জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নাকি জীবনের সঙ্গে অবিরত যুদ্ধ?
jugantor
জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নাকি জীবনের সঙ্গে অবিরত যুদ্ধ?

  মনজু আরা বেগম  

১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার তৃতীয় ঢেউ আবার প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে। বিগত প্রায় দুটি বছর ধরে করোনাভাইরাস কর্তৃক সৃষ্ট সংকট আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির করে দিয়েছে। ২০২০-এর মার্চ থেকে শুরু হওয়া কোভিডের প্রকোপ ২০২১-এর শেষ দিকটায় একটু কমে আসতে শুরু করায় মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল। কিন্তু বোধহয় শেষ রক্ষা হলো না। এ বছরের শুরু থেকে করোনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিগত দুটি বছরেই মার্চ মাস থেকে এর তীব্রতা শুরু হয়েছিল। এবারে কী হবে, তা ভবিতব্যই জানে।

১৯৭১ থেকে ২০২১-স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, সার্বজনীন শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, প্রবাসী আয় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছিল অবিরত। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশের অর্থনীতি সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ও বিশ্বে ৪১তম স্থান করে নিয়েছে। আমাদের দারিদ্র্যের হার ২০০৭ সালে ছিল ৪৩ শতাংশ। বর্তমানে তা ২০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ অতিমারি ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। এ ভাইরাসের ফলে বিশ্বের অনেক দেশেই অর্থনৈতিক সংকোচন ঘটেছে। প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়েছে। কলকারখানা, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী বেকার হয়েছে। শিল্প, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ অথবা হ্রাস পাওয়ার ফলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

দারিদ্র্যের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যাদের আয় কমে গেছে, তারা যে কী পরিমাণ আর্থিক দুর্দশায় পড়েছেন, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। তবে এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আর্থিক দৈন্যের মধ্যে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করছেন। একদিকে করোনাযুদ্ধে পর্যুদস্ত আমাদের জীবন; অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দফায় দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবন একবারেই ওষ্ঠাগত। আগামী এপ্রিলে পবিত্র রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। রমজানকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বাজারে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে সেসব পণ্য-যেগুলো রোজাদাররা মূল্য বাড়লেও স্বল্প পরিমাণে হলেও কেনে। এটা এদেশে একটা চিরাচরিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। পবিত্র রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে বেশি বেশি নামাজ-রোজা কায়েম আর দান-খয়রাত করার কথা বলেছেন-এ কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। তারপরও সবকিছু জেনেশুনে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এ মাসে সর্বাধিক মুনাফা লাভের আশায় রমজান শুরুর অনেক আগে থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে পত্র পত্রিকায় বহু লেখালেখি আলোচনা-সমালোচনা করেও কোনো লাভ হয় না এবং এবারেও এর ব্যতিক্রম হবে না, তার আলামত এখন থেকেই শুরু হয়েছে।

রমজানের প্রায় তিন মাস বাকি থাকলেও এখন থেকেই সেসব দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা রোজাদাররা মূল্য বৃদ্ধি পেলেও স্বল্প পরিমাণে হলেও কিনবে। রোজার সময়ে দাম বাড়ালে ভোক্তারা বা পত্রপত্রিকা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যাতে লেখালেখি করতে না পারে, সেজন্য এখন থেকেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে বিরাট সংখ্যক এ জনগোষ্ঠী কতটা বিপাকে পড়তে পারে, তা কি আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় একবারও ভেবে দেখেছেন? চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, মসলা ও গরুর মাংসের দাম তো এমনিতেই বাড়তি ছিল; সেটি এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম একটু কমতির দিকে থাকলেও সেটির দামও এখন বেড়ে গেছে। পেঁয়াজ ছাড়া আমরা তরকারি রান্নার কথা ভাবতেও পারি না। রমজান মাসে তো পেঁয়াজের কদর আরও বেড়ে যায়। নতুন পেঁয়াজ নামলেও এর মূল্যসহ সব পণ্যের মূল্য দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে। দেশে একবার যে পণ্যের মূল্য বাড়ে, সেটি আর কমতির দিকে সহজে আসতে চায় না। বিরাট একটি সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে; কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ নেই বা বলা যায়, তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এ আইনে ভেজাল ও নিুমানের পণ্য সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এসব বিষয় দেখভাল করলেও সংস্থাটি চরম জনবল সংকটে কাজ করছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। রাজধানীতে বসবাসরত দুই কোটি মানুষের বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা (১৫.০৯.২১, যুগান্তর)। সংস্থাটির বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে ২৪০ জনবলের মধ্যে ১৭ কোটি ভোক্তার অধিকার রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র ১০৮ জন কর্মকর্তা। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দ্বারা এত বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ কিভাবে সম্ভব? রোজা শুরুর এখনো প্রায় তিন মাস বাকি; তার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্য ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। লাগামহীনভাবে তা বেড়েই চলেছে। এটা শুধু এ বছরই নয়, দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে আসছে; কিন্তু এর কোনো প্রতিকার আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

বাজারকে শক্তহাতে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অর্থাৎ বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এ অবস্থা চলতেই থাকবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে তদারকি কার্যক্রম চালালে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম কম দেখালেও প্রকৃত অর্থে তারা এত বেশি দাম বাড়ায় যে, মুনাফার একটা বড় অংশ হাতে রেখে নামমাত্র মূল্য কমানো হয়। এতে ভোক্তারা মোটেও উপকৃত হন না। এ দেশের খেটে খাওয়া নিুআয়ের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করতে গিয়ে যদি আয়ের সিংহভাগই শেষ হয়ে যায়, তাহলে জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, পানি, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ হবে কিভাবে? করোনা মহামারির চিকিৎসাই বা হবে কিভাবে? হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, আমাদের আয় বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে; কিন্তু কাদের বেড়েছে? একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে অর্থ সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। সানেমের গবেষণায় বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ২০.৫ শতাংশ। করোনার কারণে এ হার বেড়ে প্রায় ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সিপিডি’র তথ্যানুসারে, করোনায় ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। এদের অধিকাংশই শ্রমজীবী। অথচ করোনাকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকলেও বিগত এক বছরে দেশে নতুন কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার।

করোনার প্রভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়লেও ধনিক শ্রেণির সংখ্যাও সমহারে বেড়েছে; অর্থাৎ এ সময়ে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে। ফলে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও আয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে বিরাট বৈষম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাড়তি অর্থ গুনতে গিয়ে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজান মাসেও যদি এরকম অবস্থা থাকে, তাহলে রোজাদাররা ভীষণ অসুবিধায় পড়বেন। এ ছাড়াও এত উচ্চ মূল্য দিয়ে আমরা যেসব খাবার কিনে খাচ্ছি, তার প্রায় ৯০-৯৫ ভাগই ভেজালে ভরা বিষাক্ত সব খাদ্য। এমন কোনো খাদ্য নেই, যেখানে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়। ভেজাল, নোংরা, পচা-বাসি খাদ্যে সৃদৃশ্য মোড়ক লাগিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আমরাও জেনেশুনে বিষপান করছি। দুর্নীতি আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জিডিপি কিংবা মাথাপিছু আয় যতই বাড়ুক, তাতে কোনো লাভ হবে না।

সরকারকে শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তা করতে না পারলে সরকার দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স অবস্থায় আনার যত প্রচেষ্টাই গ্রহণ করুক না কেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন ঘটবে না। কাজেই আর দেরি না করে এই করোনাকালে কড়া নজরদারির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com

জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নাকি জীবনের সঙ্গে অবিরত যুদ্ধ?

 মনজু আরা বেগম 
১৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনার তৃতীয় ঢেউ আবার প্রবল বেগে ধেয়ে আসছে। বিগত প্রায় দুটি বছর ধরে করোনাভাইরাস কর্তৃক সৃষ্ট সংকট আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির করে দিয়েছে। ২০২০-এর মার্চ থেকে শুরু হওয়া কোভিডের প্রকোপ ২০২১-এর শেষ দিকটায় একটু কমে আসতে শুরু করায় মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে শুরু করেছিল। কিন্তু বোধহয় শেষ রক্ষা হলো না। এ বছরের শুরু থেকে করোনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিগত দুটি বছরেই মার্চ মাস থেকে এর তীব্রতা শুরু হয়েছিল। এবারে কী হবে, তা ভবিতব্যই জানে।

১৯৭১ থেকে ২০২১-স্বাধীনতার এই পঞ্চাশ বছরে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। আমাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছে। মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, সার্বজনীন শিক্ষা, শিশুমৃত্যুর হার, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি, প্রবাসী আয় ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশ এগিয়ে গেছে এবং যাচ্ছিল অবিরত। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে। দেশের অর্থনীতি সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ও বিশ্বে ৪১তম স্থান করে নিয়েছে। আমাদের দারিদ্র্যের হার ২০০৭ সালে ছিল ৪৩ শতাংশ। বর্তমানে তা ২০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ অতিমারি ব্যক্তি পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ের অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে। এ ভাইরাসের ফলে বিশ্বের অনেক দেশেই অর্থনৈতিক সংকোচন ঘটেছে। প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়েছে। কলকারখানা, দোকানপাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি বিরাট সংখ্যক জনগোষ্ঠী বেকার হয়েছে। শিল্প, কলকারখানাসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ অথবা হ্রাস পাওয়ার ফলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে।

দারিদ্র্যের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। যাদের আয় কমে গেছে, তারা যে কী পরিমাণ আর্থিক দুর্দশায় পড়েছেন, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানেন। তবে এটি নিশ্চিত করে বলা যায়, এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আর্থিক দৈন্যের মধ্যে তাদের দৈনন্দিন জীবন নির্বাহ করছেন। একদিকে করোনাযুদ্ধে পর্যুদস্ত আমাদের জীবন; অন্যদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দফায় দফায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে জনজীবন একবারেই ওষ্ঠাগত। আগামী এপ্রিলে পবিত্র রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। রমজানকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী বাজারে প্রতিটি পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়, বিশেষ করে সেসব পণ্য-যেগুলো রোজাদাররা মূল্য বাড়লেও স্বল্প পরিমাণে হলেও কেনে। এটা এদেশে একটা চিরাচরিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। পবিত্র রমজান মাস সিয়াম সাধনার মাস। আত্মশুদ্ধির মাস। এ মাসে আল্লাহতায়ালা প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে বেশি বেশি নামাজ-রোজা কায়েম আর দান-খয়রাত করার কথা বলেছেন-এ কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। তারপরও সবকিছু জেনেশুনে ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এ মাসে সর্বাধিক মুনাফা লাভের আশায় রমজান শুরুর অনেক আগে থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। এ নিয়ে পত্র পত্রিকায় বহু লেখালেখি আলোচনা-সমালোচনা করেও কোনো লাভ হয় না এবং এবারেও এর ব্যতিক্রম হবে না, তার আলামত এখন থেকেই শুরু হয়েছে।

রমজানের প্রায় তিন মাস বাকি থাকলেও এখন থেকেই সেসব দ্রব্যের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা রোজাদাররা মূল্য বৃদ্ধি পেলেও স্বল্প পরিমাণে হলেও কিনবে। রোজার সময়ে দাম বাড়ালে ভোক্তারা বা পত্রপত্রিকা মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে যাতে লেখালেখি করতে না পারে, সেজন্য এখন থেকেই দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে বিরাট সংখ্যক এ জনগোষ্ঠী কতটা বিপাকে পড়তে পারে, তা কি আমাদের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় একবারও ভেবে দেখেছেন? চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, চিনি, আটা, ময়দা, সয়াবিন তেল, মসলা ও গরুর মাংসের দাম তো এমনিতেই বাড়তি ছিল; সেটি এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম একটু কমতির দিকে থাকলেও সেটির দামও এখন বেড়ে গেছে। পেঁয়াজ ছাড়া আমরা তরকারি রান্নার কথা ভাবতেও পারি না। রমজান মাসে তো পেঁয়াজের কদর আরও বেড়ে যায়। নতুন পেঁয়াজ নামলেও এর মূল্যসহ সব পণ্যের মূল্য দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে আছে। দেশে একবার যে পণ্যের মূল্য বাড়ে, সেটি আর কমতির দিকে সহজে আসতে চায় না। বিরাট একটি সিন্ডিকেট বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন আছে; কিন্তু তার কোনো প্রয়োগ নেই বা বলা যায়, তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এ আইনে ভেজাল ও নিুমানের পণ্য সরবরাহের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির কথা বলা থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এসব বিষয় দেখভাল করলেও সংস্থাটি চরম জনবল সংকটে কাজ করছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। রাজধানীতে বসবাসরত দুই কোটি মানুষের বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র পাঁচজন কর্মকর্তা (১৫.০৯.২১, যুগান্তর)। সংস্থাটির বিদ্যমান জনবল কাঠামোতে ২৪০ জনবলের মধ্যে ১৭ কোটি ভোক্তার অধিকার রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে বাজার তদারকিতে রয়েছেন মাত্র ১০৮ জন কর্মকর্তা। এত স্বল্পসংখ্যক জনবল দ্বারা এত বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণ কিভাবে সম্ভব? রোজা শুরুর এখনো প্রায় তিন মাস বাকি; তার আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্য ব্যবসায়ীরা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। লাগামহীনভাবে তা বেড়েই চলেছে। এটা শুধু এ বছরই নয়, দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলে আসছে; কিন্তু এর কোনো প্রতিকার আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

বাজারকে শক্তহাতে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে অর্থাৎ বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এ অবস্থা চলতেই থাকবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে তদারকি কার্যক্রম চালালে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম কম দেখালেও প্রকৃত অর্থে তারা এত বেশি দাম বাড়ায় যে, মুনাফার একটা বড় অংশ হাতে রেখে নামমাত্র মূল্য কমানো হয়। এতে ভোক্তারা মোটেও উপকৃত হন না। এ দেশের খেটে খাওয়া নিুআয়ের সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ক্রয় করতে গিয়ে যদি আয়ের সিংহভাগই শেষ হয়ে যায়, তাহলে জীবন বাঁচানোর প্রয়োজনীয় ওষুধ, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাড়িভাড়া, পানি, বিদ্যুৎসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ হবে কিভাবে? করোনা মহামারির চিকিৎসাই বা হবে কিভাবে? হ্যাঁ, এটা সত্যি যে, আমাদের আয় বাড়ছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে; কিন্তু কাদের বেড়েছে? একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে অর্থ সম্পদ কুক্ষিগত হচ্ছে। সানেমের গবেষণায় বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ২০.৫ শতাংশ। করোনার কারণে এ হার বেড়ে প্রায় ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সিপিডি’র তথ্যানুসারে, করোনায় ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। এদের অধিকাংশই শ্রমজীবী। অথচ করোনাকালে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির থাকলেও বিগত এক বছরে দেশে নতুন কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার।

করোনার প্রভাবে দারিদ্র্যের হার বাড়লেও ধনিক শ্রেণির সংখ্যাও সমহারে বেড়েছে; অর্থাৎ এ সময়ে ধনীরা আরও ধনী হয়েছে। ফলে শ্রেণিবৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও আয়ের ক্ষেত্রে রয়েছে বিরাট বৈষম্য। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বাড়তি অর্থ গুনতে গিয়ে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমজান মাসেও যদি এরকম অবস্থা থাকে, তাহলে রোজাদাররা ভীষণ অসুবিধায় পড়বেন। এ ছাড়াও এত উচ্চ মূল্য দিয়ে আমরা যেসব খাবার কিনে খাচ্ছি, তার প্রায় ৯০-৯৫ ভাগই ভেজালে ভরা বিষাক্ত সব খাদ্য। এমন কোনো খাদ্য নেই, যেখানে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে না। বেঁচে থাকার জন্য খেতে হয়। ভেজাল, নোংরা, পচা-বাসি খাদ্যে সৃদৃশ্য মোড়ক লাগিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আমরাও জেনেশুনে বিষপান করছি। দুর্নীতি আমাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জিডিপি কিংবা মাথাপিছু আয় যতই বাড়ুক, তাতে কোনো লাভ হবে না।

সরকারকে শক্ত হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। তা করতে না পারলে সরকার দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্স অবস্থায় আনার যত প্রচেষ্টাই গ্রহণ করুক না কেন, পরিস্থিতির কোনো উন্নয়ন ঘটবে না। কাজেই আর দেরি না করে এই করোনাকালে কড়া নজরদারির মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

মনজু আরা বেগম : লেখক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক, সাবেক মহাব্যবস্থাপক, বিসিক

monjuara2006@yahoo.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন