শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা
jugantor
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা

  সম্পাদকীয়  

২৮ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কেবল আমাদের দেশে নয়, গোটা উপমহাদেশেই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয় ইংরেজদের উদ্যোগ আর চেষ্টায়। শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন আইন-কানুন ও বিধিবিধানেরও প্রবর্তক মূলত তারাই। দিনে দিনে ইংরেজদের প্রণীত এসব আইন-কানুন ও বিধিবিধানের ওপর ভিত্তি করেই প্রধানত আমাদের অঞ্চলে সময় সময় বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রায় ২০০ বছর শাসন করে দেশ থেকে ইংরেজদের বিদায় নেওয়ার পর আমরা নতুন করে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আটকে ছিলাম আরও চব্বিশটি বছর। লক্ষ্য করার বিষয়, কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে নয়-অন্যসব ক্ষেত্রেও একেবারে শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমরা ইংরেজ প্রণীত আইন-কানুনগুলোর খুব একটা রদবদল বা সংস্কার করতে পারিনি। রদবদল বা সংস্কার এবং নতুন আইন-কানুন প্রবর্তন একেবারেই হয়নি তা নয়, হয়েছে অবশ্যই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া রদবদল বা সংস্কার এবং নতুন কিছু করার নামে যখন যেখানেই হাত দেওয়া হয়েছে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে হোঁচট খেতে হয়েছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের বিপত্তি, যা এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে। দেখা গেছে, কোনো একটি বিষয়ে আইন জারি করা হলো। কয়েকদিন যেতে না যেতে, আইনটি বলবৎ বা কার্যকর করার আগেই তা সংশোধন করতে হয়েছে। অতীতে তো বটেই, এমনকি সাম্প্রতিককালেও এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে।

১৯৭১ সাল। এখন আর ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমল নয়। পাকিস্তানি শাসনও নয়। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের নিগড় থেকে বের হয়ে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছি। আমরা বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক। ইংরেজ-পাকিস্তানিদের হটিয়ে নিজেরা স্বাধীনভাবে পথ চলতে শুরু করেছি। পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) স্থাপন করতে হলে যেসব শর্ত পূরণ করার বাধ্যবাধকতা ছিল, স্বাধীনতা লাভের পর সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে তা অনেকটা শিথিল করা হয়। আগে শহর এলাকায় একটি মাধ্যমিক স্কুল স্থাপন করতে হলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কমপক্ষে এক একর এবং গ্রাম এলাকায় দেড় একর জমি থাকতে হতো। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শহরের ক্ষেত্রে তা আধা একর (৫০ শতাংশ) এবং গ্রামের ক্ষেত্রে এক একরে কমিয়ে আনা হয়। কলেজ প্রতিষ্ঠার বেলায়ও এমনই। শহরে তিন একরের স্থলে দেড় একর জমি থাকা চাই। অবশ্য গ্রামাঞ্চলে কোনো কলেজ স্থাপন করতে হলে আগের তিন একর জমি থাকার বিধানই স্বাধীনতার পর (১৯৭২) বহাল রাখা হয়। আর রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহরের ক্ষেত্রে কলেজের নামে এক একর জমি থাকলেই চলবে।

গ্রুপ অনুযায়ী (মানবিক, বিজ্ঞান ইত্যাদি) রিজার্ভ ফান্ডের ব্যাপারেও আগের শর্তগুলো শিথিল করা হয়। পাকিস্তান আমল থেকে গ্রুপ অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা জমা রাখার বিধান ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কলেজের একটি গ্রুপ খোলার জন্য শুধু ৫ হাজার টাকার রিজার্ভ ফান্ড থাকতে হবে। এতে আরও বলা হয়, প্রতিটি অতিরিক্ত গ্রুপ খোলার জন্য আড়াই হাজার টাকার রিজার্ভ ফান্ড হলেই চলবে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) স্থাপনের ব্যাপারে ১৭ আগস্ট ১৯৭২ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি ওই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো; এতে বলা হয়-‘দুইটি কলেজ বা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব কী হবে, তা নির্ধারণে আঞ্চলিক প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতে হবে।’

এই ছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পর দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরকারের নীতি ও মনোভাব। দিন যায়, মাস ও বছরও গড়াতে থাকে। এভাবে দশকের পর দশক। এক সরকার যায়, নতুন সরকার আসে। দেখতে দেখতে এভাবেই পঞ্চাশ বছর পার। খুবই আক্ষেপের ব্যাপার হলো, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে সেই পাকিস্তান আমলেও মোটামুটি মানানসই একটি নীতিমালা ছিল; কিন্তু স্বাধীন দেশে এত বছর পর এ ক্ষেত্রে আমরা কী দেখছি?

২.

‘চারঘাটের এক ইউনিয়নে ছয়টি কলেজ!’ এটি ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের শিরোনাম। উল্লিখিত খবরটি শুরু করা হয়েছে ঠিক এভাবে-শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রাপ্যতার চেয়ে আটটি কলেজ বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর প্রস্তাবিত কলেজ মিলে এ সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে চারঘাট উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে কারিগরি ও সাধারণ কলেজ মিলে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০-এ। ‘এর মধ্যে একটি ইউনিয়নেই কলেজ হচ্ছে ছয়টি।’ পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির আশঙ্কায় খবরের বিস্তারিত আর উল্লেখ করলাম না।

‘এত কলেজ কেন : এভাবে শিক্ষার মান বাড়ানো যায় না।’ এটি অবশ্য কোনো খবরের শিরোনাম নয়। প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে লেখা সম্পাদকীয়র শিরোনাম এটি। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ওই সম্পাদকীয়টি শুরু করা হয় এভাবে-‘রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজ চালু করলে যা হয়, ঠিক তা-ই হয়েছে যশোরের মনিরামপুর উপজেলায়। সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গত ১০-১১ বছরে এ এলাকায় একের পর এক ডজনখানেক কলেজ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১৫টি কলেজ আছে। মাত্র ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ মানুষ এখানে বাস করে। নিয়ম আছে ৭৫ হাজার বসবাসকারীর জন্য একটি কলেজ থাকতে পারে। সেই হিসাবে বড়জোর ছয়টি কলেজই এখানে থাকতে পারত। কিন্তু কলেজের বন্যায় শিক্ষা ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সময় যত এগিয়ে আসতে থাকে, ততই আতঙ্কিত হতে থাকেন কলেজ শিক্ষকরা। কলেজের পরিচালনা পর্ষদ আগেই বলে দেয়, শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে না পারলে শিক্ষকদের রুটি-রুজির ওপরই আঘাত আসবে। সুতরাং মানুষ গড়ার কারিগররা তখন শিক্ষার্থী-শিকারি হয়ে সময় কাটান। বিষয়টি দুঃখজনক।’ একই কারণে সম্পাদকীয়টির বাকি অংশ উল্লেখ না করে ক্ষান্ত দিলাম।

‘নিয়োগ-বাণিজ্যের স্বার্থে সুন্দরগঞ্জে নয় কিলোমিটারেই ১৩টি কলেজ!’ শিরোনামের খবরটি ২০০৮ সালের জুলাই মাসের। তিন কলামে ছাপানো বেশ বড় ওই খবরটিতে বলা হয়-‘নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় মাত্র নয় কিলোমিটার এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে ১৩টি কলেজ। এখানে ৫০ থেকে ২০০ গজ দূরত্বের মধ্যেও একাধিক কলেজ আছে। সুন্দরগঞ্জে ১৯৯৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ১২টি কলেজ গড়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে, শিক্ষা বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে ও তৎকালীন সাংসদের প্রভাবে নিয়োগ-বাণিজ্যের স্বার্থে এসব কলেজ গড়ে উঠেছে।’

এ তো গেল আজ থেকে দশ বা পনেরো বছর আগের কথা। নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন নিয়ে হাল-জমানায় কীসব হচ্ছে? ‘সাংসদদের চাপে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিতে হয়’-একজন সংসদ-সদস্যের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী (২০০৯-২০১৮) নুরুল ইসলাম নাহিদ সংসদকে এ কথা জানান। বক্তব্যটি বছর ছয়েক আগের (২০১৬) হলেও এর প্রাসঙ্গিকতাকে আজও অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করি না। শিক্ষামন্ত্রী (নুরুল ইসলাম নাহিদ) বলেন, ‘সাংসদরা অনুরোধ করেন বলে আমাদের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিতে হয়। এক কথায় সাংসদদের চাপে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার অনুমতি দিতে হয়। আমরা সেই সময় বলে দিই অনুমতি দিচ্ছি, তবে বেতন দিতে পারব না। যদিও আমরা বেতন দিতে বাধ্য।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এবার (২০১৬) যারা এসএসসি পাশ করেছে, তাদের সবাই ভর্তি হওয়ার পরও সারা দেশের সাত লাখ আসন ফাঁকা আছে। বোঝেন তাহলে কী পরিমাণ কলেজ আমরা খুলেছি।’ (সূত্র : বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ২৭ জুলাই ২০১৬)।

রাজনৈতিক বিবেচনা বা সংসদ-সদস্যদের চাপে কলেজ প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রতিষ্ঠিত কলেজকে ডিগ্রি-স্তরে উন্নীতকরণের প্রয়াস নতুন নয়; বরং অনেক পুরোনো। এ ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দল বা কার নেতৃত্বে গঠিত সরকার ক্ষমতায়, সেটি বড় কথা নয়। অনেকটা যেন ‘সব শেয়ালের এক রা’। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনা মানে চাপের কাছে নতি স্বীকার করা।

প্রচলিত নীতিমালা লঙ্ঘন এবং কোনো রকম বাছবিচার না করে, কখনো কখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় যেখানে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। এটা খুবই অশুভ এবং এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা

 সম্পাদকীয় 
২৮ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কেবল আমাদের দেশে নয়, গোটা উপমহাদেশেই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার গোড়াপত্তন হয় ইংরেজদের উদ্যোগ আর চেষ্টায়। শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন আইন-কানুন ও বিধিবিধানেরও প্রবর্তক মূলত তারাই। দিনে দিনে ইংরেজদের প্রণীত এসব আইন-কানুন ও বিধিবিধানের ওপর ভিত্তি করেই প্রধানত আমাদের অঞ্চলে সময় সময় বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এবং পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রায় ২০০ বছর শাসন করে দেশ থেকে ইংরেজদের বিদায় নেওয়ার পর আমরা নতুন করে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে আটকে ছিলাম আরও চব্বিশটি বছর। লক্ষ্য করার বিষয়, কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে নয়-অন্যসব ক্ষেত্রেও একেবারে শুরু থেকে এ পর্যন্ত আমরা ইংরেজ প্রণীত আইন-কানুনগুলোর খুব একটা রদবদল বা সংস্কার করতে পারিনি। রদবদল বা সংস্কার এবং নতুন আইন-কানুন প্রবর্তন একেবারেই হয়নি তা নয়, হয়েছে অবশ্যই। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া রদবদল বা সংস্কার এবং নতুন কিছু করার নামে যখন যেখানেই হাত দেওয়া হয়েছে, সেখানেই কোনো না কোনোভাবে হোঁচট খেতে হয়েছে। এতে সৃষ্টি হয়েছে নানা ধরনের বিপত্তি, যা এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে। দেখা গেছে, কোনো একটি বিষয়ে আইন জারি করা হলো। কয়েকদিন যেতে না যেতে, আইনটি বলবৎ বা কার্যকর করার আগেই তা সংশোধন করতে হয়েছে। অতীতে তো বটেই, এমনকি সাম্প্রতিককালেও এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে।

১৯৭১ সাল। এখন আর ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমল নয়। পাকিস্তানি শাসনও নয়। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের নিগড় থেকে বের হয়ে আমরা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠন করেছি। আমরা বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক। ইংরেজ-পাকিস্তানিদের হটিয়ে নিজেরা স্বাধীনভাবে পথ চলতে শুরু করেছি। পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানে নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (মাধ্যমিক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) স্থাপন করতে হলে যেসব শর্ত পূরণ করার বাধ্যবাধকতা ছিল, স্বাধীনতা লাভের পর সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে তা অনেকটা শিথিল করা হয়। আগে শহর এলাকায় একটি মাধ্যমিক স্কুল স্থাপন করতে হলে ওই প্রতিষ্ঠানের নামে কমপক্ষে এক একর এবং গ্রাম এলাকায় দেড় একর জমি থাকতে হতো। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে শহরের ক্ষেত্রে তা আধা একর (৫০ শতাংশ) এবং গ্রামের ক্ষেত্রে এক একরে কমিয়ে আনা হয়। কলেজ প্রতিষ্ঠার বেলায়ও এমনই। শহরে তিন একরের স্থলে দেড় একর জমি থাকা চাই। অবশ্য গ্রামাঞ্চলে কোনো কলেজ স্থাপন করতে হলে আগের তিন একর জমি থাকার বিধানই স্বাধীনতার পর (১৯৭২) বহাল রাখা হয়। আর রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য বিভাগীয় শহরের ক্ষেত্রে কলেজের নামে এক একর জমি থাকলেই চলবে।

গ্রুপ অনুযায়ী (মানবিক, বিজ্ঞান ইত্যাদি) রিজার্ভ ফান্ডের ব্যাপারেও আগের শর্তগুলো শিথিল করা হয়। পাকিস্তান আমল থেকে গ্রুপ অনুযায়ী ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা জমা রাখার বিধান ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কলেজের একটি গ্রুপ খোলার জন্য শুধু ৫ হাজার টাকার রিজার্ভ ফান্ড থাকতে হবে। এতে আরও বলা হয়, প্রতিটি অতিরিক্ত গ্রুপ খোলার জন্য আড়াই হাজার টাকার রিজার্ভ ফান্ড হলেই চলবে। নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা) স্থাপনের ব্যাপারে ১৭ আগস্ট ১৯৭২ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি ওই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো; এতে বলা হয়-‘দুইটি কলেজ বা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব কী হবে, তা নির্ধারণে আঞ্চলিক প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতে হবে।’

এই ছিল স্বাধীনতার অব্যবহিত পর দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে সরকারের নীতি ও মনোভাব। দিন যায়, মাস ও বছরও গড়াতে থাকে। এভাবে দশকের পর দশক। এক সরকার যায়, নতুন সরকার আসে। দেখতে দেখতে এভাবেই পঞ্চাশ বছর পার। খুবই আক্ষেপের ব্যাপার হলো, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে সেই পাকিস্তান আমলেও মোটামুটি মানানসই একটি নীতিমালা ছিল; কিন্তু স্বাধীন দেশে এত বছর পর এ ক্ষেত্রে আমরা কী দেখছি?

২.

‘চারঘাটের এক ইউনিয়নে ছয়টি কলেজ!’ এটি ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের প্রথম শ্রেণির একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরের শিরোনাম। উল্লিখিত খবরটি শুরু করা হয়েছে ঠিক এভাবে-শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রাপ্যতার চেয়ে আটটি কলেজ বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আর প্রস্তাবিত কলেজ মিলে এ সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে চারঘাট উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে কারিগরি ও সাধারণ কলেজ মিলে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০-এ। ‘এর মধ্যে একটি ইউনিয়নেই কলেজ হচ্ছে ছয়টি।’ পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির আশঙ্কায় খবরের বিস্তারিত আর উল্লেখ করলাম না।

‘এত কলেজ কেন : এভাবে শিক্ষার মান বাড়ানো যায় না।’ এটি অবশ্য কোনো খবরের শিরোনাম নয়। প্রকাশিত খবরের ওপর ভিত্তি করে লেখা সম্পাদকীয়র শিরোনাম এটি। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত ওই সম্পাদকীয়টি শুরু করা হয় এভাবে-‘রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজ চালু করলে যা হয়, ঠিক তা-ই হয়েছে যশোরের মনিরামপুর উপজেলায়। সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গত ১০-১১ বছরে এ এলাকায় একের পর এক ডজনখানেক কলেজ চালু করা হয়েছে। বর্তমানে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ১৫টি কলেজ আছে। মাত্র ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ মানুষ এখানে বাস করে। নিয়ম আছে ৭৫ হাজার বসবাসকারীর জন্য একটি কলেজ থাকতে পারে। সেই হিসাবে বড়জোর ছয়টি কলেজই এখানে থাকতে পারত। কিন্তু কলেজের বন্যায় শিক্ষা ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের সময় যত এগিয়ে আসতে থাকে, ততই আতঙ্কিত হতে থাকেন কলেজ শিক্ষকরা। কলেজের পরিচালনা পর্ষদ আগেই বলে দেয়, শিক্ষার্থী সংগ্রহ করতে না পারলে শিক্ষকদের রুটি-রুজির ওপরই আঘাত আসবে। সুতরাং মানুষ গড়ার কারিগররা তখন শিক্ষার্থী-শিকারি হয়ে সময় কাটান। বিষয়টি দুঃখজনক।’ একই কারণে সম্পাদকীয়টির বাকি অংশ উল্লেখ না করে ক্ষান্ত দিলাম।

‘নিয়োগ-বাণিজ্যের স্বার্থে সুন্দরগঞ্জে নয় কিলোমিটারেই ১৩টি কলেজ!’ শিরোনামের খবরটি ২০০৮ সালের জুলাই মাসের। তিন কলামে ছাপানো বেশ বড় ওই খবরটিতে বলা হয়-‘নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় মাত্র নয় কিলোমিটার এলাকার মধ্যে গড়ে উঠেছে ১৩টি কলেজ। এখানে ৫০ থেকে ২০০ গজ দূরত্বের মধ্যেও একাধিক কলেজ আছে। সুন্দরগঞ্জে ১৯৯৫ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সাত বছরে ১২টি কলেজ গড়ে উঠেছে। অভিযোগ আছে, শিক্ষা বোর্ডের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে ও তৎকালীন সাংসদের প্রভাবে নিয়োগ-বাণিজ্যের স্বার্থে এসব কলেজ গড়ে উঠেছে।’

এ তো গেল আজ থেকে দশ বা পনেরো বছর আগের কথা। নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন নিয়ে হাল-জমানায় কীসব হচ্ছে? ‘সাংসদদের চাপে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিতে হয়’-একজন সংসদ-সদস্যের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী (২০০৯-২০১৮) নুরুল ইসলাম নাহিদ সংসদকে এ কথা জানান। বক্তব্যটি বছর ছয়েক আগের (২০১৬) হলেও এর প্রাসঙ্গিকতাকে আজও অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করি না। শিক্ষামন্ত্রী (নুরুল ইসলাম নাহিদ) বলেন, ‘সাংসদরা অনুরোধ করেন বলে আমাদের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিতে হয়। এক কথায় সাংসদদের চাপে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার অনুমতি দিতে হয়। আমরা সেই সময় বলে দিই অনুমতি দিচ্ছি, তবে বেতন দিতে পারব না। যদিও আমরা বেতন দিতে বাধ্য।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এবার (২০১৬) যারা এসএসসি পাশ করেছে, তাদের সবাই ভর্তি হওয়ার পরও সারা দেশের সাত লাখ আসন ফাঁকা আছে। বোঝেন তাহলে কী পরিমাণ কলেজ আমরা খুলেছি।’ (সূত্র : বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, ২৭ জুলাই ২০১৬)।

রাজনৈতিক বিবেচনা বা সংসদ-সদস্যদের চাপে কলেজ প্রতিষ্ঠা কিংবা প্রতিষ্ঠিত কলেজকে ডিগ্রি-স্তরে উন্নীতকরণের প্রয়াস নতুন নয়; বরং অনেক পুরোনো। এ ক্ষেত্রে কোন রাজনৈতিক দল বা কার নেতৃত্বে গঠিত সরকার ক্ষমতায়, সেটি বড় কথা নয়। অনেকটা যেন ‘সব শেয়ালের এক রা’। এখানে রাজনৈতিক বিবেচনা মানে চাপের কাছে নতি স্বীকার করা।

প্রচলিত নীতিমালা লঙ্ঘন এবং কোনো রকম বাছবিচার না করে, কখনো কখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় যেখানে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া দরকার। এটা খুবই অশুভ এবং এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন