ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হীরকজয়ন্তী
jugantor
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হীরকজয়ন্তী

  ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি  

১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হীরকজয়ন্তী

দেশের মহাসড়কের ইতিহাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এ মহাসড়ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে, ইতিহাসের বিচারে এ বছর সড়কটির হীরকজয়ন্তীর বছর। এ মহাসড়ক শুধু যে দুটি প্রধান শহরকে সংযুক্ত করেছে তাই নয়, একইসঙ্গে মেঘনার দুই পাড়ে বিচ্ছিন্ন দুই সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধও তৈরি করেছে। মেঘনার দুই পাড়ে দুই ভিন্ন জনপদ সড়কপথে যুক্ত হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাধ্যমে। শের শাহের সড়ক-ই-আজম (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যার বাজারে এসে সমাপ্ত হয়েছে আর চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড এসে শেষ হয়েছে দাউদকান্দিতে। সড়ক-ই-আজম তৈরি হয়েছে শের শাহের আমলে, মধ্যযুগে আর গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড ইংরেজদের আমলে, আধুনিককালে।

বৈদ্যার বাজার ও দাউদকান্দির মধ্যবর্তী গজারিয়ার উপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মিত হয় পাকিস্তান আমলে। কালপরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে ওঠে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মধ্যযুগে সামরিক অভিযান এই সড়কের রূপরেখা তৈরি করে, ইংরেজ আমলে বিচ্ছিন্ন সড়কগুলো সমন্বিত রূপ নেয়। ইংরেজ আমলে ছিল কাঁচা রাস্তা, পাকিস্তান আমলে এর পাকাকরণ সম্পন্ন হয়। ইংরেজ আমলের হস্তীচালিত রাস্তা পাকিস্তান আমলে মোটরগাড়ি চলাচলের যোগ্য হয়ে ওঠে। ১৯৬৩ সালে রোরো ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ আমলে ফেরি সার্ভিস তুলে দিয়ে সেতু নির্মাণ ও বহু লাইনবিশিষ্ট করে একে নিরবচ্ছিন্ন করা হয়।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতামুখী সড়ক দাউদকান্দি-কুমিল্লা মহাসড়কের ব্যবহার শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। প্রশাসনিক কারণে কোম্পানি আমলের শুরুতেই দাউদকান্দি-কুমিল্লা সড়কের উন্মোচন জরুরি হয়ে পড়ে। কলকাতা ও চট্টগ্রামের দেওয়ানি লাভের পর (১৭৬০) দুটি সমুদ্রবন্দরকে সড়কপথে সংযুক্ত করার প্রয়োজন অনুভূত হয় প্রথম; ঢাকা ও ত্রিপুরার দেওয়ানি লাভের পর (১৭৬৫) এটা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। ততদিনে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ নির্মিত ‘হদ্দীনের পথ’-এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। মধ্যযুগের প্রথম মহাসড়কের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আধুনিক কালে শুরু হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের কাজ। সামরিক চলাচল ও ডাক যোগাযোগের দিকে লক্ষ্য রেখে সড়ক উন্নয়নে মনোনিবেশ করে ইংরেজ সরকার। দুটি সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করার মানসে প্রথম তারা শের শাহের সড়ক-ই-আজমকে পুনর্জাগরিত করে এর নাম দেয় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এ সড়ক যুক্ত করে তাদের রাজধানী কলকাতাকে। ঢাকা থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত যে সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়, তাকে বলা যায় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ আর দাউদকান্দি-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম সড়কটিকে বলা যায় দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণ।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো কারণেও সড়ক নির্মাণ ত্বরান্বিত হয় বলে মনে হয়। ১৭৮৬ সালে জন শোরের প্রস্তাব অনুসারে বাংলাকে বিভক্ত করা হয় ২৩টি জেলা কালেক্টরিতে। তখন গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে বন্যা, ফসলহানি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে গোমতীর অববাহিকাকে নিয়ে শুরু হয় নতুন জেলা তৈরির কাজ। ‘কুমিল্লা শহরের দুঃখ’ বলে পরিচিত গোমতী নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে সঙ্গমস্থল পর্যন্ত, কুমিল্লা থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত প্রথমে সম্ভবত নির্মিত হয় উঁচু বাঁধ বা কাঁচা রাস্তা। সে সময় কাঁচা রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন জমিদার ও ধনিক শ্রেণির লোকেরা।

কোম্পানি আমলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রকৃত অর্থে কোনো ভালো রাস্তা ছিল না। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়। ব্রিটিশরাজের আমলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক আয়োজনের সুবিধার্থে দ্রুত যোগাযোগক্ষম সড়কব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে। কোম্পানি আমলে ১৮৪৮ সালে সারা বাংলায় রাস্তার দৈর্ঘ্য ছিল ২,৫৮৯ মাইল, ব্রিটিশরাজের আমলে ১৯০০ সালে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৪০,০০০ মাইলে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে পাকা রাস্তার পরিমাণ ছিল ৬০ মাইল, কাঁচা রাস্তার পরিমাণ ১,৩৯৫ মাইল আর চট্টগ্রামে ছিল পাকা রাস্তা ১৫ মাইল, কাঁচা রাস্তা ১,৩৬১ মাইল।

সিপাহি বিপ্লবের পর দাউদকান্দি থানা প্রতিষ্ঠিত হয় (১৮৫৮)। একই সময়ে দাউদকান্দি-কুমিল্লা বরাবর ঢাকা-চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপিত হয় (ডিসেম্বর, ১৮৫৮)। ১৮৬৭-১৮৬৮ সালে যোগাযোগ খাতে, বিশেষ করে সড়ক নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়। ১৮৭০-১৮৭১ সালের বার্ষিক রিপোর্টে ভারতের পূর্বাঞ্চলে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উল্লেখ দেখা যায়। তার মধ্যে দুটি সড়ক বেশি গুরুত্বের দাবিদার। এ দুটি সড়ক হল গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সড়ক-ই-আজম) এবং দাউদকান্দি-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম সড়ক (চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড)।

সিপাহি বিপ্লবের পর এ সড়কের গুরুত্ব অনুভব করে দাউদকান্দি থেকে ফেনী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয় কোতোয়ালি (১৮৫৮), বড় কামতা (১৮৫৮), জগন্নাথদীঘি থানা (১৮৫৮)। পরে এগুলোকে পুনর্গঠিত করে বড় কামতার নাম দেওয়া হয় চান্দিনা (১৮৭৬), জগন্নাথদীঘির নাম দেওয়া হয় চৌদ্দগ্রাম (১৮৮৯)। ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৬ সালে, ছাগলনাইয়া ১৮৭২ সালে। পরে ছাগলনাইয়াকে ত্রিপুরা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নোয়াখালীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৮৭৫ সালে।

পাকিস্তান আমলে ঢাকামুখী সড়ক ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গ সরকার প্রধান বন্দর, রেলপথ ও যোগাযোগের কেন্দ্রস্থলে পাটজাত সামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শিল্পাঞ্চল নির্মাণে অগ্রসর হয়। যুক্তফ্রন্ট সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে গৃহীত হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ। কিন্তু সে সময় সোনারগাঁও-দাউদকান্দি সংযোগসড়ক ছিল না-পারাপারের জন্য এ পথে চলত নৌকা। শের শাহের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এসে শেষ হয়েছে গজারিয়ার পশ্চিমে আর চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড এসে শেষ হয়েছে গজারিয়ার পূর্বে। এ দুটি ঐতিহাসিক সড়ককে গজারিয়ার উপর দিয়ে সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে যুক্তফ্রন্ট সরকার। এ সময়ে গজারিয়া আসনের এমএলএ ছিলেন মনির হোসেন জাহাঙ্গীর।

দুটি সভ্যতার মিলন সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ ১৯৫৬ সালে গৃহীত হলেও এর জরিপ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। জব্বার ইঞ্জিনিয়ার গজারিয়ার পূর্ব-পশ্চিমে চেইন টেনে সড়কের গতিপথ নির্ধারণ করেন। এটি হোসেন্দি, বালুয়াকান্দি, ভাটেরচর, আনারপুরা, ভিটিকান্দি, আলীপুরা, পুরান বাউসিয়া, মধ্যম বাউসিয়া, চর বাউসিয়া হয়ে দাউদকান্দিতে গিয়ে সমাপ্ত হয়। গজারিয়ার উপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে। এটা মেঘনা ঘাট থেকে মোগরাপাড়া-কেওডালা-শীতলক্ষ্যা হয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হয় (বর্তমান কাচপুরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মিত হয় আরও পরে)। নারায়ণগঞ্জ থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত সড়কপথে লক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী নদীতে চলাচল করত তিনটি ৮৫ ফুট লম্বা ছোট ফেরি, যার গতিবেগ ছিল ৫ নটিক্যাল মাইল।

পাকিস্তান আমলের প্রধান অর্জন রাস্তা পাকাকরণ। ব্রিটিশ শাসনামলের শেষদিকে যেখানে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আনুমানিক ৪৮০ কিলোমিটারের কম পাকা রাস্তা এবং ৩,৬০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ছিল, সেখানে পূর্ব পাকিস্তান আমলের শেষদিকে পাকা রাস্তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩,৮৬০ কিলোমিটারে। সড়ক পরিবহণ সংস্থা যাত্রা শুরু করলে (১৯৬১) ফোর্ড কোম্পানির বাস চালু করা হয় মহাসড়কে। মার্কিন পুঁজি অনুপ্রবেশের যুগে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পথে চলতে শুরু করে লাল বাসগুলো।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ রাস্তাটি ছিল হাতি চলাচলার উপযোগী। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশে ঘোড়ার গাড়ি চলার সুবিধার্থে ইট-সুরকির রাস্তার প্রচলন হয়। তখন পর্যন্ত দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম সড়কটি পাকা করার পরিবেশ তৈরি হয়নি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মোটরগাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে পিচঢালা সড়কের ব্যবহার শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাশক্তি ইংরেজদের স্থান দখল করে নেয় আমেরিকা। ইংরেজদের লৌহপাত বাহন রেলওয়ের স্থান দখল করে আমেরিকানদের পিচঢালা পথ। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক নীতিতে নির্মিত হয়েছিল দর্শনা-জগতী রেলওয়ে, পক্ষান্তরে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকাকেন্দ্রিক নীতিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু হয় আমেরিকান কোম্পানির গাড়ি। ১৯৬৩ সালে রোরো ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়।

বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৭ সালে কাচপুর শীতলক্ষ্যা সেতু চালু হয়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ আমলে ফেরি সার্ভিস তুলে দিয়ে সেতু নির্মাণ ও বহু লাইনবিশিষ্ট করে একে নিরবচ্ছিন্ন করা হয়। মেঘনা সেতু ১৯৯১ সালে, গোমতী সেতু ১৯৯৫ সালে চালু হলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার সূচনা হয়। নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা চালুই বাংলাদেশ পর্বের প্রধান অর্জন।

ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি : লেখক ও গবেষক

mahmoodnasirjahangiri@gmail.com

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হীরকজয়ন্তী

 ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি 
১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের হীরকজয়ন্তী
ফাইল ছবি

দেশের মহাসড়কের ইতিহাসে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। এ মহাসড়ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে, ইতিহাসের বিচারে এ বছর সড়কটির হীরকজয়ন্তীর বছর। এ মহাসড়ক শুধু যে দুটি প্রধান শহরকে সংযুক্ত করেছে তাই নয়, একইসঙ্গে মেঘনার দুই পাড়ে বিচ্ছিন্ন দুই সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধও তৈরি করেছে। মেঘনার দুই পাড়ে দুই ভিন্ন জনপদ সড়কপথে যুক্ত হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাধ্যমে। শের শাহের সড়ক-ই-আজম (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) নারায়ণগঞ্জের বৈদ্যার বাজারে এসে সমাপ্ত হয়েছে আর চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড এসে শেষ হয়েছে দাউদকান্দিতে। সড়ক-ই-আজম তৈরি হয়েছে শের শাহের আমলে, মধ্যযুগে আর গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড ইংরেজদের আমলে, আধুনিককালে।

বৈদ্যার বাজার ও দাউদকান্দির মধ্যবর্তী গজারিয়ার উপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মিত হয় পাকিস্তান আমলে। কালপরিক্রমায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে গড়ে ওঠে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মধ্যযুগে সামরিক অভিযান এই সড়কের রূপরেখা তৈরি করে, ইংরেজ আমলে বিচ্ছিন্ন সড়কগুলো সমন্বিত রূপ নেয়। ইংরেজ আমলে ছিল কাঁচা রাস্তা, পাকিস্তান আমলে এর পাকাকরণ সম্পন্ন হয়। ইংরেজ আমলের হস্তীচালিত রাস্তা পাকিস্তান আমলে মোটরগাড়ি চলাচলের যোগ্য হয়ে ওঠে। ১৯৬৩ সালে রোরো ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ আমলে ফেরি সার্ভিস তুলে দিয়ে সেতু নির্মাণ ও বহু লাইনবিশিষ্ট করে একে নিরবচ্ছিন্ন করা হয়।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতামুখী সড়ক দাউদকান্দি-কুমিল্লা মহাসড়কের ব্যবহার শুরু হয় ব্রিটিশ আমলে। প্রশাসনিক কারণে কোম্পানি আমলের শুরুতেই দাউদকান্দি-কুমিল্লা সড়কের উন্মোচন জরুরি হয়ে পড়ে। কলকাতা ও চট্টগ্রামের দেওয়ানি লাভের পর (১৭৬০) দুটি সমুদ্রবন্দরকে সড়কপথে সংযুক্ত করার প্রয়োজন অনুভূত হয় প্রথম; ঢাকা ও ত্রিপুরার দেওয়ানি লাভের পর (১৭৬৫) এটা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে ওঠে। ততদিনে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ নির্মিত ‘হদ্দীনের পথ’-এর প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। মধ্যযুগের প্রথম মহাসড়কের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আধুনিক কালে শুরু হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের কাজ। সামরিক চলাচল ও ডাক যোগাযোগের দিকে লক্ষ্য রেখে সড়ক উন্নয়নে মনোনিবেশ করে ইংরেজ সরকার। দুটি সমুদ্রবন্দরকে সংযুক্ত করার মানসে প্রথম তারা শের শাহের সড়ক-ই-আজমকে পুনর্জাগরিত করে এর নাম দেয় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড। এ সড়ক যুক্ত করে তাদের রাজধানী কলকাতাকে। ঢাকা থেকে শ্রীহট্ট পর্যন্ত যে সড়ক যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়, তাকে বলা যায় গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের পূর্বমুখী সম্প্রসারণ আর দাউদকান্দি-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম সড়কটিকে বলা যায় দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণ।

প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো কারণেও সড়ক নির্মাণ ত্বরান্বিত হয় বলে মনে হয়। ১৭৮৬ সালে জন শোরের প্রস্তাব অনুসারে বাংলাকে বিভক্ত করা হয় ২৩টি জেলা কালেক্টরিতে। তখন গোমতী নদীর বাঁধ ভেঙে বন্যা, ফসলহানি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে গোমতীর অববাহিকাকে নিয়ে শুরু হয় নতুন জেলা তৈরির কাজ। ‘কুমিল্লা শহরের দুঃখ’ বলে পরিচিত গোমতী নদীর উৎপত্তিস্থল থেকে সঙ্গমস্থল পর্যন্ত, কুমিল্লা থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত প্রথমে সম্ভবত নির্মিত হয় উঁচু বাঁধ বা কাঁচা রাস্তা। সে সময় কাঁচা রাস্তা নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন জমিদার ও ধনিক শ্রেণির লোকেরা।

কোম্পানি আমলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রকৃত অর্থে কোনো ভালো রাস্তা ছিল না। ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিপ্লবের পর সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়। ব্রিটিশরাজের আমলে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক আয়োজনের সুবিধার্থে দ্রুত যোগাযোগক্ষম সড়কব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকে। কোম্পানি আমলে ১৮৪৮ সালে সারা বাংলায় রাস্তার দৈর্ঘ্য ছিল ২,৫৮৯ মাইল, ব্রিটিশরাজের আমলে ১৯০০ সালে এর দৈর্ঘ্য দাঁড়ায় ৪০,০০০ মাইলে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে পাকা রাস্তার পরিমাণ ছিল ৬০ মাইল, কাঁচা রাস্তার পরিমাণ ১,৩৯৫ মাইল আর চট্টগ্রামে ছিল পাকা রাস্তা ১৫ মাইল, কাঁচা রাস্তা ১,৩৬১ মাইল।

সিপাহি বিপ্লবের পর দাউদকান্দি থানা প্রতিষ্ঠিত হয় (১৮৫৮)। একই সময়ে দাউদকান্দি-কুমিল্লা বরাবর ঢাকা-চট্টগ্রাম টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপিত হয় (ডিসেম্বর, ১৮৫৮)। ১৮৬৭-১৮৬৮ সালে যোগাযোগ খাতে, বিশেষ করে সড়ক নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়। ১৮৭০-১৮৭১ সালের বার্ষিক রিপোর্টে ভারতের পূর্বাঞ্চলে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের উল্লেখ দেখা যায়। তার মধ্যে দুটি সড়ক বেশি গুরুত্বের দাবিদার। এ দুটি সড়ক হল গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সড়ক-ই-আজম) এবং দাউদকান্দি-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম সড়ক (চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড)।

সিপাহি বিপ্লবের পর এ সড়কের গুরুত্ব অনুভব করে দাউদকান্দি থেকে ফেনী পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয় কোতোয়ালি (১৮৫৮), বড় কামতা (১৮৫৮), জগন্নাথদীঘি থানা (১৮৫৮)। পরে এগুলোকে পুনর্গঠিত করে বড় কামতার নাম দেওয়া হয় চান্দিনা (১৮৭৬), জগন্নাথদীঘির নাম দেওয়া হয় চৌদ্দগ্রাম (১৮৮৯)। ফেনী মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭৬ সালে, ছাগলনাইয়া ১৮৭২ সালে। পরে ছাগলনাইয়াকে ত্রিপুরা জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে নোয়াখালীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৮৭৫ সালে।

পাকিস্তান আমলে ঢাকামুখী সড়ক ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ববঙ্গ সরকার প্রধান বন্দর, রেলপথ ও যোগাযোগের কেন্দ্রস্থলে পাটজাত সামগ্রী প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শিল্পাঞ্চল নির্মাণে অগ্রসর হয়। যুক্তফ্রন্ট সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালে পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে গৃহীত হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণের উদ্যোগ। কিন্তু সে সময় সোনারগাঁও-দাউদকান্দি সংযোগসড়ক ছিল না-পারাপারের জন্য এ পথে চলত নৌকা। শের শাহের গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড এসে শেষ হয়েছে গজারিয়ার পশ্চিমে আর চিটাগাং গ্রেট ট্রাঙ্ক রোড এসে শেষ হয়েছে গজারিয়ার পূর্বে। এ দুটি ঐতিহাসিক সড়ককে গজারিয়ার উপর দিয়ে সংযুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে যুক্তফ্রন্ট সরকার। এ সময়ে গজারিয়া আসনের এমএলএ ছিলেন মনির হোসেন জাহাঙ্গীর।

দুটি সভ্যতার মিলন সড়কটি নির্মাণের উদ্যোগ ১৯৫৬ সালে গৃহীত হলেও এর জরিপ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে। জব্বার ইঞ্জিনিয়ার গজারিয়ার পূর্ব-পশ্চিমে চেইন টেনে সড়কের গতিপথ নির্ধারণ করেন। এটি হোসেন্দি, বালুয়াকান্দি, ভাটেরচর, আনারপুরা, ভিটিকান্দি, আলীপুরা, পুরান বাউসিয়া, মধ্যম বাউসিয়া, চর বাউসিয়া হয়ে দাউদকান্দিতে গিয়ে সমাপ্ত হয়। গজারিয়ার উপর দিয়ে সংযোগ সড়ক নির্মিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে। এটা মেঘনা ঘাট থেকে মোগরাপাড়া-কেওডালা-শীতলক্ষ্যা হয়ে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হয় (বর্তমান কাচপুরের সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মিত হয় আরও পরে)। নারায়ণগঞ্জ থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত সড়কপথে লক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী নদীতে চলাচল করত তিনটি ৮৫ ফুট লম্বা ছোট ফেরি, যার গতিবেগ ছিল ৫ নটিক্যাল মাইল।

পাকিস্তান আমলের প্রধান অর্জন রাস্তা পাকাকরণ। ব্রিটিশ শাসনামলের শেষদিকে যেখানে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আনুমানিক ৪৮০ কিলোমিটারের কম পাকা রাস্তা এবং ৩,৬০০ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ছিল, সেখানে পূর্ব পাকিস্তান আমলের শেষদিকে পাকা রাস্তার পরিমাণ দাঁড়ায় ৩,৮৬০ কিলোমিটারে। সড়ক পরিবহণ সংস্থা যাত্রা শুরু করলে (১৯৬১) ফোর্ড কোম্পানির বাস চালু করা হয় মহাসড়কে। মার্কিন পুঁজি অনুপ্রবেশের যুগে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পথে চলতে শুরু করে লাল বাসগুলো।

ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত এ রাস্তাটি ছিল হাতি চলাচলার উপযোগী। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশে ঘোড়ার গাড়ি চলার সুবিধার্থে ইট-সুরকির রাস্তার প্রচলন হয়। তখন পর্যন্ত দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম সড়কটি পাকা করার পরিবেশ তৈরি হয়নি। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মোটরগাড়ি চলাচলের সুবিধার্থে পিচঢালা সড়কের ব্যবহার শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরাশক্তি ইংরেজদের স্থান দখল করে নেয় আমেরিকা। ইংরেজদের লৌহপাত বাহন রেলওয়ের স্থান দখল করে আমেরিকানদের পিচঢালা পথ। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক নীতিতে নির্মিত হয়েছিল দর্শনা-জগতী রেলওয়ে, পক্ষান্তরে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে ঢাকাকেন্দ্রিক নীতিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চালু হয় আমেরিকান কোম্পানির গাড়ি। ১৯৬৩ সালে রোরো ফেরি সার্ভিস চালুর মাধ্যমে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা হয়।

বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৭ সালে কাচপুর শীতলক্ষ্যা সেতু চালু হয়। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ আমলে ফেরি সার্ভিস তুলে দিয়ে সেতু নির্মাণ ও বহু লাইনবিশিষ্ট করে একে নিরবচ্ছিন্ন করা হয়। মেঘনা সেতু ১৯৯১ সালে, গোমতী সেতু ১৯৯৫ সালে চালু হলে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার সূচনা হয়। নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা চালুই বাংলাদেশ পর্বের প্রধান অর্জন।

ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি : লেখক ও গবেষক

mahmoodnasirjahangiri@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন