চিঠিই হতে পারে মামলা
jugantor
চিঠিই হতে পারে মামলা

  মো. আসাদ উদ্দিন  

২৪ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আদালতে চিঠি পাঠালে তা মামলা হিসাবে গণ্য হতে পারে-এমন ধারণা বাংলাদেশে নতুন। চিঠি দিয়েই উচ্চ আদালতে মামলা করা যায়, এটি অনেকেরই অজানা। কেউ এমন কথা বললে মানুষ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাবে। আদালতের কাছে চিঠি পাঠানো আদৌ নিয়মসিদ্ধ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করবে। বাস্তবতা হলো, এ সহজ পদ্ধতিটি আইন ও বিধি দ্বারা স্বীকৃত। চিঠি, টেলিগ্রাম বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের ভিত্তিতে আদালত তার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন।

এটিকে বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার (Epistolary Jurisdiction) বলা হয়। জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক অন্যায় ও অপরাধের প্রতিকার এ প্রক্রিয়ায় পাওয়া যেতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অসংখ্য নজির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশেও দু-একটি নজির রয়েছে। তবে পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতেও আদালত বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার প্রয়োগ করে থাকেন। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে অনেক নজিরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য আজকের প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিকতা কেবল চিঠি বা টেলিগ্রামকে ঘিরেই।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. ফসটিনা পেরেরা ২০০১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) কো-অর্ডিনেটর থাকাবস্থায় প্রধান বিচারপতিকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি জানান, ২৯ জন বিদেশি নাগরিক সাজা ভোগ করার পরও কারাভ্যন্তরে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। কম-বেশি ৫ বছর তাদের এ অতিরিক্ত বন্দিদশা। এটিকে তিনি বেআইনি আটক উল্লেখ করে বন্দিদের মুক্তি দাবি করেন। প্রধান বিচারপতি চিঠিটি রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিচারপতি হামিদুল হক এবং বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। হাইকোর্ট বেঞ্চ চিঠিটিকে বিবিধ মামলা (সুয়োমোটো) হিসাবে আমলে নিয়ে রুল ইস্যু করেন। জেল সুপার আদালতে বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন।

এসব বন্দি ছিল ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও তানজানিয়ার। কারা মহাপরিদর্শক আদালতকে জানান, এর বাইরে আরও ৮২২ জন বিদেশি নাগরিক তাদের সাজার মেয়াদ সম্পন্ন করে মুক্তির অপেক্ষায় আছেন। জেল কোডের ৫৭০ থেকে ৫৭৮ বিধিতে বন্দিমুক্তি বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বিদেশি বন্দিমুক্তি কীভাবে হবে, সে ব্যাপারে জেল কোড নিশ্চুপ। অন্য কোনো আইনি বিধানও অনুপস্থিত। বিবাদীপক্ষে এসব ব্যর্থতা ও অসুবিধার কথাও তুলে ধরা হয়। এ ব্যাপারে আপাতত অনুসৃত নিয়ম হিসাবে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। সবশেষে হাইকোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ সব বিদেশি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। রায়ে হাইকোর্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি পৃথক সেল প্রতিষ্ঠা করতে পারে মর্মে মতপ্রকাশ করেন।

এভাবে একটি চিঠি পরিণত হলো গুরুত্বপূর্ণ মামলায়। মামলাটির শিরোনাম ‘ড. ফসটিনা পেরেরা বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’। এর মাধ্যমে মুক্তির স্বাদ পেল কারাভ্যন্তরে বেআইনিভাবে আটকে থাকা আট শতাধিক বন্দি। মামলাটি ৫৩ ডিএলআরের (হাইকোর্ট বিভাগ) ৪১৪ পৃষ্ঠায় সন্নিবেশিত। আমাদের দেশে এটিই আদালতের বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার প্রয়োগে ‘ল্যান্ডমার্ক মামলা’ হিসাবে স্বীকৃত।

আদালতের এমন এখতিয়ারের প্রথম প্রয়োগ হয় ভারতে ‘সুনীল বাত্রা বনাম দিল্লি প্রশাসন’ মামলায়। সুনীল বাত্রা ছিলেন দিল্লির তিহার জেলের একজন কয়েদি। মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে তিনি কারান্তরীণ ছিলেন। তিনি সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারপতিকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি প্রেম চাঁদ নামের একজন কয়েদির ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযোগ করেন। তার চিঠিটিকে রিট পিটিশন হিসাবে গণ্য করা হয়। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নোটিশ জারি করেন। দুজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন। তাদের তিহার জেলখানা পরিদর্শন ও ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। কারারক্ষক অবৈধ অর্থ আদায়ের জন্য প্রেম চাঁদকে অমানুষিক নির্যাতন করেছিলেন। মেডিকেল রিপোর্ট দ্বারাও নির্যাতনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। শুনানি শেষে সুপ্রিমকোর্ট রিট পিটিশনটি যথাযথ মর্মে রায় দেন। রায়ে কয়েদিদের অধিকার ও কারা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অনেক নির্দেশনা দেওয়া হয়। রায়ে উল্লেখ করা হয়, চিঠি বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমেও আদালত তার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন।

১৯৮১ সালে পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস নামক সংগঠনের পক্ষ থেকে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি ভগবতির কাছে চিঠি লেখা হয়। চিঠিতে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়। তিনজন সমাজবিজ্ঞানীর তদন্ত ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ঘটনায় প্রকাশ-এশিয়ান গেমসের স্বাগতিক দেশ হিসাবে ভারত তার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ দিতে হয়েছিল। শ্রমিকদের অনেককে আনা হয়েছিল রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশা থেকে। এদের মধ্যে নারী ও শিশু শ্রমিকও ছিল।

কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে আমদানিকৃত এসব শ্রমিককে প্রতিদিন কাজ শেষে মজুরি দেওয়া হতো। তাদের ৯.২৫ রুপি দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হতো ৮.২৫ রুপি। এছাড়া নারী ও শিশুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো। বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত চিঠিটিকে রিট পিটিশন হিসাবে গণ্য করেন। ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া দিল্লি প্রশাসনসহ বিবাদীদের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। বিবাদীদের পক্ষ থেকে আদালতে সংগঠনটির মামলা করার অধিকার (Locus Standi) নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আদালত রায়ে বলেন, শ্রম আইন লঙ্ঘনের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা দরিদ্র, অসহায় ও অশিক্ষিত শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট, যারা সামাজিক ও অর্থনৈতকভাবে সম্পূর্ণরূপে দুর্বল শ্রেণির। আদালতের দ্বারস্থ হয়ে প্রতিকার চাওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। অতএব সংগঠনটির পক্ষে এসব অক্ষম শ্রমিক শ্রেণির জন্য প্রতিকার চাওয়া আইনসংগত।

প্রসঙ্গত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার কথা না বললেই নয়। সেটি হলো ‘সিটিজেন ফর ডেমোক্রেসি বনাম স্টেট অব আসাম’। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। সাংবাদিক কুলদিপ নায়ার একদিন গুয়াহাটি সরকারি হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি একটি রুমে সাতজন রোগীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেন। তিনি জানতে পারেন, তারা উলফা সন্ত্রাসী। তাদের একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কুলদিপ নায়ার ‘সিটিজেন ফর ডেমোক্রেসি’ নামক সংগঠনের সভাপতি হিসাবে বিষয়টি আসামের মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনেন। কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে তিনি ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের কাছে চিঠি লেখেন। সুপ্রিমকোর্ট তার চিঠিকে রিট পিটিশন হিসাবে রেজিস্ট্রিভুক্ত করেন। শুনানি শেষে আদালত রিট পিটিশন মঞ্জুর করে রায় দেন। এ রায়ে আদালত হাতকড়ার ব্যবহার সংক্রান্ত বিশদ নির্দেশনা প্রদান করেন। হাতকড়া বিষয়ে ভারতে এ রায়টি ‘ল্যান্ডমার্ক রায়’ হিসাবে বিবেচিত হয়।

পাকিস্তানেও বার্তাপ্রসূত এখতিয়ারের প্রয়োগ লক্ষণীয়। ‘দর্শন মাসিহ এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র’ মামলাটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এমন মামলা পাকিস্তানে এটিই প্রথম। গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় প্রধান বিচারপতি একটি টেলিগ্রাম পান। লাহোরের ২০ জন ভুক্তভোগীর পক্ষে টেলিগ্রামটি পাঠান দর্শন মাসিহ নামের একজন শ্রমিক। এতে কাতর নিবেদন করে বলা হয়, তাকেসহ তার পরিবারের সদস্যদের দাস শ্রমিক হিসাবে ইটভাটায় কাজ করানো হচ্ছিল। তারা আদালতের মাধ্যমে মুক্ত হয়েছেন; কিন্তু তিনজনকে মালিকপক্ষ অপহরণ করে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের স্ত্রী-সন্তানদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা অভিযোগ দিয়েছেন; কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় জীবজন্তুর মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের খাবার নেই। জীবনের নিরাপত্তা নেই। তারা বাঁচতে চান। মানুষের মতো বাঁচতে চান।

পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট টেলিগ্রামটিকে সাংবিধানিক মামলা হিসাবে গ্রহণ করেন। আদালতের পক্ষ থেকে বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, পুলিশের আইজিসহ অন্যদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। ইটভাটাগুলোতে সরেজমিন তদন্ত করানো হয়। তদন্ত শেষে অনেক বড় একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে প্রায় ৫০টি ইটভাটার শ্রমিকদের করুণ চিত্র উঠে আসে। রায়ে এসব শ্রমিক সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মর্মে উল্লেখ করা হয়। মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথকভাবে অনেক ফৌজদারি মামলা করা হয়। রায়ে পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থাকে দাস শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার বিষয়ে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর কোনোটি লঙ্ঘিত হলে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টকে এগুলো বলবতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে। এটিই মূলত হাইকোর্টের বিশেষ আদি এখতিয়ার (Special Original Jurisdiction) বা রিট এখতিয়ার। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে হাইকোর্ট তার এ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন। সুপ্রিমকোর্ট বিভিন্ন রায়ে সংবিধানে উল্লেখিত ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’র সম্প্রসারিত ধারণা দিয়েছেন। জনস্বার্থে মামলার (Public Interest Litigation) ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বেরুবাড়ী মামলা হিসাবে পরিচিত ‘কাজী মুখলেসুর রহমান বনাম বাংলাদেশ’ মামলার মাধ্যমে ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’ এবং ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই’-এর সংজ্ঞায়ন শুরু হয়।

এরপর ‘বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ বনাম বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ রিটায়ার্ড এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বনাম বাংলাদেশ’ মামলা হয়ে এ ধারণা চূড়ান্ত পরিণতি পায় ‘ড. মোহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ বা ‘ফ্যাপ-২০’ মামলায়। মামলাটি বাংলাদেশে ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই কেস’ হিসাবে সমধিক পরিচিত। এ মামলার রায়ের মাধ্যমে ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’র ব্যাপ্তি ব্যক্তিগত ও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে জনসাধারণ, সংগঠন ও ব্যক্তিসমষ্টি পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। এ রায় অনুযায়ী এমন কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকেও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বলা যাবে, যার হৃদয়ে কোনো অন্যায়ের ফলে রক্তক্ষরণ হবে। জনস্বার্থে মামলার মাহাত্ম্য এখানেই।

একইভাবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে ‘আবেদনক্রমে’ শব্দের সন্নিবেশ থাকলেও ‘আবেদনে’র কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। সংবিধানের কোথাও আবেদন করার পদ্ধতি আলোচিত হয়নি। কোনো সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতার কথাও বলা হয়নি। তবে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিধিমালা, ১৯৭৩-এ ‘আবেদন’ সম্পর্কিত নিয়ম বাতলে দেওয়া হয়েছে। কীভাবে আবেদন লিখতে হবে, কেমন কাগজে লিখতে হবে, কী কী তথ্য থাকতে হবে, কীভাবে এফিডেভিট করতে হবে-বিস্তারিত পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে। বিধিমালার বিশেষ আদি এখতিয়ার (Special Original Jurisdiction) অধ্যায়ে (Chapter XIA) বিদ্যমান রয়েছে এসব নিয়ম-পদ্ধতি। হাইকোর্ট বিধিতে বাধা-ধরা নিয়মের বাইরে সহজ উপায়েরও উল্লেখ রয়েছে। সেটিই হলো আদালতের বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার। এটি হাইকোর্ট বিধিমালার অনন্য বিশেষত্ব বটে।

পূর্বোক্ত অধ্যায়টির ১০ বিধিতে চিঠিকে ১০২ অনুচ্ছেদের আবেদন হিসাবে গ্রহণ করার পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি বা অন্য কোনো বিচারপতি বা রেজিস্ট্রার বরাবর কোনো বিষয়ে চিঠি পাঠাতে পারেন। বিষয়টি অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ মর্মে বিবেচিত হলে হাইকোর্ট বেঞ্চ সেটিকে রিট পিটিশন হিসাবে গণ্য করতে পারেন। কোনো পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদও একইভাবে গ্রাহ্য হতে পারে। হাইকোর্ট ওই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুলনিশি জারি করবেন। একইসঙ্গে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিঠি বা সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করবেন। সংশ্লিষ্ট পত্রপ্রেরক, সাংবাদিক, সম্পাদক বা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ করবেন। আদালতের কার্যধারা অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।

সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবীর পাঠানো চিঠি হাইকোর্ট আমলে নিয়েছেন। গত বছর ৪ আগস্ট নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে দুই শিশুকে এক মাসের সাজা দেন। ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে অ্যাডভোকেট শিশির মনির হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের কাছে ইমেইলে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, শিশু আইন অনুযায়ী কোনো শিশুকে সাজা দেওয়ার এখতিয়ার ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেই। ফলে প্রদত্ত সাজা এখতিয়ারবহির্ভূত। মাননীয় বিচারপতি বিষয়টি আমলে নিয়ে দুই শিশুকে মুক্তির নির্দেশ দেন। চিঠির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিকার পাওয়ার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আদালত হলো নাগরিকদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোনো বিলম্বিত বিষয় নয়। যখনই অধিকার লঙ্ঘিত হবে, তখনই তার প্রতিকার পাওয়া উচিত। অতএব বিচারপ্রার্থীর আদালতে প্রবেশ (Access to Justice) সহজতর হওয়াই শ্রেয়। একজন নাগরিক তার অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সহজেই যেন সেখানে আশ্রয় নিতে পারে, তেমন ব্যবস্থাপনা প্রত্যাশিত। তার জন্য আদালতের দরজা উদারভাবে উন্মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়, যেখানে টাকা-পয়সা খরচেরও প্রয়োজন হয় না। পিটিশন ড্রাফট করতে গিয়ে গলধঘর্ম হতে হয় না।

এফিডেভিটের মতো জটিল প্রক্রিয়ায় যেতে হয় না। সময় নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে না। আদালতে একটি চিঠি পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অন্যায় বা অপরাধ রুখে দিতে পারলে এর চেয়ে ভালো প্রতিকার আর কী হতে পারে! নাগরিকের সচেতনতা এ ব্যাপারে সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তাকে অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। মানুষ ও সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। তাহলেই একজন নাগরিক উপযুক্ত বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে। তবে এটি নিশ্চয়ই ‘ফ্লাড গেট’ হওয়া চলবে না। এক্ষেত্রে অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতির ইস্যুই কেবল বিবেচনাযোগ্য হবে।

মো. আসাদ উদ্দিন : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট

asadiuk@yahoo.com

চিঠিই হতে পারে মামলা

 মো. আসাদ উদ্দিন 
২৪ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আদালতে চিঠি পাঠালে তা মামলা হিসাবে গণ্য হতে পারে-এমন ধারণা বাংলাদেশে নতুন। চিঠি দিয়েই উচ্চ আদালতে মামলা করা যায়, এটি অনেকেরই অজানা। কেউ এমন কথা বললে মানুষ অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাবে। আদালতের কাছে চিঠি পাঠানো আদৌ নিয়মসিদ্ধ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করবে। বাস্তবতা হলো, এ সহজ পদ্ধতিটি আইন ও বিধি দ্বারা স্বীকৃত। চিঠি, টেলিগ্রাম বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের ভিত্তিতে আদালত তার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন।

এটিকে বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার (Epistolary Jurisdiction) বলা হয়। জরুরি ও জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক অন্যায় ও অপরাধের প্রতিকার এ প্রক্রিয়ায় পাওয়া যেতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানে ইতোমধ্যে এ বিষয়ে অসংখ্য নজির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশেও দু-একটি নজির রয়েছে। তবে পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমের খবরের ভিত্তিতেও আদালত বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার প্রয়োগ করে থাকেন। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ইতোমধ্যে অনেক নজিরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অবশ্য আজকের প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিকতা কেবল চিঠি বা টেলিগ্রামকে ঘিরেই।

সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ড. ফসটিনা পেরেরা ২০০১ সালে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) কো-অর্ডিনেটর থাকাবস্থায় প্রধান বিচারপতিকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি জানান, ২৯ জন বিদেশি নাগরিক সাজা ভোগ করার পরও কারাভ্যন্তরে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। কম-বেশি ৫ বছর তাদের এ অতিরিক্ত বন্দিদশা। এটিকে তিনি বেআইনি আটক উল্লেখ করে বন্দিদের মুক্তি দাবি করেন। প্রধান বিচারপতি চিঠিটি রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে বিচারপতি হামিদুল হক এবং বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। হাইকোর্ট বেঞ্চ চিঠিটিকে বিবিধ মামলা (সুয়োমোটো) হিসাবে আমলে নিয়ে রুল ইস্যু করেন। জেল সুপার আদালতে বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেন।

এসব বন্দি ছিল ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও তানজানিয়ার। কারা মহাপরিদর্শক আদালতকে জানান, এর বাইরে আরও ৮২২ জন বিদেশি নাগরিক তাদের সাজার মেয়াদ সম্পন্ন করে মুক্তির অপেক্ষায় আছেন। জেল কোডের ৫৭০ থেকে ৫৭৮ বিধিতে বন্দিমুক্তি বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বিদেশি বন্দিমুক্তি কীভাবে হবে, সে ব্যাপারে জেল কোড নিশ্চুপ। অন্য কোনো আইনি বিধানও অনুপস্থিত। বিবাদীপক্ষে এসব ব্যর্থতা ও অসুবিধার কথাও তুলে ধরা হয়। এ ব্যাপারে আপাতত অনুসৃত নিয়ম হিসাবে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। সবশেষে হাইকোর্ট মেয়াদোত্তীর্ণ সব বিদেশি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। রায়ে হাইকোর্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত একটি পৃথক সেল প্রতিষ্ঠা করতে পারে মর্মে মতপ্রকাশ করেন।

এভাবে একটি চিঠি পরিণত হলো গুরুত্বপূর্ণ মামলায়। মামলাটির শিরোনাম ‘ড. ফসটিনা পেরেরা বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’। এর মাধ্যমে মুক্তির স্বাদ পেল কারাভ্যন্তরে বেআইনিভাবে আটকে থাকা আট শতাধিক বন্দি। মামলাটি ৫৩ ডিএলআরের (হাইকোর্ট বিভাগ) ৪১৪ পৃষ্ঠায় সন্নিবেশিত। আমাদের দেশে এটিই আদালতের বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার প্রয়োগে ‘ল্যান্ডমার্ক মামলা’ হিসাবে স্বীকৃত।

আদালতের এমন এখতিয়ারের প্রথম প্রয়োগ হয় ভারতে ‘সুনীল বাত্রা বনাম দিল্লি প্রশাসন’ মামলায়। সুনীল বাত্রা ছিলেন দিল্লির তিহার জেলের একজন কয়েদি। মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে তিনি কারান্তরীণ ছিলেন। তিনি সুপ্রিমকোর্টের একজন বিচারপতিকে চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি প্রেম চাঁদ নামের একজন কয়েদির ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের অভিযোগ করেন। তার চিঠিটিকে রিট পিটিশন হিসাবে গণ্য করা হয়। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর নোটিশ জারি করেন। দুজন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেন। তাদের তিহার জেলখানা পরিদর্শন ও ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্ত শেষে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়। কারারক্ষক অবৈধ অর্থ আদায়ের জন্য প্রেম চাঁদকে অমানুষিক নির্যাতন করেছিলেন। মেডিকেল রিপোর্ট দ্বারাও নির্যাতনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। শুনানি শেষে সুপ্রিমকোর্ট রিট পিটিশনটি যথাযথ মর্মে রায় দেন। রায়ে কয়েদিদের অধিকার ও কারা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অনেক নির্দেশনা দেওয়া হয়। রায়ে উল্লেখ করা হয়, চিঠি বা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যমেও আদালত তার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন।

১৯৮১ সালে পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস নামক সংগঠনের পক্ষ থেকে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি ভগবতির কাছে চিঠি লেখা হয়। চিঠিতে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়। তিনজন সমাজবিজ্ঞানীর তদন্ত ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এ অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। ঘটনায় প্রকাশ-এশিয়ান গেমসের স্বাগতিক দেশ হিসাবে ভারত তার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রস্তুতি সম্পন্ন করার জন্য প্রচুর শ্রমিক নিয়োগ দিতে হয়েছিল। শ্রমিকদের অনেককে আনা হয়েছিল রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ ও ওড়িশা থেকে। এদের মধ্যে নারী ও শিশু শ্রমিকও ছিল।

কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে আমদানিকৃত এসব শ্রমিককে প্রতিদিন কাজ শেষে মজুরি দেওয়া হতো। তাদের ৯.২৫ রুপি দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হতো ৮.২৫ রুপি। এছাড়া নারী ও শিশুদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো। বিষয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত চিঠিটিকে রিট পিটিশন হিসাবে গণ্য করেন। ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া দিল্লি প্রশাসনসহ বিবাদীদের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। বিবাদীদের পক্ষ থেকে আদালতে সংগঠনটির মামলা করার অধিকার (Locus Standi) নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। আদালত রায়ে বলেন, শ্রম আইন লঙ্ঘনের যে অভিযোগ করা হয়েছে, তা দরিদ্র, অসহায় ও অশিক্ষিত শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট, যারা সামাজিক ও অর্থনৈতকভাবে সম্পূর্ণরূপে দুর্বল শ্রেণির। আদালতের দ্বারস্থ হয়ে প্রতিকার চাওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। অতএব সংগঠনটির পক্ষে এসব অক্ষম শ্রমিক শ্রেণির জন্য প্রতিকার চাওয়া আইনসংগত।

প্রসঙ্গত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার কথা না বললেই নয়। সেটি হলো ‘সিটিজেন ফর ডেমোক্রেসি বনাম স্টেট অব আসাম’। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। সাংবাদিক কুলদিপ নায়ার একদিন গুয়াহাটি সরকারি হাসপাতালে যান। সেখানে তিনি একটি রুমে সাতজন রোগীকে হাতকড়া পরা অবস্থায় বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেন। তিনি জানতে পারেন, তারা উলফা সন্ত্রাসী। তাদের একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। কুলদিপ নায়ার ‘সিটিজেন ফর ডেমোক্রেসি’ নামক সংগঠনের সভাপতি হিসাবে বিষয়টি আসামের মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনেন। কোনো প্রত্যুত্তর না পেয়ে তিনি ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের কাছে চিঠি লেখেন। সুপ্রিমকোর্ট তার চিঠিকে রিট পিটিশন হিসাবে রেজিস্ট্রিভুক্ত করেন। শুনানি শেষে আদালত রিট পিটিশন মঞ্জুর করে রায় দেন। এ রায়ে আদালত হাতকড়ার ব্যবহার সংক্রান্ত বিশদ নির্দেশনা প্রদান করেন। হাতকড়া বিষয়ে ভারতে এ রায়টি ‘ল্যান্ডমার্ক রায়’ হিসাবে বিবেচিত হয়।

পাকিস্তানেও বার্তাপ্রসূত এখতিয়ারের প্রয়োগ লক্ষণীয়। ‘দর্শন মাসিহ এবং অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র’ মামলাটি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। এমন মামলা পাকিস্তানে এটিই প্রথম। গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় প্রধান বিচারপতি একটি টেলিগ্রাম পান। লাহোরের ২০ জন ভুক্তভোগীর পক্ষে টেলিগ্রামটি পাঠান দর্শন মাসিহ নামের একজন শ্রমিক। এতে কাতর নিবেদন করে বলা হয়, তাকেসহ তার পরিবারের সদস্যদের দাস শ্রমিক হিসাবে ইটভাটায় কাজ করানো হচ্ছিল। তারা আদালতের মাধ্যমে মুক্ত হয়েছেন; কিন্তু তিনজনকে মালিকপক্ষ অপহরণ করে জিম্মি করে রেখেছে। তাদের স্ত্রী-সন্তানদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা অভিযোগ দিয়েছেন; কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তারা ক্ষুধার্ত অবস্থায় জীবজন্তুর মতো পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের খাবার নেই। জীবনের নিরাপত্তা নেই। তারা বাঁচতে চান। মানুষের মতো বাঁচতে চান।

পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট টেলিগ্রামটিকে সাংবিধানিক মামলা হিসাবে গ্রহণ করেন। আদালতের পক্ষ থেকে বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, পুলিশের আইজিসহ অন্যদের সহযোগিতা চাওয়া হয়। ইটভাটাগুলোতে সরেজমিন তদন্ত করানো হয়। তদন্ত শেষে অনেক বড় একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে প্রায় ৫০টি ইটভাটার শ্রমিকদের করুণ চিত্র উঠে আসে। রায়ে এসব শ্রমিক সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত মর্মে উল্লেখ করা হয়। মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পৃথক পৃথকভাবে অনেক ফৌজদারি মামলা করা হয়। রায়ে পুলিশ প্রশাসন, বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থাকে দাস শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার বিষয়ে কাজ করার জন্য উৎসাহিত করা হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় অধ্যায়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকারগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর কোনোটি লঙ্ঘিত হলে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে হাইকোর্টকে এগুলো বলবতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে। এটিই মূলত হাইকোর্টের বিশেষ আদি এখতিয়ার (Special Original Jurisdiction) বা রিট এখতিয়ার। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে হাইকোর্ট তার এ এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারেন। সুপ্রিমকোর্ট বিভিন্ন রায়ে সংবিধানে উল্লেখিত ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’র সম্প্রসারিত ধারণা দিয়েছেন। জনস্বার্থে মামলার (Public Interest Litigation) ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অপরিসীম। বেরুবাড়ী মামলা হিসাবে পরিচিত ‘কাজী মুখলেসুর রহমান বনাম বাংলাদেশ’ মামলার মাধ্যমে ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’ এবং ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই’-এর সংজ্ঞায়ন শুরু হয়।

এরপর ‘বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদ বনাম বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশ রিটায়ার্ড এমপ্লয়িজ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বনাম বাংলাদেশ’ মামলা হয়ে এ ধারণা চূড়ান্ত পরিণতি পায় ‘ড. মোহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ বা ‘ফ্যাপ-২০’ মামলায়। মামলাটি বাংলাদেশে ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই কেস’ হিসাবে সমধিক পরিচিত। এ মামলার রায়ের মাধ্যমে ‘সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি’র ব্যাপ্তি ব্যক্তিগত ও প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে জনসাধারণ, সংগঠন ও ব্যক্তিসমষ্টি পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। এ রায় অনুযায়ী এমন কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকেও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বলা যাবে, যার হৃদয়ে কোনো অন্যায়ের ফলে রক্তক্ষরণ হবে। জনস্বার্থে মামলার মাহাত্ম্য এখানেই।

একইভাবে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে ‘আবেদনক্রমে’ শব্দের সন্নিবেশ থাকলেও ‘আবেদনে’র কোনো সংজ্ঞা দেওয়া হয়নি। সংবিধানের কোথাও আবেদন করার পদ্ধতি আলোচিত হয়নি। কোনো সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতার কথাও বলা হয়নি। তবে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিধিমালা, ১৯৭৩-এ ‘আবেদন’ সম্পর্কিত নিয়ম বাতলে দেওয়া হয়েছে। কীভাবে আবেদন লিখতে হবে, কেমন কাগজে লিখতে হবে, কী কী তথ্য থাকতে হবে, কীভাবে এফিডেভিট করতে হবে-বিস্তারিত পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে। বিধিমালার বিশেষ আদি এখতিয়ার (Special Original Jurisdiction) অধ্যায়ে (Chapter XIA) বিদ্যমান রয়েছে এসব নিয়ম-পদ্ধতি। হাইকোর্ট বিধিতে বাধা-ধরা নিয়মের বাইরে সহজ উপায়েরও উল্লেখ রয়েছে। সেটিই হলো আদালতের বার্তাপ্রসূত এখতিয়ার। এটি হাইকোর্ট বিধিমালার অনন্য বিশেষত্ব বটে।

পূর্বোক্ত অধ্যায়টির ১০ বিধিতে চিঠিকে ১০২ অনুচ্ছেদের আবেদন হিসাবে গ্রহণ করার পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি বা অন্য কোনো বিচারপতি বা রেজিস্ট্রার বরাবর কোনো বিষয়ে চিঠি পাঠাতে পারেন। বিষয়টি অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ মর্মে বিবেচিত হলে হাইকোর্ট বেঞ্চ সেটিকে রিট পিটিশন হিসাবে গণ্য করতে পারেন। কোনো পত্রিকা বা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদও একইভাবে গ্রাহ্য হতে পারে। হাইকোর্ট ওই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুলনিশি জারি করবেন। একইসঙ্গে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিঠি বা সংবাদের সত্যতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করবেন। সংশ্লিষ্ট পত্রপ্রেরক, সাংবাদিক, সম্পাদক বা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ করবেন। আদালতের কার্যধারা অনুযায়ী পরবর্তী প্রক্রিয়া চলতে থাকবে।

সম্প্রতি সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবীর পাঠানো চিঠি হাইকোর্ট আমলে নিয়েছেন। গত বছর ৪ আগস্ট নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে দুই শিশুকে এক মাসের সাজা দেন। ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এতে অ্যাডভোকেট শিশির মনির হাইকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের কাছে ইমেইলে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, শিশু আইন অনুযায়ী কোনো শিশুকে সাজা দেওয়ার এখতিয়ার ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেই। ফলে প্রদত্ত সাজা এখতিয়ারবহির্ভূত। মাননীয় বিচারপতি বিষয়টি আমলে নিয়ে দুই শিশুকে মুক্তির নির্দেশ দেন। চিঠির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক প্রতিকার পাওয়ার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

আদালত হলো নাগরিকদের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল, যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোনো বিলম্বিত বিষয় নয়। যখনই অধিকার লঙ্ঘিত হবে, তখনই তার প্রতিকার পাওয়া উচিত। অতএব বিচারপ্রার্থীর আদালতে প্রবেশ (Access to Justice) সহজতর হওয়াই শ্রেয়। একজন নাগরিক তার অধিকার ক্ষুণ্ন হলে সহজেই যেন সেখানে আশ্রয় নিতে পারে, তেমন ব্যবস্থাপনা প্রত্যাশিত। তার জন্য আদালতের দরজা উদারভাবে উন্মুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়, যেখানে টাকা-পয়সা খরচেরও প্রয়োজন হয় না। পিটিশন ড্রাফট করতে গিয়ে গলধঘর্ম হতে হয় না।

এফিডেভিটের মতো জটিল প্রক্রিয়ায় যেতে হয় না। সময় নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে না। আদালতে একটি চিঠি পাঠিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অন্যায় বা অপরাধ রুখে দিতে পারলে এর চেয়ে ভালো প্রতিকার আর কী হতে পারে! নাগরিকের সচেতনতা এ ব্যাপারে সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তাকে অধিকার সম্পর্কে জানতে হবে। মানুষ ও সমাজের প্রতি তার দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। তাহলেই একজন নাগরিক উপযুক্ত বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে। তবে এটি নিশ্চয়ই ‘ফ্লাড গেট’ হওয়া চলবে না। এক্ষেত্রে অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতির ইস্যুই কেবল বিবেচনাযোগ্য হবে।

মো. আসাদ উদ্দিন : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট

asadiuk@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন