বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হাল মেনে নেওয়া যায় না
jugantor
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হাল মেনে নেওয়া যায় না

  ড. মো. কামরুজ্জামান  

২৫ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লাটিন শব্দ ইউনিভার্সিটাসের বাংলা অনুবাদ হলো বিশ্ববিদ্যালয়। মধ্যযুগে শব্দটি বিভিন্ন পেশাজীবীর সংঘ ও সমিতি অর্থে ব্যবহৃত হতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে শব্দটি ইউরোপের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমিতি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। সময়ের পরিক্রমায় এটি ছাত্র ও শিক্ষক সংঘ হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে এ শব্দটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তীকালে এ সংঘই ইউনিভার্সিটি নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রথম বা প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হলো ‘আল-কারাউইন’ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজে স্থাপিত হয়। মুসলিম শাসক ফাতিমা আল-ফিহরি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রাচীনতম দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হলো মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ৯৭০ সালে ফাতেমীয় শাসনামলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ফাতেমী সেনানায়ক জাওহর সিসিলি। আর ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হলো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১০৯৬ সালে।

প্রাচীন এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে। ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রতিষ্ঠাকালীন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু কালক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ধর্মচর্চাকে নির্দয়ভাবে নির্বাসনে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আধুনিক যুগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হলো, বিশ্বমানের পাঠদান ও গবেষণার মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি বৃদ্ধি করা। উৎকর্ষ, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সারা দুনিয়াকে আকৃষ্ট করা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হলো, পাণ্ডিত্য ও গবেষণা দ্বারা নিত্য নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করা। সময়োপযোগী শিক্ষণের মাধ্যমে জ্ঞানের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া। জনসেবার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটানো।

চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। সব ধরনের বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি ও সংরক্ষণ করা। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মৌলিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করা। উনিশ শতকের বিখ্যাত খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও ব্রিটিশ ধর্মতত্ত্ববিদ কার্ডিনাল জন হেনরি নিউম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন এক পরিবেশ, যেখানে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে মানুষ আগমন করবেন। তারা এক জায়গায় থাকবেন। ব্যাপকভাবে ভাবের আদান-প্রদান করবেন। তাদের একে অপরের জ্ঞান ও মনের সঙ্গে মতান্তর সৃষ্টি হবে। আর এ মতান্তরের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে নতুন জ্ঞান। এখানে পুরোনো জ্ঞানের ব্যাপক বিশ্লেষণ হবে; হবে চুলচেরা বিশ্লেষণ, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। এখানে অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীর যৌথ পাণ্ডিত্য মিলে আবিষ্কার হবে নতুন জ্ঞান। সৃষ্টি হবে নতুন গবেষণা। আর পুরোনো জ্ঞানকে ঘষে মেজে করবেন পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন।

সংক্ষেপে বর্ণিত এসব লক্ষ্য এটাই প্রমাণ করে যে, উন্নত জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকে বদলে দেওয়ার নাম বিশ্ববিদ্যালয়। ভালো মানুষ তৈরির নিরন্তর প্রচেষ্টা করার এক কারখানার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। জাত আর পেশা ভুলে যোগ্য মানুষ তৈরি করার প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। নিজ দেশের মান ও গৌরব বৃদ্ধির অবিরাম সাধনার নাম বিশ্ববিদ্যালয়। দিনের পর দিন নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রচেষ্টায় থাকার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। জগৎবিখ্যাত নতুন ফর্মুলা তৈরির নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়।

মহাকাশের নতুন যান ডিজাইনের সূত্র আবিষ্কার করার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। সৃজনশীল গবেষক তৈরি করার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক মহান পাঠশালার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়। আর শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব শুধু পাঠগ্রহণ নয়। শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় আত্মিক উন্নয়ন সাধন করাই হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মৌলিক দায়িত্ব।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বিশ্বসমাজের জন্য একটি আলোকবর্তিকা। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে পথে হাঁটতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতমুখী স্রোতের অনুকূলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ পেয়েছে। এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা একেবারে হয় না বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য রাজনৈতিক পরিচয়েই তার পদ অলংকৃত করে থাকেন। ফলে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সময় কিছু শিক্ষকের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। এ পদে নিয়োগ পেতে একজন উপাচার্যকে সর্বপ্রথম দলীয় আনুগত্যের প্রমাণ দিতে হয়। ফলে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি আর নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করতে পারেন না।

বাকি সময়টা তাকে সরকারের পদলেহন করেই চলা লাগে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপকরা বিভিন্ন দলীয় বৃত্তে বন্দি হয়ে আছেন। এ বন্দিত্বের মূল উদ্দেশ্য অর্থ, স্বার্থ আর ক্ষমতা। ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার লোভে সংকীর্ণ দলীয় বন্দিত্ব থেকে তারা বের হয়ে আসেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের রাজনীতির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিও এখন দলীয় মদদপুষ্ট। ছাত্র রাজনীতি থেকে নৈতিকতা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। তিন দশক ধরে বাংলাদেশের জনগণ ক্রমান্বয়ে এর অবনতিই দেখতে পাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতি এখন আর ছাত্রদের কল্যাণে পরিচালিত হয় না। এ রাজনীতি এখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনৈতিক অর্থ উপার্জনের এক ছকে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক এ ছক মেধাবী ছাত্রদের মেধা ধ্বংস করে দিয়েছে। কারণ দল না করলে যোগ্যতম স্থানে মেধাবীদের ঠাঁই হয় না। ভালো চাকরি পেতে হলে টাকা, দলীয় পরিচয় এবং মন্ত্রী-আমলাদের ফোনই একমাত্র ভরসা। এখানে মেধাকে উপেক্ষা করা হয়। দলীয় বৃত্তে বন্দি থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনের জায়গায় স্থান পেয়েছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। এ স্বার্থের নির্মম শিকার হচ্ছে নিরীহ মেধাবী শিক্ষার্থীরা।

এ তালিকায় সর্বশেষ নাম লিখিয়েছেন বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার। গত তিন দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিহত হয়েছে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয়েছে ৭৫ জন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয়েছে ২৫ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয়েছে ৪ জন। এসব তথ্যের বাইরে হতাহতের অনেক খবর আমাদের অজানা রয়ে গেছে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি দলীয় অভ্যন্তরেও সংঘর্ষের ঘটনা কম নয়।

প্রতিপক্ষ ও দলীয় অভ্যন্তরে এ পর্যন্ত সংঘর্ষ ঘটেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক। দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭১। অথচ বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস ছিল অত্যন্ত গৌরবের। ১৯৬২, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালের আন্দোলন ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষ্য প্রমাণ করে। এ উজ্জ্বল ইতিহাস বাঙালি জাতির জন্য একদিকে গর্বের, অন্যদিকে আনন্দের। আমরা এসব আন্দোলনকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকি। তার মানে হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক ইতিহাস সাফল্যে ভরা।

তবে চিন্তার বিষয় হলো, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো তেমন কোনো সাফল্য পায়নি। এ ক্ষেত্রে বর্তমান র‌্যাংকিং-এর ক্রমানুসারে পৃথিবীর সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এমআইটি (ইউএসএ), অক্সফোর্ড (ইউকে), স্ট্যানফোর্ড (ইউএসএ), কেমব্রিজ (ইউকে), হার্ভার্ড (ইউএসএ), ক্যাল-টেক (ইউএসএ), ইম্পিরিয়াল কলেজ (ইউকে), সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (সুইজারল্যান্ড), ইউনিভার্সিটি কলেজ (ইউকে) ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো (ইউএসএ)।

এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময়োপযোগী উন্নত জ্ঞান চর্চার শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে পরিচিত। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো সরকারের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না। সেখানে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতির কোনো নাম-গন্ধও নেই। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে দিনরাত পৃথিবীকে নতুন জ্ঞান উপহার দিতে ব্যস্ত। সেখানে ভিসি ও অন্যান্য পদ নির্ধারিত হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের যোগ্যতার ভিত্তিতে।

দুর্ভাগ্যই বলতে হয়, উপাচার্য হতে বাংলাদেশের অনেক অধ্যাপক মন্ত্রী-আমলা ও এমপিদের তোয়াজ করে বেড়ান! এসব কারণে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এগিয়ে আসতে পারেনি। অবশ্য রাজনীতি শব্দটি অতি পবিত্র এক শব্দ। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম-নীতিকে রাজনীতি বলা হয়। কিন্তু সে নিয়ম-নীতি আজ নোংরা নীতিতে পরিণত হয়েছে। এ রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একাডেমিক পরিবেশকেও আজ নষ্ট করে দিয়েছে।

এজন্য স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, গবেষক ও আবিষ্কারক জন্ম নেয়নি। প্রতিবছর এখানে জন্ম নেন কিছু বিসিএস ক্যাডার। এ ক্যাডাররাই পরবর্তীকালে ক্ষমতাধর আমলায় পরিণত হন। আর তাদেরই ডিরেকশনে পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিষয়াদি। এসব কারণেই বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও র‌্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটও এ তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি! এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও জায়গা হয়নি বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও!

গত ১৩ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের প্রভোস্ট বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পটভূমিতে শুরু হয় উপাচার্য পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সমাধান ছাড়াই প্রশাসন কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা! কিন্তু শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে তারা আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কিছুর পেছনে রয়েছে ঘৃণ্য রাজনীতির খেলা। উল্লেখিত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ছাত্র-পুলিশ দাঙ্গার কোনো ঘটনা কোনোদিন ঘটেনি। কালেভদ্রে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী হামলা হলেও পুলিশ দিয়ে ছাত্র পেটানোর নজির নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার মতো কোনো ঘটনাও সেখানে ঘটে না। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়া হয় না। শিক্ষকরা বসে বসে নেতার পদলেহন করেন না। সারা দিন নোংরা রাজনীতি নিয়েও তারা সময় ব্যয় করেন না। সে দেশের সরকারগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলেন না।

ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত জ্ঞান-গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হয়। তরুণ-তরুণীরা বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করে। শিক্ষার্থীরা জগৎখ্যাত আইডিয়া তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করে। মহাকাশের নতুন নতুন যান ডিজাইন করে। আর আমরা? আমাদের তরুণদের আমরা ঠেলে দিই রাজনীতিতে! তাদের বাধ্য করি জীবনের সবচেয়ে প্রডাক্টিভ সময়কে তুচ্ছ কাজে ব্যয় করতে। নিচু, অসভ্য আর নোংরা সমাজ ছাড়া এগুলো অন্য কোথাও হয় না।

বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসব নোংরা রাজনীতি দূর করা দরকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। কারণ ছাত্রদের লাঠিয়াল বাহিনী বানিয়ে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে শামিল করা যাবে না। শুধু কিছু রাস্তা আর সেতুর উন্নয়ন ঘটিয়ে উন্নত রাষ্ট্র গড়াও সম্ভব হবে না।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.knzaman@gmail.com

বিশ্ববিদ্যালয়ের এই হাল মেনে নেওয়া যায় না

 ড. মো. কামরুজ্জামান 
২৫ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

লাটিন শব্দ ইউনিভার্সিটাসের বাংলা অনুবাদ হলো বিশ্ববিদ্যালয়। মধ্যযুগে শব্দটি বিভিন্ন পেশাজীবীর সংঘ ও সমিতি অর্থে ব্যবহৃত হতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে শব্দটি ইউরোপের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সমিতি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। সময়ের পরিক্রমায় এটি ছাত্র ও শিক্ষক সংঘ হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি পায়। বিশ্বব্যাপী ধীরে ধীরে এ শব্দটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করে। পরবর্তীকালে এ সংঘই ইউনিভার্সিটি নামে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের প্রথম বা প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হলো ‘আল-কারাউইন’ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ৮৫৯ সালে মরক্কোর ফেজে স্থাপিত হয়। মুসলিম শাসক ফাতিমা আল-ফিহরি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা। প্রাচীনতম দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হলো মিসরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়। ৯৭০ সালে ফাতেমীয় শাসনামলে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন ফাতেমী সেনানায়ক জাওহর সিসিলি। আর ইংরেজি ভাষাভাষী জগতের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম হলো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১০৯৬ সালে।

প্রাচীন এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ধর্মীয় মতাদর্শের ভিত্তিতে। ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব চর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। প্রতিষ্ঠাকালীন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ছিল চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন। কিন্তু কালক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ধর্মচর্চাকে নির্দয়ভাবে নির্বাসনে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আধুনিক যুগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য হলো, বিশ্বমানের পাঠদান ও গবেষণার মাধ্যমে দুনিয়াজুড়ে খ্যাতি বৃদ্ধি করা। উৎকর্ষ, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে সারা দুনিয়াকে আকৃষ্ট করা। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হলো, পাণ্ডিত্য ও গবেষণা দ্বারা নিত্য নতুন জ্ঞান আবিষ্কার করা। সময়োপযোগী শিক্ষণের মাধ্যমে জ্ঞানের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে দেওয়া। জনসেবার মাধ্যমে নতুন জ্ঞানের প্রয়োগ ঘটানো।

চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করা। সব ধরনের বৈষম্যহীন পরিবেশ তৈরি ও সংরক্ষণ করা। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মৌলিক মূল্যবোধকে জাগ্রত করা। উনিশ শতকের বিখ্যাত খ্রিষ্টান ধর্মযাজক ও ব্রিটিশ ধর্মতত্ত্ববিদ কার্ডিনাল জন হেনরি নিউম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন এক পরিবেশ, যেখানে পৃথিবীর সব প্রান্ত থেকে মানুষ আগমন করবেন। তারা এক জায়গায় থাকবেন। ব্যাপকভাবে ভাবের আদান-প্রদান করবেন। তাদের একে অপরের জ্ঞান ও মনের সঙ্গে মতান্তর সৃষ্টি হবে। আর এ মতান্তরের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে নতুন জ্ঞান। এখানে পুরোনো জ্ঞানের ব্যাপক বিশ্লেষণ হবে; হবে চুলচেরা বিশ্লেষণ, পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন। এখানে অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীর যৌথ পাণ্ডিত্য মিলে আবিষ্কার হবে নতুন জ্ঞান। সৃষ্টি হবে নতুন গবেষণা। আর পুরোনো জ্ঞানকে ঘষে মেজে করবেন পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন।

সংক্ষেপে বর্ণিত এসব লক্ষ্য এটাই প্রমাণ করে যে, উন্নত জ্ঞানচর্চা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজকে বদলে দেওয়ার নাম বিশ্ববিদ্যালয়। ভালো মানুষ তৈরির নিরন্তর প্রচেষ্টা করার এক কারখানার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। জাত আর পেশা ভুলে যোগ্য মানুষ তৈরি করার প্রতিষ্ঠান হলো বিশ্ববিদ্যালয়। নিজ দেশের মান ও গৌরব বৃদ্ধির অবিরাম সাধনার নাম বিশ্ববিদ্যালয়। দিনের পর দিন নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রচেষ্টায় থাকার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। জগৎবিখ্যাত নতুন ফর্মুলা তৈরির নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়।

মহাকাশের নতুন যান ডিজাইনের সূত্র আবিষ্কার করার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। সৃজনশীল গবেষক তৈরি করার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক মহান পাঠশালার নাম হলো বিশ্ববিদ্যালয়। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পাঠদান নয়। আর শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব শুধু পাঠগ্রহণ নয়। শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে জাতীয় আত্মিক উন্নয়ন সাধন করাই হলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মৌলিক দায়িত্ব।

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি দেশের জন্য নয়, বিশ্বসমাজের জন্য একটি আলোকবর্তিকা। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সে পথে হাঁটতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপরীতমুখী স্রোতের অনুকূলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক ধরনের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ পেয়েছে। এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা একেবারে হয় না বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য রাজনৈতিক পরিচয়েই তার পদ অলংকৃত করে থাকেন। ফলে যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সময় কিছু শিক্ষকের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায়। এ পদে নিয়োগ পেতে একজন উপাচার্যকে সর্বপ্রথম দলীয় আনুগত্যের প্রমাণ দিতে হয়। ফলে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি আর নিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করতে পারেন না।

বাকি সময়টা তাকে সরকারের পদলেহন করেই চলা লাগে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত অধ্যাপকরা বিভিন্ন দলীয় বৃত্তে বন্দি হয়ে আছেন। এ বন্দিত্বের মূল উদ্দেশ্য অর্থ, স্বার্থ আর ক্ষমতা। ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধার লোভে সংকীর্ণ দলীয় বন্দিত্ব থেকে তারা বের হয়ে আসেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতি কলুষিত হয়ে পড়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, দেশের রাজনীতির মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতিও এখন দলীয় মদদপুষ্ট। ছাত্র রাজনীতি থেকে নৈতিকতা অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। তিন দশক ধরে বাংলাদেশের জনগণ ক্রমান্বয়ে এর অবনতিই দেখতে পাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতি এখন আর ছাত্রদের কল্যাণে পরিচালিত হয় না। এ রাজনীতি এখন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা অনৈতিক অর্থ উপার্জনের এক ছকে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক এ ছক মেধাবী ছাত্রদের মেধা ধ্বংস করে দিয়েছে। কারণ দল না করলে যোগ্যতম স্থানে মেধাবীদের ঠাঁই হয় না। ভালো চাকরি পেতে হলে টাকা, দলীয় পরিচয় এবং মন্ত্রী-আমলাদের ফোনই একমাত্র ভরসা। এখানে মেধাকে উপেক্ষা করা হয়। দলীয় বৃত্তে বন্দি থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। ন্যায়ভিত্তিক আন্দোলনের জায়গায় স্থান পেয়েছে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ। এ স্বার্থের নির্মম শিকার হচ্ছে নিরীহ মেধাবী শিক্ষার্থীরা।

এ তালিকায় সর্বশেষ নাম লিখিয়েছেন বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার। গত তিন দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিহত হয়েছে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয়েছে ৭৫ জন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয়েছে ২৫ জন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হয়েছে ৪ জন। এসব তথ্যের বাইরে হতাহতের অনেক খবর আমাদের অজানা রয়ে গেছে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষের পাশাপাশি দলীয় অভ্যন্তরেও সংঘর্ষের ঘটনা কম নয়।

প্রতিপক্ষ ও দলীয় অভ্যন্তরে এ পর্যন্ত সংঘর্ষ ঘটেছে প্রায় পাঁচ শতাধিক। দলীয় অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৭১। অথচ বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাস ছিল অত্যন্ত গৌরবের। ১৯৬২, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালের আন্দোলন ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষ্য প্রমাণ করে। এ উজ্জ্বল ইতিহাস বাঙালি জাতির জন্য একদিকে গর্বের, অন্যদিকে আনন্দের। আমরা এসব আন্দোলনকে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকি। তার মানে হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর রাজনৈতিক ইতিহাস সাফল্যে ভরা।

তবে চিন্তার বিষয় হলো, গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো তেমন কোনো সাফল্য পায়নি। এ ক্ষেত্রে বর্তমান র‌্যাংকিং-এর ক্রমানুসারে পৃথিবীর সেরা ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্যের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এমআইটি (ইউএসএ), অক্সফোর্ড (ইউকে), স্ট্যানফোর্ড (ইউএসএ), কেমব্রিজ (ইউকে), হার্ভার্ড (ইউএসএ), ক্যাল-টেক (ইউএসএ), ইম্পিরিয়াল কলেজ (ইউকে), সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (সুইজারল্যান্ড), ইউনিভার্সিটি কলেজ (ইউকে) ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো (ইউএসএ)।

এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সময়োপযোগী উন্নত জ্ঞান চর্চার শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে পরিচিত। এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো সরকারের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় না। সেখানে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতির কোনো নাম-গন্ধও নেই। উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে দিনরাত পৃথিবীকে নতুন জ্ঞান উপহার দিতে ব্যস্ত। সেখানে ভিসি ও অন্যান্য পদ নির্ধারিত হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের যোগ্যতার ভিত্তিতে।

দুর্ভাগ্যই বলতে হয়, উপাচার্য হতে বাংলাদেশের অনেক অধ্যাপক মন্ত্রী-আমলা ও এমপিদের তোয়াজ করে বেড়ান! এসব কারণে এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এগিয়ে আসতে পারেনি। অবশ্য রাজনীতি শব্দটি অতি পবিত্র এক শব্দ। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ম-নীতিকে রাজনীতি বলা হয়। কিন্তু সে নিয়ম-নীতি আজ নোংরা নীতিতে পরিণত হয়েছে। এ রাজনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একাডেমিক পরিবেশকেও আজ নষ্ট করে দিয়েছে।

এজন্য স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, গবেষক ও আবিষ্কারক জন্ম নেয়নি। প্রতিবছর এখানে জন্ম নেন কিছু বিসিএস ক্যাডার। এ ক্যাডাররাই পরবর্তীকালে ক্ষমতাধর আমলায় পরিণত হন। আর তাদেরই ডিরেকশনে পরিচালিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক বিষয়াদি। এসব কারণেই বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও র‌্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটও এ তালিকায় স্থান করে নিতে পারেনি! এক হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও জায়গা হয়নি বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও!

গত ১৩ জানুয়ারি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের প্রভোস্ট বিরোধী আন্দোলন। এ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পটভূমিতে শুরু হয় উপাচার্য পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত কোনো ধরনের সমাধান ছাড়াই প্রশাসন কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা! কিন্তু শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন এখনো চলমান রয়েছে। উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে তারা আমরণ অনশন চালিয়ে যাচ্ছে। এসব কিছুর পেছনে রয়েছে ঘৃণ্য রাজনীতির খেলা। উল্লেখিত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে ছাত্র-পুলিশ দাঙ্গার কোনো ঘটনা কোনোদিন ঘটেনি। কালেভদ্রে শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী হামলা হলেও পুলিশ দিয়ে ছাত্র পেটানোর নজির নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার মতো কোনো ঘটনাও সেখানে ঘটে না। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের রাজনীতিতে ঠেলে দেওয়া হয় না। শিক্ষকরা বসে বসে নেতার পদলেহন করেন না। সারা দিন নোংরা রাজনীতি নিয়েও তারা সময় ব্যয় করেন না। সে দেশের সরকারগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের নিয়ে রাজনৈতিক খেলা খেলেন না।

ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নত জ্ঞান-গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হয়। তরুণ-তরুণীরা বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করে। শিক্ষার্থীরা জগৎখ্যাত আইডিয়া তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করে। মহাকাশের নতুন নতুন যান ডিজাইন করে। আর আমরা? আমাদের তরুণদের আমরা ঠেলে দিই রাজনীতিতে! তাদের বাধ্য করি জীবনের সবচেয়ে প্রডাক্টিভ সময়কে তুচ্ছ কাজে ব্যয় করতে। নিচু, অসভ্য আর নোংরা সমাজ ছাড়া এগুলো অন্য কোথাও হয় না।

বাংলাদেশকে উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত করতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসব নোংরা রাজনীতি দূর করা দরকার। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। কারণ ছাত্রদের লাঠিয়াল বাহিনী বানিয়ে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে শামিল করা যাবে না। শুধু কিছু রাস্তা আর সেতুর উন্নয়ন ঘটিয়ে উন্নত রাষ্ট্র গড়াও সম্ভব হবে না।

ড. মো. কামরুজ্জামান : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

dr.knzaman@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন