নাগরিকরা অর্থনীতির সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানতে পারছে না কেন?
jugantor
নাগরিকরা অর্থনীতির সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানতে পারছে না কেন?

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

১৪ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কথা ছিল আমরা দেশের নাগরিক হব, কথা ছিল আমরা হব সব ক্ষমতার উৎস, জানব দেশের সবকিছু। কিন্তু হয়েছি কি সেটা? এ রাষ্ট্রের ন্যূনতম খবরাখবরও কি পায় তারা? বিশেষ করে অর্থনীতি, যেটা মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে, সেটার খবর তো সবার জানার কথা। কিন্তু জানি কি আমরা?

৩ জুলাই সরকার নানা ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় কমানোর জন্য একটি পরিপত্র জারি করে। এতে ব্যয় কমানোর নানা পদক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্পগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ আর ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনার কথা বলা হয়।

এর কিছুদিন পরই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং করা শুরু হলো। এ সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সরকারের কাছে ছিল এক তিক্ত বড়ি গেলার মতো বিষয়। ২০০১ সালে যে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা দেশের বিদ্যুৎ খাতে কার্যত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার মাশুল জনগণ দিয়েছিল ভয়ংকরভাবে। আমাদের স্মৃতিতে নিশ্চয়ই এখনো তাজা আছে, খোদ ঢাকা শহরেই এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হতো।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে সরকার একের পর এক তরল জ্বালানিভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি আজ সংকটে পড়ার পেছনে এসব ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অকল্পনীয় পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জের বিরাট ‘অবদান’ আছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ঢাকাসহ অন্তত বড় শহরগুলোয় লোডশেডিং প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সরকারের উন্নয়নের তালিকায় সব সময় সবার উপরে ছিল। অর্থাৎ ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের ইগোর জন্য নিশ্চয়ই ভীষণ কঠিন।

সাধারণ মানুষ অতশত বোঝে না; কিন্তু তারা যখন দেখে সরকার একটার পর একটা পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি ব্যয় সংকোচের চেষ্টা করে, যখন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোপাগান্ডাটির ক্ষেত্রেও আত্মসমর্পণ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধে।

সাম্প্রতিক সময়ের সংকটের ক্ষেত্রে সরকার ইউক্রেন যুদ্ধের ওপরে সব দায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধই বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ নয়, এমনকি প্রধান কারণও নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, সরকারি কথাই সঠিক; তাহলেও প্রশ্ন হচ্ছে, পদক্ষেপ নিতে এত দেরি করল কেন সরকার? ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি। কিয়েভ আক্রমণের জন্য যাওয়া ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাশিয়ান সাঁজোয়া বহর যখন ফিরে গেল, তখনই বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হতে যাচ্ছে। তাহলে মার্চ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত চার মাসে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে জুলাইয়ে এসে কেন সরকার পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে?

মানুষ সরকারের সব পদক্ষেপ যখন দেখল, যখন দেখল টাকা ডলারের বিপরীতে তার মূল্য ধরে রাখতে পারছে না, অতি দ্রুত পতন হচ্ছে, তখন মানুষ বুঝতে পারল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব খারাপ। সর্বশেষ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যা ঘটল সেটা মানুষকে দেশের অর্থনীতি বুঝতে আরও খুব চমৎকারভাবে সাহায্য করেছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনোদিন জ্বালানিভেদে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি খাতে সরকারকে যে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেটা তারা বন্ধ করতে চায়। এ ভর্তুকির মধ্যেও আছে কিছু মারপ্যাঁচ। সরকার জ্বালানি আমদানি করে তার ওপরে নানা রকম কর সংগ্রহ (সর্বমোট ৩৪ শতাংশ) করার পর জ্বালানির যে মূল্য দাঁড়ায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যদি এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করে, তাহলে তার লোকসান হয়েছে বলে বলা হয়। তখনই আসে ভর্তুকির প্রশ্ন। অথচ যে করের কারণে জ্বালানির দাম অতটা বাড়ল সেই টাকাও তো গেছে সরকারের কাছেই। এই কম টাকায় বিক্রিকে লোকসান হিসাবে যদি আমরা ধরেও নিই, তাহলে আমরা দেখব গত কয়েক মাসে সাত থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান দিয়েছে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। কিন্তু এই তথ্য আমরা এখন জানি, তার আগের ৭ বছরে ৪৮ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল বিপিসি। তাহলে নিশ্চিতভাবেই মূল্য কমার কথা। এমন একটা পরিস্থিতিতে সরকার তেলের দাম কেন বাড়াল? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এতটা বাড়াল?

এই যে লিখলাম তেলের দাম আরও কমার কথা, কেউ প্রশ্ন করতে পারেন কীসের ভিত্তিতে বলছি সেটা? এই ভবিষ্যদ্বাণী আমার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানির মূল্য বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদদের। যে কারণে ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেলের দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে (৯০ ডলারের আশপাশে), ঠিক সে কারণেই তেলের দাম ভবিষ্যতেও কমতে থাকবে, এটা নিশ্চিত।

আমরা জানি, পশ্চিমা দেশগুলোয় বেশ কিছুদিন থেকে খুব উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। কোনো দেশেই এ মাত্রার মূল্যস্ফীতি গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। সেই মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরার জন্য সেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসাবে সেখানে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। এর জেরে পশ্চিমা বিশ্ব মন্দার মধ্যে ঢুকে গেছে। মন্দার মাত্রা কত এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছু মতদ্বৈততা আছে, কিন্তু মন্দার অস্তিত্বের ব্যাপারে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ আগামী বেশ কয়েক মাসের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমাগতভাবে কমতেই থাকবে। এমন প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করে জ্বালানির মূল্য এভাবে বাড়ানো প্রমাণ করে সরকারের পিঠ কতটা দেওয়ালে ঠেকে গেছে।

এটা এখন সচেতন মানুষমাত্রই জানেন, সরকার তার লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতি এড়ানোর আগাম প্রচেষ্টা হিসাবে আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ চাইছে। সাধারণ মানুষ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফকে একই রকম প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেন, যা ঠিক নয়। ব্রেটন উডস সিস্টেমের অধীনে এই প্রতিষ্ঠান দুটি তৈরি হলেও এদের কাজের ক্ষেত্র একেবারেই আলাদা। বিশ্বব্যাংক কোনো দেশের ভৌত অবকাঠামোসহ নানারকম অবকাঠামো প্রকল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদিতে অর্থায়ন করে ঋণ দেয়। কিন্তু আইএমএফ ঋণ দেয় যখন কোনো দেশ তার লেনদেনের ভারসাম্যের সংকটের কারণে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থাৎ কোনো দেশের আইএমএফ-এর ঋণ চাওয়ার মানে হচ্ছে সেখানে অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে আছে। এশিয়ায় বাংলাদেশ, শ্রীলংকা আর পাকিস্তান ছাড়া এ মুহূর্তে আর কেউ আইএমএফ-এর সঙ্গে ঋণের জন্য আলোচনা করছে না।

সরকার প্রথমদিকে লুকানোর চেষ্টা করলেও পরে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ আইএমএফ-এর তরফ থেকে তথ্য নিয়েই ব্লুমবার্গসহ বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া খবর প্রচার করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছে। সেই ঋণের সঙ্গে খুব সহজেই জনগণ মিলিয়ে ফেলতে পারছেন-কেন জ্বালানির মূল্য বাড়াতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিকভাবে কোনো দুর্দশাগ্রস্ত সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ঠিক করার জন্য আইএমএফ ভর্তুকি কামানোর সব শর্ত দেয়। তবে এ পর্যায়ে ঋণের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো শর্ত দিয়েছে, এখন পর্যন্ত এটা জানা যায় না। এটা ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই আসবে, সেই কারণেই সরকার বেশ খানিকটা আগেই এ দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সরকার জোর গলায় বলতে চাইছে আইএমএফ-এর ঋণ নেওয়ার সঙ্গে এ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই। মুখ রক্ষা করার জন্য এটা খুব দরকার ছিল, কারণ কিছুদিন আগেই পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময় এ প্রকল্প থেকে আগে সরে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংককে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেছে সরকার।

সরকার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করল; কিন্তু এক ধাপেই কেন এত বড় বৃদ্ধি করল, সেটা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন। খুব দ্রুত এত বড় অঙ্কের বৃদ্ধি প্রমাণ করে সরকার অভ্যন্তরীণ মুদ্রার অভাবজনিত সংকটেও পড়েছে। যেহেতু জনগণকে কেবল সরকারের কাছ থেকেই জ্বালানি তেল কিনতে হয় (মনোপলি), তাই সরকার চাইলেই এ ক্ষেত্র থেকে খুব বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নিতে পারে।

একই সঙ্গে দেশে পরিকল্পিতভাবে মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমিয়ে ফেলার মাধ্যমে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সম্ভবত সরকার। যেহেতু টাকা পাচার বন্ধ করা সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব, তাই অর্থনীতির চাহিদা কমিয়ে আমদানি কমানো গেলে সেটা ডলার কিছুটা হলেও সাশ্রয় করবে, যা লেনদেনের ভারসাম্যকে কিছুটা ভালো অবস্থায় নেবে।

একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে মানুষের অধিকার ছিল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতির পরিস্থিতি জানার। এটা এজন্য জানা জরুরি, যেন মানুষ তার সামনে কোন পরিস্থিতি আছে সেটা জেনে সেটা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারে। কিন্তু এদেশে এসব হয় না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সেটা এত বড় পরিমাণে করা জনগণের সামনে দেশের অর্থনীতির নাজুক অবস্থাকে উন্মোচন করেছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

নাগরিকরা অর্থনীতির সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানতে পারছে না কেন?

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
১৪ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কথা ছিল আমরা দেশের নাগরিক হব, কথা ছিল আমরা হব সব ক্ষমতার উৎস, জানব দেশের সবকিছু। কিন্তু হয়েছি কি সেটা? এ রাষ্ট্রের ন্যূনতম খবরাখবরও কি পায় তারা? বিশেষ করে অর্থনীতি, যেটা মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে, সেটার খবর তো সবার জানার কথা। কিন্তু জানি কি আমরা?

৩ জুলাই সরকার নানা ক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় কমানোর জন্য একটি পরিপত্র জারি করে। এতে ব্যয় কমানোর নানা পদক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় ছিল প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রকল্পগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ আর ‘সি’ ক্যাটাগরিতে ভাগ করে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার বিবেচনার কথা বলা হয়।

এর কিছুদিন পরই দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিং করা শুরু হলো। এ সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সরকারের কাছে ছিল এক তিক্ত বড়ি গেলার মতো বিষয়। ২০০১ সালে যে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল, তারা দেশের বিদ্যুৎ খাতে কার্যত কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার মাশুল জনগণ দিয়েছিল ভয়ংকরভাবে। আমাদের স্মৃতিতে নিশ্চয়ই এখনো তাজা আছে, খোদ ঢাকা শহরেই এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হতো।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে সরকার একের পর এক তরল জ্বালানিভিত্তিক কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি আজ সংকটে পড়ার পেছনে এসব ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অকল্পনীয় পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জের বিরাট ‘অবদান’ আছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ঢাকাসহ অন্তত বড় শহরগুলোয় লোডশেডিং প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বড় ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সরকারের উন্নয়নের তালিকায় সব সময় সবার উপরে ছিল। অর্থাৎ ঘোষণা দিয়ে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া সরকারের ইগোর জন্য নিশ্চয়ই ভীষণ কঠিন।

সাধারণ মানুষ অতশত বোঝে না; কিন্তু তারা যখন দেখে সরকার একটার পর একটা পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সরকারি ব্যয় সংকোচের চেষ্টা করে, যখন তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রোপাগান্ডাটির ক্ষেত্রেও আত্মসমর্পণ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনের মধ্যে সন্দেহ দানা বাঁধে।

সাম্প্রতিক সময়ের সংকটের ক্ষেত্রে সরকার ইউক্রেন যুদ্ধের ওপরে সব দায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধই বর্তমান সংকটের একমাত্র কারণ নয়, এমনকি প্রধান কারণও নয়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, সরকারি কথাই সঠিক; তাহলেও প্রশ্ন হচ্ছে, পদক্ষেপ নিতে এত দেরি করল কেন সরকার? ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৪ ফেব্রুয়ারি। কিয়েভ আক্রমণের জন্য যাওয়া ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাশিয়ান সাঁজোয়া বহর যখন ফিরে গেল, তখনই বিশ্বের সব গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হতে যাচ্ছে। তাহলে মার্চ থেকে জুনের শেষ পর্যন্ত চার মাসে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে জুলাইয়ে এসে কেন সরকার পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে?

মানুষ সরকারের সব পদক্ষেপ যখন দেখল, যখন দেখল টাকা ডলারের বিপরীতে তার মূল্য ধরে রাখতে পারছে না, অতি দ্রুত পতন হচ্ছে, তখন মানুষ বুঝতে পারল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি খুব খারাপ। সর্বশেষ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে যা ঘটল সেটা মানুষকে দেশের অর্থনীতি বুঝতে আরও খুব চমৎকারভাবে সাহায্য করেছে। দেশের ইতিহাসে এর আগে কোনোদিন জ্বালানিভেদে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

সরকারের দিক থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি খাতে সরকারকে যে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে, সেটা তারা বন্ধ করতে চায়। এ ভর্তুকির মধ্যেও আছে কিছু মারপ্যাঁচ। সরকার জ্বালানি আমদানি করে তার ওপরে নানা রকম কর সংগ্রহ (সর্বমোট ৩৪ শতাংশ) করার পর জ্বালানির যে মূল্য দাঁড়ায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যদি এর চেয়ে কম দামে বিক্রি করে, তাহলে তার লোকসান হয়েছে বলে বলা হয়। তখনই আসে ভর্তুকির প্রশ্ন। অথচ যে করের কারণে জ্বালানির দাম অতটা বাড়ল সেই টাকাও তো গেছে সরকারের কাছেই। এই কম টাকায় বিক্রিকে লোকসান হিসাবে যদি আমরা ধরেও নিই, তাহলে আমরা দেখব গত কয়েক মাসে সাত থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার মতো লোকসান দিয়েছে পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। কিন্তু এই তথ্য আমরা এখন জানি, তার আগের ৭ বছরে ৪৮ হাজার কোটি টাকা মুনাফা করেছিল বিপিসি। তাহলে নিশ্চিতভাবেই মূল্য কমার কথা। এমন একটা পরিস্থিতিতে সরকার তেলের দাম কেন বাড়াল? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এতটা বাড়াল?

এই যে লিখলাম তেলের দাম আরও কমার কথা, কেউ প্রশ্ন করতে পারেন কীসের ভিত্তিতে বলছি সেটা? এই ভবিষ্যদ্বাণী আমার নয়, আন্তর্জাতিক বাজারের জ্বালানির মূল্য বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদদের। যে কারণে ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধের পর তেলের দাম এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে (৯০ ডলারের আশপাশে), ঠিক সে কারণেই তেলের দাম ভবিষ্যতেও কমতে থাকবে, এটা নিশ্চিত।

আমরা জানি, পশ্চিমা দেশগুলোয় বেশ কিছুদিন থেকে খুব উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। কোনো দেশেই এ মাত্রার মূল্যস্ফীতি গত কয়েক দশকে দেখা যায়নি। সেই মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরার জন্য সেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়েছে। এর অনিবার্য পরিণতি হিসাবে সেখানে বিনিয়োগ কমে যাচ্ছে। এর জেরে পশ্চিমা বিশ্ব মন্দার মধ্যে ঢুকে গেছে। মন্দার মাত্রা কত এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কিছু মতদ্বৈততা আছে, কিন্তু মন্দার অস্তিত্বের ব্যাপারে তাদের কোনো সন্দেহ নেই। অর্থাৎ আগামী বেশ কয়েক মাসের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্য ক্রমাগতভাবে কমতেই থাকবে। এমন প্রেক্ষাপটে মানুষের জীবনে সংকট তৈরি করে জ্বালানির মূল্য এভাবে বাড়ানো প্রমাণ করে সরকারের পিঠ কতটা দেওয়ালে ঠেকে গেছে।

এটা এখন সচেতন মানুষমাত্রই জানেন, সরকার তার লেনদেনের ভারসাম্যহীনতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেউলিয়া হওয়ার পরিস্থিতি এড়ানোর আগাম প্রচেষ্টা হিসাবে আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ চাইছে। সাধারণ মানুষ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফকে একই রকম প্রতিষ্ঠান বলে মনে করেন, যা ঠিক নয়। ব্রেটন উডস সিস্টেমের অধীনে এই প্রতিষ্ঠান দুটি তৈরি হলেও এদের কাজের ক্ষেত্র একেবারেই আলাদা। বিশ্বব্যাংক কোনো দেশের ভৌত অবকাঠামোসহ নানারকম অবকাঠামো প্রকল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদিতে অর্থায়ন করে ঋণ দেয়। কিন্তু আইএমএফ ঋণ দেয় যখন কোনো দেশ তার লেনদেনের ভারসাম্যের সংকটের কারণে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থাৎ কোনো দেশের আইএমএফ-এর ঋণ চাওয়ার মানে হচ্ছে সেখানে অর্থনীতি বড় ঝুঁকিতে আছে। এশিয়ায় বাংলাদেশ, শ্রীলংকা আর পাকিস্তান ছাড়া এ মুহূর্তে আর কেউ আইএমএফ-এর সঙ্গে ঋণের জন্য আলোচনা করছে না।

সরকার প্রথমদিকে লুকানোর চেষ্টা করলেও পরে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ আইএমএফ-এর তরফ থেকে তথ্য নিয়েই ব্লুমবার্গসহ বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া খবর প্রচার করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছে। সেই ঋণের সঙ্গে খুব সহজেই জনগণ মিলিয়ে ফেলতে পারছেন-কেন জ্বালানির মূল্য বাড়াতে হচ্ছে।

অর্থনৈতিকভাবে কোনো দুর্দশাগ্রস্ত সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ঠিক করার জন্য আইএমএফ ভর্তুকি কামানোর সব শর্ত দেয়। তবে এ পর্যায়ে ঋণের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধির কোনো শর্ত দিয়েছে, এখন পর্যন্ত এটা জানা যায় না। এটা ভবিষ্যতে নিশ্চিতভাবেই আসবে, সেই কারণেই সরকার বেশ খানিকটা আগেই এ দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে সরকার জোর গলায় বলতে চাইছে আইএমএফ-এর ঋণ নেওয়ার সঙ্গে এ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই। মুখ রক্ষা করার জন্য এটা খুব দরকার ছিল, কারণ কিছুদিন আগেই পদ্মা সেতু উদ্বোধনের সময় এ প্রকল্প থেকে আগে সরে যাওয়ার কারণে বিশ্বব্যাংককে তীব্র ভাষায় ভর্ৎসনা করেছে সরকার।

সরকার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি করল; কিন্তু এক ধাপেই কেন এত বড় বৃদ্ধি করল, সেটা নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন। খুব দ্রুত এত বড় অঙ্কের বৃদ্ধি প্রমাণ করে সরকার অভ্যন্তরীণ মুদ্রার অভাবজনিত সংকটেও পড়েছে। যেহেতু জনগণকে কেবল সরকারের কাছ থেকেই জ্বালানি তেল কিনতে হয় (মনোপলি), তাই সরকার চাইলেই এ ক্ষেত্র থেকে খুব বড় অঙ্কের মুনাফা তুলে নিতে পারে।

একই সঙ্গে দেশে পরিকল্পিতভাবে মূল্যস্ফীতি উসকে দিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমিয়ে ফেলার মাধ্যমে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে সম্ভবত সরকার। যেহেতু টাকা পাচার বন্ধ করা সরকারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব, তাই অর্থনীতির চাহিদা কমিয়ে আমদানি কমানো গেলে সেটা ডলার কিছুটা হলেও সাশ্রয় করবে, যা লেনদেনের ভারসাম্যকে কিছুটা ভালো অবস্থায় নেবে।

একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে মানুষের অধিকার ছিল তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতির পরিস্থিতি জানার। এটা এজন্য জানা জরুরি, যেন মানুষ তার সামনে কোন পরিস্থিতি আছে সেটা জেনে সেটা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারে। কিন্তু এদেশে এসব হয় না। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং সেটা এত বড় পরিমাণে করা জনগণের সামনে দেশের অর্থনীতির নাজুক অবস্থাকে উন্মোচন করেছে।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন