পাঠাভ্যাস কি আসলেই কমে যাচ্ছে?
jugantor
পাঠাভ্যাস কি আসলেই কমে যাচ্ছে?

  সালাহ্ উদ্দিন নাগরী  

১২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা পৃথিবীতেই বই পড়া মানুষের সংখ্যা কমছে। কয়েক বছর আগে বুকার পুরস্কারজয়ী ব্রিটিশ লেখক হাওয়ার্ড জ্যাকবসন বলেছিলেন, ‘আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমরা এমন শিশুদের পাব, যারা পড়তে জানবে না।’ বর্তমান সভ্যতার পীঠস্থান ইউরোপ-আমেরিকায় আগে মানুষ বাস, ট্রেন, প্লেন ও স্টিমারযাত্রায় যেভাবে বই, পত্রপত্রিকা পড়ত, এখন তেমনটি আর দেখা যায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে যত না সোনাদানা নিয়েছিল, এর চেয়ে বেশি নিয়ে গিয়েছিল বইপুস্তক। আমাদের ছাত্রাবস্থায় অবসর কাটানো ও বিনোদনের অন্যতম উপায় ছিল বই, পত্রপত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়া।

মনে আছে, ভাইবোনরা যখন একত্রে বড় হয়েছি, তখন বাসায় খবরের কাগজ আসত দুপুরের দিকে, আর হকারের কাছ থেকে কে আগে তা ছিনিয়ে নেবে, সেজন্য ভাইবোনদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেত এবং গোসল ও খাওয়াদাওয়ার পর আরাম করে পড়ার জন্য সেটি লুকিয়েও রাখা হতো। এ যুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এখন কি খবরের কাগজ নিয়ে সেই উন্মাদনা আছে?

কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমির বইমেলায় বই বিক্রির ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ আমাদের দেশে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন, কিন্তু বাস্তব অবস্থা তেমন নয়। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্বল্প সময়ের বই বিক্রির এ প্রবণতাকে ভিত্তি করে সারা দেশে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করা যায় না। আসলে সারা পৃথিবীতেই বইপড়ুয়াদের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। আর এর কারণ হিসাবে প্রথম তিরটি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে স্মার্ট ডিভাইসের দিকে।

বাংলাদেশে কিছুদিন আগে কিছু শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত একটি জরিপের ফল বলছে, ৬২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অবসরে ফেসবুক চ্যাট করে। ৭৭ শতাংশ বই পড়ার চেয়ে ফেসবুকে সময় কাটাতে বা ইউটিউবে মুভি দেখতে বেশি পছন্দ করে। মাত্র ৬ শতাংশ ফেসবুকে থাকার চেয়ে বই পড়তে পছন্দ করে। ৩৩ শতাংশ দিনে একটাও বই পড়ে না।

আমেরিকার এক জরিপে দেখা যায়, ১৫-২০ বছর আগে শিক্ষার্থীরা যতটুকু সময় বই পড়ত, বর্তমানে তা ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এর কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দেওয়া। আর যুক্তরাজ্যের মানুষের বছরব্যাপী বই পড়াকে দিনের হিসাবে নিয়ে এলে তো ১ ঘণ্টাও ভাগে পড়ে না। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা থেকে মোটামুটি এটা নিশ্চিত যে, সারা পৃথিবীতেই বই পড়ার হার কমছে।

স্মার্ট ডিভাইসনির্ভর মানুষের অধিকাংশই চটুল বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে বেশি আনন্দ পাচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। কিন্তু এটিও ঠিক, মানুষ এখন শুধু বিনোদনের জন্যই স্মার্টফোন বা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে না। এ ডিভাইস এখন মানুষের জীবনের বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু চ্যাটিং বা গানবাজনা শোনা বা দেখাই নয়, বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক সেবা গ্রহণ, ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্নকরণ, ছবি তোলা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করা, লেখাপড়া, দাপ্তরিক কার্যক্রম, মিটিং, টেলি মেডিসিন কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়।

মোবাইল ফোনে কুরআন তিলাওয়াত থেকে শুরু করে রান্না ও ইংরেজি শেখার বই-সবকিছুই সংরক্ষণ করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফেসবুক খুললেই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাই মানুষ এখন গণমাধ্যমের পাশাপাশি ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মাধ্যমেও খবরাখবর জানছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে আপডেট থাকার জন্য তাকে অন্য কোনো মাধ্যমের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে না। এক স্মার্টফোনেই সব পাঠ চুকে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীর লাইব্রেরিগুলোয় যত বিখ্যাত, দুষ্প্রাপ্য বইপুস্তক, ম্যাগাজিন আছে, সেগুলোয় ঘরে বসেই ঢু মারা ও ডাউনলোড করা যাচ্ছে।

আগে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা গোয়েন্দা কাহিনি, রহস্য উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশনের বই খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়ত। এখন তারা ওগুলো পড়ার চেয়ে দেখতে, ইউটিউবে কার্টুন বা মুভিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ১৮০ টাকা বিল পরিশোধ করে সারা মাস নেটফ্লিক্সের সেবা গ্রহণ করছে। এতে বই পড়ার আগ্রহ কিছু হলেও তো কমছে।

শুধুই কি স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে বই পড়া কমছে? তা নয়। মানুষ ইদানীং ক্লাব, সমিতি, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং এ ধরনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। ছুটির দিনে ব্যক্তিগত কাজকর্ম ও বহুবিধ ওয়াদা রক্ষা বা এ ধরনের অনেক কিছু মিলে মানুষের হাতে সময়ই থাকে না।

তাছাড়া এখনকার মানুষের সমস্যা ও ঝামেলাগুলোও কেন জানি আগের চেয়ে একটু জটিল। তাই অনেকে বই পড়ায় মনোনিবেশ করতে পারছে না। স্পষ্ট দেখতে পাই, যেসব মানুষ একসময় বইয়ের পোকা ছিলেন, তারা জীবনের কশাঘাতে বই পড়া বাদই দিয়ে দিয়েছেন। এমনকি যে মানুষটি আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভির সামনে বসে থাকতেন, তিনিও আজ টিভি দেখার সময় বের করতে পারছেন না।

আসলেই আমাদের জীবনযাপন পদ্ধতি অনেকটা বদলে যাচ্ছে। মানুষের জীবন জটিল হচ্ছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, একই সঙ্গে যান্ত্রিকও হয়েছে। হাজারো সমস্যা, দায়দায়িত্ব সামলিয়ে বই পড়ার আগ্রহ ও সময় দুটোই কমেছে। মানুষের বাসাবাড়ি ছোট হয়ে আসছে, আলাদা রিডিং রুমের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। বুক সেলফ বা বইয়ের তাকের স্থান সংকুলান হয় না, তাই বই কিনে রাখবে কোথায়? হয়তো বই কেনা বা পড়ার হার কমে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।

একসময় বৃষ্টির দিনে মানুষের ঘরের বাইরে যাওয়া কমে যেত, তখন ঘরবন্দি মানুষের সময় কাটানোর বড় উপায় ছিল বই পড়া। এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক সংগতি বেড়েছে, ব্যক্তিগত যানবাহন তার জীবনকে গতিশীল করেছে। তার কাছে অলস বর্ষা বলে কিছু নেই, সে এখন সারা দিন, সারা বছরই ব্যস্ত। যেসব মানুষের বিনোদনের বহু বিকল্প আছে, তারা তুলনামূলক কম বই পড়ে। গবেষণায় উঠে আসছে, শহরাঞ্চলের তরুণদের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের তরুণরা অবসরে বই ও খবরের কাগজ বেশি পড়ে থাকে।

আরও একটি বিষয়। অনেকেই বইয়ের নাম পছন্দ হলেই হয়তো বা বই কিনছেন, কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখেন অন্তঃসারশূন্য। যে আগ্রহ ও স্পৃহা নিয়ে বই কেনেন, তা পূরণ হয় না। অনেকেই বলে থাকেন, এখনকার অনেক বইয়ে ঘটনা ও বিষয়বস্তুর নির্মোহ বর্ণনা ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। সন্নিবেশিত তথ্য ও তত্ত্বে গরমিল পরিলক্ষিত হয়। মানহীন বইয়ে বাজার সয়লাব, সেজন্য মানুষ বই কিনতেও ভয় পায়। অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন, আমাদের দেশে বইয়ের দাম তুলনামূলক একটু বেশি। পাঠক কমে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে।

হ্যাঁ, বই পড়া কমছে; তরুণ, বৃদ্ধসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই এ প্রবণতা দৃশ্যমান। কিন্তু সব দোষ এসে পড়ছে এখনকার তরুণ সমাজের প্রতি, বলা হচ্ছে-তারা বই পড়ে না। তাদের প্রতি এ অভিযোগ সঠিক নাও হতে পারে। আসলে তারা সবসময় কিছু না কিছু পড়ছেই।

হয়তো সেই পড়াটা অনলাইনেই সম্পন্ন করছে এবং নিজেকে আপডেটও রাখছে। তাই হাতে বই না থাকলে বা বইয়ের দোকান থেকে বই না কিনলে বা লাইব্রেরি থেকে কোনো বই রেন্ট না করলেও বলা যাবে না যে মানুষ বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে। ছোট্ট একটি ডিভাইসে হাজার হাজার বইপুস্তক সংগ্রহে রাখা যায়। কোনো বুক সেলফ লাগে না, তাক লাগে না, টেবিল লাগে না।

ফলে অনেকেই হার্ডকপির বইকে অনেক ক্ষেত্রে বোঝা হিসাবেই বিবেচনা করছেন। তাই এখন সফটকপির বইপুস্তকের কদর বাড়ছে। এ সংরক্ষণ পদ্ধতি সহজ, নিরাপদ ও অর্থসাশ্রয়ী এবং এখনকার প্রজন্ম তা-ই করছে। একজনের হাতে হার্ডকপি বই না থাকতে পারে, কিন্তু তার পকেটে শত সহস্র বই অনেক সযত্নে থাকতে পারে।

হার্ডকপি বই দাম দিয়ে কিনতে হয়, কিন্তু অনলাইন থেকে অনেকটা বিনা খরচে নানা বই ডাউনলোড করা যায়। তারা আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা গ্রহণ করছে মাত্র। তাই এখনকার প্রজন্ম বই পড়ছে না মনে করে হা-হুতাশের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

বই পড়া কমেছে কি বেড়েছে-এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে যদি প্রশ্ন করা হয়-এত বই পড়েই বা কী লাভ হচ্ছে? আমরা কি পৃথিবীকে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানাতে পেরেছি? মানুষকে সত্যের দিশা দিতে পেরেছি? বই পড়া মানুষ ও জাতিগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় সভ্যতাবিনাশী যুদ্ধের জন্য নিয়ত সংগঠিত হয়ে চলেছে। তাহলে বই পড়ে কি কোনো ফায়দা নেই?

আমরা বই কিনি, বই পড়িও; কিন্তু বইয়ের নির্যাসটুকু মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে ধারণ করি না। তাই বই পড়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। প্রতিদিনই শিক্ষিত মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে বিবেকবান, পরিশুদ্ধ মানুষের সংখ্যা কি বেড়েছে? অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে শুদ্ধ, বিবেকবান, দুর্নীতিমুক্ত, সৎ ও নির্ভীক মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে হবে।

নিজের, পরিবারের এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। হার্ডকপি বই বা ই-বই বা অনলাইন পেপার, পত্রপত্রিকা যা-ই পড়া হোক না কেন, এর ভালোটুকু অন্তরে ধারণ করতে হবে। মন-মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে, আর তা যদি করা না যায়, তাহলে বই পড়া কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে ভিন্ন কোনো অর্থ বহন করবে না। বই পড়ে যদি মানুষ হিসাবেই গড়ে ওঠা না যায়, তাহলে সে জ্ঞান আহরণের কোনো মূল্য নেই।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

পাঠাভ্যাস কি আসলেই কমে যাচ্ছে?

 সালাহ্ উদ্দিন নাগরী 
১২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা পৃথিবীতেই বই পড়া মানুষের সংখ্যা কমছে। কয়েক বছর আগে বুকার পুরস্কারজয়ী ব্রিটিশ লেখক হাওয়ার্ড জ্যাকবসন বলেছিলেন, ‘আগামী ২০ বছরের মধ্যে আমরা এমন শিশুদের পাব, যারা পড়তে জানবে না।’ বর্তমান সভ্যতার পীঠস্থান ইউরোপ-আমেরিকায় আগে মানুষ বাস, ট্রেন, প্লেন ও স্টিমারযাত্রায় যেভাবে বই, পত্রপত্রিকা পড়ত, এখন তেমনটি আর দেখা যায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে ঘর ছেড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে যত না সোনাদানা নিয়েছিল, এর চেয়ে বেশি নিয়ে গিয়েছিল বইপুস্তক। আমাদের ছাত্রাবস্থায় অবসর কাটানো ও বিনোদনের অন্যতম উপায় ছিল বই, পত্রপত্রিকা বা ম্যাগাজিন পড়া।

মনে আছে, ভাইবোনরা যখন একত্রে বড় হয়েছি, তখন বাসায় খবরের কাগজ আসত দুপুরের দিকে, আর হকারের কাছ থেকে কে আগে তা ছিনিয়ে নেবে, সেজন্য ভাইবোনদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেত এবং গোসল ও খাওয়াদাওয়ার পর আরাম করে পড়ার জন্য সেটি লুকিয়েও রাখা হতো। এ যুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে এখন কি খবরের কাগজ নিয়ে সেই উন্মাদনা আছে?

কয়েক বছর ধরে বাংলা একাডেমির বইমেলায় বই বিক্রির ঊর্ধ্বগতিকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ আমাদের দেশে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করছেন, কিন্তু বাস্তব অবস্থা তেমন নয়। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় স্বল্প সময়ের বই বিক্রির এ প্রবণতাকে ভিত্তি করে সারা দেশে পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে সরাসরি মন্তব্য করা যায় না। আসলে সারা পৃথিবীতেই বইপড়ুয়াদের সংখ্যা ক্রমহ্রাসমান। আর এর কারণ হিসাবে প্রথম তিরটি নিক্ষিপ্ত হচ্ছে স্মার্ট ডিভাইসের দিকে।

বাংলাদেশে কিছুদিন আগে কিছু শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত একটি জরিপের ফল বলছে, ৬২.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অবসরে ফেসবুক চ্যাট করে। ৭৭ শতাংশ বই পড়ার চেয়ে ফেসবুকে সময় কাটাতে বা ইউটিউবে মুভি দেখতে বেশি পছন্দ করে। মাত্র ৬ শতাংশ ফেসবুকে থাকার চেয়ে বই পড়তে পছন্দ করে। ৩৩ শতাংশ দিনে একটাও বই পড়ে না।

আমেরিকার এক জরিপে দেখা যায়, ১৫-২০ বছর আগে শিক্ষার্থীরা যতটুকু সময় বই পড়ত, বর্তমানে তা ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এর কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি সময় দেওয়া। আর যুক্তরাজ্যের মানুষের বছরব্যাপী বই পড়াকে দিনের হিসাবে নিয়ে এলে তো ১ ঘণ্টাও ভাগে পড়ে না। বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণা থেকে মোটামুটি এটা নিশ্চিত যে, সারা পৃথিবীতেই বই পড়ার হার কমছে।

স্মার্ট ডিভাইসনির্ভর মানুষের অধিকাংশই চটুল বিষয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটাতে বেশি আনন্দ পাচ্ছে, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। কিন্তু এটিও ঠিক, মানুষ এখন শুধু বিনোদনের জন্যই স্মার্টফোন বা স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহার করে না। এ ডিভাইস এখন মানুষের জীবনের বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু চ্যাটিং বা গানবাজনা শোনা বা দেখাই নয়, বিভিন্ন ধরনের গ্রাহক সেবা গ্রহণ, ব্যাংকিং কার্যক্রম সম্পন্নকরণ, ছবি তোলা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করা, লেখাপড়া, দাপ্তরিক কার্যক্রম, মিটিং, টেলি মেডিসিন কার্যক্রম সম্পন্ন করা যায়।

মোবাইল ফোনে কুরআন তিলাওয়াত থেকে শুরু করে রান্না ও ইংরেজি শেখার বই-সবকিছুই সংরক্ষণ করা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফেসবুক খুললেই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যে চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাই মানুষ এখন গণমাধ্যমের পাশাপাশি ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের মাধ্যমেও খবরাখবর জানছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে আপডেট থাকার জন্য তাকে অন্য কোনো মাধ্যমের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে না। এক স্মার্টফোনেই সব পাঠ চুকে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীর লাইব্রেরিগুলোয় যত বিখ্যাত, দুষ্প্রাপ্য বইপুস্তক, ম্যাগাজিন আছে, সেগুলোয় ঘরে বসেই ঢু মারা ও ডাউনলোড করা যাচ্ছে।

আগে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা গোয়েন্দা কাহিনি, রহস্য উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশনের বই খুবই আগ্রহ নিয়ে পড়ত। এখন তারা ওগুলো পড়ার চেয়ে দেখতে, ইউটিউবে কার্টুন বা মুভিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। ১৮০ টাকা বিল পরিশোধ করে সারা মাস নেটফ্লিক্সের সেবা গ্রহণ করছে। এতে বই পড়ার আগ্রহ কিছু হলেও তো কমছে।

শুধুই কি স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে বই পড়া কমছে? তা নয়। মানুষ ইদানীং ক্লাব, সমিতি, সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এবং এ ধরনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে বেশি জড়িয়ে পড়ছে। ছুটির দিনে ব্যক্তিগত কাজকর্ম ও বহুবিধ ওয়াদা রক্ষা বা এ ধরনের অনেক কিছু মিলে মানুষের হাতে সময়ই থাকে না।

তাছাড়া এখনকার মানুষের সমস্যা ও ঝামেলাগুলোও কেন জানি আগের চেয়ে একটু জটিল। তাই অনেকে বই পড়ায় মনোনিবেশ করতে পারছে না। স্পষ্ট দেখতে পাই, যেসব মানুষ একসময় বইয়ের পোকা ছিলেন, তারা জীবনের কশাঘাতে বই পড়া বাদই দিয়ে দিয়েছেন। এমনকি যে মানুষটি আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টিভির সামনে বসে থাকতেন, তিনিও আজ টিভি দেখার সময় বের করতে পারছেন না।

আসলেই আমাদের জীবনযাপন পদ্ধতি অনেকটা বদলে যাচ্ছে। মানুষের জীবন জটিল হচ্ছে, ব্যস্ততা বেড়েছে, একই সঙ্গে যান্ত্রিকও হয়েছে। হাজারো সমস্যা, দায়দায়িত্ব সামলিয়ে বই পড়ার আগ্রহ ও সময় দুটোই কমেছে। মানুষের বাসাবাড়ি ছোট হয়ে আসছে, আলাদা রিডিং রুমের সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। বুক সেলফ বা বইয়ের তাকের স্থান সংকুলান হয় না, তাই বই কিনে রাখবে কোথায়? হয়তো বই কেনা বা পড়ার হার কমে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ।

একসময় বৃষ্টির দিনে মানুষের ঘরের বাইরে যাওয়া কমে যেত, তখন ঘরবন্দি মানুষের সময় কাটানোর বড় উপায় ছিল বই পড়া। এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক সংগতি বেড়েছে, ব্যক্তিগত যানবাহন তার জীবনকে গতিশীল করেছে। তার কাছে অলস বর্ষা বলে কিছু নেই, সে এখন সারা দিন, সারা বছরই ব্যস্ত। যেসব মানুষের বিনোদনের বহু বিকল্প আছে, তারা তুলনামূলক কম বই পড়ে। গবেষণায় উঠে আসছে, শহরাঞ্চলের তরুণদের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের তরুণরা অবসরে বই ও খবরের কাগজ বেশি পড়ে থাকে।

আরও একটি বিষয়। অনেকেই বইয়ের নাম পছন্দ হলেই হয়তো বা বই কিনছেন, কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখেন অন্তঃসারশূন্য। যে আগ্রহ ও স্পৃহা নিয়ে বই কেনেন, তা পূরণ হয় না। অনেকেই বলে থাকেন, এখনকার অনেক বইয়ে ঘটনা ও বিষয়বস্তুর নির্মোহ বর্ণনা ও বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। সন্নিবেশিত তথ্য ও তত্ত্বে গরমিল পরিলক্ষিত হয়। মানহীন বইয়ে বাজার সয়লাব, সেজন্য মানুষ বই কিনতেও ভয় পায়। অনেকেই অভিযোগ করে থাকেন, আমাদের দেশে বইয়ের দাম তুলনামূলক একটু বেশি। পাঠক কমে যাওয়ার পেছনে এটিও একটি কারণ হতে পারে।

হ্যাঁ, বই পড়া কমছে; তরুণ, বৃদ্ধসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই এ প্রবণতা দৃশ্যমান। কিন্তু সব দোষ এসে পড়ছে এখনকার তরুণ সমাজের প্রতি, বলা হচ্ছে-তারা বই পড়ে না। তাদের প্রতি এ অভিযোগ সঠিক নাও হতে পারে। আসলে তারা সবসময় কিছু না কিছু পড়ছেই।

হয়তো সেই পড়াটা অনলাইনেই সম্পন্ন করছে এবং নিজেকে আপডেটও রাখছে। তাই হাতে বই না থাকলে বা বইয়ের দোকান থেকে বই না কিনলে বা লাইব্রেরি থেকে কোনো বই রেন্ট না করলেও বলা যাবে না যে মানুষ বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে। ছোট্ট একটি ডিভাইসে হাজার হাজার বইপুস্তক সংগ্রহে রাখা যায়। কোনো বুক সেলফ লাগে না, তাক লাগে না, টেবিল লাগে না।

ফলে অনেকেই হার্ডকপির বইকে অনেক ক্ষেত্রে বোঝা হিসাবেই বিবেচনা করছেন। তাই এখন সফটকপির বইপুস্তকের কদর বাড়ছে। এ সংরক্ষণ পদ্ধতি সহজ, নিরাপদ ও অর্থসাশ্রয়ী এবং এখনকার প্রজন্ম তা-ই করছে। একজনের হাতে হার্ডকপি বই না থাকতে পারে, কিন্তু তার পকেটে শত সহস্র বই অনেক সযত্নে থাকতে পারে।

হার্ডকপি বই দাম দিয়ে কিনতে হয়, কিন্তু অনলাইন থেকে অনেকটা বিনা খরচে নানা বই ডাউনলোড করা যায়। তারা আধুনিক প্রযুক্তি সুবিধা গ্রহণ করছে মাত্র। তাই এখনকার প্রজন্ম বই পড়ছে না মনে করে হা-হুতাশের কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

বই পড়া কমেছে কি বেড়েছে-এ প্রশ্নে যাওয়ার আগে যদি প্রশ্ন করা হয়-এত বই পড়েই বা কী লাভ হচ্ছে? আমরা কি পৃথিবীকে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়স্থল বানাতে পেরেছি? মানুষকে সত্যের দিশা দিতে পেরেছি? বই পড়া মানুষ ও জাতিগুলো নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় সভ্যতাবিনাশী যুদ্ধের জন্য নিয়ত সংগঠিত হয়ে চলেছে। তাহলে বই পড়ে কি কোনো ফায়দা নেই?

আমরা বই কিনি, বই পড়িও; কিন্তু বইয়ের নির্যাসটুকু মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে ধারণ করি না। তাই বই পড়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না। প্রতিদিনই শিক্ষিত মানুষ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে বিবেকবান, পরিশুদ্ধ মানুষের সংখ্যা কি বেড়েছে? অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে শুদ্ধ, বিবেকবান, দুর্নীতিমুক্ত, সৎ ও নির্ভীক মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতে হবে।

নিজের, পরিবারের এবং দেশ ও জাতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। হার্ডকপি বই বা ই-বই বা অনলাইন পেপার, পত্রপত্রিকা যা-ই পড়া হোক না কেন, এর ভালোটুকু অন্তরে ধারণ করতে হবে। মন-মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে হবে, আর তা যদি করা না যায়, তাহলে বই পড়া কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় জীবনে ভিন্ন কোনো অর্থ বহন করবে না। বই পড়ে যদি মানুষ হিসাবেই গড়ে ওঠা না যায়, তাহলে সে জ্ঞান আহরণের কোনো মূল্য নেই।

সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন