এখন সময় সতর্কতার
jugantor
নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি
এখন সময় সতর্কতার

  ড. আর এম দেবনাথ  

০২ জুলাই ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পাশ হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে দেশে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ভালো ও উৎসাহব্যঞ্জক খবর যেমন আছে, তেমনি আছে উদ্বেগজনক খবরও। সবচেয়ে ভালো খবর হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সফল উদ্বোধন।

সারা দেশের মানুষ এখন এই সেতু দেখার জন্য ভিড় করছে মাওয়া অঞ্চলে। দেখার মতো সেতুই বটে। শুধু খরচের দিক থেকেই নয়, নয় শুধু দৈর্ঘ্যরে দিক থেকেও, পদ্মা সেতু দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে অশেষ অবদান রাখছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও এর অবদান হবে বড়। আশা করা যায়, পদ্মা সেতুর ফল হিসাবে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার এক থেকে দেড় শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আর সেতুর খরচও উঠে যাবে বছর ত্রিশের মধ্যে।

এই বিশাল অর্জন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার ফসল। তার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ নিজেস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না, বিশেষ করে যখন এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল ছিল বিস্তৃত। বলাই বাহুল্য, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি স্বাক্ষর। এই সেতু আমাদের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

পদ্মা সেতুর সুখবরের পর যে ঘটনাটি সারা দেশের মানুষকে বিচলিত করছে, তা হলো ভয়াবহ বন্যা। পুরো বৃহত্তর সিলেট বলা যায় জলের তলায়। লাখ লাখ মানুষ খাবারের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। থাকার জায়গা নেই-গরু-ছাগলের পর্যন্ত থাকার জায়গা নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগের কথা, এই ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বেশকিছু ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বন্যার জল এবং উজানের জল ধরে রাখার মতো ‘ওয়াটার বডি’র সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বস্তুত হাওড়ের আয়তন এবং জল ধারণক্ষমতা এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট হয়ে গেছে। যার ফলে এখন একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উজানের পানি এসে পুরো সিলেট জেলাকে জলে ডুবিয়ে দেয়। এর ফলে এবার যে কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এর বোঝা যে বিশাল হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা করোনার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। এই যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ইউক্রেন যুদ্ধ এসে আমাদের সবকিছু আবার লন্ডভন্ড করে দিতে উদ্যত। মূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ খবরে দেখলাম, মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি বেশি। প্রতিদিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সরকারও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। শোনা যাচ্ছে, তেল ও বিদ্যুতের দামও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা, কিছুদিন আগেই আমাদের প্রধান ফসল বোরো উঠেছে কৃষকের ঘরে। তারপরও চালের দাম বাড়ছে। সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমদানি পর্যায়ে সব শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাতেও কিছু হচ্ছে না। ধারণা করা যায়, চালের ব্যবসায়ীরা অকাল বন্যার সুযোগ নিচ্ছে। একদিকে যখন আমরা কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করছি, অন্যদিকে তখন বন্যা এসে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন করেছে।

দৃশ্যত সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে মনে হলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামসহ কিছু অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এতগুলো সমস্যা এসে আমাদের সামনে উপস্থিত, অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় টার্গেট নিয়ে কাজ করছি এই জুলাই মাসে। শুরুতেই আমরা বৈরী পরিস্থিতির সম্মুখীন। তাই এখন সতর্কতার সময়, ভীষণ সতর্কতার সময়। সতর্কতার সময় আরও কয়েকটি কারণে। তার আগে আরও একটি ভালো খবর দেওয়া দরকার। এই প্রথম আমাদের রপ্তানি আয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে যাচ্ছে। বিশাল সুখবর। বহুদিন পর এটি হবে আমাদের আরেকটি বড় অর্জন, যা আমাদের অর্থনৈতিক মর্যাদাকে উন্নীত করবে।

একটি কাগজের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৭ বিলিয়ন ডলারেরও (এক বিলিয়ন সমান ১০০ কোটি) বেশি। জুন মাসের প্রথম ২৫ দিনেই শুধু পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩২০ কোটি ডলারের। বলাই বাহুল্য, তৈরি পোশাক রপ্তানিই আমাদের এক নম্বর রপ্তানি আয়। তবে এ ক্ষেত্রে একটা সাবধানতার বিষয় আছে। বস্তুত আমরা এক পণ্য রপ্তানির দেশে পরিণত হয়েছি। আরও একটি দুশ্চিন্তার খবর হচ্ছে, তৈরি পোশাক খাতে ‘ভ্যালু এডিশনের’ পরিমাণ বাড়ছেই না। এ শিল্পটি এক অর্থে শিশু শিল্পই রয়ে যাচ্ছে।

অথচ এই শিল্পকে ভরসা করে আমরা বিরাট একটা ‘ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ’ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছি। এতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। চাহিদার অভাবে শিল্পটি এখন নানা সমস্যায় ভুগছে। একটি পরিসংখ্যানে পেলাম একজন সাবেক গভর্নরের লেখায়। সরকার আগে তৈরি পোশাক খাতে প্রণোদনা দিত ৩০ শতাংশ ‘ভ্যালু এডিশন’ থাকলে। এখন তা করা হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তৈরি পোশাক খাতে আমরা যে রপ্তানির অঙ্ক দেখাই, তার বিপরীতে রয়েছে বিরাট পরিমাণের আমদানি। ফলে নিট রপ্তানির পরিমাণ রয়ে যায় অনেক কম। অর্থাৎ এ খাতের রপ্তানিতে অবদান প্রকৃত হিসাবে অনেক কম। এ বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে।

মুশকিল হচ্ছে, রপ্তানি ক্ষেত্রে যে ভালো খবর দিলাম, এর বিপরীতে কয়েকটি পরিসংখ্যান মোটেই সুখকর নয়। আমাদের সার্বিক চিত্র বোঝা যাবে আমদানি, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ইত্যাদির পরিসংখ্যান থেকে। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে আমাদের আমদানি বেড়েছে ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে একই সময়ে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তার মানে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। তাহলে এই ঘাটতি মিটবে কী করে?

সাধারণত আমদানির এই বিরাট চাহিদার একটা অংশ আমরা মেটাই প্রবাসীদের আয় (রেমিট্যান্স) থেকে। অর্থাৎ আমাদের নাগরিকরা প্রতি মাসে দেশে যে ডলার পাঠান, তার থেকে আমদানি চাহিদার একটা অংশ মেটানো হয়। এতদিন এই রেমিট্যান্সে একটা ঢেউ ছিল। এই ঢেউয়ে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে তার জন্য সরকার রেমিট্যান্সের ওপর প্রতি ডলারে দুই টাকা প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা ছিল খুবই আশাপ্রদ খবর।

কিন্তু ইদানীং প্রবাসীদের আয়ে একটা বিরাট ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এত প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও, বাজার অর্থনীতির নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, সরকারিভাবে রেমিট্যান্সের প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রবাসী আয় হ্রাস পেয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এর ফলে তিনটি ঘটনা ঘটছে। একটি কাগজের প্রতিবেদনে দেখলাম অস্বাভাবিক আমদানি ব্যয়, কম হারে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেশি হচ্ছে।

চলতি হিসাবে এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে তাতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে ক্ষতি কী? বিশাল ক্ষতিবৃদ্ধির কারণ আছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি দেখা দিলে সব দেশকেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সহায়তা দিতে হয় আমদানি ব্যয় নির্বাহ করতে। কাগজে দেখলাম সতর্কতা হিসাবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই আইএমএফের কাছে সহায়তা প্রদানের জন্য আবেদন করেছে। যদিও দৃশ্যত এটা কোনো উদ্বেগের খবর নয়; তবে এটাও ঠিক, এসব খবর আন্তর্জাতিক বাজারে ভালোভাবে গৃহীত হয় না।

আমাদের এখনো ৪২ বিলিয়ন ডলারের মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রয়েছে, যা দিয়ে ৪-৫ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। অতএব দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই সুযোগে খোলাবাজারে ডলারের মূল্য বেশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ডলারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ টাকা, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৮৬-৮৭ টাকা! এ বিবেচনায় টাকার মান যথেষ্ট কমেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বড় বড় আমদানির জন্য বাজারে ডলারের অভাব দেখা দিয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের খবরে দেখা যায় তাদের ঋণপত্র খুলতে অসুবিধা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য খোলাবাজারে ডলার সরবরাহ করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা কম। এ অবস্থায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ না বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, রেমিট্যান্সের প্রধান বাজার মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স আসছে কম। অতএব দ্বিতীয় পথ খোলা থাকে আমদানি ব্যয় হ্রাস করা।

সরকার ইতোমধ্যেই অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। আমার ধারণা, আমদানি আরও হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তা আছে। শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ভোগ্যপণ্য আমদানির পোর্টফলিওগুলো ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার। দেখা দরকার এসবে কোনো ফাঁকিবাজি আছে কিনা।

খবর হচ্ছে, নানা কারণে যত ডলারের রপ্তানি হচ্ছে, তত পরিমাণ ডলার দেশে আসছে না। নানা বাধা-বিপত্তি এক্ষেত্রে কাজ করছে। এ বিষয়টি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও তৎপর হতে হবে।

পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ কবে শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ এর ওপর আমাদের ভাগ্য নির্ভরশীল। আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স নয় শুধু-চাল, গম আমদানি, তেলের মূল্য সবই নির্ভর করছে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর। এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসবের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে আরও বেশি করে। বিশেষ করে যদি তেলের মূল্য বাড়ে, তাহলে আমাদের সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অতএব এখন ভীষণ সতর্কতার সময়। স্থিতিশীলতা রক্ষাই হওয়া দরকার প্রথম লক্ষ্য।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

এখন সময় সতর্কতার

 ড. আর এম দেবনাথ 
০২ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট পাশ হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে দেশে অনেক বড় বড় ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ভালো ও উৎসাহব্যঞ্জক খবর যেমন আছে, তেমনি আছে উদ্বেগজনক খবরও। সবচেয়ে ভালো খবর হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সফল উদ্বোধন।

সারা দেশের মানুষ এখন এই সেতু দেখার জন্য ভিড় করছে মাওয়া অঞ্চলে। দেখার মতো সেতুই বটে। শুধু খরচের দিক থেকেই নয়, নয় শুধু দৈর্ঘ্যরে দিক থেকেও, পদ্মা সেতু দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়নে অশেষ অবদান রাখছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও এর অবদান হবে বড়। আশা করা যায়, পদ্মা সেতুর ফল হিসাবে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার এক থেকে দেড় শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আর সেতুর খরচও উঠে যাবে বছর ত্রিশের মধ্যে।

এই বিশাল অর্জন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার ফসল। তার বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ ছাড়া সম্পূর্ণ নিজেস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না, বিশেষ করে যখন এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল ছিল বিস্তৃত। বলাই বাহুল্য, পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতার একটি স্বাক্ষর। এই সেতু আমাদের এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

পদ্মা সেতুর সুখবরের পর যে ঘটনাটি সারা দেশের মানুষকে বিচলিত করছে, তা হলো ভয়াবহ বন্যা। পুরো বৃহত্তর সিলেট বলা যায় জলের তলায়। লাখ লাখ মানুষ খাবারের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। থাকার জায়গা নেই-গরু-ছাগলের পর্যন্ত থাকার জায়গা নেই।

সবচেয়ে উদ্বেগের কথা, এই ভয়াবহ বন্যায় আমাদের বেশকিছু ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ভুক্তভোগীরা বলছেন, বন্যার জল এবং উজানের জল ধরে রাখার মতো ‘ওয়াটার বডি’র সংখ্যা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বস্তুত হাওড়ের আয়তন এবং জল ধারণক্ষমতা এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট হয়ে গেছে। যার ফলে এখন একটু বেশি বৃষ্টি হলেই উজানের পানি এসে পুরো সিলেট জেলাকে জলে ডুবিয়ে দেয়। এর ফলে এবার যে কত টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সম্পূর্ণ হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এর বোঝা যে বিশাল হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা করোনার ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি থেকে উদ্ধার পাওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলাম। এই যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই ইউক্রেন যুদ্ধ এসে আমাদের সবকিছু আবার লন্ডভন্ড করে দিতে উদ্যত। মূল্যস্ফীতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সর্বশেষ খবরে দেখলাম, মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামীণ মূল্যস্ফীতি বেশি। প্রতিদিন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সরকারও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। শোনা যাচ্ছে, তেল ও বিদ্যুতের দামও বাড়বে।

সবচেয়ে বড় কথা, কিছুদিন আগেই আমাদের প্রধান ফসল বোরো উঠেছে কৃষকের ঘরে। তারপরও চালের দাম বাড়ছে। সরকার চাল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমদানি পর্যায়ে সব শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাতেও কিছু হচ্ছে না। ধারণা করা যায়, চালের ব্যবসায়ীরা অকাল বন্যার সুযোগ নিচ্ছে। একদিকে যখন আমরা কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করছি, অন্যদিকে তখন বন্যা এসে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন করেছে।

দৃশ্যত সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হচ্ছে মনে হলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রামসহ কিছু অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এটা মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা ছাড়া আর কিছুই নয়।

এতগুলো সমস্যা এসে আমাদের সামনে উপস্থিত, অথচ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির বড় টার্গেট নিয়ে কাজ করছি এই জুলাই মাসে। শুরুতেই আমরা বৈরী পরিস্থিতির সম্মুখীন। তাই এখন সতর্কতার সময়, ভীষণ সতর্কতার সময়। সতর্কতার সময় আরও কয়েকটি কারণে। তার আগে আরও একটি ভালো খবর দেওয়া দরকার। এই প্রথম আমাদের রপ্তানি আয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে যাচ্ছে। বিশাল সুখবর। বহুদিন পর এটি হবে আমাদের আরেকটি বড় অর্জন, যা আমাদের অর্থনৈতিক মর্যাদাকে উন্নীত করবে।

একটি কাগজের প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসেই (জুলাই-মে) দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪৭ বিলিয়ন ডলারেরও (এক বিলিয়ন সমান ১০০ কোটি) বেশি। জুন মাসের প্রথম ২৫ দিনেই শুধু পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৩২০ কোটি ডলারের। বলাই বাহুল্য, তৈরি পোশাক রপ্তানিই আমাদের এক নম্বর রপ্তানি আয়। তবে এ ক্ষেত্রে একটা সাবধানতার বিষয় আছে। বস্তুত আমরা এক পণ্য রপ্তানির দেশে পরিণত হয়েছি। আরও একটি দুশ্চিন্তার খবর হচ্ছে, তৈরি পোশাক খাতে ‘ভ্যালু এডিশনের’ পরিমাণ বাড়ছেই না। এ শিল্পটি এক অর্থে শিশু শিল্পই রয়ে যাচ্ছে।

অথচ এই শিল্পকে ভরসা করে আমরা বিরাট একটা ‘ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ’ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তুলেছি। এতে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। চাহিদার অভাবে শিল্পটি এখন নানা সমস্যায় ভুগছে। একটি পরিসংখ্যানে পেলাম একজন সাবেক গভর্নরের লেখায়। সরকার আগে তৈরি পোশাক খাতে প্রণোদনা দিত ৩০ শতাংশ ‘ভ্যালু এডিশন’ থাকলে। এখন তা করা হয়েছে মাত্র ২০ শতাংশ। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তৈরি পোশাক খাতে আমরা যে রপ্তানির অঙ্ক দেখাই, তার বিপরীতে রয়েছে বিরাট পরিমাণের আমদানি। ফলে নিট রপ্তানির পরিমাণ রয়ে যায় অনেক কম। অর্থাৎ এ খাতের রপ্তানিতে অবদান প্রকৃত হিসাবে অনেক কম। এ বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আমাদের ভাবতে হবে।

মুশকিল হচ্ছে, রপ্তানি ক্ষেত্রে যে ভালো খবর দিলাম, এর বিপরীতে কয়েকটি পরিসংখ্যান মোটেই সুখকর নয়। আমাদের সার্বিক চিত্র বোঝা যাবে আমদানি, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ইত্যাদির পরিসংখ্যান থেকে। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে আমাদের আমদানি বেড়েছে ৪১ দশমিক ৪২ শতাংশ। অথচ এর বিপরীতে একই সময়ে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ। তার মানে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি। তাহলে এই ঘাটতি মিটবে কী করে?

সাধারণত আমদানির এই বিরাট চাহিদার একটা অংশ আমরা মেটাই প্রবাসীদের আয় (রেমিট্যান্স) থেকে। অর্থাৎ আমাদের নাগরিকরা প্রতি মাসে দেশে যে ডলার পাঠান, তার থেকে আমদানি চাহিদার একটা অংশ মেটানো হয়। এতদিন এই রেমিট্যান্সে একটা ঢেউ ছিল। এই ঢেউয়ে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে তার জন্য সরকার রেমিট্যান্সের ওপর প্রতি ডলারে দুই টাকা প্রণোদনা দিয়ে থাকে। এতে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা ছিল খুবই আশাপ্রদ খবর।

কিন্তু ইদানীং প্রবাসীদের আয়ে একটা বিরাট ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এত প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও, বাজার অর্থনীতির নিয়মের বাইরে গিয়ে প্রণোদনা দেওয়া সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, সরকারিভাবে রেমিট্যান্সের প্রবাহ হ্রাস পাচ্ছে। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে প্রবাসী আয় হ্রাস পেয়েছে ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা খুবই উদ্বেগের বিষয়। এর ফলে তিনটি ঘটনা ঘটছে। একটি কাগজের প্রতিবেদনে দেখলাম অস্বাভাবিক আমদানি ব্যয়, কম হারে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেশি হচ্ছে।

চলতি হিসাবে এবং ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্ট ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে উদ্বৃত্ত ছিল। কিন্তু ২০২১-২২ অর্থবছরে তাতে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে ক্ষতি কী? বিশাল ক্ষতিবৃদ্ধির কারণ আছে। ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি দেখা দিলে সব দেশকেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে সহায়তা দিতে হয় আমদানি ব্যয় নির্বাহ করতে। কাগজে দেখলাম সতর্কতা হিসাবে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই আইএমএফের কাছে সহায়তা প্রদানের জন্য আবেদন করেছে। যদিও দৃশ্যত এটা কোনো উদ্বেগের খবর নয়; তবে এটাও ঠিক, এসব খবর আন্তর্জাতিক বাজারে ভালোভাবে গৃহীত হয় না।

আমাদের এখনো ৪২ বিলিয়ন ডলারের মতো বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ রয়েছে, যা দিয়ে ৪-৫ মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। অতএব দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই সুযোগে খোলাবাজারে ডলারের মূল্য বেশ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। ডলারের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ টাকা, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৮৬-৮৭ টাকা! এ বিবেচনায় টাকার মান যথেষ্ট কমেছে। সবচেয়ে বড় কথা, বড় বড় আমদানির জন্য বাজারে ডলারের অভাব দেখা দিয়েছে।

অগ্রণী ব্যাংকের খবরে দেখা যায় তাদের ঋণপত্র খুলতে অসুবিধা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য খোলাবাজারে ডলার সরবরাহ করছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় তা কম। এ অবস্থায় রেমিট্যান্সের পরিমাণ না বাড়লে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। অথচ দেখা যাচ্ছে, রেমিট্যান্সের প্রধান বাজার মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স আসছে কম। অতএব দ্বিতীয় পথ খোলা থাকে আমদানি ব্যয় হ্রাস করা।

সরকার ইতোমধ্যেই অপ্রয়োজনীয় আমদানি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। আমার ধারণা, আমদানি আরও হ্রাস করার প্রয়োজনীয়তা আছে। শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য এবং ভোগ্যপণ্য আমদানির পোর্টফলিওগুলো ভালো করে পরীক্ষা করা দরকার। দেখা দরকার এসবে কোনো ফাঁকিবাজি আছে কিনা।

খবর হচ্ছে, নানা কারণে যত ডলারের রপ্তানি হচ্ছে, তত পরিমাণ ডলার দেশে আসছে না। নানা বাধা-বিপত্তি এক্ষেত্রে কাজ করছে। এ বিষয়টি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও তৎপর হতে হবে।

পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ কবে শেষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অথচ এর ওপর আমাদের ভাগ্য নির্ভরশীল। আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স নয় শুধু-চাল, গম আমদানি, তেলের মূল্য সবই নির্ভর করছে ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর। এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এসবের মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে আরও বেশি করে। বিশেষ করে যদি তেলের মূল্য বাড়ে, তাহলে আমাদের সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। অতএব এখন ভীষণ সতর্কতার সময়। স্থিতিশীলতা রক্ষাই হওয়া দরকার প্রথম লক্ষ্য।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন