কুসিক নির্বাচন : একটি ছোট্ট বিশ্লেষণ
jugantor
চেতনায় বুদ্বুদ
কুসিক নির্বাচন : একটি ছোট্ট বিশ্লেষণ

  বদিউর রহমান  

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি সরাসরি রাজনীতি কখনো করিনি। এমনকি ছাত্রজীবনেও কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়-ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হইনি। তবে মতাদর্শ তথা জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের বা ছাত্র সংগঠনের সমর্থক ছিলাম। ভোটের সময়ে সে সমর্থন কাজেও লাগাতাম। হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময়ে ছোট ছিলাম, কিছু বুঝিনি, পরে পড়ে জেনেছিলাম। ১৯৫৮-এর আইয়ুব খানের মার্শাল ল’র উত্তাপ আমরা অজপাড়াগ্রামেও টের পেয়েছি। আমরা বলতাম, আমের টরি জামের টরি-আইলোরে ভাই মিলিট্টরি। টরি অর্থ আম বা জামের ছোট্ট মুকুল-অবস্থা। কেন এবং কীভাবে যে ‘ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে’র মতো এ আমের টরি আর জামের টরি চালু হয়েছে-তা আজও জানি না। আমার দেখামতে, এই আইয়ুবের সামরিক আইন বস্তুত প্রকৃত সামরিক আইন ছিল। আমরা ছোটরা দৈনিক সকাল-বিকাল দুবার বাড়ির আঙ্গিনার পাতা পর্যন্ত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতাম, পুকুরপাড়ের গাছ পর্যন্ত সরদারদের চিহ্নিত মতে কেটে ফেলা হয়েছিল, যাতে পাতা পড়ে পুকুরের পানি দূষিত না হয়। আর হাঁস-মুরগির পা ধরে মাথা ঝুলিয়ে বহন তো হতোই না বেতের ভয়ে। মার্শাল ল’র সে রাজনৈতিক উত্তাপ শেষ হতে না হতেই ১৯৬২’র শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে বড়দের সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতেই মিছিলে যোগ দিলাম। তবে ১৯৬৫’র ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে আমরা ভারতের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে সীমান্তের কাছেই চলে গেলাম যেন। তারপর ১৯৬৬’র ৬ দফা, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ, এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরেরগুলো তো অনেকটা বড় হয়েই জেনেশুনে সচেতনভাবে দেখলাম ও জড়ালাম। রাজনৈতিকভাবে ভোটের জন্য প্রথম সরাসরি মিছিলে-মিটিংয়ে ১৯৭০ দিয়েই শুরু। আর আপাতত সর্বশেষ সম্পৃক্ততা ছিল ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এর জাতীয় নির্বাচনে, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্বাচনে। মজার বিষয় হলো-সক্রিয়ভাবে জড়ালেও কারও দলীয়-লেজুড় হইনি কখনো। তবে নির্বাচন নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি কখনো ছিল না, বিচার-বিশ্লেষণে তো অপার আনন্দ রয়েছেই। তারই ফলে কলামেও আমার বিবেচ্য বিষয় থাকে প্রশাসন আর রাজনীতি।

গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন নিয়ে আমার বেশ আগ্রহ ছিল দীর্ঘ ২৯ বছর পর কুমিল্লা পৌরসভা/সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হতে পারবে কিনা ভেবে। কুমিল্লা পৌরসভার বয়স কিন্তু কম নয়, ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৮৪ এবং ১৯৯৪ দুবার আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, সংসদ-সদস্য, পৌরসভায় আওয়ামী লীগের সর্বশেষ চেয়ারম্যান। এবারের নির্বাচিত মেয়র আরফানুল হক রিফাতকে বাহারের শিষ্য বলা হয়। জয়ের পরও বলা হচ্ছে, বাহারের মদদেই রিফাত উতরে গেছেন। ভোটের ব্যবধান মাত্র ৩৪৩ হলেও জিতেছেন তো, নাকি? এ নির্বাচনে প্রথম তিন শীর্ষসংখ্যার ভোটের অধিকারী রিফাত ৫০,৩১০, মনিরুল হক সাক্কু ৪৯, ৯৬৭ এবং নিজাম উদ্দিন কায়সার ২৯,০৯৯ ভোট। কুমিল্লার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের দুনেতার দুগ্রুপ যে নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত থাকত, তাতো কম-বেশি সবাই জানে। বর্তমান সংসদ-সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের এবং প্রয়াত নেতা আফজাল খানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগকে বরং বেকায়দায়ই ফেলত। এদের দুজনের বিবাদের সুযোগ পেত অন্য প্রার্থী। ফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারত। আফজাল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানাও গত নির্বাচনে এ কারণেই হেরেছেন মর্মে বলা হয়ে থাকে। এবারের ভিন্ন স্বাদ হলো, নিজাম উদ্দিন কায়সারও মনিরুল হক সাক্কুর মতো বিএনপির লোক। প্রদত্ত ভোটের শতকরা ভাগে ২০১২ ছিল ৭৩ শতাংশ, ২০১৭ বেড়ে হয় ৮০ শতাংশ; কিন্তু এবার কমে হয়ে পড়ে ৫৯ শতাংশ (৫৮.৭৪)। এবারের নির্বাচনে ১০৫ কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টিতে সাক্কু ভোটে এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ চারটিতে তিনি ৩৪৩ ভোটে পিছিয়ে পড়ে হেরে যান। অর্থাৎ এ চার কেন্দ্রে রিফাত পিছিয়ে থাকা ৬০০ সমান করে আরও ৩৪৩ ভোট বেশি পান। তাহলে মানেটা দাঁড়ায় এ চার কেন্দ্রই জয় নির্ধারক। সাক্কুর অভিযোগ এ চার কেন্দ্রের ফল ঘোষণায় বিলম্বের কারণেই তার পরাজয় হয়েছে। আমরা ইঙ্গিতটা বোধহয় এমন অর্থবহ হিসাবে ধরে নিতে পারি যে, এ চার কেন্দ্রে কোনো না কোনোভাবে তাকে ‘হারিয়ে’ দেওয়া হয়েছে। সাক্কু মামলাও করতে পারেন মর্মে খবর বেরিয়েছে। নিজেদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগিতে হেরেছেন-এ কথা কিন্তু সাক্কু বলছেন না।

সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটা বিষয় বিবেচনায় এসে যায়। এক. নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন শেষতক পরিচালনায় সফল হয়েছেন কিনা। প্রাপ্ত খবরাদি বিশ্লেষণে বোঝা যায়, ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত কমিশন সফলতা দাবি করতে পারে। কিন্তু শেষ চার কেন্দ্রের ভোট গণনায় বিলম্ব অপ্রত্যাশিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনে এক ভোটেও কারও হারজিত হতে পারে। ১৯৬৪ কিংবা ১৯৬৫ (পুরো মনে নেই) ফেনীর জায়লস্কর ইউনিয়নের এক মেম্বার পদে এক ভোটে ইদ্রিছ মওলানা জয়ী হয়েছিলেন। একাধিকবার উভয় প্রার্থীর সামনেই ভোট গণনা হয়েছিল। তখন কথা উঠেছিল, ইদ্রিছ মওলানাকে আল্লাহ নিজে জয়ী করে দিয়েছেন, কেননা তিনি বড় আলেম ছিলেন। কিন্তু এবার কি ভোট পুনঃগণনায় কোনো সুযোগ ছিল? ১০১টি কেন্দ্রে ৬০০ ভোটে এগিয়ে থেকে চারটিতে সাক্কুর ৩৪৩ ভোটে হারার বিষয়টি পুনঃগণনায় সুরাহা হওয়ার সুযোগ নেই বলেই শোনা যাচ্ছে, কেননা ইভিএমে নাকি এখনো এ সুবিধা নেই। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-কিছু ‘অঘটন’ ওই বিলম্বে ঘটেছে কি? সব ভালো যার শেষ ভালো-এ প্রথায় গেলে নির্বাচন কমিশনের শেষটা ভালো হয়নি। ফলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে একটা আস্থার ঘাটতি যাত্রাতেই শুরু হল।

দুই. ইভিএমে প্রদত্ত ভোটের শতাংশ ৫৯-এ নেমে পড়া কী বার্তা দেয়? ব্যালটে ভোট হলে প্রদত্ত ভোটে শতকরা হার হয়তো বাড়ত, কেননা ইভিএমের দেরি হওয়া এখনো সারেনি। এতে করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম বিতর্ক আরেকটু চাঙ্গা হতে পারে। বর্তমান কমিশন ভোটারের আস্থা সৃষ্টির জন্য এমন সাহসী ভূমিকা নিতে পারবে কিনা যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন ব্যালটেই হবে-এটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সম্প্রতি এক কমিশনারের ইভিএম-বিশুদ্ধতা নিয়ে যে অর্বাচীন চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই অনভিপ্রেত। ত্রুটি প্রমাণের জন্যই তার ঘোষিত পুরস্কারের অঙ্কটা যত বড়ই হোক না কেন। প্রধানমন্ত্রী আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের আগাম ঘোষণা বা ইচ্ছা ব্যক্ত করার কারণেই ওই কমিশনারের এমন আগ-বাড়ানো উত্তেজিত সাফাই কিনা আমরা বুঝতে পারছি না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এতদ্বিষয়ে কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবেন বললেও, তা কিন্তু সন্দেহমুক্ত নয় এখনো।

তিন. রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ কিনা। হালে আমরা দলীয় নির্দেশনা অমান্য করার দুঃসাহস দলীয় নেতাদের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। আর এ কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন অনেকে। রাজনৈতিক দল করলে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার সাহস এদের কীভাবে হয়? হয় হয়তো দু’কারণে-ক. দলীয় নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব এখন গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, প্রার্থী নির্বাচনে দল ন্যায়বিচার করতে হয়তো ব্যর্থ হয়। খ. ব্যক্তিপর্যায়ে, ক্ষমতার মোহ কিংবা পদ-পদবি পাওয়ার অদম্য বিবেচনা দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত অমান্য করতে তাকে সাহসী করে, হোক না দল থেকে কারও বহিষ্কার। নারায়ণগঞ্জের তৈমূর আলম খন্দকারই হোক, আর কুমিল্লার সাক্কু কিংবা কায়সারই হোক, সর্বত্রই রাজনীতি এখন নিজের জেদ আর লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে নয়। এই-ই যদি নেতাদের আদর্শ হয়, তাহলে দল আর অটুট থাকবে কী করে? অনেকের এমন ধারণা হয়তো থেকে থাকে যে, জিতে গেলে, এমনকি পরাজিত হলেও, আবার সুযোগ বুঝে দলে ভিড়ে যেতে পারবে। আমরা বলব, রাজনীতির জন্য এটা অশুভ। অবশ্য অতীতে দলত্যাগী বা দলছুটদের পুনর্বাসন এজন্য দায়ী এবং দলীয় নেতৃত্বই এর দায় নিতে বাধ্য। এর অবসান দরকার।

চার. নির্বাচন কমিশন সংসদ-সদস্যকে কুমিল্লা ছাড়ার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তার সুফল কে বা কারা পেল। আমার তো মনে হয়, কোমরের শক্তি যাচাই না করে এমন সিদ্ধান্ত বরং নির্বাচন কমিশনকে উচ্চমাত্রায় হেয় করেছে। এতে করে কমিশনের শক্তি-সামর্থ্য বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা এতে অবশ্যই কমেছে। আইন, বিধি-বিধানে কাউকে এলাকা ছাড়া করার কতটুকু ক্ষমতা কমিশনের আছে, আর তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাই বা কতটুকু তা যাচাই-বাছাই না করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়তো চমক সৃষ্টি করে থাকতে পারে, কিন্তু পরিণামে তা হয়ে গেছে বুমেরাং। আমরা কমিশনের প্রজ্ঞা নিয়ে এতে অবশ্যই হতাশ হয়েছি। আওয়ামী নেতৃত্ব যে কারণেই হোক, কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়েছে মর্মে আমাদের মনে হয়নি। অবশ্যই আমরা জানি, ক্ষমতা ও স্বার্থের রাজনীতিও যুদ্ধ, ভালোবাসা ও ব্যবসায়ে কোনো নৈতিকতা (ethics) নেই-এর মতোই। কমিশন বোধকরি এটা ভুলে গিয়েছিলেন। এবারের পদক্ষেপ কমিশনকে একটা দারুণ ‘শিক্ষা’ দিয়েছে নিশ্চয়ই। কমিশন হেরেছে।

পাঁচ. দুই প্রার্থী সাক্কু ও কায়সারকে, যতই বলুন না কেন তারা বিদ্রোহী, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে, এক করতে যে পারেনি তার সুদূরপ্রসারী ফল বিএনপি কীভাবে বহন করবে? রাজনীতিতে যে যাকে, যেভাবে পারে টেক্কা দেবেই, তা দলীয়ভাবেই হোক কিংবা ব্যক্তিগতভাবেই হোক। বিএনপির দুজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি আওয়ামী লীগের ইন্ধনেও হয়ে থাকে, তাহলেও বলতে হবে বিএনপি এখানে আরেকটা বড় রাজনৈতিক মার খেল। এর দীর্ঘস্থায়ী খেসারত বিএনপিকে বহন করেই যেতে হবে। ঘরের শত্রু বিভীষণ-থামাতে না পারলে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব তাদের ঘুচবে না। এতে এবারও যেমন আওয়ামী লীগই লাভবান হলো, ভবিষ্যতেও হবে। বিদ্রোহ থামাতে ব্যর্থ হওয়া কিন্তু দলীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা।

ছয়. স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়া দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য? আমি আওয়ামী লীগ যখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ (মেম্বার/কাউন্সিলর বাদে) স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলীয়ভাবে করার আইন পাশ করে, তখনও এর বিরোধিতা করেছিলাম। দলবাজি কি সর্বত্রই করতে হয়? স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে দলীয়রূপে ঘোষণা না করলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা নিশ্চিতভাবেই কোন প্রার্থী কোন দলঘেঁষা তা জানে। দলীয় নেতৃত্বও তা জানে এবং পর্দার অন্তরাল থেকে অঘোষিতভাবে কলকাঠিও নাড়ায়। দলীয়ভাবে নির্বাচনের আইন করার আগেই দলীয়-সমর্থকরা নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করত। তবে নির্দলীয় অনেক যোগ্য ব্যক্তি কিংবা ভিন্ন দলীয় প্রার্থীও তখন প্রচুর জনসমর্থন পেয়ে নির্বাচিত হতেন। কিন্তু দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আইনিভাবে চালু করে আওয়ামী লীগ সমাজে একটা অপ্রত্যাশিত বিভাজন সৃষ্টি করে দিয়েছে। এ আইন আমাদের উপকার তো করেইনি, বরং সামাজিক-সৌহার্দ্যে ফাটল ধরিয়েছে। সমালোচনা আছে যে, বাকশাল টিকিয়ে রাখতে না পেরে আওয়ামী লীগ প্রকারান্তরে সব দলীয় করার মানসেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে নিয়ে এসেছে। দলীয় ভিত্তিতে না হলে সাক্কু, কায়সার, রিফাতগণের সামাজিক-সৌহার্দ্য এবং হারজিতের পর হৃদ্যতা একটুও কমত না। তখন বরং সঠিকভাবে সুযোগ্য প্রার্থী বেশি বিবেচিত হতো। দলীয় নির্বাচনের মারাত্মক খারাপ দিকই হলো-দলের কলাগাছ হলেও তিনিই যোগ্য। সংসদীয় সরকারে কোন আইন পাশের জন্য ‘আমার মনে হয় হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে’-এর জন্য দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হয়তো সঠিক, কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী একজনও জয়ী না হলেও কি সরকার-পতন হয়? অতএব এ পচা আইন বাতিলযোগ্য।

সার্বিক বিশ্লেষণে আমরা কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে যা পেলাম তা হচ্ছে, ১. নির্বাচন কমিশন হেরে গেছে এবং নিজেদের প্রতি নিজেরাই কিছুটা জনঅনাস্থা সৃষ্টি করেছে; ২. রাজনৈতিক নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে; ৩. ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং ক্ষমতালিপ্সা দলীয় নেতৃত্বে বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে; ৪. ইভিএম এখনো সুষ্ঠু এবং সফল ভোটের জন্য গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারেনি, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ব্যালটে ভোট অনুষ্ঠানের সাহসী সিদ্ধান্ত কমিশন এখনই নিতে পারে; এবং ৫. দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন বাতিলযোগ্য। সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়গুলো সুবিবেচনায় নিলেই আমরা খুশি হব।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

চেতনায় বুদ্বুদ

কুসিক নির্বাচন : একটি ছোট্ট বিশ্লেষণ

 বদিউর রহমান 
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমি সরাসরি রাজনীতি কখনো করিনি। এমনকি ছাত্রজীবনেও কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়-ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হইনি। তবে মতাদর্শ তথা জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের বা ছাত্র সংগঠনের সমর্থক ছিলাম। ভোটের সময়ে সে সমর্থন কাজেও লাগাতাম। হক-ভাসানীর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময়ে ছোট ছিলাম, কিছু বুঝিনি, পরে পড়ে জেনেছিলাম। ১৯৫৮-এর আইয়ুব খানের মার্শাল ল’র উত্তাপ আমরা অজপাড়াগ্রামেও টের পেয়েছি। আমরা বলতাম, আমের টরি জামের টরি-আইলোরে ভাই মিলিট্টরি। টরি অর্থ আম বা জামের ছোট্ট মুকুল-অবস্থা। কেন এবং কীভাবে যে ‘ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে’র মতো এ আমের টরি আর জামের টরি চালু হয়েছে-তা আজও জানি না। আমার দেখামতে, এই আইয়ুবের সামরিক আইন বস্তুত প্রকৃত সামরিক আইন ছিল। আমরা ছোটরা দৈনিক সকাল-বিকাল দুবার বাড়ির আঙ্গিনার পাতা পর্যন্ত ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করতাম, পুকুরপাড়ের গাছ পর্যন্ত সরদারদের চিহ্নিত মতে কেটে ফেলা হয়েছিল, যাতে পাতা পড়ে পুকুরের পানি দূষিত না হয়। আর হাঁস-মুরগির পা ধরে মাথা ঝুলিয়ে বহন তো হতোই না বেতের ভয়ে। মার্শাল ল’র সে রাজনৈতিক উত্তাপ শেষ হতে না হতেই ১৯৬২’র শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে বড়দের সঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকতেই মিছিলে যোগ দিলাম। তবে ১৯৬৫’র ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হলে আমরা ভারতের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দিতে সীমান্তের কাছেই চলে গেলাম যেন। তারপর ১৯৬৬’র ৬ দফা, ১৯৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচন, ১৯৭১-এর ৭ মার্চ, এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরেরগুলো তো অনেকটা বড় হয়েই জেনেশুনে সচেতনভাবে দেখলাম ও জড়ালাম। রাজনৈতিকভাবে ভোটের জন্য প্রথম সরাসরি মিছিলে-মিটিংয়ে ১৯৭০ দিয়েই শুরু। আর আপাতত সর্বশেষ সম্পৃক্ততা ছিল ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮-এর জাতীয় নির্বাচনে, স্থানীয় সংসদ সদস্যের নির্বাচনে। মজার বিষয় হলো-সক্রিয়ভাবে জড়ালেও কারও দলীয়-লেজুড় হইনি কখনো। তবে নির্বাচন নিয়ে আমার আগ্রহের কমতি কখনো ছিল না, বিচার-বিশ্লেষণে তো অপার আনন্দ রয়েছেই। তারই ফলে কলামেও আমার বিবেচ্য বিষয় থাকে প্রশাসন আর রাজনীতি।

গত ১৫ জুন অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচন নিয়ে আমার বেশ আগ্রহ ছিল দীর্ঘ ২৯ বছর পর কুমিল্লা পৌরসভা/সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হতে পারবে কিনা ভেবে। কুমিল্লা পৌরসভার বয়স কিন্তু কম নয়, ১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত। ১৯৮৪ এবং ১৯৯৪ দুবার আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, সংসদ-সদস্য, পৌরসভায় আওয়ামী লীগের সর্বশেষ চেয়ারম্যান। এবারের নির্বাচিত মেয়র আরফানুল হক রিফাতকে বাহারের শিষ্য বলা হয়। জয়ের পরও বলা হচ্ছে, বাহারের মদদেই রিফাত উতরে গেছেন। ভোটের ব্যবধান মাত্র ৩৪৩ হলেও জিতেছেন তো, নাকি? এ নির্বাচনে প্রথম তিন শীর্ষসংখ্যার ভোটের অধিকারী রিফাত ৫০,৩১০, মনিরুল হক সাক্কু ৪৯, ৯৬৭ এবং নিজাম উদ্দিন কায়সার ২৯,০৯৯ ভোট। কুমিল্লার রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের দুনেতার দুগ্রুপ যে নিজেদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারে ব্যস্ত থাকত, তাতো কম-বেশি সবাই জানে। বর্তমান সংসদ-সদস্য বাহাউদ্দিন বাহারের এবং প্রয়াত নেতা আফজাল খানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আওয়ামী লীগকে বরং বেকায়দায়ই ফেলত। এদের দুজনের বিবাদের সুযোগ পেত অন্য প্রার্থী। ফলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হারত। আফজাল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানাও গত নির্বাচনে এ কারণেই হেরেছেন মর্মে বলা হয়ে থাকে। এবারের ভিন্ন স্বাদ হলো, নিজাম উদ্দিন কায়সারও মনিরুল হক সাক্কুর মতো বিএনপির লোক। প্রদত্ত ভোটের শতকরা ভাগে ২০১২ ছিল ৭৩ শতাংশ, ২০১৭ বেড়ে হয় ৮০ শতাংশ; কিন্তু এবার কমে হয়ে পড়ে ৫৯ শতাংশ (৫৮.৭৪)। এবারের নির্বাচনে ১০৫ কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টিতে সাক্কু ভোটে এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ চারটিতে তিনি ৩৪৩ ভোটে পিছিয়ে পড়ে হেরে যান। অর্থাৎ এ চার কেন্দ্রে রিফাত পিছিয়ে থাকা ৬০০ সমান করে আরও ৩৪৩ ভোট বেশি পান। তাহলে মানেটা দাঁড়ায় এ চার কেন্দ্রই জয় নির্ধারক। সাক্কুর অভিযোগ এ চার কেন্দ্রের ফল ঘোষণায় বিলম্বের কারণেই তার পরাজয় হয়েছে। আমরা ইঙ্গিতটা বোধহয় এমন অর্থবহ হিসাবে ধরে নিতে পারি যে, এ চার কেন্দ্রে কোনো না কোনোভাবে তাকে ‘হারিয়ে’ দেওয়া হয়েছে। সাক্কু মামলাও করতে পারেন মর্মে খবর বেরিয়েছে। নিজেদের মধ্যে ভোট ভাগাভাগিতে হেরেছেন-এ কথা কিন্তু সাক্কু বলছেন না।

সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে কয়েকটা বিষয় বিবেচনায় এসে যায়। এক. নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু-সুন্দর নির্বাচন শেষতক পরিচালনায় সফল হয়েছেন কিনা। প্রাপ্ত খবরাদি বিশ্লেষণে বোঝা যায়, ভোটগ্রহণ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত কমিশন সফলতা দাবি করতে পারে। কিন্তু শেষ চার কেন্দ্রের ভোট গণনায় বিলম্ব অপ্রত্যাশিত এবং প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচনে এক ভোটেও কারও হারজিত হতে পারে। ১৯৬৪ কিংবা ১৯৬৫ (পুরো মনে নেই) ফেনীর জায়লস্কর ইউনিয়নের এক মেম্বার পদে এক ভোটে ইদ্রিছ মওলানা জয়ী হয়েছিলেন। একাধিকবার উভয় প্রার্থীর সামনেই ভোট গণনা হয়েছিল। তখন কথা উঠেছিল, ইদ্রিছ মওলানাকে আল্লাহ নিজে জয়ী করে দিয়েছেন, কেননা তিনি বড় আলেম ছিলেন। কিন্তু এবার কি ভোট পুনঃগণনায় কোনো সুযোগ ছিল? ১০১টি কেন্দ্রে ৬০০ ভোটে এগিয়ে থেকে চারটিতে সাক্কুর ৩৪৩ ভোটে হারার বিষয়টি পুনঃগণনায় সুরাহা হওয়ার সুযোগ নেই বলেই শোনা যাচ্ছে, কেননা ইভিএমে নাকি এখনো এ সুবিধা নেই। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-কিছু ‘অঘটন’ ওই বিলম্বে ঘটেছে কি? সব ভালো যার শেষ ভালো-এ প্রথায় গেলে নির্বাচন কমিশনের শেষটা ভালো হয়নি। ফলে বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে একটা আস্থার ঘাটতি যাত্রাতেই শুরু হল।

দুই. ইভিএমে প্রদত্ত ভোটের শতাংশ ৫৯-এ নেমে পড়া কী বার্তা দেয়? ব্যালটে ভোট হলে প্রদত্ত ভোটে শতকরা হার হয়তো বাড়ত, কেননা ইভিএমের দেরি হওয়া এখনো সারেনি। এতে করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম বিতর্ক আরেকটু চাঙ্গা হতে পারে। বর্তমান কমিশন ভোটারের আস্থা সৃষ্টির জন্য এমন সাহসী ভূমিকা নিতে পারবে কিনা যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন ব্যালটেই হবে-এটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সম্প্রতি এক কমিশনারের ইভিএম-বিশুদ্ধতা নিয়ে যে অর্বাচীন চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে, তা সত্যিই অনভিপ্রেত। ত্রুটি প্রমাণের জন্যই তার ঘোষিত পুরস্কারের অঙ্কটা যত বড়ই হোক না কেন। প্রধানমন্ত্রী আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের আগাম ঘোষণা বা ইচ্ছা ব্যক্ত করার কারণেই ওই কমিশনারের এমন আগ-বাড়ানো উত্তেজিত সাফাই কিনা আমরা বুঝতে পারছি না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এতদ্বিষয়ে কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবেন বললেও, তা কিন্তু সন্দেহমুক্ত নয় এখনো।

তিন. রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ কিনা। হালে আমরা দলীয় নির্দেশনা অমান্য করার দুঃসাহস দলীয় নেতাদের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি। আর এ কারণে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন অনেকে। রাজনৈতিক দল করলে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করার সাহস এদের কীভাবে হয়? হয় হয়তো দু’কারণে-ক. দলীয় নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব এখন গ্রহণযোগ্য মনে হয় না, প্রার্থী নির্বাচনে দল ন্যায়বিচার করতে হয়তো ব্যর্থ হয়। খ. ব্যক্তিপর্যায়ে, ক্ষমতার মোহ কিংবা পদ-পদবি পাওয়ার অদম্য বিবেচনা দলের নীতিগত সিদ্ধান্ত অমান্য করতে তাকে সাহসী করে, হোক না দল থেকে কারও বহিষ্কার। নারায়ণগঞ্জের তৈমূর আলম খন্দকারই হোক, আর কুমিল্লার সাক্কু কিংবা কায়সারই হোক, সর্বত্রই রাজনীতি এখন নিজের জেদ আর লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে নয়। এই-ই যদি নেতাদের আদর্শ হয়, তাহলে দল আর অটুট থাকবে কী করে? অনেকের এমন ধারণা হয়তো থেকে থাকে যে, জিতে গেলে, এমনকি পরাজিত হলেও, আবার সুযোগ বুঝে দলে ভিড়ে যেতে পারবে। আমরা বলব, রাজনীতির জন্য এটা অশুভ। অবশ্য অতীতে দলত্যাগী বা দলছুটদের পুনর্বাসন এজন্য দায়ী এবং দলীয় নেতৃত্বই এর দায় নিতে বাধ্য। এর অবসান দরকার।

চার. নির্বাচন কমিশন সংসদ-সদস্যকে কুমিল্লা ছাড়ার যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তার সুফল কে বা কারা পেল। আমার তো মনে হয়, কোমরের শক্তি যাচাই না করে এমন সিদ্ধান্ত বরং নির্বাচন কমিশনকে উচ্চমাত্রায় হেয় করেছে। এতে করে কমিশনের শক্তি-সামর্থ্য বা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা এতে অবশ্যই কমেছে। আইন, বিধি-বিধানে কাউকে এলাকা ছাড়া করার কতটুকু ক্ষমতা কমিশনের আছে, আর তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাই বা কতটুকু তা যাচাই-বাছাই না করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়তো চমক সৃষ্টি করে থাকতে পারে, কিন্তু পরিণামে তা হয়ে গেছে বুমেরাং। আমরা কমিশনের প্রজ্ঞা নিয়ে এতে অবশ্যই হতাশ হয়েছি। আওয়ামী নেতৃত্ব যে কারণেই হোক, কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আগ্রহী হয়েছে মর্মে আমাদের মনে হয়নি। অবশ্যই আমরা জানি, ক্ষমতা ও স্বার্থের রাজনীতিও যুদ্ধ, ভালোবাসা ও ব্যবসায়ে কোনো নৈতিকতা (ethics) নেই-এর মতোই। কমিশন বোধকরি এটা ভুলে গিয়েছিলেন। এবারের পদক্ষেপ কমিশনকে একটা দারুণ ‘শিক্ষা’ দিয়েছে নিশ্চয়ই। কমিশন হেরেছে।

পাঁচ. দুই প্রার্থী সাক্কু ও কায়সারকে, যতই বলুন না কেন তারা বিদ্রোহী, তাদের বহিষ্কার করা হয়েছে, এক করতে যে পারেনি তার সুদূরপ্রসারী ফল বিএনপি কীভাবে বহন করবে? রাজনীতিতে যে যাকে, যেভাবে পারে টেক্কা দেবেই, তা দলীয়ভাবেই হোক কিংবা ব্যক্তিগতভাবেই হোক। বিএনপির দুজন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি আওয়ামী লীগের ইন্ধনেও হয়ে থাকে, তাহলেও বলতে হবে বিএনপি এখানে আরেকটা বড় রাজনৈতিক মার খেল। এর দীর্ঘস্থায়ী খেসারত বিএনপিকে বহন করেই যেতে হবে। ঘরের শত্রু বিভীষণ-থামাতে না পারলে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব তাদের ঘুচবে না। এতে এবারও যেমন আওয়ামী লীগই লাভবান হলো, ভবিষ্যতেও হবে। বিদ্রোহ থামাতে ব্যর্থ হওয়া কিন্তু দলীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা।

ছয়. স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়া দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য কতটুকু গ্রহণযোগ্য? আমি আওয়ামী লীগ যখন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ (মেম্বার/কাউন্সিলর বাদে) স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলীয়ভাবে করার আইন পাশ করে, তখনও এর বিরোধিতা করেছিলাম। দলবাজি কি সর্বত্রই করতে হয়? স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে দলীয়রূপে ঘোষণা না করলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটাররা নিশ্চিতভাবেই কোন প্রার্থী কোন দলঘেঁষা তা জানে। দলীয় নেতৃত্বও তা জানে এবং পর্দার অন্তরাল থেকে অঘোষিতভাবে কলকাঠিও নাড়ায়। দলীয়ভাবে নির্বাচনের আইন করার আগেই দলীয়-সমর্থকরা নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করত। তবে নির্দলীয় অনেক যোগ্য ব্যক্তি কিংবা ভিন্ন দলীয় প্রার্থীও তখন প্রচুর জনসমর্থন পেয়ে নির্বাচিত হতেন। কিন্তু দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন আইনিভাবে চালু করে আওয়ামী লীগ সমাজে একটা অপ্রত্যাশিত বিভাজন সৃষ্টি করে দিয়েছে। এ আইন আমাদের উপকার তো করেইনি, বরং সামাজিক-সৌহার্দ্যে ফাটল ধরিয়েছে। সমালোচনা আছে যে, বাকশাল টিকিয়ে রাখতে না পেরে আওয়ামী লীগ প্রকারান্তরে সব দলীয় করার মানসেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে নিয়ে এসেছে। দলীয় ভিত্তিতে না হলে সাক্কু, কায়সার, রিফাতগণের সামাজিক-সৌহার্দ্য এবং হারজিতের পর হৃদ্যতা একটুও কমত না। তখন বরং সঠিকভাবে সুযোগ্য প্রার্থী বেশি বিবেচিত হতো। দলীয় নির্বাচনের মারাত্মক খারাপ দিকই হলো-দলের কলাগাছ হলেও তিনিই যোগ্য। সংসদীয় সরকারে কোন আইন পাশের জন্য ‘আমার মনে হয় হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে’-এর জন্য দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হয়তো সঠিক, কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের প্রার্থী একজনও জয়ী না হলেও কি সরকার-পতন হয়? অতএব এ পচা আইন বাতিলযোগ্য।

সার্বিক বিশ্লেষণে আমরা কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে যা পেলাম তা হচ্ছে, ১. নির্বাচন কমিশন হেরে গেছে এবং নিজেদের প্রতি নিজেরাই কিছুটা জনঅনাস্থা সৃষ্টি করেছে; ২. রাজনৈতিক নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে; ৩. ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং ক্ষমতালিপ্সা দলীয় নেতৃত্বে বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে; ৪. ইভিএম এখনো সুষ্ঠু এবং সফল ভোটের জন্য গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হতে পারেনি, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ব্যালটে ভোট অনুষ্ঠানের সাহসী সিদ্ধান্ত কমিশন এখনই নিতে পারে; এবং ৫. দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন বাতিলযোগ্য। সংশ্লিষ্ট সবাই বিষয়গুলো সুবিবেচনায় নিলেই আমরা খুশি হব।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন