নাসিক নির্বাচনে একটি বার্তা আছে
jugantor
নাসিক নির্বাচনে একটি বার্তা আছে

  ড. বদিউল আলম মজুমদার  

১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাসিক নির্বাচনে একটি বার্তা আছে

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের যে ঐতিহ্য সেটা রক্ষা পেয়েছে। এজন্য আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। একইসঙ্গে আমি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকেও অভিনন্দন জ্ঞাপন করতে চাচ্ছি। একটা নির্বাচনে কতগুলো স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থাকে। এই স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো হলো নির্বাচন কমিশন ও সরকার। সরকার মানে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশন হলো সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। একে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে তারা এ দায়িত্বটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। আর প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সাংবিধানিকভাবে কমিশনকে সহায়তা করতে বাধ্য। যদি তারা সহায়তা না করে, তাহলে নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না। বস্তুত সরকার যদি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের তেমন কিছুই করার থাকে না-যদিও তারা বিতর্কিত নির্বাচন বন্ধ করতে পারে, নির্বাচনি ফলাফল বাতিল করতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বার্তাটি হলো, এই সরকারের ওপর আস্থা রাখা যায় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়। এর কিছু ইতিবাচক দিক আছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আস্থা অর্জনের একটা সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার এখন অনেক দিক থেকেই চাপে আছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর নাখোশ আছে। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সামিটে আমাদের নিমন্ত্রণ জানায়নি। এই চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচন নিয়ে অনেক রকম কাথাবার্তা আছে। দেশে ও বাইরে প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে, এই সরকারের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। এই নির্বাচন কমিশনের সব কর্মকাণ্ড এবং পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন-এগুলোর জন্য সরকার অভ্যন্তরীণভাবে চাপে আছে। সরকার চাপে আছে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ নিয়ে। সবাই দাবি করছে, এ ব্যাপারে আইন হোক। কিন্তু সবার দাবি অগ্রাহ্য করে পুরোনো পথেই তারা হাঁটছে, যে পথের মাধ্যমে তারা অতীতে তাদেরই অনুগতদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দিয়েছে এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করেছে। এবার সরকার একটা আস্থা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

অতীতে তারা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করেছে, যেটা খুলনা সিটি করপোরেশন থেকে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে জাতীয় নির্বাচন ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা ঝুঁকি নিয়েছে এ কারণে যে, এ নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হবে না। তারা এ নির্বাচনে হারলেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পালাবদল হবে না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এ নির্বাচনে তাদের প্রার্থী হলেন তারকা প্রার্থী। বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাদের এ তারকাপ্রার্থীই জিতেছেন। তার ব্যাপক জনসমর্থন আছে এবং তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি কিংবা গুরুতর অন্যায়ের কোনো অভিযোগ নেই। তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক। তার একটি ভোটব্যাংক আছে। তাই তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। তাই তারা এখানে সেই ঝুঁকিটা নিয়েছে। তাদের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। কিন্তু যে বার্তাটি তারা মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে, সেটা তারা ২০১৩ সালেও দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা? এরপর পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সবকটিতে তারা ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে হেরেছে। তাদের অনেক ভালো প্রার্থী ছিল, তারপরও তারা হেরেছে। কারণ তারা সেখানে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেনি। তখনো তারা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

এখন এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার যে বার্তাটি দিল, সেটা মানুষ কিভাবে নেবে তা দেখার বিষয়। এখানে যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেটা হলো ইভিএম। ইভিএমটি নিকৃষ্ট মানের একটি যন্ত্র। ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশন যে তথ্য দেবে সে তথ্যই আমাদের মেনে নিতে হবে। অডিট করার আর কোনো সুযোগ নেই। অনেক দাম দিয়ে কেনার পরও এটা একটা অনির্ভরযোগ্য যন্ত্র এবং এটার মাধ্যমে ডিজিটাল জালিয়াতি সম্ভব। এই ইভিএম আমাদের ব্যবহার করা উচিত নয়। এটা আমাদের সংকটের মুখে ফেলতে পারে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

নাসিক নির্বাচনে একটি বার্তা আছে

 ড. বদিউল আলম মজুমদার 
১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
নাসিক নির্বাচনে একটি বার্তা আছে
ফাইল ছবি

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের যে ঐতিহ্য সেটা রক্ষা পেয়েছে। এজন্য আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। একইসঙ্গে আমি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকেও অভিনন্দন জ্ঞাপন করতে চাচ্ছি। একটা নির্বাচনে কতগুলো স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষ থাকে। এই স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো হলো নির্বাচন কমিশন ও সরকার। সরকার মানে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য নির্বাচন কমিশন হলো সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। একে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যাতে তারা এ দায়িত্বটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারে। আর প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে সাংবিধানিকভাবে কমিশনকে সহায়তা করতে বাধ্য। যদি তারা সহায়তা না করে, তাহলে নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না। বস্তুত সরকার যদি নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে নির্বাচন কমিশনের তেমন কিছুই করার থাকে না-যদিও তারা বিতর্কিত নির্বাচন বন্ধ করতে পারে, নির্বাচনি ফলাফল বাতিল করতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বার্তাটি হলো, এই সরকারের ওপর আস্থা রাখা যায় এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়। এর কিছু ইতিবাচক দিক আছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আস্থা অর্জনের একটা সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সরকার এখন অনেক দিক থেকেই চাপে আছে। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের কিছু উর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর নাখোশ আছে। এ কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গণতান্ত্রিক সামিটে আমাদের নিমন্ত্রণ জানায়নি। এই চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচন নিয়ে অনেক রকম কাথাবার্তা আছে। দেশে ও বাইরে প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে যে, এই সরকারের মাধ্যমে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব। এই নির্বাচন কমিশনের সব কর্মকাণ্ড এবং পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন-এগুলোর জন্য সরকার অভ্যন্তরীণভাবে চাপে আছে। সরকার চাপে আছে পরবর্তী নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ নিয়ে। সবাই দাবি করছে, এ ব্যাপারে আইন হোক। কিন্তু সবার দাবি অগ্রাহ্য করে পুরোনো পথেই তারা হাঁটছে, যে পথের মাধ্যমে তারা অতীতে তাদেরই অনুগতদের নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দিয়েছে এবং কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করেছে। এবার সরকার একটা আস্থা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

অতীতে তারা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন করেছে, যেটা খুলনা সিটি করপোরেশন থেকে শুরু হয়েছিল। পরবর্তীকালে জাতীয় নির্বাচন ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা ঝুঁকি নিয়েছে এ কারণে যে, এ নির্বাচনে ক্ষমতা বদল হবে না। তারা এ নির্বাচনে হারলেও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার পালাবদল হবে না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, এ নির্বাচনে তাদের প্রার্থী হলেন তারকা প্রার্থী। বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাদের এ তারকাপ্রার্থীই জিতেছেন। তার ব্যাপক জনসমর্থন আছে এবং তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি কিংবা গুরুতর অন্যায়ের কোনো অভিযোগ নেই। তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক। তার একটি ভোটব্যাংক আছে। তাই তার জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। তাই তারা এখানে সেই ঝুঁকিটা নিয়েছে। তাদের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। কিন্তু যে বার্তাটি তারা মানুষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে, সেটা তারা ২০১৩ সালেও দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হয়। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা? এরপর পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সবকটিতে তারা ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে হেরেছে। তাদের অনেক ভালো প্রার্থী ছিল, তারপরও তারা হেরেছে। কারণ তারা সেখানে নির্বাচনকে প্রভাবিত করেনি। তখনো তারা বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়া সত্ত্বেও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব।

এখন এই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকার যে বার্তাটি দিল, সেটা মানুষ কিভাবে নেবে তা দেখার বিষয়। এখানে যে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেটা হলো ইভিএম। ইভিএমটি নিকৃষ্ট মানের একটি যন্ত্র। ইভিএম নিয়ে নির্বাচন কমিশন যে তথ্য দেবে সে তথ্যই আমাদের মেনে নিতে হবে। অডিট করার আর কোনো সুযোগ নেই। অনেক দাম দিয়ে কেনার পরও এটা একটা অনির্ভরযোগ্য যন্ত্র এবং এটার মাধ্যমে ডিজিটাল জালিয়াতি সম্ভব। এই ইভিএম আমাদের ব্যবহার করা উচিত নয়। এটা আমাদের সংকটের মুখে ফেলতে পারে।

ড. বদিউল আলম মজুমদার : সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন