সুইস ব্যাংকে অর্থ-পাহাড়ের উৎস কী?
jugantor
সুইস ব্যাংকে অর্থ-পাহাড়ের উৎস কী?

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

৩০ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৬ জুন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের বার্ষিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যান ২০২২-এর তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

উক্ত প্রতিবেদন মতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশিদের রাখা ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার সুইস ফ্রাঁ একলাফে প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৩৬৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৬ টাকা। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ২২ হাজার সুইস ফ্রাঁ।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০০ সালে সুইস ব্যাংকে জমা বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৯৩ কোটি টাকা। প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২ সালে হয় ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্রাঁ, ২০১৩ সালে ৩৭ কোটি ২০ লাখ, ২০১৪ সালে ৫০ কোটি ৬০ লাখ, ২০১৫ সালে ৫৫ কোটি ৮ লাখ, ২০১৬ সালে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ, ২০১৭ সালে ৪৮ কোটি ১৩ লাখ এবং ২০১৮ সালে হয় ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ।

উল্লেখিত প্রতিবেদন অনুসারে, সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে বিশ্বে এ বছর প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। ২০২১ সাল নাগাদ দেশটির আমানতের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৫২০ কোটি ফ্রাঁ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের আছে ১৭ হাজার ৭৩৩ কোটি এবং তৃতীয় সিঙ্গাপুরের আছে ৫ হাজার ৬৩ কোটি ফ্রাঁ। অন্যান্য দেশের মধ্যে চীন ১ হাজার ৯৩ কোটি, রাশিয়া ২ হাজার ১৩৭ কোটি, সৌদি আরব ১ হাজার ৪৫ কোটি, থাইল্যান্ড ৪৩২ কোটি, তাইওয়ানের ১ হাজার ৪৩ কোটি, জাপানের ২ হাজার ৬০ কোটি, তুরস্ক ৭৪২ কোটি ও মালয়েশিয়ার আছে ২১৫ কোটি ফ্রাঁ। দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে ভারত, বাংলাদেশসহ বেড়েছে পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও ভুটানের এবং কমেছে আফগানিস্তান, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের আমানতের পরিমাণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান।

এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, সুইজারল্যান্ডের প্রচলিত আইন অনুসারে দেশটির ব্যাংকগুলোর গোপনীয়তার নীতির কারণে সারা বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনেক বাংলাদেশি এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নানাভাবে অবৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থ পাচার করে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা করে। গ্রাহকদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত সূত্রে পাচারের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা আমানতকারীর রক্ষিত অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী নাগরিকরা দেশটিতে অর্থ জমা রাখেন। অনেকের ধারণা, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশিদের মোট টাকার মধ্যে বৈধ-অবৈধ সব অর্থই রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশিকে বিদেশে টাকা জমা রাখার বিশেষ অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং কোনো বাংলাদেশি প্রবাসীও সরকারকে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার তথ্য জমা দেয়নি। তবে বিদেশি নাগরিকত্ব-পাসপোর্টধারী ব্যক্তিবিশেষের অর্থ জমা করার বিষয়টি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং, সুইস ব্যাংকে জমা সব টাকা কোনো না কোনোভাবে পাচারকৃত অর্থ হিসাবে অনুমিত।

১৮ জুন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের ২০ বছর’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, ‘বাংলাদেশের ৬৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ সম্পর্কে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। সেসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।

এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৮০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করেছে বিএফআইইউ।’ প্রাসঙ্গিকতায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘শুধু সুইস ব্যাংক নয়; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য আসছে। বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক। কারণ, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের যে টাকা রাখা আছে, সেটি মূলত দুর্নীতির। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তিনটি প্রধান কারণের মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলেই অর্থ পাচারও বেড়েছে।’

আমাদের সবার জানা, সুইস ব্যাংকে রাখা অর্থ ফেরত আনা তো দূরের কথা, সুইস ব্যাংক থেকে কোনো তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থাই বাংলাদেশের নেই। ইতোমধ্যে বিশ্বের ১২১টি দেশ ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এইওআই)’ আন্তর্জাতিক কাঠামোর মাধ্যমে সুইস ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের তথ্য পাচ্ছে। মূলত কর ফাঁকির অসৎ উদ্দেশ্য প্রতিরোধে জি-২০ এবং ওইসিডিভুক্ত ৩৮টি দেশ নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময়ের এই কাঠামো চালু রয়েছে। কোনো দেশের নাগরিক নিজ দেশে কর ফাঁকি দিয়ে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখলে এই কাঠামোর আওতায় সেই তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় এই তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থায় আরও ৪২টি দেশ যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও দুঃখজনকভাবে তালিকায় নাম নেই বাংলাদেশের। দেশের সচেতন মহলের মতে, বাংলাদেশ শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে গেছে; কিন্তু তথ্য পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হওয়ার কার্যকর পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয়। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আন্তর্জাতিক কাঠামোয় যুক্ত থেকে তথ্য পাওয়া শুরু করায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের রাখা অর্থ বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছিল।

২২ মে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ‘বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২২-২৩ : একটি জনগণতান্ত্রিক বাজেট প্রস্তাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেছেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি কালোটাকা এবং মুদ্রা পাচারও থেমে নেই। ১৯৭২-৭৩ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে কালোটাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮ লাখ ৬১ হাজার কোটিতে। উল্লেখ্য, সময়ে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে ৮ লাখ কোটি টাকা।’ গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি’র ভাষ্যমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে পাচার হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু ২০১৫ সালে পাচার হয়ে যায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের সাড়ে ১৭ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার মনিটরিং সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিআইএফইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, আমদানি-রপ্তানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কারসাজি আর হুন্ডির আড়ালে অর্থপাচার করছে অর্থ পাচারকারী সিন্ডিকেট।

পাচার হওয়া এসব অর্থ চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ডসহ ১০টি দেশে। বিদেশে টাকা পাচার রোধ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত ও পাচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য রাষ্ট্রের ৮টি সংস্থা একযোগে কাজ করার পরও ঠেকানো যাচ্ছে না অর্থ পাচার কিংবা ফেরত আনা সম্ভব হচ্ছে না পাচার হওয়া অর্থ।

২ মে ২০২১ প্রকাশিত জিএফআই-এর অপর প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে ৯১১ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫-২০১৪ সময়কালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যার দেশীয় মুদ্রামান ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। ওই সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৪-২০০৫-২০০৬-২০০৭-২০০৮-২০০৯-২০১০-২০১১-২০১২-২০১৩-২০১৪ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ যথাক্রমে ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ, ৪২৬ কোটি ২০ লাখ, ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ, ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ, ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ, ৬১২ কোটি ৭০ লাখ, ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ, ৫৯২ কোটি ১০ লাখ, ৭২২ কোটি ৫০ লাখ, ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ এবং ৯১১ কোটি ডলার। ২৭ নভেম্বর ২০২০ জার্মানির আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টার ‘ডিডাব্লিউ’র প্রতিবেদন অনুসারে, বিগত ১০ বছরে দেশের দুটি বাজেটের সমপরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।

‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)’র সূত্রানুযায়ী, ২০১৩ সালে পাচারকৃত অর্থ যথাক্রমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেটের ৩.৬ গুণ ও ৮.২ গুণের অধিক এবং মোট দেশজ উৎপাদনের সাড়ে ৫.৫ শতাংশ। এ ছাড়াও বিদেশে বিনিয়োগ বা মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে সেকেন্ড হোম প্রতিষ্ঠায় অবৈধ অর্থ পাচারের সঠিক তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রমতে অর্থ পাচারের পরিমাণ এক্ষেত্রেও অনেক বেশি।

সম্প্রতি ঘোষিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ বা সম্পদ বিনা প্রশ্নে দেশে আনার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রতিভাত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এটিকে অনৈতিক, বৈষম্যমূলক ও বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির মতে, নামমাত্র ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার করা টাকা প্রশ্নহীনভাবে দেশে আনার সুযোগের মানে স্পষ্টতই পাচারকারীদের অনৈতিক সুরক্ষা ও পুরস্কার প্রদান। এ সুযোগ অর্থ পাচার তথা সার্বিকভাবে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে, যা সংবিধান পরিপন্থি এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’ ঘোষণার জন্য অবমাননাকর। অন্যদিকে বৈধ উপার্জননির্ভর করদাতাদের জন্য এ প্রস্তাব বৈষম্যমূলক। এ সুযোগ বাতিল করে অর্থ পাচারকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় যে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, তা অনুসরণ করে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণে সংস্থাটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

বিভিন্ন অবৈধ-অনৈতিক পন্থায় উপার্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ঘটনায় যারপরনাই দেশবাসী সংক্ষুব্ধ। অবশ্যই এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বিভিন্ন সংস্থার গৃহীত উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। দেশে আইনের শাসন সুরক্ষা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে গণমানুষের কষ্টার্জিত মেধা-শ্রমের বিপরীতে প্রদেয় কর-ভ্যাট ইত্যাদির লুণ্ঠনে স্বল্পসংখ্যক ঘৃণ্য ব্যক্তির লোভ-লালসায় কূটচরিত্রের বহিঃপ্রকাশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশবাসীসহ সমগ্র বিশ্ব সম্যক অবগত আছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ও মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় পরিপূর্ণ ঋদ্ধ বর্তমান সরকার। সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অদম্য অগ্রগতিতে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা পর্যুদস্ত করার লক্ষ্যে এসব সিন্ডিকেটেড অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে কিনা, তার নিবিড়-গভীর তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের অকল্পনীয় বিস্ময়কর অর্জন এবং বিশ্বে বাঙালি জাতিরাষ্ট্রকে সুমহান মর্যাদায় আসীন করার অভূতপূর্ব অহংবোধকে ন্যূনতম ম্লান করার যে কোনো অপচেষ্টা-অপকৌশল আপামর জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হবেই। সমগ্র দেশপ্রেমিক জনগণের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবিচল ঐক্যবদ্ধ চলমান যুদ্ধে এ জাতীয় দুর্বৃত্তায়ন অবশ্যই পরাস্ত হবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সুইস ব্যাংকে অর্থ-পাহাড়ের উৎস কী?

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
৩০ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

১৬ জুন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের বার্ষিক ব্যাংকিং পরিসংখ্যান ২০২২-এর তথ্যসূত্র অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।

উক্ত প্রতিবেদন মতে, ২০২০ সালে বাংলাদেশিদের রাখা ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ৩৩ হাজার সুইস ফ্রাঁ একলাফে প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২১ সালে দাঁড়িয়েছে ৮৭ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৩৬৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৬ টাকা। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি শুরুর আগে ২০১৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ৬০ কোটি ৩০ লাখ ২২ হাজার সুইস ফ্রাঁ।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০০ সালে সুইস ব্যাংকে জমা বাংলাদেশিদের টাকার পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ কোটি ১৯ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৯৩ কোটি টাকা। প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১২ সালে হয় ২২ কোটি ৯০ লাখ ফ্রাঁ, ২০১৩ সালে ৩৭ কোটি ২০ লাখ, ২০১৪ সালে ৫০ কোটি ৬০ লাখ, ২০১৫ সালে ৫৫ কোটি ৮ লাখ, ২০১৬ সালে ৬৬ কোটি ১৯ লাখ, ২০১৭ সালে ৪৮ কোটি ১৩ লাখ এবং ২০১৮ সালে হয় ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ফ্রাঁ।

উল্লেখিত প্রতিবেদন অনুসারে, সুইস ব্যাংকে আমানত রাখার দিক থেকে বিশ্বে এ বছর প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাজ্য। ২০২১ সাল নাগাদ দেশটির আমানতের পরিমাণ ৩৭ হাজার ৫২০ কোটি ফ্রাঁ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের আছে ১৭ হাজার ৭৩৩ কোটি এবং তৃতীয় সিঙ্গাপুরের আছে ৫ হাজার ৬৩ কোটি ফ্রাঁ। অন্যান্য দেশের মধ্যে চীন ১ হাজার ৯৩ কোটি, রাশিয়া ২ হাজার ১৩৭ কোটি, সৌদি আরব ১ হাজার ৪৫ কোটি, থাইল্যান্ড ৪৩২ কোটি, তাইওয়ানের ১ হাজার ৪৩ কোটি, জাপানের ২ হাজার ৬০ কোটি, তুরস্ক ৭৪২ কোটি ও মালয়েশিয়ার আছে ২১৫ কোটি ফ্রাঁ। দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে ভারত, বাংলাদেশসহ বেড়েছে পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও ভুটানের এবং কমেছে আফগানিস্তান, শ্রীলংকা ও মিয়ানমারের আমানতের পরিমাণ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই রয়েছে বাংলাদেশের অবস্থান।

এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, সুইজারল্যান্ডের প্রচলিত আইন অনুসারে দেশটির ব্যাংকগুলোর গোপনীয়তার নীতির কারণে সারা বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের পাশাপাশি অনেক বাংলাদেশি এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে নানাভাবে অবৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থ পাচার করে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা করে। গ্রাহকদের পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত সূত্রে পাচারের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা আমানতকারীর রক্ষিত অর্থের পরিমাণ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী নাগরিকরা দেশটিতে অর্থ জমা রাখেন। অনেকের ধারণা, সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশিদের মোট টাকার মধ্যে বৈধ-অবৈধ সব অর্থই রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশিকে বিদেশে টাকা জমা রাখার বিশেষ অনুমোদন দেওয়া হয়নি এবং কোনো বাংলাদেশি প্রবাসীও সরকারকে সুইস ব্যাংকে টাকা রাখার তথ্য জমা দেয়নি। তবে বিদেশি নাগরিকত্ব-পাসপোর্টধারী ব্যক্তিবিশেষের অর্থ জমা করার বিষয়টি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সুতরাং, সুইস ব্যাংকে জমা সব টাকা কোনো না কোনোভাবে পাচারকৃত অর্থ হিসাবে অনুমিত।

১৮ জুন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধ কার্যক্রমের ২০ বছর’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, ‘বাংলাদেশের ৬৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ সম্পর্কে সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ। সেসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, দুদক ও তদন্তকারী সংস্থাকে দেওয়া হয়েছে।

এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৮০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করেছে বিএফআইইউ।’ প্রাসঙ্গিকতায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘শুধু সুইস ব্যাংক নয়; বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টেও বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তথ্য আসছে। বিষয়টি গভীর উদ্বেগজনক। কারণ, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশের যে টাকা রাখা আছে, সেটি মূলত দুর্নীতির। বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের তিনটি প্রধান কারণের মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি বেড়েছে বলেই অর্থ পাচারও বেড়েছে।’

আমাদের সবার জানা, সুইস ব্যাংকে রাখা অর্থ ফেরত আনা তো দূরের কথা, সুইস ব্যাংক থেকে কোনো তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থাই বাংলাদেশের নেই। ইতোমধ্যে বিশ্বের ১২১টি দেশ ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (এইওআই)’ আন্তর্জাতিক কাঠামোর মাধ্যমে সুইস ব্যাংক থেকে আমানতকারীদের তথ্য পাচ্ছে। মূলত কর ফাঁকির অসৎ উদ্দেশ্য প্রতিরোধে জি-২০ এবং ওইসিডিভুক্ত ৩৮টি দেশ নিয়ে ২০১৭ সাল থেকে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিনিময়ের এই কাঠামো চালু রয়েছে। কোনো দেশের নাগরিক নিজ দেশে কর ফাঁকি দিয়ে সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখলে এই কাঠামোর আওতায় সেই তথ্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

স্বয়ংক্রিয় এই তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থায় আরও ৪২টি দেশ যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও দুঃখজনকভাবে তালিকায় নাম নেই বাংলাদেশের। দেশের সচেতন মহলের মতে, বাংলাদেশ শুধু বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে গেছে; কিন্তু তথ্য পাওয়ার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি এবং আন্তর্জাতিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হওয়ার কার্যকর পদক্ষেপও দৃশ্যমান নয়। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আন্তর্জাতিক কাঠামোয় যুক্ত থেকে তথ্য পাওয়া শুরু করায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত সুইস ব্যাংকে ভারতীয়দের রাখা অর্থ বিপুলভাবে হ্রাস পেয়েছিল।

২২ মে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ‘বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা ২০২২-২৩ : একটি জনগণতান্ত্রিক বাজেট প্রস্তাব’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত বলেছেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি কালোটাকা এবং মুদ্রা পাচারও থেমে নেই। ১৯৭২-৭৩ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে কালোটাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮ লাখ ৬১ হাজার কোটিতে। উল্লেখ্য, সময়ে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে ৮ লাখ কোটি টাকা।’ গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটেগ্রিটি’র ভাষ্যমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৬৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে পাচার হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু ২০১৫ সালে পাচার হয়ে যায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের সাড়ে ১৭ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ পাচার মনিটরিং সংস্থা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিআইএফইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, আমদানি-রপ্তানিসহ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কারসাজি আর হুন্ডির আড়ালে অর্থপাচার করছে অর্থ পাচারকারী সিন্ডিকেট।

পাচার হওয়া এসব অর্থ চলে যাচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, থাইল্যান্ডসহ ১০টি দেশে। বিদেশে টাকা পাচার রোধ, পাচারকৃত অর্থ ফেরত ও পাচারকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার জন্য রাষ্ট্রের ৮টি সংস্থা একযোগে কাজ করার পরও ঠেকানো যাচ্ছে না অর্থ পাচার কিংবা ফেরত আনা সম্ভব হচ্ছে না পাচার হওয়া অর্থ।

২ মে ২০২১ প্রকাশিত জিএফআই-এর অপর প্রতিবেদন মতে, ২০১৪ সালে বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে ৯১১ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫-২০১৪ সময়কালে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যার দেশীয় মুদ্রামান ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা। ওই সংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, ২০০৪-২০০৫-২০০৬-২০০৭-২০০৮-২০০৯-২০১০-২০১১-২০১২-২০১৩-২০১৪ সালে অর্থ পাচারের পরিমাণ যথাক্রমে ৩৩৪ কোটি ৭০ লাখ, ৪২৬ কোটি ২০ লাখ, ৩৩৭ কোটি ৮০ লাখ, ৪০৯ কোটি ৮০ লাখ, ৬৪৪ কোটি ৩০ লাখ, ৬১২ কোটি ৭০ লাখ, ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ, ৫৯২ কোটি ১০ লাখ, ৭২২ কোটি ৫০ লাখ, ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ এবং ৯১১ কোটি ডলার। ২৭ নভেম্বর ২০২০ জার্মানির আন্তর্জাতিক ব্রডকাস্টার ‘ডিডাব্লিউ’র প্রতিবেদন অনুসারে, বিগত ১০ বছরে দেশের দুটি বাজেটের সমপরিমাণ প্রায় সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।

‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)’র সূত্রানুযায়ী, ২০১৩ সালে পাচারকৃত অর্থ যথাক্রমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বাজেটের ৩.৬ গুণ ও ৮.২ গুণের অধিক এবং মোট দেশজ উৎপাদনের সাড়ে ৫.৫ শতাংশ। এ ছাড়াও বিদেশে বিনিয়োগ বা মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশে সেকেন্ড হোম প্রতিষ্ঠায় অবৈধ অর্থ পাচারের সঠিক তথ্য না থাকলেও বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রমতে অর্থ পাচারের পরিমাণ এক্ষেত্রেও অনেক বেশি।

সম্প্রতি ঘোষিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পাচার হওয়া অর্থ বা সম্পদ বিনা প্রশ্নে দেশে আনার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া প্রতিভাত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এটিকে অনৈতিক, বৈষম্যমূলক ও বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছে। সংস্থাটির মতে, নামমাত্র ৭ শতাংশ কর দিয়ে পাচার করা টাকা প্রশ্নহীনভাবে দেশে আনার সুযোগের মানে স্পষ্টতই পাচারকারীদের অনৈতিক সুরক্ষা ও পুরস্কার প্রদান। এ সুযোগ অর্থ পাচার তথা সার্বিকভাবে দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে, যা সংবিধান পরিপন্থি এবং প্রধানমন্ত্রীর ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা’ ঘোষণার জন্য অবমাননাকর। অন্যদিকে বৈধ উপার্জননির্ভর করদাতাদের জন্য এ প্রস্তাব বৈষম্যমূলক। এ সুযোগ বাতিল করে অর্থ পাচারকারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় যে আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে, তা অনুসরণ করে পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণে সংস্থাটি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

বিভিন্ন অবৈধ-অনৈতিক পন্থায় উপার্জিত হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের ঘটনায় যারপরনাই দেশবাসী সংক্ষুব্ধ। অবশ্যই এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান এবং বিভিন্ন সংস্থার গৃহীত উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। দেশে আইনের শাসন সুরক্ষা ও জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে গণমানুষের কষ্টার্জিত মেধা-শ্রমের বিপরীতে প্রদেয় কর-ভ্যাট ইত্যাদির লুণ্ঠনে স্বল্পসংখ্যক ঘৃণ্য ব্যক্তির লোভ-লালসায় কূটচরিত্রের বহিঃপ্রকাশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশবাসীসহ সমগ্র বিশ্ব সম্যক অবগত আছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী ও মুক্তির মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় পরিপূর্ণ ঋদ্ধ বর্তমান সরকার। সরকার প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অদম্য অগ্রগতিতে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রা পর্যুদস্ত করার লক্ষ্যে এসব সিন্ডিকেটেড অপকর্ম সংঘটিত হচ্ছে কিনা, তার নিবিড়-গভীর তদন্ত অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশের অকল্পনীয় বিস্ময়কর অর্জন এবং বিশ্বে বাঙালি জাতিরাষ্ট্রকে সুমহান মর্যাদায় আসীন করার অভূতপূর্ব অহংবোধকে ন্যূনতম ম্লান করার যে কোনো অপচেষ্টা-অপকৌশল আপামর জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হবেই। সমগ্র দেশপ্রেমিক জনগণের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবিচল ঐক্যবদ্ধ চলমান যুদ্ধে এ জাতীয় দুর্বৃত্তায়ন অবশ্যই পরাস্ত হবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সমাজ-অপরাধবিজ্ঞানী; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন