আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী
jugantor
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী

  বিমল সরকার  

০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সংযোজন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বা রাষ্ট্রনায়কদের নামের তালিকায় যার নামটি কৃতজ্ঞচিত্তে বেশি স্মরণ করা হয়, তিনি হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী। নামটির সঙ্গে ধৈর্য, শক্তি ও সাহস এবং দূরদর্শী-প্রত্যুৎপন্নমতি এমনকিছু শব্দ ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে রয়েছে। এমন দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী রাজনীতিকের উদাহরণ খুবই বিরল। স্বাধীন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী নামগুলো অবিচ্ছেদ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশের জনগণের কাছে তিনি প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ বাঙালি জাতির সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নতুন সরকার গঠন ও নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইন্দিরা গান্ধী শপথ নিতে না নিতেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় ঢাকাসহ বাংলাদেশের সর্বত্র নির্বিচার গণহত্যা, অবাধ লুণ্ঠন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। ঘটনার আকস্মিকতা এবং রক্তের হোলিখেলা অবলোকন করে সারা দুনিয়া একেবারে স্তম্ভিত। বাঙালি জাতির এ ঘোর দুর্দিনে ভারতের মতো একটি উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ বড় রাষ্ট্রের করণীয় হিসাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইন্দিরা গান্ধীকে দেরি করতে হয়নি। তৃতীয় বিশ্বের অত্যন্ত জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও উদার-হৃদয় ইন্দিরা গান্ধী দুর্দিনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেন এবং সাহায্য প্রদানে এগিয়ে আসেন। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা ও ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনোবলকে আরও চাঙা করে তোলে। বাঙালি জাতির গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত অংশগ্রহণ ও বিজয় এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রয়েছে গৌরবময় ঐতিহ্যের এক নিবিড় সেতুবন্ধ। এ সেতুবন্ধ তৈরির অগ্রদূত ছিলেন বিশ্বরাজনীতির অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা, সর্বোপরি মানবীয় অনুভূতি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক গতির সঞ্চার করে এবং অপেক্ষাকৃত দ্রুত সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আজন্মলালিত স্বাধীনতা লাভের লক্ষ্যে পরিচালিত বাঙালি জাতির মরণপণ লড়াইয়ের দিনগুলোতে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধী নিজ দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই; বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠন ও রাষ্ট্রের সমর্থন-সহযোগিতা চেয়েছেন আমাদের অনুকূলে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা লাভ ও সাড়া জাগাতে এ সময় এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দেশ বা জায়গা বাকি ছিল না, যেখানে তিনি যাননি।

১৯৭১ সালে আমাদের জাতীয় জীবনের এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতাকারী বিদেশি সব বন্ধু রাষ্ট্রের তালিকায় সবার ওপরে ভারতের স্থান। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ করা, স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায় এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির লক্ষ্যে বিশ্বজনমত গঠনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দূতিয়ালি ও নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা কোনোদিনই ভোলার নয়। ভোলা যাবে না ভারতের বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থী হিসাবে প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু অস্থিকঙ্কালসার মানুষের আশ্রয় প্রদান এবং চিকিৎসাসহ ১০ মাসব্যাপী তাদের ভরণপোষণের কথা। দীর্ঘ সাড়ে ৯ মাস পর পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করে স্বদেশের পথে পা বাড়িয়ে এ দেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে লন্ডনে যান। লন্ডন থেকে তিনি প্রথমে স্বাধীন দেশে স্বজনদের সঙ্গে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে দেশে ফিরে আসার ২৬ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বঙ্গবন্ধু প্রথম বিদেশ সফরে যান। প্রথম সফরের দেশ হিসাবে তিনি প্রতিবেশী ভারতকেই বেছে নেন। ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে বাংলাদেশের মহান নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ছুটে আসেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে তার আমন্ত্রণে বেশ উৎসাহের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ইন্দিরার বাংলাদেশ সফরের দিনটিতে ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এ সময় সারা দেশের শহর, বন্দর, গ্রামসহ সব জনপদ, এমনকি যানবাহনগুলো পর্যন্ত ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী অমর হোক’ লেখাবিশিষ্ট পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায়। উভয় দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও সৃষ্টি হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার। উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়। দুই বছর পর ১৯৭৪ সালে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সম্পাদিত হয় স্থলসীমান্ত চুক্তি; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এ চুক্তি বাস্তবায়ন আর সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীও আরেক বেদনাদায়ক হত্যাকাণ্ডের বলি হন। ফলে কেবল স্বাক্ষরিত চুক্তি নয়, গৌরবময় অনেক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দুই দেশের মৈত্রী সম্পর্কটিও অনেকটা ধামার আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন অনেক বড় মাপের একজন মানুষ। বড় মাপের রাজনীতিক। প্রকৃত অর্থেই স্টেটসম্যান। নিজের দেশে এবং বহির্বিশ্বে তার কর্মপরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত। তার সহৃদয়তা এবং আগ্রাসী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ ১৯৭১ সালে আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। বিজয়ের মাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এ মহীয়সী নারীকে স্মরণ করি।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী

 বিমল সরকার 
০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সংযোজন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বা রাষ্ট্রনায়কদের নামের তালিকায় যার নামটি কৃতজ্ঞচিত্তে বেশি স্মরণ করা হয়, তিনি হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দিরা গান্ধী। নামটির সঙ্গে ধৈর্য, শক্তি ও সাহস এবং দূরদর্শী-প্রত্যুৎপন্নমতি এমনকিছু শব্দ ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে রয়েছে। এমন দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী রাজনীতিকের উদাহরণ খুবই বিরল। স্বাধীন বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধী নামগুলো অবিচ্ছেদ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশের জনগণের কাছে তিনি প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।

১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ বাঙালি জাতির সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে ভারতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নতুন সরকার গঠন ও নবগঠিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ইন্দিরা গান্ধী শপথ নিতে না নিতেই পাকিস্তানি সামরিক জান্তা উন্মত্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় ঢাকাসহ বাংলাদেশের সর্বত্র নির্বিচার গণহত্যা, অবাধ লুণ্ঠন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। ঘটনার আকস্মিকতা এবং রক্তের হোলিখেলা অবলোকন করে সারা দুনিয়া একেবারে স্তম্ভিত। বাঙালি জাতির এ ঘোর দুর্দিনে ভারতের মতো একটি উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ বড় রাষ্ট্রের করণীয় হিসাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইন্দিরা গান্ধীকে দেরি করতে হয়নি। তৃতীয় বিশ্বের অত্যন্ত জনবহুল ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও উদার-হৃদয় ইন্দিরা গান্ধী দুর্দিনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেন এবং সাহায্য প্রদানে এগিয়ে আসেন। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা ও ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মনোবলকে আরও চাঙা করে তোলে। বাঙালি জাতির গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে বীরোচিত অংশগ্রহণ ও বিজয় এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তিলাভে ইন্দিরা গান্ধীর ভূমিকা চিরস্মরণীয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রয়েছে গৌরবময় ঐতিহ্যের এক নিবিড় সেতুবন্ধ। এ সেতুবন্ধ তৈরির অগ্রদূত ছিলেন বিশ্বরাজনীতির অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তার প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা, নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা, সর্বোপরি মানবীয় অনুভূতি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক গতির সঞ্চার করে এবং অপেক্ষাকৃত দ্রুত সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আজন্মলালিত স্বাধীনতা লাভের লক্ষ্যে পরিচালিত বাঙালি জাতির মরণপণ লড়াইয়ের দিনগুলোতে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধী নিজ দেশের অভ্যন্তরে তো বটেই; বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠন ও রাষ্ট্রের সমর্থন-সহযোগিতা চেয়েছেন আমাদের অনুকূলে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাহায্য-সহযোগিতা লাভ ও সাড়া জাগাতে এ সময় এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দেশ বা জায়গা বাকি ছিল না, যেখানে তিনি যাননি।

১৯৭১ সালে আমাদের জাতীয় জীবনের এক ক্রান্তিকালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতাকারী বিদেশি সব বন্ধু রাষ্ট্রের তালিকায় সবার ওপরে ভারতের স্থান। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা বন্ধ করা, স্বাধীন দেশ হিসাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি আদায় এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির লক্ষ্যে বিশ্বজনমত গঠনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দূতিয়ালি ও নিরলস কর্মপ্রচেষ্টা কোনোদিনই ভোলার নয়। ভোলা যাবে না ভারতের বিভিন্ন জায়গায় শরণার্থী হিসাবে প্রায় এক কোটি উদ্বাস্তু অস্থিকঙ্কালসার মানুষের আশ্রয় প্রদান এবং চিকিৎসাসহ ১০ মাসব্যাপী তাদের ভরণপোষণের কথা। দীর্ঘ সাড়ে ৯ মাস পর পাকিস্তানি বন্দিদশা থেকে মুক্তিলাভ করে স্বদেশের পথে পা বাড়িয়ে এ দেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমে লন্ডনে যান। লন্ডন থেকে তিনি প্রথমে স্বাধীন দেশে স্বজনদের সঙ্গে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে দেশে ফিরে আসার ২৬ দিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বঙ্গবন্ধু প্রথম বিদেশ সফরে যান। প্রথম সফরের দেশ হিসাবে তিনি প্রতিবেশী ভারতকেই বেছে নেন। ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে বাংলাদেশের মহান নেতাকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজধানী নয়াদিল্লি থেকে ছুটে আসেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে তার আমন্ত্রণে বেশ উৎসাহের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ সফর করেন। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ ইন্দিরার বাংলাদেশ সফরের দিনটিতে ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এ সময় সারা দেশের শহর, বন্দর, গ্রামসহ সব জনপদ, এমনকি যানবাহনগুলো পর্যন্ত ‘ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী অমর হোক’ লেখাবিশিষ্ট পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে যায়। উভয় দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও সৃষ্টি হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার। উভয় দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়। দুই বছর পর ১৯৭৪ সালে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সম্পাদিত হয় স্থলসীমান্ত চুক্তি; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর এ চুক্তি বাস্তবায়ন আর সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীও আরেক বেদনাদায়ক হত্যাকাণ্ডের বলি হন। ফলে কেবল স্বাক্ষরিত চুক্তি নয়, গৌরবময় অনেক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দুই দেশের মৈত্রী সম্পর্কটিও অনেকটা ধামার আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন অনেক বড় মাপের একজন মানুষ। বড় মাপের রাজনীতিক। প্রকৃত অর্থেই স্টেটসম্যান। নিজের দেশে এবং বহির্বিশ্বে তার কর্মপরিধি ছিল অনেক বিস্তৃত। তার সহৃদয়তা এবং আগ্রাসী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ ১৯৭১ সালে আমাদের বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল। ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। বিজয়ের মাসে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এ মহীয়সী নারীকে স্মরণ করি।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন