আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার
jugantor
অন্যমত
আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার

  আবু আহমেদ  

২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার

করোনা মহামারি-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি একটি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্বে নতুন করে করোনার সংক্রমণ সবাইকে আবারও ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়; যে কারণে আমাদের অনেক হিসাব-নিকাশ করেই এগোতে হবে। কয়েকটি বিষয়ের ওপর আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছি। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরটি কু-ঋণ বা অনাদায়ী দেনা নিয়ে খুব সমস্যার মধ্যে রয়েছে। ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য ব্যাংকিং খাতটিকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলেছে। দীর্ঘ সময়ে ঋণখেলাপির সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে খেলাপি ঋণও।

গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৮৯ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৫২৮ জনে। ২০২০ সালের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮২ জন। গত ১ বছরে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে ২৫ হাজর ৫৪৬ জন। ২০১৮ সালের জুনে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন।

আলোচ্য ২ বছর ৩ মাসে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৩২৪ জন। সুতরাং আমাদের এ খেলাপি ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলছে। তার লাগাম টানা যাচ্ছে না। পুরো বাংলাদেশে বিগত ৫০ বছরের মধ্যে বর্তমানে ঋণখেলাপির সংখ্যা সর্বোচ্চ, যার ফলে ইতোমধ্যেই কয়েকটি ব্যাংক প্রায় অকার্যকর অবস্থায় আছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। ঋণখেলাপির ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত। কেননা ঋণখেলাপির মাধ্যমে কোনো অর্থনীতি এগোতে পারে না।

ঋণখেলাপিদের দরিদ্র জনগণ তাদের আমানতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করছে, যে কারণে ব্যাংকগুলো শোষিত হচ্ছে, খেলাপিতে জর্জরিত হচ্ছে। সেটার আলটিমেট মূল্য দিচ্ছে জনগণ। যেমন সরকারি ব্যাংকগুলোকে যখন পুনঃঅর্থায়ন করা হয়, যাকে রি-সাপ্লাই ইন দি ক্যাপিটাল বলে; তখন এ টাকা তো বাজেট থেকে অথবা যে কোনোভাবেই হোক সরকারি কোষাগার থেকেই আসছে। সুতরাং তার জোগান তো দিচ্ছে জনগণই। অবশ্য কু-ঋণ আদায়ের জন্য সরকার প্রণোদনাও দিচ্ছে। তবে কিছু কিছু প্রণোদনার অপব্যবহারও হচ্ছে।

সরকারের উচিত, এসব ব্যাপারে কঠিন অবস্থানে গিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা। কেননা পুরো পৃথিবীতেই ঋণগ্রস্ত অর্থনীতি খুব বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে বাংলাদেশের একটি সুবিধা এখনো আছে; সেটি হলো, বাংলাদেশ অতটা ঋণগ্রস্ত নয়। কিন্তু সরকারি ব্যয় যদি কমাতে না পারে বা সুশৃঙ্খলভাবে না রাখতে পারে, তাহলে সরকারি ঋণ অনেকাংশে বেড়ে যেতে পারে। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না। কারণ সেটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য আমি মনে করি, সরকারের রাজস্ব থেকে ব্যয়ের ওপর লাগাম টেনে ধরা উচিত। অন্তত এক বছরের জন্য হলেও সরকারকে ব্যয় সংকোচন নীতি মেনে চলতে হবে।

আমাদের অর্থনীতির যা আছে অর্থাৎ গত চার বছর ধরে জিডিপির ৫ পার্সেন্ট বা ৪.৫ পার্সেন্ট ধরে যে ধারায় চলে আসছে-এর বাইরে যাওয়া উচিত হবে না। কারণ সেটি ইনফ্লেশনকে উসকে দিতে পারে। আরেকটি বিষয় সরকারকে সামনে আনতে হবে, সেটি হচ্ছে অর্থের অপব্যবহার। অর্থের অপব্যবহার বা অর্থের অদক্ষ ব্যবহার রোধ করতে সরকারের পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। অর্থাৎ সরকারকে বেল্ট টাইটেন করা উচিত। এখানে একটি প্রবাদ বাক্য উল্লেখ করা যেতে পারে; সেটি হলো, কোট সেলাই করতে হবে তার কাপড় অনুযায়ী। অর্থাৎ আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ীই খরচ করা উচিত। ফাইন্যান্সিয়াল ডিসিপ্লিন যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

আরেকটি বিষয় আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত; সেটি হলো, পুঁজি সংগ্রহের অন্যতম উৎস হওয়া উচিত শেয়ারবাজার। সেটি করতে গেলে শেয়ারবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে দুটি উপাদান দরকার। একটি হচ্ছে গুড গভর্নেন্স ও স্বচ্ছতা। আরেকটি হচ্ছে, ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা। বাংলাদেশে অনেক ভালো ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আছে, দেশীয় ভালো ভালো কোম্পানি আছে। তারা আমাদের শেয়ারবাজারে অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের কীভাবে তালিকাভুক্ত করা যায়, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। সরকারের জানার কথা, কী কী পলিসিগত সাপোর্ট দিলে ভালো কোম্পানি লিস্টিংয়ে আসবে। সুতরাং সরকার সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকার আওতায় আসবে। অবশ্য এসব বড় বড় কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর একটি হচ্ছে, এসব কোম্পানি অতি সহজেই ব্যাংক লোন পেয়ে যায়। তাছাড়া কোনো কোম্পানি লিস্টিংয়ে এলে তাকে এক্সপোজড হতে হয়। সে কী কী আয় করছে, সরকারকে কত পরিমাণ ট্যাক্স দিচ্ছে এবং তিন মাস অন্তর অন্তর তার আয়-ব্যয়ের একটি তালিকাও প্রকাশ করতে হয়। এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে অনেক কোম্পানিই তালিকাভুক্ত হতে চায় না; বরং তারা তাদের ব্যবসা ঢেকে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কেননা তাদের ব্যবসাকে তারা যত বেশি ঢেকে রাখতে পারবে, তাদের তত বেশি লাভ।

এভাবে ঢেকে রাখতে পারলে তারা সরকারকে কম ট্যাক্স দিতে পারবে এবং কোম্পানিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও থাকবে না; যার ফলে সরকার এসব কোম্পানিকে শেয়ার মার্কেটের আওতায় আনতে চাইলেও তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সরকারের আহ্বানে সাড়া দেয় না। এসব কারণে দেশের সাধারণ মানুষ বড় বড় এবং ভালো ভালো কোম্পানির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারও খুব একটা তৎপর নয়। কেয়ারটেকার সরকারের সময়ে অবশ্য চেষ্টা করা হয়েছিল বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে বসার জন্য। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত, যে কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে পারলে তার আয়-ব্যয় লুকানোর সুযোগ থাকে না; যার ফলে সরকারের রাজস্ব অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। কারণ করপোরেট ইনকাম ট্যাক্সের ৮০ শতাংশই আসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে। তাছাড়া কোম্পানিকে তালিকার আওতায় আনতে পারলে দেশের জনগণও কোম্পানির মালিকানা পাবে।

কোনো দেশই পাবলিক ইন্টারেস্টে পিছিয়ে থাকতে পারে না। আমরা কেন পিছিয়ে আছি, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের পলিসি মেকাররা যদি তৎপর না থাকে, তাহলে তো ভালো কোনো বিদেশি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং শেয়ারবাজারকে পলিসিগত সাপোর্ট দিয়ে যেতে হবে; শুধু মুখে বললে হবে না। ট্যাক্স রিলেটেড এবং অন্যান্য ইস্যুতে কমপ্লিট সাপোর্ট দিয়ে যেতে হবে, যাতে করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির জনগণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে যাতে আস্থা ফিরে আসে, এ জন্য যা যা করা দরকার, সেটি করে যেতে হবে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে দেশকে সামাজিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এর পাশাপাশি দেশে মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মুক্ত থাকে, এ বিষয়টি সামনে আনতে হবে। এর জন্য চাই একটি ভালো নির্বাচন। ভালো বলতে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন; একতরফা কোনো নির্বাচন নয়। একতরফা নির্বাচন দেশে অস্থিরতা বাড়াবে। আর এ অস্থিরতার সৃষ্টি হলে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ সহজে আসতে চাইবে না। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা ভালো অবস্থানে আছে, তারপরও তুলনা করলে আমরা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অতটা পাচ্ছি না। এগুলো ওইসব ইস্যুর কারণেই হচ্ছে।

আমাদের মেগা প্রজেক্টগুলো চালু হলে আলটিমেটলি ফরেন ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, যদি পলিটিক্যালি আমরা শুদ্ধ থাকি। ঢাকা এয়ারপোর্ট এবং চিটাগাং এয়ারপোর্ট পার্সিয়ালি হলেও প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া উচিত। এটি বিমান বাংলাদেশের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বিদেশি এয়ারক্রাফ্টের রি-ফুয়েলিং এবং সার্ভিসিংয়ের ব্যাপারটা প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া উচিত। তাহলে এসব কাজে অনেকটা গতি ফিরে আসবে। পারলে পুরো এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্টই প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া যেতে পারে। কারণ তা না হলে এয়ারপোর্টে যে দুরবস্থা চলছে, সেটি আরও অবনতির দিকে যাবে।

আমার কাছে মনে হয়, পুরো এশিয়াতে আমাদের ঢাকা এয়ারপোর্টটি ওয়ান অফ দ্য ওয়াস্ট। এখানে বিদেশিরা আসার সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টের এ অবস্থা দেখে তাদের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা বাজে ধারণা তৈরি হয়। এ বিষয়টি সামনে আনা উচিত। বিশ্বের বড় বড় এয়ারপোর্টগুলো প্রাইভেট সেক্টরে রয়েছে এবং সেটি সরকারের লিস্টেড কোম্পানি। আমাদের দেশে কেন নয়? বিমান বর্তমানে যে সার্ভিস দিচ্ছে, এখন সেগুলোকে প্রাইভেট সেক্টরে লিজআউট করা উচিত। শুধু তাই নয়, বিদেশি যে এয়ারক্রাফট্গুলো আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে বিমান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যেসব সার্ভিস পাচ্ছে, সেটি সন্তোষজনক নয়। সুতরাং বিদেশি এয়ারক্রাফটের রি-ফুয়েলিং এবং মেইনটেনেন্স ইত্যাদি সবকিছুই প্রাইভেট সেক্টরের আওতায় আনতে হবে। এগুলো বিমান দিয়ে হবে না। এমনকি লাগেজ কালেকশনও প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া উচিত। পুরো ম্যানেজমেন্টকে প্রাইভেট সেক্টরে না দিতে পারলে গতি ফেরানো সম্ভব নয়। সরকারের এন্টারপ্রাইজ হিসাবে এয়ারপোর্ট অনেক জায়গাতেই এখন আর নেই। তাহলে আমাদের এখানে থাকবে কেন? সি-পোর্টের ব্যাপারেও আমাদের এ রকম চিন্তা করা উচিত। সি-পোর্টের দায়িত্ব যদি প্রাইভেট সেক্টরে দিতে পারি, তাহলে এখানেও অনেক গতি আসবে।

আমরা যদি পিছিয়েও থাকি অন্যরা পিছিয়ে থাকবে না। ‘শ্রীলংকা খারাপ করছে, পাকিস্তান খারাপ করছে, তাদের থেকে আমরা তো ভালো করছি’-এমন মনমানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কখনোই খারাপ উদাহরণ ফলো করা উচিত নয়। আমাদের থেকে ভালো কারা কারা করছে, সেটি অনুসরণ উচিত-যেমন ভিয়েতনাম আমাদের থেকে অনেক পেছনে ছিল, সেই ভিয়েতনাম এখন এত এগিয়ে গেল কীভাবে। লাওস, কম্বোডিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ডও আমাদের থেকে অনেকগুণ এগিয়ে গেছে। তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? আমরা শুধু ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে সব জয় করে ফেলেছি এমন ধারণা করলে তো চলবে না। ওসব তুলনা করে লাভ নেই। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

অন্যমত

আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার

 আবু আহমেদ 
২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার
ফাইল ছবি

করোনা মহামারি-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি একটি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশ্বে নতুন করে করোনার সংক্রমণ সবাইকে আবারও ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়; যে কারণে আমাদের অনেক হিসাব-নিকাশ করেই এগোতে হবে। কয়েকটি বিষয়ের ওপর আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছি। বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরটি কু-ঋণ বা অনাদায়ী দেনা নিয়ে খুব সমস্যার মধ্যে রয়েছে। ঋণখেলাপিদের দৌরাত্ম্য ব্যাংকিং খাতটিকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলেছে। দীর্ঘ সময়ে ঋণখেলাপির সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে খেলাপি ঋণও।

গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৮ দশমিক ১২ শতাংশ। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট খেলাপি ঋণের ৮৯ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬০ হাজার ৫২৮ জনে। ২০২০ সালের একই সময়ে ছিল ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৯৮২ জন। গত ১ বছরে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়েছে ২৫ হাজর ৫৪৬ জন। ২০১৮ সালের জুনে এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৫৮ জন।

আলোচ্য ২ বছর ৩ মাসে ঋণখেলাপির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৩২৪ জন। সুতরাং আমাদের এ খেলাপি ঋণের বোঝা দিন দিন বেড়েই চলছে। তার লাগাম টানা যাচ্ছে না। পুরো বাংলাদেশে বিগত ৫০ বছরের মধ্যে বর্তমানে ঋণখেলাপির সংখ্যা সর্বোচ্চ, যার ফলে ইতোমধ্যেই কয়েকটি ব্যাংক প্রায় অকার্যকর অবস্থায় আছে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। ঋণখেলাপির ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থানে যাওয়া উচিত। কেননা ঋণখেলাপির মাধ্যমে কোনো অর্থনীতি এগোতে পারে না।

ঋণখেলাপিদের দরিদ্র জনগণ তাদের আমানতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করছে, যে কারণে ব্যাংকগুলো শোষিত হচ্ছে, খেলাপিতে জর্জরিত হচ্ছে। সেটার আলটিমেট মূল্য দিচ্ছে জনগণ। যেমন সরকারি ব্যাংকগুলোকে যখন পুনঃঅর্থায়ন করা হয়, যাকে রি-সাপ্লাই ইন দি ক্যাপিটাল বলে; তখন এ টাকা তো বাজেট থেকে অথবা যে কোনোভাবেই হোক সরকারি কোষাগার থেকেই আসছে। সুতরাং তার জোগান তো দিচ্ছে জনগণই। অবশ্য কু-ঋণ আদায়ের জন্য সরকার প্রণোদনাও দিচ্ছে। তবে কিছু কিছু প্রণোদনার অপব্যবহারও হচ্ছে।

সরকারের উচিত, এসব ব্যাপারে কঠিন অবস্থানে গিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলা। কেননা পুরো পৃথিবীতেই ঋণগ্রস্ত অর্থনীতি খুব বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে বাংলাদেশের একটি সুবিধা এখনো আছে; সেটি হলো, বাংলাদেশ অতটা ঋণগ্রস্ত নয়। কিন্তু সরকারি ব্যয় যদি কমাতে না পারে বা সুশৃঙ্খলভাবে না রাখতে পারে, তাহলে সরকারি ঋণ অনেকাংশে বেড়ে যেতে পারে। সরকারি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না। কারণ সেটি পুরো অর্থনীতির জন্য একটি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এজন্য আমি মনে করি, সরকারের রাজস্ব থেকে ব্যয়ের ওপর লাগাম টেনে ধরা উচিত। অন্তত এক বছরের জন্য হলেও সরকারকে ব্যয় সংকোচন নীতি মেনে চলতে হবে।

আমাদের অর্থনীতির যা আছে অর্থাৎ গত চার বছর ধরে জিডিপির ৫ পার্সেন্ট বা ৪.৫ পার্সেন্ট ধরে যে ধারায় চলে আসছে-এর বাইরে যাওয়া উচিত হবে না। কারণ সেটি ইনফ্লেশনকে উসকে দিতে পারে। আরেকটি বিষয় সরকারকে সামনে আনতে হবে, সেটি হচ্ছে অর্থের অপব্যবহার। অর্থের অপব্যবহার বা অর্থের অদক্ষ ব্যবহার রোধ করতে সরকারের পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। অর্থাৎ সরকারকে বেল্ট টাইটেন করা উচিত। এখানে একটি প্রবাদ বাক্য উল্লেখ করা যেতে পারে; সেটি হলো, কোট সেলাই করতে হবে তার কাপড় অনুযায়ী। অর্থাৎ আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ীই খরচ করা উচিত। ফাইন্যান্সিয়াল ডিসিপ্লিন যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

আরেকটি বিষয় আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত; সেটি হলো, পুঁজি সংগ্রহের অন্যতম উৎস হওয়া উচিত শেয়ারবাজার। সেটি করতে গেলে শেয়ারবাজারকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে দুটি উপাদান দরকার। একটি হচ্ছে গুড গভর্নেন্স ও স্বচ্ছতা। আরেকটি হচ্ছে, ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা। বাংলাদেশে অনেক ভালো ভালো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি আছে, দেশীয় ভালো ভালো কোম্পানি আছে। তারা আমাদের শেয়ারবাজারে অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের কীভাবে তালিকাভুক্ত করা যায়, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। সরকারের জানার কথা, কী কী পলিসিগত সাপোর্ট দিলে ভালো কোম্পানি লিস্টিংয়ে আসবে। সুতরাং সরকার সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকার আওতায় আসবে। অবশ্য এসব বড় বড় কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত না হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর একটি হচ্ছে, এসব কোম্পানি অতি সহজেই ব্যাংক লোন পেয়ে যায়। তাছাড়া কোনো কোম্পানি লিস্টিংয়ে এলে তাকে এক্সপোজড হতে হয়। সে কী কী আয় করছে, সরকারকে কত পরিমাণ ট্যাক্স দিচ্ছে এবং তিন মাস অন্তর অন্তর তার আয়-ব্যয়ের একটি তালিকাও প্রকাশ করতে হয়। এসব ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে অনেক কোম্পানিই তালিকাভুক্ত হতে চায় না; বরং তারা তাদের ব্যবসা ঢেকে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কেননা তাদের ব্যবসাকে তারা যত বেশি ঢেকে রাখতে পারবে, তাদের তত বেশি লাভ।

এভাবে ঢেকে রাখতে পারলে তারা সরকারকে কম ট্যাক্স দিতে পারবে এবং কোম্পানিতে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও থাকবে না; যার ফলে সরকার এসব কোম্পানিকে শেয়ার মার্কেটের আওতায় আনতে চাইলেও তারা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সরকারের আহ্বানে সাড়া দেয় না। এসব কারণে দেশের সাধারণ মানুষ বড় বড় এবং ভালো ভালো কোম্পানির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিষয়গুলো নিয়ে সরকারও খুব একটা তৎপর নয়। কেয়ারটেকার সরকারের সময়ে অবশ্য চেষ্টা করা হয়েছিল বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে বসার জন্য। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একটি বিষয় মাথায় রাখা উচিত, যে কোনো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করতে পারলে তার আয়-ব্যয় লুকানোর সুযোগ থাকে না; যার ফলে সরকারের রাজস্ব অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। কারণ করপোরেট ইনকাম ট্যাক্সের ৮০ শতাংশই আসে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি থেকে। তাছাড়া কোম্পানিকে তালিকার আওতায় আনতে পারলে দেশের জনগণও কোম্পানির মালিকানা পাবে।

কোনো দেশই পাবলিক ইন্টারেস্টে পিছিয়ে থাকতে পারে না। আমরা কেন পিছিয়ে আছি, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশের পলিসি মেকাররা যদি তৎপর না থাকে, তাহলে তো ভালো কোনো বিদেশি কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হবে না। সুতরাং শেয়ারবাজারকে পলিসিগত সাপোর্ট দিয়ে যেতে হবে; শুধু মুখে বললে হবে না। ট্যাক্স রিলেটেড এবং অন্যান্য ইস্যুতে কমপ্লিট সাপোর্ট দিয়ে যেতে হবে, যাতে করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির জনগণ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে যাতে আস্থা ফিরে আসে, এ জন্য যা যা করা দরকার, সেটি করে যেতে হবে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে হলে দেশকে সামাজিক অস্থিরতা থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এর পাশাপাশি দেশে মানবাধিকার যাতে লঙ্ঘিত না হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা মুক্ত থাকে, এ বিষয়টি সামনে আনতে হবে। এর জন্য চাই একটি ভালো নির্বাচন। ভালো বলতে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন; একতরফা কোনো নির্বাচন নয়। একতরফা নির্বাচন দেশে অস্থিরতা বাড়াবে। আর এ অস্থিরতার সৃষ্টি হলে দেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ সহজে আসতে চাইবে না। অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতি একটা ভালো অবস্থানে আছে, তারপরও তুলনা করলে আমরা ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট অতটা পাচ্ছি না। এগুলো ওইসব ইস্যুর কারণেই হচ্ছে।

আমাদের মেগা প্রজেক্টগুলো চালু হলে আলটিমেটলি ফরেন ইনভেস্টমেন্ট বাড়বে, যদি পলিটিক্যালি আমরা শুদ্ধ থাকি। ঢাকা এয়ারপোর্ট এবং চিটাগাং এয়ারপোর্ট পার্সিয়ালি হলেও প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া উচিত। এটি বিমান বাংলাদেশের হাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বিদেশি এয়ারক্রাফ্টের রি-ফুয়েলিং এবং সার্ভিসিংয়ের ব্যাপারটা প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া উচিত। তাহলে এসব কাজে অনেকটা গতি ফিরে আসবে। পারলে পুরো এয়ারপোর্ট ম্যানেজমেন্টই প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া যেতে পারে। কারণ তা না হলে এয়ারপোর্টে যে দুরবস্থা চলছে, সেটি আরও অবনতির দিকে যাবে।

আমার কাছে মনে হয়, পুরো এশিয়াতে আমাদের ঢাকা এয়ারপোর্টটি ওয়ান অফ দ্য ওয়াস্ট। এখানে বিদেশিরা আসার সঙ্গে সঙ্গে এয়ারপোর্টের এ অবস্থা দেখে তাদের মনে বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা বাজে ধারণা তৈরি হয়। এ বিষয়টি সামনে আনা উচিত। বিশ্বের বড় বড় এয়ারপোর্টগুলো প্রাইভেট সেক্টরে রয়েছে এবং সেটি সরকারের লিস্টেড কোম্পানি। আমাদের দেশে কেন নয়? বিমান বর্তমানে যে সার্ভিস দিচ্ছে, এখন সেগুলোকে প্রাইভেট সেক্টরে লিজআউট করা উচিত। শুধু তাই নয়, বিদেশি যে এয়ারক্রাফট্গুলো আমাদের এয়ারপোর্ট থেকে বিমান কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যেসব সার্ভিস পাচ্ছে, সেটি সন্তোষজনক নয়। সুতরাং বিদেশি এয়ারক্রাফটের রি-ফুয়েলিং এবং মেইনটেনেন্স ইত্যাদি সবকিছুই প্রাইভেট সেক্টরের আওতায় আনতে হবে। এগুলো বিমান দিয়ে হবে না। এমনকি লাগেজ কালেকশনও প্রাইভেট সেক্টরে দেওয়া উচিত। পুরো ম্যানেজমেন্টকে প্রাইভেট সেক্টরে না দিতে পারলে গতি ফেরানো সম্ভব নয়। সরকারের এন্টারপ্রাইজ হিসাবে এয়ারপোর্ট অনেক জায়গাতেই এখন আর নেই। তাহলে আমাদের এখানে থাকবে কেন? সি-পোর্টের ব্যাপারেও আমাদের এ রকম চিন্তা করা উচিত। সি-পোর্টের দায়িত্ব যদি প্রাইভেট সেক্টরে দিতে পারি, তাহলে এখানেও অনেক গতি আসবে।

আমরা যদি পিছিয়েও থাকি অন্যরা পিছিয়ে থাকবে না। ‘শ্রীলংকা খারাপ করছে, পাকিস্তান খারাপ করছে, তাদের থেকে আমরা তো ভালো করছি’-এমন মনমানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কখনোই খারাপ উদাহরণ ফলো করা উচিত নয়। আমাদের থেকে ভালো কারা কারা করছে, সেটি অনুসরণ উচিত-যেমন ভিয়েতনাম আমাদের থেকে অনেক পেছনে ছিল, সেই ভিয়েতনাম এখন এত এগিয়ে গেল কীভাবে। লাওস, কম্বোডিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। থাইল্যান্ডও আমাদের থেকে অনেকগুণ এগিয়ে গেছে। তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? আমরা শুধু ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, শ্রীলংকাকে পেছনে ফেলে সব জয় করে ফেলেছি এমন ধারণা করলে তো চলবে না। ওসব তুলনা করে লাভ নেই। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের ফরোয়ার্ড লুকিং পলিসি দরকার।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন