বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু
jugantor
বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু

  এম শাহজাহান মিয়া  

০১ জুলাই ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র পদ্মার খুঁটির নিচে দেবে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর পরম স্বপ্নের পদ্মা সেতু গত ২৪ জুন পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এ দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাহসী কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার এটি অনন্য অর্জন।

সেতুটি শেষ পর্যন্ত প্রমত্তা পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু নামেই দাঁড়িয়ে থাকবে। নেতাকর্মীদের দাবিকে উপেক্ষা করে সেতুর নামকরণ নিয়েও তিনি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। এটাই হলো দেশের প্রধানমন্ত্রীর লোভ-লালসা ত্যাগের এক বিরাট দৃষ্টান্ত।

তিনি দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের উন্নয়নের মহারানি হিসাবে মর্যাদালাভ করেছেন। বৈদেশিক তহবিল বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশি অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অসীম সাহসী বলে মনে করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

গত রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যা করেছেন, এ ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি দেশের সাধারণ নেতার পক্ষে সম্ভব হতো কিনা আমি সন্দেহ করি। রাষ্ট্রদূত বলেন, বিদেশি কিছু উন্নয়ন অংশীদার বিশ্বাসই করতে পারেনি যে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সব সন্দেহ, চাপ ও অভিযোগের মুখে নিজেকে ইস্পাতকঠিন দৃঢ় রেখে শতভাগ বাংলাদেশের অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত যে কোনো সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে নেওয়ার জন্য দরকার ছিল অসীম সাহস, দৃঢ় রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ ও চেতনা।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংযুক্তি বিকাশে বাংলাদেশের নেতৃত্বের উদাহরণ হিসাবে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওয়া এক বার্তায় এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে দেশটি।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস গত শুক্রবার বিবৃতিটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রচার করেছে। এতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এ মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানায় যুক্তরাষ্ট্র। সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পণ্য পরিবহণের টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করবে। ব্যবসার বিকাশ ও জীবনযাত্রার গুণগত মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি বিকাশে বাংলাদেশের আরেকটি দৃষ্টান্ত।

নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। ২০১৫ সালে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হয়েছে ২৫ জুন, শনিবার। প্রধানমন্ত্রী মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে সেতুর উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু হয়েছে ঢাকার সঙ্গে।

গত ২৬ জুন রোববার ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হয়েছে। সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সারা দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলায় বিরাজ করছে আনন্দ-উৎসব। এ ঐতিহাসিক সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বেগবান হবে দুই পারের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ ঘটবে। পদ্মার এপার ও ওপারের কৃষি ও শিল্পপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত হবে। সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব। শুধু তাই নয়, এ সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গেও যুক্ত করেছে বাংলাদেশকে।

সেতু নির্মাণকাজ শুরুর আগেই দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও এ ঘটনায় বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ চুক্তি প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো বৈশ্বিক অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল।

তেমনি নিজস্ব তহবিল থেকে এত বড় অঙ্কের টাকার জোগান দেওয়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে নিজেদের সামর্থ্য, শক্তি ও সক্ষমতার জানান দিল বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন দেশ ও জনগণকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক দিন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন বিশ্ব দরবারে জনগণকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন একটি ঐতিহাসিক দিন। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ২১ জেলার নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো। তিনি বলেন, শিল্পায়ন ও পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বিশাল নদীটির দুই পারেই বর্ণাঢ্য আয়োজন ছিল। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লঞ্চ ও বাসযোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি বাংলাদেশের অহংকারের নিদর্শন। নতুন বাংলাদেশের শক্তি। বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ চাইলে সব পারে। এ সেতু পুরো অর্থনীতি তথা দেশের চেহারাই পালটে দিতে পারে। দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর নানামুখী অবদান থাকবে।

পায়রাবন্দর, মোংলাবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। এ সেতুর কারণে ভুটান, নেপাল ও ভারতের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর হতে পারে। একইসঙ্গে দক্ষিণের ২১টি জেলায় শিল্প গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এই সেতু। পাশাপাশি পর্যটন খাতে, যেমন কুয়াকাটা, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন লীলাভূমি গড়ে উঠবে।

২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর এই সেতু নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করেন তিনি। গত ২৫ জুন তারই হাতে চালু হতে যাচ্ছে যানবাহন চলাচল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে পদ্মাপারে গাড়ি ও নৌযান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। বায়তুল মোকাররম মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। রাজধানীর হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়েছিল। লাগানো হয়েছিল ব্যানার ও ফেস্টুন।

সেতুর আয়ুষ্কাল ১০০ বছর ধরা হয়েছে। সেতুতে গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। সেতুর ওপর দিয়ে তিন চাকাবিশিষ্ট যান, যেমন-রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে না। হেঁটেও সেতু পার হওয়া যাবে না। গাড়ির বডির চেয়ে বেশি চওড়া ও ৫-৭ মিটার উচ্চতার বেশি মালামাল নিয়ে সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়া যাবে না। সেতুতে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ও হাঁটা যাবে না এবং ময়লাও ফেলা যাবে না।

অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এই সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ২ জুন বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিলের পর সেতু নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সংশয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বর্তমান সরকারকে তখন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু কানাডার আদালতে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রমাণিত হয়নি। এতে সেতুর নির্মাণকাজ পিছিয়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের ৯ জুলাই এক বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন জননেত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। অবশেষে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু হাসিমুখে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

এম শাহজাহান মিয়া : সিনিয়র সাংবাদিক

বাঙালির স্বপ্নের পদ্মা সেতু

 এম শাহজাহান মিয়া 
০১ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র পদ্মার খুঁটির নিচে দেবে গিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর পরম স্বপ্নের পদ্মা সেতু গত ২৪ জুন পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। এ দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাহসী কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার এটি অনন্য অর্জন।

সেতুটি শেষ পর্যন্ত প্রমত্তা পদ্মার বুকে পদ্মা সেতু নামেই দাঁড়িয়ে থাকবে। নেতাকর্মীদের দাবিকে উপেক্ষা করে সেতুর নামকরণ নিয়েও তিনি এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। এটাই হলো দেশের প্রধানমন্ত্রীর লোভ-লালসা ত্যাগের এক বিরাট দৃষ্টান্ত।

তিনি দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের উন্নয়নের মহারানি হিসাবে মর্যাদালাভ করেছেন। বৈদেশিক তহবিল বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও দেশি অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত অসীম সাহসী বলে মনে করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং।

গত রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, শেখ হাসিনা যা করেছেন, এ ধরনের কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া একটি দেশের সাধারণ নেতার পক্ষে সম্ভব হতো কিনা আমি সন্দেহ করি। রাষ্ট্রদূত বলেন, বিদেশি কিছু উন্নয়ন অংশীদার বিশ্বাসই করতে পারেনি যে বাংলাদেশ সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী সব সন্দেহ, চাপ ও অভিযোগের মুখে নিজেকে ইস্পাতকঠিন দৃঢ় রেখে শতভাগ বাংলাদেশের অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। এ সিদ্ধান্ত যে কোনো সরকারপ্রধানের পক্ষ থেকে নেওয়ার জন্য দরকার ছিল অসীম সাহস, দৃঢ় রাজনৈতিক দায়িত্ববোধ ও চেতনা।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংযুক্তি বিকাশে বাংলাদেশের নেতৃত্বের উদাহরণ হিসাবে অভিহিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পদ্মা সেতুর উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওয়া এক বার্তায় এ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে দেশটি।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস গত শুক্রবার বিবৃতিটি তাদের ওয়েবসাইটে প্রচার করেছে। এতে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এ মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানায় যুক্তরাষ্ট্র। সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে পণ্য পরিবহণের টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ অপরিহার্য। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করবে। ব্যবসার বিকাশ ও জীবনযাত্রার গুণগত মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। পদ্মা সেতুর নির্মাণ দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি বিকাশে বাংলাদেশের আরেকটি দৃষ্টান্ত।

নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। ২০১৫ সালে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন হয়েছে ২৫ জুন, শনিবার। প্রধানমন্ত্রী মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ও শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে সেতুর উদ্বোধন করেছেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা চালু হয়েছে ঢাকার সঙ্গে।

গত ২৬ জুন রোববার ঢাকার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য পদ্মা সেতু খুলে দেওয়া হয়েছে। সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে সারা দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলায় বিরাজ করছে আনন্দ-উৎসব। এ ঐতিহাসিক সেতু উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে বেগবান হবে দুই পারের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বিকাশ ঘটবে। পদ্মার এপার ও ওপারের কৃষি ও শিল্পপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত হবে। সেতুকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে পড়বে ইতিবাচক প্রভাব। শুধু তাই নয়, এ সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গেও যুক্ত করেছে বাংলাদেশকে।

সেতু নির্মাণকাজ শুরুর আগেই দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ও এ ঘটনায় বিশ্বব্যাংকসহ দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ চুক্তি প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো বৈশ্বিক অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল।

তেমনি নিজস্ব তহবিল থেকে এত বড় অঙ্কের টাকার জোগান দেওয়া, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, করোনা ভাইরাস সংক্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করার মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বে নিজেদের সামর্থ্য, শক্তি ও সক্ষমতার জানান দিল বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন দেশ ও জনগণকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে। গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক দিন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেছেন, পদ্মা সেতু বাস্তবায়ন বিশ্ব দরবারে জনগণকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পদ্মা সেতুর উদ্বোধন একটি ঐতিহাসিক দিন। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে ২১ জেলার নিরবচ্ছিন্ন, সাশ্রয়ী ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো। তিনি বলেন, শিল্পায়ন ও পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো।

পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষ্যে বিশাল নদীটির দুই পারেই বর্ণাঢ্য আয়োজন ছিল। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লঞ্চ ও বাসযোগে বিপুলসংখ্যক মানুষ যোগ দিয়েছিলেন। পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি বাংলাদেশের অহংকারের নিদর্শন। নতুন বাংলাদেশের শক্তি। বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী দেখিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ চাইলে সব পারে। এ সেতু পুরো অর্থনীতি তথা দেশের চেহারাই পালটে দিতে পারে। দেশের অর্থনীতিতে পদ্মা সেতুর নানামুখী অবদান থাকবে।

পায়রাবন্দর, মোংলাবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে। এ সেতুর কারণে ভুটান, নেপাল ও ভারতের সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক করিডোর হতে পারে। একইসঙ্গে দক্ষিণের ২১টি জেলায় শিল্প গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এই সেতু। পাশাপাশি পর্যটন খাতে, যেমন কুয়াকাটা, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন লীলাভূমি গড়ে উঠবে।

২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর এই সেতু নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করেন তিনি। গত ২৫ জুন তারই হাতে চালু হতে যাচ্ছে যানবাহন চলাচল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে পদ্মাপারে গাড়ি ও নৌযান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। বায়তুল মোকাররম মসজিদে বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছিল। রাজধানীর হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়েছিল। লাগানো হয়েছিল ব্যানার ও ফেস্টুন।

সেতুর আয়ুষ্কাল ১০০ বছর ধরা হয়েছে। সেতুতে গাড়ির সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। সেতুর ওপর দিয়ে তিন চাকাবিশিষ্ট যান, যেমন-রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, অটোরিকশা চলাচল করতে পারবে না। হেঁটেও সেতু পার হওয়া যাবে না। গাড়ির বডির চেয়ে বেশি চওড়া ও ৫-৭ মিটার উচ্চতার বেশি মালামাল নিয়ে সেতুর ওপর দিয়ে যাওয়া যাবে না। সেতুতে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা ও হাঁটা যাবে না এবং ময়লাও ফেলা যাবে না।

অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে এই সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ এনে ২০১২ সালের ২ জুন বিশ্বব্যাংক ঋণ চুক্তি বাতিলের পর সেতু নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন মহলে সংশয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বর্তমান সরকারকে তখন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু কানাডার আদালতে দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রমাণিত হয়নি। এতে সেতুর নির্মাণকাজ পিছিয়ে যায়। এমন প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের ৯ জুলাই এক বৈঠকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন জননেত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। অবশেষে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু হাসিমুখে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।

 

এম শাহজাহান মিয়া : সিনিয়র সাংবাদিক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন