিত ভাঙন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবের কারণে এ বাঁধগুলোর বেশির ভাগই কার্যকর নেই। নিকট অতীতের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, চিংড়ি ও লবণ চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে স্বাভাবিক ফসল চাষ ও কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। লবণাক্ত এলাকায় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিকল্পে লবণ সহনশীল কিছু ধান ও অন্যান্য ফসল ওইসব এলাকার উপযোগী করার প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে।

লবণাক্ত মৃত্তিকার উন্নত ব্যবহারের অন্যতম উপায় হতে পারে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা (Sustainable Land Management (SLM) গ্রহণ। এ পদ্ধতি গ্রহণে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষয়ক্ষতি হয় তার প্রশমন, সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ, উন্নততর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও অধিক উৎপাদনসহ লবণাক্ততার কারণে মৃত্তিকার যে অবক্ষয় হয় সেটিও কমিয়ে আনা সম্ভব। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা সরাসরিভাবে মৃত্তিকার লবণাক্ততা রোধ/অবনয়ন অথবা প্রতিহত করতে সহায়ক এবং এ কারণে বাস্তুতান্ত্রিক (Ecosystem) সুযোগ-সুবিধা সঠিক পর্যায়ে রাখতে সক্ষম। যে পদ্ধতিতে ভূমি ব্যবহারকারীরা তাদের ভূমি ও বাস্তুতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধাগুলো বজায় রেখে একটি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে অর্থনৈতিক ও সামাজিক লাভগুলো সর্বাধিক করতে পারে, সেই পদ্ধতিটিই হচ্ছে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা। অন্যভাবে বলতে গেলে, টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় ভূমিকে (মৃত্তিকা, জল, জীব, উদ্ভিদ) এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে প্রাপ্তব্য সুযোগ-সুবিধাদি দীর্ঘকালীন হয় এবং একই সঙ্গে পরিবেশ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি, নীতি ও কার্যক্রমকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে পরিবেশ সম্পর্কিত আর্থ-সামাজিক বিধানগুলোকে একীভূত করতে সচেষ্ট থাকা হয়। এর ফলে যেমন ফলন বৃদ্ধি বা টেকসই রাখা যায়, তেমনি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার বিপদমাত্রাও কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। মৃত্তিকার লবণাক্ততা দমনের জন্য বালাদেশের উপকূলবর্তী এলাকায় এ ধরনের ভূমি ব্যবস্থা তাই আশু প্রয়োজন। টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে প্রয়োজন স্থানীয় পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক অবস্থার সঠিক মূল্যায়ন।

উপকূলীয় এলাকায় কৃষক টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করে মৃত্তিকা ও জলাধারের লবণাক্ততা রোধ/প্রশমন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো তাদের সহায়তা প্রদান করছে। এ ব্যবস্থাপনায় উপকূলবর্তী এলাকায় উৎপাদন (খাদ্য, পশুখাদ্য, কাঠ/তন্তু, জল, শক্তি) বৃদ্ধি, ভূমি অবক্ষয় রোধ, বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা/উন্নতকরণ, আয় বা কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস রোধ, বেড়িবাঁধের ভাঙন রোধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও তার প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, লবণাক্ত পরিবেশের প্রতি সহনশীলতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয় এ ভূমি ব্যবস্থাপনা গ্রহণের কারণে সম্ভব হচ্ছে। লবণ সহনশীল এবং লবণাক্ততায় খাপ খাওয়া ফসল আবাদ ছাড়াও লবণাক্রান্ত উপকূলবর্তী এলাকায় টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার সর্বোত্তম প্রথাগুলো গ্রহণ করে লবাণক্ততা প্রশমন করা ও মৃত্তিকার উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ প্রথাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মৃত্তিকা ও শস্য ব্যবস্থাপনা, মৃত্তিকা ও জল ব্যবস্থাপনা এবং বনজ কৃষিব্যবস্থার সঠিক ও যথোপযুক্ত প্রয়োগ। উপকূলবর্তী এলাকায় লবণাক্ততা রোধ/প্রশমনে বেড়িবাঁধ ব্যবস্থাপনা এবং জলের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে তা বিবেচনায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করি। মৃত্তিকার উৎপাদন বৃদ্ধি করতে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা যেমন- একই জমিতে রোপা আমন ও গলদা চিংড়ি চাষ, কাঁকড়া চাষ, কৃষি-বনজ বৃক্ষাদি চাষ নিবিড়করণ ইত্যাদি গ্রহণ করা যেতে পারে। সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় দেশের লবণাক্ত মৃত্তিকায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে- এ কামনা করছি।

অধ্যাপক ড. এসএম ইমামুল হক : সভাপতি, বাংলাদেশ মৃত্তিকা বিজ্ঞান সমিতি; সাবেক উপাচার্য, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক চেয়ারম্যান, বিসিএসআইআর

imamhuq@hotmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন