২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে

  বদরুদ্দীন উমর ১২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট প্রসঙ্গে

বাংলাদেশ এখন কারা শাসন করছে? বাংলাদেশের অর্থনীতি কাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে? কয়েকদিন আগে বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী যে বাজেট পেশ করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সে পরিপ্রেক্ষিতে এ প্রশ্ন স্বাভাবিক। কারণ যে কোনো দেশেরই বাজেটে সেদেশের শাসকশ্রেণী ও তাদের সরকারের চরিত্রের অভ্রান্ত প্রতিফলন ঘটে।

অর্থমন্ত্রী তার বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বাজেট সম্পর্কিত ব্যাখ্যামূলক নানা কথার মধ্যে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘কোনোভাবে গরিবদের কষ্ট দেয়া হচ্ছে না। দেশে দরিদ্র মানুষ বাড়ছে না। দেশে আয়-বৈষম্যও বাড়েনি। যারা পরিবর্তনে বিশ্বাস করে না, তারাই এ ধরনের প্রশ্ন করেন। স্বাধীনতার পর দরিদ্র, অনাহারী একটি দেশ যাত্রা করে। কিন্তু বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নত। অভাব শব্দটি এখন দেশে নেই’ (বণিক বার্তা, জুন ৯, ২০১৮)।

‘অভাব শব্দটি এখন দেশে নেই’- যে অর্থমন্ত্রী একথা বলতে পারেন তার সম্পর্কে কী বলা যেতে পারে? তিনি কার স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন? অভাব বলতেই বা তিনি কী বোঝেন? কাজ, খাদ্য, বস্তু, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা থেকে নিয়ে অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে। যেখানে প্রয়োজন থাকে সেখানে অভাবের প্রশ্নও থাকে। ‘অভাব নেই’ বলতে কি অর্থমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন দেশের জনগণের কাজ, খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুর কোনো অভাব নেই? হতে পারে অর্থমন্ত্রী হিসেবে নয়, সরকারের ও সমাজের উচ্চতম পর্যায়ের লোক হিসেবে তিনি নিজের চারদিকে উপরোক্ত কোনো জিনিসেরই অভাব দেখেন না। কিন্তু এভাবে এসব বিষয়কে দেখা তো সমাজ ও দেশকে দেখা নয়। এটা হল একটা বিশেষ শ্রেণীকে দেখা, যে শ্রেণীর তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিচালনার দায়িত্ব যার হাতে সরকারিভাবে ন্যস্ত, তিনি যদি বলেন দেশে অভাব নেই, তাহলে তার দ্বারা তিনি কী বোঝাতে চান? তিনি যদি বলেন দেশে আয়-বৈষম্য বাড়ছে না, তার দ্বারাই বা তিনি কী বোঝাতে চান? এই সব বক্তব্যের সঙ্গে কি বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক আছে? বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, শ্রমজীবী গরীব কৃষক, শ্রমিক ও নিু-মধ্যবিত্তের ট্যাক্সের টাকায় দেশ শাসন করলেও এই ট্যাক্স দাতাদের কোনো প্রকৃত অস্তিত্ব অর্থমন্ত্রী ও তাদের সরকারের কাছে নেই। জনগণের রক্ত তারা বেপরোয়াভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ট্যাক্সের মাধ্যমে টেনে নিয়ে তা উচ্চবিত্তদের মধ্যে বন্টন করছেন। এ কারণে উচ্চবিত্তদের মধ্যে তিনি অভাব দেখছেন না, এবং তার দৃষ্টি যেহেতু কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী পর্যন্ত প্রসারিত নয়, তাদেরকে তিনি মানুষই মনে করেন না, সেহেতু তার পক্ষে বলা সম্ভব, ‘দেশে কোনো অভাব নেই।’

লক্ষ্য করার বিষয়, অর্থমন্ত্রী বাজেটে যা করেছেন এবং পরে সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছেন, সে বিষয়ে অনেক পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তব্য বিভিন্ন বুর্জোয়া অর্থনৈতিক মহল থেকে দেয়া হলেও ‘বাংলাদেশে এখন কোনো গরীব নেই’- এ কথাটি নিয়ে তাদেরও বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই। তারা প্রায় সবাই নরম ভাষায় শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যয় কমানোর কথা বললেও এ ধরনের বক্তব্য যে কত মারাত্মক এ নিয়ে তারা কিছু বলেননি। কাজেই প্রকৃতপক্ষে বাজেটে দেশের শ্রমজীবী সব ধরনের জনগণের স্বার্থ যেভাবে ও যতখানি উপেক্ষিত হয়েছে, তার বিরুদ্ধে যেভাবে তাদের সোচ্চার হওয়া দরকার ছিল, তার কিছুই তাদের বক্তব্যে নেই।

সামনে নির্বাচন রেখে অর্থমন্ত্রী সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি করেছেন, যাতে নির্বাচনে তারা তাদের সহায়তা লাভ করতে পারেন। নির্বাচনের কোনো কথা সরাসরি না বললেও এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য উল্লেখযোগ্য। সরকারি কর্মচারীদের পেনশনসহ বিভিন্ন সুবিধা প্রদান প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সরকারি চাকুরেদের যেসব সুযোগ-সুবিধা বর্তমান সরকার দিয়েছে, এর আগে তারা জীবনে তা চোখেও দেখেনি।

বেতন ৪০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ইনক্রিমেন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বল্প সুদে গৃহনির্মাণ ঋণ দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর পরও তারা (সরকারি চাকরিজীবীরা) আর কত সুবিধা চান?’ (বণিক বার্তা, জুন ৯, ২০১৮)। যেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বেতন সামান্য বৃদ্ধি করতে অর্থমন্ত্রীর প্রাণে ব্যথা লাগে, যেখানে ঢাকা শহরে এবং অন্যত্র বস্তিতে কোটির ওপর মানুষ অমানবিক জীবনযাপন করে, সেখানে তিনি সরকারি কর্মচারীদের বেতন অবিশ্বাস্যভাবে একেবারে দ্বিগুণ করেছেন, তাদের জন্য স্বল্প সুদে গৃহনির্মাণ ঋণের ব্যবস্থা করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদদের সরাসরি কোনো সমালোচনা নেই। তাদের মধ্যে কারও কারও কথা হল- শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজকল্যাণ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি হয়নি, ব্যয়ের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কিছুই নেই তাদের বাজেট সমালোচনার মধ্যে।

মূল্যবৃদ্ধি ক্রমাগত হতে থাকার কারণে লাখ লাখ মানুষ এখন তরকারী ছাড়াই শুধু ভাত খেয়ে থাকছেন এবং অপুষ্টিতে ভুগছেন। তাদের জন্য চিকিৎসার যে ব্যবস্থা আছে তাকে একটা সভ্য দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা বলা চলে না। যারা এখানকার বড় বড় মহার্ঘ হাসপাতালে নিজেদের চিকিৎসা করেন এবং কথায় কথায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, এমনকি স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্যও বিদেশে যান, তাদের চোখে চিকিৎসার এই অভাব ধরা পড়ার কারণ নেই।

প্রকৃত শিক্ষা থেকে যে দেশের কোটি কোটি ছাত্র বঞ্চিত হচ্ছে তার হিসাব এদের খাতায় নেই। এর অভাব বোধ তাদের নেই। দেশে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে উন্নয়নের যে কথা তারা কারণে-অকারণে বলছেন সে উন্নয়নে যে দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে না, এ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কোনো কথা নেই। কাজেই কর্মসংস্থানের অভাবও তার হিসাবে বাইরে। এভাবে জনগণের জীবনে যত রকম অভাব আছে সবকিছুর থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে রেখে অর্থমন্ত্রী গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেছেন, ‘দেশে কোনো অভাব নেই’! যেহেতু এরা ক্ষমতার গদিতে বসে আছেন কাজেই কোনো কিছু, এমনকি দেশের জনগণের চরম দুরবস্থা এবং সর্বক্ষেত্রে অভাবকে উপেক্ষা করে ‘দেশে কোনো অভাব নেই’ জাতীয় ঘোষণা দিলেও তার বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভেরও কোনো সুযোগ নেই। বিক্ষোভ হচ্ছেও না।

ব্যাংকিং খাতে সরকার এখন যা করছে তা দুনিয়ার কোনো দেশে এভাবে নেই। ব্যাংকে দুর্নীতি সব পুঁজিবাদী দেশেই হয়ে থাকে। কিন্তু তার মাত্রা থাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। বাংলাদেশে এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ বলে কিছু নেই। এখানে সাধারণ আমানতকারীদের টাকা রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো অবাধে লুটপাট করছে। আর লুটপাট যারা করছে তারা কোনো না কোনোভাবে সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকার কারণে সরকার ও তার অর্থমন্ত্রীর এদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেই। উপরন্তু তাদের এই দুর্নীতিকে আড়াল করে ব্যাংকের ঘাটতি সরকারি তহবিল থেকে পূরণ করা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে এক সরকারি নীতিতে। এর জন্য কাউকে জবাবদিহিতা করতেও হচ্ছে না। তার কোনো সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে যুগান্তরের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলো যখনই মূলধন ঘাটতিতে পড়ছে, তখনই তা জনগণের করের টাকায় পূরণ করে আসছে সরকার। এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে ৬ বছরে সরকার ১৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। এছাড়া চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ রয়েছে ২ হাজার কোটি টাকা। আবার প্রস্তাবিত নতুন বাজেটেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ২ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যাংকের এবারের ভর্তুকি বরাদ্দ নিয়ে লুকোচুরি করেছে সরকার। প্রতি বছর প্রস্তাবিত বাজেটে এটি আলাদাভাবে উল্লেখ থাকলেও এবার অন্যান্য ব্যয়ের মুধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, এমনকি বাজেট বক্তৃতায়ও বিষয়টি এড়িয়ে যান অর্থমন্ত্রী’ (যুগান্তর, ০৯.০৬.২০১৮)। আসলে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি একটা নিয়মে দাঁড়িয়ে গেছে এবং সরকারি স্বীকৃতিও লাভ করেছে। সেজন্য আগাম সতর্কতা হিসেবে বাজেটে ব্যাংকিং খাতে এই বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ফলে বাস্তবত দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিজনিত কারণে রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকে যে সংকট দেখা যাচ্ছে সে সংকটে সরকার ব্যাংকগুলোর পাশে আছে।

সরকারের এই নীতি যে ব্যাংকে দুর্নীতিবাজদের লুটপাট কমিয়ে না এনে বেপরোয়াভাবে আরও বৃদ্ধি করবে এতে সন্দেহ নেই। এ কারণে একজন সাবেক ব্যাংকার এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘লুটপাট করে বছর শেষে বাজেট থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা একটি অনৈতিক ব্যবস্থা, যা দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে’ (যুগান্তর, ০৯.০৬.২০১৮)। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, ব্যাংকের দুর্নীতি ও সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে কথা ছিল সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি কমিশন গঠন করার। কিন্তু অর্থমন্ত্রী তার ধারেকাছে না গিয়ে বলেছেন, তিনি এ কাজ এবার করলেন না। তবে কাগজপত্র সব গুছিয়ে দিয়েছেন যাতে পরবর্তী সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারে! এর থেকে বেশি চোখ খুলে দেয়ার মতো ব্যাপার আর কী হতে পারে?

দেশের অর্থনীতিকে আকাশে ওঠানোর লক্ষ্য স্থির করে বাজেটের আকার অসম্ভব বড় করা হয়েছে। কিন্তু যে পরিমাণ বাজেট ঘাটতি (১,২১,২৪২ কোটি টাকা) দেখানো হয়েছে তা পূরণ করার মতো প্রশাসনিক ক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই। কাজেই পূর্ববর্তী বাজেটের মতো এবারের বাজেট বাস্তবায়নও এক অসম্ভব ব্যাপার। এখানে আরও লক্ষ করার বিষয় এই যে, বাজেটের এই আকার বৃদ্ধি সত্ত্বেও শিক্ষা, চিকিৎসা ক্ষেত্রে ব্যয় কমানো হয়েছে এবং গরীবদের গৃহসংস্থান ইত্যাদি বিষয়ে প্রকৃতপক্ষে কিছুই এতে নেই। এসব বিষয়ে আরও অনেক কথা বলার থাকলেও এখানে তার সুযোগ নেই। তবে এটা অবশ্যই বলা দরকার যে, বাজেটে যা করা হয়েছে এবং সরকারের পক্ষে অর্থমন্ত্রী যেসব কথাবার্তা বলেছেন তাতে কাদের শাসন এখন বাংলাদেশে বলবৎ আছে, এটা বোঝার কোনো অসুবিধা জনগণের কোনো অংশেরই নেই।

১১.০৬.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

 

 

আরও পড়ুন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.