নাসিক নির্বাচনে ইভিএম ও স্মার্ট বুথ
jugantor
নাসিক নির্বাচনে ইভিএম ও স্মার্ট বুথ

  ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার  

১৬ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব কয়টি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয়। মোট ১৪,৪৩৪টি বুথে ২৮,৮৬৮টি ইভিএম ব্যবহৃত হয়েছে। এর আগে ইভিএমে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ৫.২৮ শতাংশ, ঢাকা-৫ আসনে ১০.৪৩ শতাংশ এবং নওগাঁ-৬ আসনে ৩৬.৪৯ শতাংশ ভোট পড়ে। একই বছর ১২ নভেম্বর উপনির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে ১৪.১৮ শতাংশ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনে ৫১.১৯ শতাংশ ভোট পড়ে। ইতঃপূর্বে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এবং বর্তমানে চলমান দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ব্যাপক হারে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামীতেও সব জাতীয় ও স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন ও পৌরসভা) নির্বাচনে ইভিএম দিয়ে ভোট গ্রহণ করার পরিকল্পনা আছে নির্বাচন কমিশনের।

এ ধারাবাহিকতায় আজ রোববার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন পুরোটাই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নেওয়া হচ্ছে এবং ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় এই প্রথম স্মার্ট বুথের পরীক্ষামূলক ব্যবহার থাকছে এখানে। একটি কেন্দ্রের ১০টি কক্ষে স্মার্ট ভোটকক্ষ (বিশেষ বোর্ডের ফোল্ডার দিয়ে তৈরি) পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হবে। সফল হলে আগামীতে সব নির্বাচনে এ ব্যবস্থা প্রয়োগ করবেন কমিশন। নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও টাঙ্গাইল-৭ আসনের উপনির্বাচন এবং ৫টি পৌরসভায় ভোট রয়েছে একই দিনে ইভিএম পদ্ধতিতে। যান্ত্রিক ত্রুটি না হলে ইভিএম দিয়ে ভোট দিতে সময় কম লাগে, কাগজের পরিবর্তে ব্যালট, আঙুলের ছাপ দিয়ে পরিচয় নিশ্চিন্ত করা, বাটন চেপে ভোট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ভোট দিতে আসা ভোটারদের মধ্যে ইভিএম নিয়ে অনেক কৌতূহল থাকে।

উল্লেখ্য, দেশে প্রথমবারের মতো সব কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হয় ১৭ জানুয়ারি ২০১১ সালে নরসিংদীর পৌরসভা নির্বাচনে এবং পরে ৫ জানুয়ারি ২০১২ সালে কুমিল্লার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এর আগে আংশিক ও পরীক্ষামূলকভাবে ৩ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো ২০১০ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশনের ১৪টি কেন্দ্রে ও ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশনের ৫৮টি কেন্দ্রে। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ২৪নং এবং ২৭নং ওয়ার্ডের সব কয়টি কেন্দ্রে ইভিএম দিয়ে ভোটগ্রহণ করা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহৃত হয়। আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে-ঢাকা-৬ ও ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২ আসন। পরবর্তীকালে জুন মাসে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে সবকটি সেন্টারে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয়। অবশ্য বাংলাদেশে ২০০৭ সালে প্রথম ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের নির্বাচন ই-ভোটিং পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আমাদের উপমহাদেশে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটের প্রচলন শুরু হয় ভারতের কেরালা রাজ্যে। সেখানকার ‘পারুর অ্যাসেম্বলি’ নির্বাচনে ১৯৮২ সালে এ পদ্ধতিতে ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে ভারতের সব রাজ্যেই এ পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয়, তবে ইভিএমের পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতির প্রচলনও আছে। এ পদ্ধতিতে জর্ডান, মালদ্বীপ, নামিবিয়া, মিসর, ভুটান ও নেপালেও ভোট গণনা করা হয় এবং ভারতের বিশেষজ্ঞরা এসব দেশে টেকনিক্যাল সাপোর্ট বা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের ইভিএম মেশিন ভারতের আদলে তৈরি এবং এগুলো বিভিন্ন মডেলের হয়ে থাকে। একসঙ্গে ১৬ জন, ৩২ জন কিংবা ৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনী প্রতীক রাখার ব্যবস্থা আছে, যেখানে চারটি ব্যালট ইউনিট আছে। আধুনিক ইভিএম মেশিনে ৩৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনি প্রতীকসহ ২৪টি ব্যালট ইউনিট রাখার ব্যবস্থা করা যায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তায় তৈরিকৃত নির্বাচন কমিশনের হাতে বর্তমানে যে ইভিএম যন্ত্রটি আছে, তার প্রতিটির মূল্য দুই লক্ষাধিক টাকা। ভারতে এ রকম একটি ইভিএম-এর দাম বর্তমানে ১৭ হাজার রুপির মতো।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি প্রথম চালু হয় অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে ১৮৫৬ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৮ সালে ম্যাসাচুয়েটস অস্ট্রেলিয়ার সেই পদ্ধতি গ্রহণ করে। ১৮৮৯ সালে ম্যাসাচুয়েটস পাঞ্চকার্ডের প্যাটেন্ট তৈরি করে। একই বছর মেকানিক্যাল লেবার মেশিন প্যাটেন্ট তৈরি হয় এবং নিউইয়র্কের লকপর্ট নির্বাচনে তা ব্যবহার করা হয়। পরে আমেরিকার বিভিন্ন সিটি নির্বাচনে এ সিস্টেম ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। ১৯৬৫ সালে ভোটোমেটিক সিস্টেম পাঞ্চকার্ডের প্রবর্তন ঘটে এবং ১৯৭৪ সালে ডিআরই ভোটিং মেশিনের প্যাটেন্ট আবিষ্কৃত হয়। ১৯৭৫ সালে ভিডিও ভোটার সিস্টেমের প্রবর্তন ঘটে এবং ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ইন্টারনেট ভোটিং সিস্টেম চালু হয়। এভাবে আস্তে আস্তে ইন্টারনেট ভোটিং এবং মেশিনের মাধ্যমে তথা ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের প্রচলন সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে পাঞ্চকার্ডের মাধ্যমে ভোট প্রদানের রূপরেখা আবিষ্কারের প্রেক্ষাপটে ১৯৬০-এর দশকে ইলেকট্রনিক ভোটিং পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা করা শুরু হয়। ১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে এ পদ্ধতি অনুসৃত হওয়ার মাধ্যমে দৃশ্যত প্রথমবারের মতো ই-ভোটিং এবং ইভিএম ব্যবহারের চিত্র চোখে পড়ে।

ইলেকট্রনিক ভোটিং আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট প্রয়োগ বা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের স্বীয় মতামত প্রতিফলনের অন্যতম মাধ্যম। ভোট প্রয়োগে মেশিন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অনুসৃত হয় বিধায় সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নামে পরিচিত। এর অন্য নাম ই-ভোটিং। ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় এটি একাধারে সঠিকভাবে ভোট প্রয়োগ ও দ্রুততার সঙ্গে ভোট গণনা করতে সক্ষম। ভোট প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নত এবং উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অতি দ্রুত ব্যালট পেপার গণনা করা সম্ভবপর। একই সঙ্গে অক্ষম ভোটাররাও তাদের ভোট সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। ভোট গ্রহণের স্থান হিসাবে ভোটকেন্দ্রেই মূলত ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও টেলিফোন ব্যবহার করেও ই-ভোটিং প্রয়োগ করা সম্ভব। নতুনতর অপটিক্যাল স্ক্যান ভোটিং পদ্ধতিতে পাঞ্চকার্ড, অপটিক্যাল স্ক্যানার ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে একজন ভোটার ব্যালট পেপার চিহ্নিত করে ভোট প্রদান করেন।

ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক সমালোচনা শুরু হয়। এটিকে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায় বলে বিতর্ক আছে। তাই বিভিন্ন দেশে ইভিএম পদ্ধতি ইতোমধ্যেই বাতিল করা হয়েছে; এমনকি আইন করেও কোনো কোনো দেশে এ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে এক সময় ইভিএম/ই-ভোটিং পদ্ধতিতে ভোট পরিচালনা করা হতো; কিন্তু নানারকম অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবং জনসাধারণের আপত্তির মুখে ২০০৬ সালে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে ডাচ সরকার। ২০০৯ সালে আয়ারল্যান্ড এবং ইতালি এ পদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করেছে। ২০০৯ সালে জার্মান সরকার এ পদ্ধতি বাতিল করে এবং রুল জারি করে যে-দ্রুততা কিংবা দক্ষতার চেয়ে স্বচ্ছতা বেশি জরুরি। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সেও এ পদ্ধতি ইতোমধ্যে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই প্রবল বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ইভিএম এবং ডিআরই পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের ফলে নির্বাচনি কারচুপির ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

আমাদের দেশেও বিগত কয়েকটি নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর এ ইভিএম পদ্ধতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। তবুও উচ্চ আদালত থেকে ইভিএম দিয়ে ভোট গণনার পক্ষে রায় আছে। বলা বাহুল্য, ১ ফেব্রুয়ারির (২০২০) ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আঙুলের ছাপ দিয়েও কোনো কোনো ভোটার তার প্রিয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ মেলেনি কিংবা ভোট দিতেও অনেক সময় লেগেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোট দিতে পারেননি ওই নির্বাচনে। পরে ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে তিনি তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যুক্তফ্রন্ট নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনেরও একই অবস্থা হয়েছে। আধাঘণ্টা চেষ্টা করেও ইভিএম দিয়ে আঙুলের ছাপ মেলাতে পারেননি। পরে প্রিসাইডিং অফিসারের সহায়তায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তিনি তার ভোট প্রয়োগ করেন। গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মা নাসরিন আউয়াল ভোট দিতে যাওয়ার মুহূর্তে মেশিন হ্যাং হয়ে যায়। এরপর প্রায় ৪০ মিনিট চেষ্টা করে কর্মকর্তারা মেশিনটিকে সচল করেন এবং তিনি তার ভোট দেন। সিনিয়র সাংবাদিক জনাব আবু সাঈদ খানও তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ ধরনের আরও অনেক অনিয়মের কথা বিভিন্ন মিডিয়া ও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সাধারণ ভোটাররা।

তবুও প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এর সঠিক ব্যবহার ভোট পদ্ধতিকে ত্বরান্বিত করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে যারা, তারা দেশের গণতন্ত্র এবং ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখার ওপর কতটা জোর দিচ্ছে, এটাই হলো প্রশ্ন। মানুষ তার ভোটটি গোপনে সঠিক স্থানে প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে তবেই ইভিএমের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, নির্বাচন কমিশন ফিরে পাবে তাদের হারানো সম্মান এবং ঐতিহ্য। বিগত দিনের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের হার খুবই নিুমুখী। এর কারণ ইভিএম একটি নতুন যন্ত্র বা পদ্ধতি কিংবা এটি বিকল হয়ে যাওয়া নয়; বরং এটিকে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে না দেওয়া এবং নির্বাচনি পরিবেশ না থাকাই এর মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম যন্ত্রটি সঠিকভাবে চলবে, যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত প্রতিস্থাপন করা হবে আরেকটি ইভিএম এবং সার্বিক পরিবেশ নির্বাচনমুখী হবে-এমনটিই আশা করছে সমগ্র দেশবাসী।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (‘ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেম’ বিষয়ে পিএইচডি করেছেন)

নাসিক নির্বাচনে ইভিএম ও স্মার্ট বুথ

 ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার 
১৬ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হচ্ছে। ২০২০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সব কয়টি কেন্দ্রে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয়। মোট ১৪,৪৩৪টি বুথে ২৮,৮৬৮টি ইভিএম ব্যবহৃত হয়েছে। এর আগে ইভিএমে ঢাকা-১০ আসনের উপনির্বাচনে ৫.২৮ শতাংশ, ঢাকা-৫ আসনে ১০.৪৩ শতাংশ এবং নওগাঁ-৬ আসনে ৩৬.৪৯ শতাংশ ভোট পড়ে। একই বছর ১২ নভেম্বর উপনির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে ১৪.১৮ শতাংশ ও সিরাজগঞ্জ-১ আসনে ৫১.১৯ শতাংশ ভোট পড়ে। ইতঃপূর্বে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে এবং বর্তমানে চলমান দেশব্যাপী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও ব্যাপক হারে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামীতেও সব জাতীয় ও স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন ও পৌরসভা) নির্বাচনে ইভিএম দিয়ে ভোট গ্রহণ করার পরিকল্পনা আছে নির্বাচন কমিশনের।

এ ধারাবাহিকতায় আজ রোববার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন পুরোটাই ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) নেওয়া হচ্ছে এবং ভোটের গোপনীয়তা রক্ষায় এই প্রথম স্মার্ট বুথের পরীক্ষামূলক ব্যবহার থাকছে এখানে। একটি কেন্দ্রের ১০টি কক্ষে স্মার্ট ভোটকক্ষ (বিশেষ বোর্ডের ফোল্ডার দিয়ে তৈরি) পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হবে। সফল হলে আগামীতে সব নির্বাচনে এ ব্যবস্থা প্রয়োগ করবেন কমিশন। নারায়ণগঞ্জ ছাড়াও টাঙ্গাইল-৭ আসনের উপনির্বাচন এবং ৫টি পৌরসভায় ভোট রয়েছে একই দিনে ইভিএম পদ্ধতিতে। যান্ত্রিক ত্রুটি না হলে ইভিএম দিয়ে ভোট দিতে সময় কম লাগে, কাগজের পরিবর্তে ব্যালট, আঙুলের ছাপ দিয়ে পরিচয় নিশ্চিন্ত করা, বাটন চেপে ভোট দেওয়া ইত্যাদি কারণে ভোট দিতে আসা ভোটারদের মধ্যে ইভিএম নিয়ে অনেক কৌতূহল থাকে।

উল্লেখ্য, দেশে প্রথমবারের মতো সব কেন্দ্রে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ হয় ১৭ জানুয়ারি ২০১১ সালে নরসিংদীর পৌরসভা নির্বাচনে এবং পরে ৫ জানুয়ারি ২০১২ সালে কুমিল্লার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এর আগে আংশিক ও পরীক্ষামূলকভাবে ৩ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো ২০১০ সালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সিটি করপোরেশনের ১৪টি কেন্দ্রে ও ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জের সিটি করপোরেশনের ৫৮টি কেন্দ্রে। ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহৃত হয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৮ সালের ১৫ মে খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ২৪নং এবং ২৭নং ওয়ার্ডের সব কয়টি কেন্দ্রে ইভিএম দিয়ে ভোটগ্রহণ করা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহৃত হয়। আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে-ঢাকা-৬ ও ঢাকা-১৩, চট্টগ্রাম-৯, রংপুর-৩, খুলনা-২ এবং সাতক্ষীরা-২ আসন। পরবর্তীকালে জুন মাসে বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে সবকটি সেন্টারে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট হয়। অবশ্য বাংলাদেশে ২০০৭ সালে প্রথম ঢাকা অফিসার্স ক্লাবের নির্বাচন ই-ভোটিং পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আমাদের উপমহাদেশে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটের প্রচলন শুরু হয় ভারতের কেরালা রাজ্যে। সেখানকার ‘পারুর অ্যাসেম্বলি’ নির্বাচনে ১৯৮২ সালে এ পদ্ধতিতে ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে ভারতের সব রাজ্যেই এ পদ্ধতিতে ভোট গণনা করা হয়, তবে ইভিএমের পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতির প্রচলনও আছে। এ পদ্ধতিতে জর্ডান, মালদ্বীপ, নামিবিয়া, মিসর, ভুটান ও নেপালেও ভোট গণনা করা হয় এবং ভারতের বিশেষজ্ঞরা এসব দেশে টেকনিক্যাল সাপোর্ট বা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। বাংলাদেশের ইভিএম মেশিন ভারতের আদলে তৈরি এবং এগুলো বিভিন্ন মডেলের হয়ে থাকে। একসঙ্গে ১৬ জন, ৩২ জন কিংবা ৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনী প্রতীক রাখার ব্যবস্থা আছে, যেখানে চারটি ব্যালট ইউনিট আছে। আধুনিক ইভিএম মেশিনে ৩৬৪ জন প্রার্থীর নাম, ছবি এবং নির্বাচনি প্রতীকসহ ২৪টি ব্যালট ইউনিট রাখার ব্যবস্থা করা যায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিগরি সহায়তায় তৈরিকৃত নির্বাচন কমিশনের হাতে বর্তমানে যে ইভিএম যন্ত্রটি আছে, তার প্রতিটির মূল্য দুই লক্ষাধিক টাকা। ভারতে এ রকম একটি ইভিএম-এর দাম বর্তমানে ১৭ হাজার রুপির মতো।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি প্রথম চালু হয় অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যে ১৮৫৬ সালে। পরবর্তী সময়ে ১৮৮৮ সালে ম্যাসাচুয়েটস অস্ট্রেলিয়ার সেই পদ্ধতি গ্রহণ করে। ১৮৮৯ সালে ম্যাসাচুয়েটস পাঞ্চকার্ডের প্যাটেন্ট তৈরি করে। একই বছর মেকানিক্যাল লেবার মেশিন প্যাটেন্ট তৈরি হয় এবং নিউইয়র্কের লকপর্ট নির্বাচনে তা ব্যবহার করা হয়। পরে আমেরিকার বিভিন্ন সিটি নির্বাচনে এ সিস্টেম ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করে। ১৯৬৫ সালে ভোটোমেটিক সিস্টেম পাঞ্চকার্ডের প্রবর্তন ঘটে এবং ১৯৭৪ সালে ডিআরই ভোটিং মেশিনের প্যাটেন্ট আবিষ্কৃত হয়। ১৯৭৫ সালে ভিডিও ভোটার সিস্টেমের প্রবর্তন ঘটে এবং ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ইন্টারনেট ভোটিং সিস্টেম চালু হয়। এভাবে আস্তে আস্তে ইন্টারনেট ভোটিং এবং মেশিনের মাধ্যমে তথা ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের প্রচলন সারা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে পাঞ্চকার্ডের মাধ্যমে ভোট প্রদানের রূপরেখা আবিষ্কারের প্রেক্ষাপটে ১৯৬০-এর দশকে ইলেকট্রনিক ভোটিং পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা করা শুরু হয়। ১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে এ পদ্ধতি অনুসৃত হওয়ার মাধ্যমে দৃশ্যত প্রথমবারের মতো ই-ভোটিং এবং ইভিএম ব্যবহারের চিত্র চোখে পড়ে।

ইলেকট্রনিক ভোটিং আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট প্রয়োগ বা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের স্বীয় মতামত প্রতিফলনের অন্যতম মাধ্যম। ভোট প্রয়োগে মেশিন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অনুসৃত হয় বিধায় সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নামে পরিচিত। এর অন্য নাম ই-ভোটিং। ইলেকট্রনিক প্রক্রিয়ায় এটি একাধারে সঠিকভাবে ভোট প্রয়োগ ও দ্রুততার সঙ্গে ভোট গণনা করতে সক্ষম। ভোট প্রয়োগের ক্ষেত্রে উন্নত এবং উচ্চতর প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে অতি দ্রুত ব্যালট পেপার গণনা করা সম্ভবপর। একই সঙ্গে অক্ষম ভোটাররাও তাদের ভোট সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন। ভোট গ্রহণের স্থান হিসাবে ভোটকেন্দ্রেই মূলত ইভিএম ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও টেলিফোন ব্যবহার করেও ই-ভোটিং প্রয়োগ করা সম্ভব। নতুনতর অপটিক্যাল স্ক্যান ভোটিং পদ্ধতিতে পাঞ্চকার্ড, অপটিক্যাল স্ক্যানার ব্যবহৃত হয়। এ পদ্ধতিতে একজন ভোটার ব্যালট পেপার চিহ্নিত করে ভোট প্রদান করেন।

ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট প্রচলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে অনেক সমালোচনা শুরু হয়। এটিকে খুব সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায় বলে বিতর্ক আছে। তাই বিভিন্ন দেশে ইভিএম পদ্ধতি ইতোমধ্যেই বাতিল করা হয়েছে; এমনকি আইন করেও কোনো কোনো দেশে এ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে এক সময় ইভিএম/ই-ভোটিং পদ্ধতিতে ভোট পরিচালনা করা হতো; কিন্তু নানারকম অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবং জনসাধারণের আপত্তির মুখে ২০০৬ সালে তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছে ডাচ সরকার। ২০০৯ সালে আয়ারল্যান্ড এবং ইতালি এ পদ্ধতি বাতিল ঘোষণা করেছে। ২০০৯ সালে জার্মান সরকার এ পদ্ধতি বাতিল করে এবং রুল জারি করে যে-দ্রুততা কিংবা দক্ষতার চেয়ে স্বচ্ছতা বেশি জরুরি। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সেও এ পদ্ধতি ইতোমধ্যে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে ইলেকট্রনিক ভোটিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই প্রবল বিতর্কের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ইভিএম এবং ডিআরই পদ্ধতিতে ই-ভোটিংয়ের ফলে নির্বাচনি কারচুপির ব্যাপক আশঙ্কা রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

আমাদের দেশেও বিগত কয়েকটি নির্বাচনে প্রযুক্তিনির্ভর এ ইভিএম পদ্ধতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। তবুও উচ্চ আদালত থেকে ইভিএম দিয়ে ভোট গণনার পক্ষে রায় আছে। বলা বাহুল্য, ১ ফেব্রুয়ারির (২০২০) ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আঙুলের ছাপ দিয়েও কোনো কোনো ভোটার তার প্রিয় প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেননি। অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের আঙুলের ছাপ মেলেনি কিংবা ভোট দিতেও অনেক সময় লেগেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেই আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোট দিতে পারেননি ওই নির্বাচনে। পরে ন্যাশনাল আইডি কার্ড দিয়ে তিনি তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। যুক্তফ্রন্ট নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনেরও একই অবস্থা হয়েছে। আধাঘণ্টা চেষ্টা করেও ইভিএম দিয়ে আঙুলের ছাপ মেলাতে পারেননি। পরে প্রিসাইডিং অফিসারের সহায়তায় ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তিনি তার ভোট প্রয়োগ করেন। গুলশানের মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে মেয়রপ্রার্থী তাবিথ আউয়ালের মা নাসরিন আউয়াল ভোট দিতে যাওয়ার মুহূর্তে মেশিন হ্যাং হয়ে যায়। এরপর প্রায় ৪০ মিনিট চেষ্টা করে কর্মকর্তারা মেশিনটিকে সচল করেন এবং তিনি তার ভোট দেন। সিনিয়র সাংবাদিক জনাব আবু সাঈদ খানও তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। এ ধরনের আরও অনেক অনিয়মের কথা বিভিন্ন মিডিয়া ও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সাধারণ ভোটাররা।

তবুও প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। এর সঠিক ব্যবহার ভোট পদ্ধতিকে ত্বরান্বিত করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটিকে নিয়ন্ত্রণ করবে যারা, তারা দেশের গণতন্ত্র এবং ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখার ওপর কতটা জোর দিচ্ছে, এটাই হলো প্রশ্ন। মানুষ তার ভোটটি গোপনে সঠিক স্থানে প্রয়োগ করার সুযোগ পেলে তবেই ইভিএমের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, নির্বাচন কমিশন ফিরে পাবে তাদের হারানো সম্মান এবং ঐতিহ্য। বিগত দিনের নির্বাচনে ভোট গ্রহণের হার খুবই নিুমুখী। এর কারণ ইভিএম একটি নতুন যন্ত্র বা পদ্ধতি কিংবা এটি বিকল হয়ে যাওয়া নয়; বরং এটিকে নিজের ইচ্ছেমতো চলতে না দেওয়া এবং নির্বাচনি পরিবেশ না থাকাই এর মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম যন্ত্রটি সঠিকভাবে চলবে, যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত প্রতিস্থাপন করা হবে আরেকটি ইভিএম এবং সার্বিক পরিবেশ নির্বাচনমুখী হবে-এমনটিই আশা করছে সমগ্র দেশবাসী।

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার : অধ্যাপক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (‘ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেম’ বিষয়ে পিএইচডি করেছেন)

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন