আফগানিস্তানে দুর্ভিক্ষ কি আসন্ন?
jugantor
আফগানিস্তানে দুর্ভিক্ষ কি আসন্ন?

  একেএম শামসুদ্দিন  

১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আফগানিস্তানে দুর্ভিক্ষ কি আসন্ন?

চার মাসেরও বেশি সময়ের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসর পশ্চিমা শক্তিগুলো সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তালেবানদের হাতে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সে দেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্য নিয়ে যেন ছিনিমিনি খেলা চলছে।

বর্তমানে দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট শুরু হয়েছে। আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। চার দশকের যুদ্ধ ও দুঃখ-দুর্দশার পর দেশটি একটি গুরুতর বিপর্যয়ের মুখোমুখি। গত আগস্টে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সে দেশের মানুষ বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো সে দেশ ছেড়ে আসার পর নিজেদের অভিবাসন নীতি শিথিল করে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বিমানে করে তাদের সমর্থক বেশ কয়েক হাজার ভাগ্যবান আফগান নাগরিকদের উদ্ধার করে নিয়ে গেলেও আফগানিস্তানের বর্তমান সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে রেখেছে তারা।

সন্ত্রাস দমনের নামে যে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে এড়িয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল, গত ২০ বছর তাদের সমর্থিত সরকার বসিয়ে সে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতা করে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হওয়ার পর সেই যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই বিভিন্ন দেশের সরকার আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত রাখে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তানে কোটি কোটি ডলারের সহায়তা বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে আফগানদের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ রেখেছে তারা। আফগানিস্তানে অবস্থানকালে বিগত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা মিলে সন্ত্রাসবিরোধী যেসব আইনকানুন করেছিল, সে আইনকানুনের দোহাই দিয়ে এসব ব্যবস্থা আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে অর্থ সংকট যেমন বেড়েছে, তেমনই তীব্র খাদ্য ঘাটতিও দেখা দিয়েছে দেশটিতে।

ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নেওয়ার পর থেকেই দীর্ঘ চার দশক ধরে যুদ্ধ-বিগ্রহে জর্জরিত দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি এখন নতুন মহাসংকটে পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশসহ জাতিসংঘের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এতই নিচে নেমে গেছে যে, সেখানকার চাকরিজীবী, শিক্ষক, পৌর কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া যাচ্ছে না। দেশের আমদানি-রফতানি বন্ধ আছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশটিতে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এই শীত মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ ও উন্নত দেশগুলো নিজেদের দরজা বন্ধ করে রাখলে আফগান জনগণ আরও নিঃস্ব হয়ে যাবে এবং অচিরেই তারা দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে। নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তারা এ কাজ করতে পারে না।

আফগানিস্তানে ক্ষমতায় এখন যারাই থাকুক না কেন, উন্নত বিশ্বের এই নোংরা রাজনীতির খেলার বিরূপ ফল যাতে আফগান গরিব জনগণকে না ফেলে, সেদিকে দৃষ্টি রাখা সবারই কর্তব্য। এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতার জন্য ওই দেশের ওপর যখন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, তখন সেদেশের সরকার বা ক্ষমতাসীনরা যত না সমস্যায় পড়ে, তার চেয়ে ঢের বেশি দুর্ভোগে নিপতিত হয় দেশটির জনগণ। বিশ্বজুড়েই এখন রাজনৈতিক নেতাদের খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষ। ফিলিস্তিনি ও অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের মতোই বিশ্ব রাজনীতির মারপ্যাঁচের শিকার হয়েছে আফগান জনগণ। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে এসব অসহায় মানুষকে। গত চার দশকে আফগান জনগণের ভোগান্তির ছোট্ট একটি খতিয়ান দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যদিও পুরোনো তথ্য, তবু নতুন করে উল্লেখ করতে হচ্ছে। কথিত আছে, ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের সময় ৬ লাখ, মতান্তরে ২০ লাখ বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের দখলদারিত্বের সময় হতাহতের সংখ্যা দাঁয়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮৭ জন। ২০ বছরে ২ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে যুদ্ধ ও সামরিক সরঞ্জামাদির পিছনে। এই ২০ বছরের খবরদারির ফলাফলের কথা যদি বলি, তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে হয় ‘শূন্য’। রাজনীতির দাবার ঘুঁটির চালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আফগান জনগণ। গত ২০ বছরে ৬০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ধাক্কায় যদি দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাহলে না খেয়ে কত লাখ মানুষ যে মারা যাবে, আরও কত লাখ মানুষ যে উদ্বাস্তু হয়ে দেশছাড়া হবে, তা অনুমান করাও মুশকিল।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই মূলত দায়ী করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া এই বিপর্যয় নতুন নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের এই হিংস্র ও আগ্রাসী ভূমিকা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে কত লাখ মানুষকে তারা হত্যা করেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষকে তারা হত্যা করেছে। এখানেই শেষ নয়, পারমাণবিক বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আরও ৪ লাখ ৭২ হাজার নিরীহ মানুষ মারা গেছে। ভিয়েতনামে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ৩২ লাখ ভিয়েতনামি নাগরিক তাদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। ভিয়েতনামে একুশ বছরে একের পর এক বিভিন্ন হারবিসাইড বোমা, রাসায়নিক বিস্ফোরক দিয়ে গোটা দেশটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় আট কোটি লিটারেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিস্ফোরক বর্ষণ করে ভিয়েতনামের পরিবেশ চরম ভারসাম্যহীন করে ফেলে, যার খেসারত তাদের আজও দিতে হচ্ছে।

পুরো পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে পরিমাণ বোমা ফেলা হয়েছিল, আমেরিকা তার চারগুণের বেশি বোমা ভিয়েতনামে ফেলেছে। সে সময় তারা, ডাই-অক্সিন এজেন্ট নামের এক ধরনের জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যার ফলে ভিয়েতনামে আজও মানসিক ভারসাম্যহীন, বিকলাঙ্গ শিশু জন্মাচ্ছে। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী শুধু লাওসেই ২ মিলিয়ন টন বোমা নিক্ষেপ করে, যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপ-এশিয়ায় সম্মিলিতভাবে ২.১ মিলিয়ন বোমা বর্ষণের সমানুপাতিক। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী কম-বেশি ৬ থেকে ৭ লাখ ইরাকিকে হত্যা করে। ২০ বছর মোড়লিপনা করে আমেরিকা এখন মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে আফগানদের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে; এর শেষ পরিণতি কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। খাবারের অভাব দূর করতে তারা পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে বেশকিছু পরিমাণ গম পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। এরই মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি সরকার আমলে ভারতের দেওয়া গম ৪০ হাজার মানুষকে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির অংশ হিসাবে রাজধানী কাবুলে প্রতিদিন ১০ কেজি করে গম দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে অনুদান হিসাবে ১৮ টন গম আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে এবং আরও ৩৭ টন গম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতের কাছ থেকে ৫৫ টনেরও বেশি গম পাওয়ার আশা করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে কাজের বিনিময় খাদ্য কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়ে দেশজুড়ে শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। তালেবানের অর্ন্তবর্তী সরকার ইতোমধ্যেই ৫৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন আফগান মুদ্রার বাজেট অনুমোদন দিয়েছে। এই বাজেট অবশ্য ২০২২ সালের প্রথম তিন মাসের জন্য ঘোষিত হয়েছে। তাদের এই বাজেটে অবশ্য বিদেশি সাহায্যের কথা উল্লেখ নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ১৩ জানিয়ারি তালেবান সরকারের বাজেট অনুমোদনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের প্রতি আফগানিস্তানের জব্দ তহবিল অবমুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আশার কথা, অর্থনৈতিক অবরোধ থাকা সত্ত্বেও আসন্ন মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশ্বের ২০টি প্রধান অর্থনৈতিক জোট জি-২০ একমত হয়েছে। এই জোট ১০০ কোটি ইউরো তহবিল সংগ্রহের জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তালেবান সরকারকে না দিয়ে আফগানিস্তানে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে, তাদের মাধ্যমে তারা এ অর্থ ব্যয় করবে। জাতিসংঘও ৫০০ কোটি ডলারের তহবিলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। এই অর্থের মধ্যে ৪৪০ কোটি ডলার শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, ওষুধ ও নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করা হবে। বাকি অর্থ দেশটির পাঁচ প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় গ্রহণকারী ৫৭ লাখ বাস্তুচ্যুত আফগান নাগরিকের জরুরি সহায়তার জন্য প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এ মুহূর্তে দেশটিতে কারা ক্ষমতায় আছে, তা না দেখে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক মহলের একগুঁয়েমিপনার জন্য আফগান জনগণকেই কষ্টভোগ করতে হবে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে দায়িত্বশীল দেশগুলোকে বিশ্ববিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

একথা ঠিক, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তালেবানদের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপও কম দায়ী নয়। এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য ক্ষমতা দখলের সময় তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরই। ক্ষমতা গ্রহণের পর নারীর ক্ষমতায়নসহ মানবাধিকার উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে, অন্যান্য মুসলিম দেশের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বাস্তবধর্মী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না করে একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে যদি তালেবানরা বসে থাকে, তাহলে আসন্ন মানবিক বিপর্যয় গুরুতর আকার ধারণ করবে এবং এক্ষেত্রে তালেবানরা তাদের দায় এড়াতে পারবে না। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলকেও আফগানিস্তানের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান দেখিয়ে আরও নমনীয় ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে উভয় পক্ষ যদি একটি গ্রহণযোগ্য মীমাংসায় আসতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আফগানিস্তানের দুর্ভিক্ষ কেউ ঠেকাতে পারবে না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

আফগানিস্তানে দুর্ভিক্ষ কি আসন্ন?

 একেএম শামসুদ্দিন 
১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আফগানিস্তানে দুর্ভিক্ষ কি আসন্ন?
ফাইল ছবি

চার মাসেরও বেশি সময়ের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসর পশ্চিমা শক্তিগুলো সশস্ত্র বাহিনী প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর দেশটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় তালেবানদের হাতে। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সে দেশের সাধারণ জনগণের ভাগ্য নিয়ে যেন ছিনিমিনি খেলা চলছে।

বর্তমানে দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট শুরু হয়েছে। আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এখন খাদ্য সংকটে ভুগছে। চার দশকের যুদ্ধ ও দুঃখ-দুর্দশার পর দেশটি একটি গুরুতর বিপর্যয়ের মুখোমুখি। গত আগস্টে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই সে দেশের মানুষ বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো সে দেশ ছেড়ে আসার পর নিজেদের অভিবাসন নীতি শিথিল করে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে বিমানে করে তাদের সমর্থক বেশ কয়েক হাজার ভাগ্যবান আফগান নাগরিকদের উদ্ধার করে নিয়ে গেলেও আফগানিস্তানের বর্তমান সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের দরজা বন্ধ করে রেখেছে তারা।

সন্ত্রাস দমনের নামে যে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে এড়িয়ে আফগানিস্তান দখল করে নিয়েছিল, গত ২০ বছর তাদের সমর্থিত সরকার বসিয়ে সে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতা করে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হওয়ার পর সেই যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধেই বিভিন্ন দেশের সরকার আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট স্থগিত রাখে। একই সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তানে কোটি কোটি ডলারের সহায়তা বন্ধ করে দেয়। একই সঙ্গে আফগানদের সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধ রেখেছে তারা। আফগানিস্তানে অবস্থানকালে বিগত ২০ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা মিলে সন্ত্রাসবিরোধী যেসব আইনকানুন করেছিল, সে আইনকানুনের দোহাই দিয়ে এসব ব্যবস্থা আফগানিস্তানের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। ফলে অর্থ সংকট যেমন বেড়েছে, তেমনই তীব্র খাদ্য ঘাটতিও দেখা দিয়েছে দেশটিতে।

ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করে নেওয়ার পর থেকেই দীর্ঘ চার দশক ধরে যুদ্ধ-বিগ্রহে জর্জরিত দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি এখন নতুন মহাসংকটে পড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশসহ জাতিসংঘের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞায় দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এতই নিচে নেমে গেছে যে, সেখানকার চাকরিজীবী, শিক্ষক, পৌর কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া যাচ্ছে না। দেশের আমদানি-রফতানি বন্ধ আছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবা মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দেশটিতে এখন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এই শীত মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই দেশের মোট জনসংখ্যার ৯৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ ও উন্নত দেশগুলো নিজেদের দরজা বন্ধ করে রাখলে আফগান জনগণ আরও নিঃস্ব হয়ে যাবে এবং অচিরেই তারা দুর্ভিক্ষের মুখে পড়বে। নীতি ও নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে তারা এ কাজ করতে পারে না।

আফগানিস্তানে ক্ষমতায় এখন যারাই থাকুক না কেন, উন্নত বিশ্বের এই নোংরা রাজনীতির খেলার বিরূপ ফল যাতে আফগান গরিব জনগণকে না ফেলে, সেদিকে দৃষ্টি রাখা সবারই কর্তব্য। এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, উন্নত বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র কোনো রাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বৈরিতার জন্য ওই দেশের ওপর যখন অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, তখন সেদেশের সরকার বা ক্ষমতাসীনরা যত না সমস্যায় পড়ে, তার চেয়ে ঢের বেশি দুর্ভোগে নিপতিত হয় দেশটির জনগণ। বিশ্বজুড়েই এখন রাজনৈতিক নেতাদের খেলার পুতুলে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষ। ফিলিস্তিনি ও অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের মতোই বিশ্ব রাজনীতির মারপ্যাঁচের শিকার হয়েছে আফগান জনগণ। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে এসব অসহায় মানুষকে। গত চার দশকে আফগান জনগণের ভোগান্তির ছোট্ট একটি খতিয়ান দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। যদিও পুরোনো তথ্য, তবু নতুন করে উল্লেখ করতে হচ্ছে। কথিত আছে, ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্বের সময় ৬ লাখ, মতান্তরে ২০ লাখ বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের দখলদারিত্বের সময় হতাহতের সংখ্যা দাঁয়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৮৭ জন। ২০ বছরে ২ দশমিক ৩১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে যুদ্ধ ও সামরিক সরঞ্জামাদির পিছনে। এই ২০ বছরের খবরদারির ফলাফলের কথা যদি বলি, তাহলে নির্দ্বিধায় বলতে হয় ‘শূন্য’। রাজনীতির দাবার ঘুঁটির চালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আফগান জনগণ। গত ২০ বছরে ৬০ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ধাক্কায় যদি দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, তাহলে না খেয়ে কত লাখ মানুষ যে মারা যাবে, আরও কত লাখ মানুষ যে উদ্বাস্তু হয়ে দেশছাড়া হবে, তা অনুমান করাও মুশকিল।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকেই মূলত দায়ী করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া এই বিপর্যয় নতুন নয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের এই হিংস্র ও আগ্রাসী ভূমিকা পর্যালোচনা করলেই বোঝা যাবে কত লাখ মানুষকে তারা হত্যা করেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ২ লাখ ১৪ হাজার মানুষকে তারা হত্যা করেছে। এখানেই শেষ নয়, পারমাণবিক বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আরও ৪ লাখ ৭২ হাজার নিরীহ মানুষ মারা গেছে। ভিয়েতনামে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে ৩২ লাখ ভিয়েতনামি নাগরিক তাদের হাতে মৃত্যুবরণ করেছে। ভিয়েতনামে একুশ বছরে একের পর এক বিভিন্ন হারবিসাইড বোমা, রাসায়নিক বিস্ফোরক দিয়ে গোটা দেশটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনী ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রায় আট কোটি লিটারেরও বেশি বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বিস্ফোরক বর্ষণ করে ভিয়েতনামের পরিবেশ চরম ভারসাম্যহীন করে ফেলে, যার খেসারত তাদের আজও দিতে হচ্ছে।

পুরো পৃথিবীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে পরিমাণ বোমা ফেলা হয়েছিল, আমেরিকা তার চারগুণের বেশি বোমা ভিয়েতনামে ফেলেছে। সে সময় তারা, ডাই-অক্সিন এজেন্ট নামের এক ধরনের জৈব রাসায়নিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছিল, যার ফলে ভিয়েতনামে আজও মানসিক ভারসাম্যহীন, বিকলাঙ্গ শিশু জন্মাচ্ছে। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী শুধু লাওসেই ২ মিলিয়ন টন বোমা নিক্ষেপ করে, যা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপ-এশিয়ায় সম্মিলিতভাবে ২.১ মিলিয়ন বোমা বর্ষণের সমানুপাতিক। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী কম-বেশি ৬ থেকে ৭ লাখ ইরাকিকে হত্যা করে। ২০ বছর মোড়লিপনা করে আমেরিকা এখন মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে আফগানদের বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে; এর শেষ পরিণতি কী হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। খাবারের অভাব দূর করতে তারা পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা করে বেশকিছু পরিমাণ গম পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। এরই মধ্যে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি সরকার আমলে ভারতের দেওয়া গম ৪০ হাজার মানুষকে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির অংশ হিসাবে রাজধানী কাবুলে প্রতিদিন ১০ কেজি করে গম দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পাকিস্তান ইতোমধ্যে অনুদান হিসাবে ১৮ টন গম আফগানিস্তানে পাঠিয়েছে এবং আরও ৩৭ টন গম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতের কাছ থেকে ৫৫ টনেরও বেশি গম পাওয়ার আশা করছে। সবকিছু ঠিক থাকলে কাজের বিনিময় খাদ্য কর্মসূচির পরিধি বাড়িয়ে দেশজুড়ে শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। তালেবানের অর্ন্তবর্তী সরকার ইতোমধ্যেই ৫৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন আফগান মুদ্রার বাজেট অনুমোদন দিয়েছে। এই বাজেট অবশ্য ২০২২ সালের প্রথম তিন মাসের জন্য ঘোষিত হয়েছে। তাদের এই বাজেটে অবশ্য বিদেশি সাহায্যের কথা উল্লেখ নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ১৩ জানিয়ারি তালেবান সরকারের বাজেট অনুমোদনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংকের প্রতি আফগানিস্তানের জব্দ তহবিল অবমুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।

আশার কথা, অর্থনৈতিক অবরোধ থাকা সত্ত্বেও আসন্ন মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সহায়তা দেওয়ার জন্য বিশ্বের ২০টি প্রধান অর্থনৈতিক জোট জি-২০ একমত হয়েছে। এই জোট ১০০ কোটি ইউরো তহবিল সংগ্রহের জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। তালেবান সরকারকে না দিয়ে আফগানিস্তানে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা কাজ করছে, তাদের মাধ্যমে তারা এ অর্থ ব্যয় করবে। জাতিসংঘও ৫০০ কোটি ডলারের তহবিলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। এই অর্থের মধ্যে ৪৪০ কোটি ডলার শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, ওষুধ ও নিরাপত্তার জন্য ব্যয় করা হবে। বাকি অর্থ দেশটির পাঁচ প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় গ্রহণকারী ৫৭ লাখ বাস্তুচ্যুত আফগান নাগরিকের জরুরি সহায়তার জন্য প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে। আফগানিস্তানের পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এ মুহূর্তে দেশটিতে কারা ক্ষমতায় আছে, তা না দেখে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে আন্তর্জাতিক মহলের একগুঁয়েমিপনার জন্য আফগান জনগণকেই কষ্টভোগ করতে হবে। এ পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে দায়িত্বশীল দেশগুলোকে বিশ্ববিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।

একথা ঠিক, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তালেবানদের প্রতিশ্রুতির বরখেলাপও কম দায়ী নয়। এ বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য ক্ষমতা দখলের সময় তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরই। ক্ষমতা গ্রহণের পর নারীর ক্ষমতায়নসহ মানবাধিকার উন্নয়নে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের বর্তমান বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে, অন্যান্য মুসলিম দেশের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি বাস্তবধর্মী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না করে একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে যদি তালেবানরা বসে থাকে, তাহলে আসন্ন মানবিক বিপর্যয় গুরুতর আকার ধারণ করবে এবং এক্ষেত্রে তালেবানরা তাদের দায় এড়াতে পারবে না। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলকেও আফগানিস্তানের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্মান দেখিয়ে আরও নমনীয় ও সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে উভয় পক্ষ যদি একটি গ্রহণযোগ্য মীমাংসায় আসতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আফগানিস্তানের দুর্ভিক্ষ কেউ ঠেকাতে পারবে না।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন