বর্ষার আগেই ডিএনডি প্রকল্পের বাস্তবায়ন জরুরি
jugantor
বর্ষার আগেই ডিএনডি প্রকল্পের বাস্তবায়ন জরুরি

  ড. মো. আওলাদ হোসেন  

১৪ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধের অভ্যন্তরের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুমোদন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে উল্লিখিত প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দেশ প্রদান করায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবারও ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। জলাবদ্ধতা নিরসনে ওই এলাকায় ড্রেনসহ রাস্তা নির্মাণকাজ করায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ডিএনডি ড্রেনেজ অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে’র কাজ প্রাথমিকভাবে খুব জোরেশোরে শুরু হয়েছিল। মৃতপ্রায় খাল পুনরুদ্ধার ও পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্পস্টেশন নির্মাণকাজও শুরু হয়েছিল; কিন্তু করোনা মহামারিকালে কাজ বন্ধ হয়ে আর শুরু হয়নি। বর্ষা আসন্ন। ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসরত মানুষ আবারও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন। উল্লেখিত প্রকল্পসহ ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসরত মানুষের বহুমুখী সমস্যা সমাধানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

১৯৬২ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরার (ডিএনডি) মধ্যকার ৫৮.২২ বর্গকিলোমিটার জলাভূমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত ধানচাষ করার জন্য চারদিকে বাঁধ নিয়ে ‘ডিএনডি ইরিগেশন প্ল্যান্ট’ তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ বাঁধটিই ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-পোস্তগোলা-যাত্রাবাড়ী এলাকার চারদিকে যান চলাচলের রাস্তা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বর্তমানে তা আরও প্রসারিত হয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় সেচের জন্য ৫৫.২ কিলোমিটার সেচখাল ও ৪৫.৯০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল খনন করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগরীতে ব্যাপক আবাসন সংকটের ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সুবিধা নিশ্চিত থাকা চাষাবাদের জন্য প্রস্তুতকৃত ওই নিচু এলাকায় ক্রমান্বয়ে অপরিকল্পিত জনপদ গড়ে ওঠে। ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা নদীবেষ্টিত জুরাইন, মুরাদপুর, শ্যামপুর, আলমবাগ, নামা শ্যামপুর, কদমতলী, দনিয়া, পাটেরবাগ, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, সিদ্ধিরগঞ্জ, পাগলা, ফতুল্লা, কুতুবপুর, মুন্সিবাগ, শহীদবাগ, ভূঁইঘর, মিজমিজি ও পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত এলাকা নিয়ে ডিএনডি বাঁধের মধ্যে একটি বিশাল জনবহুল এলাকা গড়ে উঠেছে। এলাকাটিতে নিুআয় থেকে মধ্য আয়ের প্রায় অর্ধকোটি লোক বসবাস করে। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য উপাসনালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছোট-মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

প্রয়োজনের তাগিদে ধানক্ষেতের আইল দিয়ে চলার পথকে ভিত্তি করে অথবা এলাকাবাসীর সুবিধা অনুযায়ী অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা গড়ে উঠেছে, যা পরবর্তী সময়ে পাকা রাস্তায় পরিণত হয়েছে। ওইসব রাস্তার দুই পাশে সুউচ্চ অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় রাস্তার পাশে ড্রেন আছে, কিন্তু ড্রেনের পাশের বাড়িগুলো থেকে অপচনশীল দ্রব্যাদি দীর্ঘদিন ড্রেনে ফেলার কারণে এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ড্রেনগুলো ময়লা, বালি ও মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে।

এলাকায় বসবাসকারী মানুষের পানির চাহিদা মোতাবেক ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এ এলাকায় অসংখ্য গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে; কিন্তু ওইসব গভীর নলকূপ দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলিত হচ্ছে, তা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পর নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এছাড়া বৃষ্টির পানি তো রয়েছেই।

বসতবাড়ি গড়ে ওঠার পর সেচের জন্য খনন করা আঁকাবাঁকা খালগুলোতে পানির প্রবাহ না থাকলেও সেগুলো বসতবাড়ির ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। তবে এলাকাবাসী ওই খালগুলোতে শুধু ড্রেনের পানি নিষ্কাশন করেই ক্ষান্ত হননি, ওই খালে বাড়ির ময়লা-আবর্জনা, ব্যবহৃত পলিথিন ও অপ্রয়োজনীয় অপচনশীল দ্রব্যাদি ফেলে খালগুলো ভরাট করে ফেলেছেন। অনেক জায়গায় খালগুলো সম্পূর্ণভাবে বা সেগুলোর অংশবিশেষ অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। ফলে বর্তমানে ওসব সেচখালে ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের আর কোনো উপায় নেই। ফলে ওই পানি নিম্নাঞ্চলকে প্লাবিত করে থাকে।

ডিএনডি এলাকাটির চারদিকে উঁচু বাঁধ থাকার ফলে পানি বের হয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বাঁধের মধ্যখানের নিচু এলাকায় প্লাবিত পানি নিষ্কাশনের জন্য শিমরাইলে অবস্থিত একটিমাত্র পাম্পস্টেশন রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। এছাড়া খালটির বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় ড্রেনের পানি পাম্পস্টেশন পর্যন্ত পৌঁছার কোনো উপায় না থাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে উল্লেখিত প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে, আমার দেখামতে, কদমতলী থানা এলাকায় অলিগলিগুলোসহ প্রধান রাস্তায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। কালো-পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল। সামান্য বৃষ্টি হলেই রিকশা ছাড়া রাস্তায় নামা যেত না। ভারী বৃষ্টি হলে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সব একাকার হয়ে যেত। নামা শ্যামপুর, কদমতলী, মেরাজনগর, মোহাম্মদবাগ, শহীদবাগ, মদিনাবাগসহ পুরো নিম্নাঞ্চলে হাঁটু থেকে কোমর পরিমাণ পানি জমে যেত। সেসময়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা দুর্দশা লাঘবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।

ডিএনডি বাঁধের মধ্যের জলাবদ্ধতা ও মানুষের দুর্দশা নিয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদ, নিবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে অবহিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ডিএনডি বাঁধের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ২০১০ সালে ডিএনডি এলাকার বাসিন্দাদের দুর্দশার কথা বিবেচনা করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ মোতাবেক সরকার কর্তৃক ‘ডিএনডি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কিছু অদূরদর্শী জনপ্রতিনিধির ভুল ব্যাখ্যার কারণে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।

এরই মধ্যে জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট দুর্দশা লাঘবে বাঁধের মধ্যকার রাস্তা-অলিগলি বারবার উঁচু করার ফলে বাড়িগুলো নিচু হতে থাকে। ফলে অনেক বাড়ির নিচতলা মাটির নিচে চলে গেছে। অনেকে বাড়ির ওইসব ভূগর্ভস্থ নিচতলা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করছে। ওইসব ভূগর্ভস্থ নিচতলার পাঁচ ইঞ্চি দেওয়াল ধসে যে কোনো সময়ে জীবনঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সর্বোপরি গত ২৮ মে ২০১৩ তারিখে ‘আমাদের অর্থনীতি’ পত্রিকায় ‘ডিএনডি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সমীপে খোলা চিঠি ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ ‘ডিএনডি বাঁধের জলাবদ্ধতার সমাধানে’ শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৪ এর সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের দৃষ্টি আকর্ষণী বক্তব্যের পর সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডিএনডি এলাকা পরিদর্শন করে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ডিএনডি ড্রেনেজ অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ একনেকে উপস্থাপন করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটি অনুমোদন করেন।

শুধু তাই নয়, উল্লিখিত প্রকল্প এলাকায় দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার করে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করেন; কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। সামনে বর্ষাকাল। জলাবদ্ধতা রোধে খাল সংস্কার এবং প্রকল্পে প্রস্তাবিত শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশনগুলো স্থাপন করা জরুরি।

আমাদের বিশ্বাস, দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করেছে এবং করছে, তেমনিভাবে ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে ‘ডিএনডি ড্রেনেজ অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করবে। ডিএনডি বাঁধ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনই শুধু নয়, এলাকার মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন এবং খেলার মাঠসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী।

ড. মো. আওলাদ হোসেন : ভেটেরিনারিয়ান, পরিবেশবিজ্ঞানী

বর্ষার আগেই ডিএনডি প্রকল্পের বাস্তবায়ন জরুরি

 ড. মো. আওলাদ হোসেন 
১৪ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধের অভ্যন্তরের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ড্রেনেজ ও স্যুয়ারেজ উন্নয়ন প্রকল্প’ অনুমোদন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে উল্লিখিত প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দেশ প্রদান করায় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবারও ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। জলাবদ্ধতা নিরসনে ওই এলাকায় ড্রেনসহ রাস্তা নির্মাণকাজ করায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘ডিএনডি ড্রেনেজ অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পে’র কাজ প্রাথমিকভাবে খুব জোরেশোরে শুরু হয়েছিল। মৃতপ্রায় খাল পুনরুদ্ধার ও পানি নিষ্কাশনের জন্য পাম্পস্টেশন নির্মাণকাজও শুরু হয়েছিল; কিন্তু করোনা মহামারিকালে কাজ বন্ধ হয়ে আর শুরু হয়নি। বর্ষা আসন্ন। ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসরত মানুষ আবারও জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন। উল্লেখিত প্রকল্পসহ ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসরত মানুষের বহুমুখী সমস্যা সমাধানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

১৯৬২ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরার (ডিএনডি) মধ্যকার ৫৮.২২ বর্গকিলোমিটার জলাভূমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে অতিরিক্ত ধানচাষ করার জন্য চারদিকে বাঁধ নিয়ে ‘ডিএনডি ইরিগেশন প্ল্যান্ট’ তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এ বাঁধটিই ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ-পোস্তগোলা-যাত্রাবাড়ী এলাকার চারদিকে যান চলাচলের রাস্তা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং বর্তমানে তা আরও প্রসারিত হয়েছে।

প্রকল্প এলাকায় সেচের জন্য ৫৫.২ কিলোমিটার সেচখাল ও ৪৫.৯০ কিলোমিটার নিষ্কাশন খাল খনন করা হয়েছিল। ঢাকা মহানগরীতে ব্যাপক আবাসন সংকটের ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সুবিধা নিশ্চিত থাকা চাষাবাদের জন্য প্রস্তুতকৃত ওই নিচু এলাকায় ক্রমান্বয়ে অপরিকল্পিত জনপদ গড়ে ওঠে। ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা নদীবেষ্টিত জুরাইন, মুরাদপুর, শ্যামপুর, আলমবাগ, নামা শ্যামপুর, কদমতলী, দনিয়া, পাটেরবাগ, রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, মাতুয়াইল, সিদ্ধিরগঞ্জ, পাগলা, ফতুল্লা, কুতুবপুর, মুন্সিবাগ, শহীদবাগ, ভূঁইঘর, মিজমিজি ও পার্শ্ববর্তী বিস্তৃত এলাকা নিয়ে ডিএনডি বাঁধের মধ্যে একটি বিশাল জনবহুল এলাকা গড়ে উঠেছে। এলাকাটিতে নিুআয় থেকে মধ্য আয়ের প্রায় অর্ধকোটি লোক বসবাস করে। এছাড়া রয়েছে অসংখ্য উপাসনালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছোট-মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।

প্রয়োজনের তাগিদে ধানক্ষেতের আইল দিয়ে চলার পথকে ভিত্তি করে অথবা এলাকাবাসীর সুবিধা অনুযায়ী অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা গড়ে উঠেছে, যা পরবর্তী সময়ে পাকা রাস্তায় পরিণত হয়েছে। ওইসব রাস্তার দুই পাশে সুউচ্চ অট্টালিকা গড়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় রাস্তার পাশে ড্রেন আছে, কিন্তু ড্রেনের পাশের বাড়িগুলো থেকে অপচনশীল দ্রব্যাদি দীর্ঘদিন ড্রেনে ফেলার কারণে এবং নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ড্রেনগুলো ময়লা, বালি ও মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে।

এলাকায় বসবাসকারী মানুষের পানির চাহিদা মোতাবেক ওয়াসা কর্তৃপক্ষ এ এলাকায় অসংখ্য গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে; কিন্তু ওইসব গভীর নলকূপ দিয়ে যে বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলিত হচ্ছে, তা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারের পর নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা রাখা হয়নি। এছাড়া বৃষ্টির পানি তো রয়েছেই।

বসতবাড়ি গড়ে ওঠার পর সেচের জন্য খনন করা আঁকাবাঁকা খালগুলোতে পানির প্রবাহ না থাকলেও সেগুলো বসতবাড়ির ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে। তবে এলাকাবাসী ওই খালগুলোতে শুধু ড্রেনের পানি নিষ্কাশন করেই ক্ষান্ত হননি, ওই খালে বাড়ির ময়লা-আবর্জনা, ব্যবহৃত পলিথিন ও অপ্রয়োজনীয় অপচনশীল দ্রব্যাদি ফেলে খালগুলো ভরাট করে ফেলেছেন। অনেক জায়গায় খালগুলো সম্পূর্ণভাবে বা সেগুলোর অংশবিশেষ অবৈধ দখলদারদের হাতে চলে গেছে। ফলে বর্তমানে ওসব সেচখালে ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের আর কোনো উপায় নেই। ফলে ওই পানি নিম্নাঞ্চলকে প্লাবিত করে থাকে।

ডিএনডি এলাকাটির চারদিকে উঁচু বাঁধ থাকার ফলে পানি বের হয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। বাঁধের মধ্যখানের নিচু এলাকায় প্লাবিত পানি নিষ্কাশনের জন্য শিমরাইলে অবস্থিত একটিমাত্র পাম্পস্টেশন রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই নগণ্য। এছাড়া খালটির বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় ড্রেনের পানি পাম্পস্টেশন পর্যন্ত পৌঁছার কোনো উপায় না থাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে উল্লেখিত প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে, আমার দেখামতে, কদমতলী থানা এলাকায় অলিগলিগুলোসহ প্রধান রাস্তায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। কালো-পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে চলাচল দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল। সামান্য বৃষ্টি হলেই রিকশা ছাড়া রাস্তায় নামা যেত না। ভারী বৃষ্টি হলে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সব একাকার হয়ে যেত। নামা শ্যামপুর, কদমতলী, মেরাজনগর, মোহাম্মদবাগ, শহীদবাগ, মদিনাবাগসহ পুরো নিম্নাঞ্চলে হাঁটু থেকে কোমর পরিমাণ পানি জমে যেত। সেসময়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠনের নেতাকর্মীরা দুর্দশা লাঘবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। পানি নিষ্কাশনের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।

ডিএনডি বাঁধের মধ্যের জলাবদ্ধতা ও মানুষের দুর্দশা নিয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচারিত সংবাদ, নিবন্ধ ইত্যাদির মাধ্যমে অবহিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ডিএনডি বাঁধের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ২০১০ সালে ডিএনডি এলাকার বাসিন্দাদের দুর্দশার কথা বিবেচনা করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ মোতাবেক সরকার কর্তৃক ‘ডিএনডি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছিল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মোতাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কিছু অদূরদর্শী জনপ্রতিনিধির ভুল ব্যাখ্যার কারণে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখেনি।

এরই মধ্যে জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট দুর্দশা লাঘবে বাঁধের মধ্যকার রাস্তা-অলিগলি বারবার উঁচু করার ফলে বাড়িগুলো নিচু হতে থাকে। ফলে অনেক বাড়ির নিচতলা মাটির নিচে চলে গেছে। অনেকে বাড়ির ওইসব ভূগর্ভস্থ নিচতলা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবহার করছে। ওইসব ভূগর্ভস্থ নিচতলার পাঁচ ইঞ্চি দেওয়াল ধসে যে কোনো সময়ে জীবনঘাতী দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সর্বোপরি গত ২৮ মে ২০১৩ তারিখে ‘আমাদের অর্থনীতি’ পত্রিকায় ‘ডিএনডি জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী সমীপে খোলা চিঠি ও ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ ‘ডিএনডি বাঁধের জলাবদ্ধতার সমাধানে’ শিরোনামে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদে নারায়ণগঞ্জ-৪ এর সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের দৃষ্টি আকর্ষণী বক্তব্যের পর সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ডিএনডি এলাকা পরিদর্শন করে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ৫৫৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘ডিএনডি ড্রেনেজ অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প’ একনেকে উপস্থাপন করা হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে প্রকল্পটি অনুমোদন করেন।

শুধু তাই নয়, উল্লিখিত প্রকল্প এলাকায় দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার করে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করেন; কিন্তু বর্তমানে প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে আছে। সামনে বর্ষাকাল। জলাবদ্ধতা রোধে খাল সংস্কার এবং প্রকল্পে প্রস্তাবিত শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশনগুলো স্থাপন করা জরুরি।

আমাদের বিশ্বাস, দেশপ্রেমিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করেছে এবং করছে, তেমনিভাবে ডিএনডি বাঁধের মধ্যে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিবেচনা করে ‘ডিএনডি ড্রেনেজ অ্যান্ড স্যুয়ারেজ ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়ন করবে। ডিএনডি বাঁধ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনই শুধু নয়, এলাকার মানুষের শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন এবং খেলার মাঠসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন এলাকাবাসী।

ড. মো. আওলাদ হোসেন : ভেটেরিনারিয়ান, পরিবেশবিজ্ঞানী

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন