ভোলা কি একটা টেস্ট কেস?
jugantor
চেতনায় বুদ্বুদ
ভোলা কি একটা টেস্ট কেস?

  বদিউর রহমান  

১৯ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যারা কলাম লিখতে চান, কিংবা নিজের পছন্দের দলের পক্ষে সাফাই গেয়ে একটু নিজেকে কোনো উদ্দেশ্যে একটু ওপরে উঠাতে চান, তাদের জন্য এখন বাতাসে কেবল বিষয়ের ছড়াছড়ি। বরং আপনি বেকায়দায় পড়ে যাবেন, কোনটা ফেলে কোনটায় যাবেন।

কবিতা লিখবেন, ছড়া লিখবেন-তাতেও কাঁচামালের এখন অভাব নেই-দ্রব্যমূল্য, তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-তাইওয়ান-আমেরিকা ইস্যু, র‌্যাবের কজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আর জাতিসংঘের দাওয়াত,...লোডশেডিং তো আছেই।

লোডশেডিং নিয়ে আমার ছড়া-লোডশেডিংয়ের আলোতে,/ আমরা আছি ভালোতে,/ খালি গায়ে রাস্তাতে,/ আঁধার কিনি সস্তাতে,/ টাকা জমাই বস্তাতে,/ হয়না আর পস্তাতে,/ লোডশেডিং-এর আলোতে...। আর দ্রব্যমূল্য? এটা নিয়ে আমি ভাবিই না, যখন যা হয় হবে, আমি মাধ্যমিকের পাটিগণিতের ওই অঙ্কে আস্থা রাখি-এটা-ওটার দাম এত বাড়লে তিনি খরচ কত শতাংশ কমালে বাড়তি ব্যয় হবে না।

ড. ফখরুদ্দীনের সময়ে এক পত্রিকায় তাকে চালের বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে শুধু মাথাটা বাইরে রেখে মজাদার একটা ক্যাপশন দেওয়া হয়েছিল। আমার স্ত্রী তো তখন বাজার-সরকারের পদ থেকে ইস্তফাই দিয়ে ফেলেছিলেন। অতএব আমি অভ্যস্ত, আমার কোনো হা-হুতাশ নেই, কম খাব, অনেক কিছু না খেলেও চলে, দুবছর যে ইলিশ মাছ কিনি না তাতে কি চলছে না?

মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য হাঁটুর কাছে ছিঁড়ে যাওয়া দুটি ফুলপ্যান্টকে কেটে দুটি হাফপ্যান্ট বানিয়ে নিলাম মোট ৪০ টাকায়, আর পেরেক গেঁথে রাবারের স্যান্ডেল ঠিক করেই তা চলে যাচ্ছে এক বছর। কোনো অসুবিধা তো হচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশ্রী কাণ্ডই বড় ভাবায়। এই যেমন সেদিনকার ভোলা-দুজন জীবন্ত মানুষ আমাদের বন্ধু পুলিশের গুলিতে চিরবিদায় নিলেন। ঘটনা কি গুলির পর্যায়ে ছিল?

ভোলা আমার জীবনের এক চমৎকার স্মৃতি। কথাবার্তায়, চাল-চলনে, ভাষায় তারা আর আমরা বলা চলে নোয়াখাইল্যাই। শুনেছি, আমাদের আদি নোয়াখাইল্যারাই ভোলার বড় দখলে কয়েক প্রজন্ম আগে থেকে। আমার জীবনের প্রথম স্মরণীয় এক চাকরিও এই ভোলার চরফ্যাশন কলেজে-সেই ১৯৭৪-৭৫।

কী জামাই আদরেই না অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম সাহেব এবং অধ্যাপক জহির সাহেব সম্মান পাশ করার পরই হল থেকে খুঁজে ইংরেজির অধ্যাপক করে নিয়ে গেলেন! নজরুল স্যার পরে নিউমার্কেটে নিয়ে আমার সঙ্গে একটা ছবি উঠালেন। বললেন, আমি মরে যাব; কিন্তু এ ছবিটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমার আত্মজীবনী ‘ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয়’ বইটিতে স্যারের সঙ্গের সে ছবি আমাকে ধন্য করেছে। তবে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ওই চরফ্যাশনেই দেখেছিলাম।

কীভাবে কুকুর থেকে খাবার কেড়ে নিয়েছে কংকালসদৃশ মানুষ তা যেমন দেখেছি, রক্ষীবাহিনী কীভাবে পাশবিক নির্যাতন করত তাও রক্ষীবাহিনীর লিডার দেখিয়েছিলেন। এখন দ্রব্যমূল্য যতই বাড়ুক, আমরা কত ভালো আছি-আল্লাহর লাখো শুকরিয়া। অভাব থাকলেও মানুষ না খেয়ে যেমন নেই, তেমনি হা-হুতাশও নেই এখনো। আমার কাছে আর্থিক পতনটাকে এখনো সাময়িক মনে হয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা অবশ্যই উতরে যাব ইনশাল্লাহ। কিন্তু ভোলাতে যে দুটি তাজা প্রাণ অযথা চলে গেল বলা চলে, এটা কি আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটা টেস্ট কেস হয়ে গেল?

আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে বেশ পটু, বিরোধী দলে থাকলে তো এ দল আরও বেশি দক্ষ হয়। পুলিশের পিটুনি খেয়েও মারদাঙ্গা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের জুড়ি নেই। হালে বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো রাস্তা গরম করতে বেশ গরম গরম বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিল, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের পতন এবার যেন ঘটিয়েই থামবে। সরকার নাকি একেবারে খাদের কিনারে, প্রয়োজন শুধু একটু ধাক্কার।

আমি জানি না, সে ধাক্কা সৃষ্টি করতেই তারা সারা দেশে একটা বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছিল কিনা। ফল কী হলো-যাত্রাতেই রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি। এখন খবর হলো, বিএনপি আন্দোলনে থাকবে, তবে এখনই বড় কর্মসূচি নয়। দুজনের মৃত্যুতেই কি বিএনপি কিছুটা টের পেয়ে গেল যে, সামনে আরও কী হতে পারে! তাহলে আন্দোলন আর জমবে কীভাবে? বিএনপি কি সরকারের নার্ভ টেস্ট করতেই আন্দোলনের একটা চাঙ্গাভাব দেখাতে চেয়েছিল? তা না হলে ভোলাতে পরের দিনের হরতালও অর্ধবেলায় শেষ করে ফেলল কেন?

বিএনপি কি জানে না যে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপি সরকারের মতো ভীরুভাবে কোনো ইস্যু মেনে নেয় না? প্রধানমন্ত্রী যতই বলুন, শান্তিপূর্ণ কোনো আন্দোলনে/মিছিলে কিংবা ঘেরাওয়ে সরকার কোনো বাধা দেবে না, বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলে চা খাওয়াবে-এটার স্পিরিট যদি বিএনপি না বোঝে তাহলে তো ভোলা দিয়েই বুঝিয়ে দিতে হলো, নাকি?

বিএনপি কি ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’-এ প্রবাদটাও মনে রাখেনি? নাকি তারা দেখতে চেয়েছে, দেখি কী হয়, সরকার কী করে! তাহলে এখন তো দেখাটা হয়ে গেল।

আমার কখনো মনে হয় না যে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে সামান্যতম স্পেসও দেবে। সরকার যাত্রাতেই বিএনপির আন্দোলন ধূলিসাৎ করে দিতে বদ্ধপরিকর-এটা ভোলাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল। নচেৎ পত্রপত্রিকায় যা খবর আমরা দেখলাম, তাতে তো এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে পুলিশকে এভাবে গুলি করে ফেলতে হবে। তাহলে ব্যাখ্যাটা কী দাঁড়ায়?

ব্যাখ্যাটা দাঁড়াতে পারে এমন যে, অংকুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া শ্রেয়। ভোলাকে যদি আমরা উভয় দলের পরবর্তী পদক্ষেপের টেস্ট কেস হিসাবে বিবেচনা করি, তাহলে লাভ-ক্ষতির হিসাবে, যত অনৈতিকই হোক না কেন, সরকার জবরদস্তিতে, শক্তিতে এগিয়ে গেল। ভোলার ঘটনায় বড় মজাটা হলো, বিএনপির প্রতিপক্ষ কিন্তু আওয়ামী লীগ হয়নি, হয়েছে পুলিশ। পুলিশ তো আইনের শাসনের প্রতিভূ, অতএব পুলিশকে সরকারের ঠেঙানো-বাহিনী বলবেন কীভাবে?

পুলিশ যা করেছে তা তো আইনের শাসন সুরক্ষায় করেছে, জনগণের জানমাল রক্ষায় দেশপ্রেমিক পুলিশের এটা যে এক গুরুদায়িত্ব। তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শাহবাগে তো প্রতিবাদকারীদের দাঁড়াতেই দেয়নি, পিটিয়েছে। দেবে কেন? সরকার এত এত উন্নয়ন করে দিচ্ছে, পদ্মা সেতু দিয়েছে, মেট্রোরেল এ বছরেই চালু করে দেবে, কর্ণফুলী টানেল তো আমাদের ‘জাপান’ বানিয়ে দেবে-তারপরও ‘সামান্য’ মূল্যবৃদ্ধিতে এত আন্দোলন হবে কেন? সত্যিই তো, মানুষ এত অকৃতজ্ঞ হলে কি সরকারের ধৈর্য থাকে? অতএব, পুলিশের ডান্ডা করে দেবে ঠান্ডা! ডান্ডায় না হলে কূল্লে-খালাস, গুলি; এবার বাছাধন আন্দোলন করত দেখি!

সরকারের এমনতরো অসহিষ্ণুতা আমাদের কেন জানি ভালো লাগছে না। সরকার কি মনোকষ্টে আছে যে মুজিব শতবর্ষটা মনমতো করতে পারল না, কারণ করোনা এসে গেল; পদ্মা সেতুর মহা ধুমধাম শেষ না হতেই বিদ্যুতের জ্বালা, তেলের জ্বালা, দ্রব্যমূল্যের জ্বালাতন; এসব দীর্ঘায়িত হলে মেট্রোরেলের মহোৎসব হবে কীভাবে? আমরা তো পাশে আছি, আওয়ামী লীগের অস্বস্তির কারণ তো দেখি না, সুবিধাবাদী মিত্রদের পাশে না থাকাই ভালো। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের কাছে কলাটা-মুলাটার জন্য কত দল যে দৌড়াবে তা সময়ে দেখা যাবে।

পত্রপত্রিকায় দেখা গেল ‘গৃহপালিত’ এক বিরোধী দলের নেতাসহ, যিনি আওয়ামী লীগের ঐকমত্যের সরকারেও হাসিনার দয়া নিয়েছেন, কী একটা ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নাকি করেছেন অচেনা-অজানা সাত দল মিলে। তাদের মাঠের কর্মসূচি সরকার কীভাবে দেখবে দেখা যাক। তবে আমরা বলব, ভোলাকে আওয়ামী লীগ-বিএনপির টেস্ট কেস হিসাবে নিলেও সরকারের ধৈর্যের প্রয়োজন, অযথা গুলি চালানোর মধ্যে কিংবা পুলিশকে সরকারের পক্ষে পেটোয়াবাহিনী করার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। আওয়ামী লীগকে পেটানোর কথা নিশ্চয় আওয়ামী লীগ ভুলে যায়নি, অতএব পেটোয়া পুলিশকে প্রশ্রয় না দেওয়াই ভবিষ্যতের জন্য বেহেতর।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

চেতনায় বুদ্বুদ

ভোলা কি একটা টেস্ট কেস?

 বদিউর রহমান 
১৯ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যারা কলাম লিখতে চান, কিংবা নিজের পছন্দের দলের পক্ষে সাফাই গেয়ে একটু নিজেকে কোনো উদ্দেশ্যে একটু ওপরে উঠাতে চান, তাদের জন্য এখন বাতাসে কেবল বিষয়ের ছড়াছড়ি। বরং আপনি বেকায়দায় পড়ে যাবেন, কোনটা ফেলে কোনটায় যাবেন।

কবিতা লিখবেন, ছড়া লিখবেন-তাতেও কাঁচামালের এখন অভাব নেই-দ্রব্যমূল্য, তেলের দাম, মূল্যস্ফীতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, চীন-তাইওয়ান-আমেরিকা ইস্যু, র‌্যাবের কজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আর জাতিসংঘের দাওয়াত,...লোডশেডিং তো আছেই।

লোডশেডিং নিয়ে আমার ছড়া-লোডশেডিংয়ের আলোতে,/ আমরা আছি ভালোতে,/ খালি গায়ে রাস্তাতে,/ আঁধার কিনি সস্তাতে,/ টাকা জমাই বস্তাতে,/ হয়না আর পস্তাতে,/ লোডশেডিং-এর আলোতে...। আর দ্রব্যমূল্য? এটা নিয়ে আমি ভাবিই না, যখন যা হয় হবে, আমি মাধ্যমিকের পাটিগণিতের ওই অঙ্কে আস্থা রাখি-এটা-ওটার দাম এত বাড়লে তিনি খরচ কত শতাংশ কমালে বাড়তি ব্যয় হবে না।

ড. ফখরুদ্দীনের সময়ে এক পত্রিকায় তাকে চালের বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলে শুধু মাথাটা বাইরে রেখে মজাদার একটা ক্যাপশন দেওয়া হয়েছিল। আমার স্ত্রী তো তখন বাজার-সরকারের পদ থেকে ইস্তফাই দিয়ে ফেলেছিলেন। অতএব আমি অভ্যস্ত, আমার কোনো হা-হুতাশ নেই, কম খাব, অনেক কিছু না খেলেও চলে, দুবছর যে ইলিশ মাছ কিনি না তাতে কি চলছে না?

মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য হাঁটুর কাছে ছিঁড়ে যাওয়া দুটি ফুলপ্যান্টকে কেটে দুটি হাফপ্যান্ট বানিয়ে নিলাম মোট ৪০ টাকায়, আর পেরেক গেঁথে রাবারের স্যান্ডেল ঠিক করেই তা চলে যাচ্ছে এক বছর। কোনো অসুবিধা তো হচ্ছে না। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশ্রী কাণ্ডই বড় ভাবায়। এই যেমন সেদিনকার ভোলা-দুজন জীবন্ত মানুষ আমাদের বন্ধু পুলিশের গুলিতে চিরবিদায় নিলেন। ঘটনা কি গুলির পর্যায়ে ছিল?

ভোলা আমার জীবনের এক চমৎকার স্মৃতি। কথাবার্তায়, চাল-চলনে, ভাষায় তারা আর আমরা বলা চলে নোয়াখাইল্যাই। শুনেছি, আমাদের আদি নোয়াখাইল্যারাই ভোলার বড় দখলে কয়েক প্রজন্ম আগে থেকে। আমার জীবনের প্রথম স্মরণীয় এক চাকরিও এই ভোলার চরফ্যাশন কলেজে-সেই ১৯৭৪-৭৫।

কী জামাই আদরেই না অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম সাহেব এবং অধ্যাপক জহির সাহেব সম্মান পাশ করার পরই হল থেকে খুঁজে ইংরেজির অধ্যাপক করে নিয়ে গেলেন! নজরুল স্যার পরে নিউমার্কেটে নিয়ে আমার সঙ্গে একটা ছবি উঠালেন। বললেন, আমি মরে যাব; কিন্তু এ ছবিটা স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমার আত্মজীবনী ‘ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয়’ বইটিতে স্যারের সঙ্গের সে ছবি আমাকে ধন্য করেছে। তবে ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ ওই চরফ্যাশনেই দেখেছিলাম।

কীভাবে কুকুর থেকে খাবার কেড়ে নিয়েছে কংকালসদৃশ মানুষ তা যেমন দেখেছি, রক্ষীবাহিনী কীভাবে পাশবিক নির্যাতন করত তাও রক্ষীবাহিনীর লিডার দেখিয়েছিলেন। এখন দ্রব্যমূল্য যতই বাড়ুক, আমরা কত ভালো আছি-আল্লাহর লাখো শুকরিয়া। অভাব থাকলেও মানুষ না খেয়ে যেমন নেই, তেমনি হা-হুতাশও নেই এখনো। আমার কাছে আর্থিক পতনটাকে এখনো সাময়িক মনে হয়।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আমরা অবশ্যই উতরে যাব ইনশাল্লাহ। কিন্তু ভোলাতে যে দুটি তাজা প্রাণ অযথা চলে গেল বলা চলে, এটা কি আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটা টেস্ট কেস হয়ে গেল?

আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে বেশ পটু, বিরোধী দলে থাকলে তো এ দল আরও বেশি দক্ষ হয়। পুলিশের পিটুনি খেয়েও মারদাঙ্গা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের জুড়ি নেই। হালে বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো রাস্তা গরম করতে বেশ গরম গরম বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছিল, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সরকারের পতন এবার যেন ঘটিয়েই থামবে। সরকার নাকি একেবারে খাদের কিনারে, প্রয়োজন শুধু একটু ধাক্কার।

আমি জানি না, সে ধাক্কা সৃষ্টি করতেই তারা সারা দেশে একটা বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছিল কিনা। ফল কী হলো-যাত্রাতেই রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি। এখন খবর হলো, বিএনপি আন্দোলনে থাকবে, তবে এখনই বড় কর্মসূচি নয়। দুজনের মৃত্যুতেই কি বিএনপি কিছুটা টের পেয়ে গেল যে, সামনে আরও কী হতে পারে! তাহলে আন্দোলন আর জমবে কীভাবে? বিএনপি কি সরকারের নার্ভ টেস্ট করতেই আন্দোলনের একটা চাঙ্গাভাব দেখাতে চেয়েছিল? তা না হলে ভোলাতে পরের দিনের হরতালও অর্ধবেলায় শেষ করে ফেলল কেন?

বিএনপি কি জানে না যে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপি সরকারের মতো ভীরুভাবে কোনো ইস্যু মেনে নেয় না? প্রধানমন্ত্রী যতই বলুন, শান্তিপূর্ণ কোনো আন্দোলনে/মিছিলে কিংবা ঘেরাওয়ে সরকার কোনো বাধা দেবে না, বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলে চা খাওয়াবে-এটার স্পিরিট যদি বিএনপি না বোঝে তাহলে তো ভোলা দিয়েই বুঝিয়ে দিতে হলো, নাকি?

বিএনপি কি ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’-এ প্রবাদটাও মনে রাখেনি? নাকি তারা দেখতে চেয়েছে, দেখি কী হয়, সরকার কী করে! তাহলে এখন তো দেখাটা হয়ে গেল।

আমার কখনো মনে হয় না যে আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে সামান্যতম স্পেসও দেবে। সরকার যাত্রাতেই বিএনপির আন্দোলন ধূলিসাৎ করে দিতে বদ্ধপরিকর-এটা ভোলাতেই পরিষ্কার হয়ে গেল। নচেৎ পত্রপত্রিকায় যা খবর আমরা দেখলাম, তাতে তো এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে পুলিশকে এভাবে গুলি করে ফেলতে হবে। তাহলে ব্যাখ্যাটা কী দাঁড়ায়?

ব্যাখ্যাটা দাঁড়াতে পারে এমন যে, অংকুরেই বিনষ্ট করে দেওয়া শ্রেয়। ভোলাকে যদি আমরা উভয় দলের পরবর্তী পদক্ষেপের টেস্ট কেস হিসাবে বিবেচনা করি, তাহলে লাভ-ক্ষতির হিসাবে, যত অনৈতিকই হোক না কেন, সরকার জবরদস্তিতে, শক্তিতে এগিয়ে গেল। ভোলার ঘটনায় বড় মজাটা হলো, বিএনপির প্রতিপক্ষ কিন্তু আওয়ামী লীগ হয়নি, হয়েছে পুলিশ। পুলিশ তো আইনের শাসনের প্রতিভূ, অতএব পুলিশকে সরকারের ঠেঙানো-বাহিনী বলবেন কীভাবে?

পুলিশ যা করেছে তা তো আইনের শাসন সুরক্ষায় করেছে, জনগণের জানমাল রক্ষায় দেশপ্রেমিক পুলিশের এটা যে এক গুরুদায়িত্ব। তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে শাহবাগে তো প্রতিবাদকারীদের দাঁড়াতেই দেয়নি, পিটিয়েছে। দেবে কেন? সরকার এত এত উন্নয়ন করে দিচ্ছে, পদ্মা সেতু দিয়েছে, মেট্রোরেল এ বছরেই চালু করে দেবে, কর্ণফুলী টানেল তো আমাদের ‘জাপান’ বানিয়ে দেবে-তারপরও ‘সামান্য’ মূল্যবৃদ্ধিতে এত আন্দোলন হবে কেন? সত্যিই তো, মানুষ এত অকৃতজ্ঞ হলে কি সরকারের ধৈর্য থাকে? অতএব, পুলিশের ডান্ডা করে দেবে ঠান্ডা! ডান্ডায় না হলে কূল্লে-খালাস, গুলি; এবার বাছাধন আন্দোলন করত দেখি!

সরকারের এমনতরো অসহিষ্ণুতা আমাদের কেন জানি ভালো লাগছে না। সরকার কি মনোকষ্টে আছে যে মুজিব শতবর্ষটা মনমতো করতে পারল না, কারণ করোনা এসে গেল; পদ্মা সেতুর মহা ধুমধাম শেষ না হতেই বিদ্যুতের জ্বালা, তেলের জ্বালা, দ্রব্যমূল্যের জ্বালাতন; এসব দীর্ঘায়িত হলে মেট্রোরেলের মহোৎসব হবে কীভাবে? আমরা তো পাশে আছি, আওয়ামী লীগের অস্বস্তির কারণ তো দেখি না, সুবিধাবাদী মিত্রদের পাশে না থাকাই ভালো। ভোটের আগে আওয়ামী লীগের কাছে কলাটা-মুলাটার জন্য কত দল যে দৌড়াবে তা সময়ে দেখা যাবে।

পত্রপত্রিকায় দেখা গেল ‘গৃহপালিত’ এক বিরোধী দলের নেতাসহ, যিনি আওয়ামী লীগের ঐকমত্যের সরকারেও হাসিনার দয়া নিয়েছেন, কী একটা ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ নাকি করেছেন অচেনা-অজানা সাত দল মিলে। তাদের মাঠের কর্মসূচি সরকার কীভাবে দেখবে দেখা যাক। তবে আমরা বলব, ভোলাকে আওয়ামী লীগ-বিএনপির টেস্ট কেস হিসাবে নিলেও সরকারের ধৈর্যের প্রয়োজন, অযথা গুলি চালানোর মধ্যে কিংবা পুলিশকে সরকারের পক্ষে পেটোয়াবাহিনী করার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই। আওয়ামী লীগকে পেটানোর কথা নিশ্চয় আওয়ামী লীগ ভুলে যায়নি, অতএব পেটোয়া পুলিশকে প্রশ্রয় না দেওয়াই ভবিষ্যতের জন্য বেহেতর।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন