শুরু হয়েছে, শেষ হবে তো?
jugantor
শুরু হয়েছে, শেষ হবে তো?

  মুঈদ রহমান  

২২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অভ্যন্তরে গেল সপ্তাহের আলোচিত বিষয় ছিল অর্থ আত্মসাৎকারী ও অর্থ পাচারকারী প্রশান্ত কুমার হালদারের গ্রেফতারের ঘটনা। দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়েছেন তিনি। দুই বছর ধরে আলোচিত এই প্রশান্ত কুমার হালদার পিকে হালদার নামে অধিক পরিচিত। অর্থ পাচারকারী দেশত্যাগী এই পিকে হালদার গত ১৪ মে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার অশোকনগরে গ্রেফতার হন। তাকে গ্রেফতার করে ভারতের অর্থসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, সংক্ষেপে ইডি। ইডি কার্যালয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আদালতে উপস্থিত করে রিমান্ড চাইলে আদালত প্রথমে ১৭ মে পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নির্ধারিত সময় শেষে ইডির পক্ষ থেকে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে আদালতে দ্বিতীয়বারের মতো আরও ১৪ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে পিকে হালদার ইডি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের হাতে ন্যস্ত আছেন। এর আগে পিকে হালদারকে গ্রেফতারের জন্য বাংলাদেশ ইন্টারপোলোর সাহায্য চায়। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পিকে হালদারকে গ্রেফতার করা হয় বলে ভারতের সরকারি পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পিকে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তাছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বলেছেন, পিকে হালদারকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কোনো আপত্তি নেই। আশা করা যাচ্ছে, পিকে হালদার যদি ভারতীয় আইনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে থাকেন, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে। তবে তার বিরুদ্ধে ভারতীয় পাসপোর্ট, রেশন কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে বলে শোনা যায়।

পিকে হালদার বাংলাদেশের আর্থিক খাতের একজন শীর্ষ নির্বাহী হিসাবে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এ পদে আসার আগে তিনি রিলায়েন্স ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। বছর দুয়েক আগের এক হিসাবমতে দেখা যায়, দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার সুবাদে তার বেতনভাতাসহ বৈধ উৎস থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা যায়, উচ্চপদে থাকা অবস্থায় তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নড়চেড়ে বসে। ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পিকে হালদারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সেই মামলায় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয় ২৭৫ কোটি টাকার। অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি একই মালায় ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ দায়ের করে দুদক। একে একে অধিকতর অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে আরও জালিয়াতির তথ্য পায় দুদক। সেই অনুযায়ী পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে একটি মামলা তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা হয়েছে, আরও তিনটি মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান সময়ে দুদক বলছে, পিকে হালদার ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে ঋণ অনুমোদন করে ২৫০ কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন এবং আত্মসাৎ ও পাচার করা অর্থের পরিমাণ ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কম নয়। অসমর্থিত অন্যান্য সূত্র অর্থের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা হবে বলে অনুমান করছে। তারপরও সরকারি প্রতিষ্ঠান দুদকের ভাষ্যই আমাদের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য। অথচ দুবছর আগে যখন আমরা সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার কথা বলেছি, তখন অনেক দলকানা বন্ধু একে তথ্যবিভ্রান্তি এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা বলে তিরস্কার করেছিল। তাই কেবল সরকারি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুদকের ভাষ্যটি আমলে নেওয়াই যথেষ্ট বলে মনে করছি।

দেশে-বিদেশে পিকে হালদারের সম্পদ-সম্পত্তির বিবরণী তুলে ধরা আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো দেশের আর্থিক অনিয়মের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা। একজন পিকে হালদার একদিনে বা এককভাবে তৈরি হননি। দিনে দিনে বহু মানুষের সহযোগিতায় এই পিকে হালদারের সৃষ্টি। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইডির কাছে পিকে হালদার স্বীকার করেছেন, তার সহযোগী হিসাবে ভারতের সাতজন এবং বাংলাদেশের ৪০ জন নাগরিক কাজ করেছে। বের করতে হবে তারা কারা। কিন্তু তা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, এর আগে ক্যাসিনো-কেলেঙ্কারিতে জিকে শামীম, সম্রাট, করোনাকালে শাহেদ, সাবরিনা এবং পরবর্তী সময়ে পাপিয়ার নাম অনৈতিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার খবর আলোড়িত হয়েছিল। তবে তা দুদিন বাদেই মিলিয়ে গেছে। এবারও নতুন কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। এর কারণ হলো, সরকারি মহল থেকে আর্থিক অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়ে থাকে, যা অনিয়মে উৎসাহ জোগায়। অর্থ পাচার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সরকার সেগুলোকে আমলে নেয়নি। বরং অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, আপনারা পাচারকারীদের তালিকা দিন। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানকাজ সীমিত আকারে করা সম্ভব। ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করার মতো এজেন্সি তো সরকারের হাতে। প্রকাশিত সংবাদকে আমলে নিয়ে এর প্রকৃত সত্য যাচাই করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তারা তা আমলেই নেয়নি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বিশ্বের সব দেশের অর্থ পাচার, অবৈধ বণিজ্য লেনদেন, অবৈধ সম্পদ অর্জন প্রভৃতি বিষয়ে কাজ করে এবং নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটির মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল-এই ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৭ হাজার কোটি ডলার পাচার হয়েছে। প্রতি ডলার সমান যদি ৮৬ টাকা ধরা হয়, তাহলে বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ২ হাজার টাকা, যা আমাদের চলতি বাজেটের প্রায় সমান (আমাদের চলতি বাজেট ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার)। তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। জিএফআই-এর রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে থাকে। সুতরাং এই পাচারপ্রবণতাকে প্রতিরোধ করতে না পারলে একজন পিকে হালদারকে আটকের মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি হবে না। কারণ পিকে হালদার সমগ্র অন্ধকার জগতের একটি খণ্ডিত অংশমাত্র। যদি বলা হয়, ‘আজ থেকে শুরু হলো’, তবে বিলম্ব হলেও আমরা আশান্বিত। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় অতীতের অভিজ্ঞতা, যেখানে শুরু হয়, শেষ হয় না।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক-যে কোনো সমস্যা উত্থাপিত বা প্রকাশিত হলে সরকারের দায়িত্ব হলো এর যথাযথ অনুসন্ধান বা তদন্ত করে সুষ্ঠু সমাধান করা। কোনো সমস্যা উত্থাপিত হওয়া মানে সরকারবিরোধিতা নয় বরং সরকারের সহযোগিতা। যদি সরকারি মহল এটাকে সরকারবিরোধিতা মনে করে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তাহলে বুঝতে হবে ওইসব কাজের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের লোকজন সে কাজটিই করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে দুর্নীতির কথা বলা হলেও সরকার তা তাদের বিরোধিতা মনে করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ফলে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহ পাচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থাটির একটি শাখা বাংলাদেশে আছে, নাম তার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টরন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি প্রতিবছরই দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ হলো সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। দেশ দুটির করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে (সিপিআই) স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৮৮। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির তালিকায় এক নম্বরে আছে দক্ষিণ সুদান। তার সিপিআই স্কোর মাত্র ১১। ২৬ পয়েন্ট নিয়ে দুর্নীতির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪। ভারতের অবস্থান ৯৫ এবং পাকিস্তানের ৬০। এর এক বছর পর অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতিতে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে ৩৩তম অবস্থানে আছে। ভারতের অবস্থান ৯৫-ই থেকে গেছে আর পাকিস্তানের ২০ ধাপ অবনতি হয়ে ৪০-এ অবস্থান করছে। এই যে বাংলাদেশের এক ধাপ অবনতির খবর, তা প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি উপর মহলের গাত্রজালা শুরু হয়ে যায়, টিআইবিকে নানা ভাষায় তিরস্কার করা হয়। অথচ বিএনপির আমলে এই টিআইবির প্রতিবেদনেই বাংলাদেশকে এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলা হয়েছিল। তখন আওয়ামী লীগ তা সানন্দে গ্রহণ করে নির্বাচনি প্রচারে কাজে লাগাতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।

বস্তুত দ্বিমুখী মনোভাবাপন্ন হলে সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যায় না। এ ধরনের মনোভাব থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনাকে আমলে নিয়ে এর প্রতিকার করতে হবে। সমস্যা জিইয়ে না রেখে প্রথমেই সমাধানের পথ দেখতে হবে। তা না হলে বছর বছর ডজন ডজন প্রশান্ত কুমার হালদারদের জন্ম হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

শুরু হয়েছে, শেষ হবে তো?

 মুঈদ রহমান 
২২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অভ্যন্তরে গেল সপ্তাহের আলোচিত বিষয় ছিল অর্থ আত্মসাৎকারী ও অর্থ পাচারকারী প্রশান্ত কুমার হালদারের গ্রেফতারের ঘটনা। দেশের প্রায় সব গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয়েছেন তিনি। দুই বছর ধরে আলোচিত এই প্রশান্ত কুমার হালদার পিকে হালদার নামে অধিক পরিচিত। অর্থ পাচারকারী দেশত্যাগী এই পিকে হালদার গত ১৪ মে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার অশোকনগরে গ্রেফতার হন। তাকে গ্রেফতার করে ভারতের অর্থসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, সংক্ষেপে ইডি। ইডি কার্যালয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে আদালতে উপস্থিত করে রিমান্ড চাইলে আদালত প্রথমে ১৭ মে পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর করেন। নির্ধারিত সময় শেষে ইডির পক্ষ থেকে অধিকতর তদন্তের স্বার্থে আদালতে দ্বিতীয়বারের মতো আরও ১৪ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত শুনানি শেষে ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বর্তমানে পিকে হালদার ইডি কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের হাতে ন্যস্ত আছেন। এর আগে পিকে হালদারকে গ্রেফতারের জন্য বাংলাদেশ ইন্টারপোলোর সাহায্য চায়। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পিকে হালদারকে গ্রেফতার করা হয় বলে ভারতের সরকারি পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পিকে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। তাছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার বলেছেন, পিকে হালদারকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কোনো আপত্তি নেই। আশা করা যাচ্ছে, পিকে হালদার যদি ভারতীয় আইনের কোনো ব্যত্যয় না ঘটিয়ে থাকেন, তাহলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে বাংলাদেশে ফেরত আনা সম্ভব হবে। তবে তার বিরুদ্ধে ভারতীয় পাসপোর্ট, রেশন কার্ড জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে বলে শোনা যায়।

পিকে হালদার বাংলাদেশের আর্থিক খাতের একজন শীর্ষ নির্বাহী হিসাবে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। এ পদে আসার আগে তিনি রিলায়েন্স ফিন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। বছর দুয়েক আগের এক হিসাবমতে দেখা যায়, দীর্ঘ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকার সুবাদে তার বেতনভাতাসহ বৈধ উৎস থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। কিন্তু বিভিন্ন অনুসন্ধানে দেখা যায়, উচ্চপদে থাকা অবস্থায় তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ বিষয়ে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নড়চেড়ে বসে। ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি পিকে হালদারের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। সেই মামলায় অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয় ২৭৫ কোটি টাকার। অবৈধ সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি একই মালায় ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ দায়ের করে দুদক। একে একে অধিকতর অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে আরও জালিয়াতির তথ্য পায় দুদক। সেই অনুযায়ী পিকে হালদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা হয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে একটি মামলা তদন্ত শেষে আদালতে দাখিল করা হয়েছে, আরও তিনটি মামলার অভিযোগপত্র অনুমোদনের জন্য কমিশনে পাঠানো হয়েছে। বর্তমান সময়ে দুদক বলছে, পিকে হালদার ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে ঋণ অনুমোদন করে ২৫০ কোটি টাকা কমিশন নিয়েছেন এবং আত্মসাৎ ও পাচার করা অর্থের পরিমাণ ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কম নয়। অসমর্থিত অন্যান্য সূত্র অর্থের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা হবে বলে অনুমান করছে। তারপরও সরকারি প্রতিষ্ঠান দুদকের ভাষ্যই আমাদের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য। অথচ দুবছর আগে যখন আমরা সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার কথা বলেছি, তখন অনেক দলকানা বন্ধু একে তথ্যবিভ্রান্তি এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা বলে তিরস্কার করেছিল। তাই কেবল সরকারি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুদকের ভাষ্যটি আমলে নেওয়াই যথেষ্ট বলে মনে করছি।

দেশে-বিদেশে পিকে হালদারের সম্পদ-সম্পত্তির বিবরণী তুলে ধরা আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য হলো দেশের আর্থিক অনিয়মের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা। একজন পিকে হালদার একদিনে বা এককভাবে তৈরি হননি। দিনে দিনে বহু মানুষের সহযোগিতায় এই পিকে হালদারের সৃষ্টি। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ইডির কাছে পিকে হালদার স্বীকার করেছেন, তার সহযোগী হিসাবে ভারতের সাতজন এবং বাংলাদেশের ৪০ জন নাগরিক কাজ করেছে। বের করতে হবে তারা কারা। কিন্তু তা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, এর আগে ক্যাসিনো-কেলেঙ্কারিতে জিকে শামীম, সম্রাট, করোনাকালে শাহেদ, সাবরিনা এবং পরবর্তী সময়ে পাপিয়ার নাম অনৈতিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার খবর আলোড়িত হয়েছিল। তবে তা দুদিন বাদেই মিলিয়ে গেছে। এবারও নতুন কিছু প্রত্যাশা করা যায় না। এর কারণ হলো, সরকারি মহল থেকে আর্থিক অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়ে থাকে, যা অনিয়মে উৎসাহ জোগায়। অর্থ পাচার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সরকার সেগুলোকে আমলে নেয়নি। বরং অর্থমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, আপনারা পাচারকারীদের তালিকা দিন। সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানকাজ সীমিত আকারে করা সম্ভব। ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করার মতো এজেন্সি তো সরকারের হাতে। প্রকাশিত সংবাদকে আমলে নিয়ে এর প্রকৃত সত্য যাচাই করার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু তারা তা আমলেই নেয়নি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বিশ্বের সব দেশের অর্থ পাচার, অবৈধ বণিজ্য লেনদেন, অবৈধ সম্পদ অর্জন প্রভৃতি বিষয়ে কাজ করে এবং নিয়মিতভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটির মতে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল-এই ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৭ হাজার কোটি ডলার পাচার হয়েছে। প্রতি ডলার সমান যদি ৮৬ টাকা ধরা হয়, তাহলে বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ২ হাজার টাকা, যা আমাদের চলতি বাজেটের প্রায় সমান (আমাদের চলতি বাজেট ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার)। তথ্যমতে, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। জিএফআই-এর রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে থাকে। সুতরাং এই পাচারপ্রবণতাকে প্রতিরোধ করতে না পারলে একজন পিকে হালদারকে আটকের মাধ্যমে কার্যসিদ্ধি হবে না। কারণ পিকে হালদার সমগ্র অন্ধকার জগতের একটি খণ্ডিত অংশমাত্র। যদি বলা হয়, ‘আজ থেকে শুরু হলো’, তবে বিলম্ব হলেও আমরা আশান্বিত। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় অতীতের অভিজ্ঞতা, যেখানে শুরু হয়, শেষ হয় না।

অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক-যে কোনো সমস্যা উত্থাপিত বা প্রকাশিত হলে সরকারের দায়িত্ব হলো এর যথাযথ অনুসন্ধান বা তদন্ত করে সুষ্ঠু সমাধান করা। কোনো সমস্যা উত্থাপিত হওয়া মানে সরকারবিরোধিতা নয় বরং সরকারের সহযোগিতা। যদি সরকারি মহল এটাকে সরকারবিরোধিতা মনে করে এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে, তাহলে বুঝতে হবে ওইসব কাজের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের লোকজন সে কাজটিই করছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন মহল থেকে দুর্নীতির কথা বলা হলেও সরকার তা তাদের বিরোধিতা মনে করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ফলে দুর্নীতিবাজরা উৎসাহ পাচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সংস্থাটির একটি শাখা বাংলাদেশে আছে, নাম তার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টরন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি প্রতিবছরই দুর্নীতির প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮০টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতির দেশ হলো সুইডেন ও ফিনল্যান্ড। দেশ দুটির করাপশন পারসেপশন ইনডেক্সে (সিপিআই) স্কোর ১০০-এর মধ্যে ৮৮। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির তালিকায় এক নম্বরে আছে দক্ষিণ সুদান। তার সিপিআই স্কোর মাত্র ১১। ২৬ পয়েন্ট নিয়ে দুর্নীতির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪। ভারতের অবস্থান ৯৫ এবং পাকিস্তানের ৬০। এর এক বছর পর অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রতিবেদন বলছে, দুর্নীতিতে বাংলাদেশ এক ধাপ এগিয়ে ৩৩তম অবস্থানে আছে। ভারতের অবস্থান ৯৫-ই থেকে গেছে আর পাকিস্তানের ২০ ধাপ অবনতি হয়ে ৪০-এ অবস্থান করছে। এই যে বাংলাদেশের এক ধাপ অবনতির খবর, তা প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে সরকারি উপর মহলের গাত্রজালা শুরু হয়ে যায়, টিআইবিকে নানা ভাষায় তিরস্কার করা হয়। অথচ বিএনপির আমলে এই টিআইবির প্রতিবেদনেই বাংলাদেশকে এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ বলা হয়েছিল। তখন আওয়ামী লীগ তা সানন্দে গ্রহণ করে নির্বাচনি প্রচারে কাজে লাগাতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।

বস্তুত দ্বিমুখী মনোভাবাপন্ন হলে সঠিক পথের সন্ধান পাওয়া যায় না। এ ধরনের মনোভাব থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনাকে আমলে নিয়ে এর প্রতিকার করতে হবে। সমস্যা জিইয়ে না রেখে প্রথমেই সমাধানের পথ দেখতে হবে। তা না হলে বছর বছর ডজন ডজন প্রশান্ত কুমার হালদারদের জন্ম হবে।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন