নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য : তাইহোকু থেকে ফৈজাবাদ
jugantor
নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য : তাইহোকু থেকে ফৈজাবাদ

  সাকিব আনোয়ার  

১৮ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নেতাজির অন্তর্ধান দিবস আজ। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে অন্যতম প্রধান বিপ্লবী ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির প্রাক্কালে ভারত সরকার স্বীকৃত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকু (বর্তমান তাইপে) এরোড্রমে এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়।

কিন্তু ২০১৫-১৬ সালে ডিক্লাসিফাই হওয়া কিছু সরকারি ও গোয়েন্দা ফাইলে ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্টের পর নেতাজির রাশিয়ায় অবস্থান, এমনকি ভারতের মাটিতে ফিরে আসার বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এসব ফাইল থেকে জানা যায়, ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত নেতাজির পরিবারের সদস্যদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি ছিল।

নেতাজির অন্তর্ধানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যে কয়টি থিওরি পাওয়া যায় তার মধ্যে প্রধান তিনটি হলো-এক. উড়োজাহাজ ক্র্যাশ থিওরি; দুই. রাশিয়ায় স্তালিনের কারাগারে নির্যাতনে মৃত্যু; তিন. সন্ন্যাসী হয়ে ভারতে ফিরে আসা।

আজকের লেখাটি নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য ঘিরে। তাই এখানে নেতাজির মহিমান্বিত রাজনৈতিক ও বিপ্লবী জীবন নিয়ে আলোচনা করছি না। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার লক্ষ্যে নেতাজি এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ব্রিটিশদের নজরদারি এড়িয়ে বিহার, পেশোয়ার, আফগানিস্তান, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে জার্মানিতে পালিয়ে যান। ১৯৪৩ সালে তিনি সাবমেরিনে জাপান পৌঁছান। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব নেন এবং আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করেন। ১১টি দেশ এ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। আজাদ হিন্দ ফৌজ আরাকান, ইম্ফাল জয় করে কোহিমা পর্যন্ত অগ্রসর হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা আঘাত হানলে জাপান আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং নেতাজি তার আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে সিঙ্গাপুরে ফিরে আসেন। তিনি আত্মসমর্পণের বিষয়ে আলোচনার জন্য জাপানের টোকিওতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকু এরোড্রমে এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। বিমানটিতে নেতাজির সঙ্গে জাপানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা ছাড়াও তার এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমান ছিলেন। দুদিন পর নেতাজির মৃতদেহ দাহ করা হয় এবং চিতাভস্ম জাপানের টোকিওতে রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দিরে রাখা হয়। এটিই নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের স্বীকৃত উড়োজাহাজ ক্রাশ থিওরি।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। এর মাত্র ১২ দিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে জওহরলাল নেহেরুর উপস্থিতিতে শিকাগো ট্রিবিউনের একজন সাংবাদিক দাবি করেন, তার একজন সহকর্মী ১৯৪৫ সালের ২১ আগস্ট নেতাজিকে সায়গনে দেখেছেন। নেতাজির অন্তর্ধানের পর থেকেই এরকম বিভিন্ন দাবি উঠতে থাকে। নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নেহেরু সরকার ১৯৫৫ সালে শাহনেওয়াজ কমিটি এবং ইন্দিরা গান্ধী সরকার ১৯৭০ সালে খোসলা কমিশন নামে দুটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। দুটি কমিশনই নেতাজি উড়োজাহাজ ক্রাশে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে রায় দেয়। যদিও শাহনেওয়াজ কমিটির একজন সদস্য হিসাবে নেতাজির ভাই সুরেশ চন্দ্র বসু কমিশনের রিপোর্টে স্বাক্ষর না করে টোকিও ট্রায়ালের বিচারক ড. রাধাবিনোদ পালের নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। ক্ষমতায় আসার পর মোরারজি দেশাই দুটি কমিশনের রিপোর্টকেই নাকচ করে দেন এবং জানান, তাইপে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো নথি তার হাতে রয়েছে। পরে অবশ্য তিনি সেই নথির কথা চেপে যান। এরপর ১৯৯৯ সালে নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মনোজ কুমার মুখার্জির নেতৃত্বে মুখার্জি কমিশন গঠন করা হয়।

মুখার্জি কমিশনকে লেখা অফিসিয়াল চিঠিতে তাইওয়ান সরকার জানায়, ‘১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তো দূরের কথা, সারা বছরে কেবল তাইহোকুতে নয়, পুরো তাইওয়ানে কোনো উড়োজাহাজ ক্রাশ হয়নি। সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে যে উড়োজাহাজ ক্রাশ হয়েছিল, সেটি সংঘটিত হয় ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে।’ তাইওয়ানের কোনো হাসপাতাল লগবুকে নেতাজির চিকিৎসার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, এমনকি পাওয়া যায় না কোনো ডেথ সার্টিফিকেট। সেদিন তাইহোকুতে কানাকান্তা নামে একটি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু হয়। দুদিন পর অর্থাৎ ২০ আগস্ট কেবল একজন জাপানি সৈনিকের ক্রিমেটোরিয়াম পারমিটের তথ্য পাওয়া যায়, যার মৃত্যু হয়েছিল হৃদরোগে। সেই বোমারু বিমানে নেতাজি ও হাবিবুর রেহমানের সঙ্গী জাপানি সেনা অফিসারদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসার কোনো তথ্য, ডেথ সার্টিফিকেট, ক্রিমেটোরিয়াম রেজিস্টার কিংবা মৃতদেহ বা আহত অবস্থার কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। মুখার্জি কমিশন রায় দেয়, নেতাজি উড়োজাহাজ ক্রাশে মারা যাননি।

দ্বিতীয় থিওরিতে যারা বিশ্বাস করেন, তারা নেতাজি যে মাঞ্চুরিয়া হয়ে রাশিয়া পৌঁছেছিলেন, এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারলেও সেখানে নেতাজিকে হত্যা করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। ১৯৬১ সালে অর্দেন্দু সরকার নামে একজন ভারতীয় প্রকৌশলী মস্কোয় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে জানান, তার কোম্পানির একজন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার রাশিয়ার ট্রান্স-সাইবেরিয়ান এলাকায় স্তালিনের গুলাগে নেতাজিকে দেখেছিলেন। এ ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য তার ওপর চাপ দেওয়া হয়। ফলে তিনি আর কোনোদিন এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি মুখার্জি কমিশনের সামনে এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন। নেতাজি গবেষক পুরবী রায় রাশিয়া গিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেন, যেখানে স্পষ্ট ছিল যে নেতাজি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য চিত্ত বসুর হাতে নথিগুলো তুলে দেন। চিত্ত বসু নথিগুলো নিয়ে দিল্লি যাওয়ার পথে রাজধানী এক্সপ্রেসে রহস্যজনকভাবে মারা যান। সেই নথিগুলো আর পাওয়া যায়নি।

এরকম রহস্যজনক আরেকটি মৃত্যুর সঙ্গে নেতাজির যোগসূত্র পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেদিন রাতেই হোটেলে নিজ কক্ষে মারা যান লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। পরবর্তী সময়ে শাস্ত্রীজির স্ত্রী জানান, ‘মৃত্যুর আগে তিনি বাড়িতে কল করেন এবং জানান, তিনি একজন বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছেন, যার জন্য গোটা ভারতবর্ষ অপেক্ষা করছে। তিনি আরও বলেন, পরদিন দেশে ফিরে তিনি জাতিকে সেই চমকপ্রদ উপহার দেবেন।’ কিন্তু সেই রাতেই মারা যান তিনি। ষাটের দশকে গোটা ভারতবর্ষ নেতাজি ছাড়া আর কারও জন্য অপেক্ষায় ছিল, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। তবে কি লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নেতাজির সঙ্গে ১৯৬৬ সালে সাক্ষাৎ করেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত, ঠিক যেমন অমীমাংসিত শাস্ত্রীজির মৃত্যুরহস্য।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর নীল হয়ে যাওয়া মরদেহ দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তার মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়। অথচ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে দেশের প্রধানমন্ত্রীর এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও তার মরদেহের কোনো ময়নাতদন্ত না করে খুব দ্রুত সৎকার করা হয়। হোটেল রুম থেকে গায়েব হয়ে যায় শাস্ত্রীজির ডায়েরি। হারিয়ে যান সেই রাতে শাস্ত্রীজির সেবার দায়িত্বে থাকা খানসামা। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর তদন্তে গঠিত সংসদীয় কমিটির সাক্ষী তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং সচিব দুজনই সড়ক দুর্ঘটনায় আকস্মিকভাবে মারা যান।

এবার নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের তৃতীয় তত্ত্বের দিকে আলোকপাত করা যাক। সন্ন্যাসীর বেশে সুভাষ বোসের ফিরে আসা নিয়ে পঞ্চাশের দশকে শৌলমারি আশ্রম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি ওঠে। মুখার্জি কমিশনের সামনে আরেকজন সাধু বাবার তথ্য উপস্থাপিত হয়। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে রামভবন নামে একটি বাড়িতে একজন সন্ন্যাসীর মৃত্যু হয়, যিনি মহাকাল, ভগবানজিসহ বিভিন্ন নামে তার অনুরাগীদের মধ্যে পরিচিত ছিলেন। তিনি সবসময় পর্দার আড়ালে থাকতেন এবং সাধারণত কারও সঙ্গে দেখা করতেন না। ভগবানজি জীবিত থাকাকালীনও তার দর্শন পাওয়া অনেকে দাবি করেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। ভগবানজির মৃত্যুর পর এই দাবি আরও প্রবল হয়ে ওঠে। নেতাজির ভাইঝি ললিতা বসু ১৯৮৬ সালের প্রথমদিকে ফৈজাবাদের রাম ভবনে যান। সেখানে গিয়ে ঘরের ভেতরে থাকা ভগবানজির ব্যবহৃত সামগ্রী এবং চিঠি, নথি ও অন্যান্য জিনিসপত্র দেখে নিশ্চিত হন সেগুলো তার রাঙা কাকা অর্থাৎ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রাম ভবনে থাকা ভগবানজির সব জিনিসপত্র ফৈজাবাদের ট্রেজারি বিভাগে সংরক্ষণ করা হয়।

আদালতের রায়ে মুখার্জি কমিশনের সামনে ফৈজাবাদ জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষিত ভগবানজির ঘর থেকে উদ্ধার করা জিনিসপত্রের ট্রাংকগুলো খোলা হয়। সেখানে পাওয়া যায় নেতাজির পিতা-মাতার বাঁধানো ছবি, ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নেতাজির ছবি, সাবেক বিপ্লবী ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অনেক সদস্যের ছবি এবং পেছনে আঁকিবুঁকি করা তাদের ডাকনাম। আরও পাওয়া যায় গোল ফ্রেমের চশমা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ফ্ল্যাশ লাইট, জার্মান বাইনোকুলার, রোলেক্স ঘড়ি, পোর্টেবল বেলজিয়ান টাইপরাইটার, জাপানিজ ওয়াটার ফিল্টার। পাওয়া যায় পবিত্রমোহন রায়, লীলা রায়, সুনীল দাস, অনীল দাস, আশুতোষ কালী, বিশ্বরুপ রায়সহ নেতাজির পূর্বপরিচিত সাবেক বিপ্লবী, কমরেড, আইএনএ’র সদস্যদের লেখা অসংখ্য চিঠি-যে চিঠিগুলোতে তারা ভগবানজিকে পরোক্ষভাবে নেতাজি হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। নেতাজির পুরোনো বন্ধু দিলীপ রায়কে লেখা চিঠিতে লীলা রায় বলেছেন, নেতাজি বেঁচে আছেন এবং তিনি তার সঙ্গে দেখা করেছেন। এই চিঠিগুলোর মধ্যে ছিল আরেকটি আশ্চর্য চিঠি-সেক্রেটারি নাথালি নোলসের স্বাক্ষর করা যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিসের অফিসিয়াল লেটার। সেখানে আরও পাওয়া যায় নেতাজির দাদা সুরেশ বসুকে পাঠানো খোসলা কমিশনের সমনের অরিজিনাল কপি। এছাড়া পাওয়া গিয়েছিল শাহনেওয়াজ কমিটির একজন সদস্য হিসাবে কমিশনের রায়কে খণ্ডন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে পাঠানো অফিসিয়াল নোট, যার উপরে সুরেশ বসুর স্ত্রী অর্থাৎ নেতাজির বউদির নিজ হাতে লেখা দুটি লাইন-

‘পরম কল্যাণীয় দেবর, চিরজীবেষু। প্রাণাধিক স্নেহ আশীর্বাদ।’

মুখার্জি কমিশন এবং পরবর্তীকালে সাহাই কমিশন একথা স্বীকার করেছিল যে, ভগবানজির গলার স্বরের সঙ্গে নেতাজির গলার স্বরের মিল ছিল এবং উভয়েই বাঙালি ছিলেন। নেতাজি ও ভগবানজির হাতের লেখা এক নয় বলে সরকারি রিপোর্ট দেওয়া হলেও বিশ্ববিখ্যাত ফরেনসিক হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্ট কার্ল ব্যাগেট সন্দেহাতীতভাবে দুটি হাতের লেখা একজনের বলে সিদ্ধান্ত দেন। ভগবানজির ঘর থেকে পাওয়া দাঁতের সঙ্গে নেতাজির (নেতাজির পরিবারের সদস্যদের ব্লাড স্যাম্পলের মাধ্যমে) ডিএনএ ম্যাচিং টেস্ট করা হয় মুখার্জি কমিশনের নির্দেশে। ডিএনএ ম্যাচ করেনি বলে কমিশনকে রিপোর্ট দেয় সিএফএসএল কলকাতা (সরকারি ল্যাব)। অদ্ভুত বিষয় হলো, এর সঙ্গে দেওয়া হয়নি ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ইলেক্ট্রোফেরোগ্রাম রিপোর্ট। পরবর্তীকালে ভারতের কেন্দ্রীয় ল্যাব সিএফএসএল জানায়, কলকাতার সরকারি ল্যাবে ভগবানজির দাঁতের কোনো ইলেক্ট্রোফেরোগ্রাম রিপোর্টই নেই। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সেই রিপোর্ট গায়েব করে ফেলেছে অথবা কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই পূর্বনির্ধারিত রিপোর্ট কমিশনের সামনে পেশ করা হয়েছে। ভগবানজি বা গুমনামি বাবার সঙ্গে নেতাজির যোগসূত্র নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আরও সহস্র তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

২৫ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন। প্রতিবছর ওইদিনই ভগবানজির জন্মোৎসব পালন হতো। আসত অনেক চিঠি, উপহার। উপস্থিত হতেন নেতাজির বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহচররা। ভগবানজি মারা যান ১৯৮৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদের রাম ভবনে। সরযু নদীর তীরে গুপ্তার ঘাটে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মাত্র ১৩ জন মানুষ সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৮৫ সালের ২৫ অক্টোবর স্থানীয় হিন্দি দৈনিক ‘নয়া লোগ’ পত্রিকায় ছাপা হয়-‘ফৈজাবাদে অজ্ঞাতবাসে থাকা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আর নেই?’

ইংরেজি একটি প্রবাদ দিয়ে লেখাটা শেষ করছি-‘ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন’।

সাকিব আনোয়ার : অ্যাক্টিভিস্ট, প্রাবন্ধিক

নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য : তাইহোকু থেকে ফৈজাবাদ

 সাকিব আনোয়ার 
১৮ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নেতাজির অন্তর্ধান দিবস আজ। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামে অন্যতম প্রধান বিপ্লবী ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির প্রাক্কালে ভারত সরকার স্বীকৃত ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকু (বর্তমান তাইপে) এরোড্রমে এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়।

কিন্তু ২০১৫-১৬ সালে ডিক্লাসিফাই হওয়া কিছু সরকারি ও গোয়েন্দা ফাইলে ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্টের পর নেতাজির রাশিয়ায় অবস্থান, এমনকি ভারতের মাটিতে ফিরে আসার বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়েছে। এসব ফাইল থেকে জানা যায়, ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত নেতাজির পরিবারের সদস্যদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি ছিল।

নেতাজির অন্তর্ধানের বিষয়ে এখন পর্যন্ত যে কয়টি থিওরি পাওয়া যায় তার মধ্যে প্রধান তিনটি হলো-এক. উড়োজাহাজ ক্র্যাশ থিওরি; দুই. রাশিয়ায় স্তালিনের কারাগারে নির্যাতনে মৃত্যু; তিন. সন্ন্যাসী হয়ে ভারতে ফিরে আসা।

আজকের লেখাটি নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য ঘিরে। তাই এখানে নেতাজির মহিমান্বিত রাজনৈতিক ও বিপ্লবী জীবন নিয়ে আলোচনা করছি না। সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার লক্ষ্যে নেতাজি এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ব্রিটিশদের নজরদারি এড়িয়ে বিহার, পেশোয়ার, আফগানিস্তান, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে জার্মানিতে পালিয়ে যান। ১৯৪৩ সালে তিনি সাবমেরিনে জাপান পৌঁছান। তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের দায়িত্ব নেন এবং আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করেন। ১১টি দেশ এ সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। আজাদ হিন্দ ফৌজ আরাকান, ইম্ফাল জয় করে কোহিমা পর্যন্ত অগ্রসর হয়। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা আঘাত হানলে জাপান আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং নেতাজি তার আজাদ হিন্দ ফৌজ নিয়ে সিঙ্গাপুরে ফিরে আসেন। তিনি আত্মসমর্পণের বিষয়ে আলোচনার জন্য জাপানের টোকিওতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তাইওয়ানের তাইহোকু এরোড্রমে এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। বিমানটিতে নেতাজির সঙ্গে জাপানি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা ছাড়াও তার এডিসি কর্নেল হাবিবুর রহমান ছিলেন। দুদিন পর নেতাজির মৃতদেহ দাহ করা হয় এবং চিতাভস্ম জাপানের টোকিওতে রেনকোজি বৌদ্ধ মন্দিরে রাখা হয়। এটিই নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের স্বীকৃত উড়োজাহাজ ক্রাশ থিওরি।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে। এর মাত্র ১২ দিন পর এক সংবাদ সম্মেলনে জওহরলাল নেহেরুর উপস্থিতিতে শিকাগো ট্রিবিউনের একজন সাংবাদিক দাবি করেন, তার একজন সহকর্মী ১৯৪৫ সালের ২১ আগস্ট নেতাজিকে সায়গনে দেখেছেন। নেতাজির অন্তর্ধানের পর থেকেই এরকম বিভিন্ন দাবি উঠতে থাকে। নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নেহেরু সরকার ১৯৫৫ সালে শাহনেওয়াজ কমিটি এবং ইন্দিরা গান্ধী সরকার ১৯৭০ সালে খোসলা কমিশন নামে দুটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। দুটি কমিশনই নেতাজি উড়োজাহাজ ক্রাশে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে রায় দেয়। যদিও শাহনেওয়াজ কমিটির একজন সদস্য হিসাবে নেতাজির ভাই সুরেশ চন্দ্র বসু কমিশনের রিপোর্টে স্বাক্ষর না করে টোকিও ট্রায়ালের বিচারক ড. রাধাবিনোদ পালের নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। ক্ষমতায় আসার পর মোরারজি দেশাই দুটি কমিশনের রিপোর্টকেই নাকচ করে দেন এবং জানান, তাইপে বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করার মতো নথি তার হাতে রয়েছে। পরে অবশ্য তিনি সেই নথির কথা চেপে যান। এরপর ১৯৯৯ সালে নেতাজির অন্তর্ধান রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মনোজ কুমার মুখার্জির নেতৃত্বে মুখার্জি কমিশন গঠন করা হয়।

মুখার্জি কমিশনকে লেখা অফিসিয়াল চিঠিতে তাইওয়ান সরকার জানায়, ‘১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তো দূরের কথা, সারা বছরে কেবল তাইহোকুতে নয়, পুরো তাইওয়ানে কোনো উড়োজাহাজ ক্রাশ হয়নি। সবচেয়ে কাছাকাছি সময়ে যে উড়োজাহাজ ক্রাশ হয়েছিল, সেটি সংঘটিত হয় ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বরে।’ তাইওয়ানের কোনো হাসপাতাল লগবুকে নেতাজির চিকিৎসার কোনো তথ্য পাওয়া যায় না, এমনকি পাওয়া যায় না কোনো ডেথ সার্টিফিকেট। সেদিন তাইহোকুতে কানাকান্তা নামে একটি ডেথ সার্টিফিকেট ইস্যু হয়। দুদিন পর অর্থাৎ ২০ আগস্ট কেবল একজন জাপানি সৈনিকের ক্রিমেটোরিয়াম পারমিটের তথ্য পাওয়া যায়, যার মৃত্যু হয়েছিল হৃদরোগে। সেই বোমারু বিমানে নেতাজি ও হাবিবুর রেহমানের সঙ্গী জাপানি সেনা অফিসারদের ক্ষেত্রেও চিকিৎসার কোনো তথ্য, ডেথ সার্টিফিকেট, ক্রিমেটোরিয়াম রেজিস্টার কিংবা মৃতদেহ বা আহত অবস্থার কোনো ছবি পাওয়া যায়নি। মুখার্জি কমিশন রায় দেয়, নেতাজি উড়োজাহাজ ক্রাশে মারা যাননি।

দ্বিতীয় থিওরিতে যারা বিশ্বাস করেন, তারা নেতাজি যে মাঞ্চুরিয়া হয়ে রাশিয়া পৌঁছেছিলেন, এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারলেও সেখানে নেতাজিকে হত্যা করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। ১৯৬১ সালে অর্দেন্দু সরকার নামে একজন ভারতীয় প্রকৌশলী মস্কোয় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে জানান, তার কোম্পানির একজন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার রাশিয়ার ট্রান্স-সাইবেরিয়ান এলাকায় স্তালিনের গুলাগে নেতাজিকে দেখেছিলেন। এ ঘটনা প্রকাশ না করার জন্য তার ওপর চাপ দেওয়া হয়। ফলে তিনি আর কোনোদিন এ বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি মুখার্জি কমিশনের সামনে এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দেন। নেতাজি গবেষক পুরবী রায় রাশিয়া গিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি সংগ্রহ করেন, যেখানে স্পষ্ট ছিল যে নেতাজি ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তিনি তৎকালীন সংসদ সদস্য চিত্ত বসুর হাতে নথিগুলো তুলে দেন। চিত্ত বসু নথিগুলো নিয়ে দিল্লি যাওয়ার পথে রাজধানী এক্সপ্রেসে রহস্যজনকভাবে মারা যান। সেই নথিগুলো আর পাওয়া যায়নি।

এরকম রহস্যজনক আরেকটি মৃত্যুর সঙ্গে নেতাজির যোগসূত্র পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর ১৯৬৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সেদিন রাতেই হোটেলে নিজ কক্ষে মারা যান লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। পরবর্তী সময়ে শাস্ত্রীজির স্ত্রী জানান, ‘মৃত্যুর আগে তিনি বাড়িতে কল করেন এবং জানান, তিনি একজন বিশেষ ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেছেন, যার জন্য গোটা ভারতবর্ষ অপেক্ষা করছে। তিনি আরও বলেন, পরদিন দেশে ফিরে তিনি জাতিকে সেই চমকপ্রদ উপহার দেবেন।’ কিন্তু সেই রাতেই মারা যান তিনি। ষাটের দশকে গোটা ভারতবর্ষ নেতাজি ছাড়া আর কারও জন্য অপেক্ষায় ছিল, এমনটা ভাবার সুযোগ নেই। তবে কি লাল বাহাদুর শাস্ত্রী নেতাজির সঙ্গে ১৯৬৬ সালে সাক্ষাৎ করেছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত, ঠিক যেমন অমীমাংসিত শাস্ত্রীজির মৃত্যুরহস্য।

লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর নীল হয়ে যাওয়া মরদেহ দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, তার মৃত্যু হয়েছে বিষক্রিয়ায়। অথচ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে দেশের প্রধানমন্ত্রীর এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও তার মরদেহের কোনো ময়নাতদন্ত না করে খুব দ্রুত সৎকার করা হয়। হোটেল রুম থেকে গায়েব হয়ে যায় শাস্ত্রীজির ডায়েরি। হারিয়ে যান সেই রাতে শাস্ত্রীজির সেবার দায়িত্বে থাকা খানসামা। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর তদন্তে গঠিত সংসদীয় কমিটির সাক্ষী তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং সচিব দুজনই সড়ক দুর্ঘটনায় আকস্মিকভাবে মারা যান।

এবার নেতাজির অন্তর্ধান রহস্যের তৃতীয় তত্ত্বের দিকে আলোকপাত করা যাক। সন্ন্যাসীর বেশে সুভাষ বোসের ফিরে আসা নিয়ে পঞ্চাশের দশকে শৌলমারি আশ্রম থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি ওঠে। মুখার্জি কমিশনের সামনে আরেকজন সাধু বাবার তথ্য উপস্থাপিত হয়। ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বরে উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদে রামভবন নামে একটি বাড়িতে একজন সন্ন্যাসীর মৃত্যু হয়, যিনি মহাকাল, ভগবানজিসহ বিভিন্ন নামে তার অনুরাগীদের মধ্যে পরিচিত ছিলেন। তিনি সবসময় পর্দার আড়ালে থাকতেন এবং সাধারণত কারও সঙ্গে দেখা করতেন না। ভগবানজি জীবিত থাকাকালীনও তার দর্শন পাওয়া অনেকে দাবি করেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। ভগবানজির মৃত্যুর পর এই দাবি আরও প্রবল হয়ে ওঠে। নেতাজির ভাইঝি ললিতা বসু ১৯৮৬ সালের প্রথমদিকে ফৈজাবাদের রাম ভবনে যান। সেখানে গিয়ে ঘরের ভেতরে থাকা ভগবানজির ব্যবহৃত সামগ্রী এবং চিঠি, নথি ও অন্যান্য জিনিসপত্র দেখে নিশ্চিত হন সেগুলো তার রাঙা কাকা অর্থাৎ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী রাম ভবনে থাকা ভগবানজির সব জিনিসপত্র ফৈজাবাদের ট্রেজারি বিভাগে সংরক্ষণ করা হয়।

আদালতের রায়ে মুখার্জি কমিশনের সামনে ফৈজাবাদ জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষিত ভগবানজির ঘর থেকে উদ্ধার করা জিনিসপত্রের ট্রাংকগুলো খোলা হয়। সেখানে পাওয়া যায় নেতাজির পিতা-মাতার বাঁধানো ছবি, ভাই-বোনসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে নেতাজির ছবি, সাবেক বিপ্লবী ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অনেক সদস্যের ছবি এবং পেছনে আঁকিবুঁকি করা তাদের ডাকনাম। আরও পাওয়া যায় গোল ফ্রেমের চশমা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত ফ্ল্যাশ লাইট, জার্মান বাইনোকুলার, রোলেক্স ঘড়ি, পোর্টেবল বেলজিয়ান টাইপরাইটার, জাপানিজ ওয়াটার ফিল্টার। পাওয়া যায় পবিত্রমোহন রায়, লীলা রায়, সুনীল দাস, অনীল দাস, আশুতোষ কালী, বিশ্বরুপ রায়সহ নেতাজির পূর্বপরিচিত সাবেক বিপ্লবী, কমরেড, আইএনএ’র সদস্যদের লেখা অসংখ্য চিঠি-যে চিঠিগুলোতে তারা ভগবানজিকে পরোক্ষভাবে নেতাজি হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। নেতাজির পুরোনো বন্ধু দিলীপ রায়কে লেখা চিঠিতে লীলা রায় বলেছেন, নেতাজি বেঁচে আছেন এবং তিনি তার সঙ্গে দেখা করেছেন। এই চিঠিগুলোর মধ্যে ছিল আরেকটি আশ্চর্য চিঠি-সেক্রেটারি নাথালি নোলসের স্বাক্ষর করা যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন সার্ভিসের অফিসিয়াল লেটার। সেখানে আরও পাওয়া যায় নেতাজির দাদা সুরেশ বসুকে পাঠানো খোসলা কমিশনের সমনের অরিজিনাল কপি। এছাড়া পাওয়া গিয়েছিল শাহনেওয়াজ কমিটির একজন সদস্য হিসাবে কমিশনের রায়কে খণ্ডন করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে পাঠানো অফিসিয়াল নোট, যার উপরে সুরেশ বসুর স্ত্রী অর্থাৎ নেতাজির বউদির নিজ হাতে লেখা দুটি লাইন-

‘পরম কল্যাণীয় দেবর, চিরজীবেষু। প্রাণাধিক স্নেহ আশীর্বাদ।’

মুখার্জি কমিশন এবং পরবর্তীকালে সাহাই কমিশন একথা স্বীকার করেছিল যে, ভগবানজির গলার স্বরের সঙ্গে নেতাজির গলার স্বরের মিল ছিল এবং উভয়েই বাঙালি ছিলেন। নেতাজি ও ভগবানজির হাতের লেখা এক নয় বলে সরকারি রিপোর্ট দেওয়া হলেও বিশ্ববিখ্যাত ফরেনসিক হ্যান্ড রাইটিং এক্সপার্ট কার্ল ব্যাগেট সন্দেহাতীতভাবে দুটি হাতের লেখা একজনের বলে সিদ্ধান্ত দেন। ভগবানজির ঘর থেকে পাওয়া দাঁতের সঙ্গে নেতাজির (নেতাজির পরিবারের সদস্যদের ব্লাড স্যাম্পলের মাধ্যমে) ডিএনএ ম্যাচিং টেস্ট করা হয় মুখার্জি কমিশনের নির্দেশে। ডিএনএ ম্যাচ করেনি বলে কমিশনকে রিপোর্ট দেয় সিএফএসএল কলকাতা (সরকারি ল্যাব)। অদ্ভুত বিষয় হলো, এর সঙ্গে দেওয়া হয়নি ডিএনএ সিকোয়েন্সিং ইলেক্ট্রোফেরোগ্রাম রিপোর্ট। পরবর্তীকালে ভারতের কেন্দ্রীয় ল্যাব সিএফএসএল জানায়, কলকাতার সরকারি ল্যাবে ভগবানজির দাঁতের কোনো ইলেক্ট্রোফেরোগ্রাম রিপোর্টই নেই। কোনো এক অদৃশ্য শক্তি সেই রিপোর্ট গায়েব করে ফেলেছে অথবা কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই পূর্বনির্ধারিত রিপোর্ট কমিশনের সামনে পেশ করা হয়েছে। ভগবানজি বা গুমনামি বাবার সঙ্গে নেতাজির যোগসূত্র নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে আরও সহস্র তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।

২৫ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন। প্রতিবছর ওইদিনই ভগবানজির জন্মোৎসব পালন হতো। আসত অনেক চিঠি, উপহার। উপস্থিত হতেন নেতাজির বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহচররা। ভগবানজি মারা যান ১৯৮৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদের রাম ভবনে। সরযু নদীর তীরে গুপ্তার ঘাটে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। মাত্র ১৩ জন মানুষ সেদিন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৮৫ সালের ২৫ অক্টোবর স্থানীয় হিন্দি দৈনিক ‘নয়া লোগ’ পত্রিকায় ছাপা হয়-‘ফৈজাবাদে অজ্ঞাতবাসে থাকা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস আর নেই?’

ইংরেজি একটি প্রবাদ দিয়ে লেখাটা শেষ করছি-‘ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন’।

সাকিব আনোয়ার : অ্যাক্টিভিস্ট, প্রাবন্ধিক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন