মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা
jugantor
মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা

  ড. হাসনান আহমেদ  

২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিদিনের পত্রিকা পড়া মানেই চারপাশের শতেক অবনতিশীল অবস্থার খবর মাথায় আসা-মনে নাড়া দেওয়া, আবার সময় অতিক্রমণে ভুলেও যাওয়া। অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। সেদিন সকালে উঠে দৈনিক পত্রিকাটা হাতে নিতেই ‘সম্পাদকীয়’তে দেখলাম, ‘সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত নির্দেশনা : অনিয়ম-দুর্নীতি রোধেও নিতে হবে পদক্ষেপ’ (যুগান্তর, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২)। পরদিন সকালের পত্রিকায় একটা হেডলাইন পড়লাম, ‘সার্ভেয়ারের ঘুস নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল’ (যুগান্তর, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২)। প্রথম লাইনটা এ রকম-‘ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হয় না সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিসে।’

সংবাদে দুর্নীতির সঙ্গে এদেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কাজকারবার প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিদিনই এ ধরনের সংবাদ পড়তে হয়। বছরের প্রথমদিকের আরেকটি প্রাসঙ্গিক তামাদি সংবাদও দুটো কারণে উল্লেখ করা দরকার-টাকার অঙ্ক সামান্য একটু(?) বেশি আর কথাগুলো ছিল ‘সত্য-ভাষণ’। হেডলাইনটা এমন, ‘লোপাট ১৫০০০ কোটি টাকা’। এ দেশে এমন খবর চন্দ্র-সূর্যের প্রতিটি তিথি-লগ্নে হরহামেশাই চোখে পড়ে। ‘হাজার হাজার কোটি’ শব্দটাও যেন ডালভাত হয়ে গেছে। আবার কোনো কোনো লোপাটের খবর অনেকদিন পর লোকপরম্পরায় শুনি, পত্রিকায় আসে না। প্রাসঙ্গিকতার কারণে খবরটা থেকে উদ্ধৃত করছি :

‘সরকারি ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, জ্বালানি তেল ক্রয়, খাদ্য বিতরণ, ব্যাংক, বিমা ও রাজস্ব খাত ঘিরে এ অনিয়ম হয়। পাশাপাশি কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য বিদেশি প্রকল্পে সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম ধরা পড়ে।

করোনাকালেও থেমে ছিল না শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গরিব মানুষের খাদ্য বিতরণের টাকা ব্যয়ে অনিয়ম; যা নিরীক্ষা বিভাগের ২০২০-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।... বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক দুর্নীতি একটি সামাজিক ক্যানসারে রূপ নিয়েছে। ক্যানসার যেমন কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুর দেশে পাঠিয়ে তারপর শান্ত হয়, তেমনি দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট-এসব সামাজিক ক্ষত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পঙ্গু না করে শান্ত হবে না। দুর্নীতির কারণে সমাজে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এতে সমাজের টার্গেট গ্রুপ তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়। জিডিপির একটি অংশ নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমির জন্ম হয়। সেখান থেকে দেশের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলে’ (যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২)।

আমি খুঁজে ফিরছি, এ দেশের কোন সেক্টরে এ ‘মহামহিম ধন্বন্তরি মহৌষধের’ বাস্তব ও প্রকাশ্য প্রয়োগ নেই? জন্ম-মৃত্যুতে, জীবনের ঘাটে ঘাটে-কোথায়? তাই তো আমরা হাল ছেড়ে দিয়ে স্রোতের অনুকূলে বসে আছি।

ছাত্রাবস্থায় সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির যা শিখতে পারিনি, তার কিছু কিছু এখন শিখছি। পত্রিকার মাধ্যমে লুটপাটের একটা সামান্য অংশ গোচরীভূত হয়। বাকিটা সাধারণ মানুষের অজান্তেই রয়ে যায়। একসময় পুকুর চুরির খবর পড়তাম। এখন ‘নদী চুরি’, ‘সাগর চুরি’র খবরও পড়তে হয়। পড়ে চোখে সরষের ফুল দেখি। একসময় চোখের ধাঁধা কাটে, কিন্তু মনের ধাঁধা রয়ে যায়।

তবে মানুষ চোখ দিয়ে তো আর শুধু পত্রিকাই পড়ে না-বাস্তব অবস্থা, পরিস্থিতিকে পড়ে, বোঝে, শেখে। এর নামও শিক্ষা। পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেওয়া। যার মনে যেটা চায়, সে সেই শিক্ষাটা নেয়। কেউ লুটেরার দলে ভেড়ে কিংবা ভেড়ার জন্য দলীয় গুণগানের কোরাস চর্চা করে। কেউবা লুটেরা শ্রেণি থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য ‘ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি’ পড়ে ঘরে ঢুকে বসে থাকে।

তবে এদেশের প্রতিটি লুটতরাজের সঙ্গেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে বলে পত্রিকায় জানা যায়। বর্তমানে এদেশে ব্যবসার রাজনীতি বা রাজনীতির ব্যবসা-দুটো কথাই সমভাবে খাটে। রাজনীতির মদদপুষ্ট মতলববাজ-দুর্বৃত্ত-দুরাচাররা এগুলো করছে। রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম দলীয় নীতি-আদর্শ ভুলে দেশের মানুষের সম্পদ মেরে-কেটে খাওয়ার নিরাপদ আখড়া হয়েছে। রাজনীতির বিষবাষ্প সামাজিক এথিক্সের পুরোটাই নষ্ট করে ফেলেছে। সাধারণ মানুষ যেদিকেই যায়, পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ পায়। একটা জনগোষ্ঠী নষ্ট হয়ে গেলে লাইনে আনা চাট্টিখানি কথা নয়! আমরা এদেশের জনগোষ্ঠীকে নিজ গুণে জন-আপদ বানিয়ে ফেলেছি, তাই এত দুর্গন্ধ।

দুর্নীতি এমন একটি সামাজিক ব্যাধি, যা দেশের অর্থনীতিকে, মানুষের সুস্থ মানসিকতাকে, সাধারণ মানুষের সহায়-সম্পদকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এ ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। দেশের অর্থনীতির নাভিশ্বাস উঠেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের যারা আমানতদার, তারাই বিভিন্ন ছলচাতুরীতে ভক্ষক। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ নির্বাক। ভক্ষকরা পঙ্কিল রাজনীতির শিক্ষাগুরু-লুটতরাজে মত্ত। রাজনীতি ও উন্নয়নের বুলি এদের সামাজিক ঢাল, রক্ষাকবচ।

দুর্নীতির এ কিঞ্চিৎ উদাহরণ থেকে একটি কথা খোলা মনে বলা যায়-সুশিক্ষা, সুশাসনের অভাব ও প্রশাসনিক নৈরাজ্য অর্থনৈতিক নৈরাজ্যকে ত্বরান্বিত করে। সেই সঙ্গে এ দেশের জনসম্পদের করুণ দশাও ভেসে ওঠে। দুর্নীতিবাজ, ঘুসখোর, মিথ্যাবাদী, প্রতারক, সরকারি তহবিল তছরুপকারীকে কখনো মানবসম্পদের সারিতে দাঁড় করানো যায় না। এসব কথা ভাবতে গেলেই শিক্ষায় মানবিক মূল্যবোধ, সততা, দেশপ্রেম, ন্যায়নিষ্ঠা ইত্যাদি গুণের সম্মিলন ঘটিয়ে দেশে মানবসম্পদ তৈরির গুরুত্ব এসে যায়, যা নিয়ে আমরা দায়সারা গোছের কাজ করি।

আমি কোনো সরকারকে কোনো দুর্নীতি বন্ধ করতে বলি না। কোনো সরকার তা ইচ্ছা করলেই পারে না। সরকার তো কোনো একক ব্যক্তি নয়। তাছাড়া দুর্নীতি একটি সামাজিক অবস্থা ও পরিবেশ। পরিবেশ দিনে দিনে ধ্বংস হয়। পরিবেশ তৈরিও অনেক দিনের ব্যাপার। সরকার একটি সামষ্টিক বা গোষ্ঠীবর্গীয় পরিচালক। এজন্য গোষ্ঠীভুক্ত সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

দেশের মানুষকে মানব-আপদ বানিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে চাওয়া মাথায় আঘাত করে টাকের যত্ন নেওয়ার শামিল। দুর্নীতি, দুরাচার, দুর্বৃত্ততা, দুঃশাসন একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রমের পর একটি ক্ষয়িত-কুশিক্ষিত-জারিত পরিবেশের অনিবার্য সামাজিক অভিঘাত। সুস্থ-সামাজিক পরিবেশের ক্রমেই অবনতি ঘটছে। বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই এদেশের শাসনব্যবস্থা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও উন্নয়নের পরিবেশ গঠনে ব্যর্থ হচ্ছে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা উঠে গেছে। সমাজে তাই সুশিক্ষা, সুস্থ চিন্তা, সুখ-শান্তি উঠে গেছে। একটি উন্নয়ন ও মানবসম্পদের শত্রুভাবাপন্ন সমাজ দিনে দিনে অজান্তেই তৈরি হয়েছে। খাজাঞ্চির নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাত থেকে লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে।

এভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে সমাজের একটি অংশ অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে। এতে ধরে নিতে হবে, আরেকটি অংশ তার আর্থিক অধিকার ও প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবৈধ টাকার মালিকের সঙ্গে টাকার প্রতিযোগিতায় খেটে খাওয়া মানুষ টিকতে পারছে না। এতে সমাজে সাধারণ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক দুর্দশা বাড়ছে। আয়বৈষম্য বাড়ছে। আমরা গড় হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি দেখিয়ে বাহবা নিচ্ছি।

এমনটি ভাবা অমূলক নয় যে, এ অবৈধভাবে অর্জিত কালোটাকাই হয়তো বিদেশ ঘুরে সাদাটাকার নামে খোলস বদলিয়ে আবার এদেশে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে যোগ হচ্ছে। যার টাকা তারই থাকছে। দুর্নীতিবাজরা অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে। যে বা যারা সুযোগবঞ্চিত বা সুনীতির কারণে অবহেলিত বা বঞ্চিত ছিল-সে বা তারা বঞ্চনার সেই তিমিরেই রয়ে যাচ্ছে। আমরা টেকসই কোনো ব্যষ্টিক উন্নয়ন মডেল হাতে নিতে পারছি না। যে মডেলই হাতে নিচ্ছি, লুটেরার দল সব সুবিধা সমূলে সাবাড় করে দিচ্ছে।

বণ্টনব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বণ্টিত অর্থের বৃহৎ অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এজন্য আমরা গলদটা না বুঝে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক কাজ করি, না ভেবে ব্যবস্থাপত্র দেই, কাজের কাজ হয় না-সময়ক্ষেপণ হয়, সম্পদ নষ্ট হয়। ক্ষতকে সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে ক্ষতের ওপর অবিরাম মলম মালিশ করি। রাষ্ট্রীয় কোষাগার উজাড় করে দলের কাজে খাদক ও দুর্বৃত্ত প্রতিপালন করি। আসলে কোথাও চতুর্মুখী দুর্নীতি ও লুটপাট হলে জনগোষ্ঠী যদি মানবিক চরিত্র ধরে রাখতে না পারে, উন্নয়নের কোনো মডেলই তখন আর কাজ করে না। মানুষের সুষ্ঠু চিন্তাধারা ও শিক্ষায় গলদ থাকলে তাদের নিয়ে উন্নয়নের কাজে আদৌ এগোনো যায় না।

মূলত সংশ্লিষ্ট মানুষের চিন্তাধারা ও চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র সুশিক্ষার অভাব, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগহীনতাকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করা যায়। তাই জনগোষ্ঠীকে সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত মানুষ বানাতে হবে। তাহলে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সুব্যবস্থা, সুনিয়ন্ত্রণ, সুস্থ চিন্তা, জীবনের উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি ফিরে আসবে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাড়লে ব্যষ্টিক উন্নয়ন সেই তালে বাড়ে না। সামষ্টিক উন্নয়নে শ্রেণিবিশেষ বেশি উপকৃত হয়। সার্বিক উন্নয়ন টেকসই করতে ব্যষ্টিক উন্নয়ন আলাদাভাবে বিশেষ জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে করতে হয়। নইলে আয়বৈষম্য, শিক্ষাবৈষম্য ও জীবনমানবৈষম্য ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এজন্য ব্যষ্টিক উন্নয়নের বিদ্যমান মডেলের ঢিমেতেতালা গতিকে ত্বরান্বিত করা আশু প্রয়োজন। তাই নতুন কোনো ব্যষ্টিক উন্নয়ন মডেলের আশ্রয় নেওয়া যায়।

এদেশে সে কাজ হাতে নিতে গেলেই রাজনীতির নামে, জনপ্রতিনিধির পরিচয়ে লুটেরা-খাদকগোষ্ঠী সামনে চলে আসে। বরাদ্দকৃত অর্থের অধিকাংশ পিঁপড়ার পেটে চলে যায়। পরিকল্পনা প্রণয়নে এটিও একটি বিবেচ্য বিষয়। একটি শ্রেণি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার আশায় সব সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে ভেড়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়। উদ্দেশ্য একটাই-চেটেপুটে পেট ভরা। সেজন্য ব্যষ্টিক উন্নয়ন মডেল বানাতে গেলে প্রথমেই খাদক সম্পৃক্ততা কমাতে হবে।

দেশের রাজনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। আলাদা একটি নীতিমান সুশিক্ষিত সমাজগোষ্ঠীর হাতে অর্থ ও সেবা বণ্টনের দায়িত্ব দিতে হবে। সেই সুশিক্ষিত সমাজগোষ্ঠী তাদের স্বচ্ছতা, মেধা, শিক্ষা, সামর্থ্য ও সেবা দিয়ে সমাজ পরিচালনার কাজ করবে। সমাজে আবার সুশিক্ষা সুস্থ মানসিকতার আবহ ছড়িয়ে দেবে। সুশিক্ষার ছায়াতলে মানুষকে আনবে। চেষ্টা চলবে জনগোষ্ঠীর মানসিকতার উন্নয়ন। জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই জনসম্পদ বানাবে। জাতি মুক্তি পাবে।

এখানে অন্য আরেকটি সমস্যা আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে কাজ করে। অনেকেই নিজের চিন্তাচেতনাকে প্রতিফলিত করে ধরেই নেয় যে, মানুষমাত্রই দুর্নীতিবাজ; সুযোগ পেলেই দুর্নীতি করবে। তাই দায়দায়িত্ব বণ্টনের সময় মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে আর বিবেচনায় আনে না। আসলে বাস্তবতা তা বলে না। প্রতিটি সমাজেই নীতিমান ও দুর্নীতিবাজ উভয় মানুষই থাকে।

সহনীয় অনুপাতে আছে কি না-এটিই বিবেচনার বিষয়। আমাদের সমাজে নীতিমান এখনো আছে, সংখ্যাটা হয়তো একটু কমে গেছে; তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নেই। তাই তাদের করারও কিছু নেই। যাদের বলদর্পিত দাপট ও ক্ষমতা আছে, যোগ্যতাও নেই, সততাও নেই, মুখসর্বস্ব বুলি আছে-তারাই বর্তমান সমাজ বিবেচনায় যোগ্য। ভুলটা এখানেই। রাষ্ট্রপরিচালনার কাজে, খাজাঞ্চি পাহারার কাজে, বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহারের কাজে আমরা সচরাচর এসব ফ্যাক্টর আমলে নিই না। অন্যভাবে বলতে গেলে, সুশিক্ষিত ও উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী যে মূলত অর্থনৈতিক সম্পদ, তা আমরা রাষ্ট্রীয় বা দেশের কাজে আদৌ বিবেচনায় নিই না। তাই এ দুরাগ্রস্ত দুর্গতি নিয়েই আমাদের নিত্য বসবাস।

উন্নয়নের ধারা কোনো বস্তুগত অবস্থা নয়। এটি একটি মানসিক অবস্থার ধারণা। সুতরাং সরকারি কর্মব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর মানসিকতার উন্নতি না হলে তাদের দেওয়া সেবার মানোন্নয়নের আশা করা বৃথা। মানুষকে পাহারা দিয়ে বেশিক্ষণ পারা যায় না। দেশ পরিচালকরা সুশিক্ষিত হবে। সুশিক্ষিত পরিবেশ দেবে। মানুষকে সশিক্ষিত ও দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হতে হবে। এজন্য নিয়মিত সুশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মনের মধ্যে মনুষ্যত্ব ও ন্যায়নিষ্ঠার মতো মানবিক গুণগুলো জাগিয়ে তুলতে পারলে তার জাগ্রত বিবেক সতত তাকে পাহারা দেবে। সে স্বেচ্ছায় নিজের ও সমাজের ভালো কাজে ব্রতী হবে।

ড. হাসনান আহমেদ : অধ্যাপক, ইউআইইউ; প্রাবন্ধিক ও গবেষক

মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিক্ষার ভূমিকা

 ড. হাসনান আহমেদ 
২২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিদিনের পত্রিকা পড়া মানেই চারপাশের শতেক অবনতিশীল অবস্থার খবর মাথায় আসা-মনে নাড়া দেওয়া, আবার সময় অতিক্রমণে ভুলেও যাওয়া। অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। সেদিন সকালে উঠে দৈনিক পত্রিকাটা হাতে নিতেই ‘সম্পাদকীয়’তে দেখলাম, ‘সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত নির্দেশনা : অনিয়ম-দুর্নীতি রোধেও নিতে হবে পদক্ষেপ’ (যুগান্তর, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২২)। পরদিন সকালের পত্রিকায় একটা হেডলাইন পড়লাম, ‘সার্ভেয়ারের ঘুস নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল’ (যুগান্তর, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২২)। প্রথম লাইনটা এ রকম-‘ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হয় না সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অফিসে।’

সংবাদে দুর্নীতির সঙ্গে এদেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কাজকারবার প্রতিফলিত হয়েছে। প্রতিদিনই এ ধরনের সংবাদ পড়তে হয়। বছরের প্রথমদিকের আরেকটি প্রাসঙ্গিক তামাদি সংবাদও দুটো কারণে উল্লেখ করা দরকার-টাকার অঙ্ক সামান্য একটু(?) বেশি আর কথাগুলো ছিল ‘সত্য-ভাষণ’। হেডলাইনটা এমন, ‘লোপাট ১৫০০০ কোটি টাকা’। এ দেশে এমন খবর চন্দ্র-সূর্যের প্রতিটি তিথি-লগ্নে হরহামেশাই চোখে পড়ে। ‘হাজার হাজার কোটি’ শব্দটাও যেন ডালভাত হয়ে গেছে। আবার কোনো কোনো লোপাটের খবর অনেকদিন পর লোকপরম্পরায় শুনি, পত্রিকায় আসে না। প্রাসঙ্গিকতার কারণে খবরটা থেকে উদ্ধৃত করছি :

‘সরকারি ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, জ্বালানি তেল ক্রয়, খাদ্য বিতরণ, ব্যাংক, বিমা ও রাজস্ব খাত ঘিরে এ অনিয়ম হয়। পাশাপাশি কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য বিদেশি প্রকল্পে সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়ম ধরা পড়ে।

করোনাকালেও থেমে ছিল না শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গরিব মানুষের খাদ্য বিতরণের টাকা ব্যয়ে অনিয়ম; যা নিরীক্ষা বিভাগের ২০২০-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।... বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক দুর্নীতি একটি সামাজিক ক্যানসারে রূপ নিয়েছে। ক্যানসার যেমন কোনো ব্যক্তিকে মৃত্যুর দেশে পাঠিয়ে তারপর শান্ত হয়, তেমনি দুর্নীতি, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাট-এসব সামাজিক ক্ষত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে পঙ্গু না করে শান্ত হবে না। দুর্নীতির কারণে সমাজে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এতে সমাজের টার্গেট গ্রুপ তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হয়। জিডিপির একটি অংশ নিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড ইকোনমির জন্ম হয়। সেখান থেকে দেশের বাইরে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। সামগ্রিকভাবে আর্থিক খাতকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে ফেলে’ (যুগান্তর, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২)।

আমি খুঁজে ফিরছি, এ দেশের কোন সেক্টরে এ ‘মহামহিম ধন্বন্তরি মহৌষধের’ বাস্তব ও প্রকাশ্য প্রয়োগ নেই? জন্ম-মৃত্যুতে, জীবনের ঘাটে ঘাটে-কোথায়? তাই তো আমরা হাল ছেড়ে দিয়ে স্রোতের অনুকূলে বসে আছি।

ছাত্রাবস্থায় সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির যা শিখতে পারিনি, তার কিছু কিছু এখন শিখছি। পত্রিকার মাধ্যমে লুটপাটের একটা সামান্য অংশ গোচরীভূত হয়। বাকিটা সাধারণ মানুষের অজান্তেই রয়ে যায়। একসময় পুকুর চুরির খবর পড়তাম। এখন ‘নদী চুরি’, ‘সাগর চুরি’র খবরও পড়তে হয়। পড়ে চোখে সরষের ফুল দেখি। একসময় চোখের ধাঁধা কাটে, কিন্তু মনের ধাঁধা রয়ে যায়।

তবে মানুষ চোখ দিয়ে তো আর শুধু পত্রিকাই পড়ে না-বাস্তব অবস্থা, পরিস্থিতিকে পড়ে, বোঝে, শেখে। এর নামও শিক্ষা। পরিবেশ থেকে শিক্ষা নেওয়া। যার মনে যেটা চায়, সে সেই শিক্ষাটা নেয়। কেউ লুটেরার দলে ভেড়ে কিংবা ভেড়ার জন্য দলীয় গুণগানের কোরাস চর্চা করে। কেউবা লুটেরা শ্রেণি থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য ‘ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি’ পড়ে ঘরে ঢুকে বসে থাকে।

তবে এদেশের প্রতিটি লুটতরাজের সঙ্গেই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে বলে পত্রিকায় জানা যায়। বর্তমানে এদেশে ব্যবসার রাজনীতি বা রাজনীতির ব্যবসা-দুটো কথাই সমভাবে খাটে। রাজনীতির মদদপুষ্ট মতলববাজ-দুর্বৃত্ত-দুরাচাররা এগুলো করছে। রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম দলীয় নীতি-আদর্শ ভুলে দেশের মানুষের সম্পদ মেরে-কেটে খাওয়ার নিরাপদ আখড়া হয়েছে। রাজনীতির বিষবাষ্প সামাজিক এথিক্সের পুরোটাই নষ্ট করে ফেলেছে। সাধারণ মানুষ যেদিকেই যায়, পচা-দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ পায়। একটা জনগোষ্ঠী নষ্ট হয়ে গেলে লাইনে আনা চাট্টিখানি কথা নয়! আমরা এদেশের জনগোষ্ঠীকে নিজ গুণে জন-আপদ বানিয়ে ফেলেছি, তাই এত দুর্গন্ধ।

দুর্নীতি এমন একটি সামাজিক ব্যাধি, যা দেশের অর্থনীতিকে, মানুষের সুস্থ মানসিকতাকে, সাধারণ মানুষের সহায়-সম্পদকে কুরে কুরে খাচ্ছে। এ ব্যাধিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। দেশের অর্থনীতির নাভিশ্বাস উঠেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের যারা আমানতদার, তারাই বিভিন্ন ছলচাতুরীতে ভক্ষক। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ নির্বাক। ভক্ষকরা পঙ্কিল রাজনীতির শিক্ষাগুরু-লুটতরাজে মত্ত। রাজনীতি ও উন্নয়নের বুলি এদের সামাজিক ঢাল, রক্ষাকবচ।

দুর্নীতির এ কিঞ্চিৎ উদাহরণ থেকে একটি কথা খোলা মনে বলা যায়-সুশিক্ষা, সুশাসনের অভাব ও প্রশাসনিক নৈরাজ্য অর্থনৈতিক নৈরাজ্যকে ত্বরান্বিত করে। সেই সঙ্গে এ দেশের জনসম্পদের করুণ দশাও ভেসে ওঠে। দুর্নীতিবাজ, ঘুসখোর, মিথ্যাবাদী, প্রতারক, সরকারি তহবিল তছরুপকারীকে কখনো মানবসম্পদের সারিতে দাঁড় করানো যায় না। এসব কথা ভাবতে গেলেই শিক্ষায় মানবিক মূল্যবোধ, সততা, দেশপ্রেম, ন্যায়নিষ্ঠা ইত্যাদি গুণের সম্মিলন ঘটিয়ে দেশে মানবসম্পদ তৈরির গুরুত্ব এসে যায়, যা নিয়ে আমরা দায়সারা গোছের কাজ করি।

আমি কোনো সরকারকে কোনো দুর্নীতি বন্ধ করতে বলি না। কোনো সরকার তা ইচ্ছা করলেই পারে না। সরকার তো কোনো একক ব্যক্তি নয়। তাছাড়া দুর্নীতি একটি সামাজিক অবস্থা ও পরিবেশ। পরিবেশ দিনে দিনে ধ্বংস হয়। পরিবেশ তৈরিও অনেক দিনের ব্যাপার। সরকার একটি সামষ্টিক বা গোষ্ঠীবর্গীয় পরিচালক। এজন্য গোষ্ঠীভুক্ত সবাইকে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে হবে।

দেশের মানুষকে মানব-আপদ বানিয়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে চাওয়া মাথায় আঘাত করে টাকের যত্ন নেওয়ার শামিল। দুর্নীতি, দুরাচার, দুর্বৃত্ততা, দুঃশাসন একটি নির্দিষ্ট সময় অতিক্রমের পর একটি ক্ষয়িত-কুশিক্ষিত-জারিত পরিবেশের অনিবার্য সামাজিক অভিঘাত। সুস্থ-সামাজিক পরিবেশের ক্রমেই অবনতি ঘটছে। বলা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই এদেশের শাসনব্যবস্থা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ও উন্নয়নের পরিবেশ গঠনে ব্যর্থ হচ্ছে। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা উঠে গেছে। সমাজে তাই সুশিক্ষা, সুস্থ চিন্তা, সুখ-শান্তি উঠে গেছে। একটি উন্নয়ন ও মানবসম্পদের শত্রুভাবাপন্ন সমাজ দিনে দিনে অজান্তেই তৈরি হয়েছে। খাজাঞ্চির নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাত থেকে লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে।

এভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে সমাজের একটি অংশ অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে। এতে ধরে নিতে হবে, আরেকটি অংশ তার আর্থিক অধিকার ও প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অবৈধ টাকার মালিকের সঙ্গে টাকার প্রতিযোগিতায় খেটে খাওয়া মানুষ টিকতে পারছে না। এতে সমাজে সাধারণ মানুষের আর্থিক ও সামাজিক দুর্দশা বাড়ছে। আয়বৈষম্য বাড়ছে। আমরা গড় হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি দেখিয়ে বাহবা নিচ্ছি।

এমনটি ভাবা অমূলক নয় যে, এ অবৈধভাবে অর্জিত কালোটাকাই হয়তো বিদেশ ঘুরে সাদাটাকার নামে খোলস বদলিয়ে আবার এদেশে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে যোগ হচ্ছে। যার টাকা তারই থাকছে। দুর্নীতিবাজরা অঢেল টাকার মালিক হচ্ছে। যে বা যারা সুযোগবঞ্চিত বা সুনীতির কারণে অবহেলিত বা বঞ্চিত ছিল-সে বা তারা বঞ্চনার সেই তিমিরেই রয়ে যাচ্ছে। আমরা টেকসই কোনো ব্যষ্টিক উন্নয়ন মডেল হাতে নিতে পারছি না। যে মডেলই হাতে নিচ্ছি, লুটেরার দল সব সুবিধা সমূলে সাবাড় করে দিচ্ছে।

বণ্টনব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বণ্টিত অর্থের বৃহৎ অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এজন্য আমরা গলদটা না বুঝে অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক কাজ করি, না ভেবে ব্যবস্থাপত্র দেই, কাজের কাজ হয় না-সময়ক্ষেপণ হয়, সম্পদ নষ্ট হয়। ক্ষতকে সারাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার না করে ক্ষতের ওপর অবিরাম মলম মালিশ করি। রাষ্ট্রীয় কোষাগার উজাড় করে দলের কাজে খাদক ও দুর্বৃত্ত প্রতিপালন করি। আসলে কোথাও চতুর্মুখী দুর্নীতি ও লুটপাট হলে জনগোষ্ঠী যদি মানবিক চরিত্র ধরে রাখতে না পারে, উন্নয়নের কোনো মডেলই তখন আর কাজ করে না। মানুষের সুষ্ঠু চিন্তাধারা ও শিক্ষায় গলদ থাকলে তাদের নিয়ে উন্নয়নের কাজে আদৌ এগোনো যায় না।

মূলত সংশ্লিষ্ট মানুষের চিন্তাধারা ও চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে। একমাত্র সুশিক্ষার অভাব, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব ও আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগহীনতাকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করা যায়। তাই জনগোষ্ঠীকে সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত মানুষ বানাতে হবে। তাহলে জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সুব্যবস্থা, সুনিয়ন্ত্রণ, সুস্থ চিন্তা, জীবনের উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধি ফিরে আসবে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাড়লে ব্যষ্টিক উন্নয়ন সেই তালে বাড়ে না। সামষ্টিক উন্নয়নে শ্রেণিবিশেষ বেশি উপকৃত হয়। সার্বিক উন্নয়ন টেকসই করতে ব্যষ্টিক উন্নয়ন আলাদাভাবে বিশেষ জনগোষ্ঠীকে সামনে রেখে করতে হয়। নইলে আয়বৈষম্য, শিক্ষাবৈষম্য ও জীবনমানবৈষম্য ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এজন্য ব্যষ্টিক উন্নয়নের বিদ্যমান মডেলের ঢিমেতেতালা গতিকে ত্বরান্বিত করা আশু প্রয়োজন। তাই নতুন কোনো ব্যষ্টিক উন্নয়ন মডেলের আশ্রয় নেওয়া যায়।

এদেশে সে কাজ হাতে নিতে গেলেই রাজনীতির নামে, জনপ্রতিনিধির পরিচয়ে লুটেরা-খাদকগোষ্ঠী সামনে চলে আসে। বরাদ্দকৃত অর্থের অধিকাংশ পিঁপড়ার পেটে চলে যায়। পরিকল্পনা প্রণয়নে এটিও একটি বিবেচ্য বিষয়। একটি শ্রেণি রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার ভাগ পাওয়ার আশায় সব সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলে ভেড়ার চেষ্টা চালিয়ে যায়। উদ্দেশ্য একটাই-চেটেপুটে পেট ভরা। সেজন্য ব্যষ্টিক উন্নয়ন মডেল বানাতে গেলে প্রথমেই খাদক সম্পৃক্ততা কমাতে হবে।

দেশের রাজনীতিকে ঢেলে সাজাতে হবে। আলাদা একটি নীতিমান সুশিক্ষিত সমাজগোষ্ঠীর হাতে অর্থ ও সেবা বণ্টনের দায়িত্ব দিতে হবে। সেই সুশিক্ষিত সমাজগোষ্ঠী তাদের স্বচ্ছতা, মেধা, শিক্ষা, সামর্থ্য ও সেবা দিয়ে সমাজ পরিচালনার কাজ করবে। সমাজে আবার সুশিক্ষা সুস্থ মানসিকতার আবহ ছড়িয়ে দেবে। সুশিক্ষার ছায়াতলে মানুষকে আনবে। চেষ্টা চলবে জনগোষ্ঠীর মানসিকতার উন্নয়ন। জনগোষ্ঠীকে ক্রমেই জনসম্পদ বানাবে। জাতি মুক্তি পাবে।

এখানে অন্য আরেকটি সমস্যা আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে কাজ করে। অনেকেই নিজের চিন্তাচেতনাকে প্রতিফলিত করে ধরেই নেয় যে, মানুষমাত্রই দুর্নীতিবাজ; সুযোগ পেলেই দুর্নীতি করবে। তাই দায়দায়িত্ব বণ্টনের সময় মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে আর বিবেচনায় আনে না। আসলে বাস্তবতা তা বলে না। প্রতিটি সমাজেই নীতিমান ও দুর্নীতিবাজ উভয় মানুষই থাকে।

সহনীয় অনুপাতে আছে কি না-এটিই বিবেচনার বিষয়। আমাদের সমাজে নীতিমান এখনো আছে, সংখ্যাটা হয়তো একটু কমে গেছে; তাদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নেই। তাই তাদের করারও কিছু নেই। যাদের বলদর্পিত দাপট ও ক্ষমতা আছে, যোগ্যতাও নেই, সততাও নেই, মুখসর্বস্ব বুলি আছে-তারাই বর্তমান সমাজ বিবেচনায় যোগ্য। ভুলটা এখানেই। রাষ্ট্রপরিচালনার কাজে, খাজাঞ্চি পাহারার কাজে, বাজেট বরাদ্দ ও ব্যবহারের কাজে আমরা সচরাচর এসব ফ্যাক্টর আমলে নিই না। অন্যভাবে বলতে গেলে, সুশিক্ষিত ও উন্নত মানসিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী যে মূলত অর্থনৈতিক সম্পদ, তা আমরা রাষ্ট্রীয় বা দেশের কাজে আদৌ বিবেচনায় নিই না। তাই এ দুরাগ্রস্ত দুর্গতি নিয়েই আমাদের নিত্য বসবাস।

উন্নয়নের ধারা কোনো বস্তুগত অবস্থা নয়। এটি একটি মানসিক অবস্থার ধারণা। সুতরাং সরকারি কর্মব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর মানসিকতার উন্নতি না হলে তাদের দেওয়া সেবার মানোন্নয়নের আশা করা বৃথা। মানুষকে পাহারা দিয়ে বেশিক্ষণ পারা যায় না। দেশ পরিচালকরা সুশিক্ষিত হবে। সুশিক্ষিত পরিবেশ দেবে। মানুষকে সশিক্ষিত ও দায়িত্ববোধে উজ্জীবিত হতে হবে। এজন্য নিয়মিত সুশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মনের মধ্যে মনুষ্যত্ব ও ন্যায়নিষ্ঠার মতো মানবিক গুণগুলো জাগিয়ে তুলতে পারলে তার জাগ্রত বিবেক সতত তাকে পাহারা দেবে। সে স্বেচ্ছায় নিজের ও সমাজের ভালো কাজে ব্রতী হবে।

ড. হাসনান আহমেদ : অধ্যাপক, ইউআইইউ; প্রাবন্ধিক ও গবেষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন