আমদানি ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা ইতিবাচক
jugantor
আমদানি ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা ইতিবাচক

  এম এ খালেক  

১২ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্থানীয়ভাবে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আগামীতে মূল্যস্ফীতি যাতে অসহনীয় মাত্রায় উন্নীত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বিলাসজাত এবং তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

ইতোমধ্যেই আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকা বড় করা হয়েছে। আগে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ১২টি পণ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন সেই তালিকায় আরও ১৪টি পণ্য যোগ করা হয়েছে। ফলে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে। একইসঙ্গে ১২৩টি পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক ব্যাপক মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ এবং অন্য ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে আমদানি বাণিজ্যে কিছুটা হলেও গতি কমে এসেছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তা হলো দেশে আমদানির সংখ্যাগত পরিমাণ যে খুব একটা বেড়েছে তা নয়। পণ্য আমদানি আগের মতোই রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার ক্রাইসিস এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সব ধরনের পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আগের সমপরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশ থেকে হঠাৎ করেই পণ্য রপ্তানি বেড়ে গেছে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু তারপরও রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২১-২০২২) বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় করেছে পণ্য রপ্তানি করে। পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

তৈরি পোশাক ছাড়াও আরও চারটি পণ্য ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করেছে। নতুন যে চারটি পণ্য প্রথমবারের মতো শত কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় করেছে, সেগুলোর সবই প্রায় শতভাগ স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর। ফলে এসব পণ্য থেকে রপ্তানি আয়ের প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করেছে।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতের ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে ব্যয় যতটা বেড়েছে রপ্তানি আয় সেই তুলনায় কম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য বাংলাদেশের প্রতিকূলে অসহনীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে যদি বেশি পরিমাণে পণ্য রপ্তানি না করতে পারে তাহলেও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।

কারণ বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি এবং স্থানীয় ও বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এখন আমরা যদি আমদানি ব্যয় সীমিত করতে পারি, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য কিছুটা হলেও কমে আসবে।

আশার কথা, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নানা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে আমদানি বাণিজ্যে কিছুটা হলেও মন্থরতা নেমে এসেছে। গত জুলাই মাসে আগের মাসের তুলনায় আমদানি এলসি খোলার হার প্রায় ৩১ শতাংশ কমেছে। জুলাই মাসে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ৫৪৭ কোটি মার্কিন ডলারের। জুন মাসে এলসি খোলা হয়েছিল ৭৯৬ কোটি মার্কিন ডলারের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ২০২১-২০২২ অর্থবছরে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৮ হাজার ৯১৬ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছর এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। বছর শেষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিকূলে ভারসাম্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩২৫ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছর এ বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৩৭ কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো একক বছরে বাণিজ্য ঘাটতি এতটা বিশালাকার ধারণ করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ কমানোর উদ্দেশ্যে ২৭টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণদান বন্ধ করে দিয়েছে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার ৩১৬ কোটি ২০ লাখ টাকা।

২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৩৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নকামী দেশ। নানাভাবে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। স্থানীয়ভাবে ভোগ ব্যয় আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ এখন উন্নত এবং ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তাই বিদেশ থেকে উন্নত মানের পণ্য আমদানি করে থাকে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আমরা আমাদের উন্নয়ন সম্ভবনাকে ভঙ্গুর করে ফেলছি। তাই শুধু এ সংকটকালের জন্যই নয়, স্বাভাবিক সময়ের জন্য আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার বা ভোগ করা হয় তার মধ্যে ২৩ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।

অবশিষ্ট ৭৭ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা করা প্রয়োজন যাতে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ছাড়া একান্ত অপরিহার্য না হলে কোনো পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে না হয়। যেসব পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে, মানে কিছুটা কম হলেও সেই পণ্যের জোগান বাড়াতে হবে।

যে কোনো মূল্যেই হোক আমাদের আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে এক শ্রেণির অসৎ ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী ব্যাপকভাবে মুদ্রা পাচার করছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনট্রিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। পাচারকৃত এ অর্থের পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

তাদের প্রতিবেদনে উল্লিখিত পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত বিশাল। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত নয়। কারণ তাদের এ তথ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। তবে সেটা অনুমান করা গেলেও প্রমাণ করা যাবে না। কারণ যারা মুদ্রা পাচার করেন, তারা কখনোই তাদের অর্থের উৎস এবং পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ কারও কাছে প্রকাশ করেন না।

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর কত টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় প্রবেশ করে, তার সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই। তবে জাতিসংঘের একজন সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রতিবছর বিশ্বে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয় তা বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলার।

এ তথ্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কারণ দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত বেশি ও দৃষ্টিকটু।

বর্তমানে আমরা আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির যে প্রবণতা প্রত্যক্ষ করছি তার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে মুদ্রা পাচার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে অনেকেই মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি ব্যয় কমানোর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর ফলে জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে আমদানি ব্যয় ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হ্রাস পেয়েছে। এটা ভালো লক্ষণ। আমরা যদি আগামীতেও আমদানি ব্যয় কমিয়ে রাখতে পারি, তাহলে অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের তেমন একটা প্রভাবিত করতে পারবে না।

মূল্যস্ফীতি জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে কিছুটা কমেছে। জুন মাসে মূল্যস্ফীতির সার্বিক হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জুলাইতে তা ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামীতে বিশ্ব ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এ সংকটে খুব একটা প্রভাবিত হবে বলে মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সঠিক পথেই পরিচালিত হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পরপর দুই প্রান্তিকে সংকুচিত হলেই মন্দাবস্থা হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যেই মার্কিন অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে দুই প্রান্তিকে সংকুচিত হয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকেও মার্কিন অর্থনীতি সংকোচনের দিকেই রয়েছে। কিন্তু এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মন্দাবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। ১৮৫৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতি মোট ৩৪ বার মন্দাবস্থার শিকার হয়েছে।

অর্থাৎ প্রতি পাঁচ বছর পরপর মার্কিন অর্থনীতি মন্দার কবলে পতিত হয়েছে। কিন্তু আগামীতে যে মন্দা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা সাধারণ কোনো মন্দা নয়। অর্থনীতিবিদরা এ মন্দাকে স্ট্র্যাগফ্লেশন (ইনফ্লেশন+রিসেশন) বলে আখ্যায়িত করছেন।

এ মন্দা অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। কোনোভাবেই এ মন্দাবস্থা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি মুক্তি পাবে না। তবে যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম আমদানিনির্ভর এবং নিজস্ব শক্তির ওপর আস্থা রাখার পর্যায়ে রয়েছে, মন্দা তাদের কম ক্ষতি করবে। যেমন বাংলাদেশ তার মোট ভোগ্যপণ্যের ২৩ শতাংশ মাত্র আমদানির মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে। অবশিষ্ট ৭৭ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। কাজেই বাংলাদেশ চেষ্টা করলে এ মন্দা থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারে।

এম এ খালেক : অর্থনীতি বিশ্লেষক; অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার

আমদানি ব্যয় হ্রাসের সম্ভাবনা ইতিবাচক

 এম এ খালেক 
১২ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্থানীয়ভাবে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আগামীতে মূল্যস্ফীতি যাতে অসহনীয় মাত্রায় উন্নীত না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বিলাসজাত এবং তুলনামূলকভাবে অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি কমানোর জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে।

ইতোমধ্যেই আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকা বড় করা হয়েছে। আগে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের তালিকায় ১২টি পণ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখন সেই তালিকায় আরও ১৪টি পণ্য যোগ করা হয়েছে। ফলে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্যের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে। একইসঙ্গে ১২৩টি পণ্যের ওপর আমদানি শুল্ক ব্যাপক মাত্রায় বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি মার্জিন কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতভাগ এবং অন্য ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে আমদানি বাণিজ্যে কিছুটা হলেও গতি কমে এসেছে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, তা হলো দেশে আমদানির সংখ্যাগত পরিমাণ যে খুব একটা বেড়েছে তা নয়। পণ্য আমদানি আগের মতোই রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলার ক্রাইসিস এবং পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে সব ধরনের পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আগের সমপরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। দেশ থেকে হঠাৎ করেই পণ্য রপ্তানি বেড়ে গেছে বিষয়টি এমন নয়। কিন্তু তারপরও রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২১-২০২২) বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় করেছে পণ্য রপ্তানি করে। পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

তৈরি পোশাক ছাড়াও আরও চারটি পণ্য ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) মার্কিন ডলারের ল্যান্ডমার্ক অতিক্রম করেছে। নতুন যে চারটি পণ্য প্রথমবারের মতো শত কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় করেছে, সেগুলোর সবই প্রায় শতভাগ স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর। ফলে এসব পণ্য থেকে রপ্তানি আয়ের প্রায় পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করেছে।

সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতের ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে আমদানির ক্ষেত্রে ব্যয় যতটা বেড়েছে রপ্তানি আয় সেই তুলনায় কম বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য বাংলাদেশের প্রতিকূলে অসহনীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে যদি বেশি পরিমাণে পণ্য রপ্তানি না করতে পারে তাহলেও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে।

কারণ বিশ্ববাজারে মূল্যস্ফীতি এবং স্থানীয় ও বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নিশ্চিতভাবেই বৃদ্ধি পাবে। এখন আমরা যদি আমদানি ব্যয় সীমিত করতে পারি, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্য কিছুটা হলেও কমে আসবে।

আশার কথা, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে নানা ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে আমদানি বাণিজ্যে কিছুটা হলেও মন্থরতা নেমে এসেছে। গত জুলাই মাসে আগের মাসের তুলনায় আমদানি এলসি খোলার হার প্রায় ৩১ শতাংশ কমেছে। জুলাই মাসে আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ৫৪৭ কোটি মার্কিন ডলারের। জুন মাসে এলসি খোলা হয়েছিল ৭৯৬ কোটি মার্কিন ডলারের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ২০২১-২০২২ অর্থবছরে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ৮ হাজার ৯১৬ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছর এ ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৩৬ শতাংশ। বছর শেষে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিকূলে ভারসাম্যে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩২৫ কোটি মার্কিন ডলার। আগের বছর এ বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৩৩৭ কোটি মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো একক বছরে বাণিজ্য ঘাটতি এতটা বিশালাকার ধারণ করেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ কমানোর উদ্দেশ্যে ২৭টি পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ঋণদান বন্ধ করে দিয়েছে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার ৩১৬ কোটি ২০ লাখ টাকা।

২০১৯-২০২০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৪২ হাজার ৩৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৮৬৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নকামী দেশ। নানাভাবে বাংলাদেশ চেষ্টা করছে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। স্থানীয়ভাবে ভোগ ব্যয় আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ এখন উন্নত এবং ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তাই বিদেশ থেকে উন্নত মানের পণ্য আমদানি করে থাকে। কিন্তু এটা করতে গিয়ে আমরা আমাদের উন্নয়ন সম্ভবনাকে ভঙ্গুর করে ফেলছি। তাই শুধু এ সংকটকালের জন্যই নয়, স্বাভাবিক সময়ের জন্য আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার বা ভোগ করা হয় তার মধ্যে ২৩ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।

অবশিষ্ট ৭৭ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা হয়। আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা করা প্রয়োজন যাতে শিল্পে ব্যবহার্য কাঁচামাল এবং ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ছাড়া একান্ত অপরিহার্য না হলে কোনো পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে না হয়। যেসব পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে, মানে কিছুটা কম হলেও সেই পণ্যের জোগান বাড়াতে হবে।

যে কোনো মূল্যেই হোক আমাদের আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে এক শ্রেণির অসৎ ব্যক্তি ও ব্যবসায়ী ব্যাপকভাবে মুদ্রা পাচার করছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনট্রিগ্রিটি (জিএফআই) তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে প্রচুর পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে যায়। পাচারকৃত এ অর্থের পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

তাদের প্রতিবেদনে উল্লিখিত পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত বিশাল। কিন্তু এটাই চূড়ান্ত নয়। কারণ তাদের এ তথ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে। তবে সেটা অনুমান করা গেলেও প্রমাণ করা যাবে না। কারণ যারা মুদ্রা পাচার করেন, তারা কখনোই তাদের অর্থের উৎস এবং পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ কারও কাছে প্রকাশ করেন না।

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর কত টাকা মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতধারায় প্রবেশ করে, তার সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই। তবে জাতিসংঘের একজন সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন, প্রতিবছর বিশ্বে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়া হয় তা বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশ। টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৮৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ লাখ কোটি মার্কিন ডলার।

এ তথ্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। কারণ দুই পরিসংখ্যানের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত বেশি ও দৃষ্টিকটু।

বর্তমানে আমরা আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির যে প্রবণতা প্রত্যক্ষ করছি তার পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে মুদ্রা পাচার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বলে অনেকেই মনে করেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি ব্যয় কমানোর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এর ফলে জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে আমদানি ব্যয় ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হ্রাস পেয়েছে। এটা ভালো লক্ষণ। আমরা যদি আগামীতেও আমদানি ব্যয় কমিয়ে রাখতে পারি, তাহলে অর্থনৈতিক মন্দা আমাদের তেমন একটা প্রভাবিত করতে পারবে না।

মূল্যস্ফীতি জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে কিছুটা কমেছে। জুন মাসে মূল্যস্ফীতির সার্বিক হার ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। জুলাইতে তা ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামীতে বিশ্ব ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পতিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এ সংকটে খুব একটা প্রভাবিত হবে বলে মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সঠিক পথেই পরিচালিত হচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পরপর দুই প্রান্তিকে সংকুচিত হলেই মন্দাবস্থা হিসাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যেই মার্কিন অর্থনীতি ধারাবাহিকভাবে দুই প্রান্তিকে সংকুচিত হয়েছে। তৃতীয় প্রান্তিকেও মার্কিন অর্থনীতি সংকোচনের দিকেই রয়েছে। কিন্তু এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মন্দাবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। ১৮৫৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মার্কিন অর্থনীতি মোট ৩৪ বার মন্দাবস্থার শিকার হয়েছে।

অর্থাৎ প্রতি পাঁচ বছর পরপর মার্কিন অর্থনীতি মন্দার কবলে পতিত হয়েছে। কিন্তু আগামীতে যে মন্দা সৃষ্টি হতে যাচ্ছে তা সাধারণ কোনো মন্দা নয়। অর্থনীতিবিদরা এ মন্দাকে স্ট্র্যাগফ্লেশন (ইনফ্লেশন+রিসেশন) বলে আখ্যায়িত করছেন।

এ মন্দা অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। কোনোভাবেই এ মন্দাবস্থা থেকে বিশ্ব অর্থনীতি মুক্তি পাবে না। তবে যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে কম আমদানিনির্ভর এবং নিজস্ব শক্তির ওপর আস্থা রাখার পর্যায়ে রয়েছে, মন্দা তাদের কম ক্ষতি করবে। যেমন বাংলাদেশ তার মোট ভোগ্যপণ্যের ২৩ শতাংশ মাত্র আমদানির মাধ্যমে মিটিয়ে থাকে। অবশিষ্ট ৭৭ শতাংশ পণ্য স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়। কাজেই বাংলাদেশ চেষ্টা করলে এ মন্দা থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পেতে পারে।

এম এ খালেক : অর্থনীতি বিশ্লেষক; অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন