অর্থ পাচার রোধে অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ করতে হবে
jugantor
অর্থ পাচার রোধে অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ করতে হবে

  এম এ খালেক  

২২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সরকারের দুটি সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা নিজ দেশ থেকে এ দুটি দেশে অর্থ পাচার করেছেন বা আগামী অর্থ পাচারের পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য এ উদ্যোগ ভয়াবহ দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা অনেকের কাছেই ‘স্বপ্নের দেশ।’ বিশ্বে খুব কম মানুষই আছেন যারা একবারের জন্য হলেও এই দুই দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের কথা ভাবেননি। অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা হচ্ছে ‘সব পেয়েছি’র দেশ। একবার সেখানে গিয়ে থিতু হতে পারলে আর কথা নেই। তাই অনেকেই চেষ্টা করেন কীভাবে এ দুটি দেশে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অভিবাসীদের বেশির ভাগই তাদের নিজ নিজ দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ নিয়ে সেখানে চলে যান। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে অনেকেই তাদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় চলে যান। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করলে একই চিত্র প্রত্যক্ষ করা যাবে।

বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করছে। কিছু মানুষ উন্নয়নের এই সময়ে ব্যাপকভাবে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়ে বিত্তবৈভব গড়ে তুলছেন। যেহেতু দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থসম্পদ দেশের অভ্যন্তরে প্রশ্নহীনভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই, তাই তারা সেই অর্থ ও সম্পদ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। বাংলাদেশে যারা অবৈধ উপায়ে বিত্তবৈভব গড়ে তুলছেন, তাদের প্রথম পছন্দ হচ্ছে কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র। নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা এ দুই দেশে অর্থ পাচার করে তাদের অবৈধ সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতার ইতি টানার বোধহয় সময় এসেছে।

কোনো দেশই চায় না, তার দেশের উপার্জিত অর্থ অন্য দেশে ব্যবহৃত হোক। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, মুদ্রা পাচার কখনোই বন্ধ হবে না যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশ এ ব্যাপারে সতর্ক এবং সচেতন না হয়। কারণ এটা দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম। যে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয় তারা কখনোই তা বন্ধ করতে পারবে না, যদি মুদ্রা পাচারের গন্তব্য দেশটিও সতর্ক না হয়। কোনো দেশ যদি পাচারকৃত মুদ্রাকে তাদের দেশে অভ্যর্থনা জানায়, তাহলে কখনোই মুদ্রা পাচার বন্ধ হবে না। কিন্তু উদ্দিষ্ট দেশটি যদি পাচারকৃত মুদ্রা তাদের দেশে অভ্যর্থনা না জানায়, তাহলে এ কার্যক্রম এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই তাদের দেশে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে পাচারকৃত অর্থকে স্বাগত জানায়। যেমন, মালয়েশিয়া তাদের দেশে সেকেন্ড হোম প্রকল্প চালাচ্ছে অনেক দিন ধরেই। বিদেশি কোনো নাগরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলে তাকে মালয়েশিয়ায় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

তুরস্কও সম্প্রতি সেকেন্ড হোম প্রকল্প চালু করেছে। বাংলাদেশের অন্তত ২০০ বিত্তবান অর্থ পাচারকারী এ প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন করেছে। আরও অনেক দেশ পরোক্ষভাবে পাচারকৃত অর্থকে স্বাগত জানাচ্ছে। কানাডার বেগমপাড়ায় বাংলাদেশিদের ব্যাপক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, কানাডার বেগমপাড়ায় যেসব বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে, তাদের বেশির ভাগই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা অথবা চলমান কর্মকর্তা। তারা নানা উপায়ে বিস্তর অর্থকড়ি সঞ্চয় করে কানাডায় বাড়ি ক্রয় করেছে। কিন্তু কানাডা কর্তৃপক্ষ হাউজিং সেক্টরে বিদেশিদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে অভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক সমস্যায় পতিত হয়েছে। সেদেশে আবাসন খাতের মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী দুবছর কোনো বিদেশিকে তাদের দেশের হাউজিং সেক্টরে কোনো বাড়ি বা ফ্লাট ক্রয় করতে দেওয়া হবে না।

কানাডা কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের ফলে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের অর্থ পাচারকারীরা বিপাকে পড়েছে। তারা চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে। কারণ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কানাডায় অর্থ পাচারের পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে। বিদেশি অর্থ পাচারকারীদের জন্য কানাডা একটি স্বর্গরাজ্য। অনেকেই কানাডায় অর্থপাচার করে থাকে। কিন্তু কানাডা সরকারের এ উদ্যোগ অনেকের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিদেশ থেকে অনেকেই অর্থ পাচার করে থাকে। কানাডার মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অর্থ পাচারকারীদের একটি স্বর্গরাজ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব বিদেশি নাগরিক নগদ অর্থে বাড়ি-ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো সম্পত্তি অর্জন করেছেন তাদের পুরো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। সেসব বিদেশির সম্পদে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা হবে না, যারা সে দেশের কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে সম্পদ অর্জন করেছেন। যারা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ ক্রয় করবে, তাদেরই সেই সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু যারা নিজ দেশ থেকে অর্থ পাচার করে সেখানে নিয়ে কোনো সম্পদ অর্জন করবে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যি এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই মুদ্রা পাচারকারীদের অপতৎপরতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। তবে বিষয়টি হতে হবে সমন্বিতভাবে। অর্থাৎ প্রতিটি দেশকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে যাতে কোনো দেশ থেকে তাদের দেশে অর্থ পাচার হয়ে আসতে না পারে। যে দেশে মুদ্রা পাচার করা হয়, সে দেশটি যদি এ ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে তাহলে এ অপরাধকর্ম অনেকটাই কমে আসবে। কারণ কেউ তার নিজ দেশে অবৈধ অর্থ উপার্জন করলেও তা তিনি কোনো দেশে যদি স্থানান্তর করতে না পারেন, তাহলে পাচারপ্রবণতা এমনিতেই কমে আসবে।

মুদ্রা পাচার কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। যেসব দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ মুদ্রা পাচার হয়, সেসব দেশেও অন্যদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে আসে। মুদ্রা পাচার একটি বহুপক্ষীয় সমস্যা। কোনো দেশের একার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয় এবং কত অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতোধারায় প্রবিষ্ট করানো হয়, এর সঠিক হিসাব কোনো কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে না। যদিও কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ মানি লন্ডারিং এবং অর্থ পাচারের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল ক্যামদিসাস কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, প্রতিবছর বিশ্বে যে অর্থ ও সম্পদ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়, এর পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশের সমান। অঙ্কের হিসাবে যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন (এক ট্রিলিয়ন সমান এক লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের সমান। কিন্তু এ পরিসংখ্যান কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ মানি লন্ডাররা কখনোই তাদের অর্থের উৎস ও পরিমাণ কাউকে জানায় না। মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের হিসাব কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংরক্ষিত হয় না, হওয়া সম্ভবও নয়। এছাড়া পরিসংখ্যানের মধ্যে যে ব্যবধান তা এ পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, এর সঠিক কোনো হিসাব কারও পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি কত টাকা প্রতিবছর পাচার হয়, তাও জানা সম্ভব নয়। পাচারকৃত অর্থের প্রায় পুরোটাই মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে বৈধতা দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ২০১৫ সালে মোট ১ হাজার ১৫১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫২৮ কোটি মার্কিন ডলার। ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে যথাক্রমে ৪৯০ কোটি, ৭০৯ কোটি, ৮০০ কোটি, ৭১২ কোটি এবং ৮৮২ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়। জিএফআই বাংলাদেশ থেকে মুদ্রা পাচারের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তা অবশ্যই উদ্বেগজনক। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত হিসাব নয়। শুধু জিএফআই নয়, কোনো কর্তৃপক্ষই পাচার করা মুদ্রা এবং মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ জানাতে পারবে না।

মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমেই অবৈধ অর্থ উপার্জনের রাস্তাগুলো বন্ধ করতে হবে। কারা অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে মুদ্রা পাচার ও মানিলন্ডারিং বৃদ্ধি পায়। এ প্রবণতা আমরা ২০১৩ সালে প্রত্যক্ষ করেছি। আগামী জাতীয় নির্বাচন যে কোনো বিচারেই অত্যন্ত জটিল ও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যারা ক্ষমতা ব্যবহার করে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছেন, তারা তাদের অর্থ বিদেশে পাচার করে দিতে পারেন। কাজেই এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

যেহেতু মুদ্রা পাচার ও মানি লন্ডারিং কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়, তাই সম্মিলিতভাবেই এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিসংঘের উদ্যোগ সংঘভুক্ত প্রতিটি দেশ একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, ভবিষ্যতে আর কোনো পাচারকৃত অর্থ তাদের দেশে স্থান দেওয়া হবে না। এটা করা গেলে মুদ্রা পাচার অনেকটাই কমে আসবে। মুদ্রা পাচার কমে গেলে মানি লন্ডারিংয়ের প্রবণতাও হ্রাস পাবে।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড; অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

অর্থ পাচার রোধে অবৈধ আয়ের উৎস বন্ধ করতে হবে

 এম এ খালেক 
২২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সরকারের দুটি সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে যারা নিজ দেশ থেকে এ দুটি দেশে অর্থ পাচার করেছেন বা আগামী অর্থ পাচারের পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য এ উদ্যোগ ভয়াবহ দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা অনেকের কাছেই ‘স্বপ্নের দেশ।’ বিশ্বে খুব কম মানুষই আছেন যারা একবারের জন্য হলেও এই দুই দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের কথা ভাবেননি। অনেকেই মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা হচ্ছে ‘সব পেয়েছি’র দেশ। একবার সেখানে গিয়ে থিতু হতে পারলে আর কথা নেই। তাই অনেকেই চেষ্টা করেন কীভাবে এ দুটি দেশে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় অভিবাসীদের বেশির ভাগই তাদের নিজ নিজ দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ নিয়ে সেখানে চলে যান। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে অনেকেই তাদের অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় চলে যান। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি বিবেচনা করলে একই চিত্র প্রত্যক্ষ করা যাবে।

বাংলাদেশ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করছে। কিছু মানুষ উন্নয়নের এই সময়ে ব্যাপকভাবে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়ে বিত্তবৈভব গড়ে তুলছেন। যেহেতু দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থসম্পদ দেশের অভ্যন্তরে প্রশ্নহীনভাবে ব্যবহারের সুযোগ নেই, তাই তারা সেই অর্থ ও সম্পদ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে স্বস্তি পাওয়ার চেষ্টা করে থাকেন। বাংলাদেশে যারা অবৈধ উপায়ে বিত্তবৈভব গড়ে তুলছেন, তাদের প্রথম পছন্দ হচ্ছে কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র। নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তারা এ দুই দেশে অর্থ পাচার করে তাদের অবৈধ সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের চেষ্টা করছেন। এই প্রবণতার ইতি টানার বোধহয় সময় এসেছে।

কোনো দেশই চায় না, তার দেশের উপার্জিত অর্থ অন্য দেশে ব্যবহৃত হোক। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, মুদ্রা পাচার কখনোই বন্ধ হবে না যদি সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশ এ ব্যাপারে সতর্ক এবং সচেতন না হয়। কারণ এটা দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম। যে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয় তারা কখনোই তা বন্ধ করতে পারবে না, যদি মুদ্রা পাচারের গন্তব্য দেশটিও সতর্ক না হয়। কোনো দেশ যদি পাচারকৃত মুদ্রাকে তাদের দেশে অভ্যর্থনা জানায়, তাহলে কখনোই মুদ্রা পাচার বন্ধ হবে না। কিন্তু উদ্দিষ্ট দেশটি যদি পাচারকৃত মুদ্রা তাদের দেশে অভ্যর্থনা না জানায়, তাহলে এ কার্যক্রম এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিশ্বের বেশির ভাগ দেশই তাদের দেশে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে পাচারকৃত অর্থকে স্বাগত জানায়। যেমন, মালয়েশিয়া তাদের দেশে সেকেন্ড হোম প্রকল্প চালাচ্ছে অনেক দিন ধরেই। বিদেশি কোনো নাগরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলে তাকে মালয়েশিয়ায় নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

তুরস্কও সম্প্রতি সেকেন্ড হোম প্রকল্প চালু করেছে। বাংলাদেশের অন্তত ২০০ বিত্তবান অর্থ পাচারকারী এ প্রকল্পের মাধ্যমে তুরস্কের নাগরিকত্ব গ্রহণের জন্য আবেদন করেছে। আরও অনেক দেশ পরোক্ষভাবে পাচারকৃত অর্থকে স্বাগত জানাচ্ছে। কানাডার বেগমপাড়ায় বাংলাদেশিদের ব্যাপক উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করা যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, কানাডার বেগমপাড়ায় যেসব বাংলাদেশির বাড়ি রয়েছে, তাদের বেশির ভাগই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মকর্তা অথবা চলমান কর্মকর্তা। তারা নানা উপায়ে বিস্তর অর্থকড়ি সঞ্চয় করে কানাডায় বাড়ি ক্রয় করেছে। কিন্তু কানাডা কর্তৃপক্ষ হাউজিং সেক্টরে বিদেশিদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে অভ্যন্তরীণভাবে মারাত্মক সমস্যায় পতিত হয়েছে। সেদেশে আবাসন খাতের মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। তাই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী দুবছর কোনো বিদেশিকে তাদের দেশের হাউজিং সেক্টরে কোনো বাড়ি বা ফ্লাট ক্রয় করতে দেওয়া হবে না।

কানাডা কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তের ফলে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের অর্থ পাচারকারীরা বিপাকে পড়েছে। তারা চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেছে। কারণ এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে কানাডায় অর্থ পাচারের পরিমাণ অনেকটাই কমে যাবে। বিদেশি অর্থ পাচারকারীদের জন্য কানাডা একটি স্বর্গরাজ্য। অনেকেই কানাডায় অর্থপাচার করে থাকে। কিন্তু কানাডা সরকারের এ উদ্যোগ অনেকের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও বিদেশ থেকে অনেকেই অর্থ পাচার করে থাকে। কানাডার মতোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অর্থ পাচারকারীদের একটি স্বর্গরাজ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব বিদেশি নাগরিক নগদ অর্থে বাড়ি-ফ্ল্যাট বা অন্য কোনো সম্পত্তি অর্জন করেছেন তাদের পুরো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। সেসব বিদেশির সম্পদে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করা হবে না, যারা সে দেশের কোনো ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে সম্পদ অর্জন করেছেন। যারা বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ ক্রয় করবে, তাদেরই সেই সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু যারা নিজ দেশ থেকে অর্থ পাচার করে সেখানে নিয়ে কোনো সম্পদ অর্জন করবে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যি এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে, তাহলে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই মুদ্রা পাচারকারীদের অপতৎপরতা থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি পাবে। তবে বিষয়টি হতে হবে সমন্বিতভাবে। অর্থাৎ প্রতিটি দেশকে এমন উদ্যোগ নিতে হবে যাতে কোনো দেশ থেকে তাদের দেশে অর্থ পাচার হয়ে আসতে না পারে। যে দেশে মুদ্রা পাচার করা হয়, সে দেশটি যদি এ ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করে তাহলে এ অপরাধকর্ম অনেকটাই কমে আসবে। কারণ কেউ তার নিজ দেশে অবৈধ অর্থ উপার্জন করলেও তা তিনি কোনো দেশে যদি স্থানান্তর করতে না পারেন, তাহলে পাচারপ্রবণতা এমনিতেই কমে আসবে।

মুদ্রা পাচার কোনো একক দেশের সমস্যা নয়। যেসব দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ মুদ্রা পাচার হয়, সেসব দেশেও অন্যদেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে আসে। মুদ্রা পাচার একটি বহুপক্ষীয় সমস্যা। কোনো দেশের একার পক্ষে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয় এবং কত অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতোধারায় প্রবিষ্ট করানো হয়, এর সঠিক হিসাব কোনো কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে না। যদিও কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ মানি লন্ডারিং এবং অর্থ পাচারের পরিসংখ্যান প্রকাশ করে থাকে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল ক্যামদিসাস কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, প্রতিবছর বিশ্বে যে অর্থ ও সম্পদ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয়, এর পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশের সমান। অঙ্কের হিসাবে যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন (এক ট্রিলিয়ন সমান এক লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের সমান। কিন্তু এ পরিসংখ্যান কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ মানি লন্ডাররা কখনোই তাদের অর্থের উৎস ও পরিমাণ কাউকে জানায় না। মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের হিসাব কোনো প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সংরক্ষিত হয় না, হওয়া সম্ভবও নয়। এছাড়া পরিসংখ্যানের মধ্যে যে ব্যবধান তা এ পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাঝে ব্যবধান হচ্ছে ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশে প্রতিবছর কী পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হচ্ছে, এর সঠিক কোনো হিসাব কারও পক্ষেই দেওয়া সম্ভব নয়। এমনকি কত টাকা প্রতিবছর পাচার হয়, তাও জানা সম্ভব নয়। পাচারকৃত অর্থের প্রায় পুরোটাই মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে বৈধতা দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। ২০১৫ সালে মোট ১ হাজার ১৫১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পাচার হয়। ২০০৮ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫২৮ কোটি মার্কিন ডলার। ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে যথাক্রমে ৪৯০ কোটি, ৭০৯ কোটি, ৮০০ কোটি, ৭১২ কোটি এবং ৮৮২ কোটি মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার হয়। জিএফআই বাংলাদেশ থেকে মুদ্রা পাচারের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তা অবশ্যই উদ্বেগজনক। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত হিসাব নয়। শুধু জিএফআই নয়, কোনো কর্তৃপক্ষই পাচার করা মুদ্রা এবং মানি লন্ডারিংকৃত অর্থের সঠিক পরিমাণ জানাতে পারবে না।

মানি লন্ডারিং নিয়ন্ত্রণ করতে হলে প্রথমেই অবৈধ অর্থ উপার্জনের রাস্তাগুলো বন্ধ করতে হবে। কারা অর্থ পাচারের সঙ্গে যুক্ত, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। জাতীয় নির্বাচনের আগের বছর দেশ থেকে মুদ্রা পাচার ও মানিলন্ডারিং বৃদ্ধি পায়। এ প্রবণতা আমরা ২০১৩ সালে প্রত্যক্ষ করেছি। আগামী জাতীয় নির্বাচন যে কোনো বিচারেই অত্যন্ত জটিল ও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যারা ক্ষমতা ব্যবহার করে বিত্তের পাহাড় গড়ে তুলেছেন, তারা তাদের অর্থ বিদেশে পাচার করে দিতে পারেন। কাজেই এখনই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

যেহেতু মুদ্রা পাচার ও মানি লন্ডারিং কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়, তাই সম্মিলিতভাবেই এ সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে হবে। জাতিসংঘের উদ্যোগ সংঘভুক্ত প্রতিটি দেশ একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে আসতে পারে যে, ভবিষ্যতে আর কোনো পাচারকৃত অর্থ তাদের দেশে স্থান দেওয়া হবে না। এটা করা গেলে মুদ্রা পাচার অনেকটাই কমে আসবে। মুদ্রা পাচার কমে গেলে মানি লন্ডারিংয়ের প্রবণতাও হ্রাস পাবে।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড; অর্থনীতিবিষয়ক লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন