মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণাদায়িনী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা
jugantor
মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণাদায়িনী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা

  ড. এম এ মাননান  

০৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার স্থপতি ও রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা, অনেক অপ্রাপ্তি আর সংকটের মধ্যেও ছিলেন জীবনযুদ্ধে আপসহীন একজন মহীয়সী নারী; যিনি তার জীবনের স্বর্ণসময়টি কাটিয়েছেন স্বাধীনতার নেপথ্যের কারিগর হিসাবে, বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তার সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে। বাঙালি জাতি তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বঙ্গমাতা’ অভিধায় সিক্ত করে তাকে সম্মানিত করেছেন। তিনি শুধু বঙ্গমাতাই নন, তিনি নিজেই একটি ইতিহাস। তিনি ছিলেন একাধারে নির্মোহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরস্থির, শানিত বুদ্ধির ছোঁয়ায় পরিপুষ্ট, কর্তব্য-কর্মে অতুলনীয় নিষ্ঠাবান, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী এবং বজ্রকঠোর সাহসিকা। তার এসব গুণাবলি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বিরল কর্মক্ষমতার পরশে তিনি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধুর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে।

কৈশোরেই সংসার জীবনে প্রবেশ তাকে কখনো হতোদ্যম করেনি; সংসার জীবনের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে গিয়েছেন, জ্ঞান অর্জনের রাস্তায় হেঁটেছেন, আর ক্রমান্বয়ে সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেছেন একজন প্রজ্ঞাময় সাহসী নারী। মাতৃত্বের গুণে যেমন অপূর্ব, তেমনি দেশপ্রেমেও ছিলেন অতুলনীয়। দেশের তথা জনকল্যাণের পথে হাঁটতে গিয়ে তিনি যে অবর্ণনীয় দুঃখবরণ করেছেন, যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে যখন বারবার কারাগারে যেতে বাধ্য করেছে, শুধু রাজনৈতিক জীবনই নয়, সংসার জীবন থেকেও দূরে সরিয়ে রেখেছে, তখনো সাহস না হারিয়ে তার অতি আদরের রেণু শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন, রাজনীতির মাঠেও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কুটিলতা এ মহীয়সী নারীকে পেছনে চালিত করতে পারেনি। দৃষ্টি ছিল তার সবসময় সামনের দিকে, চিন্তাভাবনা ছিল সুদূরপ্রসারী। বাস্তবতা তাকে বারবার বাসা বদল করতে বাধ্য করেছে, তবুও তিনি কর্তব্যে অবহেলা করেননি। দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট আর মানসিক যন্ত্রণাকে মনের গহিনে চাপা দিয়ে সংসারের মাঠে যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে আগুয়ান ছিলেন।

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চোখের মণি হয়ে ওঠা রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনের কষ্ট, পরিবার থেকে নিত্য দূরে থাকার কষ্ট, সামরিক জান্তার মানসিক নিপীড়নের কষ্ট-এসব কষ্টের কিছুটা ফুটে উঠেছে তারই রচিত ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামক জীবনীগ্রন্থে, যেখানে তিনি লিখেছেন-‘সময় কেটে গেল, রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গেল। আমি এসে শুয়ে পড়লাম, আর ভাবলাম এই তো দুনিয়া। রাত কেটে গেল, খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগল না।’ তার জবানিতে আরও অনেক অনেক কষ্টের লহরী- ‘...১১ তারিখ রেণু এসেছে ছেলেমেয়ে নিয়ে দেখা করতে। ...ছেলেমেয়েরা ঈদের কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না; কারণ আমি জেলে। ...ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি নেই। ওরা বুঝতে শিখেছে। রাসেল ছোট্ট তাই বুঝতে শিখে নাই। ...দেখা করতে এসে রাসেল আমাকে মাঝে মধ্যে ছাড়তে চায় না। ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়।’ কষ্টের কথা আরও অনেক জায়গায় তিনি প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, বঙ্গমাতার কষ্ট ছিল ভিন্ন রকমের। কম বয়সি সন্তানদের নিয়ে সাংসারিক কষ্ট, ঘনিষ্ঠজনদের অসহযোগিতার কষ্ট। দুজনের কষ্টের ধরন ছিল ভিন্ন, মাত্রা ছিল ভিন্ন, কিন্তু জীবন কেটেছে দুজনেরই প্রকাশ-কঠিন অব্যক্ত কষ্টে। এত কষ্টের মধ্যে দুজনের কেউই নিজের দায়িত্বের কথা ভুলেননি, কষ্টের আঘাতে জর্জরিত হয়ে শুধু চোখের পানি ফেলে আত্মমর্যাদাকে খর্ব হতে দেননি। এ আত্মত্যাগই তাদের দুজনকে মহিমান্বিত করেছে, পরবর্তী জীবনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে পেয়েছিলেন তারা স্বর্গসুখ, যা কেড়ে নিয়েছে এ দেশেরই কয়েকজন কুলাঙ্গার স্বাধীনতাবিরোধী হন্তারক পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাতের আঁধারে।

যে মানুষ ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে ওঠে শৈশব-কৈশোরে, সে ত্যাগের আলোয় আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বয়সের পরিক্রমায়। বঙ্গমাতা তেমনি একজন মানুষ, যিনি তিন বছর বয়সে পিতৃস্নেহ আর পাঁচ বছর বয়সে মাতৃস্নেহ থেকে চিরকালের জন্য বঞ্চিত হয়ে দাদার স্নেহে বড় হয়ে শিখেছেন সত্যিকার অর্থে ত্যাগ কী মূল্যবান জিনিস। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের পাঠ চুকিয়ে সামাজিক কারণে তিনি লেখাপড়া শিখেছেন গৃহশিক্ষকের কাছে। স্বশিক্ষায় তিনি আলোকিত হয়েছেন অনেক বেশি। এমনকি দাদার চাচাত ভাইয়ের পুত্রসন্তান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরও তিনি জীবনব্যাপী শিক্ষাগ্রহণ থেকে সরে যাননি। স্বামী যখন লেখাপড়ার জন্য কলকাতায়, তখন বঙ্গমাতা তার সংগৃহীত বই অধ্যয়ন করে নিজকে ঋদ্ধ করতেন। তার অর্জিত জ্ঞান তিনি জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোতে কাজে লাগিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। সাধারণ গৃহবধূ হয়েও অসাধারণ প্রতিভা দেখিয়েছেন স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পর্দার আড়ালে থেকে সক্রিয় হয়ে, আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগকে সংগঠিতকরণের কাজে সহায়তা করে, দলীয় কর্মীরা ছাড়াও আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আন্দোলন পরিচালনায় পরামর্শ দিয়ে, এমনকি কারাগারে থাকা অবস্থায় নিজের স্বামীকে সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়ে এবং তার কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসে তা দলীয় কর্মীদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠার পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ভিত থরথর করে কেঁপে ওঠে, সেই অভ্যুত্থান বেগবান করার পেছনে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদান ছিল অপরিসীম। গণঅভ্যুত্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুসহ আরও কয়েকজন দেশপ্রেমী বাঙালি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মিথ্যা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র মাধ্যমে স্বাধিকার আন্দোলনের মূলে কুঠারাঘাত হানার চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য কারাবন্দি মুক্তি পান। এটি ছিল শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির বিশাল বিজয়, যে বিজয়ে সুপ্ত ছিল বাংলাদেশের মুক্তির বীজ, বেগবান হয়েছিল স্বাধীনতার আন্দোলন। আরও আছে তার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কাহিনি। বঙ্গবন্ধুকে যখন প্যারোলে মুক্তি দিয়ে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে বসতে শাসকগোষ্ঠী আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তখন দলের সবার মতের বিরুদ্ধে, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, দৃঢ়কণ্ঠে প্যারোলে মুক্তি নেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। তার সেই বজ্রকঠিন মনোভাব বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি নিতে অস্বীকৃতি জানানোতে শাসকরা তাকে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। এটি ছিল একটি বিরাট রাজনৈতিক বিজয়। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে না থেকেও রাজনীতির জটিল অঙ্ক তিনি বুঝতে পারতেন। সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া দূরদর্শিতার গুণটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন আমৃত্যু।

একাত্তরের ৭ মার্চের অলিখিত, বিশ্বের ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া, কালজয়ী ভাষণ নিজের প্রজ্ঞার আলোকে দেওয়ার জন্য বঙ্গমাতাই বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। একাত্তরের ২৩ মার্চ বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও তিনি বঙ্গবন্ধুর পরামর্শক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসের উত্তাল রক্তঝরা সময়ে বঙ্গমাতা অসীম সাহস আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে সর্বপ্রকার প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।

একদিকে তিনি ছিলেন আদর্শ গৃহিণী, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ জীবনসঙ্গিনী, অন্যদিকে ছিলেন সন্তানদের জন্য আদর্শ মাতা। বঙ্গবন্ধুর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন ছায়ার মতো। বঙ্গবন্ধুর কাছে বেগম ফজিলাতুন নেছা শুধু সহধর্মিণীই ছিলেন না, ছিলেন একজন সহকর্মী, একজন সহমর্মী, আন্দোলন বেগবান করার অনুঘটক, স্নেহময়ী পরামর্শক এবং সতত প্রেরণাদায়িনী। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পরপরই তাকে হানাদার বাহিনীর গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গমাতাই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় সুহৃদ। বঙ্গমাতার সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নেওয়ার পর যখন সারা শহরে গোলাগুলির আওয়াজ আর জ্বলন্ত বাড়িঘরে দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখার সঙ্গে নিরীহ মানুষের আর্তচিৎকারে চারদিকে সৃষ্টি হয় আতঙ্কময় ভূতুড়ে পরিবেশ, তখনো বঙ্গমাতা একটুর জন্যও মুষড়ে পড়েননি। রাতের অন্ধকার যখন ঘনিয়ে আসে, তখন ভোরের অরুণোদয়ও উদ্ভাসিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। তিনি ছিলেন সেই ভোরের অপেক্ষায়।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য একটি পতাকা অর্জনে, বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদান বাঙালি জাতি চিরকাল স্মরণে রাখবে। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ জহুরুল হক এবং হোসনে আরা বেগমের পরিবার আলো করে ভূমিষ্ঠ হওয়া তাদের তৃতীয় সন্তান এ মহীয়সী নারীর নাম ‘বঙ্গমাতা’ হিসাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

ড. এম এ মাননান : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণাদায়িনী মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা

 ড. এম এ মাননান 
০৮ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতার স্থপতি ও রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা, অনেক অপ্রাপ্তি আর সংকটের মধ্যেও ছিলেন জীবনযুদ্ধে আপসহীন একজন মহীয়সী নারী; যিনি তার জীবনের স্বর্ণসময়টি কাটিয়েছেন স্বাধীনতার নেপথ্যের কারিগর হিসাবে, বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তার সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে। বাঙালি জাতি তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ‘বঙ্গমাতা’ অভিধায় সিক্ত করে তাকে সম্মানিত করেছেন। তিনি শুধু বঙ্গমাতাই নন, তিনি নিজেই একটি ইতিহাস। তিনি ছিলেন একাধারে নির্মোহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরস্থির, শানিত বুদ্ধির ছোঁয়ায় পরিপুষ্ট, কর্তব্য-কর্মে অতুলনীয় নিষ্ঠাবান, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী এবং বজ্রকঠোর সাহসিকা। তার এসব গুণাবলি এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা বিরল কর্মক্ষমতার পরশে তিনি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পেরেছেন বঙ্গবন্ধুর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে।

কৈশোরেই সংসার জীবনে প্রবেশ তাকে কখনো হতোদ্যম করেনি; সংসার জীবনের পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে গিয়েছেন, জ্ঞান অর্জনের রাস্তায় হেঁটেছেন, আর ক্রমান্বয়ে সময়ের পরিক্রমায় হয়ে উঠেছেন একজন প্রজ্ঞাময় সাহসী নারী। মাতৃত্বের গুণে যেমন অপূর্ব, তেমনি দেশপ্রেমেও ছিলেন অতুলনীয়। দেশের তথা জনকল্যাণের পথে হাঁটতে গিয়ে তিনি যে অবর্ণনীয় দুঃখবরণ করেছেন, যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা সর্বজনবিদিত। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে যখন বারবার কারাগারে যেতে বাধ্য করেছে, শুধু রাজনৈতিক জীবনই নয়, সংসার জীবন থেকেও দূরে সরিয়ে রেখেছে, তখনো সাহস না হারিয়ে তার অতি আদরের রেণু শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছেন, রাজনীতির মাঠেও আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তৎকালীন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কুটিলতা এ মহীয়সী নারীকে পেছনে চালিত করতে পারেনি। দৃষ্টি ছিল তার সবসময় সামনের দিকে, চিন্তাভাবনা ছিল সুদূরপ্রসারী। বাস্তবতা তাকে বারবার বাসা বদল করতে বাধ্য করেছে, তবুও তিনি কর্তব্যে অবহেলা করেননি। দৈনন্দিন দুঃখ-কষ্ট আর মানসিক যন্ত্রণাকে মনের গহিনে চাপা দিয়ে সংসারের মাঠে যুদ্ধজয়ের লক্ষ্যে আগুয়ান ছিলেন।

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চোখের মণি হয়ে ওঠা রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধুর জেলজীবনের কষ্ট, পরিবার থেকে নিত্য দূরে থাকার কষ্ট, সামরিক জান্তার মানসিক নিপীড়নের কষ্ট-এসব কষ্টের কিছুটা ফুটে উঠেছে তারই রচিত ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামক জীবনীগ্রন্থে, যেখানে তিনি লিখেছেন-‘সময় কেটে গেল, রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে চলে গেল। আমি এসে শুয়ে পড়লাম, আর ভাবলাম এই তো দুনিয়া। রাত কেটে গেল, খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগল না।’ তার জবানিতে আরও অনেক অনেক কষ্টের লহরী- ‘...১১ তারিখ রেণু এসেছে ছেলেমেয়ে নিয়ে দেখা করতে। ...ছেলেমেয়েরা ঈদের কাপড় নেবে না। ঈদ করবে না; কারণ আমি জেলে। ...ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি নেই। ওরা বুঝতে শিখেছে। রাসেল ছোট্ট তাই বুঝতে শিখে নাই। ...দেখা করতে এসে রাসেল আমাকে মাঝে মধ্যে ছাড়তে চায় না। ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়।’ কষ্টের কথা আরও অনেক জায়গায় তিনি প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, বঙ্গমাতার কষ্ট ছিল ভিন্ন রকমের। কম বয়সি সন্তানদের নিয়ে সাংসারিক কষ্ট, ঘনিষ্ঠজনদের অসহযোগিতার কষ্ট। দুজনের কষ্টের ধরন ছিল ভিন্ন, মাত্রা ছিল ভিন্ন, কিন্তু জীবন কেটেছে দুজনেরই প্রকাশ-কঠিন অব্যক্ত কষ্টে। এত কষ্টের মধ্যে দুজনের কেউই নিজের দায়িত্বের কথা ভুলেননি, কষ্টের আঘাতে জর্জরিত হয়ে শুধু চোখের পানি ফেলে আত্মমর্যাদাকে খর্ব হতে দেননি। এ আত্মত্যাগই তাদের দুজনকে মহিমান্বিত করেছে, পরবর্তী জীবনে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে পেয়েছিলেন তারা স্বর্গসুখ, যা কেড়ে নিয়েছে এ দেশেরই কয়েকজন কুলাঙ্গার স্বাধীনতাবিরোধী হন্তারক পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট রাতের আঁধারে।

যে মানুষ ত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত হয়ে ওঠে শৈশব-কৈশোরে, সে ত্যাগের আলোয় আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বয়সের পরিক্রমায়। বঙ্গমাতা তেমনি একজন মানুষ, যিনি তিন বছর বয়সে পিতৃস্নেহ আর পাঁচ বছর বয়সে মাতৃস্নেহ থেকে চিরকালের জন্য বঞ্চিত হয়ে দাদার স্নেহে বড় হয়ে শিখেছেন সত্যিকার অর্থে ত্যাগ কী মূল্যবান জিনিস। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলের পাঠ চুকিয়ে সামাজিক কারণে তিনি লেখাপড়া শিখেছেন গৃহশিক্ষকের কাছে। স্বশিক্ষায় তিনি আলোকিত হয়েছেন অনেক বেশি। এমনকি দাদার চাচাত ভাইয়ের পুত্রসন্তান শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরও তিনি জীবনব্যাপী শিক্ষাগ্রহণ থেকে সরে যাননি। স্বামী যখন লেখাপড়ার জন্য কলকাতায়, তখন বঙ্গমাতা তার সংগৃহীত বই অধ্যয়ন করে নিজকে ঋদ্ধ করতেন। তার অর্জিত জ্ঞান তিনি জীবনের পরবর্তী ধাপগুলোতে কাজে লাগিয়েছেন দক্ষতার সঙ্গে। সাধারণ গৃহবধূ হয়েও অসাধারণ প্রতিভা দেখিয়েছেন স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে পর্দার আড়ালে থেকে সক্রিয় হয়ে, আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগকে সংগঠিতকরণের কাজে সহায়তা করে, দলীয় কর্মীরা ছাড়াও আওয়ামী লীগের শক্তিশালী ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আন্দোলন পরিচালনায় পরামর্শ দিয়ে, এমনকি কারাগারে থাকা অবস্থায় নিজের স্বামীকে সময়োপযোগী পরামর্শ দিয়ে এবং তার কাছ থেকে নির্দেশনা নিয়ে এসে তা দলীয় কর্মীদের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়ে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সারা দেশ উত্তাল হয়ে ওঠার পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ভিত থরথর করে কেঁপে ওঠে, সেই অভ্যুত্থান বেগবান করার পেছনে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদান ছিল অপরিসীম। গণঅভ্যুত্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুসহ আরও কয়েকজন দেশপ্রেমী বাঙালি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার মিথ্যা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র মাধ্যমে স্বাধিকার আন্দোলনের মূলে কুঠারাঘাত হানার চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য কারাবন্দি মুক্তি পান। এটি ছিল শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতির বিশাল বিজয়, যে বিজয়ে সুপ্ত ছিল বাংলাদেশের মুক্তির বীজ, বেগবান হয়েছিল স্বাধীনতার আন্দোলন। আরও আছে তার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কাহিনি। বঙ্গবন্ধুকে যখন প্যারোলে মুক্তি দিয়ে লাহোরে গোলটেবিল বৈঠকে বসতে শাসকগোষ্ঠী আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, তখন দলের সবার মতের বিরুদ্ধে, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে, দৃঢ়কণ্ঠে প্যারোলে মুক্তি নেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন তিনি। তার সেই বজ্রকঠিন মনোভাব বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন। বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু প্যারোলে মুক্তি নিতে অস্বীকৃতি জানানোতে শাসকরা তাকে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। এটি ছিল একটি বিরাট রাজনৈতিক বিজয়। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচে না থেকেও রাজনীতির জটিল অঙ্ক তিনি বুঝতে পারতেন। সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া দূরদর্শিতার গুণটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন আমৃত্যু।

একাত্তরের ৭ মার্চের অলিখিত, বিশ্বের ইতিহাসে স্থান করে নেওয়া, কালজয়ী ভাষণ নিজের প্রজ্ঞার আলোকে দেওয়ার জন্য বঙ্গমাতাই বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। একাত্তরের ২৩ মার্চ বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও তিনি বঙ্গবন্ধুর পরামর্শক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নয় মাসের উত্তাল রক্তঝরা সময়ে বঙ্গমাতা অসীম সাহস আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে সর্বপ্রকার প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন।

একদিকে তিনি ছিলেন আদর্শ গৃহিণী, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ জীবনসঙ্গিনী, অন্যদিকে ছিলেন সন্তানদের জন্য আদর্শ মাতা। বঙ্গবন্ধুর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন ছায়ার মতো। বঙ্গবন্ধুর কাছে বেগম ফজিলাতুন নেছা শুধু সহধর্মিণীই ছিলেন না, ছিলেন একজন সহকর্মী, একজন সহমর্মী, আন্দোলন বেগবান করার অনুঘটক, স্নেহময়ী পরামর্শক এবং সতত প্রেরণাদায়িনী। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের কালরাতে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পরপরই তাকে হানাদার বাহিনীর গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গমাতাই ছিলেন তার সবচেয়ে বড় সুহৃদ। বঙ্গমাতার সামনে থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নেওয়ার পর যখন সারা শহরে গোলাগুলির আওয়াজ আর জ্বলন্ত বাড়িঘরে দাউ দাউ আগুনের লেলিহান শিখার সঙ্গে নিরীহ মানুষের আর্তচিৎকারে চারদিকে সৃষ্টি হয় আতঙ্কময় ভূতুড়ে পরিবেশ, তখনো বঙ্গমাতা একটুর জন্যও মুষড়ে পড়েননি। রাতের অন্ধকার যখন ঘনিয়ে আসে, তখন ভোরের অরুণোদয়ও উদ্ভাসিত হওয়ার অপেক্ষায় থাকে। তিনি ছিলেন সেই ভোরের অপেক্ষায়।

বাংলাদেশ ভূখণ্ডের জন্য একটি পতাকা অর্জনে, বিশ্বের মানচিত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অবদান বাঙালি জাতি চিরকাল স্মরণে রাখবে। ১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ জহুরুল হক এবং হোসনে আরা বেগমের পরিবার আলো করে ভূমিষ্ঠ হওয়া তাদের তৃতীয় সন্তান এ মহীয়সী নারীর নাম ‘বঙ্গমাতা’ হিসাবেই বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।

ড. এম এ মাননান : সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সাবেক উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন