কোন পথে যাচ্ছে শ্রীলংকা
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
কোন পথে যাচ্ছে শ্রীলংকা

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

১২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ শ্রীলংকা। শ্রীলংকা একটি দ্বীপরাষ্ট্র। এর চারদিকে রয়েছে ভারত মহাসাগর। শ্রীলংকা উত্তরদিক থেকে ভারতের খুব কাছাকাছি। ভারতের সন্নিকটবর্তী শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চল যদিও ভারত মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন, তা সত্ত্বেও এ জায়গাটি ভারতে পৌঁছানোর জন্য খুবই সুবিধাজনক। দূরত্বের দিক থেকেও খুব কাছাকাছি।

শ্রীলংকার এ অংশে সমুদ্রের বুক চিরে ছোট ছোট পাথরের দ্বীপ রয়েছে। এই পাথরের ক্ষুদ্র দ্বীপগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত যাতে মনে হয় এগুলোর ওপর লাফ দিয়ে ভারতে পৌঁছানো যায়। লোকশ্রুতি আছে, রামচন্দের বাহিনীর হনুমানগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে শ্রীলংকায় পৌঁছে গিয়েছিল। এসব হনুমান রামের সৈন্যদের সমুদ্র অতিক্রম করে যেতে সাহায্য করেছিল। ১৯৪৮ সালে শ্রীলংকা ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর শ্রীলংকা বেশ দ্রুতগতিতে অর্থনীতিতে এগিয়ে যায়। এর প্রবৃদ্ধির হারও ছিল খুবই সন্তোষজনক। শ্রীলংকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পায়। মানবসম্পদ সূচকের দিক থেকেও শ্রীলংকার অর্জন ছিল খুবই ঈর্ষণীয়। শ্রীলংকা শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করে।

দলমতনির্বিশেষে শ্রীলংকার সরকারগুলো মানবসম্পদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব অর্জন করে। বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রধান শক্তিগুলো শ্রীলংকার বন্ধুত্ব অর্জনে বরাবরই সচেষ্ট থেকেছে।

শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলের সমুদ্রের মধ্যে পাথরের দ্বীপগুলোকে ভিত্তি করে ভারত তার নিজ ভূখণ্ডকে শ্রীলংকার সঙ্গে একটি বড় সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। বিভিন্ন সময়ে ভারত ও শ্রীলংকার মধ্যে সেতু নির্মাণের প্রশ্নে আলাপ-আলোচনা হয়। কখনো কখনো মনে হয়েছে এ ব্যাপারে শ্রীলংকার সরকার উৎসাহী। কিন্তু এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।

শ্রীলংকার জনগণের মধ্যে সেতু নির্মাণ প্রশ্নে আগ্রহ দেখা যায়নি। তারা শঙ্কিতবোধ করেছে। সেতু নির্মাণ হলে ভারত শ্রীলংকার অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলবে-এমন একটি দুর্ভাবনা শ্রীলংকার জনগণের মধ্যে রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিমান চলাচলে তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু শ্রীলংকা পাকিস্তানকে কলম্বো বিমানবন্দর ব্যবহার করতে দেয়। এর ফলে পাকিস্তানি সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

শ্রীলংকা সার্কেরও সদস্য। সার্কের সদস্য হিসাবে শ্রীলংকা সব সময় ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। দেশটি চীনকে হাম্বানটোটায় একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করার জন্য অনুমতি দেয়। চীনা ঋণের অর্থে বন্দরটি নির্মিত হয়। এখন পর্যন্ত বন্দরটি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য খুব একটা ব্যবহৃত হয়নি। ফলে অর্থনীতির বিচারে বন্দরটি লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বন্দরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রীলংকা এ বন্দর নির্মাণের জন্য চীনের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছিল তার কিস্তির অর্থ প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। এরপর এ বন্দরটি চীন ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয়। এ লিজ চুক্তিতে মালিকানার দিক থেকে শ্রীলংকা ৩০ শতাংশের মালিক এবং চীন ৭০ শতাংশের মালিক হয়ে গেল। অবশ্য শ্রীলংকা যে কোনো সময় অংশীদারত্বের হিস্যা পরিবর্তনের সুযোগ পায়।

শ্রীলংকা তিনটি জাতিগোষ্ঠীর দেশ। এই জাতিগোষ্ঠীগুলো হচ্ছে সিংহলি বৌদ্ধ, মুসলিম এবং তামিল। তামিল বিদ্রোহীরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অথবা বিচ্ছিন্নতা অর্জনের জন্য দীর্ঘকাল সশস্ত্র যুদ্ধ চালায়। রাষ্ট্র হিসাবে শ্রীলংকা সামরিক শক্তি অর্জনের জন্য তেমন কোনো উৎসাহবোধ করেনি। তামিলরা প্রভাকরণের নেতৃত্বে সাফল্যের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। অতীতে মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট পদে একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সময়ে সামরিক দিক থেকে শ্রীলংকাকে শক্তিশালী করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মাহিন্দা রাজাপাকসে পাকিস্তান ও চীনের সহযোগিতা অর্জনে সফল হয়। তার আমলেই শ্রীলংকার সামরিক বাহিনী তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তামিলরা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। তাদের নেতা প্রভাকরণ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা যায়। শ্রীলংকার সরকার তামিলদের আনুগত্য অর্জনের জন্য স্থানীয় সরকারে তামিলদের অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়।

তবে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ তামিলদের মনে এমন বীতশ্রদ্ধ ভাব তৈরি করে, যার ফলে তামিল ও সিংহলিদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা অনেক দূরের ব্যাপারে পরিণত হয়। জাতি গঠন শ্রীলংকার জন্য এখনো একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। একসময় শ্রীলংকার তরুণরা তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

এই তরুণরা ট্রটক্সির বামপন্থি দর্শনের অনুসারী হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশে যখন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, ঠিক সেই সময় শ্রীলংকার তরুণরা তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এরা জেভিপি (জনতা ভিমুক্তি প্যারানুমা) নামের একটি সংগঠনে সংঘবদ্ধ হয়েছিল।

বিদ্রোহ এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, শ্রীলংকা সরকারের পতনের অবস্থা সৃষ্টি হয়। শ্রীলংকার সরকার পাকিস্তানসহ কিছু বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতায় বিদ্রোহ দমনে সফল হয়। জেভিপির অনুসারীরা এখন নিয়মতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতি করছেন। শ্রীলংকার সংসদে এদেরও কিছু প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, শ্রীলংকা রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন পর্যন্ত সংহত হয়নি। শ্রীলংকার রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্রীয় সংহতি অর্জনের জন্য অনেক কাজ করতে হবে।

গত মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে শ্রীলংকা সম্পর্কে একটি সংবাদ পরিবেশিত হয়। এতে বলা হয়, অর্থের অভাবে শ্রীলংকা লেখার কাগজ আমদানি করতে পারছে না। কাগজের অভাবে শ্রীলংকার সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগুলো বন্ধ করে দেয়। এ থেকেই বোঝা যায়, শ্রীলংকার অর্থনীতি কত বড় দুর্যোগে পতিত হয়েছে। কাগজের অভাবে একটি দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারছে না, এর চেয়ে বড় দুর্গতি আর কী হতে পারে!

শ্রীলংকার অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাত হলো পর্যটন, কৃষি ও চা। শ্রীলংকা দ্বীপরাষ্ট্রটি বস্তুত প্রকৃতির বিশাল লীলাভূমি। বরাবরই শ্রীলংকা পর্যটকদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ। দেশটির সমুদ্ররেখা, এডামস পিক এবং কেন্ডির বুদ্ধের দন্তমন্দির পর্যটকদের প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ফলে শ্রীলংকায় পর্যটকদের আগমন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিরাপত্তাহীনতা। শ্রীলংকার একটি হোটেলে সন্ত্রাসীরা বোমা রেখে গিয়েছিল। এই বোমার বিস্ফোরণের ফলে ২০১৯ সালে দুই শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু পর্যটকদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। শ্রীলংকায় পর্যটকদের আগমন কার্যত শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যায়।

শ্রীলংকার কৃষি সরকারের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। সরকার অর্গানিক কৃষি চালু করার নামে বিদেশ থেকে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার এবং পেস্টিসাইট আমদানি থেকে বিরত হয়। কৃষকরা হঠাৎ করে এমন বিশাল পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল না। অর্গানিক ফার্মিং নামের সঙ্গে এক ধরনের রোমান্টিকতা বিদ্যমান। এই রোমান্টিকতা বাস্তবসম্মত ছিল না।

ফলে কৃষির উৎপাদন ভয়াবহভাবে হ্রাস পায় এবং খাদ্য সংকটের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর পাশাপাশি চা বাগানগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এসবের পাশাপাশি জনতুষ্টিবাদের প্রভাবে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের হারও অর্ধেক পরিমাণে হ্রাস করা হয়। এই হার ১৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর সংগ্রহ করতে না পারার ফলে সরকারের দৈনন্দিন ব্যয়নির্বাহ করার ক্ষমতা কার্যত অর্থনীতিকে দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে যায়। পর্যটন থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসত, সেটি বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আমদানির কাজে ব্যবহার করা হতো।

পর্যটনশিল্প মার খাওয়ার কারণে আমদানি বাণিজ্য ধসে পড়ে। জনগণ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারছিল না। রান্নায় ব্যবহৃত জ্বালানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ অসম্ভব হয়ে ওঠে। ২৫ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। একটি অর্থনীতিকে পঙ্গু করার জন্য যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার সবটাই বিদ্যমান ছিল শ্রীলংকায়। একপর্যায়ে শ্রীলংকার সরকার বিদেশি দায়দেনা পরিশোধ করতে না পেরে শ্রীলংকাকে সে দেশের সরকার দেউলিয়া ঘোষণা করে।

যে দেশ একসময়ে গর্ব করতে পারত তার পর্যটন শিল্পের ব্যাপারে, মানুষজন যে দেশে সবাই শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্য সেবার চাহিদা অনেকটাই পূরণ করতে পারত, সে দেশ পড়ে গেল বড় ধরনের বিপর্যয়ে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। দেখা দেয় বিক্ষোভ ও আন্দোলন। শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির চরম অবনতি হওয়ার ফলে সে দেশের সরকারের পক্ষে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।

গণ-অসন্তোষ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে সরকারবিরোধী বিদ্রোহের মুখে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ৯ মে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ৩১ মার্চ শত শত বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে তার বাসভবনে হামলার চেষ্টা করে। ১ এপ্রিল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার ফলে গোতাবায়া দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার ও আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

২ এপ্রিল দেশজুড়ে ৩৬ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনা মোতায়েন করা হয়। ৩ এপ্রিল গভীর রাতে শ্রীলংকার মন্ত্রিসভার বড় অংশ কাজে ইস্তফা দেয়। ৪ এপ্রিল রাজাপাকসের সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিরোধীরা এতে রাজি হয়নি। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করেন। ৫ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আলী সাবরি শপথ নেওয়ার পরপরই পদত্যাগ করেন।

এর ফলে সাবেক মিত্ররা পদত্যাগ করেন এবং প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান। ৯ এপ্রিল রাজাপাকসের সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। হাসপাতালগুলোয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মজুত প্রচণ্ডভাবে নেমে যায়। চিকিৎসকরা ওষুধের অভাবে করোনার চেয়ে বেশি হারে মানুষের মৃত্যু হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সরকার ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হওয়ার ঘোষণা দেয়। ১৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভায় নতুন সদস্য নিয়োগ করা হয়। তবে মন্ত্রিসভায় বড় ভাই মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রেখে দেন গোতাবায়া।

১৯ এপ্রিল সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২৮ এপ্রিল দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে শ্রীলংকা স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর ৬ মে আবার ধর্মঘট ডাকা হয়। এদিন রাজাপাকসে আবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। ৯ মে সরকার ও বিরোধী পক্ষের সংঘর্ষের পর মাহিন্দা পদত্যাগ করেন।

এখন বিরোধীরা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার পদত্যাগ দাবি করছেন। গোতাবায়া যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। যদি তাই হয়, তাহলে প্রশ্ন-সামরিক বাহিনী কি ক্ষমতা হাতে নেবে? শ্রীলংকার ইতিহাসে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা নিতে দেখা যায়নি। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, শ্রীলংকার জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজন সব পক্ষের সমন্বয়ে সংকটকালীন জাতীয় সরকার। একমাত্র সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংকট নিরসনের চেষ্টা করাটাই হবে শ্রীলংকার জন্য যুক্তিযুক্ত সমাধান।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

কোন পথে যাচ্ছে শ্রীলংকা

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
১২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ শ্রীলংকা। শ্রীলংকা একটি দ্বীপরাষ্ট্র। এর চারদিকে রয়েছে ভারত মহাসাগর। শ্রীলংকা উত্তরদিক থেকে ভারতের খুব কাছাকাছি। ভারতের সন্নিকটবর্তী শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চল যদিও ভারত মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন, তা সত্ত্বেও এ জায়গাটি ভারতে পৌঁছানোর জন্য খুবই সুবিধাজনক। দূরত্বের দিক থেকেও খুব কাছাকাছি।

শ্রীলংকার এ অংশে সমুদ্রের বুক চিরে ছোট ছোট পাথরের দ্বীপ রয়েছে। এই পাথরের ক্ষুদ্র দ্বীপগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত যাতে মনে হয় এগুলোর ওপর লাফ দিয়ে ভারতে পৌঁছানো যায়। লোকশ্রুতি আছে, রামচন্দের বাহিনীর হনুমানগুলো লাফিয়ে লাফিয়ে শ্রীলংকায় পৌঁছে গিয়েছিল। এসব হনুমান রামের সৈন্যদের সমুদ্র অতিক্রম করে যেতে সাহায্য করেছিল। ১৯৪৮ সালে শ্রীলংকা ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর শ্রীলংকা বেশ দ্রুতগতিতে অর্থনীতিতে এগিয়ে যায়। এর প্রবৃদ্ধির হারও ছিল খুবই সন্তোষজনক। শ্রীলংকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে স্বীকৃতি পায়। মানবসম্পদ সূচকের দিক থেকেও শ্রীলংকার অর্জন ছিল খুবই ঈর্ষণীয়। শ্রীলংকা শতভাগ সাক্ষরতা অর্জন করে।

দলমতনির্বিশেষে শ্রীলংকার সরকারগুলো মানবসম্পদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এই দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব অর্জন করে। বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রধান শক্তিগুলো শ্রীলংকার বন্ধুত্ব অর্জনে বরাবরই সচেষ্ট থেকেছে।

শ্রীলংকার উত্তরাঞ্চলের সমুদ্রের মধ্যে পাথরের দ্বীপগুলোকে ভিত্তি করে ভারত তার নিজ ভূখণ্ডকে শ্রীলংকার সঙ্গে একটি বড় সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। বিভিন্ন সময়ে ভারত ও শ্রীলংকার মধ্যে সেতু নির্মাণের প্রশ্নে আলাপ-আলোচনা হয়। কখনো কখনো মনে হয়েছে এ ব্যাপারে শ্রীলংকার সরকার উৎসাহী। কিন্তু এ প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।

শ্রীলংকার জনগণের মধ্যে সেতু নির্মাণ প্রশ্নে আগ্রহ দেখা যায়নি। তারা শঙ্কিতবোধ করেছে। সেতু নির্মাণ হলে ভারত শ্রীলংকার অর্থনীতিকে গ্রাস করে ফেলবে-এমন একটি দুর্ভাবনা শ্রীলংকার জনগণের মধ্যে রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিমান চলাচলে তার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু শ্রীলংকা পাকিস্তানকে কলম্বো বিমানবন্দর ব্যবহার করতে দেয়। এর ফলে পাকিস্তানি সৈন্য এবং অস্ত্রশস্ত্র তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

শ্রীলংকা সার্কেরও সদস্য। সার্কের সদস্য হিসাবে শ্রীলংকা সব সময় ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করেছে। দেশটি চীনকে হাম্বানটোটায় একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করার জন্য অনুমতি দেয়। চীনা ঋণের অর্থে বন্দরটি নির্মিত হয়। এখন পর্যন্ত বন্দরটি বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য খুব একটা ব্যবহৃত হয়নি। ফলে অর্থনীতির বিচারে বন্দরটি লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু ভূরাজনৈতিক দিক থেকে বন্দরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রীলংকা এ বন্দর নির্মাণের জন্য চীনের কাছ থেকে যে ঋণ নিয়েছিল তার কিস্তির অর্থ প্রদান করতে ব্যর্থ হয়। এরপর এ বন্দরটি চীন ৯৯ বছরের জন্য লিজ নেয়। এ লিজ চুক্তিতে মালিকানার দিক থেকে শ্রীলংকা ৩০ শতাংশের মালিক এবং চীন ৭০ শতাংশের মালিক হয়ে গেল। অবশ্য শ্রীলংকা যে কোনো সময় অংশীদারত্বের হিস্যা পরিবর্তনের সুযোগ পায়।

শ্রীলংকা তিনটি জাতিগোষ্ঠীর দেশ। এই জাতিগোষ্ঠীগুলো হচ্ছে সিংহলি বৌদ্ধ, মুসলিম এবং তামিল। তামিল বিদ্রোহীরা আত্মনিয়ন্ত্রণের অথবা বিচ্ছিন্নতা অর্জনের জন্য দীর্ঘকাল সশস্ত্র যুদ্ধ চালায়। রাষ্ট্র হিসাবে শ্রীলংকা সামরিক শক্তি অর্জনের জন্য তেমন কোনো উৎসাহবোধ করেনি। তামিলরা প্রভাকরণের নেতৃত্বে সাফল্যের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। অতীতে মাহিন্দা রাজাপাকসে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট পদে একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার সময়ে সামরিক দিক থেকে শ্রীলংকাকে শক্তিশালী করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মাহিন্দা রাজাপাকসে পাকিস্তান ও চীনের সহযোগিতা অর্জনে সফল হয়। তার আমলেই শ্রীলংকার সামরিক বাহিনী তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। তামিলরা শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। তাদের নেতা প্রভাকরণ আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা যায়। শ্রীলংকার সরকার তামিলদের আনুগত্য অর্জনের জন্য স্থানীয় সরকারে তামিলদের অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়।

তবে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ তামিলদের মনে এমন বীতশ্রদ্ধ ভাব তৈরি করে, যার ফলে তামিল ও সিংহলিদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা অনেক দূরের ব্যাপারে পরিণত হয়। জাতি গঠন শ্রীলংকার জন্য এখনো একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ। একসময় শ্রীলংকার তরুণরা তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল।

এই তরুণরা ট্রটক্সির বামপন্থি দর্শনের অনুসারী হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশে যখন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, ঠিক সেই সময় শ্রীলংকার তরুণরা তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এরা জেভিপি (জনতা ভিমুক্তি প্যারানুমা) নামের একটি সংগঠনে সংঘবদ্ধ হয়েছিল।

বিদ্রোহ এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে, শ্রীলংকা সরকারের পতনের অবস্থা সৃষ্টি হয়। শ্রীলংকার সরকার পাকিস্তানসহ কিছু বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতায় বিদ্রোহ দমনে সফল হয়। জেভিপির অনুসারীরা এখন নিয়মতান্ত্রিক সংসদীয় রাজনীতি করছেন। শ্রীলংকার সংসদে এদেরও কিছু প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এই আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, শ্রীলংকা রাষ্ট্রীয়ভাবে এখন পর্যন্ত সংহত হয়নি। শ্রীলংকার রাজনীতিবিদদের রাষ্ট্রীয় সংহতি অর্জনের জন্য অনেক কাজ করতে হবে।

গত মার্চ-এপ্রিলে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে শ্রীলংকা সম্পর্কে একটি সংবাদ পরিবেশিত হয়। এতে বলা হয়, অর্থের অভাবে শ্রীলংকা লেখার কাগজ আমদানি করতে পারছে না। কাগজের অভাবে শ্রীলংকার সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষাগুলো বন্ধ করে দেয়। এ থেকেই বোঝা যায়, শ্রীলংকার অর্থনীতি কত বড় দুর্যোগে পতিত হয়েছে। কাগজের অভাবে একটি দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারছে না, এর চেয়ে বড় দুর্গতি আর কী হতে পারে!

শ্রীলংকার অর্থনীতির তিনটি প্রধান খাত হলো পর্যটন, কৃষি ও চা। শ্রীলংকা দ্বীপরাষ্ট্রটি বস্তুত প্রকৃতির বিশাল লীলাভূমি। বরাবরই শ্রীলংকা পর্যটকদের জন্য একটি বড় আকর্ষণ। দেশটির সমুদ্ররেখা, এডামস পিক এবং কেন্ডির বুদ্ধের দন্তমন্দির পর্যটকদের প্রচণ্ডভাবে আকৃষ্ট করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কোভিড-১৯ সংক্রমণের ফলে শ্রীলংকায় পর্যটকদের আগমন মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিরাপত্তাহীনতা। শ্রীলংকার একটি হোটেলে সন্ত্রাসীরা বোমা রেখে গিয়েছিল। এই বোমার বিস্ফোরণের ফলে ২০১৯ সালে দুই শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটে। বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় এত মানুষের মৃত্যু পর্যটকদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। শ্রীলংকায় পর্যটকদের আগমন কার্যত শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যায়।

শ্রীলংকার কৃষি সরকারের একটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ফলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। সরকার অর্গানিক কৃষি চালু করার নামে বিদেশ থেকে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজার এবং পেস্টিসাইট আমদানি থেকে বিরত হয়। কৃষকরা হঠাৎ করে এমন বিশাল পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত ছিল না। অর্গানিক ফার্মিং নামের সঙ্গে এক ধরনের রোমান্টিকতা বিদ্যমান। এই রোমান্টিকতা বাস্তবসম্মত ছিল না।

ফলে কৃষির উৎপাদন ভয়াবহভাবে হ্রাস পায় এবং খাদ্য সংকটের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। কৃষকদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। এর পাশাপাশি চা বাগানগুলোর ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এসবের পাশাপাশি জনতুষ্টিবাদের প্রভাবে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের হারও অর্ধেক পরিমাণে হ্রাস করা হয়। এই হার ১৫ শতাংশ থেকে ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কর সংগ্রহ করতে না পারার ফলে সরকারের দৈনন্দিন ব্যয়নির্বাহ করার ক্ষমতা কার্যত অর্থনীতিকে দেউলিয়াত্বের দিকে নিয়ে যায়। পর্যটন থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা আসত, সেটি বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী আমদানির কাজে ব্যবহার করা হতো।

পর্যটনশিল্প মার খাওয়ার কারণে আমদানি বাণিজ্য ধসে পড়ে। জনগণ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারছিল না। রান্নায় ব্যবহৃত জ্বালানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠার কারণে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য গ্রহণ অসম্ভব হয়ে ওঠে। ২৫ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। একটি অর্থনীতিকে পঙ্গু করার জন্য যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তার সবটাই বিদ্যমান ছিল শ্রীলংকায়। একপর্যায়ে শ্রীলংকার সরকার বিদেশি দায়দেনা পরিশোধ করতে না পেরে শ্রীলংকাকে সে দেশের সরকার দেউলিয়া ঘোষণা করে।

যে দেশ একসময়ে গর্ব করতে পারত তার পর্যটন শিল্পের ব্যাপারে, মানুষজন যে দেশে সবাই শিক্ষিত এবং স্বাস্থ্য সেবার চাহিদা অনেকটাই পূরণ করতে পারত, সে দেশ পড়ে গেল বড় ধরনের বিপর্যয়ে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। দেখা দেয় বিক্ষোভ ও আন্দোলন। শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির চরম অবনতি হওয়ার ফলে সে দেশের সরকারের পক্ষে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে।

গণ-অসন্তোষ এমন পর্যায়ে চলে যায় যে সরকারবিরোধী বিদ্রোহের মুখে প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপাকসে ৯ মে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ৩১ মার্চ শত শত বিক্ষোভকারী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের পদত্যাগের দাবিতে তার বাসভবনে হামলার চেষ্টা করে। ১ এপ্রিল বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার ফলে গোতাবায়া দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সন্দেহভাজনদের গ্রেফতার ও আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হয়।

২ এপ্রিল দেশজুড়ে ৩৬ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয় এবং সেনা মোতায়েন করা হয়। ৩ এপ্রিল গভীর রাতে শ্রীলংকার মন্ত্রিসভার বড় অংশ কাজে ইস্তফা দেয়। ৪ এপ্রিল রাজাপাকসের সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিরোধীরা এতে রাজি হয়নি। একই দিনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করেন। ৫ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী আলী সাবরি শপথ নেওয়ার পরপরই পদত্যাগ করেন।

এর ফলে সাবেক মিত্ররা পদত্যাগ করেন এবং প্রেসিডেন্ট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারান। ৯ এপ্রিল রাজাপাকসের সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রাজপথে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করে। হাসপাতালগুলোয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের মজুত প্রচণ্ডভাবে নেমে যায়। চিকিৎসকরা ওষুধের অভাবে করোনার চেয়ে বেশি হারে মানুষের মৃত্যু হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। সরকার ৫১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ খেলাপি হওয়ার ঘোষণা দেয়। ১৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভায় নতুন সদস্য নিয়োগ করা হয়। তবে মন্ত্রিসভায় বড় ভাই মাহিন্দাকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রেখে দেন গোতাবায়া।

১৯ এপ্রিল সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ২৮ এপ্রিল দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটে শ্রীলংকা স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর ৬ মে আবার ধর্মঘট ডাকা হয়। এদিন রাজাপাকসে আবার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। ৯ মে সরকার ও বিরোধী পক্ষের সংঘর্ষের পর মাহিন্দা পদত্যাগ করেন।

এখন বিরোধীরা প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার পদত্যাগ দাবি করছেন। গোতাবায়া যদি পদত্যাগ করেন, তাহলে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হবে। যদি তাই হয়, তাহলে প্রশ্ন-সামরিক বাহিনী কি ক্ষমতা হাতে নেবে? শ্রীলংকার ইতিহাসে সামরিক বাহিনীকে ক্ষমতা নিতে দেখা যায়নি। সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, শ্রীলংকার জন্য এই মুহূর্তে প্রয়োজন সব পক্ষের সমন্বয়ে সংকটকালীন জাতীয় সরকার। একমাত্র সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংকট নিরসনের চেষ্টা করাটাই হবে শ্রীলংকার জন্য যুক্তিযুক্ত সমাধান।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : সঙ্কটে শ্রীলংকা