শতফুল ফুটতে দাও

মুক্তিযুদ্ধে জিতেছি, মাদকযুদ্ধে কেন হারব?

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. মাহবুব উল্লাহ্

গত ১৫ মে থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। এ অভিযানে প্রধানত অংশ নিয়েছে পুলিশ, র‌্যাব ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। দাবি করা হয়েছে একটি অনুপুঙ্খ তালিকার ভিত্তিতেই অভিযানটি পরিচালিত হচ্ছে।

এত যাচাই-বাছাইয়ের নিরিখে প্রণীত তালিকার মধ্যেও ভুল-ত্রুটি থেকে যেতে পারে বলে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের স্বীকার করেছেন বিশাল এই অভিযানের মধ্যে দু-একটি ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। ভুল-ত্রুটি নিয়ে এ স্বীকারোক্তির পর প্রচণ্ড সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

কারণ মাদকের বিরুদ্ধে এ অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে শতাধিক ব্যক্তি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। যেখানে জীবন-মরণের প্রশ্ন সেখানে একটি ভুলও হালকা করে দেখার উপায় নেই। সভ্য সমাজে মানবাধিকারের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দেখা হয়। পাশ্চাত্যের দার্শনিকরা যখন মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান, তখন বেঁচে থাকার অধিকারটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়। একে বলা হয় ন্যাচারাল রাইট।

বাংলাদেশোত্তর কালে বিভিন্ন সময়ে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার নানা প্রসঙ্গকে কেন্দ্র করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। প্রয়াত সাংবাদিক নির্মল সেন তার একটি কলামের জন্য প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার কলামের শিরোনাম ছিল, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’।

জন্মগ্রহণ করলে একদিন না একদিন মানুষের মৃত্যু ঘটবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে অপঘাতে মৃত্যু কখনই কাম্য নয়। স্বাভাবিক মৃত্যুর বাইরে যেসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য মৃত্যু হল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে মৃত্যু। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হল একটি ভূখণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্রীয়বাহিনীর বল প্রয়োগের একচেটিয়া অধিকার।

যতদিন রাষ্ট্র থাকবে ততদিন রাষ্ট্রের একচেটিয়া বল প্রয়োগের অধিকারও বহাল থাকবে। কিন্তু সভ্য গণতান্ত্রিক দেশগুলো এই একচেটিয়া অধিকারের ওপর রাশ টেনে ধরেছে। বলা হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আইন দ্বারা। একেই বলা হয় আইনের শাসন। কিন্তু আইনের শাসন নিয়েও বিতর্কের উদ্ভব হয়েছে। আইনটি যদি কালো আইন হয় কিংবা বর্বর আইন হয় তাহলে সেই আইনের শাসনও সভ্যসমাজ মেনে নিতে পারে না।

তাই দেশে-দেশে, কালে-কালে প্রচেষ্টা চলছে কীভাবে আইনকে মার্জিত ও মানবিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করে তোলা যায়, এ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অন্ত নেই। সময়ের দাবিতে আইনেরও সংস্কার হচ্ছে। এমনকি আইনি বিচারে কারও যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে সেই মৃত্যুদণ্ড কীভাবে সবচেয়ে কম কষ্টদায়ক করা যায় সে নিয়েও নানা বিকল্পের কথা ভাবা হচ্ছে।

মার্কসীয় তত্ত্ব অনুযায়ী রাষ্ট্র হল নিপীড়নের হাতিয়ার। এ তত্ত্ব অনুযায়ী অধিপতি শ্রেণী শাসিত শ্রেণীর ওপর নিপীড়ন চালায়। পৃথিবী যতই সভ্যতার পথে এগিয়ে চলছে ততই নিপীড়নকেও আড়াল করার কিংবা ভদ্র রূপ দেয়ার চেষ্টা চলছে। এজন্যই মার্কিন দার্শনিক হার্বার্ট মার্কুসে বলেছেন, উন্নত পুঁজিবাদী সমাজে এমনভাবে নিপীড়ন যন্ত্র পরিচালনা করা হয় যাতে নিপীড়িত মানুষ বুঝতে পারে না তাদের ওপর নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।

একে মার্কুসে বলেছেন, Oppression by toleration. তারপরও আমরা গুয়ান্তানামো কারাগারে ভয়াবহ নিপীড়নের ঘটনা দেখছি। অর্থাৎ রাষ্ট্র অনেক সময় তার স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে ভদ্রতার মুখোশ খুলে ফেলতে পিছপা হয় না। এতকিছুর পরও সভ্যতার দাবি হচ্ছে মানুষের জন্য মানবিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা। যে সমাজে মানবিক অধিকার নিয়ে কোনো উদ্বেগ থাকে না, সেই সমাজ হয়ে ওঠে অগণতান্ত্রিক, বর্বর ও সভ্যতাবিবর্জিত। এমন সমাজ কারোরই কাম্য নয়।

বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানের সূচনায় র‌্যাবের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’। এরপর থেকে প্রশ্ন উঠেছে এটা কি যুদ্ধ, না অভিযান? না অন্য কিছু। যাই হোক, একে মাদকবিরোধী অভিযান বলেই বিবেচনা করা সঠিক হবে। তবে যে প্রশ্নটি এখন গণমাধ্যমে তুমুল আলোচনার ঝড় তুলেছে তা হল, বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে না গিয়ে কেন বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। হতে পারে তারা অপরাধী।

অপরাধীকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। আইন নির্ধারণ করে দেবে শাস্তির মাত্রা। আবার বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়, বিচারে ১০ জন অপরাধী ছাড়া পেয়ে যেতে পারে; কিন্তু একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও যেন শাস্তি না পায়। আমরা যে ঔপনিবেশিক আইনের ঐতিহ্য বহন করছি, সেই আইনের ন্যায্যতা এ নীতির ওপরই প্রতিষ্ঠিত।

বিচারবহির্ভূতভাবে কারও প্রাণ হরণ করা হলে সেটি একদিকে যেমন হবে আইনের ব্যত্যয়, অন্যদিকে তেমনি হবে দণ্ড প্রদানের মৌলনীতিরও ব্যত্যয়। এসব নীতি-নৈতিকতার প্রশ্ন যখন আলোচিত হচ্ছে তখন আরেকটি প্রশ্নও উত্থাপিত হচ্ছে। সেটা হল, বন্দুকযুদ্ধে যারা প্রাণ হারাচ্ছে অথবা গ্রেফতার হচ্ছে তারা হল চুনোপুঁটি।

গডফাদার কিংবা রাঘববোয়ালদের কেশাগ্র স্পর্শ করা হয়েছে এমন কোনো নজির দেখা যাচ্ছে না। অন্তত এই কলাম যখন লেখা হচ্ছে সে সময় পর্যন্ত। সন্দেহ করা হচ্ছে, ইতিমধ্যেই এরা দেশ থেকে পালিয়ে গেছে অথবা গা-ঢাকা দিয়েছে। এ রকম প্রশ্ন যখন উঠতে থাকে তখন অভিযানের সততাও প্রশ্নের সম্মুখীন হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা অভিযানের মহৎ উদ্দেশ্যকেও ব্যর্থ করে দিতে পারে।

মাদক আমাদের সমাজে নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে এ সমস্যা আমাদের সমাজকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে চলেছে এবং সমাজকে সর্বনাশের অতলে ডুবিয়ে দিচ্ছে। এক হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭০ লাখ। এ পরিসংখ্যান যদি সঠিক হয় তাহলে অবশ্যই মানতে হবে ৭০ লাখ পরিবার এর দুর্বহ বোঝা বহন করছে এবং কোটি কোটি মানুষ এর নেতিবাচক প্রভাবে দুঃসহ জীবনযাপন করছে। সমাজের গাঁথুনি লণ্ডভণ্ড হয়ে যাচ্ছে।

মাদকের ছোবল এতই বিষাক্ত যে, এর ফলে মানুষের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাচ্ছে। ঐশী নামক মেয়েটির দৃষ্টান্তই এর জন্য যথেষ্ট। সে মাদকের চাহিদা পূরণে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তার জন্মদাতা পিতা ও জন্মদাত্রী মাতাকে হত্যা করেছে। তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১৯ বছর। এ থেকেই বোঝা যায়, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কী ভয়াবহ নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা ভবিষ্যতের জন্য যে স্বপ্ন দেখি, সেই স্বপ্ন নিছক নিজেদের জন্য দেখি না।

আমাদের স্বপ্ন আমাদের সন্তান-সন্ততি এবং দৌহিত্র-দৌহিত্রীকে ঘিরে। এভাবে কল্যাণচিন্তা যখন বংশপরম্পরায় আবর্তিত হয়, তখন সেটা নিছক বর্তমানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এর বিস্তার ঘটে অনাদিকাল জুড়ে। এভাবেই মানবপ্রজাতি অন্য যে কোনো প্রাণী-প্রজাতির চেয়ে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছে। সুতরাং কোনো প্রজন্মের স্খলন ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে সে ব্যাপারে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে মাদক থেকে মুক্তির কোনো বিকল্প নেই।

বর্তমান সরকার একটানা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার ৯ বছর পার করেছে। সুতরাং এ সরকারের পক্ষে অনেক আগেই সমাজ থেকে মাদক নির্মূলের পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, যথেষ্ট সময় হাতে থাকা সত্ত্বেও এরকম কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথা আগে বিবেচনা করা হয়নি।

নির্বাচন যখন দোরগোড়ায়, তখন এ ধরনের একটি অভিযান কতটা রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হচ্ছে আর কতটা মানবকল্যাণের বিবেচনায় করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অসঙ্গত নয়। মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি অনিরাপদ খাবারের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে। শোনা যাচ্ছে, বে-আইনি অস্ত্র উদ্ধারেও অভিযান চালানো হবে।

এভাবে একটির পর একটি অভিযানের মধ্য দিয়ে সরকার নির্বাচনের প্রাক্কালে সুশাসনের একটি ভাবমূর্তি গড়ে তোলার প্রয়াস পাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। আমরা চাই, সব অনাচার, সন্ত্রাস ও সামাজিক বিচ্যুতির বিরুদ্ধে অভিযান চলবে সুচিন্তিতভাবে এবং নিরবচ্ছিন্ন গতিতে। এটি কোনো মৌসুমি পদক্ষেপ হতে পারে না। এর জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও প্রস্তুত করতে হবে সর্বোচ্চ সততা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে।

বর্তমান মাদকবিরোধী অভিযানে যে বিষয়টি দুঃখজনকভাবে অবহেলিত থেকে গেছে তা হল সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি। সরকার রেডিও-টেলিভিশনে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নিয়ে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা জমজমাটভাবে গড়ে তুলেছে, তার বিন্দুমাত্র দেখতে পাওয়া যায় না মাদকের মতো সামাজিক অভিশাপের বিরুদ্ধে। সচেতনতা সৃষ্টি না করে শুধু দমন-পীড়ন দিয়ে সাময়িক সাফল্য অর্জন করা গেলেও দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।

এ কথা অনস্বীকার্য, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলেন তখন এর ফলে কিছুটা হলেও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি হয়। তবে একে অব্যাহত গতি দিতে হলে প্রয়োজন হবে সামাজিক শিক্ষার। এটি হবে একটি আন্দোলন, যে আন্দোলনে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এবং সব সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে জড়িত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির কিছু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। খাবার স্যালাইন নিয়ে ব্যাপক প্রচারণার ফলে এখন বাংলাদেশ অনেকটাই পেটের পীড়া থেকে মুক্ত থাকতে পারছে। শিশুদের টিকাদানের কর্মসূচিও একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়ে শিশুদের মারাত্মক রোগবালাই থেকে মুক্ত রাখতে পারছে। এসব যদি সম্ভব হয় তাহলে নিরন্তর সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে কেন মাদকের অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না?

এ জন্য গণমাধ্যম, স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক নেতা, সিভিল সোসাইটি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক নেতাদের একযোগে কাজ করতে হবে। এরকম একটি পরিবেশ সৃষ্টির জন্য উদ্যোগটি আসতে হবে সরকারের কাছ থেকে। নিজের সন্তানের মাদকাসক্তি নিয়ে যেসব পরিবার লাজলজ্জায় ভোগে তাদেরও লজ্জার বৃত্ত অতিক্রম করে বিপথে যাওয়া সন্তানটি যাতে শুদ্ধ হতে পারে তার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সমর্থন কামনা করতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

চীনা জাতি যদি আফিমের নেশা থেকে মুক্ত হয়ে একটি আত্মপ্রত্যয়ী দেশ গড়তে পারে তাহলে আমরা কেন পারব না? তবে প্রশ্ন উঠতে পারে এর জন্য প্রয়োজন একটি সামাজিক বিপ্লব। যদি যুগের দাবি সেটাই হয়, তাহলে সেই পথে এগোতে কেন আমাদের জড়তা থাকবে? যে জাতি মুক্তিযুদ্ধ করেছে, সে জাতি কেন মাদকের অভিশাপে দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে? এটাও এক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক জিজ্ঞাসা।

ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ