জলবায়ু সম্মেলন : বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও সাফল্য
jugantor
জলবায়ু সম্মেলন : বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও সাফল্য

  ড. একে আবদুল মোমেন  

০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দীর্ঘ এক বছর বিলম্বের পর নভেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের ২৬তম আসর-‘কপ২৬’। এবারের সম্মেলন বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ব্যাপকতা, আধুনিক পৃথিবীর জীবনব্যবস্থায় বিদ্যমান বিভেদ ও ত্রুটিগুলো আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অস্তিত্বের সংকট থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর উদ্যোগে এবারের কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলন ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে।

জলবায়ুর ক্রমাগত ও দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সময়ের সঙ্গে চরম ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করছে। বিশ্বের সব মহাদেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, ফসল ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি, জানমালের নিরাপত্তাসহ বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকির সম্মুখীন। এ ছাড়া জলবায়ু অভিবাসী বা পরিবেশ শরণার্থীদের বিষয়টি সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১ নভেম্বর সকালে সম্মেলনের প্রথম দিন পৃথিবীর সপ্তম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে আমরা যখন গ্লাসগোর ক্লাইড নদীর তীরবর্তী স্কটিশ ইভেন্ট সেন্টারে সম্মেলন স্থলে পৌঁছাই, তখন আমাদের প্রত্যাশার পারদ ছিল বেশ উঁচুতে। ঠিক ১২ দিন পর সম্মেলনের শেষদিন, অর্থাৎ ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সের প্যারিস থেকে গ্লাসগোতে অবস্থানকারী আমার সহকর্মীদের কাছে বারবার outcome document-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে তখন তাদের কণ্ঠে আশা, উদ্দীপনা, উৎসাহের সঙ্গে কিছুটা হতাশার রেশও লক্ষ করি।

এবারের কপ-২৬ সম্মেলনে বাংলাদেশের আলোচনায় চারটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথমত, জি-২০ ও অন্যান্য প্রধান পরিবেশ দূষণকারী দেশগুলো প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী উচ্চাভিলাষী স্বপ্রণোদিত জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা (Nationally Determined Contribution-NDC) নির্ধারণ করবে যাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম না করে। দ্বিতীয়ত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মূল শীর্ষ সম্মেলনসহ বিভিন্ন সাইডলাইন ইভেন্টে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী উন্নত দেশগুলো কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন (Adaptation) ও প্রশমনের (Mitigation) জন্য ৫০:৫০ অনুপাতে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বারংবার তাগিদ দিয়েছেন। তাদের অবশ্যই ওয়াদাকৃত বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এর মধ্য থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহার করা হবে এডাপটেশনে এবং বাকি ৫০ শতাংশ ব্যবহার করা হবে মিটিগেশনে। তৃতীয় ইস্যু হলো, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে সিভিএফ কান্ট্রিগুলোর মোট দূষণে অবদান পাঁচ শতাংশেরও নিচে, তারপরও আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী। তেলনির্ভর যোগাযোগ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের দিকে যেতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু আমাদের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে এখানে ব্যাপক পরিসরে সোলার এনার্জির ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোলার এনার্জি ব্যবহাকারী দেশ হলো বাংলাদেশ। এখানে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন পরিবার সোলার এনার্জি ব্যবহার করছে। কিন্তু আমরা যদি তেলচালিত গাড়ি, যানবাহন ইত্যাদিকে ইলেকট্রিক গাড়ি ইলেকট্রিক লোকোমোটিভে কনভার্ট করতে চাই, তাহলে আমাদের উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়বে; যা করার জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। এ কারণেই আমরা বিশ্ব প্রতিনিধিদের কাছে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমনের নিমিত্তে যেসব উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন হচ্ছে, সেগুলো যেন বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ব্যবহার করতে পারে, তা নিশ্চিত করার কথা বলেছি। চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, খরা ও বন্যার কারণে সৃষ্ট জলবায়ু অভিবাসীদের পুনর্বাসনে বৈশ্বিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছি এবং এ সমস্যা প্রতিকারের রূপরেখা নিরূপণের ওপর জোর দিয়েছি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, লস অ্যান্ড ড্যামেজ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলোও আমাদের আলোচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে।

প্রতিবছর বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জলবায়ুর পরিবর্তন, নদীভাঙন, পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির ফলে বহু মানুষ নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে একেবারে বাস্তুহীন হয়ে পড়ে। জীবন ও জীবিকার সন্ধানে তারা শহরে ছুটে আসে। তাদের ঠাঁই হয় শহরের বস্তিগুলোতে। এসব মানুষের পুনর্বাসন দরকার। সরকার তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। বিভিন্ন তথ্যমতে, জলবায়ুগত বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের ৬৫ লাখ মানুষ বাস্তুহারা। নতুন নতুন রোগ, এমনকি কেউ কেউ বলে থাকেন চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গি ও কোভিডের মতো রোগের বিস্তারেও জলবায়ু পরিবর্তন ভূমিকা রাখছে। যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, যেভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে- যদি একই ধারা চলতে থাকে, তাহলে শিগ্গির ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে বাস্তুহারা হয়ে পড়বে। আমরা চাই আমাদের উন্নয়ন অংশীদাররা, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো এসব মানুষের পাশে এসে দাঁড়াক। কারণ তারাই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত দায়ী। তারাই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে দূষণ-নির্গমন করছে। এসব বাস্তহারা মানুষের পুনর্বাসনের দায়িত্ব তাদের কাঁধেও বর্তায়। আমাদের পাশাপাশি তাদেরও পুনর্বাসনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত। এসব দাবি আমরা সম্মেলনে তুলে ধরেছি।

কপ-২৬ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভূমিকার পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ৫৫ দেশের সংগঠন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি হিসাবেও অংশগ্রহণ করেন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে এসব দেশের দায় শতকরা মাত্র পাঁচ ভাগ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে এরাই সবচেয়ে বিপর্যস্ত। সিভিএফের সভাপতি হিসাবে জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংরক্ষণের পাশাপাশি সব ঝুঁকিপূর্ণ দেশের স্বার্থসংরক্ষণের দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঝুঁকিপূর্ণ এসব দেশে অভিযোজন ও প্রশমন সম্পর্কিত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদানের জন্য ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে একটি ‘মোরাল ভয়েসে’ পরিণত হয়েছেন। তিনি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। এবারের সম্মেলনে তার নেতৃত্ব ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে তার বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ তাকে স্থাপন করেছে এক অনন্য আস্থার জায়গায়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিভিন্ন এডাপটেশন প্রোগ্রাম চালু করেছে। রিজিয়নাল সেন্টার অব গ্লোবাল এডাপটেশনের অধীনে বিভিন্ন হোম বেইজড প্রোগ্রাম এরই মধ্যে চালু হয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত কার্যকর। ১৯৭০ সালে দেশে খুব বড় একটা সাইক্লোন হয়েছিল। এ সাইক্লোনে ৫ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ধরনের এডাপটেশন প্রোগ্রাম সফলভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার ফলে বর্তমানে সেই অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। ১৪ হাজার সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে ৮২ হাজার স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে গত কয়েক বছরে বড় বড় সাইক্লোন হয়েছে, কিন্তু প্রাণহানির সংখ্যা নগণ্য। যদিও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক। তারপরও মানুষের প্রাণরক্ষা ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাস তথা জলবায়ুগত ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা বিশ্বের অন্যতম সক্ষম দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছি। আমাদের এ হোম বেইজড এডাপটেশন প্রোগ্রামগুলো আমরা এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে দিতে চাই। এজন্য আমাদের অর্থ সহায়তা দরকার। আমরা এ ধরনের বৃহৎ কাজের জন্য বৈশ্বিক সহায়তা চাই। এ দাবি আমরা তুলে ধরেছি এবারের সম্মেলনে।

আমরা লক্ষ করেছি, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তন প্রকল্পগুলোর জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড তৈরি করেছে; কিন্তু এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক এখনো এমন কোনো ফান্ড তৈরি করতে এগিয়ে আসেনি। তবে আইএমএফ ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি এসডিআর ফান্ড তৈরি করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি একটি দারুণ উদ্যোগ। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কপ-২৬-এ এই বিষয়গুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে।

আমরা দুটি বড় ডিক্লারেশন করেছি সেখানে। একটি হলো, ‘সিভিএফ অ্যান্ড কমনওয়েলথ জয়েন্ট অ্যাকশন প্রোগ্রাম’। আমাদের এ প্রস্তাবটিও গৃহীত হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, ‘কপ গ্লাসগো ডিক্লারেশন বা গ্লাসগো-ঢাকা ডিক্লারেশন অব কপ-২৬ সিভিএফ সামিট’। এ সামিটে বাংলাদেশের লিডারশিপে মুগ্ধ হয়ে সাতটি দেশ আমাদের সঙ্গে জয়েন করেছে। আরও কিছু দেশ জয়েন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সিভিএফের বর্তমান সদস্য ৫৫টি দেশ, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী যার অন্তর্ভুক্ত। সিভিএফ ফোরামের সামনে আমাদের বিভিন্ন ক্লাইমেট অ্যাকশন তুলে ধরার পাশাপাশি মুজিববর্ষের উদ্যোগ ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ (এমসিপিপি) উপস্থাপন করা হয়েছে। এ উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে জলবায়ু পরিবর্তনগত সমস্যা অনেকাংশেই মোকাবিলা সম্ভবপর হবে। সিভিএফভুক্ত ৩৯টি দেশ আমাদের এ প্ল্যানের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমসিপিপির বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে তারাও ভূমিকা পালন করবে।

আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশ তথা সিভিএফের সঙ্গে মিলে একটি প্রস্তাব দিয়েছি, যার মূল কথা হলো-জলবায়ু ইস্যু মূলত একটি মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ইস্যু। এতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে, যা নিঃসন্দেহে একটি মানবাধিকার ইস্যু। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য জাতিসংঘে একজন স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব করেছি, জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক যা গৃহীত হয়েছে। ফলে এমন একজন দায়িত্বশীল মানুষকে পাওয়া যাবে, যে সবসময় জলবায়ু পরির্বতনের ফলে ক্ষতির মধ্যে পড়া মানুষের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। আমাদের এ প্রস্তাবের স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট অর্জন। বাংলাদেশের সিভিএফ লিডারশিপের একটি উদাহরণ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিযোজনের বিভিন্ন উদ্ভাবনী নীতি ও কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে রোল মডেল। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে আমরাই প্রথম ২০০৯ সালে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫ কোটি ডলারের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করেছি। সম্প্রতি আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা-দশক ২০৩০’-প্রণয়ন করেছি। এ পরিকল্পনায় বাংলাদেশের জন্য জলবায়ুকে ঝুঁকির কারণ নয়, বরং সহনশীলতা ও সমৃদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করার নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা গৃহীত হয়েছে। আমরা আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি মেনে নিয়েও সম্প্রতি ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের বিদেশি বিনিয়োগের ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম বাতিল করেছি। এর বদলে আমরা সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুচালিত বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া আমরা আমাদের ʻNational Adaptation Planʼ প্রণয়নের কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছি। আমাদের সরকার প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি পরিচালিত যানবাহনের পরিবর্তে ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড যানবাহনকে উৎসাহিত করছে। উপকূলবর্তী অঞ্চলে আমরা ৪,২৯১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করেছি। এ ছাড়া বন্যাকবলিত অঞ্চলে অতিরিক্ত আরও ৫২৩টি বন্যা কেন্দ্র ও ৫৫০টি মুজিব কেল্লা স্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের অংশ হিসাবে সারা দেশে তিন কোটি গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির শর্ত মোতাবেক কিছুদিন আগেই আমরা হালনাগাদ ও উচ্চাভিলাষী ঘউঈ প্রণয়ন করেছি। আমরা আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘স্বল্প কার্বন নীতি’ যুক্ত করা এবং আমাদের অর্থনীতিকে স্বল্প কার্বন অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (এমওডিএমআর) ২০১৬-২০ সময়কালের জন্য সেন্ডেই দুর্যোগ ঝুঁকিপ্রশমন কৌশল (২০১৫-২০৩০) গ্রহণ ও দৃঢ়ভাবে অনুমোদিত অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে একটা দুর্যোগ ঝুঁকি উপশমন কৌশল গ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার গৃহীত কর্মসূচির একটি হলো, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসপি)’। এর আওতায় রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রধান জাতীয় পরিকল্পনা, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। বিসিসিএসপি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি সার্বিক নির্মাণ কাঠামো প্রস্তুত করে এবং উন্নয়ন অর্জনে সরকারি প্রতিশ্রুত পথ সম্পর্কে ধারণা দেয়। বিসিসিএসপি হলো এমন একটি কৌশল, যা পরিকল্পনা ও বিনিয়োগকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লক্ষ্য একই রেখায় আনার একটা সূত্র হিসাবে কাজ করে। এর মধ্যে মোট ৪৪টি কর্মসূচি এবং ১৪৫টি পদক্ষেপ ছয়টি বিষয়বস্তুগত জায়গায় স্থান দেওয়া হয়েছে। বিষয়বস্তুগত দিকগুলো হলো- ১. খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য; ২. বিস্তৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; ৩. অবকাঠামো; ৪. গবেষণা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা; ৫. উপশমন ও কার্বনের নিু নিঃসরণ এবং ৬. সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিবৃদ্ধি।

নরওয়ে সরকারের সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশে ২০১৫ সালে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (এনএপি) একটা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। এনএপি প্রক্রিয়া সম্পন্নকল্পে যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি, একটি কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিসহ এনএপি সূত্রবদ্ধকরণের নিমিত্তে একটি প্রধান দল গঠন করা। জলবায়ুর পরিবর্তন ও এর ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বেশকিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। যথা- (ক) খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা (পানিসহ); (খ) বিস্তৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; (গ) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা; (ঘ) বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন রক্ষা; (ঙ) জলবায়ু অভিঘাত-সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণ; (চ) গ্রাম বিদ্যুতায়ন বৃদ্ধি; (ছ) নগর অভিঘাত-সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ; (জ) ইকোসিসটেমভিত্তিক অভিযোজন (বনায়নসহ) (ঝ) কমিউনিটি বা জনপদভিত্তিক আদ্রভূমি ও উপকূলীয় জায়গা সংরক্ষণ; এবং (ঞ) নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের এতসব পদক্ষেপের পরও ভৌগোলিক, জনতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাতারাতি শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভবপর নয়। অধিকন্তু, প্রধান কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো এগিয়ে না এলে আমাদের কর্মযজ্ঞ মহাসমুদ্র থেকে একফোঁটা পানি তুলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমিয়ে আনার মতো ব্যর্থ প্রচেষ্টার শামিল হবে। তাই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার প্রয়াসে আমাদের কূটনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশের সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে এ বছরই সিভিএফের সদস্য সংখ্যা ৪৮ থেকে বেড়ে ৫৫তে উন্নীত হয়েছে।

এবারের জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৬) থেকে বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য। এবারের সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবং জি-৭৭ ও চীন গ্রুপ দুটির সদস্য হিসাবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে জোর প্রচেষ্টা চালায়। এ ছাড়া জলবায়ু তহবিল সরবরাহকালে যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়েও বাংলাদেশ গুরুত্বারোপ করে। ‘কপ-২৬’-এ ‘The glasgow Climate Pact’ নামক যে outcome document গৃহীত হয়, তাতে উন্নত দেশগুলো কর্তৃক প্রতিশ্রুত বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করে এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সবাই একমত হন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহযোগিতা করবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

‘The glasgwo Climate Pact’ অনুসারে, ২০২২ সালে মিসরে অনুষ্ঠেয় ‘কপ-২৭’ সম্মেলনে সব দেশ এমন লক্ষ্যমাত্রা উপস্থাপন করবে, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি রাখা যায়। গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরবের মতো দেশ ২০২২-এর মধ্যে আরও উচ্চাভিলাষী NDC প্রণয়ন করবে বলে আশা করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলো ইতোমধ্যে যে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণের জন্য loss and damage ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকার করে বৈশ্বিক সংলাপের একটি রূপরেখা প্রণয়নে এবারের কপ সম্মেলনে ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে, যদিও এক্ষেত্রে কোনো জোরালো কাঠামো প্রণয়ন সম্ভব হয়নি।

‘The glasgwo Climate Pact’ জাতিসংঘের প্রথম সর্বসম্মত দলিল, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি উল্লেখ করা সম্ভব হয়েছে। ‘কপ-২৬’ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১৪১টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের অরণ্য নিধন (Deforestation) রোধে অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া আলোচনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু সংক্রান্ত সব ধরনের বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় লিঙ্গ সমতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা outcome document-এ গুরুত্ব সহকারে প্রতিফলিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২ নভেম্বর ‘কপ-২৬’-এর সাইডলাইনে ‘নারী ও জলবায়ু পরিবর্তন’ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় বক্তা হিসাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নারীদের ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক বলে উল্লেখ করেন। তার সরকার ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উপরন্তু সরকার জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটও চালু করেছে, যেখানে সব নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সম্মেলনের সাইডলাইনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৫৫টি সিভিএফভুক্ত দেশের রাষ্ট্র/সরকারপ্রধানরা ও তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘CVF COP-26 Leaders Dialogue’ অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি, কপ-২৬-এর সভাপতি অলোক শর্মা, সিভিএফের থিমেটিক অ্যাম্বাসেডর মোহামেদ নাশিদ (মালদ্বীপের বর্তমান স্পিকার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি) এবং থিমেটিক অ্যাম্বাসেডর সায়মা ওয়াজেদসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করেন। উচ্চপর্যায়ের এ ডায়ালগে বাংলাদেশের নেতৃত্বে ৫৫টি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান কর্তৃক ‘Dhaka-Glasgwo Declaration’ গৃহীত হয়, যা জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার বহিঃপ্রকাশ। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম বিবিসি সম্প্রতি তাদের এক প্রতিবেদনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কপ-২৬ সম্মেলনের পাঁচজন শীর্ষ ফবধষ সধশবৎ-এর একজন হিসাবে চিহ্নিত করে। এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও সার্বজনীন বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থার প্রতিফলন। কপ-২৬-এর সাইডলাইনে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের স্থানীয় অভিযোজন মডেলগুলোর (locally led adaptation models) বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যায়, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং একইসঙ্গে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অধিকতর অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ সুগম করবে।

জাতিসংঘের বর্তমান প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২১০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে আনুমানিক ১১ বিলিয়ন। জলবায়ু পরিবর্তনে পর্যুদস্ত পৃথিবী কি এ জনসংখ্যার ভার বহন করতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিশ্বের ধনী ও প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে এক কাতারে এনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা কি সম্ভব হবে? পৃথিবীর মহান চিন্তাবিদরা বিভিন্ন সময় বিষণ্ন ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো ভবিষ্যৎ চিত্র অঙ্কন করলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের ফলে আমরা প্রকৃতির ধারণক্ষমতার সীমা কখনো অতিক্রম করিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা এবং পৃথিবীর মানুষকে প্রতিনিয়ত এ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। পৃথিবীকে বাঁচাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের একযোগে কাজ করে যেতে হবে। আশাহত হওয়া চলবে না। আমার বিশ্বাস, পৃথিবীর এ ক্রান্তিলগ্নে সমগ্র মানবসমাজ এক হয়ে তার সব শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে বাঁচাবে। মানুষের সেই উদ্যোগে এবারের কপ-২৬ সম্মেলন ক্ষুদ্র একটি মাইলফলক হয়ে থাকলেও আমাদের সবার প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

ড. একে আবদুল মোমেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

জলবায়ু সম্মেলন : বাংলাদেশের প্রত্যাশা ও সাফল্য

 ড. একে আবদুল মোমেন 
০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে দীর্ঘ এক বছর বিলম্বের পর নভেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনের ২৬তম আসর-‘কপ২৬’। এবারের সম্মেলন বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ব্যাপকতা, আধুনিক পৃথিবীর জীবনব্যবস্থায় বিদ্যমান বিভেদ ও ত্রুটিগুলো আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অস্তিত্বের সংকট থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর উদ্যোগে এবারের কপ২৬ জলবায়ু সম্মেলন ব্যাপক গুরুত্ব বহন করে।

জলবায়ুর ক্রমাগত ও দ্রুত পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ সময়ের সঙ্গে চরম ও ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করছে। বিশ্বের সব মহাদেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, ফসল ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি, জানমালের নিরাপত্তাসহ বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকির সম্মুখীন। এ ছাড়া জলবায়ু অভিবাসী বা পরিবেশ শরণার্থীদের বিষয়টি সবাইকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১ নভেম্বর সকালে সম্মেলনের প্রথম দিন পৃথিবীর সপ্তম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসাবে আমরা যখন গ্লাসগোর ক্লাইড নদীর তীরবর্তী স্কটিশ ইভেন্ট সেন্টারে সম্মেলন স্থলে পৌঁছাই, তখন আমাদের প্রত্যাশার পারদ ছিল বেশ উঁচুতে। ঠিক ১২ দিন পর সম্মেলনের শেষদিন, অর্থাৎ ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সের প্যারিস থেকে গ্লাসগোতে অবস্থানকারী আমার সহকর্মীদের কাছে বারবার outcome document-এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে তখন তাদের কণ্ঠে আশা, উদ্দীপনা, উৎসাহের সঙ্গে কিছুটা হতাশার রেশও লক্ষ করি।

এবারের কপ-২৬ সম্মেলনে বাংলাদেশের আলোচনায় চারটি বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে। প্রথমত, জি-২০ ও অন্যান্য প্রধান পরিবেশ দূষণকারী দেশগুলো প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী উচ্চাভিলাষী স্বপ্রণোদিত জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা (Nationally Determined Contribution-NDC) নির্ধারণ করবে যাতে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম না করে। দ্বিতীয়ত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মূল শীর্ষ সম্মেলনসহ বিভিন্ন সাইডলাইন ইভেন্টে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী উন্নত দেশগুলো কর্তৃক উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন (Adaptation) ও প্রশমনের (Mitigation) জন্য ৫০:৫০ অনুপাতে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে বারংবার তাগিদ দিয়েছেন। তাদের অবশ্যই ওয়াদাকৃত বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার দিতে হবে। এর মধ্য থেকে ৫০ শতাংশ ব্যবহার করা হবে এডাপটেশনে এবং বাকি ৫০ শতাংশ ব্যবহার করা হবে মিটিগেশনে। তৃতীয় ইস্যু হলো, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে সিভিএফ কান্ট্রিগুলোর মোট দূষণে অবদান পাঁচ শতাংশেরও নিচে, তারপরও আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে আগ্রহী। তেলনির্ভর যোগাযোগ থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারের দিকে যেতে আমরা অত্যন্ত আগ্রহী। কিন্তু আমাদের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে এখানে ব্যাপক পরিসরে সোলার এনার্জির ব্যবহার শুরু হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোলার এনার্জি ব্যবহাকারী দেশ হলো বাংলাদেশ। এখানে প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন পরিবার সোলার এনার্জি ব্যবহার করছে। কিন্তু আমরা যদি তেলচালিত গাড়ি, যানবাহন ইত্যাদিকে ইলেকট্রিক গাড়ি ইলেকট্রিক লোকোমোটিভে কনভার্ট করতে চাই, তাহলে আমাদের উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়বে; যা করার জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক সহায়তা প্রয়োজন। এ কারণেই আমরা বিশ্ব প্রতিনিধিদের কাছে সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা চেয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন ও প্রশমনের নিমিত্তে যেসব উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন হচ্ছে, সেগুলো যেন বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ব্যবহার করতে পারে, তা নিশ্চিত করার কথা বলেছি। চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, খরা ও বন্যার কারণে সৃষ্ট জলবায়ু অভিবাসীদের পুনর্বাসনে বৈশ্বিক দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছি এবং এ সমস্যা প্রতিকারের রূপরেখা নিরূপণের ওপর জোর দিয়েছি। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি, লস অ্যান্ড ড্যামেজ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীর ক্ষমতায়নের মতো বিষয়গুলোও আমাদের আলোচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে।

প্রতিবছর বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও জলবায়ুর পরিবর্তন, নদীভাঙন, পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, উপকূলীয় ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির ফলে বহু মানুষ নিজেদের বসতভিটা হারিয়ে একেবারে বাস্তুহীন হয়ে পড়ে। জীবন ও জীবিকার সন্ধানে তারা শহরে ছুটে আসে। তাদের ঠাঁই হয় শহরের বস্তিগুলোতে। এসব মানুষের পুনর্বাসন দরকার। সরকার তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। বিভিন্ন তথ্যমতে, জলবায়ুগত বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশের ৬৫ লাখ মানুষ বাস্তুহারা। নতুন নতুন রোগ, এমনকি কেউ কেউ বলে থাকেন চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গি ও কোভিডের মতো রোগের বিস্তারেও জলবায়ু পরিবর্তন ভূমিকা রাখছে। যেভাবে জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, যেভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে- যদি একই ধারা চলতে থাকে, তাহলে শিগ্গির ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে বাস্তুহারা হয়ে পড়বে। আমরা চাই আমাদের উন্নয়ন অংশীদাররা, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলো এসব মানুষের পাশে এসে দাঁড়াক। কারণ তারাই বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত দায়ী। তারাই সবচেয়ে বেশি পরিমাণে দূষণ-নির্গমন করছে। এসব বাস্তহারা মানুষের পুনর্বাসনের দায়িত্ব তাদের কাঁধেও বর্তায়। আমাদের পাশাপাশি তাদেরও পুনর্বাসনের দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া উচিত। এসব দাবি আমরা সম্মেলনে তুলে ধরেছি।

কপ-২৬ সম্মেলনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের ভূমিকার পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ৫৫ দেশের সংগঠন ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি হিসাবেও অংশগ্রহণ করেন। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে এসব দেশের দায় শতকরা মাত্র পাঁচ ভাগ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবে এরাই সবচেয়ে বিপর্যস্ত। সিভিএফের সভাপতি হিসাবে জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থসংরক্ষণের পাশাপাশি সব ঝুঁকিপূর্ণ দেশের স্বার্থসংরক্ষণের দায়িত্বও আমাদের ওপর বর্তায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঝুঁকিপূর্ণ এসব দেশে অভিযোজন ও প্রশমন সম্পর্কিত বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদানের জন্য ধনী দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে একটি ‘মোরাল ভয়েসে’ পরিণত হয়েছেন। তিনি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। এবারের সম্মেলনে তার নেতৃত্ব ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে তার বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ তাকে স্থাপন করেছে এক অনন্য আস্থার জায়গায়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এরই মধ্যে বিভিন্ন এডাপটেশন প্রোগ্রাম চালু করেছে। রিজিয়নাল সেন্টার অব গ্লোবাল এডাপটেশনের অধীনে বিভিন্ন হোম বেইজড প্রোগ্রাম এরই মধ্যে চালু হয়েছে, যেগুলো অত্যন্ত কার্যকর। ১৯৭০ সালে দেশে খুব বড় একটা সাইক্লোন হয়েছিল। এ সাইক্লোনে ৫ লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন ধরনের এডাপটেশন প্রোগ্রাম সফলভাবে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করার ফলে বর্তমানে সেই অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে। ১৪ হাজার সাইক্লোন শেল্টার তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে ৮২ হাজার স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করা হয়েছে, যার ফলে গত কয়েক বছরে বড় বড় সাইক্লোন হয়েছে, কিন্তু প্রাণহানির সংখ্যা নগণ্য। যদিও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে অনেক। তারপরও মানুষের প্রাণরক্ষা ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাস তথা জলবায়ুগত ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা বিশ্বের অন্যতম সক্ষম দেশ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছি। আমাদের এ হোম বেইজড এডাপটেশন প্রোগ্রামগুলো আমরা এশিয়ার অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে দিতে চাই। এজন্য আমাদের অর্থ সহায়তা দরকার। আমরা এ ধরনের বৃহৎ কাজের জন্য বৈশ্বিক সহায়তা চাই। এ দাবি আমরা তুলে ধরেছি এবারের সম্মেলনে।

আমরা লক্ষ করেছি, আফ্রিকান উন্নয়ন ব্যাংক জলবায়ু পরিবর্তন প্রকল্পগুলোর জন্য ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ড তৈরি করেছে; কিন্তু এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক এখনো এমন কোনো ফান্ড তৈরি করতে এগিয়ে আসেনি। তবে আইএমএফ ৬৫০ মিলিয়ন ডলারের একটি এসডিআর ফান্ড তৈরি করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি একটি দারুণ উদ্যোগ। আমরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। কপ-২৬-এ এই বিষয়গুলো অত্যন্ত জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছে।

আমরা দুটি বড় ডিক্লারেশন করেছি সেখানে। একটি হলো, ‘সিভিএফ অ্যান্ড কমনওয়েলথ জয়েন্ট অ্যাকশন প্রোগ্রাম’। আমাদের এ প্রস্তাবটিও গৃহীত হয়েছে। দ্বিতীয়টি হলো, ‘কপ গ্লাসগো ডিক্লারেশন বা গ্লাসগো-ঢাকা ডিক্লারেশন অব কপ-২৬ সিভিএফ সামিট’। এ সামিটে বাংলাদেশের লিডারশিপে মুগ্ধ হয়ে সাতটি দেশ আমাদের সঙ্গে জয়েন করেছে। আরও কিছু দেশ জয়েন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সিভিএফের বর্তমান সদস্য ৫৫টি দেশ, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী যার অন্তর্ভুক্ত। সিভিএফ ফোরামের সামনে আমাদের বিভিন্ন ক্লাইমেট অ্যাকশন তুলে ধরার পাশাপাশি মুজিববর্ষের উদ্যোগ ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ (এমসিপিপি) উপস্থাপন করা হয়েছে। এ উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে জলবায়ু পরিবর্তনগত সমস্যা অনেকাংশেই মোকাবিলা সম্ভবপর হবে। সিভিএফভুক্ত ৩৯টি দেশ আমাদের এ প্ল্যানের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমসিপিপির বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে তারাও ভূমিকা পালন করবে।

আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশ তথা সিভিএফের সঙ্গে মিলে একটি প্রস্তাব দিয়েছি, যার মূল কথা হলো-জলবায়ু ইস্যু মূলত একটি মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ইস্যু। এতে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়, ব্যাপক প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে, যা নিঃসন্দেহে একটি মানবাধিকার ইস্যু। এ কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের মানবাধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য জাতিসংঘে একজন স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগের প্রস্তাব করেছি, জাতিসংঘের মহাসচিব কর্তৃক যা গৃহীত হয়েছে। ফলে এমন একজন দায়িত্বশীল মানুষকে পাওয়া যাবে, যে সবসময় জলবায়ু পরির্বতনের ফলে ক্ষতির মধ্যে পড়া মানুষের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন। আমাদের এ প্রস্তাবের স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট অর্জন। বাংলাদেশের সিভিএফ লিডারশিপের একটি উদাহরণ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায় অভিযোজনের বিভিন্ন উদ্ভাবনী নীতি ও কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ বিশ্বে রোল মডেল। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে আমরাই প্রথম ২০০৯ সালে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫ কোটি ডলারের ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড’ গঠন করেছি। সম্প্রতি আমরা হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে ‘মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা-দশক ২০৩০’-প্রণয়ন করেছি। এ পরিকল্পনায় বাংলাদেশের জন্য জলবায়ুকে ঝুঁকির কারণ নয়, বরং সহনশীলতা ও সমৃদ্ধির হাতিয়ারে পরিণত করার নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা গৃহীত হয়েছে। আমরা আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি মেনে নিয়েও সম্প্রতি ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের বিদেশি বিনিয়োগের ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কার্যক্রম বাতিল করেছি। এর বদলে আমরা সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুচালিত বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন ধরনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে আমাদের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। এ ছাড়া আমরা আমাদের ʻNational Adaptation Planʼ প্রণয়নের কাজ প্রায় সম্পন্ন করেছি। আমাদের সরকার প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানি পরিচালিত যানবাহনের পরিবর্তে ইলেকট্রিক ও হাইব্রিড যানবাহনকে উৎসাহিত করছে। উপকূলবর্তী অঞ্চলে আমরা ৪,২৯১টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করেছি। এ ছাড়া বন্যাকবলিত অঞ্চলে অতিরিক্ত আরও ৫২৩টি বন্যা কেন্দ্র ও ৫৫০টি মুজিব কেল্লা স্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালনের অংশ হিসাবে সারা দেশে তিন কোটি গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির শর্ত মোতাবেক কিছুদিন আগেই আমরা হালনাগাদ ও উচ্চাভিলাষী ঘউঈ প্রণয়ন করেছি। আমরা আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ‘স্বল্প কার্বন নীতি’ যুক্ত করা এবং আমাদের অর্থনীতিকে স্বল্প কার্বন অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় (এমওডিএমআর) ২০১৬-২০ সময়কালের জন্য সেন্ডেই দুর্যোগ ঝুঁকিপ্রশমন কৌশল (২০১৫-২০৩০) গ্রহণ ও দৃঢ়ভাবে অনুমোদিত অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে একটা দুর্যোগ ঝুঁকি উপশমন কৌশল গ্রহণ করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার গৃহীত কর্মসূচির একটি হলো, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসপি)’। এর আওতায় রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রধান জাতীয় পরিকল্পনা, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশে জলবায়ুজনিত বিনিয়োগ করা হয়ে থাকে। বিসিসিএসপি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি সার্বিক নির্মাণ কাঠামো প্রস্তুত করে এবং উন্নয়ন অর্জনে সরকারি প্রতিশ্রুত পথ সম্পর্কে ধারণা দেয়। বিসিসিএসপি হলো এমন একটি কৌশল, যা পরিকল্পনা ও বিনিয়োগকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত লক্ষ্য একই রেখায় আনার একটা সূত্র হিসাবে কাজ করে। এর মধ্যে মোট ৪৪টি কর্মসূচি এবং ১৪৫টি পদক্ষেপ ছয়টি বিষয়বস্তুগত জায়গায় স্থান দেওয়া হয়েছে। বিষয়বস্তুগত দিকগুলো হলো- ১. খাদ্য নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্য; ২. বিস্তৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; ৩. অবকাঠামো; ৪. গবেষণা ও জ্ঞান ব্যবস্থাপনা; ৫. উপশমন ও কার্বনের নিু নিঃসরণ এবং ৬. সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিবৃদ্ধি।

নরওয়ে সরকারের সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশে ২০১৫ সালে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (এনএপি) একটা রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। এনএপি প্রক্রিয়া সম্পন্নকল্পে যে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তার মধ্যে আছে আন্তঃমন্ত্রণালয় স্টিয়ারিং কমিটি, একটি কারিগরি উপদেষ্টা কমিটিসহ এনএপি সূত্রবদ্ধকরণের নিমিত্তে একটি প্রধান দল গঠন করা। জলবায়ুর পরিবর্তন ও এর ঝুঁকিগুলো বিবেচনায় নিয়ে সরকার জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বেশকিছু ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। যথা- (ক) খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা (পানিসহ); (খ) বিস্তৃত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা; (গ) লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণসহ উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবস্থাপনা; (ঘ) বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভাঙন রক্ষা; (ঙ) জলবায়ু অভিঘাত-সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণ; (চ) গ্রাম বিদ্যুতায়ন বৃদ্ধি; (ছ) নগর অভিঘাত-সহনশীলতা বৃদ্ধিকরণ; (জ) ইকোসিসটেমভিত্তিক অভিযোজন (বনায়নসহ) (ঝ) কমিউনিটি বা জনপদভিত্তিক আদ্রভূমি ও উপকূলীয় জায়গা সংরক্ষণ; এবং (ঞ) নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের এতসব পদক্ষেপের পরও ভৌগোলিক, জনতাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাতারাতি শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভবপর নয়। অধিকন্তু, প্রধান কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো এগিয়ে না এলে আমাদের কর্মযজ্ঞ মহাসমুদ্র থেকে একফোঁটা পানি তুলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কমিয়ে আনার মতো ব্যর্থ প্রচেষ্টার শামিল হবে। তাই উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার প্রয়াসে আমাদের কূটনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। যার ফলস্বরূপ বাংলাদেশ দ্বিতীয়বারের মতো ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) সভাপতি নির্বাচিত হয়। বাংলাদেশের সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণে এ বছরই সিভিএফের সদস্য সংখ্যা ৪৮ থেকে বেড়ে ৫৫তে উন্নীত হয়েছে।

এবারের জলবায়ু সম্মেলন (কপ-২৬) থেকে বাংলাদেশসহ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রাপ্তি উল্লেখযোগ্য। এবারের সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবং জি-৭৭ ও চীন গ্রুপ দুটির সদস্য হিসাবে বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়নের পরিমাণ বৃদ্ধিসহ প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে জোর প্রচেষ্টা চালায়। এ ছাড়া জলবায়ু তহবিল সরবরাহকালে যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয় সে বিষয়েও বাংলাদেশ গুরুত্বারোপ করে। ‘কপ-২৬’-এ ‘The glasgow Climate Pact’ নামক যে outcome document গৃহীত হয়, তাতে উন্নত দেশগুলো কর্তৃক প্রতিশ্রুত বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করে এ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে সবাই একমত হন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় ধনী দেশগুলো উন্নয়নশীল ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে সহযোগিতা করবে বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে।

‘The glasgwo Climate Pact’ অনুসারে, ২০২২ সালে মিসরে অনুষ্ঠেয় ‘কপ-২৭’ সম্মেলনে সব দেশ এমন লক্ষ্যমাত্রা উপস্থাপন করবে, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি রাখা যায়। গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরবের মতো দেশ ২০২২-এর মধ্যে আরও উচ্চাভিলাষী NDC প্রণয়ন করবে বলে আশা করা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকির মুখে থাকা দেশগুলো ইতোমধ্যে যে ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণের জন্য loss and damage ইস্যুকে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকার করে বৈশ্বিক সংলাপের একটি রূপরেখা প্রণয়নে এবারের কপ সম্মেলনে ঐকমত্যে পৌঁছানো গেছে, যদিও এক্ষেত্রে কোনো জোরালো কাঠামো প্রণয়ন সম্ভব হয়নি।

‘The glasgwo Climate Pact’ জাতিসংঘের প্রথম সর্বসম্মত দলিল, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি উল্লেখ করা সম্ভব হয়েছে। ‘কপ-২৬’ সম্মেলনে বাংলাদেশসহ ১৪১টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের অরণ্য নিধন (Deforestation) রোধে অঙ্গীকার করেছে। এ ছাড়া আলোচনায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নারীর ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু সংক্রান্ত সব ধরনের বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় লিঙ্গ সমতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যা outcome document-এ গুরুত্ব সহকারে প্রতিফলিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২ নভেম্বর ‘কপ-২৬’-এর সাইডলাইনে ‘নারী ও জলবায়ু পরিবর্তন’ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেল আলোচনায় বক্তা হিসাবে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নারীদের ক্ষমতায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যক বলে উল্লেখ করেন। তার সরকার ‘ন্যাশনাল ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড জেন্ডার অ্যাকশন প্ল্যান’ তৈরি করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উপরন্তু সরকার জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটও চালু করেছে, যেখানে সব নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সম্মেলনের সাইডলাইনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৫৫টি সিভিএফভুক্ত দেশের রাষ্ট্র/সরকারপ্রধানরা ও তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ‘CVF COP-26 Leaders Dialogue’ অনুষ্ঠিত হয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি, কপ-২৬-এর সভাপতি অলোক শর্মা, সিভিএফের থিমেটিক অ্যাম্বাসেডর মোহামেদ নাশিদ (মালদ্বীপের বর্তমান স্পিকার ও সাবেক রাষ্ট্রপতি) এবং থিমেটিক অ্যাম্বাসেডর সায়মা ওয়াজেদসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি এ গুরুত্বপূর্ণ সভায় অংশগ্রহণ করেন। উচ্চপর্যায়ের এ ডায়ালগে বাংলাদেশের নেতৃত্বে ৫৫টি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান কর্তৃক ‘Dhaka-Glasgwo Declaration’ গৃহীত হয়, যা জলবায়ু কূটনীতিতে বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় ভূমিকার বহিঃপ্রকাশ। যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম বিবিসি সম্প্রতি তাদের এক প্রতিবেদনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কপ-২৬ সম্মেলনের পাঁচজন শীর্ষ ফবধষ সধশবৎ-এর একজন হিসাবে চিহ্নিত করে। এটি বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্ব অঙ্গনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব ও সার্বজনীন বন্ধুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থার প্রতিফলন। কপ-২৬-এর সাইডলাইনে বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের স্থানীয় অভিযোজন মডেলগুলোর (locally led adaptation models) বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যায়, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশ এবং একইসঙ্গে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অধিকতর অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ সুগম করবে।

জাতিসংঘের বর্তমান প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২১০০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে আনুমানিক ১১ বিলিয়ন। জলবায়ু পরিবর্তনে পর্যুদস্ত পৃথিবী কি এ জনসংখ্যার ভার বহন করতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিশ্বের ধনী ও প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে এক কাতারে এনে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা কি সম্ভব হবে? পৃথিবীর মহান চিন্তাবিদরা বিভিন্ন সময় বিষণ্ন ও উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো ভবিষ্যৎ চিত্র অঙ্কন করলেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের ফলে আমরা প্রকৃতির ধারণক্ষমতার সীমা কখনো অতিক্রম করিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা এবং পৃথিবীর মানুষকে প্রতিনিয়ত এ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। পৃথিবীকে বাঁচাতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য করে রেখে যাওয়ার জন্য আমাদের একযোগে কাজ করে যেতে হবে। আশাহত হওয়া চলবে না। আমার বিশ্বাস, পৃথিবীর এ ক্রান্তিলগ্নে সমগ্র মানবসমাজ এক হয়ে তার সব শক্তি দিয়ে পৃথিবীকে বাঁচাবে। মানুষের সেই উদ্যোগে এবারের কপ-২৬ সম্মেলন ক্ষুদ্র একটি মাইলফলক হয়ে থাকলেও আমাদের সবার প্রচেষ্টা সার্থক হবে।

ড. একে আবদুল মোমেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন