দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের সিঁড়ি পদ্মা সেতু
jugantor
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের সিঁড়ি পদ্মা সেতু

  ড. মো. শহীদুর রহমান খান  

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা সেতু বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু। এশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু এটি। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২১.৫ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট সেতুটি দেশের সর্ববৃহৎ ও বিশ্বে ১২২তম। সেতুর উপরে চলবে গাড়ি, নিচে চলবে রেল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্ত হবে ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে এবং রেলওয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলো। বিশ্বব্যাংকের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সুফল ভোগ করবে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের সঙ্গে এ দেশের সড়ক ও রেল সংযোগ স্থাপিত হবে। ফলে এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই করুণ। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য জাতির পিতা আজীবন লড়াই করেছেন। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে একটি কুচক্রী মহল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের উন্নয়ন থেমে গিয়েছিল, সবাই লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শোককে শক্তিতে পরিণত করে বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্বে বাংলাদেশকে আজ বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোল মডেলে রূপান্তর করেছেন। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকার কারণেই আজ পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। পদ্মা সেতুর প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহল উঠেপড়ে লেগেছিল সেই শুরু থেকেই; কিন্তু পারেনি।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনই নয়, বৈচিত্র্য আসবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহণ ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে একদিকে যেমন দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হলো, তেমনি এ সেতু ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মা সেতুর কারণে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে কৃষিজাত পণ্যের বাজারজাতকরণে পরিবহণের ক্ষেত্রে। সেতুর কারণে কৃষক তার পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন। খুলনা অঞ্চলের কৃষকরা প্রচুর ফসল উৎপাদন করতে পারলেও পর্যাপ্ত দাম পেতেন না। এর মূল কারণ, রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়া। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় যাতায়াতের সমস্যা আর থাকবে না। এতে কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা সহজ হবে, এর সঙ্গে জড়িতরাও লাভবান হবেন।

কৃষিসম্পদ : দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় খাদ্যভান্ডার। কিন্তু এ সুযোগ এতদিন পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সেখানে সবুজ বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। ধানের ঘাতসহিঞ্চু ও উচ্চ ফলনশীল নতুন জাতগুলোর বিস্তার ঘটবে। ফলে চাল উৎপাদন বাড়বে। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে তরমুজের চাষ হয়। কিন্তু ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধাসহ বিপণন সমস্যার কারণে কৃষক তরমুজ চাষে তেমন লাভবান হন না। এখন এ সমস্যা দূর হবে এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত তরমুজ প্রেরণ সম্ভব হবে। ফলে কৃষকদের তরমুজ বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরে নারিকেল ও সুপারির চাষ হয়। সমতলে হয় পান ও তেজপাতার চাষ। পটুয়াখালীতে মুগডালের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। প্রচুর ফুলের চাষ হয় যশোরে। এখানকার ফুল রপ্তানি হয় বিদেশেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কৃষিপণ্য রাজধানীতে নেওয়া হয়। পদ্মা সেতুর ফলে এসব কৃষিপণ্যের চাষ উৎসাহিত হবে ব্যাপকভাবে।

প্রাণিসম্পদ : পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুগ্ধ ও মাংস শিল্প বিকশিত হবে। গরু মোটাতাজাকরণ কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে যাবে। অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠবে। মাদারীপুরের টেকেরহাট এখন দুগ্ধ উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত। এর পরিধি শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাছাড়া পোলট্রি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দানাদার খাদ্য সহজে পরিবহণ করার কারণে এর দাম কমবে। খামারিরা প্রাণী-পাখি প্রতিপালনে আগ্রহী হবে। দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। তাতে বৃদ্ধি পাবে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান। পরিবহণ খরচ কমাতে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরের অধিকাংশ পশু ব্যবসায়ী ট্রলারে পশু নিয়ে রাজধানীতে আসেন। অন্যদিকে যশোর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও ঝিনাইদহের ব্যবসায়ীরাও ট্রাকে করে গবাদিপশু ঢাকায় আনেন। পদ্মা পার হতে এসব ট্রাকের জন্য এতদিন ফেরিই ছিল ভরসা। এতে বিড়ম্বনার সঙ্গে যুক্ত হতো বাড়তি খরচ। আবার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকতেন অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডায় পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার। ফেরিঘাটে অসুস্থ গরু জবাই করে কম দামে মাংস বিক্রির নজিরও রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ফেরিঘাটের বিড়ম্বনা কমবে। আগে একটি ট্রাকে ২০টি গরু আনতে খরচ হতো ১৪-১৮ হাজার টাকা। এখন হয় ২২-২৫ হাজার টাকা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় কম দামে ট্রাক পাওয়া যাবে, কারণ ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তখন অপেক্ষা করতে হবে না।

মৎস্যসম্পদ : খুলনা অঞ্চলের মাছ রাজধানীবাসীর পাশাপাশি রসনা বিলাসে ব্যয় হয় দেশের বাইরেও। দেশের দক্ষিণাঞ্চল মৎস্য চাষ ও আহরণের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে আছে অসংখ্য মাছের ঘের। সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। তাতে কাজ করছে অসংখ্য গরিব মানুষ। পদ্মা সেতুর ফলে নিবিড় মৎস্য চাষ উৎসাহিত হবে। রেণু পোনাসহ মাছের উৎপাদন বাড়বে। মাছ পরিবহণে সময় একটি বড় বিষয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে ফেরিঘাটে বেশি সময় ব্যয় হলে বরফ গলে গিয়ে যে সংকট দেখা দেয়, সেটি দূর হলেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই দূর হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মাছের বিপণন ও বাজারজাতকরণ সহজ হবে। এতে জেলে, মৎস্যচাষি ও ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশে মৎস্য প্রেরণ সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে। তাতে মাছের অপচয় হ্রাস পাবে। তাছাড়া সুনীল অর্থনীতি হবে গতিশীল। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ বাড়বে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে মৎস্য খাত থেকে।

পাট : খুলনা থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পাট রপ্তানি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাট কিনে খুলনায় নিয়ে আসা হয়। এ পাট মোংলা বন্দর হয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পাট কিনে আনার সময় পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়। আবার খুলনার পাটকলে উৎপাদিত পাটজাত পণ্য রাজধানীতে নেওয়া হয়। এতে যে সময়ের অপচয় হয়, তার আর্থিক মূল্য অনেক বেশি। বিশ্ববাজারে পাটের অবস্থান ভালো করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাজের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রসারিত হবে। কৃষি বহুধাকরণ ও শস্যের বৈচিত্র্যকরণ সহজ হবে। কৃষি ব্যবসায় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। উপযুক্ত কাজ ও আয়ের অভাবে যারা নিজের এলাকা ছেড়ে ঢাকা বা অন্য কোনো এলাকায় চলে গিয়েছিলেন, তারা নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে আসবেন। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ নেবেন। তাদের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। দক্ষতা অর্জিত হবে। বিভিন্ন অর্থ উপার্জনের কাজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। ইপিজেড, পাটকল, চালকল পুরো মাত্রায় বিকশিত হবে। মোংলা, পায়রা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবন ও সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে।

পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসের প্রতীক, বাঙালির শতবর্ষে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে থাকবে এটি। প্রথমবারের মতো জাতির আর্থিক সামর্থ্যরে পরিচয়ও বহন করে এ সেতু। ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। আল্লাহ আপনাকে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করুন।

কৃষিবিদ প্রফেসর ড. মো. শহীদুর রহমান খান : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের সিঁড়ি পদ্মা সেতু

 ড. মো. শহীদুর রহমান খান 
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পদ্মা সেতু বিশ্বের ১১তম দীর্ঘ সেতু। এশিয়ার দ্বিতীয় দীর্ঘতম সেতু এটি। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২১.৫ মিটার প্রস্থবিশিষ্ট সেতুটি দেশের সর্ববৃহৎ ও বিশ্বে ১২২তম। সেতুর উপরে চলবে গাড়ি, নিচে চলবে রেল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যুক্ত হবে ট্রান্স-এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে এবং রেলওয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হলো। বিশ্বব্যাংকের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এর সুফল ভোগ করবে। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশ ভারত, ভুটান, নেপাল ও মিয়ানমারের সঙ্গে এ দেশের সড়ক ও রেল সংযোগ স্থাপিত হবে। ফলে এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।

স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল খুবই করুণ। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য জাতির পিতা আজীবন লড়াই করেছেন। দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে একটি কুচক্রী মহল বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে ধ্বংসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের উন্নয়ন থেমে গিয়েছিল, সবাই লুটপাটে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শোককে শক্তিতে পরিণত করে বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্বে বাংলাদেশকে আজ বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোল মডেলে রূপান্তর করেছেন। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী ভূমিকার কারণেই আজ পদ্মা সেতু বাস্তবে রূপ লাভ করেছে। পদ্মা সেতুর প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহল উঠেপড়ে লেগেছিল সেই শুরু থেকেই; কিন্তু পারেনি।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় শুধু যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনই নয়, বৈচিত্র্য আসবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবহণ ব্যয়সহ বিভিন্ন খাতে। পদ্মা সেতুর মাধ্যমে একদিকে যেমন দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি যোগসূত্র তৈরি হলো, তেমনি এ সেতু ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পদ্মা সেতুর কারণে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হবে কৃষিজাত পণ্যের বাজারজাতকরণে পরিবহণের ক্ষেত্রে। সেতুর কারণে কৃষক তার পণ্যের সঠিক মূল্য পাবেন। খুলনা অঞ্চলের কৃষকরা প্রচুর ফসল উৎপাদন করতে পারলেও পর্যাপ্ত দাম পেতেন না। এর মূল কারণ, রাজধানীর সঙ্গে যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না হওয়া। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় যাতায়াতের সমস্যা আর থাকবে না। এতে কৃষিপণ্যের বিপণন ব্যবস্থা সহজ হবে, এর সঙ্গে জড়িতরাও লাভবান হবেন।

কৃষিসম্পদ : দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে বলা হয় খাদ্যভান্ডার। কিন্তু এ সুযোগ এতদিন পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে সেখানে সবুজ বিপ্লব ত্বরান্বিত হবে। ধানের ঘাতসহিঞ্চু ও উচ্চ ফলনশীল নতুন জাতগুলোর বিস্তার ঘটবে। ফলে চাল উৎপাদন বাড়বে। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে তরমুজের চাষ হয়। কিন্তু ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অসুবিধাসহ বিপণন সমস্যার কারণে কৃষক তরমুজ চাষে তেমন লাভবান হন না। এখন এ সমস্যা দূর হবে এবং ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দ্রুত তরমুজ প্রেরণ সম্ভব হবে। ফলে কৃষকদের তরমুজ বিক্রি করে ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিশ্চিত হবে। দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ চরে নারিকেল ও সুপারির চাষ হয়। সমতলে হয় পান ও তেজপাতার চাষ। পটুয়াখালীতে মুগডালের চাষ হয় বাণিজ্যিকভাবে। প্রচুর ফুলের চাষ হয় যশোরে। এখানকার ফুল রপ্তানি হয় বিদেশেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট থেকে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ টন কৃষিপণ্য রাজধানীতে নেওয়া হয়। পদ্মা সেতুর ফলে এসব কৃষিপণ্যের চাষ উৎসাহিত হবে ব্যাপকভাবে।

প্রাণিসম্পদ : পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দুগ্ধ ও মাংস শিল্প বিকশিত হবে। গরু মোটাতাজাকরণ কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে যাবে। অনেক দুগ্ধ খামার গড়ে উঠবে। মাদারীপুরের টেকেরহাট এখন দুগ্ধ উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে বিবেচিত। এর পরিধি শরীয়তপুর, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। তাছাড়া পোলট্রি শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। দানাদার খাদ্য সহজে পরিবহণ করার কারণে এর দাম কমবে। খামারিরা প্রাণী-পাখি প্রতিপালনে আগ্রহী হবে। দুধ ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটবে। তাতে বৃদ্ধি পাবে খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের কর্মসংস্থান। পরিবহণ খরচ কমাতে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরের অধিকাংশ পশু ব্যবসায়ী ট্রলারে পশু নিয়ে রাজধানীতে আসেন। অন্যদিকে যশোর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও ঝিনাইদহের ব্যবসায়ীরাও ট্রাকে করে গবাদিপশু ঢাকায় আনেন। পদ্মা পার হতে এসব ট্রাকের জন্য এতদিন ফেরিই ছিল ভরসা। এতে বিড়ম্বনার সঙ্গে যুক্ত হতো বাড়তি খরচ। আবার ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে থাকতেন অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডায় পশু অসুস্থ হয়ে পড়ার। ফেরিঘাটে অসুস্থ গরু জবাই করে কম দামে মাংস বিক্রির নজিরও রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় ফেরিঘাটের বিড়ম্বনা কমবে। আগে একটি ট্রাকে ২০টি গরু আনতে খরচ হতো ১৪-১৮ হাজার টাকা। এখন হয় ২২-২৫ হাজার টাকা। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় কম দামে ট্রাক পাওয়া যাবে, কারণ ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তখন অপেক্ষা করতে হবে না।

মৎস্যসম্পদ : খুলনা অঞ্চলের মাছ রাজধানীবাসীর পাশাপাশি রসনা বিলাসে ব্যয় হয় দেশের বাইরেও। দেশের দক্ষিণাঞ্চল মৎস্য চাষ ও আহরণের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছের সরবরাহ আসে মূলত দক্ষিণাঞ্চল থেকে। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনা অঞ্চলে আছে অসংখ্য মাছের ঘের। সেখানে গড়ে উঠেছে অনেক প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। তাতে কাজ করছে অসংখ্য গরিব মানুষ। পদ্মা সেতুর ফলে নিবিড় মৎস্য চাষ উৎসাহিত হবে। রেণু পোনাসহ মাছের উৎপাদন বাড়বে। মাছ পরিবহণে সময় একটি বড় বিষয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বা অন্য কোনো কারণে ফেরিঘাটে বেশি সময় ব্যয় হলে বরফ গলে গিয়ে যে সংকট দেখা দেয়, সেটি দূর হলেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি অনেকটাই দূর হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় মাছের বিপণন ও বাজারজাতকরণ সহজ হবে। এতে জেলে, মৎস্যচাষি ও ব্যবসায়ীরা বেশি লাভবান হবেন। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ও বিদেশে মৎস্য প্রেরণ সহজ ও ঝুঁকিমুক্ত হবে। তাতে মাছের অপচয় হ্রাস পাবে। তাছাড়া সুনীল অর্থনীতি হবে গতিশীল। সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের পরিমাণ বাড়বে। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি পাবে মৎস্য খাত থেকে।

পাট : খুলনা থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার পাট রপ্তানি হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাট কিনে খুলনায় নিয়ে আসা হয়। এ পাট মোংলা বন্দর হয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পাট কিনে আনার সময় পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয়। আবার খুলনার পাটকলে উৎপাদিত পাটজাত পণ্য রাজধানীতে নেওয়া হয়। এতে যে সময়ের অপচয় হয়, তার আর্থিক মূল্য অনেক বেশি। বিশ্ববাজারে পাটের অবস্থান ভালো করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এ খাত আরও এগিয়ে যাবে।

পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাজের ক্ষেত্র অনেক সম্প্রসারিত হবে। কৃষি বহুধাকরণ ও শস্যের বৈচিত্র্যকরণ সহজ হবে। কৃষি ব্যবসায় মানুষের আগ্রহ বাড়বে। উপযুক্ত কাজ ও আয়ের অভাবে যারা নিজের এলাকা ছেড়ে ঢাকা বা অন্য কোনো এলাকায় চলে গিয়েছিলেন, তারা নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে আসবেন। আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ নেবেন। তাদের উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধি পাবে। দক্ষতা অর্জিত হবে। বিভিন্ন অর্থ উপার্জনের কাজে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। ইপিজেড, পাটকল, চালকল পুরো মাত্রায় বিকশিত হবে। মোংলা, পায়রা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাতে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। সুন্দরবন ও সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হবে।

পদ্মা সেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসের প্রতীক, বাঙালির শতবর্ষে সাহসিকতার প্রতীক হয়ে থাকবে এটি। প্রথমবারের মতো জাতির আর্থিক সামর্থ্যরে পরিচয়ও বহন করে এ সেতু। ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে। আল্লাহ আপনাকে সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু দান করুন।

কৃষিবিদ প্রফেসর ড. মো. শহীদুর রহমান খান : উপাচার্য, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন