মহাসমুদ্র পরিকল্পনায় হাইড্রোগ্রাফির অবদান
jugantor
মহাসমুদ্র পরিকল্পনায় হাইড্রোগ্রাফির অবদান

  মো. মিনারুল হক  

২১ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ২১ জুন বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস পালিত হয়। হাইড্রোগ্রাফি বিষয়ে জনসচেতনতা এবং সাগর-মহাসাগরবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধিতে হাইড্রোগ্রাফির ভূমিকা তুলে ধরার লক্ষ্যে দিবসটি উদযাপিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো জাতিসংঘের দশ বছরমেয়াদি মহাসমুদ্র পরিকল্পনায় হাইড্রোগ্রাফির অবদান। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের জন্য সমুদ্রবিজ্ঞানের দশকে হাইড্রোগ্রাফির অবদান তুলে ধরার প্রয়াসে প্রতিপাদ্যটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাইড্রোগ্রাফাররা সামুদ্রিক ডাটা সংগ্রহ করার বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ে বৈশ্বিকভাবে যে সমন্বয় সাধন করে থাকেন, তার গুরুত্ব তুলে ধরাও এর একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান অংশীজনদের হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে অধিকতর সেবা প্রদান করার বিষয়টিকে বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবসের মাধ্যমে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। আশা করা যায়, হাইড্রোগ্রাফি দিবস উদযাপনের মাধ্যমে দেশের মেরিটাইম কমিউনিটি এবং অন্যান্য অংশীজনের মাঝে সচেতনতা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ মেরিটাইম চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তির সূচনা হবে।

জানা যায়, উনিশ শতকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাপী হাইড্রোগ্রাফার এবং সমুদ্রবিজ্ঞানীরা হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রম তদারকি ও নটিক্যাল চার্টিং সার্ভিসের জন্য সর্বজনীন পদ্ধতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে একটি স্থায়ী কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯, ১৯০৮ এবং ১৯১২ সালে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের হাইড্রোগ্রাফারদের সহযোগিতায় লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ২৪টি দেশের হাইড্রোগ্রাফাররা সেই সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো (আইএইচবি) নামে একটি স্থায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হয়।

১৮টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে ১৯২১ সালের ২১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আইএইচবি-এর কার্যক্রম শুরু হয়। বিশিষ্ট সমুদ্রবিজ্ঞানী প্রিন্স অ্যালবার্ট-১ মোনাকোতে সংস্থাটির প্রধান অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন থেকেই এর প্রধান কার্যালয় মোনাকোতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭০ সালে সব সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে আইএইচবি নামটি পরিবর্তন করে ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক অর্গানাইজেশন (আইএইচও) নামটি গৃহীত হয়। এখন পর্যন্ত ৯৮টি দেশ এর সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০১ সালের ২ জুলাই ৭০তম দেশ হিসাবে সংস্থাটির সদস্যপদ লাভ করে।

হাইড্রোগ্রাফিক সেবার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রায় সব উপকূলীয় দেশই তাদের নিজস্ব হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করেছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সেইফটি অফ লাইফ অ্যাট সি (সোলাস) কনভেনশন অনুযায়ী সব উপকূলীয় দেশের প্রতি যথাযথ হাইড্রোগ্রাফিক সেবা ও নটিক্যাল চার্টিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসেস গঠিত হয়। একই বছর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এদেশের সমুদ্র এলাকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের জন্য নৌবাহিনীকে এবং অভ্যন্তরীণ জলপথের জরিপের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’কে দায়িত্ব অর্পণ করে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে আমাদের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ক্রমান্বয়ে একটি পেশাদার সংস্থা হিসাবে বিকশিত হয়েছে। দেশের সমুদ্র এলাকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা ও এ সংক্রান্ত সেবাদানের মাধ্যমে নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিতের বিষয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বদ্ধপরিকর।

হাইড্রোগ্রাফিক বিষয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৯৮৩ সালে হাইড্রোগ্রাফিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে এ ধরনের এটিই একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গর্বের বিষয় এই যে, ২০০৫ সালে নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলটি ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অন স্ট্যান্ডার্ডস অব কম্পিটেন্স (আইবিএসসি) থেকে ক্যাটাগরি ‘বি’ লেভেলের হাইড্রোগ্রাফিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করার স্বীকৃতি অর্জন করে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিএন হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলের খ্যাতি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। স্কুলটি শুধু অন্যান্য সরকারি সংস্থার হাইড্রোগ্রাফারদেরই নয়, বিদেশি শিক্ষার্থীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

অন্যদিকে, আইএইচও’র মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশ নেভি হাইড্রোগ্রাফিক অ্যান্ড ওশানোগ্রাফিক সেন্টার (বিএনএইচওসি) আন্তর্জাতিক মানের নটিক্যাল চার্ট তৈরিতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে এ সংস্থাটি দেশের সমুদ্র এলাকায় নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব পেপার চার্ট ও ইলেকট্রনিক নেভিগেশনাল চার্ট (ইএনসি) প্রকাশ করেছে। বিএনএইচওসি-এর প্রকাশিত চার্টগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত এবং বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ছাড়াও বিআইডব্লিউটিএ, চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থা রয়েছে, যারা নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। দেশের সব হাইড্রোগ্রাফিক অফিসের সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসের ঘনিষ্ঠ পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে। নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ও দেশের অন্যান্য হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে তথ্য উপাত্ত আদান-প্রদান করে থাকে। এ ছাড়াও সার্ভে অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, স্পারসো, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মতো সরকারি সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। এ ছাড়াও সামুদ্রিক গবেষণার জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণামূলক সংস্থাগুলোকেও নিয়মিত সহায়তা প্রদান করে থাকে।

সমুদ্রের ক্রমশ দূষণ ও ক্ষতি হ্রাস করার জন্য সব অংশীজনকে একই কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে সমষ্টিগতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সালকে সমুদ্রবিজ্ঞানের দশক হিসাবে ঘোষণা করেছে। সমুদ্রবিজ্ঞানের সহায়তা নিয়ে সব দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। আশা করা হচ্ছে, এই দশকে সমুদ্র বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হবে, যা সমুদ্রের সঙ্গে মানবজাতির সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা এনে দেবে। এর ফলে বিজ্ঞানী, গবেষক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

২০২১ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড ওশান এসেসমেন্টে উদ্ঘাটিত হয়, সমুদ্র অতি দ্রুত তার জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা যদি ৯ বিলিয়নে এসে দাঁড়ায়, তাহলে সমুদ্রের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে অভিযোজন কৌশল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির আলোকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সমুদ্র বিজ্ঞানের এই দশক নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে আমাদের সাগর-মহাসাগরকে গভীরভাবে জানতে আরও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই দশকের মূল লক্ষ্যগুলো হলো, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করা, সমুদ্রের বিষয়ে সর্বজনীন জ্ঞান অর্জন করা এবং লব্ধ জ্ঞানের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বস্তুত টেকসই উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে হাইড্রোগ্রাফিক কর্মকাণ্ড ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নেভিগেশনাল নিরাপত্তার জন্য সমুদ্রের তলদেশ ম্যাপিং করার কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথাপি, সমুদ্র ও নেভিগেবল জলসীমায় সব কাজের জন্যই হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত ও পরিষেবা প্রয়োজন। সাগরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য শুরুতেই তলদেশের গভীরতা, বিশেষত্ব, জোয়ার-ভাটা ও স্রোতের অবস্থা জানা প্রয়োজন হয়। এ কারণে, সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য হাইড্রোগ্রাফি একটি অপরিহার্য অংশ। এসডিজি ১৪ : লাইফ বিলো ওয়াটার, এর অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য হাইড্রোগ্রাফিক তথ্যের অবদান এখন সর্বজনীনভাবে সমাদৃত।

সমুদ্র দশকের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য হাইড্রোগ্রাফি মূলত প্রকৌশলগত ও তথ্যভিত্তিক সমাধানে জোর দেয়। পৃথিবী জুড়ে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের জন্য যত ধরনের ইকুইপমেন্ট রয়েছে, তার সিংহভাগই কোনো না কোনো দেশের জাতীয় হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থা পরিচালনা করে থাকে। যদিও হাইড্রোগ্রাফির মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ নেভিগেশন, কিন্তু কোনোভাবেই এর ব্যাপ্তি শুধু চার্ট তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রের মৌলিক ভৌত বৈশিষ্ট্য, যেমন জোয়ার ও স্রোত পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসের কাজটি হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে জানা যায়। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের সময় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত আদান প্রদানের মাধ্যমে সমুদ্রবিজ্ঞানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের সহযোগিতা জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

স্ব-স্ব দেশের হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থাগুলো তাদের জলসীমায় হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশানোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব তথ্য-উপাত্ত আরও নিখুঁত ও বিস্তৃত আকার লাভ করেছে। জাতিসংঘের সমুদ্র দশক ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের উদ্যোগগুলো যাতে আরও কার্যকরী ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়, তা নিশ্চিত করতে হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্বের বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত সমুদ্র-সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত সহজে ব্যবহার করার জন্য আইএইচও ডিজিটাল ডাটা প্রমিতকরণের দিকেও নজর দিচ্ছে। আইএইচও-এর এস-১০০ সর্বজনীন হাইড্রোগ্রাফিক ডাটা মডেল ফ্রেমওয়ার্ক বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক ডাটাকে সর্বজনীনভাবে ব্যবহারের জন্য উপযোগী করে তুলবে। এ মডেলের বাস্তবায়ন হলে অন্যান্য স্টেকহোল্ডার সহজেই সামুদ্রিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে পারবেন এবং পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে গবেষণার বিষয়গুলো আরও সহজভাবে তুলে ধরা সম্ভব। বলা যায়, জাতিসংঘের মহাসাগর দশকের লক্ষ্য অর্জনে হাইড্রোগ্রাফি একটি অন্যতম বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফরম হিসাবে অবদান রাখবে।

মানব সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একুশ শতকই হবে সর্বশেষ সুযোগ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইকোসিস্টেম হচ্ছে সমুদ্র, যা ভূ-উপরিভাগের সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। সমুদ্রের টেকসই ব্যবহারের বিষয়টি এখন আর বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের ধরণির অস্তিত্বের লড়াই। বৈশ্বিক জলবায়ু রক্ষার ক্ষেত্রেও সমুদ্র দশকের কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন, ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও নতুন কর্মকৌশল বের করার জন্য বিপুল পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ, তথা বিশ্বের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসগুলো এসব তথ্য-উপাত্তের অন্যতম মূল জোগানদাতা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে হাইড্রোগ্রাফাররা জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের প্রতি অবদান রেখে চলেছেন। তবুও, এসব তথ্য-উপাত্তের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও উদ্যোগ গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। হাইড্রোগ্রাফার ও সমুদ্রবিজ্ঞানীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রমকে ভিত্তি করে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মহাসাগর দশকের মূল উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

মো. মিনারুল হক : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিমরাড) মহাপরিচালক

মহাসমুদ্র পরিকল্পনায় হাইড্রোগ্রাফির অবদান

 মো. মিনারুল হক 
২১ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ২১ জুন বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবস পালিত হয়। হাইড্রোগ্রাফি বিষয়ে জনসচেতনতা এবং সাগর-মহাসাগরবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধিতে হাইড্রোগ্রাফির ভূমিকা তুলে ধরার লক্ষ্যে দিবসটি উদযাপিত হয়। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো জাতিসংঘের দশ বছরমেয়াদি মহাসমুদ্র পরিকল্পনায় হাইড্রোগ্রাফির অবদান। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়নের জন্য সমুদ্রবিজ্ঞানের দশকে হাইড্রোগ্রাফির অবদান তুলে ধরার প্রয়াসে প্রতিপাদ্যটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

হাইড্রোগ্রাফাররা সামুদ্রিক ডাটা সংগ্রহ করার বিষয়ে কারিগরি পর্যায়ে বৈশ্বিকভাবে যে সমন্বয় সাধন করে থাকেন, তার গুরুত্ব তুলে ধরাও এর একটি অন্যতম উদ্দেশ্য। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান অংশীজনদের হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে অধিকতর সেবা প্রদান করার বিষয়টিকে বিশ্ব হাইড্রোগ্রাফি দিবসের মাধ্যমে আলোকপাত করার চেষ্টা করা হয়ে থাকে। আশা করা যায়, হাইড্রোগ্রাফি দিবস উদযাপনের মাধ্যমে দেশের মেরিটাইম কমিউনিটি এবং অন্যান্য অংশীজনের মাঝে সচেতনতা তৈরি হবে এবং ভবিষ্যৎ মেরিটাইম চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য একটি দৃঢ় ভিত্তির সূচনা হবে।

জানা যায়, উনিশ শতকের শেষের দিকে বিশ্বব্যাপী হাইড্রোগ্রাফার এবং সমুদ্রবিজ্ঞানীরা হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রম তদারকি ও নটিক্যাল চার্টিং সার্ভিসের জন্য সর্বজনীন পদ্ধতি গ্রহণের উদ্দেশ্যে একটি স্থায়ী কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৯, ১৯০৮ এবং ১৯১২ সালে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের হাইড্রোগ্রাফারদের সহযোগিতায় লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়। ২৪টি দেশের হাইড্রোগ্রাফাররা সেই সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরে আন্তর্জাতিক হাইড্রোগ্রাফিক ব্যুরো (আইএইচবি) নামে একটি স্থায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হয়।

১৮টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে ১৯২১ সালের ২১ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে আইএইচবি-এর কার্যক্রম শুরু হয়। বিশিষ্ট সমুদ্রবিজ্ঞানী প্রিন্স অ্যালবার্ট-১ মোনাকোতে সংস্থাটির প্রধান অফিস স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখন থেকেই এর প্রধান কার্যালয় মোনাকোতে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৭০ সালে সব সদস্য রাষ্ট্রের সম্মতিক্রমে আইএইচবি নামটি পরিবর্তন করে ইন্টারন্যাশনাল হাইড্রোগ্রাফিক অর্গানাইজেশন (আইএইচও) নামটি গৃহীত হয়। এখন পর্যন্ত ৯৮টি দেশ এর সদস্য রাষ্ট্র হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০১ সালের ২ জুলাই ৭০তম দেশ হিসাবে সংস্থাটির সদস্যপদ লাভ করে।

হাইড্রোগ্রাফিক সেবার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রায় সব উপকূলীয় দেশই তাদের নিজস্ব হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করেছে। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সেইফটি অফ লাইফ অ্যাট সি (সোলাস) কনভেনশন অনুযায়ী সব উপকূলীয় দেশের প্রতি যথাযথ হাইড্রোগ্রাফিক সেবা ও নটিক্যাল চার্টিং নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ বাধ্যবাধকতা পূরণের জন্য ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসেস গঠিত হয়। একই বছর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এদেশের সমুদ্র এলাকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের জন্য নৌবাহিনীকে এবং অভ্যন্তরীণ জলপথের জরিপের জন্য বিআইডব্লিউটিএ’কে দায়িত্ব অর্পণ করে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে আমাদের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ক্রমান্বয়ে একটি পেশাদার সংস্থা হিসাবে বিকশিত হয়েছে। দেশের সমুদ্র এলাকার হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ পরিচালনা ও এ সংক্রান্ত সেবাদানের মাধ্যমে নিরাপদ নেভিগেশন নিশ্চিতের বিষয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বদ্ধপরিকর।

হাইড্রোগ্রাফিক বিষয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১৯৮৩ সালে হাইড্রোগ্রাফিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশে এ ধরনের এটিই একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গর্বের বিষয় এই যে, ২০০৫ সালে নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলটি ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অন স্ট্যান্ডার্ডস অব কম্পিটেন্স (আইবিএসসি) থেকে ক্যাটাগরি ‘বি’ লেভেলের হাইড্রোগ্রাফিক প্রশিক্ষণ পরিচালনা করার স্বীকৃতি অর্জন করে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিএন হাইড্রোগ্রাফিক স্কুলের খ্যাতি আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। স্কুলটি শুধু অন্যান্য সরকারি সংস্থার হাইড্রোগ্রাফারদেরই নয়, বিদেশি শিক্ষার্থীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।

অন্যদিকে, আইএইচও’র মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলাদেশ নেভি হাইড্রোগ্রাফিক অ্যান্ড ওশানোগ্রাফিক সেন্টার (বিএনএইচওসি) আন্তর্জাতিক মানের নটিক্যাল চার্ট তৈরিতে সম্পূর্ণভাবে সক্ষমতা অর্জন করেছে। ইতোমধ্যে এ সংস্থাটি দেশের সমুদ্র এলাকায় নিরাপদ নেভিগেশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব পেপার চার্ট ও ইলেকট্রনিক নেভিগেশনাল চার্ট (ইএনসি) প্রকাশ করেছে। বিএনএইচওসি-এর প্রকাশিত চার্টগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমাদৃত এবং বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ছাড়াও বিআইডব্লিউটিএ, চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থা রয়েছে, যারা নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। দেশের সব হাইড্রোগ্রাফিক অফিসের সঙ্গে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসের ঘনিষ্ঠ পেশাগত সম্পর্ক রয়েছে। নৌবাহিনীর হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস ও দেশের অন্যান্য হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ সংস্থাগুলো নিয়মিতভাবে তথ্য উপাত্ত আদান-প্রদান করে থাকে। এ ছাড়াও সার্ভে অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, স্পারসো, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মতো সরকারি সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। এ ছাড়াও সামুদ্রিক গবেষণার জন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণামূলক সংস্থাগুলোকেও নিয়মিত সহায়তা প্রদান করে থাকে।

সমুদ্রের ক্রমশ দূষণ ও ক্ষতি হ্রাস করার জন্য সব অংশীজনকে একই কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসে সমষ্টিগতভাবে কাজ করা প্রয়োজন। বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করে জাতিসংঘ ২০২১-২০৩০ সালকে সমুদ্রবিজ্ঞানের দশক হিসাবে ঘোষণা করেছে। সমুদ্রবিজ্ঞানের সহায়তা নিয়ে সব দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। আশা করা হচ্ছে, এই দশকে সমুদ্র বিজ্ঞানে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব সাধিত হবে, যা সমুদ্রের সঙ্গে মানবজাতির সম্পর্ককে এক নতুন মাত্রা এনে দেবে। এর ফলে বিজ্ঞানী, গবেষক, ব্যবসায়ী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।

২০২১ সালে প্রকাশিত দ্বিতীয় ওয়ার্ল্ড ওশান এসেসমেন্টে উদ্ঘাটিত হয়, সমুদ্র অতি দ্রুত তার জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যা যদি ৯ বিলিয়নে এসে দাঁড়ায়, তাহলে সমুদ্রের ওপর মানুষের কর্মকাণ্ডের চাপ আরও বৃদ্ধি পাবে। এ কারণে অভিযোজন কৌশল এবং বিজ্ঞানভিত্তিক নীতির আলোকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। সমুদ্র বিজ্ঞানের এই দশক নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমে আমাদের সাগর-মহাসাগরকে গভীরভাবে জানতে আরও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এই দশকের মূল লক্ষ্যগুলো হলো, টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মকাণ্ড নির্ধারণ করা, সমুদ্রের বিষয়ে সর্বজনীন জ্ঞান অর্জন করা এবং লব্ধ জ্ঞানের ব্যবহার বৃদ্ধি করা। বস্তুত টেকসই উন্নয়নের মূল উদ্দেশ্যগুলোর সঙ্গে হাইড্রোগ্রাফিক কর্মকাণ্ড ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নেভিগেশনাল নিরাপত্তার জন্য সমুদ্রের তলদেশ ম্যাপিং করার কাজটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথাপি, সমুদ্র ও নেভিগেবল জলসীমায় সব কাজের জন্যই হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত ও পরিষেবা প্রয়োজন। সাগরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যে কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য শুরুতেই তলদেশের গভীরতা, বিশেষত্ব, জোয়ার-ভাটা ও স্রোতের অবস্থা জানা প্রয়োজন হয়। এ কারণে, সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য হাইড্রোগ্রাফি একটি অপরিহার্য অংশ। এসডিজি ১৪ : লাইফ বিলো ওয়াটার, এর অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য হাইড্রোগ্রাফিক তথ্যের অবদান এখন সর্বজনীনভাবে সমাদৃত।

সমুদ্র দশকের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য হাইড্রোগ্রাফি মূলত প্রকৌশলগত ও তথ্যভিত্তিক সমাধানে জোর দেয়। পৃথিবী জুড়ে সমুদ্র পর্যবেক্ষণের জন্য যত ধরনের ইকুইপমেন্ট রয়েছে, তার সিংহভাগই কোনো না কোনো দেশের জাতীয় হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থা পরিচালনা করে থাকে। যদিও হাইড্রোগ্রাফির মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ নেভিগেশন, কিন্তু কোনোভাবেই এর ব্যাপ্তি শুধু চার্ট তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রের মৌলিক ভৌত বৈশিষ্ট্য, যেমন জোয়ার ও স্রোত পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসের কাজটি হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে জানা যায়। হাইড্রোগ্রাফিক জরিপের সময় প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত আদান প্রদানের মাধ্যমে সমুদ্রবিজ্ঞানের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের সহযোগিতা জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

স্ব-স্ব দেশের হাইড্রোগ্রাফিক সংস্থাগুলো তাদের জলসীমায় হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশানোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে। প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব তথ্য-উপাত্ত আরও নিখুঁত ও বিস্তৃত আকার লাভ করেছে। জাতিসংঘের সমুদ্র দশক ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জনের উদ্যোগগুলো যাতে আরও কার্যকরী ও লক্ষ্যভিত্তিক হয়, তা নিশ্চিত করতে হাইড্রোগ্রাফিক তথ্য-উপাত্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্বের বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত সমুদ্র-সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত সহজে ব্যবহার করার জন্য আইএইচও ডিজিটাল ডাটা প্রমিতকরণের দিকেও নজর দিচ্ছে। আইএইচও-এর এস-১০০ সর্বজনীন হাইড্রোগ্রাফিক ডাটা মডেল ফ্রেমওয়ার্ক বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক ডাটাকে সর্বজনীনভাবে ব্যবহারের জন্য উপযোগী করে তুলবে। এ মডেলের বাস্তবায়ন হলে অন্যান্য স্টেকহোল্ডার সহজেই সামুদ্রিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে পারবেন এবং পারস্পরিক বিনিময়ের মাধ্যমে গবেষণার বিষয়গুলো আরও সহজভাবে তুলে ধরা সম্ভব। বলা যায়, জাতিসংঘের মহাসাগর দশকের লক্ষ্য অর্জনে হাইড্রোগ্রাফি একটি অন্যতম বৈজ্ঞানিক প্ল্যাটফরম হিসাবে অবদান রাখবে।

মানব সৃষ্ট জলবায়ু সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য একুশ শতকই হবে সর্বশেষ সুযোগ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইকোসিস্টেম হচ্ছে সমুদ্র, যা ভূ-উপরিভাগের সবচেয়ে বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থিত। সমুদ্রের টেকসই ব্যবহারের বিষয়টি এখন আর বৈজ্ঞানিক গবেষণায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের ধরণির অস্তিত্বের লড়াই। বৈশ্বিক জলবায়ু রক্ষার ক্ষেত্রেও সমুদ্র দশকের কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন, ফলাফল পর্যবেক্ষণ ও নতুন কর্মকৌশল বের করার জন্য বিপুল পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ, তথা বিশ্বের হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিসগুলো এসব তথ্য-উপাত্তের অন্যতম মূল জোগানদাতা। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে হাইড্রোগ্রাফাররা জাতিসংঘের সমুদ্র দশকের প্রতি অবদান রেখে চলেছেন। তবুও, এসব তথ্য-উপাত্তের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও উদ্যোগ গ্রহণ করার অবকাশ রয়েছে। হাইড্রোগ্রাফার ও সমুদ্রবিজ্ঞানীদের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে হাইড্রোগ্রাফিক কার্যক্রমকে ভিত্তি করে বাংলাদেশ জাতিসংঘের মহাসাগর দশকের মূল উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

মো. মিনারুল হক : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিমরাড) মহাপরিচালক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন