জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

১১ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষায় ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ বলে একটি কথা আছে। অকল্পনীয়ভাবে কোনো বিপদ এলে এই বাগধারাটি ব্যবহৃত হয়। জনগণ বুঝতে পারল না, জানতে পারল না, এমনই এক অবস্থায় বাড়ানো হয়েছে স্ট্র্যাটেজিক পণ্য জ্বালানি তেলের দাম। জ্বালানি তেলের মধ্যে কিছু প্রকারভেদ আছে। গত শুক্রবার, ৫ আগস্ট ২০২২ রাত ১২টা পর্যন্ত লিটার প্রতি ডিজেলের দাম ছিল ৮০ টাকা।

শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে ১১৪ টাকা হয়েছে। দাম বৃদ্ধির হার ৪২.৫ শতাংশ, প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১৪ টাকা। দাম বৃদ্ধির হার ৪২.৫ শতাংশ। অকটেনের দাম ছিল লিটার প্রতি ৮৯ টাকা, এই দাম বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির হার ৫১.৬৮ শতাংশ।

পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৮৬ টাকা, এই দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩০ টাকা। দাম বৃদ্ধির হার ৫১.১৬ শতাংশ। গড়ে ৪৭ শতাংশেরও বেশি দাম বাড়ানো হয়েছে। জনগণ এমনিতেই খাদ্যসামগ্রী এবং ওষুধের দাম বৃদ্ধিতে প্রায় মরণাপন্ন হয়ে পড়েছিল। এখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধিতে ভোক্তাদের সামান্য সচ্ছলতাও যদি অবশিষ্ট ছিল, সেটাও ছিনতাই হয়ে গেছে।

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা মহামারি জীবনকে প্রায় স্তব্ধ করে ফেলেছিল। অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এদের মধ্যে দেশের জ্ঞানী-গুণী লোকদের সংখ্যাও খুব কম নয়। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় নিশ্চল হয়ে পড়েছিল। কলকারখানায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। অনেকে চাকরি-বাকরি হারিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্যরেখা অতিক্রমকারীদের একটি বড় অংশ আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ জীবন সংকটে পড়ে যায়। এমনই এক কঠিন সময়ে দুঃস্বপ্নের মতো এসেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।

জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য যার ব্যবহার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহণ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সর্বব্যাপক। বলা হচ্ছে ভর্তুকি কমাতে এবং পেট্রোবাংলার লোকসান কমাতে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণের জন্য এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রগুলো বলছে আইএমএফ এমন ধরনের কোনো শর্ত দেয়নি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার ভালো খোকাটি সাজতে চেয়েছে। এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা আইএমএফকে বলতে পারবে, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোরতম সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা পিছপা হয়নি।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমছে। বছর শেষে এই দাম আরও কমবে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এমনই এক সময়ে জ্বালানি তেলের দামে বৃহৎ উল্লম্ফন ঘটানো হলো। সংবাদপত্র সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক চাপে পড়ে জ্বালানি খাতে আর ভর্তুকি দিতে রাজি নয় সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রয় করার ফলে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়, তার পুরোটাই সমন্বয় করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ভোক্তার ওপর।

এক নাগারে ছয় মাস ধরে লোকসান করছে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর মধ্যে সংস্থাটি নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করেছে তেল আমদানির জন্য। চাপে পড়ে অর্থ বিভাগে সহায়তা চেয়েও তা পায়নি সংস্থাটি। শুল্ক ও কর কমাতে রাজি হয়নি রাজস্ব বিভাগ (এনবিআর)। তাই বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে।

দাম বাড়ানোর সরকারি ব্যাখ্যা বলছে, প্রতি মাসে বিপিসির গড় আয় ৫ হাজার কোটি টাকা। জুলাইয়ে খরচ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। জ্বালানি তেল আমদানিতে ২ মাসের সমপরিমাণ টাকা চলতি মূলধনে রাখতে হয়। এতে করে প্রয়োজন হয় ২ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু বিপিসির হিসাবে জমা আছে ২২ হাজার কোটি টাকা। যার ফলে আগস্টের পর জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব হবে না।

জাতীয় বাজেটেও বিপিসির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। বিপিসি সূত্র বলছে, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে টানা ৭ বছরে বিপিসি মুনাফা করেছে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত বছর বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে থাকলে নভেম্বরে ডিজেলের দাম এক দফা বাড়ায় সরকার। এতে জানুয়ারি পর্যন্ত মুনাফায় ছিল বিপিসি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে লোকসান শুরু হয়।

আগের মুনাফা দিয়ে একাধিক প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বিপিসি। এছাড়া প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটি জ্বালানি তেল শোধনাগার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসির তহবিল থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ হিসাবে ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার (সূত্র : প্রথম আলো)।

আমরা জানতাম বিপিসি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। যখন দেখা যায় সংস্থাটি নিয়মিত জ্বালানি তেল আমদানিতে সমস্যায় পড়েছে, তখন প্রশ্ন উঠল বিপিসির বিশাল পরিমাণ অর্থ কোথায় গেল? সরকার অর্থকষ্টে পড়লে ধার করে সংকট সময় অতিক্রম করতে চায়। সরকারের অর্থ বিভাগ খোঁজ নিয়ে জানতে চায় কোন সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় উদ্বৃত্ত আছে। এই হিসাব দেখে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় কোন সংস্থার কাছ থেকে কত টাকা ঋণ করবে। বেশ ক’মাস আগে দৈনিক পত্রিকায় একটি খবর আমার নজর কাড়ে।

সরকার খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছে বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা আছে। এই সংস্থাগুলোর একটি হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সুযোগ্য নেতৃত্ব পেলে এবং সরকারের সহযোগিতা পেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশীয় শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর জন্য যে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে তা এই বিশ্ববিদ্যালয়টির অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত আছে। কিন্তু সরকার পাঁয়তারা করছিল উদ্বৃত্ত অর্থ কেটে নেওয়ার জন্য।

বিভিন্ন সূত্রে খবর দেখে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, বিপিসির উদ্বৃত্ত অর্থ বা মুনাফালব্ধ অর্থ সরকার অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন করে নিয়ে গেল কিনা, কী পরিমাণ অর্থ এভাবে বিপিসির হাত ছাড়া হয়েছে তার তথ্য আমার জানা নেই। তবে প্রথম আলো থেকে জানা গেল ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসির তহবিল থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ হিসাবে ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। সরকারের রাজস্ব বিভাগ রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। যদি এই লক্ষ্যমাত্রা সৃজনশীলভাবে অর্জন করা সম্ভব হতো, তাহলে সরকারকে হয়তো অনেক কম মাত্রায় ঋণ করতে হতো। এরকম ভালো কর্মকাণ্ড সরকারের তরফ থেকে দেখা যাচ্ছে না।

বিপিসির প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল এই প্রশ্ন এখন অনেকের। সহজ জবাব দেওয়া হচ্ছে, ভর্তুকিতে ক্রমাগত লোকসান গুণে বিপিসি প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতি ঠেকানোর জন্য জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ৫০ ভাগের বেশি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু খোদ সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, বিগত ৮ বছর ধরে বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রয় করে লোকসান নয়, বরং মুনাফা করেছে। এই মুনাফার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

২০১৩ সালে প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য ছিল ৯৪ ডলার। এই দাম কমতে কমতে ২০১৬ সালে ৪০ ডলারের নিচে নেমে আসে। কিন্তু সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়নি বলে উদ্বৃত্ত অর্থের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ২০১৬ সালের এপ্রিলে কেরোসিন ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা কমানো হয়েছিল। তবুও কম দামে তেল কিনে তা দেশের বাজারে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রির কারণে বিপিসি প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

এ কারণে ৮ বছরে বাজেট থেকে বিপিসিকে তেল কেনা বাবদ কোনো ধরনের ভর্তুকি সরকার প্রদান করেনি। চলতি অর্থবছরের বাজটেও তেল কেনা বাবদ বিপিসির নামে ভর্তুকির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত শুক্রবার বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে বিপিসি।

খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ২২ মে পর্যন্ত বিপিসি মুনাফায় ছিল। অর্থাৎ গেল ২০২১-২২ অর্থবছরের মে ২২ পর্যন্ত বিপিসি মুনাফা করেছে ১ হাজার ২৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এসব দেখে ও শুনে আমরা ধাঁধায় পড়ে যাই। সরকারি পরিসংখ্যান কতটুকু সত্য বলছে তা নিয়েও পরিসংখ্যান ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনাস্থা বিদ্যমান। অথচ কে না জানে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে সঠিক পরিকল্পনাও করা সম্ভব হয় না।

সব মিলে গত ৮ বছরে বিপিসির ৫০ হাজার কোটি টাকার মুনাফার অর্থ কোথায় গেল তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন আছে। মুনাফার একটি অংশ যা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা, তা এক আইনি ক্ষমতা বলে অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে গেছে এবং মুনাফার আরও একটি অংশ বিপিসির কিছু ‘বিলাসী’ উন্নয়ন প্রকল্পে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও মুনাফার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিপিসির হাতে থাকার কথা।

সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই টাকা কোথায় গেল তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। দৈনিক বণিক বার্তার ৮ আগস্ট ২০২২ সংখ্যা থেকে জানা যায়, দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যাংক গ্রাহক প্রতিষ্ঠান হলো বিপিসি। সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ১৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি আমানত হিসাবে জমা রেখেছে বিপিসি।

আর দেশের বেসরকারি ২১টি ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি আমানত হিসাবে জমা রাখা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। এর বাইরেও জ্বালানি তেল বিক্রি বাবদ ১৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা নগদ ছিল বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে। সব মিলিয়ে গত বছরের ৩০ জুন বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ২০২০-২১ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সুতরাং বিপিসি দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা যুক্তিযুক্ত নয়।

এই মুহূর্তে বিশ্বের অনেক দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্তত ৫০ শতাংশ বিশ্বায়িত। এরকম একটি দেশে বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, তা এক রকম অনিবার্য মনে করা যায়। মূল্যস্ফীতি দু’রকমের বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন। অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির কারণ হয়। এই ধরনের মূল্যস্ফীতিকে বলা হয় ডিমান্ড পুল ইনফ্লেশন।

অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে দেখা দেয় কস্টপুশ ইনফ্লেশন। জ্বালানি তেলের দাম ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে সমগ্র অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি আরও বেগবান হবে। আইএমএফের দৃষ্টিতে বিশ্বের দেশে দেশে দামের স্তর ঊর্ধ্বমুখী থাকায় মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এই মূল্যস্ফীতি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক একটি হুমকি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি এখন গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এই মূল্যস্ফীতি থেকে রক্ষার জন্য অনেক বিশেষজ্ঞ অর্থনৈতিক মন্দাকে আলিঙ্গন করার পরামর্শ দিয়েছেন। পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে সবচেয়ে ধনী দেশগুলো স্ট্যাগফ্লেশন-এর কবলে পড়েছে। এর অর্থ হলো যুগপৎ মন্দা ও মূল্যস্ফীতির দ্বারা আক্রান্ত হওয়া। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এরকম সময়ে সামান্য পরিমাণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান হয় না। একে বলে জবলেস গ্রোথ।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, বিশ্বের অনেক দেশ এই পথে হাঁটছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই ধরনের টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশও আক্রান্ত। জ্বালানি, খাদ্যশস্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। কমেছে প্রবাসী আয়। খোলাবাজারে ডলারের দামের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত দামের পার্থক্য থাকার ফলে প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো লাভজনক মনে করছে।

ফলে আইনি চ্যানেলে প্রবাসী আয় কম আসছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি আয়ে ঘাটতি ১ হাজার ৮৬৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এই ঘাটতি গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈদেশিক মুদ্রায় আয় কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে ডলারের সংকট। কমছে টাকার মূল্যমান। এতে চাপ বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর। সব মিলিয়ে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। এরকম এক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করার ফলে মূল্যস্ফীতির চাকায় গ্রিজ যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বেগবান হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কখনো বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় থাকে, আবার কখনো হ্রাসমান প্রক্রিয়ায়। এ কারণে অনেকে মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত। এই সমন্বয় হতে পারে দাম বাড়ার সময়ের গড় মূল্যে একটি রেট নির্ধারণ করা এবং একইভাবে দাম কমতে থাকার সময়ে গড় মূল্যের হারে আরেকটি রেট নির্ধারণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়ে দাম হ্রাসের সময় দাম না কমানো কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা জ্বালানি তেলের দামে সমন্বয় দেখে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
১১ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা ভাষায় ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ বলে একটি কথা আছে। অকল্পনীয়ভাবে কোনো বিপদ এলে এই বাগধারাটি ব্যবহৃত হয়। জনগণ বুঝতে পারল না, জানতে পারল না, এমনই এক অবস্থায় বাড়ানো হয়েছে স্ট্র্যাটেজিক পণ্য জ্বালানি তেলের দাম। জ্বালানি তেলের মধ্যে কিছু প্রকারভেদ আছে। গত শুক্রবার, ৫ আগস্ট ২০২২ রাত ১২টা পর্যন্ত লিটার প্রতি ডিজেলের দাম ছিল ৮০ টাকা।

শুক্রবার রাত ১২টার পর থেকে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে ১১৪ টাকা হয়েছে। দাম বৃদ্ধির হার ৪২.৫ শতাংশ, প্রতি লিটার কেরোসিনের দাম ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১১৪ টাকা। দাম বৃদ্ধির হার ৪২.৫ শতাংশ। অকটেনের দাম ছিল লিটার প্রতি ৮৯ টাকা, এই দাম বৃদ্ধি করে নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩৫ টাকা। মূল্যবৃদ্ধির হার ৫১.৬৮ শতাংশ।

পেট্রোলের দাম ছিল প্রতি লিটার ৮৬ টাকা, এই দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩০ টাকা। দাম বৃদ্ধির হার ৫১.১৬ শতাংশ। গড়ে ৪৭ শতাংশেরও বেশি দাম বাড়ানো হয়েছে। জনগণ এমনিতেই খাদ্যসামগ্রী এবং ওষুধের দাম বৃদ্ধিতে প্রায় মরণাপন্ন হয়ে পড়েছিল। এখন জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধিতে ভোক্তাদের সামান্য সচ্ছলতাও যদি অবশিষ্ট ছিল, সেটাও ছিনতাই হয়ে গেছে।

বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা মহামারি জীবনকে প্রায় স্তব্ধ করে ফেলেছিল। অনেক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। এদের মধ্যে দেশের জ্ঞানী-গুণী লোকদের সংখ্যাও খুব কম নয়। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় নিশ্চল হয়ে পড়েছিল। কলকারখানায় উৎপাদন কমে গিয়েছিল। অনেকে চাকরি-বাকরি হারিয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে পড়ে। দারিদ্র্যরেখা অতিক্রমকারীদের একটি বড় অংশ আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের দাম বাড়তে শুরু করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশ জীবন সংকটে পড়ে যায়। এমনই এক কঠিন সময়ে দুঃস্বপ্নের মতো এসেছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি।

জ্বালানি তেল এমন একটি পণ্য যার ব্যবহার কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহণ, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ সর্বব্যাপক। বলা হচ্ছে ভর্তুকি কমাতে এবং পেট্রোবাংলার লোকসান কমাতে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন আইএমএফের ঋণের শর্ত পূরণের জন্য এই ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। কিন্তু সংবাদপত্রগুলো বলছে আইএমএফ এমন ধরনের কোনো শর্ত দেয়নি। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকার ভালো খোকাটি সাজতে চেয়েছে। এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে তারা আইএমএফকে বলতে পারবে, আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোরতম সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা পিছপা হয়নি।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমছে। বছর শেষে এই দাম আরও কমবে বলে পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এমনই এক সময়ে জ্বালানি তেলের দামে বৃহৎ উল্লম্ফন ঘটানো হলো। সংবাদপত্র সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক চাপে পড়ে জ্বালানি খাতে আর ভর্তুকি দিতে রাজি নয় সরকার। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রয় করার ফলে যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়, তার পুরোটাই সমন্বয় করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ভোক্তার ওপর।

এক নাগারে ছয় মাস ধরে লোকসান করছে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনকারী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। এর মধ্যে সংস্থাটি নিজস্ব তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি বাড়তি খরচ করেছে তেল আমদানির জন্য। চাপে পড়ে অর্থ বিভাগে সহায়তা চেয়েও তা পায়নি সংস্থাটি। শুল্ক ও কর কমাতে রাজি হয়নি রাজস্ব বিভাগ (এনবিআর)। তাই বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হয়েছে।

দাম বাড়ানোর সরকারি ব্যাখ্যা বলছে, প্রতি মাসে বিপিসির গড় আয় ৫ হাজার কোটি টাকা। জুলাইয়ে খরচ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। জ্বালানি তেল আমদানিতে ২ মাসের সমপরিমাণ টাকা চলতি মূলধনে রাখতে হয়। এতে করে প্রয়োজন হয় ২ হাজার কোটি টাকার। কিন্তু বিপিসির হিসাবে জমা আছে ২২ হাজার কোটি টাকা। যার ফলে আগস্টের পর জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব হবে না।

জাতীয় বাজেটেও বিপিসির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। বিপিসি সূত্র বলছে, ২০১৪-১৫ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে টানা ৭ বছরে বিপিসি মুনাফা করেছে ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। গত বছর বিশ্ববাজারে দাম বাড়তে থাকলে নভেম্বরে ডিজেলের দাম এক দফা বাড়ায় সরকার। এতে জানুয়ারি পর্যন্ত মুনাফায় ছিল বিপিসি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর গত ফেব্রুয়ারি থেকে লোকসান শুরু হয়।

আগের মুনাফা দিয়ে একাধিক প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে বিপিসি। এছাড়া প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন একটি জ্বালানি তেল শোধনাগার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসির তহবিল থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ হিসাবে ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার (সূত্র : প্রথম আলো)।

আমরা জানতাম বিপিসি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান। যখন দেখা যায় সংস্থাটি নিয়মিত জ্বালানি তেল আমদানিতে সমস্যায় পড়েছে, তখন প্রশ্ন উঠল বিপিসির বিশাল পরিমাণ অর্থ কোথায় গেল? সরকার অর্থকষ্টে পড়লে ধার করে সংকট সময় অতিক্রম করতে চায়। সরকারের অর্থ বিভাগ খোঁজ নিয়ে জানতে চায় কোন সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় উদ্বৃত্ত আছে। এই হিসাব দেখে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় কোন সংস্থার কাছ থেকে কত টাকা ঋণ করবে। বেশ ক’মাস আগে দৈনিক পত্রিকায় একটি খবর আমার নজর কাড়ে।

সরকার খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছে বেশ কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা আছে। এই সংস্থাগুলোর একটি হচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। সুযোগ্য নেতৃত্ব পেলে এবং সরকারের সহযোগিতা পেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশীয় শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর জন্য যে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে তা এই বিশ্ববিদ্যালয়টির অ্যাকাউন্টে গচ্ছিত আছে। কিন্তু সরকার পাঁয়তারা করছিল উদ্বৃত্ত অর্থ কেটে নেওয়ার জন্য।

বিভিন্ন সূত্রে খবর দেখে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, বিপিসির উদ্বৃত্ত অর্থ বা মুনাফালব্ধ অর্থ সরকার অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন করে নিয়ে গেল কিনা, কী পরিমাণ অর্থ এভাবে বিপিসির হাত ছাড়া হয়েছে তার তথ্য আমার জানা নেই। তবে প্রথম আলো থেকে জানা গেল ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসির তহবিল থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ হিসাবে ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে সরকার। সরকারের রাজস্ব বিভাগ রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। যদি এই লক্ষ্যমাত্রা সৃজনশীলভাবে অর্জন করা সম্ভব হতো, তাহলে সরকারকে হয়তো অনেক কম মাত্রায় ঋণ করতে হতো। এরকম ভালো কর্মকাণ্ড সরকারের তরফ থেকে দেখা যাচ্ছে না।

বিপিসির প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা কোথায় গেল এই প্রশ্ন এখন অনেকের। সহজ জবাব দেওয়া হচ্ছে, ভর্তুকিতে ক্রমাগত লোকসান গুণে বিপিসি প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতি ঠেকানোর জন্য জ্বালানি তেলের দাম গড়ে ৫০ ভাগের বেশি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু খোদ সরকারি পরিসংখ্যানই বলছে, বিগত ৮ বছর ধরে বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রয় করে লোকসান নয়, বরং মুনাফা করেছে। এই মুনাফার পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

২০১৩ সালে প্রতি ব্যারেল তেলের মূল্য ছিল ৯৪ ডলার। এই দাম কমতে কমতে ২০১৬ সালে ৪০ ডলারের নিচে নেমে আসে। কিন্তু সে সময় আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়নি বলে উদ্বৃত্ত অর্থের সৃষ্টি হয়েছে। তবে ২০১৬ সালের এপ্রিলে কেরোসিন ও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ৩ টাকা কমানো হয়েছিল। তবুও কম দামে তেল কিনে তা দেশের বাজারে প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রির কারণে বিপিসি প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছে।

এ কারণে ৮ বছরে বাজেট থেকে বিপিসিকে তেল কেনা বাবদ কোনো ধরনের ভর্তুকি সরকার প্রদান করেনি। চলতি অর্থবছরের বাজটেও তেল কেনা বাবদ বিপিসির নামে ভর্তুকির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়নি। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গত শুক্রবার বিভিন্ন গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে ৮ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে বিপিসি।

খোদ অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ২২ মে পর্যন্ত বিপিসি মুনাফায় ছিল। অর্থাৎ গেল ২০২১-২২ অর্থবছরের মে ২২ পর্যন্ত বিপিসি মুনাফা করেছে ১ হাজার ২৬৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এসব দেখে ও শুনে আমরা ধাঁধায় পড়ে যাই। সরকারি পরিসংখ্যান কতটুকু সত্য বলছে তা নিয়েও পরিসংখ্যান ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনাস্থা বিদ্যমান। অথচ কে না জানে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে সঠিক পরিকল্পনাও করা সম্ভব হয় না।

সব মিলে গত ৮ বছরে বিপিসির ৫০ হাজার কোটি টাকার মুনাফার অর্থ কোথায় গেল তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন আছে। মুনাফার একটি অংশ যা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা, তা এক আইনি ক্ষমতা বলে অর্থ মন্ত্রণালয় নিয়ে গেছে এবং মুনাফার আরও একটি অংশ বিপিসির কিছু ‘বিলাসী’ উন্নয়ন প্রকল্পে ঢেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও মুনাফার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা বিপিসির হাতে থাকার কথা।

সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই টাকা কোথায় গেল তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। দৈনিক বণিক বার্তার ৮ আগস্ট ২০২২ সংখ্যা থেকে জানা যায়, দেশের সবচেয়ে ধনী ব্যাংক গ্রাহক প্রতিষ্ঠান হলো বিপিসি। সর্বশেষ নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় ১৩ হাজার ৫৪৬ কোটি টাকা দীর্ঘমেয়াদি আমানত হিসাবে জমা রেখেছে বিপিসি।

আর দেশের বেসরকারি ২১টি ব্যাংকে স্বল্পমেয়াদি আমানত হিসাবে জমা রাখা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। এর বাইরেও জ্বালানি তেল বিক্রি বাবদ ১৫ হাজার ৮২২ কোটি টাকা নগদ ছিল বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে। সব মিলিয়ে গত বছরের ৩০ জুন বিপিসির বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে জমা থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির ২০২০-২১ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সুতরাং বিপিসি দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কা যুক্তিযুক্ত নয়।

এই মুহূর্তে বিশ্বের অনেক দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে বাঁচার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্তত ৫০ শতাংশ বিশ্বায়িত। এরকম একটি দেশে বিশ্ব অর্থনীতির প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে, তা এক রকম অনিবার্য মনে করা যায়। মূল্যস্ফীতি দু’রকমের বলে অর্থনীতিবিদরা বলছেন। অতিরিক্ত চাহিদা মূল্যস্ফীতির কারণ হয়। এই ধরনের মূল্যস্ফীতিকে বলা হয় ডিমান্ড পুল ইনফ্লেশন।

অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে দেখা দেয় কস্টপুশ ইনফ্লেশন। জ্বালানি তেলের দাম ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার ফলে সমগ্র অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে। বিদ্যমান মূল্যস্ফীতি আরও বেগবান হবে। আইএমএফের দৃষ্টিতে বিশ্বের দেশে দেশে দামের স্তর ঊর্ধ্বমুখী থাকায় মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। এই মূল্যস্ফীতি সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক একটি হুমকি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি এখন গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

এই মূল্যস্ফীতি থেকে রক্ষার জন্য অনেক বিশেষজ্ঞ অর্থনৈতিক মন্দাকে আলিঙ্গন করার পরামর্শ দিয়েছেন। পরিস্থিতি দেখলে মনে হয় বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে সবচেয়ে ধনী দেশগুলো স্ট্যাগফ্লেশন-এর কবলে পড়েছে। এর অর্থ হলো যুগপৎ মন্দা ও মূল্যস্ফীতির দ্বারা আক্রান্ত হওয়া। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এরকম সময়ে সামান্য পরিমাণে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হলেও কর্মসংস্থান হয় না। একে বলে জবলেস গ্রোথ।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, বিশ্বের অনেক দেশ এই পথে হাঁটছে। বিশ্ব অর্থনীতির এই ধরনের টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশও আক্রান্ত। জ্বালানি, খাদ্যশস্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে গেছে। কমেছে প্রবাসী আয়। খোলাবাজারে ডলারের দামের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক নির্ধারিত দামের পার্থক্য থাকার ফলে প্রবাসীরা হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো লাভজনক মনে করছে।

ফলে আইনি চ্যানেলে প্রবাসী আয় কম আসছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি আয়ে ঘাটতি ১ হাজার ৮৬৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এই ঘাটতি গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বৈদেশিক মুদ্রায় আয় কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে ডলারের সংকট। কমছে টাকার মূল্যমান। এতে চাপ বেড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর। সব মিলিয়ে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। এরকম এক পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করার ফলে মূল্যস্ফীতির চাকায় গ্রিজ যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতি আরও বেগবান হচ্ছে।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কখনো বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় থাকে, আবার কখনো হ্রাসমান প্রক্রিয়ায়। এ কারণে অনেকে মনে করেন, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত। এই সমন্বয় হতে পারে দাম বাড়ার সময়ের গড় মূল্যে একটি রেট নির্ধারণ করা এবং একইভাবে দাম কমতে থাকার সময়ে গড় মূল্যের হারে আরেকটি রেট নির্ধারণ করা। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়ে দাম হ্রাসের সময় দাম না কমানো কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা জ্বালানি তেলের দামে সমন্বয় দেখে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন