পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়
jugantor
আশেপাশে চারপাশে
পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়

  চপল বাশার  

২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়

আজ ২৪ জানুয়ারি। ৫৩ বছর আগে ১৯৬৯ সালের এই দিনে ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। অভূতপূর্ব এই গণঅভ্যুত্থান সামরিক সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। উনসত্তরের সেই গণবিস্ফোরণেই পশ্চিমা স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়ের সূচনা হয়।

১৯৬২ সালে আইয়ুব সরকারের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে ছাত্রসমাজ দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সেটাই ছিল প্রথম আন্দোলন, যা পর্যায়ক্রমে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই দীর্ঘ গণআন্দোলনের সফল পরিণতি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। ষাটের দশকের গণআন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের উজ্জ্বলতম অধ্যায়, যা জাতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে গেছে।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা দেশের সংবিধান বাতিল করে সামরিক আইন জারি করেন। এর ২০ দিন পরই ২৭ অক্টোবর সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ দখল করেন এবং ইস্কান্দর মির্জাকে ওই দিনই বিশেষ বিমানে লন্ডন পাঠিয়ে দেন।

পাকিস্তানি শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষক আইয়ুব খান ক্ষমতায় বসেই সামরিক আইনবলে সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের নির্বিচারে গ্রেফতার শুরু হয় সারা দেশে। আইয়ুবের সামরিক নির্যাতন বেশি হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল শক্তির ওপর। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ তথা শত্রুপক্ষকে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছিল। সে কারণেই বাঙালি জনগণের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন নেমে আসে এবং তা অব্যাহত থাকে আইয়ুব শাসনের এক দশককালের বেশি সময় ধরে।

আইয়ুব খান এবং পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটি নতুন ধরনের সংবিধান চাপিয়ে দেয়। এ সংবিধানের ভিত্তি ছিল মৌলিক গণতন্ত্র (বেসিক ডেমোক্রেসি)। বলা হয়েছিল, মৌলিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হবে ইউনিয়ন, থানা, জেলা ও প্রাদেশিক পর্যায় পর্যন্ত। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে মৌলিক গণতন্ত্রীরা (বিডি মেম্বার) নির্বাচিত হবেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৪০ হাজার করে মোট ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচত হবেন এবং তারাই হবেন নির্বাচকমণ্ডলী। তাদের ভোটেই দেশের প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন।

সেই সময়ে, অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সব ক্ষেত্রেই বিশাল বৈষম্য ছিল। দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন, প্রশাসন, প্রতিরক্ষাসহ সব কিছুতেই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি ছিল, তবুও বাঙালিরা তাদের প্রাপ্য অধিকার কখনোই পায়নি।

আইয়ুব খান তার মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতি চালু করার সময় বলেন, দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে সমতা রক্ষার লক্ষ্যেই বিডি মেম্বারদের সংখ্যা সমান সমান রাখা হয়েছে। আসলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা নির্ধারিত হলে পূর্বাঞ্চল থেকেই বেশি সদস্য জাতীয় পরিষদে যেতেন, এমনকি পূর্বাঞ্চল থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকত। ক্ষমতা পশ্চিমে ধরে রাখার জন্যই সমতার কথা তারা বলেছিল।

আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পর পাকিস্তান মুসলিম লীগ নামে দল গঠন করেন। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুবের এই জয়ের পর তার দল মুসলিম লীগ ও ছাত্রসংগঠন এনএসএফ বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালাতে থাকে। আইয়ুবের নিয়োজিত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান নিজে এনএসএফ গুণ্ডাদের প্রশ্রয় ও মদদ দিতেন। ফলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

এনএসএফের সন্ত্রাস ও গুণ্ডামী সাধারণ ছাত্রসমাজকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এদিকে মুসলিম লীগ নেতারা বাংলা নববর্ষ পালনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন, রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। এতে বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও বিক্ষুব্ধ হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব বাংলার বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ৬-দফা উত্থাপন করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুসহ বহু রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রনেতাকে কারাবন্দি করা হয়। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুকে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ মামলার অন্যান্য অভিযুক্তকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে সেখানেই বিশেষ আদালতে বিচার শুরু করা হয় জুন মাসে।

আগরতলা মামলার বিচার চলাকালেই দেশের সর্বত্র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ১৯৬৯-এর জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় দশ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পরপরই তারা ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করেন। এই দাবিনামায় ছাত্রদের দাবি-দাওয়া ছাড়াও ছিল জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কিত দাবি। বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা দাবিও ১১ দফার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১১ দফার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় সমগ্র বাঙালি জাতি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা ঘোষণার পর ১৭ জানুয়ারি থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করতে থাকে। কর্মসূচিতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে বটতলায় সমাবেশ এবং রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল। গভর্নর মোনায়েম খানের সরকার সে সময় সারা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘটও চলছিল। প্রতিদিনই সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামত, পুলিশও লাঠিচার্জ করত, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করতো। ১৯ তারিখে গুলিবর্ষণও করে।

পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি একটি বিরাট বিক্ষোভ মিছিল বটতলা থেকে বের হয়ে মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। এ সময় পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশের একজন ডিএসপি তার রিভলভার দিয়ে মিছিলের দিকে গুলি ছুঁড়লে তা ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের বুকে লাগে। আসাদকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। আসাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ২১ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনের কর্মসূচি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল-শোক মিছিল, মশাল মিছিল, কালোব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৪ জানুয়ারি ডাকা হয় হরতাল। সবকটি কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পালিত হয়। পুলিশ-মিলিটারি আন্দোলন কর্মসূচি দমন করতে ব্যর্থ হয়।

২৪ জানুয়ারি সকাল থেকে ঢাকা শহরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়নি, কোনো অফিসে কাজ হয়নি, কোনো দোকান খোলেনি, রাস্তায় যানবাহন নামেনি। নেমেছিল লাখ লাখ মানুষ-মিছিলের পর মিছিল, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত।

মতিঝিল থেকে আসা একটি মিছিল সচিবালয়ের পূর্বদিকে এসে পৌঁছাতেই সেখানে অবস্থানরত পুলিশ-ইপিআর মিছিলে গুলি চালায়। মিছিলে অংশগ্রহণকারী নবকুমার ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিকের বুকে গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই মতিউর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। গুলিবর্ষণ বিক্ষুব্ধ জনতাকে থামাতে পারেনি। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তারা মতিউরের লাশ নিয়ে ইকবাল হল (এখন জহুরুল হক হল) মাঠে যায়। মাঠ তখন লোকে লোকারণ্য। মঞ্চে মতিউরের লাশ রাখা হয়। মতিউরের বাবা আজহার আলী মল্লিকও মঞ্চে উপস্থিত। তিনি বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে দু-একটি কথা বলেন।

ইকবাল হল থেকে মতিউরের লাশ নিয়ে একটি মিছিল সন্ধ্যার মধ্যেই মতিঝিলে ন্যাশনাল ব্যাংক (এখন সোনালী ব্যাংক) কলোনিতে যায়। সেখানেই মতিউর থাকত। তখন সারা শহরে কারফিউ, রাস্তায় পুলিশ-মিলিটারি টহল দিচ্ছে। এ অবস্থার মধ্যেই স্থানীয় ছাত্র ও জনতা রাত ১২টার আগেই মতিউরের লাশ গোপীবাগ কবরস্থানে দাফন করে।

সেদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত কারফিউর মধ্যেও ঢাকা শহরের অবস্থা ছিল ভয়ংকর। বিক্ষুব্ধ জনতা কোনো বাধা, গুলিবর্ষণ মানেনি। তারা সরকারি পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান, মনিং নিউজ ও দৈনিক পয়গাম অফিসে আগুন দেয়। সচিবালয়ের সামনের রাস্তায় পশ্চিমদিকে একজন মন্ত্রীর বাড়ি, মুসলিম লীগ নেতা খাজা হাসান আসকারি, খাজা শাহাবুদ্দিন, এনএ লস্করের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। শহরে প্রায় প্রতিটি মহল্লায় মুসলিম লীগ নেতাদের বাড়ি ও দলীয় কার্যালয় আক্রান্ত হয়।

পাকিস্তানের লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রায় ১১ বছর প্রেসিডেন্ট পদে থাকার পর স্বপ্ন দেখছিলেন দেশের আজীবন প্রেসিডেন্ট হবেন। তার দল মুসলিম লীগ এই মর্মে একটি প্রস্তাবও তৈরি করেছিল জাতীয় পরিষদে পেশ করার জন্য। ঢাকা থেকে সেদিনের গণঅভ্যুত্থানের খবর আইয়ুব নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন। তার আজীবন প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন সেদিনই ভেঙে গিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের ঠিক দুই মাস পর আইয়ুব পদত্যাগ করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এটাই ছিল গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথমবারের মতো পিছু হটে যাওয়া, এক কথায় পরাজয়।

কিন্তু এখানেই সব শেষ হয়নি, তাদের ষড়যন্ত্র থামেনি। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা চালায়। নয় মাস যুদ্ধের পর দখলদার পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

basharbd@gmail.com

আশেপাশে চারপাশে

পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়

 চপল বাশার 
২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়
গণঅভ্যুত্থানে উত্তাল ১৯৬৯ সাল। ফাইল ছবি

আজ ২৪ জানুয়ারি। ৫৩ বছর আগে ১৯৬৯ সালের এই দিনে ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) সংঘটিত হয়েছিল ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান। অভূতপূর্ব এই গণঅভ্যুত্থান সামরিক সমর্থনপুষ্ট পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। উনসত্তরের সেই গণবিস্ফোরণেই পশ্চিমা স্বৈরশাসকদের প্রথম পরাজয়ের সূচনা হয়।

১৯৬২ সালে আইয়ুব সরকারের শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বাতিলের দাবিতে ছাত্রসমাজ দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সেটাই ছিল প্রথম আন্দোলন, যা পর্যায়ক্রমে ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই দীর্ঘ গণআন্দোলনের সফল পরিণতি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান। ষাটের দশকের গণআন্দোলন বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের উজ্জ্বলতম অধ্যায়, যা জাতিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে নিয়ে গেছে।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জা দেশের সংবিধান বাতিল করে সামরিক আইন জারি করেন। এর ২০ দিন পরই ২৭ অক্টোবর সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে প্রেসিডেন্ট পদ দখল করেন এবং ইস্কান্দর মির্জাকে ওই দিনই বিশেষ বিমানে লন্ডন পাঠিয়ে দেন।

পাকিস্তানি শাসক ও শোষকগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষক আইয়ুব খান ক্ষমতায় বসেই সামরিক আইনবলে সব ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের নির্বিচারে গ্রেফতার শুরু হয় সারা দেশে। আইয়ুবের সামরিক নির্যাতন বেশি হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল শক্তির ওপর। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ তথা শত্রুপক্ষকে সঠিকভাবেই চিহ্নিত করতে পেরেছিল। সে কারণেই বাঙালি জনগণের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন নেমে আসে এবং তা অব্যাহত থাকে আইয়ুব শাসনের এক দশককালের বেশি সময় ধরে।

আইয়ুব খান এবং পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটি নতুন ধরনের সংবিধান চাপিয়ে দেয়। এ সংবিধানের ভিত্তি ছিল মৌলিক গণতন্ত্র (বেসিক ডেমোক্রেসি)। বলা হয়েছিল, মৌলিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হবে ইউনিয়ন, থানা, জেলা ও প্রাদেশিক পর্যায় পর্যন্ত। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে মৌলিক গণতন্ত্রীরা (বিডি মেম্বার) নির্বাচিত হবেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৪০ হাজার করে মোট ৮০ হাজার মৌলিক গণতন্ত্রী নির্বাচত হবেন এবং তারাই হবেন নির্বাচকমণ্ডলী। তাদের ভোটেই দেশের প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন।

সেই সময়ে, অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সব ক্ষেত্রেই বিশাল বৈষম্য ছিল। দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন, প্রশাসন, প্রতিরক্ষাসহ সব কিছুতেই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে বেশি ছিল, তবুও বাঙালিরা তাদের প্রাপ্য অধিকার কখনোই পায়নি।

আইয়ুব খান তার মৌলিক গণতন্ত্র পদ্ধতি চালু করার সময় বলেন, দেশের দুই অঞ্চলের মধ্যে সমতা রক্ষার লক্ষ্যেই বিডি মেম্বারদের সংখ্যা সমান সমান রাখা হয়েছে। আসলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা নির্ধারিত হলে পূর্বাঞ্চল থেকেই বেশি সদস্য জাতীয় পরিষদে যেতেন, এমনকি পূর্বাঞ্চল থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকত। ক্ষমতা পশ্চিমে ধরে রাখার জন্যই সমতার কথা তারা বলেছিল।

আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করার পর পাকিস্তান মুসলিম লীগ নামে দল গঠন করেন। ১৯৬৫ সালের জানুয়ারিতে মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুবের এই জয়ের পর তার দল মুসলিম লীগ ও ছাত্রসংগঠন এনএসএফ বেপরোয়া হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলা চালাতে থাকে। আইয়ুবের নিয়োজিত পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান নিজে এনএসএফ গুণ্ডাদের প্রশ্রয় ও মদদ দিতেন। ফলে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।

এনএসএফের সন্ত্রাস ও গুণ্ডামী সাধারণ ছাত্রসমাজকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এদিকে মুসলিম লীগ নেতারা বাংলা নববর্ষ পালনের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন, রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়। এতে বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও বিক্ষুব্ধ হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব বাংলার বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক ৬-দফা উত্থাপন করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধুসহ বহু রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রনেতাকে কারাবন্দি করা হয়। ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুকে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামি করা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ মামলার অন্যান্য অভিযুক্তকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করে সেখানেই বিশেষ আদালতে বিচার শুরু করা হয় জুন মাসে।

আগরতলা মামলার বিচার চলাকালেই দেশের সর্বত্র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ১৯৬৯-এর জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় দশ সদস্যবিশিষ্ট সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পরপরই তারা ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করেন। এই দাবিনামায় ছাত্রদের দাবি-দাওয়া ছাড়াও ছিল জাতীয় বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কিত দাবি। বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা দাবিও ১১ দফার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১১ দফার আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় সমগ্র বাঙালি জাতি। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা ঘোষণার পর ১৭ জানুয়ারি থেকে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করতে থাকে। কর্মসূচিতে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে বটতলায় সমাবেশ এবং রাস্তায় বিক্ষোভ মিছিল। গভর্নর মোনায়েম খানের সরকার সে সময় সারা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘটও চলছিল। প্রতিদিনই সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছাত্ররা মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামত, পুলিশও লাঠিচার্জ করত, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করতো। ১৯ তারিখে গুলিবর্ষণও করে।

পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি একটি বিরাট বিক্ষোভ মিছিল বটতলা থেকে বের হয়ে মেডিকেল কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। এ সময় পুলিশ গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশের একজন ডিএসপি তার রিভলভার দিয়ে মিছিলের দিকে গুলি ছুঁড়লে তা ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের বুকে লাগে। আসাদকে হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। আসাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ২১ থেকে ২৩ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনের কর্মসূচি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল-শোক মিছিল, মশাল মিছিল, কালোব্যাজ ধারণ, কালো পতাকা উত্তোলন। ২৪ জানুয়ারি ডাকা হয় হরতাল। সবকটি কর্মসূচি সুষ্ঠুভাবে পালিত হয়। পুলিশ-মিলিটারি আন্দোলন কর্মসূচি দমন করতে ব্যর্থ হয়।

২৪ জানুয়ারি সকাল থেকে ঢাকা শহরে পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস হয়নি, কোনো অফিসে কাজ হয়নি, কোনো দোকান খোলেনি, রাস্তায় যানবাহন নামেনি। নেমেছিল লাখ লাখ মানুষ-মিছিলের পর মিছিল, স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত।

মতিঝিল থেকে আসা একটি মিছিল সচিবালয়ের পূর্বদিকে এসে পৌঁছাতেই সেখানে অবস্থানরত পুলিশ-ইপিআর মিছিলে গুলি চালায়। মিছিলে অংশগ্রহণকারী নবকুমার ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিকের বুকে গুলি লাগে। ঘটনাস্থলেই মতিউর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। গুলিবর্ষণ বিক্ষুব্ধ জনতাকে থামাতে পারেনি। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে তারা মতিউরের লাশ নিয়ে ইকবাল হল (এখন জহুরুল হক হল) মাঠে যায়। মাঠ তখন লোকে লোকারণ্য। মঞ্চে মতিউরের লাশ রাখা হয়। মতিউরের বাবা আজহার আলী মল্লিকও মঞ্চে উপস্থিত। তিনি বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশে দু-একটি কথা বলেন।

ইকবাল হল থেকে মতিউরের লাশ নিয়ে একটি মিছিল সন্ধ্যার মধ্যেই মতিঝিলে ন্যাশনাল ব্যাংক (এখন সোনালী ব্যাংক) কলোনিতে যায়। সেখানেই মতিউর থাকত। তখন সারা শহরে কারফিউ, রাস্তায় পুলিশ-মিলিটারি টহল দিচ্ছে। এ অবস্থার মধ্যেই স্থানীয় ছাত্র ও জনতা রাত ১২টার আগেই মতিউরের লাশ গোপীবাগ কবরস্থানে দাফন করে।

সেদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত কারফিউর মধ্যেও ঢাকা শহরের অবস্থা ছিল ভয়ংকর। বিক্ষুব্ধ জনতা কোনো বাধা, গুলিবর্ষণ মানেনি। তারা সরকারি পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান, মনিং নিউজ ও দৈনিক পয়গাম অফিসে আগুন দেয়। সচিবালয়ের সামনের রাস্তায় পশ্চিমদিকে একজন মন্ত্রীর বাড়ি, মুসলিম লীগ নেতা খাজা হাসান আসকারি, খাজা শাহাবুদ্দিন, এনএ লস্করের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে। শহরে প্রায় প্রতিটি মহল্লায় মুসলিম লীগ নেতাদের বাড়ি ও দলীয় কার্যালয় আক্রান্ত হয়।

পাকিস্তানের লৌহমানব ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান প্রায় ১১ বছর প্রেসিডেন্ট পদে থাকার পর স্বপ্ন দেখছিলেন দেশের আজীবন প্রেসিডেন্ট হবেন। তার দল মুসলিম লীগ এই মর্মে একটি প্রস্তাবও তৈরি করেছিল জাতীয় পরিষদে পেশ করার জন্য। ঢাকা থেকে সেদিনের গণঅভ্যুত্থানের খবর আইয়ুব নিশ্চয়ই পেয়েছিলেন। তার আজীবন প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন সেদিনই ভেঙে গিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানের ঠিক দুই মাস পর আইয়ুব পদত্যাগ করে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। এটাই ছিল গণআন্দোলনের চাপে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের প্রথমবারের মতো পিছু হটে যাওয়া, এক কথায় পরাজয়।

কিন্তু এখানেই সব শেষ হয়নি, তাদের ষড়যন্ত্র থামেনি। ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা চালায়। নয় মাস যুদ্ধের পর দখলদার পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।

চপল বাশার : সাংবাদিক, লেখক

basharbd@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন