চ্যালেঞ্জের মুখে আমন ফসল
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
চ্যালেঞ্জের মুখে আমন ফসল

  আবদুল লতিফ মণ্ডল  

১২ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ খরা, বিদ্যুৎ সংকট, সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চলতি মৌসুমের আমন ফসল। দেশে চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আমন ফসলের উৎপাদন চলতি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পণ্যটির নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি হারের গতি আরও বেড়ে যাবে। এতে দেশে মোট চালের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ফারাক আরও বাড়বে।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চালের বৈশ্বিক উৎপাদন ও মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। তখন অতি উচ্চমূল্যে দুষ্প্রাপ্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে পণ্যটি আমদানি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে আমনের আবাদ চালু রয়েছে। আগের মতো বর্তমানেও দুই ধরনের আমন ধান-রোপা আমন ও বোনা আমন-চাষ করা হয়।

আগে দুই ধরনের আমনের জাতের মোট সংখ্যা ছিল ১৯২। এগুলোর মধ্যে মালসিরা, কাচুডুমা, সাথীরা, মাগুরা, বেতো, চাঁপাকলি, সিনগারিয়া ইত্যাদির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান উদ্ভাবিত হওয়ায় স্থানীয় জাতের আমন ধানের আবাদ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। স্থানীয় জাতের ধানের ফলন কম হওয়াই এর মূল কারণ।

সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে চাল উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে ছিল আমন। ওই বছর আমন ও বোরোর উৎপাদন দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮৮ লাখ ৫০ হাজার এবং ৮১ লাখ ৩৭ হাজার টন। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে আমন ও বোরোর উৎপাদন দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৭ লাখ ৩৬ হাজার এবং ১ কোটি ৫ লাখ ৫২ হাজার টন (সূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৫)।

এরপর থেকে দেশে চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থান দখল করে আছে বোরো। বর্তমানে দেশে মোট চাল উৎপাদনে বোরো ও আমনের অংশ কমবেশি যথাক্রমে ৫৫ ও ৩৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১ অনুযায়ী ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ অর্থবছরগুলোয় যখন বোরো চালের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার, ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৬ হাজার, ২ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার এবং ২ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার টন, তখন আমনের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার, ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার, ১ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার এবং ১ কোটি ৫৫ লাখ ২ হাজার টন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশে চাষাবাদযোগ্য প্রায় ৮৪ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে ৫৯ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়। আমন ফসলের আবাদ অনেকটা প্রকৃতিনির্ভর। আমন আবাদ খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বা সাইক্লোনে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।

আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পরপর দুটি প্রলয়ংকরী বন্যা ও সাইক্লোন সিডর কীভাবে আমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছিল। ১ কোটি ৩০ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওই মৌসুমে উৎপাদিত আমনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৯৬ লাখ টনে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও উপর্যুপরি বন্যার কারণে আমন উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি ভাষ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের আগস্ট মাসের বন্যায় সারা দেশের ৩৭টি জেলায় আমন ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে এ বন্যায় ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়।

খরার কারণে চলতি অর্থবছরে আমন আবাদের শুরুটা ভালো হয়নি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত ৪১ বছরের মধ্যে এ বছরের জুলাই মাসে (১৭ আষাঢ়-১৬ শ্রাবণ) দেশে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এ বছর জুলাইয়ে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২১১ মিলিমিটার (মিমি), যা ১৯৮১ সালের পর সর্বনিম্ন। এদিকে জুলাই মাস শেষ হয়ে আগস্ট মাসের প্রথম দশক বা শ্রাবণ মাস শেষ হতে চললেও এখনো তীব্র খরা সারা দেশে। পানির অভাবে অনেক বীজতলাও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণ মাস আমনের চারা রোপণের ভরা মৌসুম হলেও বৃষ্টির অভাবে চাষিরা খুব কম পরিমাণ জমিতে আমনের চারা রোপণ করতে পেরেছেন। এ অবস্থার মাঝেই দেশে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে।

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রগুলো তেমন পানি সরবরাহ করতে পারছে না। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক অফিসের বরাত দিয়ে একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ১০ শতাংশের মতো জমিতে রোপা আমন রোপণ হয়েছে। শস্যভাণ্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

এরপর সার ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে। ৭ জুলাই যুগান্তরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সারের দাম বৃদ্ধির ৪ দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে এক লাফেই ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। আর সারের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩৮ শতাংশ। কৃষি উৎপাদনের সবচেয়ে মৌলিক দুটি পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে এ খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এবার বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত অনেক কম। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে সেচ বেশি লাগছে। কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়ানোয় খরচ অনেক বেড়ে যাবে। বাড়বে পরিবহণ ভাড়া। আর এমন এক সময়ে সরকার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিল যখন আমন মৌসুমের ফসল বোনা শুরু হয়েছে। ফলে এ মৌসুমে প্রতিটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। অনেক কৃষক জমির আবাদ কমিয়ে দেবেন, সামগ্রিকভাবে যা দেশের মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের হার বাড়িয়ে দেবে।

কৃষি খাতে (শস্য উপখাত, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে গঠিত) প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস চাল উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হারকে প্রভাবিত করেছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, কৃষিতে এক সময়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধিহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে তলানিতে ঠেকেছে। সরকারি তথ্য মোতাবেক, ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিহার ২০২০-২১ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা বিবিএসের সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী হ্রাস পেয়ে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২১-২২) ২ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়াবে।

এটি সম্ভবত গত কয়েক বছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হারের সর্বনিম্ন রেকর্ড। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাসের ধারাবাহিকতায় শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চালের প্রবৃদ্ধিহার হ্রাস পেয়েছে। সম্প্রতি একটি দৈনিকের (বণিক বার্তা, ২৫ জুলাই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কম হারে বাড়ছে খাদ্যশস্য (চাল, গম) উৎপাদন। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে যখন জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, তখন খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বাংলাদেশে চালের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আভাস দিয়েছে। ইউএসডিএ বলেছে, সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯৭ লাখ টনে (দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ জুলাই)। ইউএসডিএ’র এ পূর্বাভাস সঠিক হলে বোরো চালের উৎপাদন সরকারের ২ কোটি ৯ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ লাখ টন কম হবে। ইউএসডিএ’র মতে, জুনে বন্যার কারণে আউশের উৎপাদনও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ খরার কারণে চলতি আমন ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ প্রধান খাদ্য চাল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে।

এ অবস্থায় করণীয় পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে। ১. ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোয় (কেজিপ্রতি ৬ টাকা) বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এতে আমন ফসলসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চলতি অর্থবছরে সারের ক্ষেত্রে ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০২২-২৩)। এ ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধি রহিত করতে হবে। ২. আমন চাষে পানি সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আবাসিক বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে দিতে হবে।

৩. আমন চাষে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বৃদ্ধি রহিত করতে হবে। এ সুবিধা শুধু আমন চাষিরা যেন ভোগ করতে পারেন সে ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদানের হার বাড়িয়ে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ করতে হবে। মোট কথা, দীর্ঘ খরার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলতি আমন আবাদকে সফল করতে হবে। এ জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

চ্যালেঞ্জের মুখে আমন ফসল

 আবদুল লতিফ মণ্ডল 
১২ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘ খরা, বিদ্যুৎ সংকট, সার ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চলতি মৌসুমের আমন ফসল। দেশে চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা আমন ফসলের উৎপাদন চলতি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্ত হলে পণ্যটির নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি হারের গতি আরও বেড়ে যাবে। এতে দেশে মোট চালের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ফারাক আরও বাড়বে।

এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে চালের বৈশ্বিক উৎপাদন ও মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন কমে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম হু হু করে বেড়ে যাবে। তখন অতি উচ্চমূল্যে দুষ্প্রাপ্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে পণ্যটি আমদানি করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।

প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে আমনের আবাদ চালু রয়েছে। আগের মতো বর্তমানেও দুই ধরনের আমন ধান-রোপা আমন ও বোনা আমন-চাষ করা হয়।

আগে দুই ধরনের আমনের জাতের মোট সংখ্যা ছিল ১৯২। এগুলোর মধ্যে মালসিরা, কাচুডুমা, সাথীরা, মাগুরা, বেতো, চাঁপাকলি, সিনগারিয়া ইত্যাদির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) কর্তৃক উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান উদ্ভাবিত হওয়ায় স্থানীয় জাতের আমন ধানের আবাদ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। স্থানীয় জাতের ধানের ফলন কম হওয়াই এর মূল কারণ।

সরকারি তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছর পর্যন্ত দেশে চাল উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থানে ছিল আমন। ওই বছর আমন ও বোরোর উৎপাদন দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮৮ লাখ ৫০ হাজার এবং ৮১ লাখ ৩৭ হাজার টন। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে আমন ও বোরোর উৎপাদন দাঁড়ায় যথাক্রমে ৭৭ লাখ ৩৬ হাজার এবং ১ কোটি ৫ লাখ ৫২ হাজার টন (সূত্র : বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০০৫)।

এরপর থেকে দেশে চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থান দখল করে আছে বোরো। বর্তমানে দেশে মোট চাল উৎপাদনে বোরো ও আমনের অংশ কমবেশি যথাক্রমে ৫৫ ও ৩৯ শতাংশ।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২১ অনুযায়ী ২০১৬-১৭, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০ অর্থবছরগুলোয় যখন বোরো চালের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৮০ লাখ ১৬ হাজার, ১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৬ হাজার, ২ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার এবং ২ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার টন, তখন আমনের উৎপাদন ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার, ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯৪ হাজার, ১ কোটি ৪০ লাখ ৫৫ হাজার এবং ১ কোটি ৫৫ লাখ ২ হাজার টন।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, দেশে চাষাবাদযোগ্য প্রায় ৮৪ লাখ হেক্টর জমির মধ্যে ৫৯ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়। আমন ফসলের আবাদ অনেকটা প্রকৃতিনির্ভর। আমন আবাদ খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস বা সাইক্লোনে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।

আমরা দেখেছি ২০০৭-০৮ অর্থবছরে পরপর দুটি প্রলয়ংকরী বন্যা ও সাইক্লোন সিডর কীভাবে আমন ফসলের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করেছিল। ১ কোটি ৩০ লাখ টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ওই মৌসুমে উৎপাদিত আমনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৯৬ লাখ টনে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও উপর্যুপরি বন্যার কারণে আমন উৎপাদন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি ভাষ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের আগস্ট মাসের বন্যায় সারা দেশের ৩৭টি জেলায় আমন ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাবে এ বন্যায় ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়।

খরার কারণে চলতি অর্থবছরে আমন আবাদের শুরুটা ভালো হয়নি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত ৪১ বছরের মধ্যে এ বছরের জুলাই মাসে (১৭ আষাঢ়-১৬ শ্রাবণ) দেশে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।

এ বছর জুলাইয়ে গড় বৃষ্টিপাত ছিল ২১১ মিলিমিটার (মিমি), যা ১৯৮১ সালের পর সর্বনিম্ন। এদিকে জুলাই মাস শেষ হয়ে আগস্ট মাসের প্রথম দশক বা শ্রাবণ মাস শেষ হতে চললেও এখনো তীব্র খরা সারা দেশে। পানির অভাবে অনেক বীজতলাও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। আষাঢ়ের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণ মাস আমনের চারা রোপণের ভরা মৌসুম হলেও বৃষ্টির অভাবে চাষিরা খুব কম পরিমাণ জমিতে আমনের চারা রোপণ করতে পেরেছেন। এ অবস্থার মাঝেই দেশে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে।

শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রগুলো তেমন পানি সরবরাহ করতে পারছে না। জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক অফিসের বরাত দিয়ে একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ১০ শতাংশের মতো জমিতে রোপা আমন রোপণ হয়েছে। শস্যভাণ্ডার খ্যাত উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য জেলায়ও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

এরপর সার ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে। ৭ জুলাই যুগান্তরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, সারের দাম বৃদ্ধির ৪ দিনের মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এক্ষেত্রে এক লাফেই ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ। আর সারের দাম বাড়ানো হয়েছে ৩৮ শতাংশ। কৃষি উৎপাদনের সবচেয়ে মৌলিক দুটি পণ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধিতে এ খাতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এবার বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত অনেক কম। এতে স্বাভাবিকের চেয়ে সেচ বেশি লাগছে। কিন্তু ডিজেলের দাম বাড়ানোয় খরচ অনেক বেড়ে যাবে। বাড়বে পরিবহণ ভাড়া। আর এমন এক সময়ে সরকার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিল যখন আমন মৌসুমের ফসল বোনা শুরু হয়েছে। ফলে এ মৌসুমে প্রতিটি কৃষিপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। অনেক কৃষক জমির আবাদ কমিয়ে দেবেন, সামগ্রিকভাবে যা দেশের মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের হার বাড়িয়ে দেবে।

কৃষি খাতে (শস্য উপখাত, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য উপখাত এবং বন উপখাত নিয়ে গঠিত) প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস চাল উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হারকে প্রভাবিত করেছে। সরকারি তথ্যে দেখা যায়, কৃষিতে এক সময়ের উচ্চ প্রবৃদ্ধিহার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে তলানিতে ঠেকেছে। সরকারি তথ্য মোতাবেক, ২০০৯-১০ অর্থবছরের ৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধিহার ২০২০-২১ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা বিবিএসের সাময়িক প্রাক্কলন অনুযায়ী হ্রাস পেয়ে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২১-২২) ২ দশমিক ২০ শতাংশে দাঁড়াবে।

এটি সম্ভবত গত কয়েক বছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হারের সর্বনিম্ন রেকর্ড। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধির হার হ্রাসের ধারাবাহিকতায় শস্য উপখাতের প্রধান ফসল চালের প্রবৃদ্ধিহার হ্রাস পেয়েছে। সম্প্রতি একটি দৈনিকের (বণিক বার্তা, ২৫ জুলাই) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে কম হারে বাড়ছে খাদ্যশস্য (চাল, গম) উৎপাদন। ওয়ার্ল্ডোমিটারের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত পাঁচ বছরে দেশে যখন জনসংখ্যা বেড়েছে ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, তখন খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) বাংলাদেশে চালের উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার আভাস দিয়েছে। ইউএসডিএ বলেছে, সদ্য সমাপ্ত বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন দাঁড়াবে ১ কোটি ৯৭ লাখ টনে (দ্য ডেইলি স্টার, ২৯ জুলাই)। ইউএসডিএ’র এ পূর্বাভাস সঠিক হলে বোরো চালের উৎপাদন সরকারের ২ কোটি ৯ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১২ লাখ টন কম হবে। ইউএসডিএ’র মতে, জুনে বন্যার কারণে আউশের উৎপাদনও সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হবে। দীর্ঘ খরার কারণে চলতি আমন ফসলও ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশ প্রধান খাদ্য চাল নিয়ে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে।

এ অবস্থায় করণীয় পদক্ষেপগুলো কী হতে পারে। ১. ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোয় (কেজিপ্রতি ৬ টাকা) বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। এতে আমন ফসলসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। চলতি অর্থবছরে সারের ক্ষেত্রে ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী (অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা ২০২২-২৩)। এ ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধি রহিত করতে হবে। ২. আমন চাষে পানি সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে আবাসিক বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে দিতে হবে।

৩. আমন চাষে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বৃদ্ধি রহিত করতে হবে। এ সুবিধা শুধু আমন চাষিরা যেন ভোগ করতে পারেন সে ব্যবস্থা নিতে হবে। ৪. কৃষিক্ষেত্রে বিদ্যুৎচালিত সেচযন্ত্রের ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ বিলের ওপর ২০ শতাংশ রিবেট প্রদানের হার বাড়িয়ে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ করতে হবে। মোট কথা, দীর্ঘ খরার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চলতি আমন আবাদকে সফল করতে হবে। এ জন্য সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাই নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন