এত অনাচার, তবুও থামেনি জীবনের রথ
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
এত অনাচার, তবুও থামেনি জীবনের রথ

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

১৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্দশা, দুর্দৈব ছাড়ছে না আমাদের। আমাদের বাংলাদেশের পরিচয় অনেক রকমের।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের ছোট ছোট সুখবর দৈনিক পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পেত না; কিন্তু নৌকাডুবি হলে, আগুন লাগলে, বন্যা হলে, রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে সেগুলো খবরের বিষয়বস্তু হয়ে উঠত।

বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী যে কল্পমূর্তি তৈরি হয়েছিল, সেটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আনন্দদায়ক বা সুখকর কিছু ছিল না।

গত ৩ দশকে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে তা দেশের কল্পমূর্তিতে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টিতে প্রচুর অবদান রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের কাছে বাংলাদেশ বিশাল একটি ধাঁধা। বাংলাদেশে সুশাসন নেই বললেই চলে। যেসব আর্থ-সামাজিক সূচক সুশাসন নির্দেশ করে সেগুলো দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। দুর্নীতি ও দুঃশাসন লাগামহীন হয়ে পড়ছে। প্রতিবছর বিশাল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।

বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর পিরামিডের শীর্ষদেশে যারা অবস্থান করে তারা দেশটাকে আদৌ ভালোবাসে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নিজ মাতৃভূমিকে ভালোবাসলে কেউ ভিনদেশে স্থায়ীভাবে জীবনযাপনের চিন্তা করে না। যারা দেশ ও দেশবাসীকে আস্থায় নেয় না, তারাই কানাডার বেগমপাড়ায় ও অস্ট্রেলিয়াতে বাড়িঘর করে জীবনযাপন করার মধ্যে স্বস্তি খুঁজে পান। কবি লিখেছিলেন, মায়ের ভাইয়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ।

কবির চোখে বাংলাদেশের এই মিষ্টিমধুর চেহারা পৃথিবীর অন্যত্র কি কোথাও আছে? মনে হয় বাংলাদেশের এলিটরা দেশের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এই মানসিকতা কতটুকু যৌক্তিক? এদেরই আপনজনরা সবাই বিদেশে নতুন ঠিকানা খুঁজতে সাহস পায় না।

কারণ তাদের অর্থবিত্ত নেই অথবা লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় তারা অর্থবিত্ত করার সুযোগ পায় না। এরাই বাংলাদেশে মাটি কামড়ে পড়ে আছে। দেশের বাইরে ভিন্ন কোনো দেশে চাকরি করা, আয়-রোজগার করা ইত্যাদিতে দোষের কিছু নেই। আমাদের দেশের সমাজ বিদেশে কাজ করাকে আড় চোখে দেখে না। কারণ আমরা জানি, এসব মানুষ কোনো এক সময়ে দেশে ফিরে আসবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি। সিলেট জেলার মানুষের মধ্যে অনেকে আছেন যারা লন্ডনে বাস করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য করেন এবং লেখাপড়া করেন। লন্ডনে চলে যাওয়া সিলেটিদের একটা অংশ বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার চিন্তা করে না। তারা হয়তো সিলেটে জন্মগ্রহণের স্মৃতিরক্ষার জন্য গ্রামের মধ্যেই পাকা বাড়িঘর নির্মাণ করে। সিলেটে এ রকম বাড়ি-ঘরগুলো প্রায়ই তালাবদ্ধ থাকে। এর মালিকরা ফিরে এলে এই বাড়িগুলোর দরজা খোলা হয়। এভাবে মাঝেমাঝে যারা সিলেটে ফিরে আসেন, তারা খুব বেশিদিন মাতৃভূমিতে অবস্থান করেন না। সিলেটের সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। এদের এক ভাগ লন্ডনি বলে পরিচিত। অপর ভাগটি দেশি। সিলেট পরিণত হয়েছে দ্বিখণ্ডিত সমাজে।

সমাজের এ বিভাজন প্রতিফলিত হয় জীবনযাত্রায়, সংস্কৃতি এবং লোকাচারে। এমনকি বৈবাহিক সম্পর্ক গড়তে গিয়ে লন্ডনি/দেশি বিভাজন বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সমাজ ও মানসিকতায় বিদেশে কর্মরত মানুষগুলো নতুন ধরনের উপাদান যোগ করেছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি অংশ অমিতব্যয়ী আচরণ করে নিজস্ব ধন-সম্পদের নোংরা প্রদর্শনীতে লিপ্ত হয়। অন্য অংশটি তুলনামূলকভাবে জীবনের ভবিষ্যতের দিনগুলো নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনা করে। এরা সচেষ্ট থাকে তাদের আয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে।

উন্নয়ন অর্থনীতি অর্থনীতিবিদদের চিন্তা-চেতনায় কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। যে দেশে এত অনাচার ও অনাসৃষ্টি, সেদেশ কী করে গত ৩ দশকে ধারাবাহিকভাবে গড়পড়তা ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রশ্নটি এটাই। যে দেশে এত দুর্নীতি, এত অনাচার, মামলা মোকদ্দমার বিশাল জট, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এত সময়ক্ষেপণ, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লক্ষ কোটি টাকার ওপরে ঠেকেছে, যে দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে কমবেশি ৭০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়, সে দেশ কী করে সম্মানজনক প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখতে পেরেছে?

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি বড় অংশ সৃজনশীল উদ্ভাবনা শক্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জীবনের বাস্তবতা তাদের নিরাপদ রাখেনি, তবুও তারা সব ধরনের ক্ষতিকর প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। এমন লড়াই বিশ্বের নামকরা মানুষগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমার শৈশব কেটেছে কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠে। সেখানে কৃষকদের জমি দুভাগে বিভক্ত। একভাগ হচ্ছে গোমতি নদীর বন্যারোধক বাঁধের ভেতরে, অন্য অংশ বাঁধের বাইরে। বাঁধের ভেতরের জমি থেকে ফসলাদি খুব একটা পাওয়া যায় না। বর্ষার কাছাকাছি সময় থেকে বর্ষা চলে যাওয়া পর্যন্ত অনাবাদি থাকে। বর্ষা চলে গেলে বাঁধের ভেতরকার জমিতে বালির আস্তরণ পড়ে যায়। ফলে সেই জমিতে চাষ করা কঠিন। আমি দেখেছি, এসব জমিতে শুধু আখের চাষ হয়। মৌসুম শেষে আখ কাটা ও মাড়াই করা হয়। মাড়াই করার পর যে রস সংগৃহীত হয়, সে রস জাল দিয়ে আখের গুড় তৈরি করা হয়। এভাবে ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁধের ভেতরকার জমির মালিকরা কিছু না কিছু আয় করতে পারে। যেখানে অন্য কোনো ফসলের চাষ করা যায় না, সেখানে আখের চাষটাও কৃষকদের সৃজনী শক্তির প্রমাণ। বাঁধের বাইরে সমতল ভূমির কৃষকরা কৃষিতে মোটামুটিভাবে অভ্যস্ত হয়ে আছে। ৬০-৭০ বছর আগে একজন ব্যতিক্রমী কৃষকের দেখা পেয়েছিলাম। এই কৃষকের জমি অল্পই ছিল। বাড়ির লাগোয়া জমিতে এই কৃষক সারা বছর ধরে সবজির আবাদ করত। বিকালবেলা গোমতি নদীর বাঁধ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখতাম সবুজের আচ্ছাদনে ঢাকা এই কৃষকের জমি। নিঃসন্দেহে এই কৃষক ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা-ভাবনা করত। তাকে দালাল-ফড়িয়াদের চক্করে পড়তে হয়নি। কাছেই ছিল শহরের বাজার। সেই বাজারে এই কৃষক তার উৎপাদিত সবজি সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করত। কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম, নদীভাঙা কিছু মানুষ সেই নদীরই চরে আশ্রয় নিয়েছে। চরের জমিতেও বালির আধিক্য। এ রকম জমিতে এমন কোনো ফসলের চাষ হয় না, যার জন্য স্বাভাবিক মৃত্তিকা প্রয়োজন। সেই কৃষকরা এরকম বালুর চরে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করে লাভবান হয়েছে এবং নিজেদের বেঁচে থাকাও সম্ভব করেছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ খুব বেশি হওয়ার ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ৩ শতক বা ৪ শতকের বেশি নয়। যে কৃষক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, সে কৃষক তার আশপাশের জমি ইজারা নিয়ে উচ্চমূল্যের ফসলের আবাদ করছে। এর মধ্যে ব্রোকলির মতো সবজিও আছে, পেয়ারার মতো ফলও আছে। একটু অবস্থাপন্ন কৃষকরা জমি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উচ্চমূল্য ফসলের চাষ করছে। এমন শত-সহস্র উদ্যোগ সব ধরনের নেতিবাচক প্রবণতাকে পরাস্ত করছে। জয় হচ্ছে উৎপাদনে, উদ্ভাবনে, দৃঢ়চিত্ত কৃষকের। শুধু কৃষিক্ষেত্রেই নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগেও অনেক সাফল্যগাথা রচিত হচ্ছে। এদের সবার দিকে একটু নজর রাখা দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন।

১৬ আগস্ট পত্রিকায় দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সংবাদ আছে। প্রথমটি হলো বিআরটি প্রকল্প ঘিরে। উড়াল সড়কের গার্ডার চাপা দিল প্রাইভেট কারকে। এ দুর্ঘটনায় যে পাঁচজন নিহত হয়েছেন, তারা পরস্পরের স্বজন। এর আগেও দুর্ঘটনা ঘটেছিল এ প্রকল্পে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সোমবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন সেক্টর ৩-এর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। গাড়িটি সড়ক ধরে যাচ্ছিল। এ সময় বিআরটি প্রকল্পের উড়াল সড়কের গার্ডার কাজ করা একটি ক্রেন কাত হয়ে যায় এবং গার্ডারটি গাড়িটিকে চাপা দেয়। বেশ কয়েক বছর আগে

আমার স্কুলজীবনের বন্ধু মুজিবুর রহমান একটি জিপে সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে কলাবাগানে নিজ বাসায় আসছিলেন। এমন সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরির কোনায় নির্মীয়মাণ ফুটওভার ব্রিজের একটি ঢালাই করা বিম পড়ে গিয়ে তার গাড়ির ওপর আঘাত হানে। মুজিবুর রহমানের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। গাড়িটও চুরমার হয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে, এরকম দুর্ঘটনা অতীতেও হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা ট্র্যাজেডি হয়ে এসেছে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য। কেন বিআরটি প্রকল্পে এমন ঘটনা ঘটল তা ভেবে নির্ণয় করা কঠিন। এরকম ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তা কারও অজানা নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যবহৃত ক্রেনটির শক্তি ভারী একটি গার্ডার উত্তোলনের জন্য যথাযথ ছিল কিনা? দ্বিতীয়ত, বিআরটির কাজ চলার সময় বিপজ্জনক পরিসর চিহ্নিত করা ছিল কিনা? আমরা দেখেছি, প্রতিবছর এদেশে শত শত প্রাণহানিকর দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির সদস্য হন বিভাগীয় কর্মকর্তারা। তাদের কয়টি তদন্ত প্রতিবেদন সরকার পেয়েছে এবং তাতে কাদের দায়ী করা হয়েছে, তা জনসমক্ষে আনা হয় না। ফলে ভুক্তভোগীরা বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

একটি সংবাদপত্রের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে চকবাজারের দেবিদাসঘাট লেনে একটি চারতলা ভবনে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট সোয়া ২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। মৃত ব্যক্তিরা সবাই ভবনের নিচতলার বরিশাল হোটেলের কর্মচারী। রাতে কাজ করে হোটেলের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন তারা। ৬ হোটেল শ্রমিকের লাশ উদ্ধার হয়েছে। প্রতিবেদক লিখেছেন, ‘পুরান ঢাকায় একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ঘটছেই। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, থানা-পুলিশ, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসে। কিছু পদক্ষেপও তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বদলায় না।’ পুরান ঢাকায় ভয়াবহ সব আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তদসত্ত্বেও সবকিছুই চলছে বিজনেস অ্যাজ ইয়ুজুয়াল। এগুলো ঘটছে সুশাসন না থাকায়। যদি এই সোনার দেশে সুশাসন থাকত, তাহলে আমরা মানবকল্যাণে অনেক দূর যেতে পারতাম।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

এত অনাচার, তবুও থামেনি জীবনের রথ

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
১৮ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্দশা, দুর্দৈব ছাড়ছে না আমাদের। আমাদের বাংলাদেশের পরিচয় অনেক রকমের।

একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের ছোট ছোট সুখবর দৈনিক পত্রিকার পাতায় ঠাঁই পেত না; কিন্তু নৌকাডুবি হলে, আগুন লাগলে, বন্যা হলে, রোগ-ব্যাধি দেখা দিলে সেগুলো খবরের বিষয়বস্তু হয়ে উঠত।

বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী যে কল্পমূর্তি তৈরি হয়েছিল, সেটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আনন্দদায়ক বা সুখকর কিছু ছিল না।

গত ৩ দশকে আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে তা দেশের কল্পমূর্তিতে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টিতে প্রচুর অবদান রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের কাছে বাংলাদেশ বিশাল একটি ধাঁধা। বাংলাদেশে সুশাসন নেই বললেই চলে। যেসব আর্থ-সামাজিক সূচক সুশাসন নির্দেশ করে সেগুলো দিনে দিনে আরও খারাপ হচ্ছে। দুর্নীতি ও দুঃশাসন লাগামহীন হয়ে পড়ছে। প্রতিবছর বিশাল অঙ্কের অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।

বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর পিরামিডের শীর্ষদেশে যারা অবস্থান করে তারা দেশটাকে আদৌ ভালোবাসে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। নিজ মাতৃভূমিকে ভালোবাসলে কেউ ভিনদেশে স্থায়ীভাবে জীবনযাপনের চিন্তা করে না। যারা দেশ ও দেশবাসীকে আস্থায় নেয় না, তারাই কানাডার বেগমপাড়ায় ও অস্ট্রেলিয়াতে বাড়িঘর করে জীবনযাপন করার মধ্যে স্বস্তি খুঁজে পান। কবি লিখেছিলেন, মায়ের ভাইয়ের এত স্নেহ, কোথায় গেলে পাবে কেহ।

কবির চোখে বাংলাদেশের এই মিষ্টিমধুর চেহারা পৃথিবীর অন্যত্র কি কোথাও আছে? মনে হয় বাংলাদেশের এলিটরা দেশের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। এই মানসিকতা কতটুকু যৌক্তিক? এদেরই আপনজনরা সবাই বিদেশে নতুন ঠিকানা খুঁজতে সাহস পায় না।

কারণ তাদের অর্থবিত্ত নেই অথবা লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় তারা অর্থবিত্ত করার সুযোগ পায় না। এরাই বাংলাদেশে মাটি কামড়ে পড়ে আছে। দেশের বাইরে ভিন্ন কোনো দেশে চাকরি করা, আয়-রোজগার করা ইত্যাদিতে দোষের কিছু নেই। আমাদের দেশের সমাজ বিদেশে কাজ করাকে আড় চোখে দেখে না। কারণ আমরা জানি, এসব মানুষ কোনো এক সময়ে দেশে ফিরে আসবে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা এক থেকে দেড় কোটি। সিলেট জেলার মানুষের মধ্যে অনেকে আছেন যারা লন্ডনে বাস করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য করেন এবং লেখাপড়া করেন। লন্ডনে চলে যাওয়া সিলেটিদের একটা অংশ বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার চিন্তা করে না। তারা হয়তো সিলেটে জন্মগ্রহণের স্মৃতিরক্ষার জন্য গ্রামের মধ্যেই পাকা বাড়িঘর নির্মাণ করে। সিলেটে এ রকম বাড়ি-ঘরগুলো প্রায়ই তালাবদ্ধ থাকে। এর মালিকরা ফিরে এলে এই বাড়িগুলোর দরজা খোলা হয়। এভাবে মাঝেমাঝে যারা সিলেটে ফিরে আসেন, তারা খুব বেশিদিন মাতৃভূমিতে অবস্থান করেন না। সিলেটের সমাজ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেছে। এদের এক ভাগ লন্ডনি বলে পরিচিত। অপর ভাগটি দেশি। সিলেট পরিণত হয়েছে দ্বিখণ্ডিত সমাজে।

সমাজের এ বিভাজন প্রতিফলিত হয় জীবনযাত্রায়, সংস্কৃতি এবং লোকাচারে। এমনকি বৈবাহিক সম্পর্ক গড়তে গিয়ে লন্ডনি/দেশি বিভাজন বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সমাজ ও মানসিকতায় বিদেশে কর্মরত মানুষগুলো নতুন ধরনের উপাদান যোগ করেছে। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি অংশ অমিতব্যয়ী আচরণ করে নিজস্ব ধন-সম্পদের নোংরা প্রদর্শনীতে লিপ্ত হয়। অন্য অংশটি তুলনামূলকভাবে জীবনের ভবিষ্যতের দিনগুলো নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনা করে। এরা সচেষ্ট থাকে তাদের আয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতে।

উন্নয়ন অর্থনীতি অর্থনীতিবিদদের চিন্তা-চেতনায় কৌতূহল সৃষ্টি করেছে। যে দেশে এত অনাচার ও অনাসৃষ্টি, সেদেশ কী করে গত ৩ দশকে ধারাবাহিকভাবে গড়পড়তা ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। প্রশ্নটি এটাই। যে দেশে এত দুর্নীতি, এত অনাচার, মামলা মোকদ্দমার বিশাল জট, উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এত সময়ক্ষেপণ, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১ লক্ষ কোটি টাকার ওপরে ঠেকেছে, যে দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে কমবেশি ৭০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়, সে দেশ কী করে সম্মানজনক প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখতে পেরেছে?

বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একটি বড় অংশ সৃজনশীল উদ্ভাবনা শক্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জীবনের বাস্তবতা তাদের নিরাপদ রাখেনি, তবুও তারা সব ধরনের ক্ষতিকর প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছে এবং শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে। এমন লড়াই বিশ্বের নামকরা মানুষগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আমার শৈশব কেটেছে কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠে। সেখানে কৃষকদের জমি দুভাগে বিভক্ত। একভাগ হচ্ছে গোমতি নদীর বন্যারোধক বাঁধের ভেতরে, অন্য অংশ বাঁধের বাইরে। বাঁধের ভেতরের জমি থেকে ফসলাদি খুব একটা পাওয়া যায় না। বর্ষার কাছাকাছি সময় থেকে বর্ষা চলে যাওয়া পর্যন্ত অনাবাদি থাকে। বর্ষা চলে গেলে বাঁধের ভেতরকার জমিতে বালির আস্তরণ পড়ে যায়। ফলে সেই জমিতে চাষ করা কঠিন। আমি দেখেছি, এসব জমিতে শুধু আখের চাষ হয়। মৌসুম শেষে আখ কাটা ও মাড়াই করা হয়। মাড়াই করার পর যে রস সংগৃহীত হয়, সে রস জাল দিয়ে আখের গুড় তৈরি করা হয়। এভাবে ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতা করে বাঁধের ভেতরকার জমির মালিকরা কিছু না কিছু আয় করতে পারে। যেখানে অন্য কোনো ফসলের চাষ করা যায় না, সেখানে আখের চাষটাও কৃষকদের সৃজনী শক্তির প্রমাণ। বাঁধের বাইরে সমতল ভূমির কৃষকরা কৃষিতে মোটামুটিভাবে অভ্যস্ত হয়ে আছে। ৬০-৭০ বছর আগে একজন ব্যতিক্রমী কৃষকের দেখা পেয়েছিলাম। এই কৃষকের জমি অল্পই ছিল। বাড়ির লাগোয়া জমিতে এই কৃষক সারা বছর ধরে সবজির আবাদ করত। বিকালবেলা গোমতি নদীর বাঁধ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখতাম সবুজের আচ্ছাদনে ঢাকা এই কৃষকের জমি। নিঃসন্দেহে এই কৃষক ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তা-ভাবনা করত। তাকে দালাল-ফড়িয়াদের চক্করে পড়তে হয়নি। কাছেই ছিল শহরের বাজার। সেই বাজারে এই কৃষক তার উৎপাদিত সবজি সরাসরি ভোক্তার কাছে বিক্রি করত। কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম, নদীভাঙা কিছু মানুষ সেই নদীরই চরে আশ্রয় নিয়েছে। চরের জমিতেও বালির আধিক্য। এ রকম জমিতে এমন কোনো ফসলের চাষ হয় না, যার জন্য স্বাভাবিক মৃত্তিকা প্রয়োজন। সেই কৃষকরা এরকম বালুর চরে মিষ্টি কুমড়ার চাষ করে লাভবান হয়েছে এবং নিজেদের বেঁচে থাকাও সম্ভব করেছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার চাপ খুব বেশি হওয়ার ফলে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ৩ শতক বা ৪ শতকের বেশি নয়। যে কৃষক অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, সে কৃষক তার আশপাশের জমি ইজারা নিয়ে উচ্চমূল্যের ফসলের আবাদ করছে। এর মধ্যে ব্রোকলির মতো সবজিও আছে, পেয়ারার মতো ফলও আছে। একটু অবস্থাপন্ন কৃষকরা জমি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উচ্চমূল্য ফসলের চাষ করছে। এমন শত-সহস্র উদ্যোগ সব ধরনের নেতিবাচক প্রবণতাকে পরাস্ত করছে। জয় হচ্ছে উৎপাদনে, উদ্ভাবনে, দৃঢ়চিত্ত কৃষকের। শুধু কৃষিক্ষেত্রেই নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগেও অনেক সাফল্যগাথা রচিত হচ্ছে। এদের সবার দিকে একটু নজর রাখা দেশের স্বার্থেই প্রয়োজন।

১৬ আগস্ট পত্রিকায় দুটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার সংবাদ আছে। প্রথমটি হলো বিআরটি প্রকল্প ঘিরে। উড়াল সড়কের গার্ডার চাপা দিল প্রাইভেট কারকে। এ দুর্ঘটনায় যে পাঁচজন নিহত হয়েছেন, তারা পরস্পরের স্বজন। এর আগেও দুর্ঘটনা ঘটেছিল এ প্রকল্পে। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সোমবার বিকাল সোয়া ৪টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন সেক্টর ৩-এর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে প্যারাডাইস টাওয়ারের সামনে এ ঘটনা ঘটে। গাড়িটি সড়ক ধরে যাচ্ছিল। এ সময় বিআরটি প্রকল্পের উড়াল সড়কের গার্ডার কাজ করা একটি ক্রেন কাত হয়ে যায় এবং গার্ডারটি গাড়িটিকে চাপা দেয়। বেশ কয়েক বছর আগে

আমার স্কুলজীবনের বন্ধু মুজিবুর রহমান একটি জিপে সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে কলাবাগানে নিজ বাসায় আসছিলেন। এমন সময় সায়েন্স ল্যাবরেটরির কোনায় নির্মীয়মাণ ফুটওভার ব্রিজের একটি ঢালাই করা বিম পড়ে গিয়ে তার গাড়ির ওপর আঘাত হানে। মুজিবুর রহমানের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হয়। গাড়িটও চুরমার হয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে, এরকম দুর্ঘটনা অতীতেও হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা ট্র্যাজেডি হয়ে এসেছে ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য। কেন বিআরটি প্রকল্পে এমন ঘটনা ঘটল তা ভেবে নির্ণয় করা কঠিন। এরকম ভারী অবকাঠামো নির্মাণ করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তা কারও অজানা নয়। প্রশ্ন হলো, ব্যবহৃত ক্রেনটির শক্তি ভারী একটি গার্ডার উত্তোলনের জন্য যথাযথ ছিল কিনা? দ্বিতীয়ত, বিআরটির কাজ চলার সময় বিপজ্জনক পরিসর চিহ্নিত করা ছিল কিনা? আমরা দেখেছি, প্রতিবছর এদেশে শত শত প্রাণহানিকর দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির সদস্য হন বিভাগীয় কর্মকর্তারা। তাদের কয়টি তদন্ত প্রতিবেদন সরকার পেয়েছে এবং তাতে কাদের দায়ী করা হয়েছে, তা জনসমক্ষে আনা হয় না। ফলে ভুক্তভোগীরা বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

একটি সংবাদপত্রের নিজস্ব প্রতিবেদক জানিয়েছেন, গত সোমবার দুপুর ১২টার দিকে চকবাজারের দেবিদাসঘাট লেনে একটি চারতলা ভবনে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট সোয়া ২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। মৃত ব্যক্তিরা সবাই ভবনের নিচতলার বরিশাল হোটেলের কর্মচারী। রাতে কাজ করে হোটেলের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন তারা। ৬ হোটেল শ্রমিকের লাশ উদ্ধার হয়েছে। প্রতিবেদক লিখেছেন, ‘পুরান ঢাকায় একের পর এক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি ঘটছেই। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, থানা-পুলিশ, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসে। কিছু পদক্ষেপও তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বদলায় না।’ পুরান ঢাকায় ভয়াবহ সব আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে। মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। তদসত্ত্বেও সবকিছুই চলছে বিজনেস অ্যাজ ইয়ুজুয়াল। এগুলো ঘটছে সুশাসন না থাকায়। যদি এই সোনার দেশে সুশাসন থাকত, তাহলে আমরা মানবকল্যাণে অনেক দূর যেতে পারতাম।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন