আবারও সান্ধ্যকোর্স!
jugantor
আবারও সান্ধ্যকোর্স!

  আবু তাহের খান  

২৫ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বিশ্ববিদ্যালয়টির সান্ধ্যকোর্সের বিষয়ে এ মর্মে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, ‘অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারি আর রাতে বেসরকারি চিত্র ধারণ করেছে।

..এক শ্রেণির শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন, যেটি শিক্ষার সার্বিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে।..এসব ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষার্থীরা কতটুকু লাভবান হচ্ছেন, এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলেও তারা ঠিকই লাভবান হচ্ছেন।’

তার এ বক্তব্যের তাৎক্ষণিক ফলোআপ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর মাত্র দুদিন পর ১১ ডিসেম্বর দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সান্ধ্যকোর্স বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করে।

এ বিষয়ে ওইদিনই গণমাধ্যমকে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব বিষয় না মানে, তাহলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউজিসি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হবে।’

উপরোক্ত বিষয়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই আকাঙ্ক্ষিত ছিল এবং দেশের সাধারণ মানুষ যাদের করের পয়সায় এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে তারাও আশা করেছিল, সরকারি এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন হয়তো সান্ধ্যকোর্স ক্রমান্বয়ে গুটিয়ে আনা হবে। কিন্তু তা গুটিয়ে আনা তো দূরের কথা, সম্প্রতি নতুন নীতিমালা ও বিধি তৈরির মাধ্যমে সেটিকে আরও পাকাপোক্ত করে তোলা হয়েছে।

তাহলে কি মহামান্য রাষ্ট্রপতির পর্যবেক্ষণ, ইউজিসির নির্দেশনা, সাধারণ ন্যায় ও যুক্তিবোধ ইত্যাদি সবই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং লাভালাভের কাছে হেরে গেল? তন্মধ্যে ন্যায় ও যুক্তিবোধের কথা না হয় বাদই দিলাম। কারণ এসবের চর্চা এখন শিক্ষিতজনের মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যে যত বেশি এগিয়ে, তার মধ্যে এ বোধহীনতাও সম্ভবত তত বেশি প্রকট।

অতএব সেদিকে না গিয়ে আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুনের আওতাতেই কি প্রশ্ন রাখা যায়, রাষ্ট্রপতি বা ইউজিসির নির্দেশনাকে তারা অমান্য করছেন কোন অধিকারে? প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণগুলো লঙ্ঘন বা উপেক্ষার এখতিয়ার কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রয়েছে?

চারটি সরকারি পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো বলবেন, ১৯৭২-এর স্বায়ত্তশাসন আদেশের অধিকারবলে এসব বিষয়ে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাদের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, সে এখতিয়ার তাদের নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে অবহেলা ও উপেক্ষা করে, সেসবের প্রতি অমনোযোগী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং সে ক্ষেত্রে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে অসম্পূর্ণ ও অসম্পাদিত রেখে ব্যবসায়ীর মতো আচরণ করার কোনো অধিকার এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের নেই। তাদের কারোর নিয়োগপত্রেই নিজেদের মূল দায়িত্বকে অসম্পূর্ণ রেখে কোনোরূপ বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগের উল্লেখ নেই, ওই স্বায়ত্তশাসন আদেশেও নয়।

আর এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল আইনেও শিক্ষক কর্তৃক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

উল্লেখ্য, উপরোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উল্লিখিত সান্ধ্যকোর্স পরিপূর্ণভাবেই একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং কোনোভাবেই তা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাহলে যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও ইউজিসির নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে সান্ধ্যকোর্স চালিয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে আবারও সিদ্ধান্ত নিল, সেটি কীভাবে সম্ভব হল? আসলে সরকারি বি

শ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে, যেখানে নিবিষ্টতার সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার চেয়ে অধিক মনোযোগ পাচ্ছে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা অর্জনের প্রয়াস। আর সে ধরনের ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন প্রয়াসের অংশ হিসাবেই পরিচালিত হচ্ছে সান্ধ্যকোর্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সান্ধ্যকোর্স পরিচালনাসংক্রান্ত সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সে ধারারই অংশ।

আসলে ওই আপ্তবাক্যটিই সঠিক যে, পচন মাথা থেকেই শুরু হয়। বাংলাদেশ সমাজের পচনও ওই কথিত জ্ঞানীদের দিয়েই শুরু হয়েছে আরও বহু আগে থেকেই, যা এখন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে মাত্র। এবং সে দুর্গন্ধ এখন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এবং সে দুর্গন্ধ এতটাই উৎকট যে, নিরুপায় হয়ে এসবের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নিয়মিতই নাকে রুমাল গুঁজতে হচ্ছে। শিক্ষকরা, আমরা জানি, সাধারণ মানুষের এসব ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য আপনাদের মোটেও স্পর্শ করে না।

কারণ বৈষয়িকতার সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধের দ্বন্দ্ব মানবসমাজে সেই আদিকাল থেকেই চলে আসছে। ফলে সান্ধ্যকোর্সের মাধ্যমে অর্জিত বিষয়গত সুবিধাদি নিশ্চিত করতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দেবেন-সেটাই স্বাভাবিক এবং তারা তা দিচ্ছেনও।

পরিশেষে তাই বলব, রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও ইউজিসির নির্দেশনাও যেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সান্ধ্যকোর্সের মুনাফা অর্জনের লোভ থেকে বিরত রাখতে পারেনি, সেখানে এ ধরনের টুকটাক লেখালেখিতে ঘটনার তেমন কোনো ইতরবিশেষ হবে বলে মনে হয় না। তারপরও এরূপ মনোকষ্ট থেকে এ আলোকপাত যে, এ সমাজের মানুষ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একসময় সত্যি সত্যি ব্যতিক্রমী সম্মানের চোখে দেখতেন।

ভাবতেন, শত পতনের মধ্যেও অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে তারাই আলোর শেষ শিখাটি জ্বালিয়ে রাখবেন। কিন্তু যখন দেখি, শিক্ষার অতি ম্রিয়মাণ ধারার নিভু নিভু আলোটিকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে সান্ধ্যকোর্সের মতো ক্ষুদ্র স্বার্থটুকুও তারা বিসর্জন দিতে রাজি নন, তখন সত্যি হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিই-বা করার থাকে! কিন্তু সব বুঝেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি মানুষকে কেবল হতাশার দিকেই ঠেলে দেন, তাহলে এ সমাজ টিকবে কেমন করে?

আবু তাহের খান : পরিচালক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনোভেশন সেন্টার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

atkhan56@gmail.com

আবারও সান্ধ্যকোর্স!

 আবু তাহের খান 
২৫ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৯ সালের ৯ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বিশ্ববিদ্যালয়টির সান্ধ্যকোর্সের বিষয়ে এ মর্মে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, ‘অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এখন দিনে সরকারি আর রাতে বেসরকারি চিত্র ধারণ করেছে।

..এক শ্রেণির শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন, যেটি শিক্ষার সার্বিক পরিবেশকে বিঘ্নিত করছে।..এসব ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষার্থীরা কতটুকু লাভবান হচ্ছেন, এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলেও তারা ঠিকই লাভবান হচ্ছেন।’

তার এ বক্তব্যের তাৎক্ষণিক ফলোআপ হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর মাত্র দুদিন পর ১১ ডিসেম্বর দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সান্ধ্যকোর্স বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একটি সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করে।

এ বিষয়ে ওইদিনই গণমাধ্যমকে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘যদি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এসব বিষয় না মানে, তাহলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউজিসি থেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হবে।’

উপরোক্ত বিষয়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই আকাঙ্ক্ষিত ছিল এবং দেশের সাধারণ মানুষ যাদের করের পয়সায় এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলে তারাও আশা করেছিল, সরকারি এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এখন হয়তো সান্ধ্যকোর্স ক্রমান্বয়ে গুটিয়ে আনা হবে। কিন্তু তা গুটিয়ে আনা তো দূরের কথা, সম্প্রতি নতুন নীতিমালা ও বিধি তৈরির মাধ্যমে সেটিকে আরও পাকাপোক্ত করে তোলা হয়েছে।

তাহলে কি মহামান্য রাষ্ট্রপতির পর্যবেক্ষণ, ইউজিসির নির্দেশনা, সাধারণ ন্যায় ও যুক্তিবোধ ইত্যাদি সবই ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ এবং লাভালাভের কাছে হেরে গেল? তন্মধ্যে ন্যায় ও যুক্তিবোধের কথা না হয় বাদই দিলাম। কারণ এসবের চর্চা এখন শিক্ষিতজনের মধ্যে প্রায় নেই বললেই চলে এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় যে যত বেশি এগিয়ে, তার মধ্যে এ বোধহীনতাও সম্ভবত তত বেশি প্রকট।

অতএব সেদিকে না গিয়ে আনুষ্ঠানিক নিয়মকানুনের আওতাতেই কি প্রশ্ন রাখা যায়, রাষ্ট্রপতি বা ইউজিসির নির্দেশনাকে তারা অমান্য করছেন কোন অধিকারে? প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণগুলো লঙ্ঘন বা উপেক্ষার এখতিয়ার কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের রয়েছে?

চারটি সরকারি পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো বলবেন, ১৯৭২-এর স্বায়ত্তশাসন আদেশের অধিকারবলে এসব বিষয়ে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাদের রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, সে এখতিয়ার তাদের নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রমকে অবহেলা ও উপেক্ষা করে, সেসবের প্রতি অমনোযোগী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে এবং সে ক্ষেত্রে নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্বকে অসম্পূর্ণ ও অসম্পাদিত রেখে ব্যবসায়ীর মতো আচরণ করার কোনো অধিকার এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের নেই। তাদের কারোর নিয়োগপত্রেই নিজেদের মূল দায়িত্বকে অসম্পূর্ণ রেখে কোনোরূপ বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগের উল্লেখ নেই, ওই স্বায়ত্তশাসন আদেশেও নয়।

আর এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মূল আইনেও শিক্ষক কর্তৃক বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

উল্লেখ্য, উপরোক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উল্লিখিত সান্ধ্যকোর্স পরিপূর্ণভাবেই একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ এবং কোনোভাবেই তা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাহলে যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও ইউজিসির নির্দেশনাকে উপেক্ষা করে সান্ধ্যকোর্স চালিয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে আবারও সিদ্ধান্ত নিল, সেটি কীভাবে সম্ভব হল? আসলে সরকারি বি

শ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে, যেখানে নিবিষ্টতার সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার চেয়ে অধিক মনোযোগ পাচ্ছে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা অর্জনের প্রয়াস। আর সে ধরনের ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন প্রয়াসের অংশ হিসাবেই পরিচালিত হচ্ছে সান্ধ্যকোর্স। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সান্ধ্যকোর্স পরিচালনাসংক্রান্ত সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সে ধারারই অংশ।

আসলে ওই আপ্তবাক্যটিই সঠিক যে, পচন মাথা থেকেই শুরু হয়। বাংলাদেশ সমাজের পচনও ওই কথিত জ্ঞানীদের দিয়েই শুরু হয়েছে আরও বহু আগে থেকেই, যা এখন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে মাত্র। এবং সে দুর্গন্ধ এখন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যাচ্ছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এবং সে দুর্গন্ধ এতটাই উৎকট যে, নিরুপায় হয়ে এসবের পাশ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নিয়মিতই নাকে রুমাল গুঁজতে হচ্ছে। শিক্ষকরা, আমরা জানি, সাধারণ মানুষের এসব ঘৃণা ও তাচ্ছিল্য আপনাদের মোটেও স্পর্শ করে না।

কারণ বৈষয়িকতার সঙ্গে আত্মমর্যাদাবোধের দ্বন্দ্ব মানবসমাজে সেই আদিকাল থেকেই চলে আসছে। ফলে সান্ধ্যকোর্সের মাধ্যমে অর্জিত বিষয়গত সুবিধাদি নিশ্চিত করতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাদের আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দেবেন-সেটাই স্বাভাবিক এবং তারা তা দিচ্ছেনও।

পরিশেষে তাই বলব, রাষ্ট্রপতির উদ্বেগ ও ইউজিসির নির্দেশনাও যেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সান্ধ্যকোর্সের মুনাফা অর্জনের লোভ থেকে বিরত রাখতে পারেনি, সেখানে এ ধরনের টুকটাক লেখালেখিতে ঘটনার তেমন কোনো ইতরবিশেষ হবে বলে মনে হয় না। তারপরও এরূপ মনোকষ্ট থেকে এ আলোকপাত যে, এ সমাজের মানুষ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একসময় সত্যি সত্যি ব্যতিক্রমী সম্মানের চোখে দেখতেন।

ভাবতেন, শত পতনের মধ্যেও অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে তারাই আলোর শেষ শিখাটি জ্বালিয়ে রাখবেন। কিন্তু যখন দেখি, শিক্ষার অতি ম্রিয়মাণ ধারার নিভু নিভু আলোটিকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে সান্ধ্যকোর্সের মতো ক্ষুদ্র স্বার্থটুকুও তারা বিসর্জন দিতে রাজি নন, তখন সত্যি হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিই-বা করার থাকে! কিন্তু সব বুঝেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যদি মানুষকে কেবল হতাশার দিকেই ঠেলে দেন, তাহলে এ সমাজ টিকবে কেমন করে?

আবু তাহের খান : পরিচালক, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনোভেশন সেন্টার, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

atkhan56@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন