দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা উচিত
jugantor
দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা উচিত

  ড. মুহম্মদ মনিরুল হক  

০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসত্তার অস্তিত্বগত দিক থেকে বাঙালি জাতি, জাতীয়তার চেতনা, জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অনেক পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই বহুজাতিক-বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর বাসস্থান এ ভারতীয় উপমহাদেশ। ড. নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, ‘‘বাংলাদেশের যে ‘জন’ ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে, তার প্রায় সবটাই আদি-অস্ট্রেলীয় ও আলপাইন জন-এর লোকদের কীর্তি।’’ প্রাচীন যুগে বর্তমান বাংলাদেশের অনুরূপ ভূখণ্ড-বসতির অস্তিত্ব ছিল না। বৃহত্তর বঙ্গীয় অঞ্চল (বর্তমান গোটা বাংলাভাষী অঞ্চল) একসময় বঙ্গ, পুণ্ড্র, সমতট, বঙ্গাল, রাঢ় নামীয় একাধিক স্বতন্ত্র কৌম জনপদে বিভক্ত ছিল। পরবর্তীকালে এসব কৌম জনপদে স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপ গড়ে ওঠে। প্রাচীন গ্রন্থ বা রচনায়, সাহিত্যে বা গাথায় রাঢ়, বঙ্গাল, সমতট জনপদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে এবং প্লিনি, টলেমি প্রমুখ ভিনদেশি পর্যটকের রচনায় খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে স্বাধীন বঙ্গাঞ্চলীয় রাষ্ট্র গঙ্গাহৃদির (গঙ্গারিড্ডি) বিবরণ পাওয়া যায়।

ষষ্ঠ শতকে স্বাধীন রাজ্য হিসাবে বঙ্গ পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রায় চারশ বছরের পালবংশীয় শাসনামলকে অনেকে প্রথম স্বাধীন বাংলা বা বাঙালি রাষ্ট্রের সুসংহত সূচনা বলে মনে করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৪১৪) বাঙ্গালা রাষ্ট্রে নিজেকে ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালা’রূপে পরিচিত করে দিয়ে যে ধারার সৃষ্টি করেছিলেন, বলা যায়, পরবর্তী সুলতানি আমলগুলো সেই ধারাকে পরিপুষ্ট করেছে। পর্যায়ক্রমে পাঠান, মুঘল ও বিদেশি ইংরেজ শক্তি বাংলাকে শাসন করেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি প্রদেশ গঠিত হয়েছিল এবং ঢাকা ছিল এর রাজধানী। উনিশ শতকের সাহিত্যে অবিভক্ত বাংলাকে ‘বঙ্গদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ’ বলার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে ‘বঙ্গদেশ’ শব্দের উল্লেখ আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘নম নম নম বাংলাদেশ মম’-এর মতো দেশাত্মবোধক গানগুলোতে সাধারণ পরিভাষা হিসাবে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি পাওয়া যায়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ও বঙ্গপ্রদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে ‘পূর্ব বাংলা’ পাকিস্তানের অধীন হয়। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা পূর্ব বাংলার নাম থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান করতে চাইলে বাঙালির শত-সহস্র বছরের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি তুলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদী হন। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘‘Sir, you will see that they want to place the word ‘East Pakistan’ instead of ‘East Bengal.’ We have demanded so many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word ‘Bengal’ has a history, has a tradition of its own...” (ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটির একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য...।)

সেই থেকে বাঙালির রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনে ‘পূর্ব বাংলা’ নামটি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তুঙ্গ গতি পায়। ১৯৬০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভ করেন এবং সামরিক ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য বিশিষ্ট ছাত্র নেতৃবৃন্দ দ্বারা একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বজ্রকঠোর সংকল্প, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব দ্বারা এ দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য অর্জন করে একসময় হয়ে ওঠেন বাংলার বন্ধু, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেরণাদাতা, মুক্তিযুদ্ধের অনন্য প্রতীক। তিনিই ঠিক করেন এ দেশটির নাম। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন এ দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’। সে সভায় তিনি বলেন, ‘‘একসময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ... একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। ... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”

বঙ্গবন্ধুকে যেমন দাবিয়ে রাখা যায়নি, তেমনি বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ‘বাংলাদেশ’ নামকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মূলেও ছিল বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, তাতেও ‘বাংলাদেশ’ নামটি পুনরুক্ত হয়েছে বারবার। মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকার প্রচারিত ঘোষণাপত্রেও বলা হয়েছে- এ দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে দেশটির নামকরণ হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’।

সমাজ, রাষ্ট্র-জাতির ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও গৌরবময় ইতিহাস দেশপ্রেমের প্রেরণা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি এ দেশটির নাম দিয়েছেন বাংলাদেশ। ৫ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হলে এবং নামকরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার স্বীকৃতি প্রদান করা হলে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমের প্রেরণায় আরও বেশি শানিত হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অধিক মহিমান্বিত হবেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংহতি, উন্নয়ন ও দেশাত্মবোধের জন্যও এটি হতে পারে একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তাই, গৌরবের মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ৫ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস এবং বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ’ নামের ঐতিহাসিক ঘোষণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের প্রস্তাব জানাই।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

[email protected]

দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা উচিত

 ড. মুহম্মদ মনিরুল হক 
০৫ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসত্তার অস্তিত্বগত দিক থেকে বাঙালি জাতি, জাতীয়তার চেতনা, জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অনেক পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকেই বহুজাতিক-বহুভাষিক জনগোষ্ঠীর বাসস্থান এ ভারতীয় উপমহাদেশ। ড. নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, ‘‘বাংলাদেশের যে ‘জন’ ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে, তার প্রায় সবটাই আদি-অস্ট্রেলীয় ও আলপাইন জন-এর লোকদের কীর্তি।’’ প্রাচীন যুগে বর্তমান বাংলাদেশের অনুরূপ ভূখণ্ড-বসতির অস্তিত্ব ছিল না। বৃহত্তর বঙ্গীয় অঞ্চল (বর্তমান গোটা বাংলাভাষী অঞ্চল) একসময় বঙ্গ, পুণ্ড্র, সমতট, বঙ্গাল, রাঢ় নামীয় একাধিক স্বতন্ত্র কৌম জনপদে বিভক্ত ছিল। পরবর্তীকালে এসব কৌম জনপদে স্বতন্ত্র রাষ্ট্ররূপ গড়ে ওঠে। প্রাচীন গ্রন্থ বা রচনায়, সাহিত্যে বা গাথায় রাঢ়, বঙ্গাল, সমতট জনপদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। মেগাস্থিনিসের ‘ইন্ডিকা’ গ্রন্থে এবং প্লিনি, টলেমি প্রমুখ ভিনদেশি পর্যটকের রচনায় খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে স্বাধীন বঙ্গাঞ্চলীয় রাষ্ট্র গঙ্গাহৃদির (গঙ্গারিড্ডি) বিবরণ পাওয়া যায়।

ষষ্ঠ শতকে স্বাধীন রাজ্য হিসাবে বঙ্গ পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রায় চারশ বছরের পালবংশীয় শাসনামলকে অনেকে প্রথম স্বাধীন বাংলা বা বাঙালি রাষ্ট্রের সুসংহত সূচনা বলে মনে করেন। শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২-১৪১৪) বাঙ্গালা রাষ্ট্রে নিজেকে ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালা’রূপে পরিচিত করে দিয়ে যে ধারার সৃষ্টি করেছিলেন, বলা যায়, পরবর্তী সুলতানি আমলগুলো সেই ধারাকে পরিপুষ্ট করেছে। পর্যায়ক্রমে পাঠান, মুঘল ও বিদেশি ইংরেজ শক্তি বাংলাকে শাসন করেছে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ব বাংলা ও আসাম নিয়ে একটি প্রদেশ গঠিত হয়েছিল এবং ঢাকা ছিল এর রাজধানী। উনিশ শতকের সাহিত্যে অবিভক্ত বাংলাকে ‘বঙ্গদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ’ বলার দৃষ্টান্ত রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখনীতে ‘বঙ্গদেশ’ শব্দের উল্লেখ আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ এবং কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘নম নম নম বাংলাদেশ মম’-এর মতো দেশাত্মবোধক গানগুলোতে সাধারণ পরিভাষা হিসাবে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি পাওয়া যায়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ও বঙ্গপ্রদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে ‘পূর্ব বাংলা’ পাকিস্তানের অধীন হয়। হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধ্বংস করতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তারা পূর্ব বাংলার নাম থেকে ‘বাংলা’ শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান করতে চাইলে বাঙালির শত-সহস্র বছরের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি তুলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিবাদী হন। ১৯৫৫ সালের ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘‘Sir, you will see that they want to place the word ‘East Pakistan’ instead of ‘East Bengal.’ We have demanded so many times that you should use Bengal instead of Pakistan. The word ‘Bengal’ has a history, has a tradition of its own...” (ওরা পূর্ব বাংলা নামের পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম রাখতে চায়। আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, আপনারা এটাকে বাংলা নামে ডাকেন। ‘বাংলা’ শব্দটির একটা নিজস্ব ইতিহাস আছে, আছে এর একটা ঐতিহ্য...।)

সেই থেকে বাঙালির রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনে ‘পূর্ব বাংলা’ নামটি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উত্তুঙ্গ গতি পায়। ১৯৬০ সালের ৭ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট আবেদন করে বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভ করেন এবং সামরিক ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। এ সময়ই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য বিশিষ্ট ছাত্র নেতৃবৃন্দ দ্বারা একটি গোপন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সংগঠনটির নাম দেওয়া হয় ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বজ্রকঠোর সংকল্প, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্ব দ্বারা এ দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনুগত্য অর্জন করে একসময় হয়ে ওঠেন বাংলার বন্ধু, বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রেরণাদাতা, মুক্তিযুদ্ধের অনন্য প্রতীক। তিনিই ঠিক করেন এ দেশটির নাম। ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন এ দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’। সে সভায় তিনি বলেন, ‘‘একসময় এ দেশের বুক হইতে, মানচিত্রের পৃষ্ঠা হইতে ‘বাংলা’ কথাটির সর্বশেষ চিহ্নটুকু চিরতরে মুছিয়া ফেলার চেষ্টা করা হইয়াছে। ... একমাত্র ‘বঙ্গোপসাগর’ ছাড়া আর কোনো কিছুর নামের সঙ্গে ‘বাংলা’ কথাটির অস্তিত্ব খুঁজিয়া পাওয়া যায় নাই। ... জনগণের পক্ষ হইতে আমি ঘোষণা করিতেছি আজ হইতে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে শুধুমাত্র ‘বাংলাদেশ’।”

বঙ্গবন্ধুকে যেমন দাবিয়ে রাখা যায়নি, তেমনি বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ‘বাংলাদেশ’ নামকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দাবিয়ে রাখা যায়নি। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের মূলেও ছিল বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন, তাতেও ‘বাংলাদেশ’ নামটি পুনরুক্ত হয়েছে বারবার। মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকার প্রচারিত ঘোষণাপত্রেও বলা হয়েছে- এ দেশটির নাম ‘বাংলাদেশ’। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২-এর ৪ নভেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে দেশটির নামকরণ হয়েছে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’।

সমাজ, রাষ্ট্র-জাতির ঐতিহ্য, সংগ্রাম ও গৌরবময় ইতিহাস দেশপ্রেমের প্রেরণা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন, তেমনি এ দেশটির নাম দিয়েছেন বাংলাদেশ। ৫ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হলে এবং নামকরণের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার স্বীকৃতি প্রদান করা হলে নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমের প্রেরণায় আরও বেশি শানিত হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও অধিক মহিমান্বিত হবেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংহতি, উন্নয়ন ও দেশাত্মবোধের জন্যও এটি হতে পারে একটি ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। তাই, গৌরবের মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ৫ ডিসেম্বর ‘বাংলাদেশ’ নামকরণ দিবস এবং বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাংলাদেশ’ নামের ঐতিহাসিক ঘোষণাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের প্রস্তাব জানাই।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

[email protected]

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন