পুতিন কি ন্যাটোকে আক্রমণ করবেন?
jugantor
পুতিন কি ন্যাটোকে আক্রমণ করবেন?

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

২৫ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ন্যাটো, বিশেষ করে এর প্রধান শক্তি আমেরিকা প্রকাশ্যভাবে বলেছে তারা এমন কিছু করতে চায় না, যেটি রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর সরাসরি সংঘাত তৈরি করবে।

ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা সবসময় খেয়াল রেখেছে এমন দূরপাল্লার অস্ত্র ইউক্রেনের হাতে না থাক, যেটির মাধ্যমে তারা রাশিয়ার ভূখণ্ডে আক্রমণ চালাতে পারে।

শুরুর দিক থেকেই ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে দূরপাল্লার মাল্টিপল রকেট লঞ্চার (এমএলআরএস) চেয়ে আসছিল। কিন্তু ইউক্রেনকে তা দিতে রাজি হচ্ছিল না আমেরিকা। কারণ আর্টিলারির (কামান) তুলনায় এগুলোর পাল্লা দীর্ঘ, যার মাধ্যমে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করা সম্ভব। তবে সম্প্রতি আমেরিকা এবং ব্রিটেন ইউক্রেনকে এ অস্ত্র দিতে রাজি হয়েছে, তবে সেটি অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার (৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার)। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমেরিকার দেওয়া রকেট লঞ্চার সিস্টেম থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করবে না এমন গ্যারান্টি তারা দিয়েছে।

ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধে সাহায্য করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জেতানোর ব্যাপারে ফ্রান্স, জার্মানির মতো কোনো কোনো ন্যাটো সদস্যের কিছু দ্বিধা থাকলেও আমেরিকা-ব্রিটেনের মতো দেশের সেই সংশয় একেবারেই নেই। কিন্তু তারাও চাইছে না ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সংঘাত লেগে যাক। এর কারণ ইউক্রেন আগ্রাসনের শুরুতে যৌক্তিকভাবেই বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ইউক্রেনে ন্যাটো সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ মানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া।

সমস্যা হচ্ছে, ইউক্রেন আগ্রাসনের চার মাস পূর্তি সামনে রেখে এ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং সেটা হতে পারে ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি।

কেন নতুন করে সংকট এভাবে বাড়ছে সেটি বোঝার জন্য রাশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান বোঝা জরুরি। যে কেউ রাশিয়ার মানচিত্র ইন্টারনেটে সার্চ করলে দেখতে পাবেন, রাশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডটি একসঙ্গেই আছে। কিন্তু এর খুব ছোট একটি ভূখণ্ড (ছিটমহল) আছে মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ খানিকটা দূরে।

এ ছিটমহলের নাম কালিনিনগ্রাদ। এর দুই দিকে লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড আর আরেক দিকে বাল্টিক সাগর। মাত্র ২২৩ কিলোমিটার আয়তনের এ জায়গাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল জার্মানির অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া এ জায়গাটি দখল করে এবং সেখানে বসবাসরত কয়েক লাখ জার্মানকে বল প্রয়োগ করে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। এরপর জায়গাটি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কালিনিনগ্রাদ সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের সামরিক স্থাপনার জায়গা। রাশিয়ার বাল্টিক নৌবহর এ কালিনিনগ্রাদেই থাকে। এখানে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস ৩০০ এবং এস ৪০০ মোতায়েন করা আছে, যেগুলো সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে সক্ষম। কয়েক বছর আগে রাশিয়া কালিনিনগ্রাদে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম মাঝারি পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ইস্কান্দার’ মোতায়েন করেছে। ১০ লাখ বাসিন্দার এ জায়গাটিতে ২ লাখই হচ্ছে সৈন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, এটি মোটামুটি নিশ্চিত যে সেখানে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করেছে বেশ আগেই।

এ ভূখণ্ডটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে রাশিয়াকে যেমন অসাধারণ সুবিধা দেয়, তেমনি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না থাকার কারণে এটি একটি দুর্বলতার জায়গাও। অতি সম্প্রতি একটি খুব বড় সংকট তৈরি হয়েছে কালিনিনগ্রাদকে নিয়ে। যেহেতু কালিনিনগ্রাদ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই এ জায়গায় সরবরাহ পৌঁছানো দুভাবে সম্ভব। বাল্টিক সাগরের মধ্য দিয়ে এবং লিথুয়ানিয়ার ওপর দিয়ে রেল করিডরের মাধ্যমে। ইউক্রেন আগ্রাসন শুরু করার পরও রাশিয়া লিথুয়ানিয়ার উপর দিয়ে তার সরবরাহ পাঠিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিন আগে লিথুয়ানিয়া ঘোষণা করেছে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা যেসব পণ্যে পড়েছে, সেগুলো তার ভূমির উপর দিয়ে পরিবহণ করতে লিথুয়ানিয়া দেবে না। এতে দেখা গেছে কয়লা, স্টিল, নির্মাণসামগ্রীসহ আরও বেশ কিছু পণ্য এ রুটে পরিবহণ করা যাবে না, যাতে পরিমাণের দিক থেকে পণ্য অর্ধেক হয়ে যাবে। অর্থাৎ লিথুয়ানিয়া সব পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়নি, এখনো লিথুয়ানিয়ার উপর দিয়ে ট্রেনে বেশকিছু পণ্য পরিবহণ হতে পারছে।

বলা বাহুল্য, লিথুয়ানিয়ার এ সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছে। ক্রেমলিন বলছে, লিথুয়ানিয়ার এ সিদ্ধান্ত ‘নজিরবিহীন’ ও ‘বেআইনি।’ তারা বলছে, এটি শত্রুতামূলক আচরণ এবং লিথুয়ানিয়াকে অবশ্যই এ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ‘কালিনিনগ্রাদ ও রুশ ফেডারেশনের বাকি অংশের সঙ্গে মালবাহী রেল চলাচল সম্পূর্ণভাবে শুরু করা না হলে জাতীয় স্বার্থরক্ষার জন্য রাশিয়ার পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার রয়েছে।’ লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েলিয়াস ল্যান্ডসবার্গিস বলেছেন, ‘এখানে লিথুয়ানিয়া নিজেরা কিছু করছে না। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যা ১৭ জুন থেকে কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে এ কমিশনের গাইডলাইন অনুসারেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে’। অর্থাৎ এটি স্পষ্ট, এটি লিথুয়ানিয়ার একার সিদ্ধান্ত নয়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সামষ্টিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

লিথুয়ানিয়া যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর রাশিয়ার সঙ্গে লিথুয়ানিয়ার চুক্তিতে কালিনিনগ্রাদের স্বার্থরক্ষার যে শর্ত ছিল, তার কিছুটা বরখেলাপ নিশ্চয়ই বলা যায়; কিন্তু পারমাণবিক বোমা হস্তান্তর করার শর্তে ইউক্রেনকে কোনোভাবে সামরিক আক্রমণ তো দূরে থাকুক, অর্থনৈতিক তৈরি করবে না এমন গ্যারান্টি দেওয়া রাশিয়া (বুদাপেস্ট মেমোরেন্ডাম) যখন ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন চালায়, তখন রাশিয়ার মুখে আইনের কথা শোভা পায় কিনা সেই প্রশ্ন খুব শক্তভাবেই থাকে।

যাই হোক, এখন প্রশ্ন আসছে সার্বিক পরিস্থিতিতে রাশিয়া কী করবে? দেশ হিসাবে লিথুয়ানিয়ার একটি খুব বড় কৌশলগত দুর্বলতা আছে। কালিনিনগ্রাদ ও বেলারুশের মাঝে পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়ার সীমান্তের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার একটি সমভূমি এলাকা আছে। একে বলা হয় সুওয়ালকি গ্যাপ। অর্থাৎ এ স্থানটি দখল করে কালিনিনগ্রাদ ও বেলারুশকে যদি সংযুক্ত করে দেওয়া যায়, তাহলে তিন বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া ও লাতভিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর অন্য সদস্য দেশের স্থল সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এরপর সেসব দেশে প্রবল শক্তিতে আগ্রাসন চালিয়ে দখল করে নেওয়া খুব কঠিন কাজ রাশিয়ার জন্য হওয়ার কথা নয়।

অবশ্য এ কাজটি এত সহজে আবার করে ফেলা যাবে না। লিথুয়ানিয়াসহ বাকি দুই বাল্টিক রাষ্ট্র ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটো সদস্য হওয়ার কারণে লিথুয়ানিয়ার ওপরে সামরিক আক্রমণ হল ন্যাটোর ওপর আক্রমণ। ন্যাটো চুক্তির আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, তখন আর সব ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। লিথুয়ানিয়া যদি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তাহলে রাশিয়া কি বল প্রয়োগ করবে? প্রাথমিকভাবে সুওয়ালকি গ্যাপ দখল করে শুধু লিথুয়ানিয়া কেন, পুরো বাল্টিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়া সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এ তিনটি দেশের প্রতিটিতে ন্যাটোর সৈন্য এক থেকে দেড় হাজার। দেশগুলোর নিজেদের সামরিক শক্তিও খুব বেশি নয়। কালিনিনগ্রাদেই আছে ২ লাখ রাশিয়ান সৈন্য এবং প্রচণ্ড ভারী অস্ত্র। ইউক্রেন সংকটের সময় আমরা দেখেছি বেলারুশ মূলত ভ্লাদিমির পুতিনের একটি পাপেট স্টেট। অর্থাৎ সেদিক থেকেও সৈন্যদের কালিনিনগ্রাদের দিকে অগ্রসর হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।

এ সংকটের আরেকটি দিক দেখা খুব জরুরি। লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে সীমান্ত আছে পোল্যান্ডের, যেটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য। জরুরি তথ্য হচ্ছে ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন আগ্রাসন শুরু করার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দেশগুলোর একটি পোল্যান্ড। লিথুয়ানিয়া আক্রান্ত হলে পোল্যান্ড মুহূর্তের মধ্যে সে যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে এ আশঙ্কা প্রবল। আর রাশিয়ার সঙ্গে তুলনীয় না হলেও সমর শক্তির দিক থেকে পোল্যান্ড অনেক শক্তিশালী একটি দেশ।

সার্বিক পরিস্থিতি ভীষণ জটিল। ইউক্রেন আগ্রাসন পুতিনের পরিকল্পনা মতো চলছে না। সীমিত কিছু লক্ষ্য রাশিয়া অর্জন করতে পারবে এটি মনে হচ্ছে; কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ সময় লাগছে এবং দিতে হচ্ছে চড়া মূল্য। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া লিথুয়ানিয়ার ওপর সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাববে কি? তেমন কিছু করতে যাওয়া মানেই ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো। ইউক্রেনে ন্যাটো এক ধরনের প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে আছে রাশিয়ার সঙ্গে, এটি বলাই যায়। সেই প্রক্সি যুদ্ধ বাদ দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি কি নিতে যাচ্ছেন পুতিন? এর মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাষ্যমতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

পুতিন কি ন্যাটোকে আক্রমণ করবেন?

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
২৫ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ন্যাটো, বিশেষ করে এর প্রধান শক্তি আমেরিকা প্রকাশ্যভাবে বলেছে তারা এমন কিছু করতে চায় না, যেটি রাশিয়ার সঙ্গে ন্যাটোর সরাসরি সংঘাত তৈরি করবে।

ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকা সবসময় খেয়াল রেখেছে এমন দূরপাল্লার অস্ত্র ইউক্রেনের হাতে না থাক, যেটির মাধ্যমে তারা রাশিয়ার ভূখণ্ডে আক্রমণ চালাতে পারে।

শুরুর দিক থেকেই ইউক্রেন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে দূরপাল্লার মাল্টিপল রকেট লঞ্চার (এমএলআরএস) চেয়ে আসছিল। কিন্তু ইউক্রেনকে তা দিতে রাজি হচ্ছিল না আমেরিকা। কারণ আর্টিলারির (কামান) তুলনায় এগুলোর পাল্লা দীর্ঘ, যার মাধ্যমে রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করা সম্ভব। তবে সম্প্রতি আমেরিকা এবং ব্রিটেন ইউক্রেনকে এ অস্ত্র দিতে রাজি হয়েছে, তবে সেটি অপেক্ষাকৃত কম পাল্লার (৮০ থেকে ১০০ কিলোমিটার)। শুধু তা-ই নয়, আমেরিকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আমেরিকার দেওয়া রকেট লঞ্চার সিস্টেম থেকে ইউক্রেন রাশিয়ার অভ্যন্তরে আক্রমণ করবে না এমন গ্যারান্টি তারা দিয়েছে।

ইউক্রেনকে অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধে সাহায্য করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে জেতানোর ব্যাপারে ফ্রান্স, জার্মানির মতো কোনো কোনো ন্যাটো সদস্যের কিছু দ্বিধা থাকলেও আমেরিকা-ব্রিটেনের মতো দেশের সেই সংশয় একেবারেই নেই। কিন্তু তারাও চাইছে না ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার সরাসরি সংঘাত লেগে যাক। এর কারণ ইউক্রেন আগ্রাসনের শুরুতে যৌক্তিকভাবেই বলেছিলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। ইউক্রেনে ন্যাটো সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাবকে সরাসরি নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, ন্যাটো ও রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ মানে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া।

সমস্যা হচ্ছে, ইউক্রেন আগ্রাসনের চার মাস পূর্তি সামনে রেখে এ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে এবং সেটা হতে পারে ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি।

কেন নতুন করে সংকট এভাবে বাড়ছে সেটি বোঝার জন্য রাশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান বোঝা জরুরি। যে কেউ রাশিয়ার মানচিত্র ইন্টারনেটে সার্চ করলে দেখতে পাবেন, রাশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডটি একসঙ্গেই আছে। কিন্তু এর খুব ছোট একটি ভূখণ্ড (ছিটমহল) আছে মূল ভূখণ্ড থেকে বেশ খানিকটা দূরে।

এ ছিটমহলের নাম কালিনিনগ্রাদ। এর দুই দিকে লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড আর আরেক দিকে বাল্টিক সাগর। মাত্র ২২৩ কিলোমিটার আয়তনের এ জায়গাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছিল জার্মানির অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়া এ জায়গাটি দখল করে এবং সেখানে বসবাসরত কয়েক লাখ জার্মানকে বল প্রয়োগ করে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। এরপর জায়গাটি রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কালিনিনগ্রাদ সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘনত্বের সামরিক স্থাপনার জায়গা। রাশিয়ার বাল্টিক নৌবহর এ কালিনিনগ্রাদেই থাকে। এখানে রাশিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস ৩০০ এবং এস ৪০০ মোতায়েন করা আছে, যেগুলো সর্বাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধে সক্ষম। কয়েক বছর আগে রাশিয়া কালিনিনগ্রাদে পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম মাঝারি পাল্লার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ‘ইস্কান্দার’ মোতায়েন করেছে। ১০ লাখ বাসিন্দার এ জায়গাটিতে ২ লাখই হচ্ছে সৈন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে, এটি মোটামুটি নিশ্চিত যে সেখানে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করেছে বেশ আগেই।

এ ভূখণ্ডটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে রাশিয়াকে যেমন অসাধারণ সুবিধা দেয়, তেমনি মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না থাকার কারণে এটি একটি দুর্বলতার জায়গাও। অতি সম্প্রতি একটি খুব বড় সংকট তৈরি হয়েছে কালিনিনগ্রাদকে নিয়ে। যেহেতু কালিনিনগ্রাদ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, তাই এ জায়গায় সরবরাহ পৌঁছানো দুভাবে সম্ভব। বাল্টিক সাগরের মধ্য দিয়ে এবং লিথুয়ানিয়ার ওপর দিয়ে রেল করিডরের মাধ্যমে। ইউক্রেন আগ্রাসন শুরু করার পরও রাশিয়া লিথুয়ানিয়ার উপর দিয়ে তার সরবরাহ পাঠিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক দিন আগে লিথুয়ানিয়া ঘোষণা করেছে, রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা যেসব পণ্যে পড়েছে, সেগুলো তার ভূমির উপর দিয়ে পরিবহণ করতে লিথুয়ানিয়া দেবে না। এতে দেখা গেছে কয়লা, স্টিল, নির্মাণসামগ্রীসহ আরও বেশ কিছু পণ্য এ রুটে পরিবহণ করা যাবে না, যাতে পরিমাণের দিক থেকে পণ্য অর্ধেক হয়ে যাবে। অর্থাৎ লিথুয়ানিয়া সব পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়নি, এখনো লিথুয়ানিয়ার উপর দিয়ে ট্রেনে বেশকিছু পণ্য পরিবহণ হতে পারছে।

বলা বাহুল্য, লিথুয়ানিয়ার এ সিদ্ধান্ত রাশিয়াকে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ করেছে। ক্রেমলিন বলছে, লিথুয়ানিয়ার এ সিদ্ধান্ত ‘নজিরবিহীন’ ও ‘বেআইনি।’ তারা বলছে, এটি শত্রুতামূলক আচরণ এবং লিথুয়ানিয়াকে অবশ্যই এ সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ‘কালিনিনগ্রাদ ও রুশ ফেডারেশনের বাকি অংশের সঙ্গে মালবাহী রেল চলাচল সম্পূর্ণভাবে শুরু করা না হলে জাতীয় স্বার্থরক্ষার জন্য রাশিয়ার পদক্ষেপ গ্রহণের অধিকার রয়েছে।’ লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েলিয়াস ল্যান্ডসবার্গিস বলেছেন, ‘এখানে লিথুয়ানিয়া নিজেরা কিছু করছে না। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যা ১৭ জুন থেকে কার্যকর হওয়া শুরু হয়েছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে এ কমিশনের গাইডলাইন অনুসারেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে’। অর্থাৎ এটি স্পষ্ট, এটি লিথুয়ানিয়ার একার সিদ্ধান্ত নয়, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সামষ্টিকভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

লিথুয়ানিয়া যে পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটাকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর রাশিয়ার সঙ্গে লিথুয়ানিয়ার চুক্তিতে কালিনিনগ্রাদের স্বার্থরক্ষার যে শর্ত ছিল, তার কিছুটা বরখেলাপ নিশ্চয়ই বলা যায়; কিন্তু পারমাণবিক বোমা হস্তান্তর করার শর্তে ইউক্রেনকে কোনোভাবে সামরিক আক্রমণ তো দূরে থাকুক, অর্থনৈতিক তৈরি করবে না এমন গ্যারান্টি দেওয়া রাশিয়া (বুদাপেস্ট মেমোরেন্ডাম) যখন ইউক্রেনে সর্বাত্মক আগ্রাসন চালায়, তখন রাশিয়ার মুখে আইনের কথা শোভা পায় কিনা সেই প্রশ্ন খুব শক্তভাবেই থাকে।

যাই হোক, এখন প্রশ্ন আসছে সার্বিক পরিস্থিতিতে রাশিয়া কী করবে? দেশ হিসাবে লিথুয়ানিয়ার একটি খুব বড় কৌশলগত দুর্বলতা আছে। কালিনিনগ্রাদ ও বেলারুশের মাঝে পোল্যান্ড এবং লিথুয়ানিয়ার সীমান্তের মাত্র ৬৫ কিলোমিটার একটি সমভূমি এলাকা আছে। একে বলা হয় সুওয়ালকি গ্যাপ। অর্থাৎ এ স্থানটি দখল করে কালিনিনগ্রাদ ও বেলারুশকে যদি সংযুক্ত করে দেওয়া যায়, তাহলে তিন বাল্টিক রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া ও লাতভিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ন্যাটোর অন্য সদস্য দেশের স্থল সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, এরপর সেসব দেশে প্রবল শক্তিতে আগ্রাসন চালিয়ে দখল করে নেওয়া খুব কঠিন কাজ রাশিয়ার জন্য হওয়ার কথা নয়।

অবশ্য এ কাজটি এত সহজে আবার করে ফেলা যাবে না। লিথুয়ানিয়াসহ বাকি দুই বাল্টিক রাষ্ট্র ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য। ন্যাটো সদস্য হওয়ার কারণে লিথুয়ানিয়ার ওপরে সামরিক আক্রমণ হল ন্যাটোর ওপর আক্রমণ। ন্যাটো চুক্তির আর্টিকেল ৫ অনুযায়ী, তখন আর সব ন্যাটো রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হবে। লিথুয়ানিয়া যদি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে, তাহলে রাশিয়া কি বল প্রয়োগ করবে? প্রাথমিকভাবে সুওয়ালকি গ্যাপ দখল করে শুধু লিথুয়ানিয়া কেন, পুরো বাল্টিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়া সর্বশক্তিতে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। এ তিনটি দেশের প্রতিটিতে ন্যাটোর সৈন্য এক থেকে দেড় হাজার। দেশগুলোর নিজেদের সামরিক শক্তিও খুব বেশি নয়। কালিনিনগ্রাদেই আছে ২ লাখ রাশিয়ান সৈন্য এবং প্রচণ্ড ভারী অস্ত্র। ইউক্রেন সংকটের সময় আমরা দেখেছি বেলারুশ মূলত ভ্লাদিমির পুতিনের একটি পাপেট স্টেট। অর্থাৎ সেদিক থেকেও সৈন্যদের কালিনিনগ্রাদের দিকে অগ্রসর হওয়ায় কোনো সমস্যা নেই।

এ সংকটের আরেকটি দিক দেখা খুব জরুরি। লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে সীমান্ত আছে পোল্যান্ডের, যেটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য। জরুরি তথ্য হচ্ছে ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন আগ্রাসন শুরু করার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দেশগুলোর একটি পোল্যান্ড। লিথুয়ানিয়া আক্রান্ত হলে পোল্যান্ড মুহূর্তের মধ্যে সে যুদ্ধে জড়িয়ে যাবে এ আশঙ্কা প্রবল। আর রাশিয়ার সঙ্গে তুলনীয় না হলেও সমর শক্তির দিক থেকে পোল্যান্ড অনেক শক্তিশালী একটি দেশ।

সার্বিক পরিস্থিতি ভীষণ জটিল। ইউক্রেন আগ্রাসন পুতিনের পরিকল্পনা মতো চলছে না। সীমিত কিছু লক্ষ্য রাশিয়া অর্জন করতে পারবে এটি মনে হচ্ছে; কিন্তু তার জন্য দীর্ঘ সময় লাগছে এবং দিতে হচ্ছে চড়া মূল্য। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া লিথুয়ানিয়ার ওপর সামরিক পদক্ষেপের কথা ভাববে কি? তেমন কিছু করতে যাওয়া মানেই ন্যাটোর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো। ইউক্রেনে ন্যাটো এক ধরনের প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে আছে রাশিয়ার সঙ্গে, এটি বলাই যায়। সেই প্রক্সি যুদ্ধ বাদ দিয়ে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকি কি নিতে যাচ্ছেন পুতিন? এর মানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাষ্যমতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন