এ কেমন জিরো টলারেন্স!
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
এ কেমন জিরো টলারেন্স!

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৭ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি একটি ক্ষতিকর সমাজব্যাধি। শারীরিক ব্যাধির সঙ্গে সমাজব্যাধির পার্থক্য আছে। অধিকাংশ শারীরিক ব্যাধি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু সমাজব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। একে নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় মাত্রায় রাখতে হয়।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই দুর্নীতি এ দেশে সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করেছে। দুর্নীতি এ দেশে সব সরকারের আমলেই কমবেশি ছিল। স্বাধীনতার পর গরিবের রিলিফ আত্মসাৎ করে খোলাবাজারে বিক্রি করার মধ্য দিয়ে দুর্নীতিচর্চার সূত্রপাত হয়।

পরবর্তী সময়ে সামরিক ও বেসামরিক সরকারের শাসনামলগুলোয় দুর্নীতির চর্চা কমবেশি অব্যাহত ছিল। তবে সব সরকারই ওপরে ওপরে দুর্নীতির প্রতি বক্তৃতা-বিবৃতিতে কঠোর মনোভাব পোষণ করে। এরশাদ সরকার তো অতীতের সব সরকারকে টেক্কা দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তার সময় দুর্নীতি অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা দীর্ঘায়িত করতে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর না হয়ে তাদের সঙ্গে আপস করেন। ফলে দুর্নীতিবাজ আমলা, ব্যবসায়ী বা অন্য পেশাজীবীরা সরকারের তরফ থেকে অঘোষিত ছাড় পায়।

এক-এগারোর অসাংবিধানিক পরিবর্তনের পর ফখরুদ্দীন সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকা করে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু এ অসাংবিধানিক সরকার তাদের কাউকেও সাজা দিতে পারেনি। এর ফলে এসব গ্রেফতার ব্যক্তির মধ্যে যারা দুর্নীতিবাজ ছিলেন, তাদের গ্রেফতারের ভয় কেটে যায়।

অসাংবিধানিক ফখরুদ্দীন-সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত প্রশ্নবিদ্ধ নবম সংসদ নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ অন্য সহযোগী দলগুলোকে নিয়ে মহাজোট সরকার গঠন করে। এরপর অনুষ্ঠিত আরও দুটি কায়দাকানুন করা ফন্দিফিকিরের দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারি দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। এর মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই সরকারদলীয় ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান।

আর একাদশ সংসদ নির্বাচনে তো দিনের ভোটের একটি বড় অংশই রাতে সম্পন্ন হয়ে যায় বলে প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ রয়েছে। সংসদ নির্বাচন ছাড়াও উপজেলা, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদসহ অন্য সব নির্বাচনেই দুর্নীতি হলেও দুর্নীতিকারীদের শাস্তি হয়নি। শাস্তি হয়নি প্রশাসনিক, আর্থিক ও সামাজিক দুর্নীতিরও।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের ব্যাপক সমালোচনা হলে প্রশ্নবিদ্ধ একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৯ সাল থেকে সরকারের তরফ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। আর্থিক খাতে হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকেও অর্থ লোপাট হয়ে যায়।

প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসাবাণিজ্য এবং শিক্ষাঙ্গনেও দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বিস্তারিত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ইউজিসির তদন্তেও উপাচার্যদের দুর্নীতির সত্যতা ধরা পড়ে। তবে এদের প্রায় সবাইকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মাত্র। ফলে নবাগত উপাচার্যদের অধিকাংশই দায়িত্বে এসে একই পথ অবলম্বন করেন।

ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে জনগণের পকেট কাটেন। অথচ এসব দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে জরিমানা করা হয়। করোনাকালীন নতুন করোনা হাসপাতাল, পিপিই, মাস্ক ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। এ সময় শাহেদ, ডা. সাবরিনাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও এখনো এদের শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয়নি। জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এসব দুর্নীতিবাজের কয়েকজনকে ধরা হলেও এদের সহায়তাকারী মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

ক্যাসিনো-কাণ্ড, পাপিয়া-কাণ্ড, বালিশ-কাণ্ড, পর্দা-কাণ্ডসহ আরও যেসব বড় বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটে, সেগুলো ছিল লোমহর্ষক। তবে এসব বড় দুর্নীতিবাজ শাস্তি না পেলেও অনেকক্ষেত্রে জীবনযুদ্ধে সংসার চালাতে না পেরে সামান্য উপরি উপার্জনকারী কেরানি বা ছোট চাকরিজীবীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কম টাকার দুর্নীতিকে বড় করে দেখা হয়েছে।

রাঘববোয়ালদের প্রতি রক্তচক্ষু নিক্ষেপ না করে চুনোপুঁটি দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কখনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না।

নির্বাচনি দুর্নীতির ক্ষেত্রে তো এ সরকার সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। পৃথিবীতে যেসব সমাজবিজ্ঞানী নির্বাচনি দুর্নীতি এবং ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর কাজ করেছেন এবং করছেন, তারা বাংলাদেশের ওপর যথেষ্ট কৃতজ্ঞ। কারণ, এসব গবেষক এ দেশের নির্বাচন থেকে নির্বাচনি দুর্নীতির নতুন নতুন ধরন জানতে পারছেন। বিশেষ করে গত কয়েকটি নির্বাচন থেকে তারা অনেক কিছু শিখেছেন।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, দশম সংসদ নির্বাচন থেকে তারা শিখতে পেরেছেন যে, একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই বলে দেওয়া যায় যে কোন দল সরকার গঠন করবে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এটা সম্ভব হয় না।

আবার একাদশ সংসদ নির্বাচন থেকে এরা শিখেছেন, যেদিন নির্বাচন হওয়ার কথা, তার আগের রাতেই ভোটের একটা অংশ কাস্ট হয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, গত ১৫ বছরে যেসব জাতীয় সংসদ, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপনির্বাচন হয়েছে তার প্রায় সব ছিল বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ ও দুর্নীতিযুক্ত।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যায়নি। কারণ, এ মেশিনে কাগজের ব্যবহার নেই। ভোট পুনঃগণনার ব্যবস্থা নেই। এ মেশিন যে হ্যাকপ্রুফ তা প্রযুক্তিবিশারদদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়নি। অথচ নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই ইভিএমে নির্বাচন না চাইলেও নির্বাচন কমিশনের ইভিএমে নির্বাচন করার প্রতি আগ্রহ জনমনে ইভিএমের প্রতি বিরক্তি ও সন্দেহ গভীর করেছে। নতুন সিইসি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বলেছেন, তিনি ইভিএম ভালো বোঝেন না।

কমিশনের অন্য সদস্যরাও বলেছেন, এ ব্যাপারে কমিশন এখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। এ নিয়ে তারা অনেক বৈঠক করে ভেবে দেখবেন যে, ইভিএমে সংসদ নির্বাচন করা ঠিক হবে কি না। ভালো কথা। তাহলে ৮ মে সরকারদলীয় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলীয় সভানেত্রী এবং তার পরপরই দলীয় সাধারণ সম্পাদক ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট করার কথা বলার অব্যবহিত পরে এ মাসের ২১ তারিখে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান কীভাবে ইভিএম বন্দনায় মেতে উঠলেন?

ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম ২০২২ উপলক্ষ্যে মাদারীপুরে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইভিএমের মতো সেরা মেশিন পৃথিবীর কোথাও নেই’ (প্রথম আলো, ২১ মে ২০২২)। ইসি কি সরকারদলীয় সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের ইভিএম দিয়ে ৩০০ আসনে নির্বাচন করার পক্ষে দেওয়া বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে? নাকি সরকারের কাছ থেকে ইভিএমে নির্বাচন করার কোনো অঘোষিত ডিকটেশন পেয়েছে। মেশিনে ভোট করে ইসি কি আবারও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়? ইভিএম প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণের আগেই উল্লিখিত ইসি কমিশনারের ইভিএমকে বিশ্বের সেরা মেশিন বলা সমঝদার জনগণকে কী ইঙ্গিত প্রদান করে?

সরকারি কার্যক্রমের সতর্ক পরখ বলে দেয় যে, সরকার দুর্নীতিবাজদের ওপর রক্তচক্ষু নিক্ষেপ না করে তাদের প্রতি অনেকটা নমনীয় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ সরকার ঘোষণা করেছে, তা কাগুজে পলিসি হয়েই আছে। বাস্তবে সরকার সব শ্রেণির দুর্নীতিবাজকে অঘোষিত ছাড় দিচ্ছে। প্রমাণিত দুর্নীতির ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হোন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের আমলা দুর্নীতিবাজ হোন, নির্বাচনি দুর্নীতিবাজ হোন, তারা সবাই ছাড় পাচ্ছেন। অনেকে গ্রেফতার হয়ে পরে জামিন পাচ্ছেন। যেসব ব্যবসায়ী সয়াবিন তেল নিয়ে দুর্নীতি করে জনগণের পকেট কাটলেন, তাদের কি কোনো শাস্তি হয়েছে?

তাদের কি গ্রেফতার করা হয়েছে? রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে? কিছু জরিমানা করা হয়েছে। এমন প্রশ্রয় পেলে কি এসব দুর্নীতিবাজ কুরবানির ঈদের আগে শুকনা মরিচ আর রসুন নিয়ে সিন্ডিকেট করবেন না?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার দুর্নীতিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনা করে। এমন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে। তবে কোনো সরকার যদি দুর্নীতিকবলিত ছলচাতুরীপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে ওই সরকারের পক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমন সরকার বক্তৃতা-বিবৃতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যত হুমকি প্রদান করুক না কেন, যত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করুক না কেন, তা কেবল কাগুজে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা সম্ভব হয় না।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

দেশপ্রেমের চশমা

এ কেমন জিরো টলারেন্স!

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৭ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি একটি ক্ষতিকর সমাজব্যাধি। শারীরিক ব্যাধির সঙ্গে সমাজব্যাধির পার্থক্য আছে। অধিকাংশ শারীরিক ব্যাধি সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব। কিন্তু সমাজব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। একে নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় মাত্রায় রাখতে হয়।

বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই দুর্নীতি এ দেশে সহনীয় মাত্রা অতিক্রম করেছে। দুর্নীতি এ দেশে সব সরকারের আমলেই কমবেশি ছিল। স্বাধীনতার পর গরিবের রিলিফ আত্মসাৎ করে খোলাবাজারে বিক্রি করার মধ্য দিয়ে দুর্নীতিচর্চার সূত্রপাত হয়।

পরবর্তী সময়ে সামরিক ও বেসামরিক সরকারের শাসনামলগুলোয় দুর্নীতির চর্চা কমবেশি অব্যাহত ছিল। তবে সব সরকারই ওপরে ওপরে দুর্নীতির প্রতি বক্তৃতা-বিবৃতিতে কঠোর মনোভাব পোষণ করে। এরশাদ সরকার তো অতীতের সব সরকারকে টেক্কা দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু তার সময় দুর্নীতি অধিকতর প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়।

রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা দীর্ঘায়িত করতে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর না হয়ে তাদের সঙ্গে আপস করেন। ফলে দুর্নীতিবাজ আমলা, ব্যবসায়ী বা অন্য পেশাজীবীরা সরকারের তরফ থেকে অঘোষিত ছাড় পায়।

এক-এগারোর অসাংবিধানিক পরিবর্তনের পর ফখরুদ্দীন সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকা করে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক নেতাদের গ্রেফতার করেছিল। কিন্তু এ অসাংবিধানিক সরকার তাদের কাউকেও সাজা দিতে পারেনি। এর ফলে এসব গ্রেফতার ব্যক্তির মধ্যে যারা দুর্নীতিবাজ ছিলেন, তাদের গ্রেফতারের ভয় কেটে যায়।

অসাংবিধানিক ফখরুদ্দীন-সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত প্রশ্নবিদ্ধ নবম সংসদ নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ অন্য সহযোগী দলগুলোকে নিয়ে মহাজোট সরকার গঠন করে। এরপর অনুষ্ঠিত আরও দুটি কায়দাকানুন করা ফন্দিফিকিরের দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারি দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। এর মধ্যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই সরকারদলীয় ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান।

আর একাদশ সংসদ নির্বাচনে তো দিনের ভোটের একটি বড় অংশই রাতে সম্পন্ন হয়ে যায় বলে প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ রয়েছে। সংসদ নির্বাচন ছাড়াও উপজেলা, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদসহ অন্য সব নির্বাচনেই দুর্নীতি হলেও দুর্নীতিকারীদের শাস্তি হয়নি। শাস্তি হয়নি প্রশাসনিক, আর্থিক ও সামাজিক দুর্নীতিরও।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ব্যাপকভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের ব্যাপক সমালোচনা হলে প্রশ্নবিদ্ধ একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ২০১৯ সাল থেকে সরকারের তরফ থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। আর্থিক খাতে হলমার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং বিভিন্ন ব্যাংকের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকেও অর্থ লোপাট হয়ে যায়।

প্রশাসন, রাজনীতি, ব্যবসাবাণিজ্য এবং শিক্ষাঙ্গনেও দুর্নীতি ব্যাপকভাবে বিস্তারিত হয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ইউজিসির তদন্তেও উপাচার্যদের দুর্নীতির সত্যতা ধরা পড়ে। তবে এদের প্রায় সবাইকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় মাত্র। ফলে নবাগত উপাচার্যদের অধিকাংশই দায়িত্বে এসে একই পথ অবলম্বন করেন।

ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দ্রব্যমূল্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে জনগণের পকেট কাটেন। অথচ এসব দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিয়ে জরিমানা করা হয়। করোনাকালীন নতুন করোনা হাসপাতাল, পিপিই, মাস্ক ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। এ সময় শাহেদ, ডা. সাবরিনাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও এখনো এদের শাস্তি প্রদান করা সম্ভব হয়নি। জনগণের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এসব দুর্নীতিবাজের কয়েকজনকে ধরা হলেও এদের সহায়তাকারী মন্ত্রণালয় এবং প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

ক্যাসিনো-কাণ্ড, পাপিয়া-কাণ্ড, বালিশ-কাণ্ড, পর্দা-কাণ্ডসহ আরও যেসব বড় বড় দুর্নীতির ঘটনা ঘটে, সেগুলো ছিল লোমহর্ষক। তবে এসব বড় দুর্নীতিবাজ শাস্তি না পেলেও অনেকক্ষেত্রে জীবনযুদ্ধে সংসার চালাতে না পেরে সামান্য উপরি উপার্জনকারী কেরানি বা ছোট চাকরিজীবীকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কম টাকার দুর্নীতিকে বড় করে দেখা হয়েছে।

রাঘববোয়ালদের প্রতি রক্তচক্ষু নিক্ষেপ না করে চুনোপুঁটি দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দিলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কখনো ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না।

নির্বাচনি দুর্নীতির ক্ষেত্রে তো এ সরকার সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। পৃথিবীতে যেসব সমাজবিজ্ঞানী নির্বাচনি দুর্নীতি এবং ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর কাজ করেছেন এবং করছেন, তারা বাংলাদেশের ওপর যথেষ্ট কৃতজ্ঞ। কারণ, এসব গবেষক এ দেশের নির্বাচন থেকে নির্বাচনি দুর্নীতির নতুন নতুন ধরন জানতে পারছেন। বিশেষ করে গত কয়েকটি নির্বাচন থেকে তারা অনেক কিছু শিখেছেন।

উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, দশম সংসদ নির্বাচন থেকে তারা শিখতে পেরেছেন যে, একটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই বলে দেওয়া যায় যে কোন দল সরকার গঠন করবে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এটা সম্ভব হয় না।

আবার একাদশ সংসদ নির্বাচন থেকে এরা শিখেছেন, যেদিন নির্বাচন হওয়ার কথা, তার আগের রাতেই ভোটের একটা অংশ কাস্ট হয়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য, গত ১৫ বছরে যেসব জাতীয় সংসদ, উপজেলা, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং উপনির্বাচন হয়েছে তার প্রায় সব ছিল বিতর্কিত, প্রশ্নবিদ্ধ ও দুর্নীতিযুক্ত।

নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যায়নি। কারণ, এ মেশিনে কাগজের ব্যবহার নেই। ভোট পুনঃগণনার ব্যবস্থা নেই। এ মেশিন যে হ্যাকপ্রুফ তা প্রযুক্তিবিশারদদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হয়নি। অথচ নির্বাচনের প্রধান স্টেকহোল্ডার রাজনৈতিক দলগুলোর অধিকাংশই ইভিএমে নির্বাচন না চাইলেও নির্বাচন কমিশনের ইভিএমে নির্বাচন করার প্রতি আগ্রহ জনমনে ইভিএমের প্রতি বিরক্তি ও সন্দেহ গভীর করেছে। নতুন সিইসি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বলেছেন, তিনি ইভিএম ভালো বোঝেন না।

কমিশনের অন্য সদস্যরাও বলেছেন, এ ব্যাপারে কমিশন এখনই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। এ নিয়ে তারা অনেক বৈঠক করে ভেবে দেখবেন যে, ইভিএমে সংসদ নির্বাচন করা ঠিক হবে কি না। ভালো কথা। তাহলে ৮ মে সরকারদলীয় কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দলীয় সভানেত্রী এবং তার পরপরই দলীয় সাধারণ সম্পাদক ৩০০ আসনে ইভিএমে ভোট করার কথা বলার অব্যবহিত পরে এ মাসের ২১ তারিখে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান কীভাবে ইভিএম বন্দনায় মেতে উঠলেন?

ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম ২০২২ উপলক্ষ্যে মাদারীপুরে তিনি বলেন, ‘আমাদের ইভিএমের মতো সেরা মেশিন পৃথিবীর কোথাও নেই’ (প্রথম আলো, ২১ মে ২০২২)। ইসি কি সরকারদলীয় সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদকের ইভিএম দিয়ে ৩০০ আসনে নির্বাচন করার পক্ষে দেওয়া বক্তব্য দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়েছে? নাকি সরকারের কাছ থেকে ইভিএমে নির্বাচন করার কোনো অঘোষিত ডিকটেশন পেয়েছে। মেশিনে ভোট করে ইসি কি আবারও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়? ইভিএম প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণের আগেই উল্লিখিত ইসি কমিশনারের ইভিএমকে বিশ্বের সেরা মেশিন বলা সমঝদার জনগণকে কী ইঙ্গিত প্রদান করে?

সরকারি কার্যক্রমের সতর্ক পরখ বলে দেয় যে, সরকার দুর্নীতিবাজদের ওপর রক্তচক্ষু নিক্ষেপ না করে তাদের প্রতি অনেকটা নমনীয় দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে যে ‘জিরো টলারেন্স’ সরকার ঘোষণা করেছে, তা কাগুজে পলিসি হয়েই আছে। বাস্তবে সরকার সব শ্রেণির দুর্নীতিবাজকে অঘোষিত ছাড় দিচ্ছে। প্রমাণিত দুর্নীতির ক্ষেত্রেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হোন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের আমলা দুর্নীতিবাজ হোন, নির্বাচনি দুর্নীতিবাজ হোন, তারা সবাই ছাড় পাচ্ছেন। অনেকে গ্রেফতার হয়ে পরে জামিন পাচ্ছেন। যেসব ব্যবসায়ী সয়াবিন তেল নিয়ে দুর্নীতি করে জনগণের পকেট কাটলেন, তাদের কি কোনো শাস্তি হয়েছে?

তাদের কি গ্রেফতার করা হয়েছে? রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে? কিছু জরিমানা করা হয়েছে। এমন প্রশ্রয় পেলে কি এসব দুর্নীতিবাজ কুরবানির ঈদের আগে শুকনা মরিচ আর রসুন নিয়ে সিন্ডিকেট করবেন না?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকার দুর্নীতিমুক্ত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনা করে। এমন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট থাকে। তবে কোনো সরকার যদি দুর্নীতিকবলিত ছলচাতুরীপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে ওই সরকারের পক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এমন সরকার বক্তৃতা-বিবৃতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যত হুমকি প্রদান করুক না কেন, যত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করুক না কেন, তা কেবল কাগুজে ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে কোনো সরকারের পক্ষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর করা সম্ভব হয় না।

 

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন