প্রহসনমূলক বিচারের প্রথম বলি মহারাজ নন্দকুমার
jugantor
প্রহসনমূলক বিচারের প্রথম বলি মহারাজ নন্দকুমার

  বিমল সরকার  

১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কেবল সৌজন্যবোধ আর শিষ্টাচার নয়, উপকারীর উপকার স্বীকার করা কিংবা কারও কাছ থেকে কোনো রকমের সুবিধা বা দান গ্রহণ করার পর এর বিনিময়ে প্রতিদান করাটাকে অনেকেই কর্তব্য বলে বিবেচনা করেন। ইতিহাসে এমন বড় বড় অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। বাংলার একসময়কার পুতুল নবাব মীরজাফরের কথাই ধরা যাক। চক্রান্তের ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বঞ্চিত করে তাকে সরিয়ে ইংরেজরা মীরজাফরকে মসনদে বসায়। এর বিনিময়ে নতুন নবাব মীরজাফর অর্থ, সম্পদ আর সুযোগ-সুবিধা গুনতে গুনতে ফতুর হওয়ার উপক্রম হন; কিন্তু ইংরেজদের প্রতি তার ‘ঋণ পরিশোধ’ যেন আর শেষই হতে চায় না।

ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৩২-১৮১৮) বাংলা তথা ব্রিটিশ-ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল (১৭৭২-১৭৮৫)। প্রায় দুইশ বছরের ইতিহাসে আর কোনো ইংরেজ শাসকের পক্ষে উপমহাদেশে এত দীর্ঘদিন, টানা ১৩ বছর দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য হয়নি। হেস্টিংসের শাসনামলেই রেগুলেটিং অ্যাক্টের আওতায় উপমহাদেশের প্রথম সুপ্রিমকোর্ট স্থাপিত হয় কলকাতায় ১৭৭৩ সালে। আর সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত করা হয় স্যার এলিজাহ ইম্পেকে (১৭৩২-১৮০৯)। এলিজাহ ইম্পেই উপমহাদেশের প্রথম সুপ্রিমকোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি। এ সময় ইম্পের বয়স ৪৩।

মীরজাফরের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার নাবালকপুত্র নাজিমউদ্দৌলাকে বাংলার নবাব পদে অধিষ্ঠিত করে। নন্দকুমার (১৭০৫-১৭৭৫) ছিলেন ওই সময় নবাবের দেওয়ান। নন্দকুমারের সঙ্গে হেস্টিংসের সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় এক জালিয়াতি মামলায় প্রধান বিচারপতি ইম্পের সহযোগিতায় তাকে (নন্দকুমার) ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়। ভারতে ইংরেজ শাসনের অধীনে নন্দকুমারই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ফাঁসির আসামি হিসাবে বলি হন। এমন কথা প্রচলিত আছে যে, এ মিথ্যা প্রহসনমূলক মামলায় হেস্টিংসকে সহযোগিতা করার জন্য নির্লজ্জভাবে পক্ষপাতিত্ব করেছেন স্বয়ং প্রধান বিচারপতি এলিজাহ ইম্পে। যার ফলে নন্দকুমারের ফাঁসির ওই ঘটনাকে সমসাময়িক ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদগণ ‘বিচারিক হত্যা’ (Judicial murder) বলে অভিহিত করেছেন। বিচারিক হত্যা মানে ‘আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া’।

হেস্টিংস ও ইম্পে ছিলেন বাল্যবন্ধু; বাল্য ও কৈশোরে ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে একসঙ্গে তারা পড়াশোনা করেছেন। ওয়ারেন হেস্টিংস তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু সুলিভান-এর কাছে লেখা চিঠিতে একবার উল্লেখ করেছিলেন, স্যার এলিজাহ ইম্পে একদিন তার নিরাপত্তা, ভাগ্য, সম্মান ও মর্যাদা সবকিছুই রক্ষা করে তাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছিলেন, ডানিং-এর কাছেও এক চিঠিতে ইম্পে লিখেছিলেন-‘আমি একদিন হেস্টিংসকে সাহায্য করেছিলাম; সেজন্য তিনি এখন ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করেই আমাকে সাহায্য করতে বাধ্য’ নন্দকুমার ছিলেন নবাবি আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের দেওয়ান। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬৪ সালে নন্দকুমারকে ‘মহারাজা’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ১৭৬৫ সালে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক বর্ধমান, নদীয়া ও হুগলির দেওয়ানি লাভ করেন। এর আগে ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর হিসাবে এসবের দায়িত্বে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর জেনারেল হয়ে এলে নন্দকুমার তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। এ বিষয়টিকে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসসহ বাংলার সুপ্রিম কাউন্সিলের বেশিরভাগ সদস্য (চারজন সদস্যের মধ্যে তিনজন-ফ্রান্সিস, ক্লেভারিং ও মনসন; একমাত্র সদস্য বারওয়েল হেস্টিংসের পক্ষে ছিলেন) সমর্থন করেন। তবে হেস্টিংস কাউন্সিলের আনীত সব অভিযোগ নাকচ করে দেন। এরপর ১৭৭৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পালটা অভিযোগ আনেন। প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পের অধীনে তার মামলা চলে। ছল, বল আর কৌশল অবলম্বন করায় মামলায় নন্দকুমার দোষী সাব্যস্ত হন। ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট কলকাতায় গঙ্গা উপকূলে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

ব্রিটিশরা আর যাই হোক, নিজ দেশে আইনকে খুব সম্মান করে। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পেসহ হেস্টিংসকে ‘আইনি হত্যা’র অপরাধে অভিযুক্ত করে। প্রখ্যাত বাগ্মী এডমান্ড বার্ক এবং পরে লর্ড মেকলে তাদের (হেস্টিংস ও ইম্পে) বিরুদ্ধে এ অভিযোগটি উত্থাপন করেছিলেন। তবে এ মামলার তদারকিতে থাকা স্যার জেমস স্টিফেন হেস্টিংসের পক্ষেই সওয়াল করেন এবং বলেন, ইম্পে ন্যায় ও সততার সঙ্গেই মামলাটির নিষ্পত্তি করেছেন।

হেস্টিংসের বিরুদ্ধে মহারাজ নন্দকুমারের অভিযোগ ছিল, হেস্টিংস তাকে দশ লাখ টাকার এক-তৃতীয়াংশ ঘুস দিতে চেয়েছিলেন। নন্দকুমার এও দাবি করেন, হেস্টিংসের বিরুদ্ধে তার অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ একটি চিঠি রয়েছে তার কাছে। ইংল্যান্ডের আইনে (১৭২৯ সালে প্রণীত) জালিয়াতি একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য হেস্টিংসের বৈরীজন ফ্রান্সিসের চেষ্টা ও বার্ক এবং মেকলের আগ্রহে মামলাটি ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে। ইম্পে অভিযোগ থেকে আগেই রেহাই পান। ইমপিচ করা হয় হেস্টিংসকে। ১৭৮৫ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে গেলে ১৭৮৭ থেকে ১৭৯৫ সাল পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে শেষপর্যন্ত রেহাই পান। ওই মামলার ঘটনা হেস্টিংসের সারাজীবনের অর্জনকে ম্লান করে দেয়। ১৮১৮ সালে তিনি মারা যান।

প্রায় পঁচাত্তর বছর গত হয়ে গেল ইংরেজরা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। নন্দকুমারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও মামলা এবং ফাঁসিকে ঘিরে উপমহাদেশের বিচারব্যবস্থায় অনেক কথা অনেকভাবে এখনো আলোচিত হয়। প্রায় আড়াইশ বছর আগের ঘটনা হলেও আলোচনা হয় ‘আইনি হত্যা’, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান’, ‘আগে ফাঁসি পরে বিচার’ এমনসব বিষয় নিয়ে। বিচারের নামে প্রহসন আজও থেমে নেই। এ নিয়ে দুনিয়ার দেশে দেশে বিবেকবান মানুষের কতই না আক্ষেপ! এমন ঘটনার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হক কর্তৃক সে দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো (৪ এপ্রিল ১৯৭৯)। নেতি-ইতি যাই হোক, এ মামলা ও বিচারে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস, প্রধান বিচারপতি এলিজাহ ইম্পে এবং বার্ক-মেকলের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

প্রহসনমূলক বিচারের প্রথম বলি মহারাজ নন্দকুমার

 বিমল সরকার 
১৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কেবল সৌজন্যবোধ আর শিষ্টাচার নয়, উপকারীর উপকার স্বীকার করা কিংবা কারও কাছ থেকে কোনো রকমের সুবিধা বা দান গ্রহণ করার পর এর বিনিময়ে প্রতিদান করাটাকে অনেকেই কর্তব্য বলে বিবেচনা করেন। ইতিহাসে এমন বড় বড় অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। বাংলার একসময়কার পুতুল নবাব মীরজাফরের কথাই ধরা যাক। চক্রান্তের ফলে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বঞ্চিত করে তাকে সরিয়ে ইংরেজরা মীরজাফরকে মসনদে বসায়। এর বিনিময়ে নতুন নবাব মীরজাফর অর্থ, সম্পদ আর সুযোগ-সুবিধা গুনতে গুনতে ফতুর হওয়ার উপক্রম হন; কিন্তু ইংরেজদের প্রতি তার ‘ঋণ পরিশোধ’ যেন আর শেষই হতে চায় না।

ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৩২-১৮১৮) বাংলা তথা ব্রিটিশ-ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল (১৭৭২-১৭৮৫)। প্রায় দুইশ বছরের ইতিহাসে আর কোনো ইংরেজ শাসকের পক্ষে উপমহাদেশে এত দীর্ঘদিন, টানা ১৩ বছর দায়িত্ব পালন করার সৌভাগ্য হয়নি। হেস্টিংসের শাসনামলেই রেগুলেটিং অ্যাক্টের আওতায় উপমহাদেশের প্রথম সুপ্রিমকোর্ট স্থাপিত হয় কলকাতায় ১৭৭৩ সালে। আর সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিযুক্ত করা হয় স্যার এলিজাহ ইম্পেকে (১৭৩২-১৮০৯)। এলিজাহ ইম্পেই উপমহাদেশের প্রথম সুপ্রিমকোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি। এ সময় ইম্পের বয়স ৪৩।

মীরজাফরের মৃত্যুর পর ইংরেজরা তার নাবালকপুত্র নাজিমউদ্দৌলাকে বাংলার নবাব পদে অধিষ্ঠিত করে। নন্দকুমার (১৭০৫-১৭৭৫) ছিলেন ওই সময় নবাবের দেওয়ান। নন্দকুমারের সঙ্গে হেস্টিংসের সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় এক জালিয়াতি মামলায় প্রধান বিচারপতি ইম্পের সহযোগিতায় তাকে (নন্দকুমার) ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো হয়। ভারতে ইংরেজ শাসনের অধীনে নন্দকুমারই প্রথম ব্যক্তি, যিনি ফাঁসির আসামি হিসাবে বলি হন। এমন কথা প্রচলিত আছে যে, এ মিথ্যা প্রহসনমূলক মামলায় হেস্টিংসকে সহযোগিতা করার জন্য নির্লজ্জভাবে পক্ষপাতিত্ব করেছেন স্বয়ং প্রধান বিচারপতি এলিজাহ ইম্পে। যার ফলে নন্দকুমারের ফাঁসির ওই ঘটনাকে সমসাময়িক ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদগণ ‘বিচারিক হত্যা’ (Judicial murder) বলে অভিহিত করেছেন। বিচারিক হত্যা মানে ‘আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া’।

হেস্টিংস ও ইম্পে ছিলেন বাল্যবন্ধু; বাল্য ও কৈশোরে ওয়েস্টমিনিস্টার স্কুলে একসঙ্গে তারা পড়াশোনা করেছেন। ওয়ারেন হেস্টিংস তার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু সুলিভান-এর কাছে লেখা চিঠিতে একবার উল্লেখ করেছিলেন, স্যার এলিজাহ ইম্পে একদিন তার নিরাপত্তা, ভাগ্য, সম্মান ও মর্যাদা সবকিছুই রক্ষা করে তাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছিলেন, ডানিং-এর কাছেও এক চিঠিতে ইম্পে লিখেছিলেন-‘আমি একদিন হেস্টিংসকে সাহায্য করেছিলাম; সেজন্য তিনি এখন ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করেই আমাকে সাহায্য করতে বাধ্য’ নন্দকুমার ছিলেন নবাবি আমলে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের দেওয়ান। মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম ১৭৬৪ সালে নন্দকুমারকে ‘মহারাজা’ উপাধি প্রদান করেছিলেন। ১৭৬৫ সালে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃক বর্ধমান, নদীয়া ও হুগলির দেওয়ানি লাভ করেন। এর আগে ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর হিসাবে এসবের দায়িত্বে ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।

১৭৭৩ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস বাংলার গভর্নর জেনারেল হয়ে এলে নন্দকুমার তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। এ বিষয়টিকে স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিসসহ বাংলার সুপ্রিম কাউন্সিলের বেশিরভাগ সদস্য (চারজন সদস্যের মধ্যে তিনজন-ফ্রান্সিস, ক্লেভারিং ও মনসন; একমাত্র সদস্য বারওয়েল হেস্টিংসের পক্ষে ছিলেন) সমর্থন করেন। তবে হেস্টিংস কাউন্সিলের আনীত সব অভিযোগ নাকচ করে দেন। এরপর ১৭৭৪ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস নন্দকুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পালটা অভিযোগ আনেন। প্রধান বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পের অধীনে তার মামলা চলে। ছল, বল আর কৌশল অবলম্বন করায় মামলায় নন্দকুমার দোষী সাব্যস্ত হন। ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট কলকাতায় গঙ্গা উপকূলে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।

ব্রিটিশরা আর যাই হোক, নিজ দেশে আইনকে খুব সম্মান করে। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট প্রধান বিচারপতি এলিজা ইম্পেসহ হেস্টিংসকে ‘আইনি হত্যা’র অপরাধে অভিযুক্ত করে। প্রখ্যাত বাগ্মী এডমান্ড বার্ক এবং পরে লর্ড মেকলে তাদের (হেস্টিংস ও ইম্পে) বিরুদ্ধে এ অভিযোগটি উত্থাপন করেছিলেন। তবে এ মামলার তদারকিতে থাকা স্যার জেমস স্টিফেন হেস্টিংসের পক্ষেই সওয়াল করেন এবং বলেন, ইম্পে ন্যায় ও সততার সঙ্গেই মামলাটির নিষ্পত্তি করেছেন।

হেস্টিংসের বিরুদ্ধে মহারাজ নন্দকুমারের অভিযোগ ছিল, হেস্টিংস তাকে দশ লাখ টাকার এক-তৃতীয়াংশ ঘুস দিতে চেয়েছিলেন। নন্দকুমার এও দাবি করেন, হেস্টিংসের বিরুদ্ধে তার অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ একটি চিঠি রয়েছে তার কাছে। ইংল্যান্ডের আইনে (১৭২৯ সালে প্রণীত) জালিয়াতি একটি গুরুতর অপরাধ এবং এর একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কাউন্সিলের প্রভাবশালী সদস্য হেস্টিংসের বৈরীজন ফ্রান্সিসের চেষ্টা ও বার্ক এবং মেকলের আগ্রহে মামলাটি ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে। ইম্পে অভিযোগ থেকে আগেই রেহাই পান। ইমপিচ করা হয় হেস্টিংসকে। ১৭৮৫ সালে তিনি স্বদেশে ফিরে গেলে ১৭৮৭ থেকে ১৭৯৫ সাল পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে শেষপর্যন্ত রেহাই পান। ওই মামলার ঘটনা হেস্টিংসের সারাজীবনের অর্জনকে ম্লান করে দেয়। ১৮১৮ সালে তিনি মারা যান।

প্রায় পঁচাত্তর বছর গত হয়ে গেল ইংরেজরা উপমহাদেশ ছেড়ে চলে গেছে। নন্দকুমারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও মামলা এবং ফাঁসিকে ঘিরে উপমহাদেশের বিচারব্যবস্থায় অনেক কথা অনেকভাবে এখনো আলোচিত হয়। প্রায় আড়াইশ বছর আগের ঘটনা হলেও আলোচনা হয় ‘আইনি হত্যা’, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় মৃত্যুদণ্ড প্রদান’, ‘আগে ফাঁসি পরে বিচার’ এমনসব বিষয় নিয়ে। বিচারের নামে প্রহসন আজও থেমে নেই। এ নিয়ে দুনিয়ার দেশে দেশে বিবেকবান মানুষের কতই না আক্ষেপ! এমন ঘটনার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হক কর্তৃক সে দেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো (৪ এপ্রিল ১৯৭৯)। নেতি-ইতি যাই হোক, এ মামলা ও বিচারে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস, প্রধান বিচারপতি এলিজাহ ইম্পে এবং বার্ক-মেকলের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে আছে।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন