দেশে স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন
jugantor
দেশে স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন

  ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু  

২৭ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই আইনের প্রয়োজনীয়তা ছিল; বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মানবজীবনে সুশৃঙ্খলভাবে সমাজে বসবাসের জন্য এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আইনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানবজীবনে আইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয়, ‘Ignorance of law is no excuses’। অর্থাৎ আইন না জানা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আবার আইন না জানার কারণে কৃত অপরাধ থেকে মাফও পাওয়া যায় না এবং এ জন্য কাউকে ক্ষমা করা যায় না। সুতরাং, দেশের নাগরিক হিসাবে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন-কানুন সম্পর্কে জানা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব এবং কর্তব্য। আইনের পরিধি অনেক বিস্তৃত হওয়ায় আইন নামক বিষয়টিকে নির্ধারিত কোনো সীমা বা গণ্ডির মধ্যে ফেলা যায় না। এ কারণে আইন বিষয়কে অনেকে ‘চির সবুজ’ বা ‘এভারগ্রিন’ বিষয় হিসাবেও আখ্যায়িত করেন। আর আইনের ব্যাপ্তি সম্পর্কে প্রবাদ আকারে বলা হয়, ‘আকাশে যত তারা, আইনের তত ধারা’। অর্থাৎ, আকাশের তারা যেমন গণনা করে শেষ করা যায় না, ঠিক তেমনি আইনের ধারাও গণনা করে শেষ করা যায় না। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের আগে শুধু কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পাঠদান করানো হতো। ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও চার বছরমেয়াদি সম্মান এবং এক বছরমেয়াদি এলএলএম প্রোগ্রামে আইন বিষয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন (প্রথমে ১৯৯২ সালে এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে) পাশ হওয়ার পর দেশে আইন শিক্ষার দ্বার অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। যদিও বেসরকারি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষার মান নিয়ে শুরু থেকেই যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তথাপিও বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পাঠদানের ফলে অনেক শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে নিজেদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে চলেছেন। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্নকারীরা পরে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি (এমফিল/পিএইচডি) অর্জন করার সুযোগ পেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা ছাড়া উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ পান না। কারণ, যৌক্তিক বিবেচনায় এবং শিক্ষার মানদণ্ডের নিরিখে এখন পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল বা পিএইচডি করার কোনো বিধান রাখা হয়নি।

যা হোক, আইনের একজন শিক্ষার্থী স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (জেএসসি) তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ হওয়ার সুযোগ পান। এতে অন্য কোনো বিষয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারেন না, যা আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগই বটে। অপরদিকে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান এবং এখানে আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পান। আবার আইনের শিক্ষার্থীরা আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়ার পর আইনজীবী হওয়া ছাড়াও ব্যারিস্টার হওয়ার সুযোগ পান, যা অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা পান না। তা ছাড়া আইনে ডিগ্রিধারী একজন শিক্ষার্থী ব্যাংক, বীমা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রিসার্চ ফার্মসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সংস্থা বা সংগঠনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও সহজেই বিভিন্ন পদে কাজ করার সুযোগ পান। এদিক থেকে বলা যায়, আইন বিষয়ের কর্মক্ষেত্র অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পাশাপাশি আইন বিষয়ে ব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন-কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তা ছাড়া একাধিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশে। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশে এখন পর্যন্ত স্বতন্ত্র কোনো আইন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল করতে এবং দেশে আইনের শাসন আরও সুদৃঢ় করতে অধিকসংখ্যক দক্ষ বিচারক ও দক্ষ আইনজীবী দরকার। দেশে যত বেশি উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ বিচারক ও আইনবিদ থাকবেন, তত দ্রুতই সম্ভব হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আইন বিষয়ে সচেতন প্রত্যেকেই এ কথা জানেন যে, আমাদের উপমহাদেশে আইনব্যবস্থা মূলত ‘কমন ল’ভিত্তিক। এখানে আনীত অপরাধীকে এ ব্যবস্থায় নিরপরাধ ভেবে আদালতে বিচার হয়। অভিযোগকারীকে আনীত অপরাধীর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। এতে দীর্ঘসূত্রতা আর ঝামেলার যেন অন্ত থাকে না। বিচারকের এ ক্ষেত্রে কোনো কিছু করার থাকে না। ‘সিভিল ল’ ব্যবস্থায় আনীত অপরাধীকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি নির্দোষ। ফলে কেউ যেন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না আনতে পারে, সে জন্য প্রত্যেকেই নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে চায়। অহেতুক আন্দোলন ও নানা অপরাধ-সম্পৃক্ত কার্যকলাপ ‘সিভিল ল’ ব্যবস্থায় যথাসময়ে প্রশমিত করা সম্ভব হয়। আর সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা প্রবর্তনে গতিশীল আইনব্যবস্থায় শান্তি-শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। এদিক বিবেচনায়, আমাদের দেশে স্বতন্ত্র অন্তত একটি হলেও আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

বর্তমানে আমাদের দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী। তুলনামূলক কম খরচে দেশে আইনে পড়াশোনা করে ছাত্রছাত্রীরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারেন। ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ বিচারক ও আইনজীবী তৈরি করতে দেশে মানসম্পন্ন স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। ইতঃপূর্বে এ বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে। আবার সমাজের বিশিষ্টজনেরা বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফলাফল শূন্য। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আইন বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ও আইন কলেজে আইন শাস্ত্রে অধ্যয়ন ও গবেষণা করানো হয় এবং এসব ইনস্টিটিউট ও কলেজের সংখ্যা শতাধিক। এগুলো সত্ত্বেও বর্তমানে গঠনমূলক এবং সৃষ্টিমুখী দিক দর্শনের বিবেচনায় আইন শিক্ষার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন শহরে আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, ভারতের নয়াদিল্লি, বিশাখাপত্তনাম, হায়দরাবাদ, পাটনা, রায়পুর, গান্ধীনগর, ব্যাঙ্গালোর, কোচিন, ভূপাল, পুনা, চন্ডীগড়, মাদ্রাজ, কলকাতা ও অন্যান্য শহরে প্রায় ২৫-৩০টি আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন আইন শিক্ষা উপহার দিয়ে আসছে। এসবের প্রাসঙ্গিকতায় বাংলাদেশের জন্য সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি দেশের জন্য অপরিহার্য বিষয় হয়ে পড়েছে। তবে এ ধরনের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণভাবে মূলত সরকারি পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করে। সবার এ কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা প্রবর্তনে গতিশীল আইন ব্যবস্থার শান্তি-শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। এমতাবস্থায় দেশে আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া দরকার। সবদিক বিবেচনা করে সরকার দেশে অন্তত একটি হলেও আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, চন্ডীগড় ইউনিভার্সিটি, পাঞ্জাব, ভারত

kekbabu@yahoo.com

দেশে স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন

 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু 
২৭ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন
প্রতীকী ছবি

মানবসভ্যতার শুরু থেকেই আইনের প্রয়োজনীয়তা ছিল; বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। মানবজীবনে সুশৃঙ্খলভাবে সমাজে বসবাসের জন্য এবং দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য আইনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মানবজীবনে আইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলা হয়, ‘Ignorance of law is no excuses’। অর্থাৎ আইন না জানা কোনো অজুহাত হতে পারে না। আবার আইন না জানার কারণে কৃত অপরাধ থেকে মাফও পাওয়া যায় না এবং এ জন্য কাউকে ক্ষমা করা যায় না। সুতরাং, দেশের নাগরিক হিসাবে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন-কানুন সম্পর্কে জানা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব এবং কর্তব্য। আইনের পরিধি অনেক বিস্তৃত হওয়ায় আইন নামক বিষয়টিকে নির্ধারিত কোনো সীমা বা গণ্ডির মধ্যে ফেলা যায় না। এ কারণে আইন বিষয়কে অনেকে ‘চির সবুজ’ বা ‘এভারগ্রিন’ বিষয় হিসাবেও আখ্যায়িত করেন। আর আইনের ব্যাপ্তি সম্পর্কে প্রবাদ আকারে বলা হয়, ‘আকাশে যত তারা, আইনের তত ধারা’। অর্থাৎ, আকাশের তারা যেমন গণনা করে শেষ করা যায় না, ঠিক তেমনি আইনের ধারাও গণনা করে শেষ করা যায় না। বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে সর্বপ্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের আগে শুধু কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পাঠদান করানো হতো। ১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করার ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও চার বছরমেয়াদি সম্মান এবং এক বছরমেয়াদি এলএলএম প্রোগ্রামে আইন বিষয়ে পাঠদান করানো হচ্ছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন (প্রথমে ১৯৯২ সালে এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে) পাশ হওয়ার পর দেশে আইন শিক্ষার দ্বার অনেকটাই উন্মোচিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। যদিও বেসরকারি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষার মান নিয়ে শুরু থেকেই যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তথাপিও বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পাঠদানের ফলে অনেক শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে নিজেদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করে চলেছেন। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্নকারীরা পরে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি (এমফিল/পিএইচডি) অর্জন করার সুযোগ পেলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা ছাড়া উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করার সুযোগ পান না। কারণ, যৌক্তিক বিবেচনায় এবং শিক্ষার মানদণ্ডের নিরিখে এখন পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল বা পিএইচডি করার কোনো বিধান রাখা হয়নি।

যা হোক, আইনের একজন শিক্ষার্থী স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর তিনি জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের (জেএসসি) তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ হওয়ার সুযোগ পান। এতে অন্য কোনো বিষয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করতে পারেন না, যা আইনের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বিশেষ সুযোগই বটে। অপরদিকে অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান এবং এখানে আইন বিষয়ের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পান। আবার আইনের শিক্ষার্থীরা আইন বিষয়ে ডিগ্রি নেওয়ার পর আইনজীবী হওয়া ছাড়াও ব্যারিস্টার হওয়ার সুযোগ পান, যা অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীরা পান না। তা ছাড়া আইনে ডিগ্রিধারী একজন শিক্ষার্থী ব্যাংক, বীমা, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রিসার্চ ফার্মসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মানবাধিকার ও আইন বিষয়ক সংস্থা বা সংগঠনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও সহজেই বিভিন্ন পদে কাজ করার সুযোগ পান। এদিক থেকে বলা যায়, আইন বিষয়ের কর্মক্ষেত্র অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় অপেক্ষাকৃত বেশি।

খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন দেশে বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় থাকার পাশাপাশি আইন বিষয়ে ব্যাপকতার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিষয়ভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় (যেমন-কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তা ছাড়া একাধিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেশে। কিন্তু দুঃখের বিষয় দেশে এখন পর্যন্ত স্বতন্ত্র কোনো আইন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার সামগ্রিক কার্যক্রমকে অধিকতর গতিশীল করতে এবং দেশে আইনের শাসন আরও সুদৃঢ় করতে অধিকসংখ্যক দক্ষ বিচারক ও দক্ষ আইনজীবী দরকার। দেশে যত বেশি উচ্চশিক্ষিত, দক্ষ বিচারক ও আইনবিদ থাকবেন, তত দ্রুতই সম্ভব হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আইন বিষয়ে সচেতন প্রত্যেকেই এ কথা জানেন যে, আমাদের উপমহাদেশে আইনব্যবস্থা মূলত ‘কমন ল’ভিত্তিক। এখানে আনীত অপরাধীকে এ ব্যবস্থায় নিরপরাধ ভেবে আদালতে বিচার হয়। অভিযোগকারীকে আনীত অপরাধীর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করতে হয়। এতে দীর্ঘসূত্রতা আর ঝামেলার যেন অন্ত থাকে না। বিচারকের এ ক্ষেত্রে কোনো কিছু করার থাকে না। ‘সিভিল ল’ ব্যবস্থায় আনীত অপরাধীকে প্রমাণ করতে হয় যে, তিনি নির্দোষ। ফলে কেউ যেন কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ না আনতে পারে, সে জন্য প্রত্যেকেই নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে চায়। অহেতুক আন্দোলন ও নানা অপরাধ-সম্পৃক্ত কার্যকলাপ ‘সিভিল ল’ ব্যবস্থায় যথাসময়ে প্রশমিত করা সম্ভব হয়। আর সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা প্রবর্তনে গতিশীল আইনব্যবস্থায় শান্তি-শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। এদিক বিবেচনায়, আমাদের দেশে স্বতন্ত্র অন্তত একটি হলেও আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

বর্তমানে আমাদের দেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী। তুলনামূলক কম খরচে দেশে আইনে পড়াশোনা করে ছাত্রছাত্রীরা দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হতে পারেন। ফলে ভবিষ্যতে দক্ষ বিচারক ও আইনজীবী তৈরি করতে দেশে মানসম্পন্ন স্বতন্ত্র আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। ইতঃপূর্বে এ বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে। আবার সমাজের বিশিষ্টজনেরা বিভিন্ন সভা-সেমিনার ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ফলাফল শূন্য। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আইন বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ও আইন কলেজে আইন শাস্ত্রে অধ্যয়ন ও গবেষণা করানো হয় এবং এসব ইনস্টিটিউট ও কলেজের সংখ্যা শতাধিক। এগুলো সত্ত্বেও বর্তমানে গঠনমূলক এবং সৃষ্টিমুখী দিক দর্শনের বিবেচনায় আইন শিক্ষার জন্য ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন শহরে আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, ভারতের নয়াদিল্লি, বিশাখাপত্তনাম, হায়দরাবাদ, পাটনা, রায়পুর, গান্ধীনগর, ব্যাঙ্গালোর, কোচিন, ভূপাল, পুনা, চন্ডীগড়, মাদ্রাজ, কলকাতা ও অন্যান্য শহরে প্রায় ২৫-৩০টি আইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান মানসম্পন্ন আইন শিক্ষা উপহার দিয়ে আসছে। এসবের প্রাসঙ্গিকতায় বাংলাদেশের জন্য সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি দেশের জন্য অপরিহার্য বিষয় হয়ে পড়েছে। তবে এ ধরনের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণভাবে মূলত সরকারি পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করে। সবার এ কথা স্মরণ রাখা প্রয়োজন, সৃষ্টিমুখী আইন শিক্ষা প্রবর্তনে গতিশীল আইন ব্যবস্থার শান্তি-শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব জাতিকে উজ্জীবিত করতে পারে। এমতাবস্থায় দেশে আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের লক্ষ্যে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া দরকার। সবদিক বিবেচনা করে সরকার দেশে অন্তত একটি হলেও আইন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, চন্ডীগড় ইউনিভার্সিটি, পাঞ্জাব, ভারত

kekbabu@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন