আগামী কাউন্সিলে সরকারি দল কি সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করতে পারবে?
jugantor
চেতনায় বুদ্বুদ
আগামী কাউন্সিলে সরকারি দল কি সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করতে পারবে?

  বদিউর রহমান  

০৯ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সবচেয়ে বড়, শুধুই বড়ই নয়, ঐতিহ্যবাহী এবং তৃণমূলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য-স্বীকৃত দল। এ দলের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ স্বাধীন হয়েছে-এটাই এ দলের সবচেয়ে বড় অর্জন। এ দল এ দেশের গণতন্ত্রের এক বিরাট মহীরুহ, যদিও মাঝখানে এ দলই দেশে একদলীয় বাকশাল করেছিল। অবশ্য তার খেসারতও এ দল কম দেয়নি। কিন্তু এ দল হচ্ছে দূর্বাঘাস, মরে না, বারবার জীবিত হয়ে টিকে থাকে।

এ দলকেই পাকিস্তান সরকার ভয় পেত, আমলে নিত; আবার বাংলাদেশেও এ দলকেই ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) হেস্তনেস্ত করতে কিংবা সহযোগিতায় আনতে চেষ্টা করত। মূলত জনগণের দ্বারা জনগণের মধ্যে জনগণের ভালোবাসায় সৃষ্ট, একমাত্র রাজনৈতিক দলও এ আওয়ামী লীগই। বিএনপি সৃষ্টি হয়েছে সেনাছাউনিতে জিয়ার ক্ষমতা দখলের পর, জাপার জন্ম হয়েছে-তা-ও সেনাছউনিতে এরশাদের সামরিক আইনের আওতায়। বস্তুত বাংলাদেশে এখন মূলত দুটি দলই আছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তারপর এরশাদের জাপা। বাকি যে অনেক দলের নাম নির্বাচন কমিশনের তালিকায় রয়েছে বা সংলাপে নাম শোনা যাচ্ছে এখন, এগুলোর কয়টার নাম জনগণ শুনেছে? এবার তো নির্বাচন কমিশনের সংলাপের নেমন্তনে এমন নামের দলও আছে শুনছি, যার নাম আমি আগে কখনো শুনিনি।

একজন্যা, দুজন্যা নামসর্বস্ব এসব দল জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপেই বোধহয় রাজনৈতিক দল হিসাবে উঁকি দেয়, তারপর বাকি সারা বছর এরা আছে কী নেই, তা তারাও বোঝে কিনা সন্দেহ। তারপরও তো তারাও একটা রাজনৈতক দল, নির্বাচন কমিশনের শর্তাদি মেনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল! এ সুবাদেই তো সংলাপে তাদের চেহারা-মোবারক অন্তত দেখা যায়। মাঝে-মাঝে আমারও খায়েশ হয়, নিজে নিজে একজন্যা-দুজন্যা একটা রাজনৈতিক দল করে ফেলব কিনা। ভোটের আগে জোট-মহাজোট হলে তখন অন্তত একটা বড় দলের লেজুড় হতে পারা যাবে। গোটা চারেক পোতা-পতি তো আছে।

রাজনৈতিক দলগুলোতে যার যার দলীয় গঠনতন্ত্র আছে নিশ্চয়, কিন্তু সে গঠনতন্ত্র কোন দল কতটুকু পালন করে তা গবেষণার বিষয়। এই যে অনেক দলের কাউন্সিল হয় না, ভোটে পদ-পদবি পূরণ হয় না, গণতন্ত্রের চর্চা তো দলে নেই-এসব অভিযোগ কি বানোয়াট? সিকি-আধুলি দলও তো এখন দেশে নেই, বেশিরভাগই বাজারে না-পাওয়া বা না-চলা খুচরো পয়সা, কোনো-কোনোটা হয়তো সেই আমাদের শিশুকালের কানা পয়সা, ছিদ্রওয়ালা এক পয়সা বা অচল ঘষা পয়সা। এদের আবার গণতন্ত্রই কী, তন্ত্রই তো নেই। আমার এগুলোর নাম শুনে হাসি পায়। একটা কিছু করোরে ভাই একটা কিছু করো, হোয়েন দেয়ার ইজ নো কার্ড টু প্লে, দেন প্লে কালার-তাসের ব্রিজ খেলার এ নিয়ম অনুসরণে যখন আর কিছু করার নেই তখন একটা রাজনৈতিক দল খুলে ফেল! এই আর কী অবস্থা।

রাজনীতি এখন ভালো ব্যবসায়, বিনা পুঁজিতে ভালো আয়-রোজগার হয়। আমাদের গ্রামাঞ্চলেও এ রাজনীতির বদৌলতে কতজনের ভাগ্য খুলে গেল দেখলাম। দৃশ্যমান কোনো রুজি-রোজগার নেই, কিন্তু কীভাবে যে গাড়িরও মালিক বনে যান-তিনি যে রাজনীতি করেন! আমাদেরই এক প্রতিবেশীকে জানি, দলের চেলা-চামুন্ডা বা কিছু যেন কী একটা, অথচ ঘরেফিরে বাড়িতে পাকা দালানও করে ফেলল! মাদকের কাজও নাকি করে, একবার আইনের কারা এসে ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হলেন। পাড়া-প্রতিবেশী তার ভয়ে ভীত থাকে, আমিও পড়েছিলাম একবার বেকায়দায়। এক টেলিফোনে তার লোক এসে যায়। আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার যুগে উন্নয়ন অনেক দিলেও শুধু গণতন্ত্রের অবনতিই ঘটায়নি, বরং সমাজটাকে নৈতিক অধঃপতনে নামিয়ে দিয়েছে। তারপরও আমরা বিকল্প নেই বিধায় সার্বিক বিবেচনায় এখনো আওয়ামী লীগকেই চাই, এখনো শেখ হাসিনাকেই চাই। আমরা আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সমালোচনা করি, দলীয় ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধনের পরামর্শ দেই, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় এখনো আওয়ামী লীগকেই দেই। আওয়ামী লীগের কিন্তু মনে রাখা দরকার, মানুষ তাদের অন্যায় কিছু চোখ বুজে মানে না, ভয়ে মানে।

বড় দুটি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা এখন অনেকটা কমে গেছে। আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা এবং বিএনপিতে খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় তারেক এখন সর্বেসর্বা। শেখ হাসিনার জীবদ্দশায়, সুস্থ থাকলে এবং তিনি না চাইলে আর কেউ দলের প্রধান হতে আদৌ পারবেন কিনা সন্দেহ। তারপরও আওয়ামী লীগের ইতিহাসে আগে মাঝে মাঝে সংকটকালে শেখ পরিবারের বাইরের কেউ কেউ দলটির প্রধান হয়েছে। কিন্তু বিএনপির বেলায় দলীয় প্রধান যেন জিয়া-পরিবারের মৌরসী তালুক। পারিবারিক মালিকানায় দলটি এমন বেকায়দায় পড়েছে যে, দলের অন্যেরা চাইলেও কোনো সুরাহা করতে আর পারছে না। এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় সাইফুর-হাফিজ-মান্নান গং খালেদাকে বাদ দিতে গিয়েও পারেনি। তখন অবশ্য তথাকথিত মাইনাস-টু ফরমুলায় হাসিনা-খালেদাকে বাদ দেওয়ার একটা অপচেষ্টা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের জনাচারেক STAR হতে চেয়েও পরে অনেকটা RATS হয়ে গেলেন। এক-এগারোর সরকারও নতি স্বীকার করে পরে। হাসিনা-খালেদা তখন দুদলের নেতা এবং অপরিহার্য হয়ে পড়েন। জেল থেকে তাদের মুক্তি দিতেও বাধ্য হয় সেনা-নির্দেশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

শেখ হাসিনার মুক্তিতে আমি লিখেছিলাম-শেখ হাসিনার মুক্তি জনমনে স্বস্তি। কিন্তু তারপরও এ দুদলের নিজেরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো করেনইনি, বরং তারা আরও মজবুত হয়ে বসেছেন। দীর্ঘ সময়ের দলীয় নেতৃত্বে বা প্রধানমন্ত্রিত্বে থাকার বদৌলতে কেউ গিনেস বুকে নাম লেখাতেও সচেষ্ট কিনা আল্লাহ মালুম। কিছু আঁতেল তো তাদের কাউকে-কাউকে এত গ্যাস দিচ্ছেন যে, তাদের পেটই আবার ফুলে ফুটে যায় কিনা-আল্লা মালুম। কেউই কোনো পদে অপরিহার্য নয়-এটা ইতিহাস থেকে আমরা শিখে নিতে চাই না। তবে এ দুটি বড় দল তাদের সাধারণ সম্পাদক পদে একজন বিশ্বস্ত-দোহারী সব সময়ে রাখেন, রাখতে সচেষ্ট হয়। পান থেকে চুন খসলে রাজনীতিতে কিন্তু মহাছন্দপতন ঘটে যায়। আর কিছু নেতাও কেন যে বিদ্রোহী হন-আমার বুঝে আসে না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের একটা ডামাডোল কিন্তু এখন বাজছে। আগামী কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক নতুন মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন মর্মে বলা হচ্ছে। ইতিহাস থেকে যা আমরা জানি, তাতে বোঝা যায়, শেখ হাসিনা যাকে চাইবেন তিনিই হবেন আগামী সাধারণ সম্পাদক। শেখ হাসিনার সভাপতি পদে তো অন্য কারও আসার চিন্তাই বোধহয় এখন করা যায় না, যদি না শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় কাউকে না বসান। শেখ হাসিনার আশীর্বাদ সাধারণ সম্পাদক পদে কার ওপর বর্ষিত হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশ প্রতিদিন গত ২৫ জুলাই ২০২২ ওবায়দুল কাদেরসহ ৯ জনের সম্ভাব্য একটা তালিকা তাদের ছবিসহকারে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন ঘিরে পত্রিকায় তুলে এনেছে। এ প্রজেকশনে এখনো ওবায়দুল কাদেরের ছবিই প্রাধান্য পেয়েছে। জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, মাহবুবউল আলম হানিফ, ড. আবদুর রাজ্জাক, ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ, বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজম-এদের নাম এবং ছবি আলোচনায় আছে। আওয়ামী লীগে নেতার অভাব নেই, বরং এত বেশি নেতা আছেন যে অন্য দলের নেতৃত্ব সংকটে এ দল থেকে তারা নেতা ধারও নিতে পারেন। শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে আওয়ামী লীগ যদি মনে করে যে, এ দল নিজেদের ভেতর থেকে নিজেদের স্বার্থে তারাই একটা নিজস্ব বিরোধী দল গঠন করবে-তা-ও সম্ভব। নেতায়-নেতায় ভরপুর এ দলের শেখ হাসিনা কাকে ফেলে কাকে বেছে নেবেন? প্রকৃত গণতন্ত্র তো দলে নেই যে আসলেই ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন, অতএব, শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

শেখ হাসিনার একটা গুণ সম্পর্কে আমার এক সহকর্মী প্রায়ই বলে থাকেন যে, শেখ হাসিনা যাকে ‘বুক’ দেন, তাকে ‘পিঠ’ দেখান না। অর্থাৎ যাকে তিনি পছন্দ করেন তার জন্য সবই করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর দেহের চেয়ে কলিজাটা অর্থাৎ হৃদয়টা বড় ছিল, শেখ হাসিনা সে পর্যায়ের না হলেও তিনিও কম নন। ইতোমধ্যে এক প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের ‘সুস্থ থাকলে’ বলে যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা শেখ হাসিনার মনের কথাই বলে ফেলেছেন কিনা কে জানে। অতএব, আপাতত আগামী সম্মেলনেও আবার ওবায়দুল কাদেরেরই সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। সামনে নির্বাচন রেখে দলীয়প্রধান নিশ্চয়ই নতুন মেরুকরণের ঝুঁকিও হয়তো নিতে চাইবেন না। দলের সাধারণ সম্পাদককে এখন সভাপতির দোহারী ও চাপাবাজ হতে হয়। সে বিবেচনায় কোনো কারণে যদি অগত্যা ওবায়দুল কাদেরকে স্বাস্থ্যগত কারণে বিশ্রাম নিতেই হয়, তাহলে হয়তো সার্বিক বিবেচনায় ড. হাছান মাহমুদ সামনে এসে যাবেন। শিক্ষা, আচার-ব্যবহার, বিরোধী দলকে ঘায়েল করা, নেতার দোহারী হওয়া, দলকে প্রচার-প্রসারে এগিয়ে নেওয়া-এ সবই তো নেতা নির্বাচনে বিবেচ্য হবে।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

চেতনায় বুদ্বুদ

আগামী কাউন্সিলে সরকারি দল কি সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করতে পারবে?

 বদিউর রহমান 
০৯ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের সবচেয়ে বড়, শুধুই বড়ই নয়, ঐতিহ্যবাহী এবং তৃণমূলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য-স্বীকৃত দল। এ দলের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ স্বাধীন হয়েছে-এটাই এ দলের সবচেয়ে বড় অর্জন। এ দল এ দেশের গণতন্ত্রের এক বিরাট মহীরুহ, যদিও মাঝখানে এ দলই দেশে একদলীয় বাকশাল করেছিল। অবশ্য তার খেসারতও এ দল কম দেয়নি। কিন্তু এ দল হচ্ছে দূর্বাঘাস, মরে না, বারবার জীবিত হয়ে টিকে থাকে।

এ দলকেই পাকিস্তান সরকার ভয় পেত, আমলে নিত; আবার বাংলাদেশেও এ দলকেই ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) হেস্তনেস্ত করতে কিংবা সহযোগিতায় আনতে চেষ্টা করত। মূলত জনগণের দ্বারা জনগণের মধ্যে জনগণের ভালোবাসায় সৃষ্ট, একমাত্র রাজনৈতিক দলও এ আওয়ামী লীগই। বিএনপি সৃষ্টি হয়েছে সেনাছাউনিতে জিয়ার ক্ষমতা দখলের পর, জাপার জন্ম হয়েছে-তা-ও সেনাছউনিতে এরশাদের সামরিক আইনের আওতায়। বস্তুত বাংলাদেশে এখন মূলত দুটি দলই আছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তারপর এরশাদের জাপা। বাকি যে অনেক দলের নাম নির্বাচন কমিশনের তালিকায় রয়েছে বা সংলাপে নাম শোনা যাচ্ছে এখন, এগুলোর কয়টার নাম জনগণ শুনেছে? এবার তো নির্বাচন কমিশনের সংলাপের নেমন্তনে এমন নামের দলও আছে শুনছি, যার নাম আমি আগে কখনো শুনিনি।

একজন্যা, দুজন্যা নামসর্বস্ব এসব দল জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপেই বোধহয় রাজনৈতিক দল হিসাবে উঁকি দেয়, তারপর বাকি সারা বছর এরা আছে কী নেই, তা তারাও বোঝে কিনা সন্দেহ। তারপরও তো তারাও একটা রাজনৈতক দল, নির্বাচন কমিশনের শর্তাদি মেনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল! এ সুবাদেই তো সংলাপে তাদের চেহারা-মোবারক অন্তত দেখা যায়। মাঝে-মাঝে আমারও খায়েশ হয়, নিজে নিজে একজন্যা-দুজন্যা একটা রাজনৈতিক দল করে ফেলব কিনা। ভোটের আগে জোট-মহাজোট হলে তখন অন্তত একটা বড় দলের লেজুড় হতে পারা যাবে। গোটা চারেক পোতা-পতি তো আছে।

রাজনৈতিক দলগুলোতে যার যার দলীয় গঠনতন্ত্র আছে নিশ্চয়, কিন্তু সে গঠনতন্ত্র কোন দল কতটুকু পালন করে তা গবেষণার বিষয়। এই যে অনেক দলের কাউন্সিল হয় না, ভোটে পদ-পদবি পূরণ হয় না, গণতন্ত্রের চর্চা তো দলে নেই-এসব অভিযোগ কি বানোয়াট? সিকি-আধুলি দলও তো এখন দেশে নেই, বেশিরভাগই বাজারে না-পাওয়া বা না-চলা খুচরো পয়সা, কোনো-কোনোটা হয়তো সেই আমাদের শিশুকালের কানা পয়সা, ছিদ্রওয়ালা এক পয়সা বা অচল ঘষা পয়সা। এদের আবার গণতন্ত্রই কী, তন্ত্রই তো নেই। আমার এগুলোর নাম শুনে হাসি পায়। একটা কিছু করোরে ভাই একটা কিছু করো, হোয়েন দেয়ার ইজ নো কার্ড টু প্লে, দেন প্লে কালার-তাসের ব্রিজ খেলার এ নিয়ম অনুসরণে যখন আর কিছু করার নেই তখন একটা রাজনৈতিক দল খুলে ফেল! এই আর কী অবস্থা।

রাজনীতি এখন ভালো ব্যবসায়, বিনা পুঁজিতে ভালো আয়-রোজগার হয়। আমাদের গ্রামাঞ্চলেও এ রাজনীতির বদৌলতে কতজনের ভাগ্য খুলে গেল দেখলাম। দৃশ্যমান কোনো রুজি-রোজগার নেই, কিন্তু কীভাবে যে গাড়িরও মালিক বনে যান-তিনি যে রাজনীতি করেন! আমাদেরই এক প্রতিবেশীকে জানি, দলের চেলা-চামুন্ডা বা কিছু যেন কী একটা, অথচ ঘরেফিরে বাড়িতে পাকা দালানও করে ফেলল! মাদকের কাজও নাকি করে, একবার আইনের কারা এসে ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হলেন। পাড়া-প্রতিবেশী তার ভয়ে ভীত থাকে, আমিও পড়েছিলাম একবার বেকায়দায়। এক টেলিফোনে তার লোক এসে যায়। আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার যুগে উন্নয়ন অনেক দিলেও শুধু গণতন্ত্রের অবনতিই ঘটায়নি, বরং সমাজটাকে নৈতিক অধঃপতনে নামিয়ে দিয়েছে। তারপরও আমরা বিকল্প নেই বিধায় সার্বিক বিবেচনায় এখনো আওয়ামী লীগকেই চাই, এখনো শেখ হাসিনাকেই চাই। আমরা আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার সমালোচনা করি, দলীয় ত্রুটিবিচ্যুতি সংশোধনের পরামর্শ দেই, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় এখনো আওয়ামী লীগকেই দেই। আওয়ামী লীগের কিন্তু মনে রাখা দরকার, মানুষ তাদের অন্যায় কিছু চোখ বুজে মানে না, ভয়ে মানে।

বড় দুটি দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা এখন অনেকটা কমে গেছে। আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনা এবং বিএনপিতে খালেদা জিয়ার অসুস্থতায় তারেক এখন সর্বেসর্বা। শেখ হাসিনার জীবদ্দশায়, সুস্থ থাকলে এবং তিনি না চাইলে আর কেউ দলের প্রধান হতে আদৌ পারবেন কিনা সন্দেহ। তারপরও আওয়ামী লীগের ইতিহাসে আগে মাঝে মাঝে সংকটকালে শেখ পরিবারের বাইরের কেউ কেউ দলটির প্রধান হয়েছে। কিন্তু বিএনপির বেলায় দলীয় প্রধান যেন জিয়া-পরিবারের মৌরসী তালুক। পারিবারিক মালিকানায় দলটি এমন বেকায়দায় পড়েছে যে, দলের অন্যেরা চাইলেও কোনো সুরাহা করতে আর পারছে না। এক-এগারোর সেনা-সমর্থিত সরকারের সময় সাইফুর-হাফিজ-মান্নান গং খালেদাকে বাদ দিতে গিয়েও পারেনি। তখন অবশ্য তথাকথিত মাইনাস-টু ফরমুলায় হাসিনা-খালেদাকে বাদ দেওয়ার একটা অপচেষ্টা হয়েছিল। আওয়ামী লীগের জনাচারেক STAR হতে চেয়েও পরে অনেকটা RATS হয়ে গেলেন। এক-এগারোর সরকারও নতি স্বীকার করে পরে। হাসিনা-খালেদা তখন দুদলের নেতা এবং অপরিহার্য হয়ে পড়েন। জেল থেকে তাদের মুক্তি দিতেও বাধ্য হয় সেনা-নির্দেশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

শেখ হাসিনার মুক্তিতে আমি লিখেছিলাম-শেখ হাসিনার মুক্তি জনমনে স্বস্তি। কিন্তু তারপরও এ দুদলের নিজেরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো করেনইনি, বরং তারা আরও মজবুত হয়ে বসেছেন। দীর্ঘ সময়ের দলীয় নেতৃত্বে বা প্রধানমন্ত্রিত্বে থাকার বদৌলতে কেউ গিনেস বুকে নাম লেখাতেও সচেষ্ট কিনা আল্লাহ মালুম। কিছু আঁতেল তো তাদের কাউকে-কাউকে এত গ্যাস দিচ্ছেন যে, তাদের পেটই আবার ফুলে ফুটে যায় কিনা-আল্লা মালুম। কেউই কোনো পদে অপরিহার্য নয়-এটা ইতিহাস থেকে আমরা শিখে নিতে চাই না। তবে এ দুটি বড় দল তাদের সাধারণ সম্পাদক পদে একজন বিশ্বস্ত-দোহারী সব সময়ে রাখেন, রাখতে সচেষ্ট হয়। পান থেকে চুন খসলে রাজনীতিতে কিন্তু মহাছন্দপতন ঘটে যায়। আর কিছু নেতাও কেন যে বিদ্রোহী হন-আমার বুঝে আসে না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের একটা ডামাডোল কিন্তু এখন বাজছে। আগামী কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদক নতুন মেয়াদের জন্য নির্বাচিত হবেন মর্মে বলা হচ্ছে। ইতিহাস থেকে যা আমরা জানি, তাতে বোঝা যায়, শেখ হাসিনা যাকে চাইবেন তিনিই হবেন আগামী সাধারণ সম্পাদক। শেখ হাসিনার সভাপতি পদে তো অন্য কারও আসার চিন্তাই বোধহয় এখন করা যায় না, যদি না শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় কাউকে না বসান। শেখ হাসিনার আশীর্বাদ সাধারণ সম্পাদক পদে কার ওপর বর্ষিত হবে সেটা সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশ প্রতিদিন গত ২৫ জুলাই ২০২২ ওবায়দুল কাদেরসহ ৯ জনের সম্ভাব্য একটা তালিকা তাদের ছবিসহকারে আওয়ামী লীগের ২২তম জাতীয় সম্মেলন ঘিরে পত্রিকায় তুলে এনেছে। এ প্রজেকশনে এখনো ওবায়দুল কাদেরের ছবিই প্রাধান্য পেয়েছে। জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, মাহবুবউল আলম হানিফ, ড. আবদুর রাজ্জাক, ডা. দীপু মনি, ড. হাছান মাহমুদ, বাহাউদ্দিন নাছিম, মির্জা আজম-এদের নাম এবং ছবি আলোচনায় আছে। আওয়ামী লীগে নেতার অভাব নেই, বরং এত বেশি নেতা আছেন যে অন্য দলের নেতৃত্ব সংকটে এ দল থেকে তারা নেতা ধারও নিতে পারেন। শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে আওয়ামী লীগ যদি মনে করে যে, এ দল নিজেদের ভেতর থেকে নিজেদের স্বার্থে তারাই একটা নিজস্ব বিরোধী দল গঠন করবে-তা-ও সম্ভব। নেতায়-নেতায় ভরপুর এ দলের শেখ হাসিনা কাকে ফেলে কাকে বেছে নেবেন? প্রকৃত গণতন্ত্র তো দলে নেই যে আসলেই ভোটে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন, অতএব, শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

শেখ হাসিনার একটা গুণ সম্পর্কে আমার এক সহকর্মী প্রায়ই বলে থাকেন যে, শেখ হাসিনা যাকে ‘বুক’ দেন, তাকে ‘পিঠ’ দেখান না। অর্থাৎ যাকে তিনি পছন্দ করেন তার জন্য সবই করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর দেহের চেয়ে কলিজাটা অর্থাৎ হৃদয়টা বড় ছিল, শেখ হাসিনা সে পর্যায়ের না হলেও তিনিও কম নন। ইতোমধ্যে এক প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের ‘সুস্থ থাকলে’ বলে যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা শেখ হাসিনার মনের কথাই বলে ফেলেছেন কিনা কে জানে। অতএব, আপাতত আগামী সম্মেলনেও আবার ওবায়দুল কাদেরেরই সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত। সামনে নির্বাচন রেখে দলীয়প্রধান নিশ্চয়ই নতুন মেরুকরণের ঝুঁকিও হয়তো নিতে চাইবেন না। দলের সাধারণ সম্পাদককে এখন সভাপতির দোহারী ও চাপাবাজ হতে হয়। সে বিবেচনায় কোনো কারণে যদি অগত্যা ওবায়দুল কাদেরকে স্বাস্থ্যগত কারণে বিশ্রাম নিতেই হয়, তাহলে হয়তো সার্বিক বিবেচনায় ড. হাছান মাহমুদ সামনে এসে যাবেন। শিক্ষা, আচার-ব্যবহার, বিরোধী দলকে ঘায়েল করা, নেতার দোহারী হওয়া, দলকে প্রচার-প্রসারে এগিয়ে নেওয়া-এ সবই তো নেতা নির্বাচনে বিবেচ্য হবে।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন