বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কি গ্রহণযোগ্য?
jugantor
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কি গ্রহণযোগ্য?

  ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী  

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গঠন ও অভিষেকের ঘটনাটি আজ (০৭.০৯.২০২২) আলোচিত খবর হিসাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পরিবেশিত হয়েছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির জরুরি সভাও গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শিগ্গির সর্বসম্মুখে চলে আসবে।

৪ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের কমিটিগুলোর একটি সম্মিলিত কাঠামো গড়ে তোলার এক পর্বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বিশেষত সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে প্রধান অতিথি করে ৩ সেপ্টেম্বর একটি সম্মেলেন করেছে।

সম্মেলনে অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য তাদের সহযোগিতা ও আশীর্বাদ করেছেন।

সদ্য গঠিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেতারা তেমন কেউ পরিচিত নন, এমনকি প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শাখা গঠিত হয়েছে বলে প্রচারণাটাও সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। গণমাধ্যমের রিপোর্টিংয়ে সে কথা ধ্বনিত হয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠনের শাখা বিস্তারে কিছু আইনগত ও পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা আছে। এ কথাগুলো বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকরী কমিটির কিছু সদস্য বলেছেন। তাদের ধারণা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো এ বিষয়গুলো অবগত ছিলেন বলেই অতীতে নেওয়া ছাত্রলীগ কমিটি গঠন উদ্যোগকে তেমন উৎসাহ দেননি। ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে সাধারণভাবে তিনি সতর্ক। কেননা মাত্র ক’দিন আগেই তিনি বলেছেন, গ্রুপ বাড়ানোর জন্য আলতু-ফালতুদের ছাত্রলীগে নেওয়া যাবে না।

সময় বদলেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির, ছাত্রদল ও বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের কমিটি গঠন না করলেও কম করে হলেও ক্যাম্পাসের বাইরে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

বিষয়টি সরকারি দল ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নজরে থাকারই কথা। সম্ভবত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা এমন একটি সম্মিলিত প্রয়াস নিয়েছে। তারা বহুদিন নিস্পৃহ থেকেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের ধারণা সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি থাকছে না বলে জঙ্গিবাদ উৎসাহিত হচ্ছে।

ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির কারণে আহত-নিহতের সংখ্যাটা অনেকের নজরে এসেছে। আরও নজরে এসেছে অভিভাবকের তির্যক মতামত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে উদাসীন নয়, বরং উদ্বিগ্ন। তারা প্রশ্ন তুলেছে, প্রশ্ন তুলেছে উদ্যোক্তারাও।

একটি প্রশ্ন হলো, ছাত্রলীগের পর অন্য সংগঠন এমন ছাত্ররাজনীতি যদি চালাতে যায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ কী করবে? এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বলেছে, তারা এমনিতর আচরণের ব্যাপারে নিরপেক্ষ, তবে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ব্যবহার করে তা চালিয়ে যাওয়ার বিরোধী। ধারণা করছি, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিধান বা রীতি চালু রয়েছে। সরকারি দলের যেসব সংসদ-সদস্য বা মন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা, তাদের মন্তব্য অবশ্য পাওয়া যায়নি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, অতীতে এ ধরনের প্রয়াস ঠেকাতে রাস্তায় নেমেছিলেন, যা একেবারে কাম্য নয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তার সংগঠনের বিধানাবলির একটি ধারা উল্লেখ করে সঙ্গে নোটিশ জারি করেছে, যাতে বিনা অনুমতিতে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড করার অধিকার নেই বলে উল্লেখ করেছে। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

এমনকি ড্যাফোডিল ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সহমত পোষণ করে তাদের আইনের নিজস্ব ধারা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। উল্লেখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাড়াও অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ্যে বা নীরবে এমন মতামত দিয়ে যাচ্ছে।

ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া প্রণিধানযোগ্য। তাদের মতে, আইনের ৬(১০) ধারা পালন করাটা অসম্ভব হবে যদি সংঘাতমুখর ছাত্ররাজনীতি বিরাজ করে। তাছাড়া এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রুলস-রেগুলেশনে ছাত্ররাজনীতির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

ট্রাস্ট পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কার্যত নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীরা সজ্ঞানে এসব শর্তাবলিতে স্বাক্ষর দিয়ে ভর্তি হয়েছে, যার পাশেই অভিভাবকদের প্রতিস্বাক্ষর রয়েছে। তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাসহায়ক ও রাজনীতি ব্যতিরেকে শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অবারিত সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটি কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিয়ে তৈরি করে তারা নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ অবশ্যই পাচ্ছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণি প্রতিনিধি বা মনিটর রয়েছে, যারা প্রতি সেমিস্টারের ফলাফলের ভিত্তিতে উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত হন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেন। তাদের উৎসাহদানের জন্য প্রদত্ত স্কলারশিপেও হেরফের ঘটানো হয়।

ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে প্রতিষ্ঠাতা ও অভিভাবকদের মতামত একমুখী বলে মনে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা একই মনোভাবাপন্ন, তাই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত কাম্য।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমিতি থেকে যা জানা গেছে, তা হচ্ছে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পর্যবেক্ষণকে যথার্থ মনে করেন এবং তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পলিসি, শৃঙ্খলা ও নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে। বিশ্বমানের কোর্স-কারিকুলাম, সেমিস্টারভিত্তিক কর্মোপযোগী আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, সেশনজট, রাজনৈতিক সংঘাত ও দলাদলিমুক্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বেসরকারি

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশ-বিদেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা ও সুনাম অর্জন করেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নানামুখী প্রতিভার বিকাশ ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের জন্য সহশিক্ষা ও অতিরিক্ত শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন বিভাগ ও বিষয়ভিত্তিক স্টুডেন্ট ক্লাব নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্টুডেন্ট কর্তৃক নিয়মিতভাবে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক চর্চা, মন ও শরীর গঠনের মতো আবশ্যিক কাজগুলো আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের রাজনীতিসচেতনতা ও সম্পৃক্ততাকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে কিনা তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম দ্বারাই নির্ধারিত। ক্যাম্পাসের বাইরে ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় অংশগ্রহণ একান্তই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা ঠিক করবেন।

তাদের আরও ধারণা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের পলিসি, শৃঙ্খলা ও নিয়ম-কানুন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং শিক্ষার্থীদের সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কি গ্রহণযোগ্য?

 ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী 
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা গঠন ও অভিষেকের ঘটনাটি আজ (০৭.০৯.২০২২) আলোচিত খবর হিসাবে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পরিবেশিত হয়েছে। এরই মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির জরুরি সভাও গত সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শিগ্গির সর্বসম্মুখে চলে আসবে।

৪ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের কমিটিগুলোর একটি সম্মিলিত কাঠামো গড়ে তোলার এক পর্বে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, বিশেষত সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে প্রধান অতিথি করে ৩ সেপ্টেম্বর একটি সম্মেলেন করেছে।

সম্মেলনে অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া। ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে আল নাহিয়ান খান জয় ও লেখক ভট্টাচার্য তাদের সহযোগিতা ও আশীর্বাদ করেছেন।

সদ্য গঠিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেতারা তেমন কেউ পরিচিত নন, এমনকি প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শাখা গঠিত হয়েছে বলে প্রচারণাটাও সম্পূর্ণ মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। গণমাধ্যমের রিপোর্টিংয়ে সে কথা ধ্বনিত হয়েছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগঠনের শাখা বিস্তারে কিছু আইনগত ও পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা আছে। এ কথাগুলো বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকরী কমিটির কিছু সদস্য বলেছেন। তাদের ধারণা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো এ বিষয়গুলো অবগত ছিলেন বলেই অতীতে নেওয়া ছাত্রলীগ কমিটি গঠন উদ্যোগকে তেমন উৎসাহ দেননি। ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে সাধারণভাবে তিনি সতর্ক। কেননা মাত্র ক’দিন আগেই তিনি বলেছেন, গ্রুপ বাড়ানোর জন্য আলতু-ফালতুদের ছাত্রলীগে নেওয়া যাবে না।

সময় বদলেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির, ছাত্রদল ও বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলো তাদের কমিটি গঠন না করলেও কম করে হলেও ক্যাম্পাসের বাইরে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

বিষয়টি সরকারি দল ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নজরে থাকারই কথা। সম্ভবত পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা এমন একটি সম্মিলিত প্রয়াস নিয়েছে। তারা বহুদিন নিস্পৃহ থেকেই এ পদক্ষেপ নিয়েছে। তাদের ধারণা সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি থাকছে না বলে জঙ্গিবাদ উৎসাহিত হচ্ছে।

ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতির কারণে আহত-নিহতের সংখ্যাটা অনেকের নজরে এসেছে। আরও নজরে এসেছে অভিভাবকের তির্যক মতামত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে উদাসীন নয়, বরং উদ্বিগ্ন। তারা প্রশ্ন তুলেছে, প্রশ্ন তুলেছে উদ্যোক্তারাও।

একটি প্রশ্ন হলো, ছাত্রলীগের পর অন্য সংগঠন এমন ছাত্ররাজনীতি যদি চালাতে যায়, তাহলে কর্তৃপক্ষ কী করবে? এ ব্যাপারে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বলেছে, তারা এমনিতর আচরণের ব্যাপারে নিরপেক্ষ, তবে ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ব্যবহার করে তা চালিয়ে যাওয়ার বিরোধী। ধারণা করছি, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিধান বা রীতি চালু রয়েছে। সরকারি দলের যেসব সংসদ-সদস্য বা মন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তা, তাদের মন্তব্য অবশ্য পাওয়া যায়নি।

উদ্যোক্তারা বলছেন, অতীতে এ ধরনের প্রয়াস ঠেকাতে রাস্তায় নেমেছিলেন, যা একেবারে কাম্য নয়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় তার সংগঠনের বিধানাবলির একটি ধারা উল্লেখ করে সঙ্গে নোটিশ জারি করেছে, যাতে বিনা অনুমতিতে এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ড করার অধিকার নেই বলে উল্লেখ করেছে। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি করতে দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।

এমনকি ড্যাফোডিল ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সহমত পোষণ করে তাদের আইনের নিজস্ব ধারা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। উল্লেখিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাড়াও অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশ্যে বা নীরবে এমন মতামত দিয়ে যাচ্ছে।

ছাত্ররাজনীতি সম্পর্কে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া প্রণিধানযোগ্য। তাদের মতে, আইনের ৬(১০) ধারা পালন করাটা অসম্ভব হবে যদি সংঘাতমুখর ছাত্ররাজনীতি বিরাজ করে। তাছাড়া এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব রুলস-রেগুলেশনে ছাত্ররাজনীতির কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।

ট্রাস্ট পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি কার্যত নিষিদ্ধ। শিক্ষার্থীরা সজ্ঞানে এসব শর্তাবলিতে স্বাক্ষর দিয়ে ভর্তি হয়েছে, যার পাশেই অভিভাবকদের প্রতিস্বাক্ষর রয়েছে। তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষাসহায়ক ও রাজনীতি ব্যতিরেকে শিক্ষাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অবারিত সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন কমিটি ও উপকমিটি কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিয়ে তৈরি করে তারা নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ অবশ্যই পাচ্ছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণি প্রতিনিধি বা মনিটর রয়েছে, যারা প্রতি সেমিস্টারের ফলাফলের ভিত্তিতে উপাচার্য কর্তৃক মনোনীত হন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেন। তাদের উৎসাহদানের জন্য প্রদত্ত স্কলারশিপেও হেরফের ঘটানো হয়।

ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে প্রতিষ্ঠাতা ও অভিভাবকদের মতামত একমুখী বলে মনে হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা একই মনোভাবাপন্ন, তাই বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত কাম্য।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমিতি থেকে যা জানা গেছে, তা হচ্ছে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পর্যবেক্ষণকে যথার্থ মনে করেন এবং তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ও প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা মনে করেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের পলিসি, শৃঙ্খলা ও নিয়ম-কানুন অনুযায়ী পরিচালিত হয়ে আসছে। বিশ্বমানের কোর্স-কারিকুলাম, সেমিস্টারভিত্তিক কর্মোপযোগী আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, সেশনজট, রাজনৈতিক সংঘাত ও দলাদলিমুক্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে বেসরকারি

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশ-বিদেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক আস্থা ও সুনাম অর্জন করেছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নানামুখী প্রতিভার বিকাশ ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জনের জন্য সহশিক্ষা ও অতিরিক্ত শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় বিভিন্ন বিভাগ ও বিষয়ভিত্তিক স্টুডেন্ট ক্লাব নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব ক্লাবের ব্যবস্থাপনায় নিয়মতান্ত্রিকভাবে স্টুডেন্ট কর্তৃক নিয়মিতভাবে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক চর্চা, মন ও শরীর গঠনের মতো আবশ্যিক কাজগুলো আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের রাজনীতিসচেতনতা ও সম্পৃক্ততাকে নিরুৎসাহিত করে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতর দলীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে কিনা তা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম দ্বারাই নির্ধারিত। ক্যাম্পাসের বাইরে ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় অংশগ্রহণ একান্তই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা ঠিক করবেন।

তাদের আরও ধারণা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের পলিসি, শৃঙ্খলা ও নিয়ম-কানুন অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে এবং শিক্ষার্থীদের সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী : মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন