টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ কৌশল : একটি গবেষণা
jugantor
টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ কৌশল : একটি গবেষণা

  মো. ফজলে রব্বে, মো. আবুল হোসেন, মো. শাহ্রিয়ার রুমী, মোহা. ইউনুস আলী, আবু সাদাত সায়েম, ওয়ালিউল ইসলাম  

২৭ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী Bay of Bengal Industrial Growth Belt-এর আওতায় মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকার উন্নয়নে Moheshkhali-Matarbari Integrated Infrastructure Development Initiative (MIDI) গঠন করেন।

এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই অঞ্চলে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ চলমান। MIDI-এর অধীন চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (সওজ অংশ) একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পে সড়ক ও সেতু নির্মাণে আমরা মাতারবাড়ী দ্বীপে কর্মরত।

মাতারবাড়ী সমুদ্র উপকূলীয় একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। পরিবার-পরিজন ছাড়া এ নির্জন এলাকায় সড়ক সেতু নির্মাণকাজের অবসরে, কখনো খাবার টেবিলে কিংবা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক আলাপচারিতায় বর্ষাকালে বাংলাদেশের সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ওঠে আসত।

বর্ষাকালে বেহাল সড়ক সম্পর্কে জনমনে রোড ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদারদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা আছে। সড়ক দ্রুত নষ্ট হওয়া নিয়ে প্রায় সব সময়ই পরিবহণ মালিক ও রোড ইঞ্জিনিয়াররা একে অন্যকে দোষারোপ করেন।

পরিবহণ মালিকরা বলেন, সড়ক নির্মাণে নিুমানের মালামাল ব্যবহার করা হয় এবং সড়ক ডিজাইনে ত্রুটি রয়েছে। অন্যদিকে রোড ইঞ্জিনিয়াররা ওভারলোডকে দায়ী করেন। রোড ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বর্ষাকালে সড়ক দ্রুত নষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিজেদের সব সময়ই পীড়া দেয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে সবসময় উদ্ভাবনী গবেষণার তাগিদ দেন। আমরাও আমাদের ভাবনায় গবেষণার তাগিদ অনুভব করি এবং সড়ক দ্রুত নষ্ট হওয়া থেকে বের হয়ে আসার উপায় ও বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করি।

উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার প্রতিফলন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর কল্যাণে প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চল মাতারবাড়ীও ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় এসেছে। বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। এই ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণের উৎস, পদ্ধতি ও করণীয় সন্ধান করতে থাকি। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী প্রচলিত সয়েল স্টাবিলাইজেশনের বিবিধ মেথড দেখতে পাই, যার মধ্যে রয়েছে মেকানিক্যাল মেথড ও বিবিধ কেমিক্যাল, যা সড়ক নির্মাণে ব্যবহার হয়ে থাকে-যেমন সিমেন্ট, লাইম, ফ্লাই অ্যাশ, বিটুমিন ইমালশন, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম সিলিকেট, বায়ো-এনজাইম প্রভৃতি। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির আধুনিকায়নে আধুনিক বিবিধ কেমিক্যালগুলো সয়েল স্টাবিলাইজেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। অ্যাক্রিলিক পলিমার নামে এমনই একটি আধুনিক কেমিক্যালের সন্ধান পাই, যা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করে টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। আধুনিক এই প্রযুক্তি ও কেমিক্যাল মাটি ও বালির ভার বহন ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পানিরোধী করে।

অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে কীভাবে দেশে সড়ক নির্মাণ করা যায়, সে বিষয়ে আমরা গবেষণায় নিবিষ্ট হই এবং এর ধারাবাহিকতায় এপ্রিল ২০২১ থেকে জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত মোট ১০ মাস ধরে দেশের ২২টি জেলার মাটি সংগ্রহ করি এবং মাতারবাড়ী প্রোজেক্ট সাইট ল্যাবরেটরিতে মাটি ও বালির সঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে অ্যাক্রিলিক পলিমারের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণের সহজ কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হই। এ নির্মাণ কৌশলের মাধ্যমে সড়কের প্রচলিত ডিজাইন ও উপকরণ বদলে দেওয়া সম্ভব। এ পদ্ধতিতে নির্মিত সড়কের কাঠামোগত নকশায় নতুনত্ব আনা সম্ভব। নতুনত্ব হচ্ছে ডিজাইন প্যারামিটার ও নির্মাণ উপকরণ।

সাধারণত প্রচলিত সড়কের ভিত্তি (base ও sub-base) নির্মিত হয় ইটের খোয়া ও পাথর (স্টোন চিপস) দিয়ে। কিন্তু অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ কৌশলে শুধু স্থানীয় মাটি ও বালির সঙ্গে অ্যাক্রিলিক পলিমারের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে সড়কের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব; যা প্রচলিত sub-base ও base-এর প্রতিস্থাপন হিসাবে কাজ করে। উপাদানটি ন্যানো-টেকনোলজিতে কাজ করে।

অ্যাক্রিলিক পলিমার মাটি ও বালির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে মাটি ও বালির প্রতিটি কণার সঙ্গে মিশে ন্যানো-পরিমারাইজ্ড গ্রিড তৈরির মাধ্যমে একটি বিশেষ স্তর সৃষ্টি করে। এ স্তরটি ক্ষয়রোধী ও স্থিতিস্থাপক গুণাগুণসম্পন্ন। উল্লেখ্য, এটি খুব দ্রুত বন্ডিং তৈরি করে। বাংলাদেশের মাটি ও বালি অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহারে বিশেষ উপযোগী এবং আবহাওয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় হওয়ায় দ্রুত শুকিয়ে যায়।

অ্যাক্রিলিক পলিমার দ্বারা নির্মাণকৃত স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি পানিরোধী। এ ছাড়াও স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারটির প্রচলিত sub-base ও base থেকে Permeability অনেক কম। ফলে অ্যাক্রিলিক পলিমার দিয়ে স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারটির প্রচলিত sub-base ও base থেকে Pavement Layer Co-efficient বেশি হয়; যা Flexible Pavement Design-এ Structural Number (SN) উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করে; বিধায় অ্যাক্রিলিক পলিমার দিয়ে নির্মিত সড়ক বেশিসংখ্যক Equivalent Standard Axle Load (ESAL) বহন করতে সক্ষম। তাই অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে প্রস্তুতকৃত স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারটি মজবুত, টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এ পদ্ধতিটি সড়কের মূল ভিত্তি মজবুত ও টেকসই করার একটি চমৎকার কৌশল, যেখানে সহজলভ্য দেশীয় উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব। আমরা এ পদ্ধতিটির নামকরণ করেছি ‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’ এবং এর স্লোগান ঠিক করেছি ‘টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ কৌশল’।

সুবিধা ও গুণাগুণ

১. প্রচলিত পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের চেয়ে এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণে সময় কম লাগে। ২. এ পদ্ধতিতে সড়ক বা সড়ক বাঁধ নির্মাণ ব্যয় সাশ্রয়ী, টেকসই ও মজবুত।

এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ কৌশলে প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করা সম্ভব এবং তুলনামূলক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এলজিইডি ও আরএইচডি কর্তৃক উপজেলা বা জেলা সড়ক নির্মাণ ব্যয় থেকে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ সাশ্রয়ী। ৩. এ পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ইটের ব্যবহার নেই।

পদ্ধতিটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ইট পোড়ানোর ধোঁয়া ও দূষণ অনেকাংশে রোধ হবে এবং অনেক কৃষি জমি সংরক্ষিত থাকবে। সড়কের ভিত্তি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর আমদানির পরিমাণ বিপুলাংশে কমে যাবে। ৪. অ্যাক্রিলিক পলিমার দ্বারা নির্মিত সড়ক একদিকে যেমন টেকসই, মজবুত ও পানি-প্রতিরোধী, অন্যদিকে বন্যা বা অধিক বর্ষণেও এর স্থায়িত্ব অটুট থাকে।

তাছাড়া সড়কগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রচলিত সড়কের তুলনায় অনেক কম। ৫. অ্যাক্রিলিক পলিমারটি পরিবেশবান্ধব; ফলে এর ব্যবহারে স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না এবং পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত করে না। ৬. এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের প্রযুক্তিগত দিক সহজ হওয়ায় দেশে প্রচলিত সড়ক নির্মাণ যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করা যাবে।

হিসাব করে দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নারীসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। ৭. ‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’ সড়ক নির্মাণের একটি নতুন কৌশল। এ পদ্ধতিতে সড়ক, বেড়িবাঁধ, গ্রামীণ কাঁচা সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক, গ্রোথ সেন্টার সংযোগ সড়ক সহজে ও স্বল্প সময়ে নির্মাণ করা সম্ভব।

এছাড়া বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, টাউনশিপ, বিশ্ববিদ্যালয়, চা-বাগান ও বিভিন্ন পার্কের অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণও সহজে ও স্বল্প সময়ে করা সম্ভব। উল্লিখিত সড়কগুলো অনেক দ্রুত নির্মাণ করা যাবে এবং সড়কগুলো মজবুত, টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। ৮. অ্যাক্রিলিক পলিমার মাটি ও বালির সঙ্গে ব্যবহারের পর শুকানোর সময় বাতাসে কোনোরূপ দুর্গন্ধ ছড়ায় না। ৯. দেশে অ্যাক্রিলিক পলিমার শিল্পের উন্নয়ন হলে সড়ক নির্মাণ ব্যয় আরও কমবে এবং নতুন ব্যবসার প্রসার ঘটবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে গ্রামীণ মাটির রাস্তাগুলো টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ডকরণ (এইচবিবি) প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প চলমান রাখার বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা যেতে পারে। কারণ এইচবিবি সড়কের রাইডিং কোয়ালিটি ভালো নয়। ফলে রিকশা, ভ্যান চলাচল কষ্টসাধ্য।

এছাড়া তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই এইচবিবি সড়ক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়, ফলে আবার নির্মাণ করতে হয়। ফলস্বরূপ, অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয় না। কিন্তু ‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’র পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করা হলে তা একদিকে যেমন টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হবে; অন্যদিকে হবে ব্যয়সাশ্রয়ী।

গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনা ‘আমার গ্রাম আমার শহর’সহ সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০, রূপকল্প-২০৪১ এবং ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে দেশের ২ লাখ ২০ হাজার কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকা করা প্রয়োজন।

যেহেতু এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের সময় কম হয়, তাই গ্রামীণ কাঁচা সড়ক দ্রুত পাকা সড়কে পরিণত করা সম্ভব হবে। এতে গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’ ব্যবহার করে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রতিবছর ৭ থেকে ১০ হাজার কিলোমিটার সড়ক পাকা করা সম্ভব হবে। ফলে তা ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে আশা করা যায় ২০৪০ সাল নাগাদ দেশে আর কোনো কাঁচা সড়ক থাকবে না।

সীমাবদ্ধতা

এ গবেষণায় অ্যাক্রিলিক পলিমার হিসাবে K31 (আমেরিকান ব্র্যান্ড) ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে সহজলভ্য হলেও বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। অ্যাক্রিলিক পলিমার দেশে সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করছি।

বিশেষ বিবেচ্য বিষয়

ইতোমধ্যে আমেরিকার অন্য একটি কোম্পানির সঙ্গে অ্যাক্রিলিক পলিমার বিষয়ে সার্বিক আলোচনা হয়েছে এবং ওই কোম্পানি তাদের অ্যাক্রিলিক পলিমার ও অ্যাক্রিলিক কো-পলিমারের Manufacturing Technology ছাড়া সড়ক নির্মাণ, Dust Control ও Slope Erosion Control-এর প্রায়োগিক কৌশল, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের পরিমাণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, Mixing Technology, বিভিন্ন ল্যাবরেটরি টেস্ট রিপোর্ট এবং পদ্ধতিগত অন্যান্য বিষয়ের প্রযুক্তি মো. ফজলে রব্বের [অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সওজ ও প্রকল্প পরিচালক, মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (সওজ অংশ)] কাছে হস্তান্তর করেছে।

এছাড়াও বাংলাদেশের গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করার ক্ষেত্রে তাদের পণ্য, প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করার বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। ওই কাজে কানাডা-প্রবাসী সৈয়দ আলী সামী সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।

উল্লেখ্য, আমরা অ্যাক্রিলিক পলিমার ও অ্যাক্রিলিক কো-পলিমার উপাদান ব্যবহার করে বাংলাদেশের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের পেভমেন্ট ডিজাইন করতে সক্ষম।

মতামত

এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত উপকরণ অ্যাক্রিলিক পলিমার দ্বারা সড়ক নির্মাণ ছাড়াও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ (Dust Control) ও Slope

Erosion Control করা সম্ভব। ধুলাবালি বাতাসের সঙ্গে মিশে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। প্রাপ্ত তথ্যমতে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এয়ারপোর্ট-গাজীপুর মহাসড়কসংলগ্ন এলাকার জনসাধারণসহ সড়কে যাতায়াতকারী জনগণ ধুলার কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়ছে। এছাড়াও হিলি স্থলবন্দর এলাকায় ধুলাবালিতে জনজীবন নাকাল হচ্ছে।

কিন্তু এ উপাদান ব্যবহার করে খুব সহজে, স্বল্প সময়ে ও ব্যয় সাশ্রয়ী উপায়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এমনকি হেলিকপ্টার ল্যান্ডিংয়ের সময় হেলিপ্যাডের আশপাশের ধুলাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ উপাদান দিয়ে Slope Erosion Control করা যায়। এতে বেড়িবাঁধ রক্ষাসহ মাটির পাহাড়/টিলার ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সুপারিশ

প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আমাদের বিশ্বাস, আগামী বিশ্বের সড়ক হবে অ্যাক্রিলিক পলিমারনির্ভর। গ্রামীণ কাঁচা সড়ক এবং ইতোমধ্যে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত এইচবিবি সড়কগুলো এ কৌশলের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে নির্মাণ শুরু করা যেতে পারে। অ্যাক্রিলিক পলিমার ও অ্যাক্রিলিক কো-পলিমার চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পণ্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিল্পায়নের ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে, সেটা আমাদের ধরা দরকার।’ এ উক্তির যথার্থতা প্রতিপাদনে এই পণ্য আমাদের ব্যবহার শুরু করা দরকার। দেশে এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করা হলে তা টেকসই, সাশ্রয়ী ও যুগোপযোগী হবে। এতে দেশীয় উপকরণের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হবে। দেশে মজবুত ও টেকসই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এর ফলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

এ গবেষণা কাজে যারা উৎসাহ ও শ্রম দিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

লেখকরা গবেষক এবং মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের (সওজ অংশ) কর্মকর্তা

টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ কৌশল : একটি গবেষণা

 মো. ফজলে রব্বে, মো. আবুল হোসেন, মো. শাহ্রিয়ার রুমী, মোহা. ইউনুস আলী, আবু সাদাত সায়েম, ওয়ালিউল ইসলাম 
২৭ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী Bay of Bengal Industrial Growth Belt-এর আওতায় মহেশখালী-মাতারবাড়ী এলাকার উন্নয়নে Moheshkhali-Matarbari Integrated Infrastructure Development Initiative (MIDI) গঠন করেন।

এ পরিকল্পনা অনুযায়ী ওই অঞ্চলে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ চলমান। MIDI-এর অধীন চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (সওজ অংশ) একটি প্রকল্প। এ প্রকল্পে সড়ক ও সেতু নির্মাণে আমরা মাতারবাড়ী দ্বীপে কর্মরত।

মাতারবাড়ী সমুদ্র উপকূলীয় একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। পরিবার-পরিজন ছাড়া এ নির্জন এলাকায় সড়ক সেতু নির্মাণকাজের অবসরে, কখনো খাবার টেবিলে কিংবা নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক আলাপচারিতায় বর্ষাকালে বাংলাদেশের সড়কগুলো দ্রুত নষ্ট হওয়ার বিষয়টি ওঠে আসত।

বর্ষাকালে বেহাল সড়ক সম্পর্কে জনমনে রোড ইঞ্জিনিয়ার ও ঠিকাদারদের সম্পর্কে বিরূপ ধারণা আছে। সড়ক দ্রুত নষ্ট হওয়া নিয়ে প্রায় সব সময়ই পরিবহণ মালিক ও রোড ইঞ্জিনিয়াররা একে অন্যকে দোষারোপ করেন।

পরিবহণ মালিকরা বলেন, সড়ক নির্মাণে নিুমানের মালামাল ব্যবহার করা হয় এবং সড়ক ডিজাইনে ত্রুটি রয়েছে। অন্যদিকে রোড ইঞ্জিনিয়াররা ওভারলোডকে দায়ী করেন। রোড ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বর্ষাকালে সড়ক দ্রুত নষ্ট হওয়ার বিষয়টি নিজেদের সব সময়ই পীড়া দেয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বক্তব্যে সবসময় উদ্ভাবনী গবেষণার তাগিদ দেন। আমরাও আমাদের ভাবনায় গবেষণার তাগিদ অনুভব করি এবং সড়ক দ্রুত নষ্ট হওয়া থেকে বের হয়ে আসার উপায় ও বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করি।

উল্লেখ্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার প্রতিফলন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর কল্যাণে প্রত্যন্ত দুর্গম অঞ্চল মাতারবাড়ীও ইন্টারনেট সুবিধার আওতায় এসেছে। বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। এই ডিজিটাল সুবিধা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানের টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণের উৎস, পদ্ধতি ও করণীয় সন্ধান করতে থাকি। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বব্যাপী প্রচলিত সয়েল স্টাবিলাইজেশনের বিবিধ মেথড দেখতে পাই, যার মধ্যে রয়েছে মেকানিক্যাল মেথড ও বিবিধ কেমিক্যাল, যা সড়ক নির্মাণে ব্যবহার হয়ে থাকে-যেমন সিমেন্ট, লাইম, ফ্লাই অ্যাশ, বিটুমিন ইমালশন, ক্যালসিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম সিলিকেট, বায়ো-এনজাইম প্রভৃতি। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির আধুনিকায়নে আধুনিক বিবিধ কেমিক্যালগুলো সয়েল স্টাবিলাইজেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে। অ্যাক্রিলিক পলিমার নামে এমনই একটি আধুনিক কেমিক্যালের সন্ধান পাই, যা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করে টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ হচ্ছে। আধুনিক এই প্রযুক্তি ও কেমিক্যাল মাটি ও বালির ভার বহন ক্ষমতা বৃদ্ধি ও পানিরোধী করে।

অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে কীভাবে দেশে সড়ক নির্মাণ করা যায়, সে বিষয়ে আমরা গবেষণায় নিবিষ্ট হই এবং এর ধারাবাহিকতায় এপ্রিল ২০২১ থেকে জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত মোট ১০ মাস ধরে দেশের ২২টি জেলার মাটি সংগ্রহ করি এবং মাতারবাড়ী প্রোজেক্ট সাইট ল্যাবরেটরিতে মাটি ও বালির সঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে অ্যাক্রিলিক পলিমারের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে একটি টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণের সহজ কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হই। এ নির্মাণ কৌশলের মাধ্যমে সড়কের প্রচলিত ডিজাইন ও উপকরণ বদলে দেওয়া সম্ভব। এ পদ্ধতিতে নির্মিত সড়কের কাঠামোগত নকশায় নতুনত্ব আনা সম্ভব। নতুনত্ব হচ্ছে ডিজাইন প্যারামিটার ও নির্মাণ উপকরণ।

সাধারণত প্রচলিত সড়কের ভিত্তি (base ও sub-base) নির্মিত হয় ইটের খোয়া ও পাথর (স্টোন চিপস) দিয়ে। কিন্তু অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে সড়ক নির্মাণ কৌশলে শুধু স্থানীয় মাটি ও বালির সঙ্গে অ্যাক্রিলিক পলিমারের রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে সড়কের ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব; যা প্রচলিত sub-base ও base-এর প্রতিস্থাপন হিসাবে কাজ করে। উপাদানটি ন্যানো-টেকনোলজিতে কাজ করে।

অ্যাক্রিলিক পলিমার মাটি ও বালির সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে মাটি ও বালির প্রতিটি কণার সঙ্গে মিশে ন্যানো-পরিমারাইজ্ড গ্রিড তৈরির মাধ্যমে একটি বিশেষ স্তর সৃষ্টি করে। এ স্তরটি ক্ষয়রোধী ও স্থিতিস্থাপক গুণাগুণসম্পন্ন। উল্লেখ্য, এটি খুব দ্রুত বন্ডিং তৈরি করে। বাংলাদেশের মাটি ও বালি অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহারে বিশেষ উপযোগী এবং আবহাওয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় হওয়ায় দ্রুত শুকিয়ে যায়।

অ্যাক্রিলিক পলিমার দ্বারা নির্মাণকৃত স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারের অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো এটি পানিরোধী। এ ছাড়াও স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারটির প্রচলিত sub-base ও base থেকে Permeability অনেক কম। ফলে অ্যাক্রিলিক পলিমার দিয়ে স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারটির প্রচলিত sub-base ও base থেকে Pavement Layer Co-efficient বেশি হয়; যা Flexible Pavement Design-এ Structural Number (SN) উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি করে; বিধায় অ্যাক্রিলিক পলিমার দিয়ে নির্মিত সড়ক বেশিসংখ্যক Equivalent Standard Axle Load (ESAL) বহন করতে সক্ষম। তাই অ্যাক্রিলিক পলিমার ব্যবহার করে প্রস্তুতকৃত স্ট্যাবিলাইজড লেয়ারটি মজবুত, টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এ পদ্ধতিটি সড়কের মূল ভিত্তি মজবুত ও টেকসই করার একটি চমৎকার কৌশল, যেখানে সহজলভ্য দেশীয় উপকরণের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব। আমরা এ পদ্ধতিটির নামকরণ করেছি ‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’ এবং এর স্লোগান ঠিক করেছি ‘টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণ কৌশল’।

সুবিধা ও গুণাগুণ

১. প্রচলিত পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের চেয়ে এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণে সময় কম লাগে। ২. এ পদ্ধতিতে সড়ক বা সড়ক বাঁধ নির্মাণ ব্যয় সাশ্রয়ী, টেকসই ও মজবুত।

এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ কৌশলে প্রায় ৬০ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করা সম্ভব এবং তুলনামূলক ব্যয় পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এলজিইডি ও আরএইচডি কর্তৃক উপজেলা বা জেলা সড়ক নির্মাণ ব্যয় থেকে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ সাশ্রয়ী। ৩. এ পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ইটের ব্যবহার নেই।

পদ্ধতিটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ইট পোড়ানোর ধোঁয়া ও দূষণ অনেকাংশে রোধ হবে এবং অনেক কৃষি জমি সংরক্ষিত থাকবে। সড়কের ভিত্তি নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় পাথর আমদানির পরিমাণ বিপুলাংশে কমে যাবে। ৪. অ্যাক্রিলিক পলিমার দ্বারা নির্মিত সড়ক একদিকে যেমন টেকসই, মজবুত ও পানি-প্রতিরোধী, অন্যদিকে বন্যা বা অধিক বর্ষণেও এর স্থায়িত্ব অটুট থাকে।

তাছাড়া সড়কগুলোর মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় প্রচলিত সড়কের তুলনায় অনেক কম। ৫. অ্যাক্রিলিক পলিমারটি পরিবেশবান্ধব; ফলে এর ব্যবহারে স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি হয় না এবং পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত করে না। ৬. এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের প্রযুক্তিগত দিক সহজ হওয়ায় দেশে প্রচলিত সড়ক নির্মাণ যন্ত্রপাতিই ব্যবহার করা যাবে।

হিসাব করে দেখা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার অদক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হবে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নারীসহ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হবে। এর ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। ৭. ‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’ সড়ক নির্মাণের একটি নতুন কৌশল। এ পদ্ধতিতে সড়ক, বেড়িবাঁধ, গ্রামীণ কাঁচা সড়ক, ইউনিয়ন সড়ক, গ্রোথ সেন্টার সংযোগ সড়ক সহজে ও স্বল্প সময়ে নির্মাণ করা সম্ভব।

এছাড়া বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, টাউনশিপ, বিশ্ববিদ্যালয়, চা-বাগান ও বিভিন্ন পার্কের অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণও সহজে ও স্বল্প সময়ে করা সম্ভব। উল্লিখিত সড়কগুলো অনেক দ্রুত নির্মাণ করা যাবে এবং সড়কগুলো মজবুত, টেকসই ও ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। ৮. অ্যাক্রিলিক পলিমার মাটি ও বালির সঙ্গে ব্যবহারের পর শুকানোর সময় বাতাসে কোনোরূপ দুর্গন্ধ ছড়ায় না। ৯. দেশে অ্যাক্রিলিক পলিমার শিল্পের উন্নয়ন হলে সড়ক নির্মাণ ব্যয় আরও কমবে এবং নতুন ব্যবসার প্রসার ঘটবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে গ্রামীণ মাটির রাস্তাগুলো টেকসইকরণের লক্ষ্যে হেরিং বোন বন্ডকরণ (এইচবিবি) প্রকল্প চলমান রয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প চলমান রাখার বিষয়ে নতুনভাবে চিন্তা করা যেতে পারে। কারণ এইচবিবি সড়কের রাইডিং কোয়ালিটি ভালো নয়। ফলে রিকশা, ভ্যান চলাচল কষ্টসাধ্য।

এছাড়া তিন থেকে চার বছরের মধ্যেই এইচবিবি সড়ক ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে যায়, ফলে আবার নির্মাণ করতে হয়। ফলস্বরূপ, অর্থের যথাযথ ব্যবহার হয় না। কিন্তু ‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’র পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করা হলে তা একদিকে যেমন টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হবে; অন্যদিকে হবে ব্যয়সাশ্রয়ী।

গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনা ‘আমার গ্রাম আমার শহর’সহ সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০, রূপকল্প-২০৪১ এবং ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে দেশের ২ লাখ ২০ হাজার কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকা করা প্রয়োজন।

যেহেতু এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণের সময় কম হয়, তাই গ্রামীণ কাঁচা সড়ক দ্রুত পাকা সড়কে পরিণত করা সম্ভব হবে। এতে গ্রাম ও শহরের মধ্যে উন্নত সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

‘বাংলাদেশ রোড টেকনোলজি’ ব্যবহার করে সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রতিবছর ৭ থেকে ১০ হাজার কিলোমিটার সড়ক পাকা করা সম্ভব হবে। ফলে তা ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বিশেষ উদ্যোগ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে আশা করা যায় ২০৪০ সাল নাগাদ দেশে আর কোনো কাঁচা সড়ক থাকবে না।

সীমাবদ্ধতা

এ গবেষণায় অ্যাক্রিলিক পলিমার হিসাবে K31 (আমেরিকান ব্র্যান্ড) ব্যবহার করা হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে সহজলভ্য হলেও বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়। অ্যাক্রিলিক পলিমার দেশে সহজলভ্য করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করছি।

বিশেষ বিবেচ্য বিষয়

ইতোমধ্যে আমেরিকার অন্য একটি কোম্পানির সঙ্গে অ্যাক্রিলিক পলিমার বিষয়ে সার্বিক আলোচনা হয়েছে এবং ওই কোম্পানি তাদের অ্যাক্রিলিক পলিমার ও অ্যাক্রিলিক কো-পলিমারের Manufacturing Technology ছাড়া সড়ক নির্মাণ, Dust Control ও Slope Erosion Control-এর প্রায়োগিক কৌশল, বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগের পরিমাণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, Mixing Technology, বিভিন্ন ল্যাবরেটরি টেস্ট রিপোর্ট এবং পদ্ধতিগত অন্যান্য বিষয়ের প্রযুক্তি মো. ফজলে রব্বের [অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, সওজ ও প্রকল্প পরিচালক, মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প (সওজ অংশ)] কাছে হস্তান্তর করেছে।

এছাড়াও বাংলাদেশের গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে টেকসই ও সাশ্রয়ী সড়ক নির্মাণকাজ শুরু করার ক্ষেত্রে তাদের পণ্য, প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ দিয়ে সার্বিক সহযোগিতা করার বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রদান করেছে। ওই কাজে কানাডা-প্রবাসী সৈয়দ আলী সামী সার্বিক সহযোগিতা করেছেন।

উল্লেখ্য, আমরা অ্যাক্রিলিক পলিমার ও অ্যাক্রিলিক কো-পলিমার উপাদান ব্যবহার করে বাংলাদেশের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের পেভমেন্ট ডিজাইন করতে সক্ষম।

মতামত

এ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত উপকরণ অ্যাক্রিলিক পলিমার দ্বারা সড়ক নির্মাণ ছাড়াও ধুলাবালি নিয়ন্ত্রণ (Dust Control) ও Slope

Erosion Control করা সম্ভব। ধুলাবালি বাতাসের সঙ্গে মিশে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। প্রাপ্ত তথ্যমতে উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, এয়ারপোর্ট-গাজীপুর মহাসড়কসংলগ্ন এলাকার জনসাধারণসহ সড়কে যাতায়াতকারী জনগণ ধুলার কারণে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় পড়ছে। এছাড়াও হিলি স্থলবন্দর এলাকায় ধুলাবালিতে জনজীবন নাকাল হচ্ছে।

কিন্তু এ উপাদান ব্যবহার করে খুব সহজে, স্বল্প সময়ে ও ব্যয় সাশ্রয়ী উপায়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এমনকি হেলিকপ্টার ল্যান্ডিংয়ের সময় হেলিপ্যাডের আশপাশের ধুলাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ উপাদান দিয়ে Slope Erosion Control করা যায়। এতে বেড়িবাঁধ রক্ষাসহ মাটির পাহাড়/টিলার ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট প্রাণহানি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সুপারিশ

প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আমাদের বিশ্বাস, আগামী বিশ্বের সড়ক হবে অ্যাক্রিলিক পলিমারনির্ভর। গ্রামীণ কাঁচা সড়ক এবং ইতোমধ্যে গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মিত এইচবিবি সড়কগুলো এ কৌশলের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে নির্মাণ শুরু করা যেতে পারে। অ্যাক্রিলিক পলিমার ও অ্যাক্রিলিক কো-পলিমার চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পণ্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিল্পায়নের ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে, সেটা আমাদের ধরা দরকার।’ এ উক্তির যথার্থতা প্রতিপাদনে এই পণ্য আমাদের ব্যবহার শুরু করা দরকার। দেশে এ পদ্ধতিতে সড়ক নির্মাণ করা হলে তা টেকসই, সাশ্রয়ী ও যুগোপযোগী হবে। এতে দেশীয় উপকরণের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হবে। দেশে মজবুত ও টেকসই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এর ফলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে।

এ গবেষণা কাজে যারা উৎসাহ ও শ্রম দিয়েছেন এবং সহযোগিতা করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।

লেখকরা গবেষক এবং মাতারবাড়ী কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের (সওজ অংশ) কর্মকর্তা

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন