ঋণখেলাপিদের কোনো ছাড় নয়
jugantor
ঋণখেলাপিদের কোনো ছাড় নয়

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

২৩ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্র্যালোচনায় দেখা যায়, ঋণ পুনর্গঠন-পুনঃতফসিল-আংশিক এককালীন পরিশোধে বিশেষ ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও চলতি বছরের শুরু থেকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়। এতে ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব অতিশয় দৃশ্যমান।

৬ জুন ২০২২ প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা; যার মধ্যে খেলাপি ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা বা বিতরণকৃত ঋণের ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি এবং ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। আর তিন মাসে বেড়েছে ১০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।

ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের মতে, যতদিন কর্তৃপক্ষ ঋণ ফেরাতে আন্তরিক না হবেন, ততদিন দেশে খেলাপি ঋণ অধিকমাত্রায় বাড়তেই থাকবে। এ দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা বেশি। তাই বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ কমানো যায়নি। এখন সেই সুবিধাগুলো নেই। ব্যবসায়ীরা আবার সেই সুবিধা চাইলেও এ সুবিধা কোনোভাবেই দেওয়া উচিত নয়।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ০১ শতাংশ। বিগত বছরের ডিসেম্বর শেষে উক্ত ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ২ লাখ ৩৩ হাজার ২৯৭ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ৪৪ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৫ কোটির মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৫৭ হাজার ৮০৩ কোটি (মোট ঋণের ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ)। ২০২১ সালে ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯ লাখ ৭০ হাজার ৪০৫ কোটি ও ৫১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪ হাজার ১৫ কোটি ও ২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা।

মার্চ ২০২২ শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণ ৩৩ হাজার ৪৩৯ কোটি এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো মোট বিতরণ করেছে ৬৩ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণখেলাপির শীর্ষস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। মার্চ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি হয়েছে মোট ঋণের ১৩ হাজার ১২৪ কোটি টাকা বা ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ন্যাশনাল ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি, ১ হাজার ৩৭০ কোটি এবং ২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ গণমাধ্যমে বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঋণের কিস্তিতে সুবিধা (মরিটোরিয়াম) তুলে দেওয়ার পরে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গেছে। কারণ, করোনার দুই বছরে খেলাপি খুব একটা দেখানো যায়নি; যদিও খেলাপি ছিল। আর সবচেয়ে বেশি খেলাপি হলো সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয়। মুষ্টিমেয় কয়েকটি সরকারি ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকের বেশি। ফেরত দেওয়ার চাপ কম থাকায় এবং বিশেষ উপায়ে ম্যানেজ করার সুযোগ বেশি থাকায় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নেয় এসব ব্যাংক থেকে। তারা ঋণ ফেরত দেয় না। আর ব্যাংকের পর্ষদ এসব ঋণ প্রদানে প্রশ্রয় দেয়।

অথচ পর্ষদের কাজ হলো এ ধরনের ঋণ দিতে খবরদারি করা এবং ব্যাংকের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকগুলো পর্ষদের অনুমতি ছাড়া বড় বড় ঋণ দিচ্ছে আর খেলাপি হচ্ছে, যার মূলে রয়েছে ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাব। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খেলাপিকে ব্যবসায়িক মডেলে রূপ দিচ্ছেন কিছু উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। তারা ঋণ পরিশোধ না করে মামলার দিকে যাচ্ছেন, কালক্ষেপণ করছেন; ব্যাংকও ঋণ অবলোপন করছে। আর টাকা ভাগাভাগির নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে বেড়ে যাচ্ছে প্রভিশন ঘাটতিও। ব্যাংকগুলো তাদের আয় দিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, মার্চ শেষে আট ব্যাংক তাদের আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি দুর্বল হয়ে আসছে।

ঘাটতির শীর্ষে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৮ হাজার ১৩৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১০৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৩ হাজার ২২৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১১১ কোটি ১০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩৩১ কোটি ২৩ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৪৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ২৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

গত ২৪ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, দুর্নীতির দায়ে সাতটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রায় ডুবতে বসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিতরণকৃত ঋণের সর্বনিম্ন ৪২ থেকে সর্বোচ্চ ৯৬ শতাংশই খেলাপি। এছাড়াও আরও ৯টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) ঋণস্থিতি ছিল ১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

একইভাবে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ঋণস্থিতি ৯৬৯ কোটির মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৮৭১ কোটি ৭২ লাখ টাকা (প্রায় ৯০ শতাংশ), এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ১ হাজার ৯২৮ কোটি টাকায় খেলাপি হয়েছে ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা (৮৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ), ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ৮৯৮ কোটির মধ্যে ৭৪২ কোটি টাকা (৮২ দশমিক ৬৪ শতাংশ), ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকার মধ্যে ৩ হাজার ২১০ কোটি (৭৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ৪৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং উত্তরা ফাইন্যান্সের ২ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার মধ্যে ৪১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের লুটপাট এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিও বাংলাদেশে ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অর্থনীতিবিদরা এমন করুণ পরিস্থিতির জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক যোগসাজশে ঋণ বিতরণকে দায়ী করার পাশাপাশি পরিচালক এবং শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে অভিযুক্ত করেছেন। এছাড়া সার্বিকভাবে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা ও আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংককে উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদও দৃশ্যমান করার পরামর্শ দিয়েছেন।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের মতে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমাতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করে সুশাসন বাড়িয়ে প্রতিটি ঋণ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ঋণের মান বাড়াতে হবে। ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের শাস্তির দৃশ্যমানতা ও স্বচ্ছতাই ঋণখেলাপি হ্রাসের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে বলে তাদের মতামতে উঠে এসেছে।

তারা আরও বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন মাস অন্তর খেলাপি ঋণের যে হিসাব তৈরি করে, তাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। এর সঙ্গে অবলোপন করা টাকা যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। এছাড়া পুনঃতফশিল ও পুনর্গঠনে আছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। এর বাইরেও আছে লাখ কোটি টাকার মতো মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ) ঋণ, যেগুলো খেলাপির পূর্ব ধাপে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় খেলাপি ঋণের সুদ মওকুফের দৃশ্যাদৃশ্য সমগ্র জাতিকে হতাশাগ্রস্ত-হতবাক করেছে। ৩১ মার্চ ২০২২ গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিভিন্ন ব্যাংক ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৩ হাজার ১৬৬ কোটি ১২ লাখ টাকা সুদ মওকুফ করেছে; যার মধ্যে সরকারি ব্যাংকে ১৪ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং বেসরকারি ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে সুদ মওকুফ করা হয় যথাক্রমে ১ হাজার ৩২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ৯৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, ১ হাজার ২৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, ১ হাজার ৩৮০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ৯৬৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ১ হাজার ৯০০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২ হাজার ২৩৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা, ৩ হাজার ৬৩৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ৪ হাজার ৯২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ও ৪ হাজার ৮৭৭ কোটি ২১ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় ৯০ শতাংশ সাধারণ গ্রাহক হলেও ১০ শতাংশ শেয়ারধারীদের দাপটই সব সময় পরিলক্ষিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকাও ফেরত পান না। সুদ মওকুফ সুবিধার কারণে ব্যাংকের আয় ও আমানতকারীদের সুদ কমে যায়।

এ কারণে লভ্যাংশ কমে এবং সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সুদ মওকুফের সুবিধা খুব বেশি পান না। সব সময় বড়-ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরাই বেশি সুদ মওকুফের সুবিধা পেয়ে থাকেন। প্রাসঙ্গিকতায় অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘সুদ মওকুফ ও খেলাপিদের ছাড় দিয়ে আদায় বেড়েছে বা খেলাপি কমেছে, এমন নজির নেই। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় কী শাস্তি দেওয়া যায় তা বের করতে হবে। তাদের জামানত বিক্রি করে ঋণ আদায় করতে হবে।’

মূলত দেশের দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী-ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীসহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বিনিয়োগের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুযোগের অভাবে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখেন। সুদ-মুনাফার হার বিগত কয়েক বছরে অভাবনীয় নিম্নস্তরে নেমে আসার পরও অনন্যোপায় হয়ে ব্যাংকে জমাকৃত অত্যন্ত কষ্টার্জিত এ সঞ্চয় দুঃসময়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রধান বাহন হিসাবে কার্যকর। এসব সঞ্চিত আমানত নানামুখী অপকৌশল-প্রতারণা-জালিয়াতি-অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ যোগসাজশে বিত্তশালীদের ঋণ হিসাবে অবাধে বিতরণ করা হয়। ঋণ গ্রহীতা কদর্য সুকৌশলে অবাঞ্ছিত-অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত পন্থা অবলম্বনে বিভিন্ন সরকারি খাস-বেসরকারি জমি বা অন্যান্য জাল দলিলাদি বন্ধক রেখে গর্হিত অপকর্মও সম্পন্ন করছে।

এসব পাপাচারে লিপ্ত নষ্ট ব্যক্তিদের পাপ কোনোভাবেই মোচন হতে পারে না। ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না’ বাণীটি পরিপূর্ণ অবজ্ঞায় কুচক্র-কুকীর্তির অভয়ারণ্যে পরিণত করে দেশের আর্থিক খাতকে শুধু দুর্বল করা নয়; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অদম্য উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় প্রবল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সমূহ আশঙ্কাও সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখ্য, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের অসহনীয় দৃশ্যপট অবলোকনে দেশ ধ্বংসের গভীর চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশবাসীর অজানা আশঙ্কা-আতঙ্কে উদ্বিগ্ন হওয়া মোটেও অযৌক্তিক-অমূলক নয়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ঋণখেলাপিদের কোনো ছাড় নয়

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
২৩ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্র্যালোচনায় দেখা যায়, ঋণ পুনর্গঠন-পুনঃতফসিল-আংশিক এককালীন পরিশোধে বিশেষ ছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার পরও চলতি বছরের শুরু থেকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতা হ্রাসের পাশাপাশি বেড়ে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়। এতে ব্যাংকিং খাতে নেতিবাচক প্রভাব অতিশয় দৃশ্যমান।

৬ জুন ২০২২ প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৫৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা; যার মধ্যে খেলাপি ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা বা বিতরণকৃত ঋণের ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এর পরিমাণ ছিল ৯৫ হাজার ৮৫ কোটি এবং ডিসেম্বর শেষে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৮ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। আর তিন মাসে বেড়েছে ১০ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা।

ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের মতে, যতদিন কর্তৃপক্ষ ঋণ ফেরাতে আন্তরিক না হবেন, ততদিন দেশে খেলাপি ঋণ অধিকমাত্রায় বাড়তেই থাকবে। এ দেশে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংখ্যা বেশি। তাই বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ কমানো যায়নি। এখন সেই সুবিধাগুলো নেই। ব্যবসায়ীরা আবার সেই সুবিধা চাইলেও এ সুবিধা কোনোভাবেই দেওয়া উচিত নয়।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালের প্রথম প্রান্তিক শেষে রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মোট ঋণ বিতরণ করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪৮ হাজার ৭৭৩ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা মোট ঋণের ২০ দশমিক ০১ শতাংশ। বিগত বছরের ডিসেম্বর শেষে উক্ত ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ২ লাখ ৩৩ হাজার ২৯৭ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে খেলাপি ছিল ৪৪ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা।

চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯৯৫ কোটির মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৫৭ হাজার ৮০৩ কোটি (মোট ঋণের ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ)। ২০২১ সালে ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৯ লাখ ৭০ হাজার ৪০৫ কোটি ও ৫১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংক ও বিদেশি ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪ হাজার ১৫ কোটি ও ২ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা।

মার্চ ২০২২ শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ বিতরণ ৩৩ হাজার ৪৩৯ কোটি এবং বিদেশি ব্যাংকগুলো মোট বিতরণ করেছে ৬৩ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ঋণখেলাপির শীর্ষস্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক। মার্চ শেষে ব্যাংকটির খেলাপি হয়েছে মোট ঋণের ১৩ হাজার ১২৪ কোটি টাকা বা ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ। বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ন্যাশনাল ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ যথাক্রমে ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি, ১ হাজার ৩৭০ কোটি এবং ২ হাজার ৬৭৭ কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ গণমাধ্যমে বলেন, ‘চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ঋণের কিস্তিতে সুবিধা (মরিটোরিয়াম) তুলে দেওয়ার পরে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে গেছে। কারণ, করোনার দুই বছরে খেলাপি খুব একটা দেখানো যায়নি; যদিও খেলাপি ছিল। আর সবচেয়ে বেশি খেলাপি হলো সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোয়। মুষ্টিমেয় কয়েকটি সরকারি ব্যাংকে খেলাপির পরিমাণ মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকের বেশি। ফেরত দেওয়ার চাপ কম থাকায় এবং বিশেষ উপায়ে ম্যানেজ করার সুযোগ বেশি থাকায় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নেয় এসব ব্যাংক থেকে। তারা ঋণ ফেরত দেয় না। আর ব্যাংকের পর্ষদ এসব ঋণ প্রদানে প্রশ্রয় দেয়।

অথচ পর্ষদের কাজ হলো এ ধরনের ঋণ দিতে খবরদারি করা এবং ব্যাংকের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করা।’ তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংকগুলো পর্ষদের অনুমতি ছাড়া বড় বড় ঋণ দিচ্ছে আর খেলাপি হচ্ছে, যার মূলে রয়েছে ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের অভাব। আর সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খেলাপিকে ব্যবসায়িক মডেলে রূপ দিচ্ছেন কিছু উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। তারা ঋণ পরিশোধ না করে মামলার দিকে যাচ্ছেন, কালক্ষেপণ করছেন; ব্যাংকও ঋণ অবলোপন করছে। আর টাকা ভাগাভাগির নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।’

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণে বেড়ে যাচ্ছে প্রভিশন ঘাটতিও। ব্যাংকগুলো তাদের আয় দিয়ে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, মার্চ শেষে আট ব্যাংক তাদের আয় দিয়ে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে পারেনি। ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি দুর্বল হয়ে আসছে।

ঘাটতির শীর্ষে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৮ হাজার ১৩৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, বেসিক ব্যাংকের ৪ হাজার ১০৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, অগ্রণী ব্যাংকের ৩ হাজার ২২৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং রূপালী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৭০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ১১১ কোটি ১০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩৩১ কোটি ২৩ লাখ টাকা, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৪৬ কোটি ৩১ লাখ টাকা ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ২৩৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

গত ২৪ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের অপর প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, দুর্নীতির দায়ে সাতটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান প্রায় ডুবতে বসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিতরণকৃত ঋণের সর্বনিম্ন ৪২ থেকে সর্বোচ্চ ৯৬ শতাংশই খেলাপি। এছাড়াও আরও ৯টি প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানির (বিআইএফসি) ঋণস্থিতি ছিল ১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৯৫ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

একইভাবে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ঋণস্থিতি ৯৬৯ কোটির মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৮৭১ কোটি ৭২ লাখ টাকা (প্রায় ৯০ শতাংশ), এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের ১ হাজার ৯২৮ কোটি টাকায় খেলাপি হয়েছে ১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা (৮৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ), ফার্স্ট ফাইন্যান্সের ৮৯৮ কোটির মধ্যে ৭৪২ কোটি টাকা (৮২ দশমিক ৬৪ শতাংশ), ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের ৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকার মধ্যে ৩ হাজার ২১০ কোটি (৭৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের ১ হাজার ৩৩২ কোটি টাকার মধ্যে খেলাপি ৪৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং উত্তরা ফাইন্যান্সের ২ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার মধ্যে ৪১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের লুটপাট এবং অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিও বাংলাদেশে ব্যাংকের বিভিন্ন পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অর্থনীতিবিদরা এমন করুণ পরিস্থিতির জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক যোগসাজশে ঋণ বিতরণকে দায়ী করার পাশাপাশি পরিচালক এবং শীর্ষ ব্যবস্থাপনাকে অভিযুক্ত করেছেন। এছাড়া সার্বিকভাবে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা ও আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংককে উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদও দৃশ্যমান করার পরামর্শ দিয়েছেন।

ব্যাংকসংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনের মতে, খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি কমাতে হলে দুর্নীতি বন্ধ করে সুশাসন বাড়িয়ে প্রতিটি ঋণ যথাযথভাবে যাচাই-বাছাইয়ে ঋণ প্রদানের মাধ্যমে ঋণের মান বাড়াতে হবে। ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের শাস্তির দৃশ্যমানতা ও স্বচ্ছতাই ঋণখেলাপি হ্রাসের সহায়ক শক্তি হিসাবে কাজ করবে বলে তাদের মতামতে উঠে এসেছে।

তারা আরও বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তিন মাস অন্তর খেলাপি ঋণের যে হিসাব তৈরি করে, তাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। এর সঙ্গে অবলোপন করা টাকা যোগ করলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে। এছাড়া পুনঃতফশিল ও পুনর্গঠনে আছে বিপুল অঙ্কের ঋণ। এর বাইরেও আছে লাখ কোটি টাকার মতো মেয়াদোত্তীর্ণ ও স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট (এসএমএ) ঋণ, যেগুলো খেলাপির পূর্ব ধাপে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় খেলাপি ঋণের সুদ মওকুফের দৃশ্যাদৃশ্য সমগ্র জাতিকে হতাশাগ্রস্ত-হতবাক করেছে। ৩১ মার্চ ২০২২ গণমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিভিন্ন ব্যাংক ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ২৩ হাজার ১৬৬ কোটি ১২ লাখ টাকা সুদ মওকুফ করেছে; যার মধ্যে সরকারি ব্যাংকে ১৪ হাজার ৫৭৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং বেসরকারি ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৮৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে সুদ মওকুফ করা হয় যথাক্রমে ১ হাজার ৩২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, ৯৬৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা, ১ হাজার ২৪৭ কোটি ৪৭ লাখ টাকা, ১ হাজার ৩৮০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ৯৬৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, ১ হাজার ৯০০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, ২ হাজার ২৩৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা, ৩ হাজার ৬৩৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, ৪ হাজার ৯২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ও ৪ হাজার ৮৭৭ কোটি ২১ লাখ টাকা।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ব্যাংকের মোট আমানতের প্রায় ৯০ শতাংশ সাধারণ গ্রাহক হলেও ১০ শতাংশ শেয়ারধারীদের দাপটই সব সময় পরিলক্ষিত হয়। ক্ষেত্রবিশেষে আমানতকারীরা তাদের জমানো টাকাও ফেরত পান না। সুদ মওকুফ সুবিধার কারণে ব্যাংকের আয় ও আমানতকারীদের সুদ কমে যায়।

এ কারণে লভ্যাংশ কমে এবং সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। তবে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সুদ মওকুফের সুবিধা খুব বেশি পান না। সব সময় বড়-ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরাই বেশি সুদ মওকুফের সুবিধা পেয়ে থাকেন। প্রাসঙ্গিকতায় অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘সুদ মওকুফ ও খেলাপিদের ছাড় দিয়ে আদায় বেড়েছে বা খেলাপি কমেছে, এমন নজির নেই। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় কী শাস্তি দেওয়া যায় তা বের করতে হবে। তাদের জামানত বিক্রি করে ঋণ আদায় করতে হবে।’

মূলত দেশের দরিদ্র-নিম্নমধ্যবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত কৃষক-শ্রমিক-পেশাজীবী-ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীসহ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী বিনিয়োগের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও সুযোগের অভাবে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসাবে ব্যাংকে টাকা গচ্ছিত রাখেন। সুদ-মুনাফার হার বিগত কয়েক বছরে অভাবনীয় নিম্নস্তরে নেমে আসার পরও অনন্যোপায় হয়ে ব্যাংকে জমাকৃত অত্যন্ত কষ্টার্জিত এ সঞ্চয় দুঃসময়ে জীবন-জীবিকা নির্বাহের প্রধান বাহন হিসাবে কার্যকর। এসব সঞ্চিত আমানত নানামুখী অপকৌশল-প্রতারণা-জালিয়াতি-অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে অবৈধ যোগসাজশে বিত্তশালীদের ঋণ হিসাবে অবাধে বিতরণ করা হয়। ঋণ গ্রহীতা কদর্য সুকৌশলে অবাঞ্ছিত-অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত পন্থা অবলম্বনে বিভিন্ন সরকারি খাস-বেসরকারি জমি বা অন্যান্য জাল দলিলাদি বন্ধক রেখে গর্হিত অপকর্মও সম্পন্ন করছে।

এসব পাপাচারে লিপ্ত নষ্ট ব্যক্তিদের পাপ কোনোভাবেই মোচন হতে পারে না। ‘পাপ বাপকেও ছাড়ে না’ বাণীটি পরিপূর্ণ অবজ্ঞায় কুচক্র-কুকীর্তির অভয়ারণ্যে পরিণত করে দেশের আর্থিক খাতকে শুধু দুর্বল করা নয়; জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অদম্য উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় প্রবল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সমূহ আশঙ্কাও সৃষ্টি হচ্ছে। উল্লেখ্য, ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের অসহনীয় দৃশ্যপট অবলোকনে দেশ ধ্বংসের গভীর চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে দেশবাসীর অজানা আশঙ্কা-আতঙ্কে উদ্বিগ্ন হওয়া মোটেও অযৌক্তিক-অমূলক নয়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন