উদ্বেগ ও দুর্ভোগ দূর হোক
jugantor
ডলার সংকট
উদ্বেগ ও দুর্ভোগ দূর হোক

  আবু তাহের খান  

২৩ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অর্থনীতির নানা চলমান অনুষঙ্গের মধ্যে ডলারের বিপরীতে একাধিক দফায় টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এ অবমূল্যায়নের ফলে কাগজে-কলমে এ বিনিময় হারের বিপরীতে যে অঙ্কের কথাই লেখা থাকুক না কেন, ডলার ক্রয়ের বাস্তব ব্যয় ইতোমধ্যে ১০২ টাকা পর্যন্ত উঠেছে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে সহসাই তা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী মহোদয় এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যকার কেউ কেউ মনে করছেন, এ অবমূল্যায়ন আমদানি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে এবং কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও বিলাসী দ্রব্য আমদানির পেছনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সাশ্রয় ঘটবে। তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞই মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতির সামগ্রিক বিবেচনায় এ অবমূল্যায়নের ফলে দেশ অনিবার্যভাবেই ব্যাপকমাত্রার মূল্যস্ফীতির মুখে পড়বে বা ইতোমধ্যে তা পড়তে শুরুও করেছে। আর তাতে করে অন্যবিধ কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য আবার নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে এবং প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন এ মূল্যস্তর শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এ মুহূর্তে আঁচ-অনুমান করে বলাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজার এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। ফলে বেশি মূল্যে কেনা ডলার দিয়ে এসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে গেলে স্বভাবতই এসবের ব্যয় বেড়ে যাবে, যা প্রকারান্তরে পরিশোধ করতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের। এর মানে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রথম খড়গটিই এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তা তথা আমজনতার ওপর। এমনিতেই নানা ব্যবসায়িক কারসাজিতে দ্রব্যমূল্য এখন অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তার ওপর রয়েছে করোনা, ইউক্রেন যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনার প্রভাব। এ অবস্থায় দফায় দফায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধি অনেকটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে ভোক্তা সাধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে টাকার এরূপ ঘন ঘন ও উচ্চমাত্রার অবমূল্যায়ন একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয় কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় মঙ্গলের পাশাপাশি কারও না কারও স্বার্থের কথা ভেবেই এটি করেছেন। আর উদ্বেগটি আসলে সেখানেই নিহিত রয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অধিকাংশ মানুষের স্বার্থে গৃহীত না হয়ে গৃহীত হচ্ছে গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থে।

ধারণা করা যায়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং তাতে দেশের শিল্পোন্নয়নের ধারা অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়বে। দেশের রাজস্ব ও অন্যান্য আর্থিক নীতি এখন এমনিতেই উৎপাদনমুখী শিল্পের চেয়ে বণিকবৃত্তি (ট্রেডিং) ও সেবাখাতের প্রতি বেশি নমনীয় বা পক্ষপাতপূর্ণ। ফলে নীতিকাঠামোয় বিরাজমান এসব পক্ষপাতপূর্ণ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণভাবেই উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এখন অনেক কম। এ অবস্থায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সর্বসাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশকে আরেক দফা ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলেই ধারণা করা চলে। এ অবস্থায় অর্থনীতির মূল তৎপরতা আরও বেশি করে সেবাখাতনির্ভর হয়ে পড়বে বলেই মনে হচ্ছে। আর তাতে সেবাখাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা কতটা টেকসই হবে, সে নিয়ে দুশ্চিন্তা আরেক দফা বাড়ল বৈকি!

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে গত ১৬ মে পর্যন্ত গত সাড়ে চার মাসে ডলারের মূল্য পাঁচ দফা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের সর্বোচ্চ গতিহার। টাকার এমন দ্রুত গতির অবমূল্যায়ন দেশের বাজার ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চরম অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে বলে আশঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং সে আশঙ্কার কিছু কিছু ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতেও শুরু করেছে। দু-একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। টঙ্গীর এক্সক্লুসিভ ক্যান ইন্ডাস্ট্রিজ নিজেদের কারখানার জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করেছিল গত ঈদের আগে আগে, যখন ডলারের মূল্য ছিল ৮৪-৮৫ টাকা। এখন ওই কাঁচামালের বিদেশি সরবরাহকারীকে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের রীতিমতো মাথায় বাড়ি। ডলারের মূল্য এখন প্রায় ৯৫ টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় কারও কাছেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারণ করে দেওয়া ওই মূল্যে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ নয়। সর্বশেষ আমদানি করা ওই কাঁচামাল (যে কাঁচামালের মূল্য এখন বাড়তি দামে ডলার কিনে পরিশোধ করতে হচ্ছে) দিয়ে উৎপাদিত পণ্য তারা কাঁচামালের আগের দর ধরে বিক্রিও করে দিয়েছেন। এখন বলুন, এ অবস্থায় প্লাস্টিকের মালিক সৈয়দ নাসির যদি ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার ভয়ে নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে চিকিৎসকের কী সাধ্য তাকে সুস্থ করে তোলেন?

কেউ হয়তো বলবেন, ব্যবসায় বা শিল্পে ঝুঁকি থাকবেই এবং সে ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগ করতে হবে। বিলক্ষণ সত্য কথা; কিন্তু পাশাপাশি এটাওতো সত্য, রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্যোক্তাকে সহায়তা করা। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যদি উদ্যোক্তার জন্য ঝুঁকি তৈরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তা কোথায় কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবেন? না, প্রায় কোথাও তারা দাঁড়াবার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। আর রাষ্ট্রের এ ধরনের আচরণের কারণেই বস্তুত উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিশ্বর‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩৭ দেশের মধ্যে ১৩২। তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় বাংলাদেশ যে দীর্ঘসময় ধরে এগিয়ে থাকল, তার ব্যাখ্যা কী? আংশিক ব্যাখ্যা এই যে, সেবাখাতনির্ভর বিনিয়োগ থেকে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও দ্রুত ফললাভ, সম্পদের প্রবল মেরুকরণের ধারায় গুটিকতক উদ্যোক্তার দ্বারা একচেটিয়াভাবে বিনিয়োগ থেকে উচ্চহারে মুনাফা আহরণ, রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়পুষ্ট সুবিধাবাদী শ্রেণির হাত দিয়ে অর্থের ব্যাপক চলাচল ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষের বাস্তব আর্থিক সামর্থ্য না বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার ঠিকই বেড়েছে।

এটি সহজেই বোধগম্য যে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে চাপমুক্ত পর্যায়ে ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করেছে, যা স্বীকার করার মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এমন ঘনঘন টাকার অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে এ চাপ মোকাবিলার কৌশল কতটা সঠিক, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে চাপমুক্ত রাখতে হলে আসলে প্রয়োজন রফতানি বৃদ্ধি করা, অর্থ পাচার রোধ করা, রেমিট্যান্স আহরণের গতিকে পড়তে না দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয় এমন ব্যয় যেমন-বৈদেশিক ঋণ, বিদেশ ভ্রমণ, দেশে ও বিদেশে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পরিকল্পনাবিহীনভাবে টাকার অবমূল্যায়ন করা হলে তা উপকারের পরিবর্তে বাজারে বরং নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত হারানোর ক্ষেত্রে শ্রীলংকা কী কী ভুল করেছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই যথার্থ ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করি।

ডলারের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিজনিত প্রভাবের দু’-চারটি প্রসঙ্গ নিয়েই কেবল এখানে আলোচনা করা হলো। প্রকৃতপক্ষে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রকেই যে স্পর্শ করে যাবে, তা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়। দেশের আর্থিক নীতিপ্রণেতারা কী ভেবে ও কার স্বার্থে ডলারের বিপরীতে টাকার এ ঘনঘন অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছেন, জানি না। তবে যত সহজে তারা সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন, এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার কাজটি অত সহজে করতে পারবেন বলে মনে হয় না। আর যদি তারা তা না পারেন, তাহলে এতদিন ধরে ধারণ করা উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মাথাপিছু আয়ের অহংকার অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে। আর এটি বলা কোনো ধরনের সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বিষয়টির প্রতি এই মর্মে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য যে, এ ব্যাপারে এখনই জরুরি ভিত্তিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে এর ক্রমান্বয়িক প্রতিক্রিয়ায় (চেইন অ্যাফেক্ট) দেশের পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার কীভাবে সমন্বয় ও সংহত করা যাবে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত বলে মনে করি। এবং সে চিন্তা কোনো গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থ ও সুবিধার কথা ভেবে নয়-করতে হবে সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও সামগ্রিক অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে : পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডলারের মূল্য যদি একান্ত নিরূপায় হয়ে বাড়াতেই হয়, তাহলে তা করতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত সময়কাঠামো ঠিক করে নিয়ে। এভাবে খণ্ড খণ্ড সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সপ্তাহে সপ্তাহে যখন-তখন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সুফল দেবে না। আর তার চেয়েও বড় কথা, এ ক্ষেত্রে কী কী করা প্রয়োজন সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একা একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে এ ব্যাপারে দেশের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা।

আবু তাহের খান : সাবেক পরিচালক, বিসিক

atkhan56@gmail.com

ডলার সংকট

উদ্বেগ ও দুর্ভোগ দূর হোক

 আবু তাহের খান 
২৩ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের অর্থনীতির নানা চলমান অনুষঙ্গের মধ্যে ডলারের বিপরীতে একাধিক দফায় টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এ অবমূল্যায়নের ফলে কাগজে-কলমে এ বিনিময় হারের বিপরীতে যে অঙ্কের কথাই লেখা থাকুক না কেন, ডলার ক্রয়ের বাস্তব ব্যয় ইতোমধ্যে ১০২ টাকা পর্যন্ত উঠেছে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে সহসাই তা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী মহোদয় এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যকার কেউ কেউ মনে করছেন, এ অবমূল্যায়ন আমদানি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে এবং কম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও বিলাসী দ্রব্য আমদানির পেছনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের সাশ্রয় ঘটবে। তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞই মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ বাজার ও অর্থনীতির সামগ্রিক বিবেচনায় এ অবমূল্যায়নের ফলে দেশ অনিবার্যভাবেই ব্যাপকমাত্রার মূল্যস্ফীতির মুখে পড়বে বা ইতোমধ্যে তা পড়তে শুরুও করেছে। আর তাতে করে অন্যবিধ কারণে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য আবার নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উঠছে এবং প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন এ মূল্যস্তর শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা এ মুহূর্তে আঁচ-অনুমান করে বলাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বাজার এখনো ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর। ফলে বেশি মূল্যে কেনা ডলার দিয়ে এসব পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে গেলে স্বভাবতই এসবের ব্যয় বেড়ে যাবে, যা প্রকারান্তরে পরিশোধ করতে হবে সাধারণ ভোক্তাদের। এর মানে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রথম খড়গটিই এসে পড়ছে সাধারণ ভোক্তা তথা আমজনতার ওপর। এমনিতেই নানা ব্যবসায়িক কারসাজিতে দ্রব্যমূল্য এখন অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তার ওপর রয়েছে করোনা, ইউক্রেন যুদ্ধ ইত্যাদি ঘটনার প্রভাব। এ অবস্থায় দফায় দফায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধি অনেকটা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। ফলে ভোক্তা সাধারণের দৃষ্টিকোণ থেকে টাকার এরূপ ঘন ঘন ও উচ্চমাত্রার অবমূল্যায়ন একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা নিশ্চয় কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় মঙ্গলের পাশাপাশি কারও না কারও স্বার্থের কথা ভেবেই এটি করেছেন। আর উদ্বেগটি আসলে সেখানেই নিহিত রয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত অধিকাংশ মানুষের স্বার্থে গৃহীত না হয়ে গৃহীত হচ্ছে গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থে।

ধারণা করা যায়, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং তাতে দেশের শিল্পোন্নয়নের ধারা অনেকটাই শ্লথ হয়ে পড়বে। দেশের রাজস্ব ও অন্যান্য আর্থিক নীতি এখন এমনিতেই উৎপাদনমুখী শিল্পের চেয়ে বণিকবৃত্তি (ট্রেডিং) ও সেবাখাতের প্রতি বেশি নমনীয় বা পক্ষপাতপূর্ণ। ফলে নীতিকাঠামোয় বিরাজমান এসব পক্ষপাতপূর্ণ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণভাবেই উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ এখন অনেক কম। এ অবস্থায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সর্বসাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত উৎপাদনমুখী শিল্পের বিকাশকে আরেক দফা ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে বলেই ধারণা করা চলে। এ অবস্থায় অর্থনীতির মূল তৎপরতা আরও বেশি করে সেবাখাতনির্ভর হয়ে পড়বে বলেই মনে হচ্ছে। আর তাতে সেবাখাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা কতটা টেকসই হবে, সে নিয়ে দুশ্চিন্তা আরেক দফা বাড়ল বৈকি!

২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে গত ১৬ মে পর্যন্ত গত সাড়ে চার মাসে ডলারের মূল্য পাঁচ দফা বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের সর্বোচ্চ গতিহার। টাকার এমন দ্রুত গতির অবমূল্যায়ন দেশের বাজার ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চরম অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে বলে আশঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং সে আশঙ্কার কিছু কিছু ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতেও শুরু করেছে। দু-একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাক। টঙ্গীর এক্সক্লুসিভ ক্যান ইন্ডাস্ট্রিজ নিজেদের কারখানার জন্য বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করেছিল গত ঈদের আগে আগে, যখন ডলারের মূল্য ছিল ৮৪-৮৫ টাকা। এখন ওই কাঁচামালের বিদেশি সরবরাহকারীকে ডলারে মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে তাদের রীতিমতো মাথায় বাড়ি। ডলারের মূল্য এখন প্রায় ৯৫ টাকায় পৌঁছেছে। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রায় কারও কাছেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারণ করে দেওয়া ওই মূল্যে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ নয়। সর্বশেষ আমদানি করা ওই কাঁচামাল (যে কাঁচামালের মূল্য এখন বাড়তি দামে ডলার কিনে পরিশোধ করতে হচ্ছে) দিয়ে উৎপাদিত পণ্য তারা কাঁচামালের আগের দর ধরে বিক্রিও করে দিয়েছেন। এখন বলুন, এ অবস্থায় প্লাস্টিকের মালিক সৈয়দ নাসির যদি ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার ভয়ে নিদ্রাহীনতায় আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে চিকিৎসকের কী সাধ্য তাকে সুস্থ করে তোলেন?

কেউ হয়তো বলবেন, ব্যবসায় বা শিল্পে ঝুঁকি থাকবেই এবং সে ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগ করতে হবে। বিলক্ষণ সত্য কথা; কিন্তু পাশাপাশি এটাওতো সত্য, রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্যোক্তাকে সহায়তা করা। কিন্তু রাষ্ট্র নিজেই যদি উদ্যোক্তার জন্য ঝুঁকি তৈরির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তা কোথায় কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবেন? না, প্রায় কোথাও তারা দাঁড়াবার জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন না। আর রাষ্ট্রের এ ধরনের আচরণের কারণেই বস্তুত উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিশ্বর‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৩৭ দেশের মধ্যে ১৩২। তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারায় বাংলাদেশ যে দীর্ঘসময় ধরে এগিয়ে থাকল, তার ব্যাখ্যা কী? আংশিক ব্যাখ্যা এই যে, সেবাখাতনির্ভর বিনিয়োগ থেকে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও দ্রুত ফললাভ, সম্পদের প্রবল মেরুকরণের ধারায় গুটিকতক উদ্যোক্তার দ্বারা একচেটিয়াভাবে বিনিয়োগ থেকে উচ্চহারে মুনাফা আহরণ, রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়পুষ্ট সুবিধাবাদী শ্রেণির হাত দিয়ে অর্থের ব্যাপক চলাচল ইত্যাদি কারণে সাধারণ মানুষের বাস্তব আর্থিক সামর্থ্য না বাড়লেও প্রবৃদ্ধির হার ঠিকই বেড়েছে।

এটি সহজেই বোধগম্য যে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে চাপমুক্ত পর্যায়ে ধরে রাখার উদ্দেশ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কৌশল গ্রহণ করেছে, যা স্বীকার করার মধ্যে দোষের কিছু নেই। কিন্তু এমন ঘনঘন টাকার অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে এ চাপ মোকাবিলার কৌশল কতটা সঠিক, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে চাপমুক্ত রাখতে হলে আসলে প্রয়োজন রফতানি বৃদ্ধি করা, অর্থ পাচার রোধ করা, রেমিট্যান্স আহরণের গতিকে পড়তে না দেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয় এমন ব্যয় যেমন-বৈদেশিক ঋণ, বিদেশ ভ্রমণ, দেশে ও বিদেশে আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সেক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করে পরিকল্পনাবিহীনভাবে টাকার অবমূল্যায়ন করা হলে তা উপকারের পরিবর্তে বাজারে বরং নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত হারানোর ক্ষেত্রে শ্রীলংকা কী কী ভুল করেছিল, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাটাই যথার্থ ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত হবে বলে মনে করি।

ডলারের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধিজনিত প্রভাবের দু’-চারটি প্রসঙ্গ নিয়েই কেবল এখানে আলোচনা করা হলো। প্রকৃতপক্ষে এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির প্রায় সব ক্ষেত্রকেই যে স্পর্শ করে যাবে, তা প্রায় নিশ্চিত করে বলা যায়। দেশের আর্থিক নীতিপ্রণেতারা কী ভেবে ও কার স্বার্থে ডলারের বিপরীতে টাকার এ ঘনঘন অবমূল্যায়ন ঘটাচ্ছেন, জানি না। তবে যত সহজে তারা সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছেন, এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া মোকাবিলার কাজটি অত সহজে করতে পারবেন বলে মনে হয় না। আর যদি তারা তা না পারেন, তাহলে এতদিন ধরে ধারণ করা উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মাথাপিছু আয়ের অহংকার অনেকটাই ম্লান হয়ে যেতে পারে। আর এটি বলা কোনো ধরনের সমালোচনা করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং বিষয়টির প্রতি এই মর্মে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য যে, এ ব্যাপারে এখনই জরুরি ভিত্তিতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারলে এর ক্রমান্বয়িক প্রতিক্রিয়ায় (চেইন অ্যাফেক্ট) দেশের পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সংকটজনক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগেই ডলারের সঙ্গে টাকার বিনিময় হার কীভাবে সমন্বয় ও সংহত করা যাবে, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত বলে মনে করি। এবং সে চিন্তা কোনো গোষ্ঠীবিশেষের স্বার্থ ও সুবিধার কথা ভেবে নয়-করতে হবে সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ও সামগ্রিক অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাব হচ্ছে : পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডলারের মূল্য যদি একান্ত নিরূপায় হয়ে বাড়াতেই হয়, তাহলে তা করতে হবে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আওতায় নির্ধারিত সময়কাঠামো ঠিক করে নিয়ে। এভাবে খণ্ড খণ্ড সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সপ্তাহে সপ্তাহে যখন-তখন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সুফল দেবে না। আর তার চেয়েও বড় কথা, এ ক্ষেত্রে কী কী করা প্রয়োজন সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত হবে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একা একা সিদ্ধান্ত না নিয়ে এ ব্যাপারে দেশের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বসে তাদের পরামর্শ গ্রহণ করা।

আবু তাহের খান : সাবেক পরিচালক, বিসিক

atkhan56@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন