খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও চাল আমদানি!
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও চাল আমদানি!

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব পরিসরে খাদ্যশস্যের সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে এমন সাবধানবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে জাতিসংঘের তরফ থেকে। এই সাবধানবাণীতে বিশ্বের অনেক দেশই চেষ্টা করবে খাদ্যশস্য আমদানি করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে ঘাটতি দেশগুলোর জন্য এই সাবধানবাণীটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো খাদ্যশস্য আমদানি করা না গেলে পরে কোথাও খাদ্যশস্য পাওয়া মুশকিল হবে। সরবরাহ ঘাটতির পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে সরকারঘনিষ্ঠ মহলগুলো দাবি করছে, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি যখন বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়, তখন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবিকে আমরা কীভাবে দেখব? সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যখন বলেন বাংলাদেশ তাদের শাসনামলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে, তখন এমন দাবিকে নিছক রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় না।

খাদ্যশস্য আমদানির তথ্যগুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। দৈনিক সংবাদপত্রগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খাদ্যশস্য আমদানির খবর প্রকাশ করে। একথা ঠিক যে, খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে সরকারের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের খাদ্যশস্যের মজুত থাকতে হয়। কৃত্রিমভাবে খাদ্য ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ালে তা নিয়ন্ত্রণের জন্যও সরকারের হাতে মজুত খাদ্যশস্য থাকা প্রয়োজন।

অস্থিরতার সময়ে মজুত থেকে চাল বা গম তুলে নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারলে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিছক খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা যথেষ্ট নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দেশীয় মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ মজুত হিসাবে থাকা বাঞ্ছনীয়। এই পরিমাণটি কম-বেশি ৩০ লাখ টন। এমন বিরাট অঙ্কের খাদ্যশস্য যদি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, তাহলে শিল্পের কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতি কেমন করে আমদানি করা সম্ভব হবে?

একটি জাতীয় দৈনিক গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধান শিরোনাম করেছে, ‘চালের বড় মজুতেও অস্বস্তিতে সরকার।’ গুদামে ১৯ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য মজুত, তবুও যেন স্বস্তিতে নেই সরকার। এখন ৯ লাখ টন চাল আমদানির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। বাজারের অস্থিরতার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে ব্যবসায়ীদের নেতিবাচক আচরণই খাদ্যের বাজারে অস্থিরতার জন্য দায়ী।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত চাল আছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দরের কারণে চালের দাম ৪০-৬০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানো যেতে পারে প্রতি কেজিতে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সাম্প্রতিককালে অকারণেই প্রতি কেজি চালের দাম ৮-১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি।

ব্যবসায়ীরা সরকারের বক্তব্য মানতে রাজি নন। বাংলাদেশ অটোমেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কেএম লায়েক আলী উল্লিখিত সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, ‘চালের বাজার শুধু ব্যবসায়ীদের হাতে নেই, এখন মধ্য পর্যায়ের অনেক ধান ব্যবসায়ী মজুত ব্যবসা করছেন। তারাও এর জন্য দায়ী।’ লায়েক আলী আরও বলেছেন, ‘সম্প্রতি ভারতে আতপ চালে ২০ শতাংশ শুল্ক বসানোর খবরে মধ্য ও বড় ব্যবসায়ীরা বাজারে ধান ছাড়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন আমাদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। ধান ছাড়া চাল করব কী দিয়ে।’

দেখা যাচ্ছে, চালের বাজারে অংশীজনের সংখ্যা বেশ কয়েকটি। বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে তার জন্য একদিকে এই অংশীজনদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি চালের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সব মিলে চালের বাজার খুবই জটিল। এই জটিলতার মধ্যে যে কোনো একজন স্বাভাবিক আচরণ না করলে বাজারে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

কেএম লায়েক আলীর আরও বক্তব্য হলো, যারা ধান মজুত করে রেখেছেন, তাদের দিকে নজর দিতে হবে, একই সঙ্গে আমদানি বাড়িয়ে ওএমএসে বেশি চাল ছাড়তে হবে। না হলে বাজার ঠিক রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। খাদ্যমন্ত্রীর মতে, ‘একশ্রেণির ব্যবসায়ী বিভিন্ন সুযোগে চালের বাজার অস্থির করে তোলেন। তখন খুচরা ব্যবসায়ীরা দায়ী করেন পাইকারি ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের। অন্যদিকে মিল মালিকরা খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপান।’

তিনি বলেন, ‘এ সমস্যার সমাধানে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিন স্তরের দাম ঘোষণার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কেউ কাউকে দোষারোপ করতে না পারে।’ প্রশ্ন হলো, এই সামান্য কাজটি কেন করা হয়নি? সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে। এই যদি হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের নমুনা, তাহলে এতদিন কী করা হয়েছে? ওয়েবসাইটে অতিরিক্ত কিছু তথ্য যোগ করা রকেট সায়েন্সের মতো কঠিন কোনো কাজ নয়। তবুও কাজটি করা হয়নি!

খাদ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, ১৪ সেপ্টেম্বর বুধবার ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে যে ৯ লাখ টন চাল আমদানির নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে; এতে আমদানি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চালও অন্তর্ভুক্ত। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য যথাসময়ে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি দেশে বোরো সংগ্রহ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বরে আমন ধান ঘরে উঠতে শুরু করবে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর-এই তিন মাস বাজারে চালের দাম বাড়ার একটা প্রবণতা থাকে। এই তিন মাসে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও টিসিবির কার্ডের জন্য সরকারের গুদাম থেকে ৯ লাখ টনের ওপর চাল বের হয়ে যাবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে। মনে রাখা দরকার, আমন মৌসুমের শুরুতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি বলে আমন চাষে বিঘ্ন ঘটেছে।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, আমনের উৎপাদন আশানুরূপ নাও হতে পারে। সেজন্য আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা ধান আটকে রাখছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিল মালিকদের এক নেতা। ব্যবসায়ীরা, যে পর্যায়ে হোন না কেন, তাদের সামনের দিকে দুটি চোখ আছে এবং পেছনের দিকেও তাদের একটি চোখ আছে।

এই চোখগুলো তারা ব্যবহার করেন বিশ্ব খাদ্যশস্য বাজার পরীবেক্ষণে এবং একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্তরে সরবরাহ ও চাহিদা পরিস্থিতিও তারা পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার জন্য তারা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের তাড়না বোধ করেন। এটা সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের তাড়না। এই তাড়না আছে বলেই তারা দেশের একটি স্মার্ট শ্রেণি।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ করেছে মন্ত্রণালয়, আরও ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চাল আমদানির চেষ্টা চলছে। সরকারের হাতে এখন মজুত আছে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার টন খাদ্যশস্য। এর মধ্যে চাল আছে ১৭ লাখ ৮০ হাজার টন।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে বোরোর ফলন কম হয়েছে। আমনের ফলনেও আশানুরূপ চাল পাওয়া যাবে না। এই তথ্য আমার সন্দেহকে সঠিক প্রমাণ করেছে। এসব কারণে চাল আমদানির বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে জীবন-মরণের প্রশ্ন! চাল আমদানিতে নয়-ছয় হচ্ছে বলেও সন্দেহ দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার আলোচ্য সংবাদপত্রটিকে বলেছেন, ‘যে দামে চাল কিনেছি, এর চেয়ে কম দামে কেউ চাল কিনে দেখান। আমরা জনগণের সেবক, এখানে নয়-ছয় করতে আসিনি।’

ভিয়েতনাম থেকে জি টু জি পদ্ধতিতে ২ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করেছে সরকার। এর মধ্যে ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল আর ৩০ হাজার টন আতপ। ভিয়েতনাম ওই ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল থাইল্যান্ড থেকে কিনে বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। সেদ্ধ চাল কেনার চুক্তির সময় প্রতি টন চালের এফওবি দর ছিল ৪১৭ ডলার।

এর সঙ্গে জাহাজ ভাড়া, বার্থ অপারেটিং, হ্যান্ডলিং, লাইটেনিং, বিমা ও মুনাফা খরচসহ প্রতি টন চালের জন্য সরকারকে পরিশোধ করতে হবে ৫২১ ডলার। অর্থাৎ এফওবি দাম ছাড়া অন্য খরচ ১০৪ ডলার। ভিয়েতনাম থেকে চাল বাংলাদেশের গুদামে পৌঁছে দেবে সাউদার্ন ফুড করপোরেশন। খাদ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ভিয়েতনাম থেকে কেনা চালের বর্তমান এফওবি দর ৪৩২ ডলার। অর্থাৎ সরকার প্রতি টন চাল ১৫ ডলার কমে কিনতে পেরেছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের চুক্তি করা ৩০ হাজার টন আতপ চালের প্রতি টনে এফওবি দর ছিল ৩৮৫ ডলার। এটির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিবর্তিত রয়েছে।

পর্যবেক্ষক মহল বলছে, সরকার এফওবি দর নিয়ে যে তথ্য দিচ্ছে, তাতে সমস্যা নেই। তবে ভিয়েতনামের চালের পরিবহণ খরচ অনেক বেশি দেখানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটা খুবই পরিষ্কার বিষয়। বেসরকারিভাবে যারা বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে, তাদের সঙ্গে যাচাই করে দেখুন। যদি আমাদের চালের পরিবহণ খরচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেটাও লিখুন।

আমরা কোনো লুকোচুরি করছি না। থাইল্যান্ড সরাসরি বাংলাদেশের কাছে চাল বিক্রি করতে চাচ্ছে না। অথচ ভিয়েতনামের কাছে চাল বিক্রি করছে। এটা একটা বিরাট পাজল। যতদূর জানি, থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ নয়। তা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড কেন বাংলাদেশে চাল রপ্তানি করতে নানা অজুহাত দিচ্ছে, সেটা এক তাজ্জব ব্যাপার। তবে ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির অন্য খরচ কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা সত্ত্বেও চাল আমদানি!

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব পরিসরে খাদ্যশস্যের সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে এমন সাবধানবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে জাতিসংঘের তরফ থেকে। এই সাবধানবাণীতে বিশ্বের অনেক দেশই চেষ্টা করবে খাদ্যশস্য আমদানি করে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে ঘাটতি দেশগুলোর জন্য এই সাবধানবাণীটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো খাদ্যশস্য আমদানি করা না গেলে পরে কোথাও খাদ্যশস্য পাওয়া মুশকিল হবে। সরবরাহ ঘাটতির পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষ পর্যন্ত গড়াতে পারে।

বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে সরকারঘনিষ্ঠ মহলগুলো দাবি করছে, বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এর পাশাপাশি যখন বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়, তখন খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের দাবিকে আমরা কীভাবে দেখব? সরকারের কর্তাব্যক্তিরা যখন বলেন বাংলাদেশ তাদের শাসনামলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে গেছে, তখন এমন দাবিকে নিছক রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় না।

খাদ্যশস্য আমদানির তথ্যগুলো দিবালোকের মতো স্পষ্ট। দৈনিক সংবাদপত্রগুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে খাদ্যশস্য আমদানির খবর প্রকাশ করে। একথা ঠিক যে, খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতা ঠেকাতে সরকারের হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের খাদ্যশস্যের মজুত থাকতে হয়। কৃত্রিমভাবে খাদ্য ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ালে তা নিয়ন্ত্রণের জন্যও সরকারের হাতে মজুত খাদ্যশস্য থাকা প্রয়োজন।

অস্থিরতার সময়ে মজুত থেকে চাল বা গম তুলে নিয়ে বাজারে ছড়িয়ে দিতে পারলে ব্যবসায়ীদের কারসাজি বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিছক খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা যথেষ্ট নয়। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দেশীয় মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ মজুত হিসাবে থাকা বাঞ্ছনীয়। এই পরিমাণটি কম-বেশি ৩০ লাখ টন। এমন বিরাট অঙ্কের খাদ্যশস্য যদি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, তাহলে শিল্পের কাঁচামাল এবং যন্ত্রপাতি কেমন করে আমদানি করা সম্ভব হবে?

একটি জাতীয় দৈনিক গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধান শিরোনাম করেছে, ‘চালের বড় মজুতেও অস্বস্তিতে সরকার।’ গুদামে ১৯ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য মজুত, তবুও যেন স্বস্তিতে নেই সরকার। এখন ৯ লাখ টন চাল আমদানির জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। বাজারের অস্থিরতার জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয় মনে করছে ব্যবসায়ীদের নেতিবাচক আচরণই খাদ্যের বাজারে অস্থিরতার জন্য দায়ী।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত চাল আছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দরের কারণে চালের দাম ৪০-৬০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানো যেতে পারে প্রতি কেজিতে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, সাম্প্রতিককালে অকারণেই প্রতি কেজি চালের দাম ৮-১০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর কোনো সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি।

ব্যবসায়ীরা সরকারের বক্তব্য মানতে রাজি নন। বাংলাদেশ অটোমেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কেএম লায়েক আলী উল্লিখিত সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, ‘চালের বাজার শুধু ব্যবসায়ীদের হাতে নেই, এখন মধ্য পর্যায়ের অনেক ধান ব্যবসায়ী মজুত ব্যবসা করছেন। তারাও এর জন্য দায়ী।’ লায়েক আলী আরও বলেছেন, ‘সম্প্রতি ভারতে আতপ চালে ২০ শতাংশ শুল্ক বসানোর খবরে মধ্য ও বড় ব্যবসায়ীরা বাজারে ধান ছাড়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন আমাদের অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। ধান ছাড়া চাল করব কী দিয়ে।’

দেখা যাচ্ছে, চালের বাজারে অংশীজনের সংখ্যা বেশ কয়েকটি। বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে তার জন্য একদিকে এই অংশীজনদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি চালের বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সব মিলে চালের বাজার খুবই জটিল। এই জটিলতার মধ্যে যে কোনো একজন স্বাভাবিক আচরণ না করলে বাজারে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়।

কেএম লায়েক আলীর আরও বক্তব্য হলো, যারা ধান মজুত করে রেখেছেন, তাদের দিকে নজর দিতে হবে, একই সঙ্গে আমদানি বাড়িয়ে ওএমএসে বেশি চাল ছাড়তে হবে। না হলে বাজার ঠিক রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের বাজারে অস্থিরতার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। খাদ্যমন্ত্রীর মতে, ‘একশ্রেণির ব্যবসায়ী বিভিন্ন সুযোগে চালের বাজার অস্থির করে তোলেন। তখন খুচরা ব্যবসায়ীরা দায়ী করেন পাইকারি ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের। অন্যদিকে মিল মালিকরা খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের ওপর দোষ চাপান।’

তিনি বলেন, ‘এ সমস্যার সমাধানে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তিন স্তরের দাম ঘোষণার ব্যবস্থা করা হবে, যাতে কেউ কাউকে দোষারোপ করতে না পারে।’ প্রশ্ন হলো, এই সামান্য কাজটি কেন করা হয়নি? সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলে। এই যদি হয় ডিজিটাল বাংলাদেশের নমুনা, তাহলে এতদিন কী করা হয়েছে? ওয়েবসাইটে অতিরিক্ত কিছু তথ্য যোগ করা রকেট সায়েন্সের মতো কঠিন কোনো কাজ নয়। তবুও কাজটি করা হয়নি!

খাদ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, ১৪ সেপ্টেম্বর বুধবার ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে যে ৯ লাখ টন চাল আমদানির নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে; এতে আমদানি প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চালও অন্তর্ভুক্ত। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির জন্য যথাসময়ে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি দেশে বোরো সংগ্রহ শেষ হয়েছে। ডিসেম্বরে আমন ধান ঘরে উঠতে শুরু করবে। সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর-এই তিন মাস বাজারে চালের দাম বাড়ার একটা প্রবণতা থাকে। এই তিন মাসে ওএমএস, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও টিসিবির কার্ডের জন্য সরকারের গুদাম থেকে ৯ লাখ টনের ওপর চাল বের হয়ে যাবে। এই ঘাটতি পূরণে সরকার আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে। মনে রাখা দরকার, আমন মৌসুমের শুরুতে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি বলে আমন চাষে বিঘ্ন ঘটেছে।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, আমনের উৎপাদন আশানুরূপ নাও হতে পারে। সেজন্য আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা ধান আটকে রাখছেন বলে অভিযোগ করেছেন মিল মালিকদের এক নেতা। ব্যবসায়ীরা, যে পর্যায়ে হোন না কেন, তাদের সামনের দিকে দুটি চোখ আছে এবং পেছনের দিকেও তাদের একটি চোখ আছে।

এই চোখগুলো তারা ব্যবহার করেন বিশ্ব খাদ্যশস্য বাজার পরীবেক্ষণে এবং একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্তরে সরবরাহ ও চাহিদা পরিস্থিতিও তারা পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখার জন্য তারা নিজেদের মধ্যে এক ধরনের তাড়না বোধ করেন। এটা সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের তাড়না। এই তাড়না আছে বলেই তারা দেশের একটি স্মার্ট শ্রেণি।

সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, ৫ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ করেছে মন্ত্রণালয়, আরও ৩ লাখ ৭০ হাজার টন চাল আমদানির চেষ্টা চলছে। সরকারের হাতে এখন মজুত আছে ১৮ লাখ ৮৩ হাজার টন খাদ্যশস্য। এর মধ্যে চাল আছে ১৭ লাখ ৮০ হাজার টন।

সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা গেছে বোরোর ফলন কম হয়েছে। আমনের ফলনেও আশানুরূপ চাল পাওয়া যাবে না। এই তথ্য আমার সন্দেহকে সঠিক প্রমাণ করেছে। এসব কারণে চাল আমদানির বিষয়টি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে জীবন-মরণের প্রশ্ন! চাল আমদানিতে নয়-ছয় হচ্ছে বলেও সন্দেহ দেখা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলে। কিন্তু খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার আলোচ্য সংবাদপত্রটিকে বলেছেন, ‘যে দামে চাল কিনেছি, এর চেয়ে কম দামে কেউ চাল কিনে দেখান। আমরা জনগণের সেবক, এখানে নয়-ছয় করতে আসিনি।’

ভিয়েতনাম থেকে জি টু জি পদ্ধতিতে ২ লাখ ৩০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তি করেছে সরকার। এর মধ্যে ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল আর ৩০ হাজার টন আতপ। ভিয়েতনাম ওই ২ লাখ টন সেদ্ধ চাল থাইল্যান্ড থেকে কিনে বাংলাদেশে সরবরাহ করবে। সেদ্ধ চাল কেনার চুক্তির সময় প্রতি টন চালের এফওবি দর ছিল ৪১৭ ডলার।

এর সঙ্গে জাহাজ ভাড়া, বার্থ অপারেটিং, হ্যান্ডলিং, লাইটেনিং, বিমা ও মুনাফা খরচসহ প্রতি টন চালের জন্য সরকারকে পরিশোধ করতে হবে ৫২১ ডলার। অর্থাৎ এফওবি দাম ছাড়া অন্য খরচ ১০৪ ডলার। ভিয়েতনাম থেকে চাল বাংলাদেশের গুদামে পৌঁছে দেবে সাউদার্ন ফুড করপোরেশন। খাদ্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, ভিয়েতনাম থেকে কেনা চালের বর্তমান এফওবি দর ৪৩২ ডলার। অর্থাৎ সরকার প্রতি টন চাল ১৫ ডলার কমে কিনতে পেরেছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের চুক্তি করা ৩০ হাজার টন আতপ চালের প্রতি টনে এফওবি দর ছিল ৩৮৫ ডলার। এটির দাম আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিবর্তিত রয়েছে।

পর্যবেক্ষক মহল বলছে, সরকার এফওবি দর নিয়ে যে তথ্য দিচ্ছে, তাতে সমস্যা নেই। তবে ভিয়েতনামের চালের পরিবহণ খরচ অনেক বেশি দেখানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, এটা খুবই পরিষ্কার বিষয়। বেসরকারিভাবে যারা বিভিন্ন পণ্য আমদানি করে, তাদের সঙ্গে যাচাই করে দেখুন। যদি আমাদের চালের পরিবহণ খরচ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, সেটাও লিখুন।

আমরা কোনো লুকোচুরি করছি না। থাইল্যান্ড সরাসরি বাংলাদেশের কাছে চাল বিক্রি করতে চাচ্ছে না। অথচ ভিয়েতনামের কাছে চাল বিক্রি করছে। এটা একটা বিরাট পাজল। যতদূর জানি, থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ নয়। তা সত্ত্বেও থাইল্যান্ড কেন বাংলাদেশে চাল রপ্তানি করতে নানা অজুহাত দিচ্ছে, সেটা এক তাজ্জব ব্যাপার। তবে ভিয়েতনাম থেকে চাল আমদানির অন্য খরচ কিছুটা হলেও অস্বাভাবিক। এক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রয়োজন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন