বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি
jugantor
বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি

  রজত রায়  

১৬ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারির পর জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তায় যখন দেশের বৃহত্তর অংশের মানুষ প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে যাচ্ছেন, তখন অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির হার এবং বিশেষত ভোগ্যপণ্যের মূল্যসূচকের ঊর্ধ্বগতির প্রবণতা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণ বহুমাত্রিক। প্রথমত, দেশি-বিদেশি বাজারে কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি ও অপ্রতুলতা উৎপাদন শিল্পকে বিপাকে ফেলেছে। উৎপাদনের জন্য আমাদের কাঁচামাল বা অন্তর্বর্তী পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসার সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদন সাংঘাতিকভাবে কমে যাবে। সুদের হার বাড়ানো মানেই বিনিয়োগের খরচ বেড়ে যাওয়া। কারণ, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে সাধারণ গ্রাহক বা কোনো কোম্পানিকে বেশি সুদ দিতে হবে। এমনিতেই অতিমারিকালে দেশে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়েছে। নীতি সুদ বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগ কমে গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষের আয় কমবে, ক্রমানুসারে তার প্রভাব পড়বে ক্রয়ক্ষমতার উপরে। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে অতি দরিদ্র পরিবারগুলো। তাই পণ্যের দামের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা শুধু আর্থিক বাজারের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, পণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্যা হয় তা কমানোর জন্যও প্রয়োজন।

বাধাহীন বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজ্য সম্প্রসারণের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি আজ ধ্বংস হতে চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রামাঞ্চলে বেড়েছে দরিদ্র্রতা, তীব্রভাবে ব্যাহত হয়েছে কৃষি উৎপাদন। কোনো কোনো এলাকায় রপ্তানিনির্ভর শিল্প আর কৃষি সরাসরি জড়িয়েছে সংঘাতে। মহামারি করোনা আর সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছে। কৃষিবাজারও খাদ্য ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। কিছু আমদানিনির্ভর দেশ অভ্যন্তরীণ খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই, মুক্তবাণিজ্য উদারীকরণ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এখন ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। নিত্যপণ্য চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি এতটা বেড়েছে। এক মাস আগে অর্থাৎ জুন মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মে মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত কয়েক মাসের মতো গ্রামে শহরের চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। জুন মাসে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। শহরে হয়েছে ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুন মাসে গ্রামাঞ্চলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এ হার ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এর অর্থ হলো ২০২১ সালের জুন মাসে খাদ্যপণ্য বা খাবারের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০২২ সালের জুন মাসে সেই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৭ টাকা ৫৬ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এ মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের জুন মাসে খাদ্যপণ্য বা খাবারের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, চলতি বছরের জুন মাসে সেই খাবারের জন্য ১০৮ টাকা ৩৭ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। তবে বিশ্বের উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় পর্যায়ে আছে। জুন ২০২২ মাসে বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৯ দশমিক ১ শতাংশ, জার্মানিতে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, রাশিয়ায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ২১ দশমিক ৩২ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তুরস্কে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

উৎপাদন বেশি, আমদানি কম এমন বেশকিছু কৌশল নিয়ে চীনের শিল্পখাত সফলতা এনে দিয়েছে। ২০২০ সালে গোল্ডম্যান স্যাকস একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। যেখানে দেখা গেছে, উচ্চ প্রযুক্তির পণ্যগুলোতে চীনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ব্যাপকভাবে উন্নতি করছে। নিজেরাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। বিদেশ থেকে প্রযুক্তি পণ্য আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। ২০০২ সালের দিকে চীন ছিল অল্প কিছু দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক অংশীদার। এখন ৬০টির বেশি দেশের বড় ব্যবসায়িক অংশীদার দেশটি। ১৯৮৫ থেকে ২০১৫ সালে আমেরিকায় চীনের পণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। এ সময় মোট ১২৫টি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। এর ফলে ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ে উল্লেখযোগ্য হারে। পশ্চিমা দেশ রাশিয়ার উপরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বৈশ্বিক জিডিপি বা বিশ্বের মোট উৎপাদনের উপর কী প্রভাব পড়বে তা সময়ই বলে দিবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেও দেশটির ক্রেতাদের এখন আগের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। গত এপ্রিলেও যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম যা ছিল, মে মাসে তা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাদ্য ও জ্বালানির দাম। ১৯৮১ সালের পর এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের এত চড়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিবারের মাসে গড়ে ৪৬০ ডলার খরচ হয়। চলতি মাসে এ খরচের হার কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মুডি’স অ্যানালিটিকসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ। গত বছরের তুলনায় জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে গ্যাসের দাম গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুতের দাম গত ১২ মাসে বেড়েছে ১২ শতাংশ। ২০০৬ সালের পর বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম মন্ত্রণালয় বলছে, নিত্যকার জীবনযাপনে যে পণ্য লাগে তার সবগুলোরই দাম বেড়েছে। দেশটির একটি পরিবারের খাবারের জন্য মাথাপিছু ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ। ডিমের দাম বেড়েছে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ, দুধ ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। দ্য শেল্টার ইনডেক্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খরচ বেড়েছে সাড়ে পাঁচ শতাংশ, যা ১৯৯১ সালের পর সর্বোচ্চ। সাধারণ নাগরিকদের এখন আবাসনের পেছনেই উপার্জনের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। মহামারির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এভিয়েশন ব্যবসা বড় রকমের ধাক্কা খায়। করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করায় এভিয়েশন কোম্পানিগুলো আশা করেছিল গত দুই বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সেই আশা আর পূরণ হচ্ছে না।

মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) তাদের মূল সুদের হার ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়েছে। ইউরো জোনের দেশগুলোতে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে এবার ১১ বছরের মধ্যে প্রথম সুদের হার বাড়িয়েছে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি)। ইউরো জোনে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউক্রেনে যুদ্ধ এবং কোভিড মহামারির কারণে জ্বালানি, খাবারের দাম বেড়ে গেছে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ বেড়েছে এবং অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। কারণ ইইউ দেশগুলো প্রচণ্ডভাবে রাশিয়ার তেল এবং গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির প্রেক্ষাপটে মস্কো জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে বলে দেশগুলো উদ্বিগ্ন। বিশ্ববাজারে এ মুহূর্তে সারের দাম আকাশছোঁয়া। এর জেরে দেখা দিতে পারে খাদ্য ঘাটতি। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকে মস্কোর উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তবে বাইডেন প্রশাসন সারসহ রাশিয়ার অন্য কোনো কৃষিপণ্যের উপরে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তবু অনেক পশ্চিমা ব্যাংক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল নিয়মনীতির মধ্যে ঝামেলায় পড়ার ভয়ে রুশ কৃষিপণ্যের সরবরাহ এড়িয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ছন্দপতন ঘটেছে, তার মধ্যে আমাদের দেশের অর্থব্যবস্থাকে যতটুকু নিরাপদ রেখে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায় তার পথ খুঁজে বের করতে হবে। যাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যথাসাধ্য কম হয়। বিশেষ করে শিল্প ও কৃষির উৎপাদনের ধারা স্বাভাবিক রাখতে হবে। কীভাবে রেমিট্যান্স আরও বাড়ানো যায় সেদিকে জোর দিতে হবে। বিশ্ববাজারে অনেক পণ্যের দাম কমে আসছে। তাই সরকারকে কঠোর মনিটরিং সিস্টেম কার্যকর করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও মসৃণ করতে হবে। যেসব আমদানি পণ্যের দাম এখনো বেশি, সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার কর ছাড় দিতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য অফিস ও দোকানপাটের সময় কমিয়ে আনা, কম জ্বালানি খরচ করা এবং কম অগ্রাধিকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ স্থগিত রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এলসি মার্জিনও বাড়ানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ৭৫-১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটার মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানি ব্যয় কমানো এবং ডলার সংকট কমিয়ে আনা এবং এর কিছু সুফলও আমরা পাচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্য আমদানির সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই ২০২২ বিদেশ থেকে পণ্য আনতে নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের মাসের চেয়ে ৩১ শতাংশ কম, যা ডলার সংকটে কিছুটা স্বস্তি আনবে।

রজত রায় : অর্থনীতি বিষয়ক লেখক

বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিচ্ছে মূল্যস্ফীতি

 রজত রায় 
১৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনা মহামারির পর জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তায় যখন দেশের বৃহত্তর অংশের মানুষ প্রতিনিয়ত অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করে যাচ্ছেন, তখন অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির হার এবং বিশেষত ভোগ্যপণ্যের মূল্যসূচকের ঊর্ধ্বগতির প্রবণতা মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মূল্যবৃদ্ধির কারণ বহুমাত্রিক। প্রথমত, দেশি-বিদেশি বাজারে কাঁচামালের দামের ঊর্ধ্বগতি ও অপ্রতুলতা উৎপাদন শিল্পকে বিপাকে ফেলেছে। উৎপাদনের জন্য আমাদের কাঁচামাল বা অন্তর্বর্তী পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেশের বাজারে পড়ে। মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে চলে আসার সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদন সাংঘাতিকভাবে কমে যাবে। সুদের হার বাড়ানো মানেই বিনিয়োগের খরচ বেড়ে যাওয়া। কারণ, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে সাধারণ গ্রাহক বা কোনো কোম্পানিকে বেশি সুদ দিতে হবে। এমনিতেই অতিমারিকালে দেশে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়েছে। নীতি সুদ বৃদ্ধির ফলে বিনিয়োগ কমে গেলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষের আয় কমবে, ক্রমানুসারে তার প্রভাব পড়বে ক্রয়ক্ষমতার উপরে। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে অতি দরিদ্র পরিবারগুলো। তাই পণ্যের দামের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা শুধু আর্থিক বাজারের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, পণ্যের দাম বাড়ার কারণে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্যা হয় তা কমানোর জন্যও প্রয়োজন।

বাধাহীন বিশ্বায়ন ও মুক্তবাণিজ্য সম্প্রসারণের কারণে স্থানীয় অর্থনীতি আজ ধ্বংস হতে চলছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রামাঞ্চলে বেড়েছে দরিদ্র্রতা, তীব্রভাবে ব্যাহত হয়েছে কৃষি উৎপাদন। কোনো কোনো এলাকায় রপ্তানিনির্ভর শিল্প আর কৃষি সরাসরি জড়িয়েছে সংঘাতে। মহামারি করোনা আর সাম্প্রতিক রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছে। কৃষিবাজারও খাদ্য ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশ্বব্যাপী উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। কিছু আমদানিনির্ভর দেশ অভ্যন্তরীণ খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই, মুক্তবাণিজ্য উদারীকরণ আজ প্রশ্নের সম্মুখীন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার এখন ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। নিত্যপণ্য চালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি এতটা বেড়েছে। এক মাস আগে অর্থাৎ জুন মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে (মাসওয়ারি বা মাসভিত্তিক) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। মে মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত কয়েক মাসের মতো গ্রামে শহরের চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হয়েছে। জুন মাসে গ্রামাঞ্চলে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। শহরে হয়েছে ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। জুন মাসে গ্রামাঞ্চলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। শহরাঞ্চলে এ হার ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। এর অর্থ হলো ২০২১ সালের জুন মাসে খাদ্যপণ্য বা খাবারের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, ২০২২ সালের জুন মাসে সেই পণ্য বা সেবার জন্য ১০৭ টাকা ৫৬ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। এ মাসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ২০২১ সালের জুন মাসে খাদ্যপণ্য বা খাবারের জন্য ১০০ টাকা খরচ করতে হতো, চলতি বছরের জুন মাসে সেই খাবারের জন্য ১০৮ টাকা ৩৭ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। তবে বিশ্বের উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার সহনীয় পর্যায়ে আছে। জুন ২০২২ মাসে বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতির চিত্রে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৯ দশমিক ১ শতাংশ, জার্মানিতে ৮ দশমিক ২ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ, রাশিয়ায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ, পাকিস্তানে ২১ দশমিক ৩২ শতাংশ, শ্রীলংকায় ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তুরস্কে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ।

উৎপাদন বেশি, আমদানি কম এমন বেশকিছু কৌশল নিয়ে চীনের শিল্পখাত সফলতা এনে দিয়েছে। ২০২০ সালে গোল্ডম্যান স্যাকস একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। যেখানে দেখা গেছে, উচ্চ প্রযুক্তির পণ্যগুলোতে চীনের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ব্যাপকভাবে উন্নতি করছে। নিজেরাই নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে। বিদেশ থেকে প্রযুক্তি পণ্য আমদানি করতে হয় না বললেই চলে। ২০০২ সালের দিকে চীন ছিল অল্প কিছু দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক অংশীদার। এখন ৬০টির বেশি দেশের বড় ব্যবসায়িক অংশীদার দেশটি। ১৯৮৫ থেকে ২০১৫ সালে আমেরিকায় চীনের পণ্য রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে। এ সময় মোট ১২৫টি পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা হয়। এর ফলে ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধি বাড়ে উল্লেখযোগ্য হারে। পশ্চিমা দেশ রাশিয়ার উপরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আর্থিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বৈশ্বিক জিডিপি বা বিশ্বের মোট উৎপাদনের উপর কী প্রভাব পড়বে তা সময়ই বলে দিবে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রেও দেশটির ক্রেতাদের এখন আগের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। গত এপ্রিলেও যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম যা ছিল, মে মাসে তা ৮ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশটিতে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে খাদ্য ও জ্বালানির দাম। ১৯৮১ সালের পর এবারই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের এত চড়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে হচ্ছে। অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরিবারের মাসে গড়ে ৪৬০ ডলার খরচ হয়। চলতি মাসে এ খরচের হার কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন মুডি’স অ্যানালিটিকসের মুখ্য অর্থনীতিবিদ। গত বছরের তুলনায় জ্বালানি খরচ বেড়েছে ৩৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এর মধ্যে গ্যাসের দাম গত বছরের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। শুধু গ্যাস নয়, বিদ্যুতের দাম গত ১২ মাসে বেড়েছে ১২ শতাংশ। ২০০৬ সালের পর বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ বলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম মন্ত্রণালয় বলছে, নিত্যকার জীবনযাপনে যে পণ্য লাগে তার সবগুলোরই দাম বেড়েছে। দেশটির একটি পরিবারের খাবারের জন্য মাথাপিছু ব্যয় বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ১৯৭৯ সালের পর সর্বোচ্চ। ডিমের দাম বেড়েছে ৩২ দশমিক ২ শতাংশ, দুধ ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। দ্য শেল্টার ইনডেক্স বলছে, যুক্তরাষ্ট্রে আবাসন খরচ বেড়েছে সাড়ে পাঁচ শতাংশ, যা ১৯৯১ সালের পর সর্বোচ্চ। সাধারণ নাগরিকদের এখন আবাসনের পেছনেই উপার্জনের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। মহামারির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের এভিয়েশন ব্যবসা বড় রকমের ধাক্কা খায়। করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করায় এভিয়েশন কোম্পানিগুলো আশা করেছিল গত দুই বছরের ক্ষতি কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সেই আশা আর পূরণ হচ্ছে না।

মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) তাদের মূল সুদের হার ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়েছে। ইউরো জোনের দেশগুলোতে বাড়তে থাকা মূল্যস্ফীতির রাশ টেনে ধরতে এবার ১১ বছরের মধ্যে প্রথম সুদের হার বাড়িয়েছে ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি)। ইউরো জোনে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউক্রেনে যুদ্ধ এবং কোভিড মহামারির কারণে জ্বালানি, খাবারের দাম বেড়ে গেছে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ বেড়েছে এবং অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। কারণ ইইউ দেশগুলো প্রচণ্ডভাবে রাশিয়ার তেল এবং গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির প্রেক্ষাপটে মস্কো জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে বলে দেশগুলো উদ্বিগ্ন। বিশ্ববাজারে এ মুহূর্তে সারের দাম আকাশছোঁয়া। এর জেরে দেখা দিতে পারে খাদ্য ঘাটতি। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকে মস্কোর উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তবে বাইডেন প্রশাসন সারসহ রাশিয়ার অন্য কোনো কৃষিপণ্যের উপরে নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। তবু অনেক পশ্চিমা ব্যাংক ও ব্যবসায়ী প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল নিয়মনীতির মধ্যে ঝামেলায় পড়ার ভয়ে রুশ কৃষিপণ্যের সরবরাহ এড়িয়ে যাচ্ছে।

যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে ছন্দপতন ঘটেছে, তার মধ্যে আমাদের দেশের অর্থব্যবস্থাকে যতটুকু নিরাপদ রেখে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায় তার পথ খুঁজে বের করতে হবে। যাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ যথাসাধ্য কম হয়। বিশেষ করে শিল্প ও কৃষির উৎপাদনের ধারা স্বাভাবিক রাখতে হবে। কীভাবে রেমিট্যান্স আরও বাড়ানো যায় সেদিকে জোর দিতে হবে। বিশ্ববাজারে অনেক পণ্যের দাম কমে আসছে। তাই সরকারকে কঠোর মনিটরিং সিস্টেম কার্যকর করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাও মসৃণ করতে হবে। যেসব আমদানি পণ্যের দাম এখনো বেশি, সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে সরকার কর ছাড় দিতে পারে। ইতোমধ্যে সরকার কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য অফিস ও দোকানপাটের সময় কমিয়ে আনা, কম জ্বালানি খরচ করা এবং কম অগ্রাধিকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ স্থগিত রাখার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে এলসি মার্জিনও বাড়ানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ৭৫-১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এটার মূল উদ্দেশ্য হলো আমদানি ব্যয় কমানো এবং ডলার সংকট কমিয়ে আনা এবং এর কিছু সুফলও আমরা পাচ্ছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের পণ্য আমদানির সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই ২০২২ বিদেশ থেকে পণ্য আনতে নতুন ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের মাসের চেয়ে ৩১ শতাংশ কম, যা ডলার সংকটে কিছুটা স্বস্তি আনবে।

রজত রায় : অর্থনীতি বিষয়ক লেখক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন