শত বছরের স্বপ্নের পুনরুজ্জীবন ও বাস্তবায়ন
jugantor
শত বছরের স্বপ্নের পুনরুজ্জীবন ও বাস্তবায়ন

  ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি  

২৩ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শত বছরের স্বপ্নের পুনরুজ্জীবন ও বাস্তবায়ন

সাম্প্রতিককালে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগের ধারণাটা আবার ফিরে এসেছে, যেমনটা ভাবা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা সরকার এবং পাকিস্তান আমলে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়। এ সরাসরি যোগাযোগটা হবে ব্রিটিশ আমলের রেলপথ থেকে ভিন্ন। আগের যাত্রাপথ ছিল ঢাকা-ভৈরব-আখাউড়া-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম। নতুন যাত্রাপথ হবে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম। সরাসরি যাত্রাপথে নতুন যুক্ত হবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া ও কুমিল্লার দাউদকান্দি। এর ফলে শত বছরের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যায়। এ রেলপথ হবে যুক্তফ্রন্টের প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম সংশোধিত রেলপথের ধারণার পুনর্জাগরণ এবং এর যাত্রাপথ হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সমান্তরাল।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে। এর শত বছর আগে চালু হয় কলকাতা-রানাঘাট রেলওয়ে ১৮৬২ সালে। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের কলকাতা-রানাঘাট শাখার উদ্বোধন হয় ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আর দর্শনা-জগতী শাখা সে বছরেরই ১৫ নভেম্বর। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা স্টেট রেলওয়ের জন্ম হয় ১৮৮৫ সালে এবং আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের জন্ম হয় ১৮৯১ সালে। পূর্বাঞ্চলে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে এবং আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপিত হয় যথাক্রমে কলকাতা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরকে যুক্ত করার মানসে। কিন্তু ৩০ বছরের সময়পরিধিতে সচল তিনটি রেলওয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকায় ঢাকার সঙ্গে না ছিল কলকাতার সরাসরি সম্পর্ক, না ছিল চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইন নির্মাণের পর ঢাকা এবং আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে নির্মাণের পর চট্টগ্রাম দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। শুধু বঙ্গভঙ্গের পরই এ দুটি শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হতে শুরু করে। ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ ঘোষণার পর ঢাকা হয় রাজধানী, চট্টগ্রাম হয় সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর। ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের রেলওয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক ও সংক্ষিপ্ত করার জন্য ভৈরব লাইন নির্মাণ করা হয় ১৯১০-১৯১৪ সালে। ঢাকা স্টেট রেলওয়ের সঙ্গে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম শাখার সংযোগ সাধনের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ের সূচনা হয়। এ কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়েকে বলা যায় দুটি রেলওয়ে ব্যবস্থার যোগফল। এর ফলে ঢাকা স্টেট রেলওয়ে প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পর নতুন যুগের সূচনা হয় ঠিকই, কিন্তু রাজধানী ঢাকার কাছে চট্টগ্রাম হয়ে থাকে দূরবর্তী শহর। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যাওয়ার পর (১৯১১) ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা প্রায় তিরোহিত হয়ে যায়। ঢাকা আবার হয়ে যায় উপশহর, চট্টগ্রাম উপবন্দর। তবে ১৯৩৭ সালে মেঘনার দুই পাড়কে সংযুক্ত করে ভৈরব সেতু উদ্বোধনের পর দুই পাড়ে বিচ্ছিন্ন দুটি রেলওয়ে একীভূত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় বেঙ্গল-আসাম রেলওয়ে (১৯৪২)। কিন্তু এ একীভবনের পরও ভ্রমণের সময় কমলেও পথের দূরত্ব কমেনি। স্মরণযোগ্য, ভৈরব লাইন নির্মিত হয় নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সময় আর ব্রিজ উদ্বোধন হয় বাংলার স্বায়ত্তশাসনের সময়।

ঔপনিবেশিক আমলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর আর নিকটবর্তী হতে পারেনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের অবস্থা হয় এরকম : ‘কাছে, তবু বহুদূরে’। যদিও দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম ট্রেনলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল ১৮৮১ সালেই। তখন ঢাকা ও চট্টগ্রামের কমিশনাররা এ রেলপথ নির্মাণের পক্ষে রায় দেন। গুরুত্বের দিক থেকে এটি হবে বাংলায় অদ্বিতীয়-এরকম মত দেন বাংলার ছোটলাট। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হতে পারত। কিন্তু ১৮৮২ সালের জুন মাসে সরকার চট্টগ্রাম থেকে দাউদকান্দির পরিবর্তে চাঁদপুর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা পেশ করে। এ ‘মোগলাই নীতি’র অনুসরণে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রেলওয়েকে (১৮৯১) লাকসাম-চাঁদপুর পর্যন্ত টেনে এনে স্টিমারের সাহায্যে সংযোগ স্থাপন করা হয় গোয়ালন্দের ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের (১৮৭১) সঙ্গে। ফলে গড়ে ওঠে বিকলাঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন এক যোগাযোগব্যবস্থা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পূর্ববঙ্গে পাট ব্যবসার উন্নতির ফলে মেঘনা নদী জরিপ করা জরুরি হয়ে পড়ে। দাবি ওঠায় বাংলা সরকার উৎপাদিত পণ্য স্টিমারে টানা টাগবোটে করে নদীপথে চট্টগ্রামে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এটি হলো নদীপথে সরাসরি যান্ত্রিক যোগাযোগের ধারণা।

পাকিস্তান আমলে স্থলপথে সরাসরি যোগাযোগের ধারণাটা আবার ফিরে আসে। বাংলা সরকার যে পরিকল্পনা করেছিল ব্রিটিশ আমলে, তা আবার পুনরুজ্জীবিত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার পাকিস্তান আমলে। যুক্তফ্রন্ট সরকার সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ের পরিকল্পনা করে। কারণ যুক্তফ্রন্টের অনেক এমএলএ এসেছিলেন এ অঞ্চলের পাটচাষি পরিবার থেকে। তাদের জন্য দরকার ছিল সরাসরি যোগাযোগ। তাদেরই প্রচেষ্টার ফল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মনে রাখতে হবে, এ প্রস্তাব আনা হয়েছিল এমন এক সময়-যখন সারা বিশ্বের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সমস্যা। সুয়েজ খাল যতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দুই সাগরকে যুক্ত করে, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গজারিয়া-দাউদকান্দি সংযোগ সড়ক ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে। এ সংযোজিত অংশটা নির্মিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে। কিন্তু সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে বাস্তবায়িত হয়নি। এর কারণ SEATO, CENTO চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাকিস্তান আদতে ব্রিটিশ রেলওয়ে নীতিকেই বিসর্জন দেয়; এর বদলে গ্রহণ করে মার্কিন সড়ক যোগাযোগ নীতি।

বর্তমানকালেও এ পথ কতটা বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য, তা বোঝা যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ পরিকল্পনার সময়। দ্রুতগতির রেল পরিকল্পনার সময় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চারটি অ্যালাইনমেন্ট চিহ্নিত করে। এ চারটি অ্যালাইনমেন্ট হলো-১. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম (২২৭ কিলোমিটার), ২. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-লাকসাম-ফেনী-চট্টগ্রাম (২৩২ কিলোমিটার), ৩. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-বাগমারা-ফেনী-চট্টগ্রাম (২২২ কিলোমিটার) এবং ৪. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম-ফেনী-চট্টগ্রাম (২২০ কিলোমিটার)। সব অ্যালাইনমেন্টই অনুসরণ করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-দাউদকান্দি সংযোগ সড়ক। এতে প্রমাণিত হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাপথ রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও কতটা ইতিহাস নির্ধারিত, একইসঙ্গে আদর্শ ও অনুকরণীয়।

পানামা যোজক আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযুক্ত করেছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে, গজারিয়া যোজক সরাসরি সংযুক্ত করবে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামকে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেলপথের দূরত্ব কমে যাবে ৮০ কিলোমিটার। শুধু চট্টগ্রামের সঙ্গে কমবে তাই নয়, কমবে ট্রান্সএশিয়ান বহুজাতিক পথ বা লৌহ রেশম পথের সঙ্গেও। শত বছরের স্বপ্ন হবে সত্যি।

ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি : লেখক ও গবেষক

mahmoodnasirjahangiri@gmail.com

শত বছরের স্বপ্নের পুনরুজ্জীবন ও বাস্তবায়ন

 ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি 
২৩ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
শত বছরের স্বপ্নের পুনরুজ্জীবন ও বাস্তবায়ন
ফাইল ছবি

সাম্প্রতিককালে সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগের ধারণাটা আবার ফিরে এসেছে, যেমনটা ভাবা হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলা সরকার এবং পাকিস্তান আমলে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময়। এ সরাসরি যোগাযোগটা হবে ব্রিটিশ আমলের রেলপথ থেকে ভিন্ন। আগের যাত্রাপথ ছিল ঢাকা-ভৈরব-আখাউড়া-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম। নতুন যাত্রাপথ হবে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম। সরাসরি যাত্রাপথে নতুন যুক্ত হবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া ও কুমিল্লার দাউদকান্দি। এর ফলে শত বছরের স্বপ্নের বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যায়। এ রেলপথ হবে যুক্তফ্রন্টের প্রস্তাবিত ঢাকা-চট্টগ্রাম সংশোধিত রেলপথের ধারণার পুনর্জাগরণ এবং এর যাত্রাপথ হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সমান্তরাল।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে। এর শত বছর আগে চালু হয় কলকাতা-রানাঘাট রেলওয়ে ১৮৬২ সালে। ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাই, ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের কলকাতা-রানাঘাট শাখার উদ্বোধন হয় ১৮৬২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আর দর্শনা-জগতী শাখা সে বছরেরই ১৫ নভেম্বর। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা স্টেট রেলওয়ের জন্ম হয় ১৮৮৫ সালে এবং আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের জন্ম হয় ১৮৯১ সালে। পূর্বাঞ্চলে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে এবং আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে স্থাপিত হয় যথাক্রমে কলকাতা বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরকে যুক্ত করার মানসে। কিন্তু ৩০ বছরের সময়পরিধিতে সচল তিনটি রেলওয়ে পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকায় ঢাকার সঙ্গে না ছিল কলকাতার সরাসরি সম্পর্ক, না ছিল চট্টগ্রামের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক।

ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইন নির্মাণের পর ঢাকা এবং আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে নির্মাণের পর চট্টগ্রাম দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। শুধু বঙ্গভঙ্গের পরই এ দুটি শহরের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হতে শুরু করে। ১৯০৫ সালে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ ঘোষণার পর ঢাকা হয় রাজধানী, চট্টগ্রাম হয় সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর। ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের রেলওয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক ও সংক্ষিপ্ত করার জন্য ভৈরব লাইন নির্মাণ করা হয় ১৯১০-১৯১৪ সালে। ঢাকা স্টেট রেলওয়ের সঙ্গে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম শাখার সংযোগ সাধনের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ের সূচনা হয়। এ কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়েকে বলা যায় দুটি রেলওয়ে ব্যবস্থার যোগফল। এর ফলে ঢাকা স্টেট রেলওয়ে প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পর নতুন যুগের সূচনা হয় ঠিকই, কিন্তু রাজধানী ঢাকার কাছে চট্টগ্রাম হয়ে থাকে দূরবর্তী শহর। বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যাওয়ার পর (১৯১১) ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগের সম্ভাবনা প্রায় তিরোহিত হয়ে যায়। ঢাকা আবার হয়ে যায় উপশহর, চট্টগ্রাম উপবন্দর। তবে ১৯৩৭ সালে মেঘনার দুই পাড়কে সংযুক্ত করে ভৈরব সেতু উদ্বোধনের পর দুই পাড়ে বিচ্ছিন্ন দুটি রেলওয়ে একীভূত হয় এবং এর নামকরণ করা হয় বেঙ্গল-আসাম রেলওয়ে (১৯৪২)। কিন্তু এ একীভবনের পরও ভ্রমণের সময় কমলেও পথের দূরত্ব কমেনি। স্মরণযোগ্য, ভৈরব লাইন নির্মিত হয় নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের সময় আর ব্রিজ উদ্বোধন হয় বাংলার স্বায়ত্তশাসনের সময়।

ঔপনিবেশিক আমলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি শহর আর নিকটবর্তী হতে পারেনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামের অবস্থা হয় এরকম : ‘কাছে, তবু বহুদূরে’। যদিও দাউদকান্দি-চট্টগ্রাম ট্রেনলাইন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল ১৮৮১ সালেই। তখন ঢাকা ও চট্টগ্রামের কমিশনাররা এ রেলপথ নির্মাণের পক্ষে রায় দেন। গুরুত্বের দিক থেকে এটি হবে বাংলায় অদ্বিতীয়-এরকম মত দেন বাংলার ছোটলাট। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে কুমিল্লার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হতে পারত। কিন্তু ১৮৮২ সালের জুন মাসে সরকার চট্টগ্রাম থেকে দাউদকান্দির পরিবর্তে চাঁদপুর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা পেশ করে। এ ‘মোগলাই নীতি’র অনুসরণে কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রেলওয়েকে (১৮৯১) লাকসাম-চাঁদপুর পর্যন্ত টেনে এনে স্টিমারের সাহায্যে সংযোগ স্থাপন করা হয় গোয়ালন্দের ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের (১৮৭১) সঙ্গে। ফলে গড়ে ওঠে বিকলাঙ্গ ও বিচ্ছিন্ন এক যোগাযোগব্যবস্থা। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে পূর্ববঙ্গে পাট ব্যবসার উন্নতির ফলে মেঘনা নদী জরিপ করা জরুরি হয়ে পড়ে। দাবি ওঠায় বাংলা সরকার উৎপাদিত পণ্য স্টিমারে টানা টাগবোটে করে নদীপথে চট্টগ্রামে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এটি হলো নদীপথে সরাসরি যান্ত্রিক যোগাযোগের ধারণা।

পাকিস্তান আমলে স্থলপথে সরাসরি যোগাযোগের ধারণাটা আবার ফিরে আসে। বাংলা সরকার যে পরিকল্পনা করেছিল ব্রিটিশ আমলে, তা আবার পুনরুজ্জীবিত করে যুক্তফ্রন্ট সরকার পাকিস্তান আমলে। যুক্তফ্রন্ট সরকার সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ের পরিকল্পনা করে। কারণ যুক্তফ্রন্টের অনেক এমএলএ এসেছিলেন এ অঞ্চলের পাটচাষি পরিবার থেকে। তাদের জন্য দরকার ছিল সরাসরি যোগাযোগ। তাদেরই প্রচেষ্টার ফল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। মনে রাখতে হবে, এ প্রস্তাব আনা হয়েছিল এমন এক সময়-যখন সারা বিশ্বের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ১৯৫৬ সালের সুয়েজ খাল সমস্যা। সুয়েজ খাল যতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দুই সাগরকে যুক্ত করে, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে গজারিয়া-দাউদকান্দি সংযোগ সড়ক ঢাকা ও চট্টগ্রামকে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে। এ সংযোজিত অংশটা নির্মিত হয় ১৯৬১-১৯৬২ সালে। কিন্তু সরাসরি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে বাস্তবায়িত হয়নি। এর কারণ SEATO, CENTO চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাকিস্তান আদতে ব্রিটিশ রেলওয়ে নীতিকেই বিসর্জন দেয়; এর বদলে গ্রহণ করে মার্কিন সড়ক যোগাযোগ নীতি।

বর্তমানকালেও এ পথ কতটা বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য, তা বোঝা যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ পরিকল্পনার সময়। দ্রুতগতির রেল পরিকল্পনার সময় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চারটি অ্যালাইনমেন্ট চিহ্নিত করে। এ চারটি অ্যালাইনমেন্ট হলো-১. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম (২২৭ কিলোমিটার), ২. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-লাকসাম-ফেনী-চট্টগ্রাম (২৩২ কিলোমিটার), ৩. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-বাগমারা-ফেনী-চট্টগ্রাম (২২২ কিলোমিটার) এবং ৪. ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম-ফেনী-চট্টগ্রাম (২২০ কিলোমিটার)। সব অ্যালাইনমেন্টই অনুসরণ করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-দাউদকান্দি সংযোগ সড়ক। এতে প্রমাণিত হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যাত্রাপথ রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও কতটা ইতিহাস নির্ধারিত, একইসঙ্গে আদর্শ ও অনুকরণীয়।

পানামা যোজক আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযুক্ত করেছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে, গজারিয়া যোজক সরাসরি সংযুক্ত করবে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামকে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে রেলপথের দূরত্ব কমে যাবে ৮০ কিলোমিটার। শুধু চট্টগ্রামের সঙ্গে কমবে তাই নয়, কমবে ট্রান্সএশিয়ান বহুজাতিক পথ বা লৌহ রেশম পথের সঙ্গেও। শত বছরের স্বপ্ন হবে সত্যি।

ড. মাহমুদ নাসির জাহাঙ্গীরি : লেখক ও গবেষক

mahmoodnasirjahangiri@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন